তবু আসো নাই, জানায়ে গেলে: ফাতিমা জাহান



তিনি তখন বেশ অসুস্থ। বেঙ্গালুরুতে অনেক দিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন অপারেশনের। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে চিকিৎসা নেয়ার জন্য গেলেও সেখানে ট্রান্সপ্লান্ট প্রসেজ খুব দুরুহ বলে বেঙ্গালুরুতে আসতে হয়। 

ভারতে অরগান ট্রান্সপ্লান্ট করতে যত না ঝক্কি, বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দিয়ে অপারেশনের পারমিশন পেতে তার চেয়ে বেশি ঝক্কি। নানা কাগজ দেশ থেকে আনতে হয়, তারপর লাগলে আরো কাগজ আনাতে হয়, সেগুলো বাংলাদেশ হাইকমিশনে অ্যাট্যাস্ট করে তারপর ভারত সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশ হাইকমিশন নেই। বারবার তাই যেতে হয় চেন্নাই।

ডোনারের ইন্টারভিউ হয়, ডোনারের সব ধরনের কাগজ ম্যাচ করতে হয়, শারীরিক ফিটনেসের পরীক্ষা করাতে হয়। এরপর ভারত সরকার একটা বোর্ড বসায়, সেখানে সিদ্ধান্ত হয় অপারেশনের অনুমোদন দেবে কি দেবে না। সে বোর্ডও বসে কালেভদ্রে। অতএব নিরুপায় হয়ে অপেক্ষায় বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

এসবে সময় যেমন লাগছিল সঙ্গে সঙ্গে লম্বা ধৈর্য পরীক্ষা দিতে হচ্ছিল। তিনি তো বাঁচতে চেয়েছিলেন। লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হলো সে আশার আলো। তিনি চাইতেন অপারেশন হোক। তার এ যাত্রার সবসময়ের সহযাত্রী ছিলেন সহধর্মিণী লেখক শাহীন আখতার। দুজনের ধৈর্য দেখে অবাক হয়ে যেতাম। একজনের শরীরের একটা অংশে ব্যথা আর আরেকজনের মনে নানা চিন্তা আর শঙ্কা। তাদের এ দীর্ঘ অপেক্ষার সামান্য অংশ আমি দেখেছি।

যখন জানতে পারি তিনি অসুস্থ, তখন আমি লম্বা ভ্রমণে আফ্রিকায়। বেঙ্গালুরুতে ফিরে দেখা করতে গেলাম। একজন মানুষ এত অসুস্থতার মাঝেও যে হাসিখুশি থাকতে পারেন, কথায় কথায় উৎফুল্ল হয়ে উঠতে পারেন তা ঠিক সে সময় তাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। লিভার সিরোসিস ভয়াবহ এক যন্ত্রণার নাম, সর্বময় যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণার লেশমাত্র তার চোখেমুখে দেখা যেত না। শিশুর মতো হাসি আর চোখে আনন্দ নিয়ে কথা বলতেন।

এর মাঝে আমি কয়েকবার গিয়েছিলাম বেঙ্গালুরুতে তাদের ভাড়া করা বাসায় দেখা করতে। একদিন অসুস্থ অবস্থায় মাছের ঝোল রান্না করে খাওয়ালেন। খুব ভালো হয়েছিল খেতে। আমি রেসিপি জিজ্ঞেস করতেই খুশি হয়ে বললেন। চা বানিয়ে খাওয়ালেন। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়েছিলেন তাই সেখানকার কত গল্প করলেন। আবার আরেকদিন মহারাষ্ট্রের খাবার ‘পোহা’ রান্না করে খাওয়ালেন। চোখেমুখে তার জীবনকে উদযাপন করার তীব্র ইচ্ছা।

একদিন বললেন, শুঁটকি মাছ খাবেন। আমি কয়েকটা বাজার ঘুরে কেরালা থেকে আগত শুঁটকি মাছ নিয়ে যেতেই খুব খুশি হলেন। মানুষ এত অল্পতেই খুশি হয়!

সবাই চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তার কর্মজীবন সম্পর্কে জানে, চলচ্চিত্রের শিক্ষক হিসেবে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী সেও কারো অজানা নয়। নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্যক্তি হিসেবে যে কী হাসিখুশি আর চমৎকার মানুষ ছিলেন তার পরিচয় আমি পেয়েছি।

গত রাতে জানলাম তিনি নেই। মানতে পারছিলাম না। ঢাকায় কাজ না থাকলে আমি এ সময় তাদের পাশে থাকতাম।

অথচ তার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম। আমাদের সবার অপেক্ষা আর মনোযোগ ছিল ভারত সরকারের অনুমোদনের ওপর। আমরা ভেবেছি অপারেশন হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এতদিনের অপেক্ষা কয়েক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। হৃদয়ে ব্যথার ভার বহন করা সহজ কাজ নয়। তার তো যাওয়ার কথা ছিল না। তার কথা ছিল ফিরে আসার।

আমার চোখে গত রাত থেকে তার শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস ভাসছে। বড় হয়েও সবাই শিশুর মতো মন নিয়ে, একই উচ্ছ্বাস নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে না। তিনি পেরেছিলেন।

তাকে আমি শেষবার যখন দেখি তখন তিনি হাঁটছেন, কথা বলছেন, চা খাচ্ছেন, শিশুর মতো হাসছেন। এখন তিনি দূরে কোনো হিমঘরে শুয়ে আছেন।

তিনি সুস্থ হয়ে হেঁটে হেঁটে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে উৎফুল্ল হয়ে হাসছেন—এ দৃশ্যও ইহজীবনে আর দেখা হবে না। এ ব্যথা ভাষায় প্রকাশ করার কোনো ভাষা নেই। ছোট একটা জীবন আমাদের, এত আক্ষেপ কি সওয়া যায়!

তিনি সুস্থ হয়ে দেশে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আসলেন না, শুধু জানায়ে গেলেন। আর আমাদের পেছনের নীপবীথিকায় এখনো রৌদ্র ছায়া খেলে যায়।

জাহিদুর রহিম অঞ্জন, এত তাড়াতাড়ি যাওয়া ঠিক হয়নি। যেখানেই থাকেন না কেন, ভালো থাকবেন।

ফাতিমা জাহান: লেখিকা, ভ্রামণিক

বণিকবার্তায় প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. আহ! ভাইয়া ভাবির কাছে আপনার কত কথা শুনেছি! পরে দেখাও হলো কি ভাইয়ার শেষ বিদায়ে? দারুণ করে লিখলেন আমাদের নিদারুণ দিনের কথা!

    উত্তরমুছুন