অমর মিত্রের গল্প: মানুষী মাহাতোর জীবন-মরণ





মরা জানি, আমরা ছাড়া জানবে কারা, কোথায় মানুষী মাহাতো শুয়ে আছে, লাশ তো আমরা মাটি চাপা দিয়েছিলাম। এই বনকাটির খালপাড়ে তারা আছে। সাত বছর আগে এই দিনে কুসুমডি-সাপধরা থেকে আনা হয়েছিল, গো-গাড়িতে লাশ, তার উপর নীচে খড় বিচলি। এন্তাজ আলি ধীরে বলে যারা সব বুঝি সে খাতায় লিখে রেখেছিল। কী রকম মনে আছে তার! সেদিন ছিল ফাল্গুনের অষ্টমী তিথি, শুক্ল পক্ষ। ধড়ের কোনো খোঁজ থাকল না, মুন্ডর অধের্কে দগদগে ঘা- এর মতো আগুন, বাকি অর্ধেকে নিকষ কালো মেঘ। বনকাটির লোক, তার ভিতরে দুটো জোয়ান, চারজন আধবুড়ো অন্ধকারে বসে কিছু একটা বলাবলি করছিল। বলছে এন্তাজ আলি, শুনছে আর পাঁচজন। গোপেন, বিজলী, শিবু, গুরুদাস আর সুরদাস, যমজ দুই ভাই, দুই কোদালিয়া। এন্তাজই সাঁঝবেলায় ঘরে ঘরে গিয়ে পাঁচজনকে ডেকে এনেছে অন্ধকার খালপাড়ে। বনকাটির এই খাল বারো মাইল পশ্চিমে কুসুমডি, সাপধরা ফুঁড়ে জঙ্গলে গিয়ে ঢুকেছে। আসলে উল্টো, জঙ্গল থেকে অজগরের মতো ঘুমঘুম ভাব নিয়ে বেরিয়ে এসে এগিয়েছে। শালজঙ্গলের ভিতর ওর জন্ম। মাটির তল থেকে উঠেছে শোনা যায়। এরা কেউ ওর জন্ম দ্যাখেনি। সারাবছর আধা শুখা, আধা জলের ধারা নিয়ে পড়েই থাকে বনকাটির খাল, কুসুমডির খাল, সাপধরার খাল। মৌজায় মৌজায় তার আলাদা আলাদা নাম।

মাথা খারাপ হলো নাকি এন্তাজের? এসব কথা বলে এখন বলে লাভ কী, সেই লাশের এখন কী পাওয়া যাবে? যা ভুলেই যাচ্ছিল সবাই, তা আবার মনে করা কেন? বিজলী মান্না বলল, থুয়ে রাখো, আমরাই বিপদে পড়ব।

পড়ি পড়ব, কিন্তু ক’দিন ধরে আমার ঘুম হচ্ছেনি, জানলা দিয়ে দেখি সাপধরা মানুষী মা'তো’ পিছনে তার সোয়ামী বিলাস, তার পিছনে সায়েবালি, তার ডাইনে গণেশ পাল-সব উঠনে দাঁড়ায়ে, সাতটা লাশ আমার উঠনে।
তুমি দুঃস্বপ্ন দিখেছ। বলল বিজলী মান্না।
এতদিন তো দেখি নাই।
তুমার ডর লেগেছ্যে? শিবু সর্দার বলল।
ইসব কথা তুলা কেনে, যা ইবার হঁই গিঁছে, আমরা তো ভুলে গিছিলাম। গোপেন মন্ডল বলে। এন্তাজ আলি বলল, মানুষী মাহাতোর কথা মনে আছে?

অস্থির হয়ে ওঠে বিজলী মান্না, আমরা তার কী জানি, সে তো বাইরের লোক বরল্য।
চুপ করে থাকে এন্তাজ আলি। অন্ধকার খালপাড় থেকে ওপারে তাকায়। হেলঅ বট কি দেখা যায়? আকাশ ভর্তি কত তারা, তাদের কত নাম। মানুষী মাহাতো তারাদের নাম জানতা সে গোরে চলে গেলে সেই সব নাম আর কেউ জানে বলে মনে হয় না। মুছে গেছে ওদের পরিচয়। ইসব কথা কহার জন্য ডাকা করলে? বিজলী মান্না জিজ্ঞেস করে।

ইসব কথা কি কথা লয়? এন্তাজ বলে, এতদিন ডাকা করত মাতিসার, কেন ডাকত তা ভুলে গেলে?
ডাক এলেই ধরা হত অপারেশন আছে। মাইতিস্যারের একটা কথা কাউকে মাথা তুলতে দেওয়া হবে না। কে কী করচে তার খবর সে পেয়ে যায়। কে খবর দেয়? না, থানা। জেলার আই, বি। জেলা থেকে খবর মহকুমা থেকে ব্লকে। সেই বিডিও যে কথা শুনছে না, তা জানা যাচ্ছিল, কিন্তু, শুনবে না কেন, সাহস পায় কোথা থেকে? চুনোপুটি বিরোধীরা হিসেব চাওয়ার হিম্মত পেল কোথা থেকে? সেই কুসুমডি থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত মেম্বর মেম্বর মানুষী আর তার স্বামী বিলাস কী করে বিরোধী হয়ে গেল। থানা বলছিল, ওদের দুজনকে নজরে রাখুন, ওরা কিন্তু মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে উঠছে।

এই খালপাড়ে দুদিন আগে মাইতিস্যার তাদের নিয়ে এসেছিল। আজ শুক্লপক্ষের অষ্টমী, সেদিন ছিল ষষ্টী। খাল পাড়ে মাইতি বলল, কুসুমডি আর সাপধরা আর আমাদের নেই, তবে করে নিয়া হবে, সব ঠান্ডা করে দিয়া হবে।
নেই কী করে জানা গেল? বিজলী মান্না জিজ্ঞেস করেছিল।
মাইতস্যার চুপ করে ছিল। এই গোপেন মন্ডল ধমকে উঠেছিল, মাতিস্যার বলছে, মাইতিস্যার যা বলবে তাই-ই সত্যি, জিজ্ঞেস করো কোন মুখে, কথা ভুল হয় স্যারের?

ডাকা করা হোক। তবু বলেছিল এই বিজলী মান্না। শুনে এন্তাজ আলি বলেছিল, স্যারের কাছে খবর আছে নিশ্চয়। এন্তাজের কি তা মনে আছে? এন্তাজই থামিয়ে দিয়েছিল বিজলি মান্নাকে। গোপেন তখন বলেছিল, ওরা ভিতরে অনেকদূরে গেছে, এখন কী হবে?

মাইতি বলেছিল, থাক, ভুল করছে, বুঝতে পারলে ঠিক শুধরে নেবে, ওরা বনপার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করছে, জানে না বনপাটি করলে কী হতে পারে।

ডাকা করে বলত্যে হব্যে তো, এটা ঠিক হচ্ছেনি, জানাতে হব্যে তো। আবার বলেছিল বিজলী মান্না, মানুষী আর বিলাস আসুক, বুঝনি হোক।

মাইতি আর কথা বলেনি। বিরক্ত হয়েছিল তা টের পেয়েছিল বিজলী মান্না। আর মাইতির কথা সত্য হয়েছিল ক’দিন বাদেই। শোনা যায় মানুষী আর বিলাস মাহাতো বিরোধী দলে ঢুকে পড়েছিল গাঁয়ের আর সবাইকে নিয়ে। গোটা সাপধরা, কুসুমডি বিরোধী পার্টির হয়ে গিয়েছিল। মাইতির কথা ছিল তাই। মাইতি বলেছিল, বনপার্টি দিচ্ছে তাই হচ্ছে। এ দিকে বিরোধী কেন হবে কী কারণে হবে, তোমার নিজের ক্ষোভটা কী তা বলো, পূরণ করে দিচ্ছি,পার্টির কাছে তোমার আশা কী? এখেনে বিরোধী পার্টি বলে থাকবে না, যদি থাকে তারাও মাইতির কথায় চলবে।

সেই মানুষী আর সাতজনের লাশ এসেছিল দোল পূর্ণিমার সাতদিন আগের রাতে। তাদের কাছে সন্ধেয় খবর এসেছিল বড়ি আসবে, বডি পুতে দিতে হবে। অপারেশন হয়ে গেছে। আশপাশের দশবিশ গাঁয়ে যে লাশ পড়বে, তার গতি করবে তারা। এদিকে করা অনেক সেফ, বলেছিল, মাইতি। নজরে রাখা যাবে। পুলিশও এদিকে আসবে না, ফলে লাশ তুলতে পারবে না কেউ। আস্তে আস্তে মাটির তলায় লাশ মাটি হয়ে যাবে, নিকেশ করে দিতে পারলে আর কেউ মাথা তুলবে না।

লাশ এসেছিল মধ্যরাতে। তার ভিতরে মানুষী। মানুষীর গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। খড়-বিচুলি সরাতেই উদোম নারী। জিভ বেরিয়ে গিয়েছিল, দু'চোখ ভয়ানক আতঙ্ক। আর সব বডিতে গুলির দাগ, একটা নয়, সাতটা আটটা করে। রক্তে মাখামাখি জামাকাপড়। শুধু মানুষীর গায়ে রক্ত ছিল না, চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল। মরা চোখের ভয় জীয়ন্ত মানুষগুলোর ভিতরে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। গাড়োয়ানকে বিজলী জিজ্ঞেস করেছিল, কাপড়ে ঢেকে আনলে না?
যেমন দিঁইছে, তেমন আনা করা হলো। এক গাড়োয়ান বলেছিল।
আর একজন চাপা গলায় বলেছিল, গলা টিপে মারা, মারার আগে রেপ হঁইছে কয়েকবার।
মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল বিজলী। ততক্ষণে খালপাড়ে কোদাল পড়ছিল। মাইতি স্যার এসে ঘুরে গেল, বলল, একশো দিনের কাজের ফান্ড থেকে সব লেবার-চার্জ হয়ে যাবে, বলা আছে বিডিওকে, সমিতিকে।
এই রাতে কেন করা হলো! কোদালিয়া গুরুদাস বলেছিল, অষ্টুমির চাঁদের তেজ দেখছ্য।
হঁ, চাঁদের আলোয় এসব করা কঠিন হয়্যে পড়ে, চাঁদ না থাকত্যে লিয়ে এল্যে ঠিক হতো।
অষ্টমীর চাঁদের আলোয় সব থমথম করছিল। এত আলো যে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। খালেরএপার ওপার, ওপারের ঝাঁটিজঙ্গল, তার পশ্চিমে হেলা বট, বটের ডালপালা, সব।
খালের এদিকের প্রত্যেকটা মানুষকে দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। খাল ছেড়ে, তার পাড় ছেড়ে নামাল জমি অনেক দূর অবধি গড়িয়ে উঠতে আরম্ভ করেছিল সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে। এদিকের জমি এমন। উঠতে উঠতে এক সময় তা থেমেছিল। তারপর তা যেন আকাশে মিশে গিয়েছিল। এমনিতে এতটা দেখা যায় না। এন্তাজ আলি দেখতে পেয়েছিল সব। দেখছিল এতটা এসে বলদ চারটের জিভ বেরিয়ে গিয়েছে। ভাগাভাগি সাতটা লাশ বয়ে এনেছে, মরা মানুষের ভার জীয়ন্তর চেয়ে বেশি। তারা তো সব সঙ্গে নিয়ে গোরস্থানের দিকে যায়। বিজলী তাকে বলেছিল, এত জুছনার ভিতরে হব্যে?
গোপেন বলেছিল, করত্যে তো হব্যে, বডি এস্যে পড়্যেেছ, বড়ি তো রাখা যাবেনি।
এন্তাজ এত সময়ে কথা বলেছিল, আদ্দেক চাঁদ, তবু তার তেজ দ্যাখো, চাঁদটা যেন ক্ষেপে গিঁইছে, রাতির হিম পুড়াই দিঁইছে গো।
হঁ, এই গোপেন বলেছিল, এখন গতি না করলে উপায় নাই, কুকুর টের পেয়েও ডাকছেনি, মাতিরে কে না ডরায়, মাতির কথা না শুনল্যে উয়াদেরও রেয়াই নাই।
তা তুমি এখন কী করতে চাও? জিজ্ঞেস করল সেই গোপেন।
তারপরেও তো বডি পুতা হঁইছে, এন্তাজ বলল।
হঁ, হঁইছে, তো কী হলো?
আমি আর সহ্য করত্যে পারছিনি গুপেন, আমরাও কি দোষ করি নাই?
মাতি করাল, তাই করা হল্য, মাতি করাইছে। গোপেন বলল।
বিজলী মান্না বলল, হঁ, মাতির বড় রোষ!
চুপ করে থাকে এন্তাজ আলি, দম নিয়ে একটু বাদে বলে, দোজখেও আমার জায়গা নাই, গোরস্থানের চারদিক ছোট হয়্যে আসব্যে, চেপ্যে ধঁইরব্যে আমারে।
তুমি এমন করছ কেনে, সাত বছর হঁই গিইছে মানুষী মা'তোর কেস, কারো মনে নাই।
উয়ার বাপ মা?
তখনই উয়ার বুড়া, শুনা যায় পুরুল্যার দিকে চলি গিঁইছে কানতে কানতে, উদিকে বড় মেয়্যা থাকে।
বিলাসের কেহ নাই?
উ তো গোপবল্লভপুর থেক্যে আসছিল কামকাজের খোঁজে, ইদিকে উয়ার কেহ নাই।
এন্তাজ বলল, আমার উপরালা আছে গুপেন, মনে হয় সব বলে দিলে যেন বাঁচি।
মাতি, মাতি কি ছেড়্যে দিবে তা করল্যে?
সে তো নাই, পলাইছে, নাই যখন আমাদের উচিত সব পকাশ করে‌্য দিয়া। বলতে বলতে এন্তাজ আলি বিড়ি ধরাতে গিয়ে তার খ্যাঁচাকল লাইটার শুধুই চাপ মেরে যায়। তা দেখে গোপেন দেশলাই জ্বালিয়ে ধরে তার মুখে। বিড়ি ধরিয়ে এন্তাজ আলি ধুঁয়ো ছেড়ে বলল, মাতি যাদের আনা করছিল চাকুল্যে, ধলভূমগড় থেকো, তারা বলে সাতজন মিলে মানসীরে ছিঁড়ে খেয়্যেছিল শেল শকুনের মতো।
হঁ, গোপেন বলল, মাতি অমনই করত্যে বলেছিল।
তোরে কে বলল?
গোপেন বলল, গাড়োয়ান জুড়ান পল্লে, সেই বেঁটে মতোন, কটা চোখ বিড়েলের মতোন।
তুই তো বলিসনি? এন্তাজ বলল।
না, কেনে বলব, বলার উপায় ছিল?
জুড়ান পল্লে তো মরেছ্যে। এতক্ষণে বলল বিজলী মান্না।
হঁ, উয়ার বড়ি পড়েছিল বনের ভিতর।
কে মারল? এন্তাজ জিজ্ঞেস করে।
বনপার্টি হব্যে। গোপেন বলল, ঠিক জানা নাই, আর এক গাড়োয়ানও নাই।
নাই কেনে? এন্তাজ জিজ্ঞেস করে।
তাও জানা নাই। গোপেন বলে চুপ করে থাকল।
কোথা গেল সে?

গোপেন জবাব দিল না। কিন্তু সবাই যেন জবাব পেয়ে গেল। অন্ধকারে সব নিঃঝুম হয়ে থাকল কিছু সময়। শিবু র্সদার, বিজলী মান্নার মনে পড়তে থাকে সেই অষ্টমীর রাতে কথা তার সাত দিনের মাথায় দোল পূর্ণিমায় জুঝি অত আলো হয়নি। মনে হচ্ছিল বড় বড় আলো জ্বালিয়ে দিয়ে রাতকে দিন করে দিয়েছে মাইতিস্যার। কিন্তু তো দরকার ছিল অন্ধকার। মাইতি কেন তখন অত আলো করে দেবে খাল পাড়। কোদাল পড়ছিল ঝপঝপ। কোদালিয়া তিনজনের একজন সুরদাস বলল, কী, বেপার বাবু, এক্কেরে দিনমানের মতো লাগছ্যে, ঘাম দিছে কী র’ম।
আর একজন, তার যমজ গুরুদাস বলল, বাপরে জুছনার এত তাপ!
হঁ, বোশাখখো মাস মনে লয়। সুরদাস বলেছিল।
বিড়াল- চোখো গাড়োয়ান তখন জিজ্ঞেস করল, বডি মাটিতে নামানো হব্যে কি?
না, এক্কেরে কবরে ফেলে যাবি।
কবর দিয়ার কথা তো হয় নাই।
তবে কী কথা হঁইছে?
লাশ রেখ্যে হামরা চল্যে যাব, রাতির ভিতরে পৌঁছুতি হবে। বিড়াল- চোখো বলেছিল।
মেয়্যাছেলেটারে ঢেক্যে আনতি পারিসনি।

হামরা ঢাকার কে, যেমন দিল, তেমন আনা হলো, তাড়াতাড়ি করো, গিয়ে গাড়ি ধুয়ে হামি বড়শিমালিয়া শালিঘর যাব, ডর লাগছ্যে, মেয়্যাছেলেটারে এমনভাবে মারল, কুকড়ার মতোন গলা ছিঁড়ে দিল বলা যায়।
সেই বিড়াল- চোখো গাড়োয়ান, জুড়ান পল্লে যে গেল শালিঘর, আর ফিরল না। আর একজনও তই। নিপাত্তা হয়ে গেল। এ খবর গোপেন পেয়েছিল ওই কুসুমডি গিয়ে। কুসুমডি এরপর একেবারে শান্ত। শান্ত কুসুমডি আরো শান্ত হয়ে গেল। পুরুষরা সব উধাও হয়ে গেল। বনের ভিতরে গিয়ে সিধোল। তারা রাতে ফেরে শোনা যায়, দিনমানে পুরুষ শূন্য হয়ে গাঁ ঝিমোয়। পুলিশ তদন্ত করল। তদন্ত শেষও হলেঅ। কিছুই বেরোয়নি। কী ঘটেছিল তাও জানা যায় না। কেউ মুখ খোলেনি। মাইতি গিয়ে বড় জনসভা করে এল। মিছিল হলো। মিছিলে বুড়ি, বুড়ো, বউ আর মেয়েরা, কচি কাঁচারা হাঁটল।

এন্তাজদের কাছ ছিল লাশ তুলে খানায় ফেলা। তারা চারজন, কোদালিয়া দুজন, গাড়োয়ান দুজন। ছ’জন ছিল সেই আশ্চর্য সেই চাঁদের আলোর ভিতরে। আর ছিল তাদের ছয় ছায়া। ছায়ারা তাদের সঙ্গে ঘেঅরাফেরা করছিল। ছ’টা মানুষ বারোটা হয়ে সেই জল শূন্য খালের পাড়ে নড়ছিল, এদিক ওদিক করছিল।আর সাটা লাশ চুপ করে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের দেখছিল।
এন্তাজ বলেছিল, মা’তো বউ এভাবে মরল, কমরেড তো ছিল বটে।
চুাকুল্যে-ধলভূমগড়ে ওরা ওই করে বেড়ায়, মেয়েছেলে পেলে ছাড়ে না। গোপেন বলেছিল।
আর এক গাড়োয়ান বলেছিল, তাড়াতাড়ি করো, কী থেকে কী হয়ে যায়, যা হঁইছে আজ আর কোনোদিন কেউ মাথা তুলবেনি, ডর লাগাই দিঁইছে এমুন, ডর লা লাগল্যে উয়ার ফের মাথা তুলব্যে।
এন্তাজ বলল, মা'তো বউরে মাতি পছন্দ করত, তা মনে আছে?
হাঁ বলল গোপেন, কে না জানে।
মা’তো বউরে বলেছিল সদরে আসত্যে, সদরে উয়ারে কাজ দেবে।
কে বলেছিল এ কথা?
সে বলেছিল, মা’তো বউ মানুষী। এন্তাজ বলল।
তোরে বলল কেনে?
আমার সঙ্গে বড়ভাই পাতাল সেই গোধরা -- গুজরাতের সময়, ফোটা দিল।
তারপর কী হলো? তারপর তো গোপবল্লভপুরের বিলাস এল, তখন তার গলঅয় মানুষীরে ঝুলায় দিয়ে মাতি তারে নিয়ে থাঁইকবে এমন কথা ছিল, কিন্তু সে বলল, না, বিলাসরে তার পছন্দ হঁইছিল।
আমরা জানি। বিজলী মান্না বলল, সব জানা আছে।
মানুষীর অমুন মরণ আমি ভাবি নাই।
কে ভেবেছিল? গোপেন বলল।
মাতি জোর করছিল মানুষীরে। এন্তাজ বলল।

হঁ। বাকি সবাই এক সঙ্গে বলল সেই অন্ধকারে। বিড়বিড় করতে লাগল, মানষী, মানুষী মানুষীর কথা নিয়ে। মনে পড়তে লাগল সেই ছিন্নভিন্ন মানুষীকে। তলপেট থেকে ক্ষত চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। রক্ত জমে নিম্নাঙ্গ কালিবর্ণ ধারণ করেছিল। ঊরু কুবলে নিয়েছিল যেন বাগের থাবা। সেই চাকুল্যের লোকগুলো এদিকে এসেছিল। মাইতি তাদের রেখেছিল ইস্কুল ঘরে তিনদিন। সেই তিনদিন ইস্কুল বন্ধ করা ছিল। তারা সব ষাঁড়ের মতো এক একজন। দেখেছিল এন্তাজ। মাইতি তাকেই সবচেয়ে বিশ্বাস করত। কেন করাত তা কে জানে? হয়ত তার সঙ্গে মানসীর কথা চলত, তাই। ফোটা দিয়ে বড় ভাই করেছিল তাকে, তা জেনেই। তাকে কি বলেনি মাইতি, মাহাতো বউরে বুঝাতে পারবি, উয়ার অনেক কাজ, ব্লকে এস থাকুক, পার্টি ওর ভার নেবে, বিলাস থাকুক ওদিকের দায়িত্বে। সোয়ামী ছেড়ে আসবে কী করে‌্য?

তা বটে। বুদ্ধিমান মাইতি আর বলেনি। কিন্তু সে হলো বাঘেরও বাঘ। শিয়ালেরও শিয়াল। সে খবর রাখছিল। মাহাতো বউ বুঝতে পারছিল মাইতি াতকে ছাড়বে না। তখন ওদিকে বিরোধী মত উঠছিল, স্বর শোনা যাচ্ছিল, বনের ভিতর বন-পার্টি বাসা বাঁধছিল। মাহাতো বউ-এর রোষ খুব। মাইতির ডাক ফিরিে য় ফোঁস করেছিল সে, মানুষীর কোনো মান নাই, সে কি তুমার কমরিড হবেনি মাতিস্যার?

সে একটু একুট করে সরে যাচ্ছিল মাইতির থেকে। মাইতির কথা ছড়া কোনো কাজ হয় না, মাইতি তখন কুসুমডি, সাপধরার টাকা ছাড়ছিল, ওদের ভাতে মারব। কেন মারবে, তার জবাব নেই। মাহাতো বউ এসেছে রিলিফের দরবারে, মাইতির কোনো নির্দেশ নেই। মাহাতো বউ হকের কথা বলতেও সেই কথঅ, মাইতস্যার বলে দেবে কার কী হক, কার কী পাওনা, তবেই তো বিডিও অভিস দেবে, বিপিএল কার্ড মিলবে, বিধবা ভাতা মিলবে, বার্ধক্যভাতা মিলবে। তার কথায় সূর্য ওঠে, চাঁদ ওঠে, পুন্নিমে অমাবস্যা হয়। আকাশে মেঘ হয়, কুয়োর জল শুকোয়, শুকোয় না। সেখেনে মানসী মাহাতো তাকে না করে কী করে? মহাতো বউ খালি হাতে ফিরেছে যখন থেকে, তখন থেকে বিরোধী হয়ে পড়া শুরু। মাইতি বোঝেনি এতটা হতে পারে। তার দেশে তার বিপক্ষে কেউ যেে পারে তা ছিল অসম্ভবের কথা। তা-ই শুরু হয়েছিল। কেন গাঁয়ে লোক না খেয়ে থাকবে, কেন কেউ কিছুই পাবে না। বিলাস আর মানসী মাহাতো একবার সাপধরা কুসুমডির লোক নিয়ে এসে বিডিওকে দাবীপত্র দিয়ে গেল। শ্লোগানে শ্লোগানে চারদিক কাঁপাল। কাঁপালই, কেননা কার বুকের পাটা আছে এদিকে, এদেশে মাইতির কতৃত্ব নিয়ে নাম না করেও কথা বলে। পঞ্চায়েতে প্রস্তাব পাশ হয়ে গেলেও কার হুকুমে সব বন্ধ থাকে?

মাইতি ডেকেছিল বিলাস মাহাতো আর দলের অন্য পাঁজনকে। সব মিলে ছয় না সাতজজন এসেছিল। যাকে ডাকেনি সেই মানসী মাহাতোও এসিেছল। কথা যা বলার মানসীই বলেছিল, সাপধরা কুসুমডি কি না খেয়্যা থাকবে? কী জবাব দেবে তারা? মাইতি বলেছিল, বিডিওকে সব বলা আছে।
বিডিও তাহলে না বলে কেনে?
অসুবিধে আছে তাই না বলে।
কী অসুবিধা তা হামরা জানব। মানসী বলেছিল, সরকারের পাঠানো চাল গম ডিলার বিচে দেয় কেনে?
কে বলল বেচে দেয়?
হামরা জানি, ডিলারকে ধরা হোক, হামরা ধঁইরব।
আইন শৃঙ্খলায় হাত দিয়ো না, ফুড ইনসপেক্টারকে বলে দিচ্ছি।
উ তো মাসগেলে টাকা পায় দঁডপাটি ডিলার থিকে, উ লককে হামরা কি বলি নাই?
তুমি দেখি সব জেনে বসে আছ মানুষী, যা বলছি তা করো।
কী বলছ তুমি মাতিসার?
এখন কোনোকিছুই হবে না, তোমাদের ভাগ অন্য মৌজায় যাচ্ছে, সেখানে দরকার আরো বেশি।
তাদের ভাগ কী হলো?
সব কি বলতে হবে?
এক জায়গার কোটা আর জায়গায় যায় কী করে‌্য, কে তুলে নেয় সে কোটা?
মাইতি বলেছিল, মানুষী মাহাতো, মাইতি আর জবাব দেবে না, তোমরা যাও।
কেনে যাব, হামাদের পাওনা হামরা চাই।
তারপর তো তারা আলাদা হয়েই গেল। মানুষীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এন্তাজ আলির ব্লক অফিসে। মানসী বলেছিল, মাতি সার শোধ নিচ্ছে, তুমি তা বুঝো নি বড় ভাই?
কিন্তু সে ছাড়া তো উপায় নাই।
হামরা হকের দাবী ছাড়বনি।
দাবী তারা করে যাচ্ছিল। মাইতিরও রোষ বাড়ছিল। মাইতি বলত, তার কাছে এসে মাথা নত করে দাঁড়াক কুসুমডি, সাপধরা, সে সব করে দেবে, কিন্তু দাবী করলে দাবী আদায় করা যাবে না।
কারোর কোনো হক থাকতে পারে না এটা জানা দরকার, সব তার পার্টির অধীন এটা কি সাপধরা কুসুমডি জানে না?
হঁ, ঠিক কথা। এন্তাজ বুঝতে পারছিল জটিল হয়ে যাচ্ছে সব। মাইতিস্যারকে বাদ দিয়ে কিছু হয়? এটা কি জানে না মানষী মাহাতো? মাইতিস্যার বলছিল, ওদের সঙ্গে বনপার্টির যোগাযোগ হয়েছে।
মাইতস্যার বলছিল, বনপার্টি সরকার উৎখাত করতে চায়, এর পিছনে বিদেশী শক্তি।
এন্তাজ শুনেছে সব। প্রথমে কথা বলেনি, পরে বলতে হয়েছে। না বললে মাইতস্যার খুশি হয় না। আর মানুষী মাহাতোর সঙ্গে দেখা হত না। সে বলেছিল, তাদের হয়ে কথা বলতে, আওয়াজ তুলতে। তার করার ক্ষমতা ছিল না তার। সে কী করে আওয়াজ তুলবে? এন্তাজ বলল, আমি তো দাস হঁই ছিলাম, তাই মানুষীর লাশ আমারে দিয়া কবর দিয়ালো মাতিসার, রায়েটের সময় ও আমারে ফোটা দিল কুসুমডি, নিজির ঘরে ডেকে নিয়ে।

বিজলী মান্না বলল, আমরাও তো দাস হয়ে ছিলাম মাইতির।

আমরা মাইতির কথায় গোর কেট্যেছি, লাশ পুতেছি, মাইতি আমাদের গোরকোন করি দিঁইছিল। কোদালিয়া গুরুদাস বলল, গোরকোন তো আমরা দু’ভাই আমি তো কোদাল মেরে মেরে গোর কেট্যে কেট্যে।।। উফ সব ভুলি গিছিলাম তারপরেও তো গোর কেট্যেছি, শিলাবতীর চরে পাঁচটা বডি এল একসঙ্গে, আর একবার এল হাফ পুড়া কঙ্কাল, ডোমের কাজ ইয়ার চেয়্যা ভাল।

সবাই চুপ করে আছে। সেই আগুনে জোছনা ফিরে এল বুঝি আবার। মানুষীর বডি খড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে নীচে শোয়ান হলো। তারপর পর পর ছ’টা বডি। খড়ে ঢেকেও চাপা দেওয়া যাচ্ছিল না মানুষীকে। চাঁদের আলো সব আরো খুলে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল জোছনার তেজে খড়ে আগুন ধরে যাবে। মনে হচ্ছিল এও মাইতির কারসাজি। এমনই দাপট তার যে চাঁদের আলোও বুঝি রৌদ্রকিরণ হয়ে উঠতে পারে। তারপরে আচমকা এন্তাজের মনে হয়, মানুষীর জন্য হচ্ছে এমন। মরা মানুষীর ছিন্নভিন্ন দেহ থেকে আগুন বেরিয়ে আসছে। মাইতি একদিন বলেছিল, ওর কত তেজ, তেজ ভাঙব এমন করে, মেয়েছেলে আবার মানুষ! ওরা হলো মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষের কাপড় খুলে দিলে সে লুকোবে কোথায়?
এন্তাজ বলল, মরা মানুষীরে কবরে না ঢুকোলে আগুন ধরে যেত সবদিকে।

বিজলী মান্না কেন আর সবাই শিহরিত হলো এই কথায়। মনে পড়ে গেল বিজলীর। মাইতির ওই কথা তারও তো শোনা। মাইতি যখন রোষ প্রকাশ করত, তখন ধরেই নেওয়া যেত শোধ নেবে মাইতি স্যার। কিন্তু ওই সময় ধরে নিয়েছিল ও হলো কথার কথা। মেয়েমানুষ নিয়ে পুরুষমানুষ অমন কথা বলেহ থাকে । বলে সুখ পায়। কিন্তু লাশগাড়ি যখন পৌঁছল, আর খড়বিচুলির ভিতর থেকে যখন বেরিয়ে এল উদোম মানুষী, ধরা গেল মাইতি যা বলে, তা করতে পারে। সে হিম্মত তার আছে। শীত করেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। ভয় করেছিল। তারপরই জোছনায় সব পুড়তে আরম্ভ করল। মাটিতে শোয়ান মানুষীর তাপে হিমে ভেজা মাটি কেমন তেতে উঠেছিল। লাশ তুলে খানার ভিতরে ফেলে মাটি চাপা না দেওয়া পর্যন্ত চলল এমন। হ্যাঁ, তাই। বিজলী তখন বোঝেনি, এখন বুঝছে বলল, এন্তাজভাই, কথাটা ঠিক, মাটিতিও পা রাখা যাচ্ছিল নি মনে হয়।আমরা মাইতির বাঁধা মজুর ছিলাম, পেটভাতার মুনষ ছিলাম মনে হয়। বিড়বিড় কলল কোদালিয়া গুরুদাস, বলল, খানা কাটত্যা হব্যে, কাটা করলাম, কেন খানা কাটা তা কি বুঝি নাই, কুছু বলার হক ছিলনি।

বন্ধক দিয়া হঁইছিল আমাদেরকে, মাইতি আমাদের খেয়ে ফেলছিল, আমরা পাপ করলাম। বিড়বিড় করল গোপেন, বলল, জানা ছিল কুসুমডি, সাপধরায় অপরিশন হবে, খবরও যদি দিয়া যেত, মানুষী ওরম ভাবে মরত না, কিন্তু মাতি জানত্যে পারত ঠিক, ভয় করল তাই।

এন্তাজ বলল, মানষের তো একটা আত্মা থাকে, রুহ, রুহ বাঁধা পড়ে গিইছিল মাইতির কাছে, না হল্যে মানুষীর লাশ মাটি চাপা দিয়ে রেহাই হলো আমাদের।

তাই-ই হয়েছিল। লাশগুলো খানায় ফেলে মাটি চাপা দিয়ে তবে বাঁচা। তারপর সারারাত বসে থাকা, শিয়াল কুকুরে টেনে তুলতে পারে। এক এক রাতে এক একজন। এন্তাজ বলল, মাটির তল থেকে আগুন বের হত্য, টের পাও নাই? মানুষীর তেজ মারত্যে পারে মাইতি। তেজ মরে নাই মানুষীর। গোরের ভিতরে পড়ে ফুঁসত, টের পাও নাই?
হঁ, হঁ, বলল কোদালিয়া গুরুদাস, কিন্তু এখন ইসব কহে কী লাভ, দুঃখ হব্যে শুধু। এন্তাজ বলল, মানুষীরে মাটির তল থেকে বের করে আনি যদি?
এ কহ তুমি এন্তাজ, তাহল্যে কেউ কি ছেড়্যে দিবে, মানুষ ফুঁসছ্যে, আমরা দুষী হঁই যাব।
এন্তাজ আলি বলল, তুমার কি মনে পড়ে না মানুষীর কথা?
পড়ে। বিড়বিড় করল বিজলী, জানতাম কুসুমডি, সাপধরায় যাবে চাকুল্যের লোকগুলি, মাইতি আমারে কহিছিল, কিন্তু আমি খবর দিতে পারি নাই, আমার ও ডর লাগল।
শুনতে শুনতে শিবু সর্দার বলল, আমিও বলত দুটা মৌজা বনপার্টি হঁই গেল, উয়ারা মাইতিরে চিনেনি, মাইতির রোষ জানেনি, মাইতি কী করত্যে পারে জানেনি, বড় অপরিশন হবে জেনেও আমি চুপ করে ছিলাম, ডর লাগল খুব, মাইতিরে আমার খুব ভয় লাগে।

এন্তাজ আলি বলল, আমি জানতাম না, আমারে কহে নাই মাইতিসার, কিন্তু সেদিন সাঁঝবেলায় ডেক্যে বলল কাজ আছে, তুমরাও তো ছিলে, খালপাড়ে ডেকে আনল্য, মনে নাই?
তুমি যদি জানত্যে, খবর দিত্যে কুসুমডি, সাপধরায়? জিজ্ঞেস করল গুরুদাস কোদালিয়া।
পারতেনি, আমরাও জানতাম কিছু একটা হচ্ছে, আমরা তো তিনদিন ভাত রেঁধেছিলাম ইস্কুল ঘরে চাকুল্যের লোকগুলোর জন্যে, তারা বলাবলি করত, জেনেও কিছু বলত্যে পারি নাই, মাইতি বলল, কোনো কথা যেন কেউ না জানে। গুরুদাসের ভাই সুরুদাস বলল।
হঁ, পারতামনি, মাইতিরে খরিস কেউটে মনে হতো।
সত্যই তুমি জানতেনি? জিজ্ঞেস করল গোপেন।
আমরা সবাই জানতাম কুসুমডি সাপধরায় অপরিশন, তুমি জানতেনি?
না, জানলে আমি পলাই যেতম হে।
সত্য, নাকি জেনেও না জেনে ছিলে, পলানোর সাহস আমাদের ছিল? বলল সুরুদাসের ভাই গুরুদাস।
মাথা নিচু করল এন্তাজ। বলল, মনে নাই জানতাম কি জানতাম না, কোদাল আনা করো গুরুদাস, সুরুদাস।
কী হবে?
গোরস্থান খুঁড়া হবে, মানুষীরে তুলে আনি।
সবাই চুপ করে থাকল। তারপর আট বছর পরে আজও শুক্লপক্ষের অষ্টমীর চাঁদ উঠে এল। এও সেই ফাল্গুন মাস। আজও ধেয়ে আসছিল নিমফুলের গন্ধ। সেই মলিন জোছনা আজও ভেসে এল দূর আকাশ, মহাকাশ থেকে। জারুল গাছের ডালে বুড়ি পেঁচা বসে আছে ঠায় সেদিনের মতো।
বিজলী মান্না বলল, হঁ, কোদাল আনা করো গুরুদাস সুরুদাস, মানুষীরে তুলা হোক, না তুললে মাতির শেকল-বাঁধা মুনিষ শিকলে বাঁধা-ই রহি যাবে, কারুর মুক্তি হবেনি।
হঁ, আনা করো সুরু গুরু। বলল শিবু সর্দার। তারপরে গোপেন। সুরুদাস ওঠে, বলে, মাটি গরম হয়ে উঠছ্যে, টের পাও কেউ?
হঁ পাই।
জুছনা বেশি কর‌্যে ফুটতে লেগ্যেছে, টের পাও?
হঁ পাই।

তবে ডাকা করো বনকাটি, মনসাবাড়ি, দশহাজারি, আমলাশোল, সাপধরা, কুসুমডির মানুষজনকে ডাকা করো। বলতে বলতে হাঁক পাড়তে পাড়তে কোদালিয়া গুরুদাস চলল কোদাল আনতে। তার যাওয়া আসার ভিতরেই চাঁদের আলো দিনের রোদ হয়ে ঝলসাতে লাগল দশদিক।

*****
লেখক পরিচিতি: অমর মিত্র-এর জন্ম ৩০ আগস্ট, ১৯৫১) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবন কাটে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের এক দপ্তরে। তিনি ২০০৬ সালে ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। অশ্বচরিত উপন্যাসের জন্য ২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চ শিক্ষা দপ্তর থেকে। এ ব্যতীত ২০০৪ সালে শরৎ পুরস্কার ( ভাগলপুর ), ১৯৯৮ সালে সর্ব ভারতীয় কথা পুরস্কার স্বদেশযাত্রা গল্পের জন্য। ২০১০ সালে গজেন্দ্রকুমার মিত্র পুরস্কার পান। ২০১৭ সালে সমস্ত জীবনের সাহিত্য রচনার জন্য যুগশঙ্খ পুরস্কার, ২০১৮ সালে কলকাতার শরৎ সমিতি প্রদত্ত রৌপ্য পদক এবং গতি পত্রিকার সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২২ এ ছোটগল্পের জন্য পেয়েছেন ও’হেনরি পুরস্কার। তাঁর গল্প, ‘দ্য ওল্ড ম্যান অফ কুসুমপুর’ তাঁকে এই পুরস্কার এনে দিয়েছে। গল্পটির বাংলা শিরোনাম ‘গাঁওবুড়ো’। বাংলায় লেখা গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক অনীশ গুপ্ত। গল্প, উপন্যাস, ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর অসংখ্যা গ্রন্থ রয়েছে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

5 মন্তব্যসমূহ

  1. শ্বাস বন্ধ করে পড়লাম কিন্তু শেষটাকে যেন আরো অন্যরকম করা যেত কি ।

    উত্তরমুছুন
  2. তখন ওই ভাবে।এসেছিল

    উত্তরমুছুন
  3. চাঁদের আলো আর মানুষের তেজ মিলেমিশে আলো হয়ে থাকা প্রত্যয়! তাকে কি মাটি চাপা দেওয়া যায় !

    প্রতিভা সরকার

    উত্তরমুছুন