বিরহিলিও পিনিয়েরার গল্প: Balmহীন অ্যালবাম




অনুবাদ: বিপ্লব বিশ্বাস

বোর্ডিংয়ের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত উত্তেজনায় ফুটতে লাগল। যথেষ্ট নাদুস-নুদুস কর্ত্রী মহিলা দারোয়ানকে ডেকে নির্দেশ দিয়েছেন যে সে যেন অন্যান্য বোর্ডারদের জানিয়ে দেয় ,তিনি তার ফোটো অ্যালবামটি বিকেলে সর্বসমক্ষে দেখাবেন। এই মহিলার চারপাশে বসার সিট বিক্রির এক সুনিয়ন্ত্রিত ব্যাবসা সেই দারোয়ানের আগে থেকেই ছিল, আর এখন সে দরজায় দরজায় ঘুরল, সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গার পরামর্শ দিল বাড়ির জনাকয় সেই বোর্ডারদের যারা আমেরিকি সিগারেট খেত আর গাঢ়- সবুজ লেন্সের সোনার ঘের বসানো সানগ্লাস কিনেছিল। কিন্তু সর্বাগ্রে তাকে ধাতস্থ হতে হবে। ঘটনা হল, অ্যালবাম দেখানোর ঘোষণায় সে বড্ড আবেগী হয়ে পড়েছিল। এতে সে চরম বিব্রত হল কেননা বোর্ডাররা কিছু অস্বাভাবিক ঘটতে যাচ্ছে ভেবে ( এবং একমাত্র অস্বাভাবিক সম্ভাব্য ঘটনাটি ঠিক ওই অ্যালবাম উপস্থাপনের বিষয়টা), সেই স্থানে জড়ো হল যেখানে সেই মহিলা তার অ্যালবামটি মেলে ধরবেন, প্রদর্শন শুরু হবার অনেক আগে থেকেই সেরা আসনগুলি দখল করল জন্য কোনও মূল্য না দিয়েই। মহিলা অবশ্য দারোয়ানের এই গোপন ব্যাবসার কিছুই জানতেন না : তিনি তাহলে মধ্যেমাঝেই তার এই বিখ্যাত প্রদর্শন তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দিতেন। এই কারণেই গরিব বোর্ডাররা - এমনকি যারা আপাতপ্রতীয়মান অসুবিধাসহ বসেছিল - তারাও দারোয়ানের এই কলঙ্কজনক ব্যাবসার খবর তাকে দেয়নি, একটা নোংরা ব্যাবসা যা তার কাজের পবিত্রতায় কালি ঢেলে দিয়েছে। কর্ত্রী মহিলার কাছে যদি এটা বেখাপ্পা ঠেকত যে দরিদ্রতম বোর্ডাররা শেষের আসনগুলি দখল করবে তিনি দারোয়ানকে এই খবর দেবার ঠিক আধ ঘন্টা পরে যে তিনি ওই বিকেলে তার পারিবারিক ও ভ্রমণ সংক্রান্ত অ্যালবামটি সবার সামনে মেলে ধরবেন - আর এই আধ ঘন্টা সময়ের মধ্যেই দারোয়ান সবচেয়ে সম্মানিত বোর্ডারদের কাছে ভালো সিটগুলি বিক্রি করে দিয়েছে - দরিদ্রতর বোর্ডাররা যাদের সকাল আটটায় ঘোষণার সময় থেকে বিকেল পাঁচটায় শুরুর সময় অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছে, তারা তাকে ব্যাখ্যা করে পুনরাশ্বাসিত করেছিল যে দূরের সিটগুলো তারা পছন্দ করে নিয়েছে ঠিক যেমন অন্যরা কাছেরগুলি বেছে নিয়েছে। কেননা নিশ্চিতভাবে সেখানে এক উন্নততর উদ্দেশ্য ছিল, সকল বিবাদের চাইতে, সকল মন কষাকষির চাইতে, সকল গোপন ষড়যন্ত্রের চাইতে তা মহত্তর এবং সেটাই এই অ্যালবাম দেখার চরম প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, যেইমাত্র দারোয়ান ঘোষণা করেছিল যে শ্রেষ্ঠ সিটগুলি বিক্রি হয়ে গেছে, কোনও বিনয়ী বোর্ডারই সেই সেগুলি দখল করার ঔদ্ধত্য দেখাবে না। অবশ্যই তারা যে কোনও আসনেই বসতে পারত, কিন্তু কলঙ্ক উসকে দেবার ভয় - যা নিশ্চিতভাবেই অ্যালবামের মালকিনকে অসন্তুষ্ট করতে পারত - তাদের এই চরম লাঞ্ছনা ভোগ করতে বাধ্য করেছিল যা কিনা সকল রকম দারিদ্র্য - আরোপিত।

এটা বিশ্বাস করা সরল মনের পরিচায়ক হবে যে উক্ত প্রদর্শন আধ ঘন্টা কিংবা বড়োজোর এক ঘন্টা অবধি চলবে। অতীতে কখনও কখনও সারা দিন কেটে গেছে ; পুরো দিনের কম তো নয়ই - অর্থাৎ অ্যালবাম খোলার শুরু থেকে বন্ধ করা পর্যন্ত টানা চব্বিশ ঘন্টার প্রদর্শন। কিন্তু কেউই আগাম বলে দিতে পারেনি ঠিক কতক্ষণ এই প্রদর্শন চলবে। যেমন, কর্ত্রী মহিলা যদি তার শাদা পোশাকে মোড়া ছবিটি দেখাতেন যা পরে তিনি ইতালি ভ্রমণকালে কলোসিয়ামের ধ্বংসাবশেষের মাঝ দিয়ে চাঁদনি রাতে হেঁটেছিলেন, তাহলে এই আখ্যান নিশ্চিতভাবেই তিন দিন তিন রাত্রি ধরে চলত। অর্থাৎ বলার কথা এটাই, যে ফোটো সহজেই মহিলার এক পলকেই দেখা শেষ হতে পারত ( এবং অবশ্যই, বেচারা বোর্ডারদের দ্বারাও) তা ছ মাস সময় নিয়ে নিত - যা এ পর্যন্ত প্রদর্শন সময়গুলোর মধ্যে দীর্ঘতম।

আমি সযত্নে পোশাক পরছিলাম - ওইদিন আমাকে নতুন কাজে যোগ দিতে হবে, এক ধনী অন্ধ বৃদ্ধের পাঠক হিসেবে, আর আমি প্রথম দিনেই শ্রেষ্ঠ ছাপটি ফেলতে চেয়েছিলাম - ঠিক সেই সময়ে দরজায় জোর আওয়াজ কানে এল। বোর্ডারদের কাছে এটা অশালীন, আমার মনে হল, বিশেষ করে আমার কাছে, যেহেতু আমি একদিন আগেই এখানে এসে উঠেছি। যে আমাকে এমন অসভ্যের মতো বিরক্ত করছে তার কাছ থেকে এর পূর্ণ ব্যাখ্যা দাবির প্রস্তুতি নিয়ে দরজা খুললাম। সেই লোকটা - যাকে পরে বোর্ডিংয়ের দারোয়ান বলে চিনলাম - আমি দরজা বন্ধ করার আগেই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আবেগতাড়িত গলায় আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে বলতে, '' আমি আপনার জন্য শ্রেষ্ঠ সিটটি বাঁচিয়ে রেখেছি। '' '' কীসের সিট?'', আমার বুকে চেপে রাখা তার হাতদুটো ঠেলে ছাড়িয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম। '' হ্যাঁ, সবচে সুবিধাজনক সিটটি '', সে উত্তরে বলল ; আমার প্রশ্নকে তোয়াক্কা না করেই সে বলে গেল, '' মালকিন মহিলার ঠিক ডান দিকেরটি, কেননা তার স্বামী বসেন তার বাঁদিকে ; তাই সেই জায়গাটি আর কেউ দখল করতে পারে না। জানেন, মহিলা তার স্বামীকে পাশে নিয়ে বসান যাতে করে তিনি যখন কাত হয়ে তার কাছে জানতে চান, ' তাই না, ওলেগারিয়? ' কিংবা ' তুমি মনে করতে পারছ না, ওলেগারিয়? ' ভদ্রলোক তখন কোনও শব্দ উচ্চারণ না করে শুধু ইতিবাচক মাথা নাড়েন। " " কিন্তু আমার হাতে তো একদমই সময় নেই ",আমি বললাম, " তাড়াতাড়ি বাস ধরে সময়মতো নতুন কাজে যোগ দিতে হবে। " " এখানে কেউ কাজে যাবার কথা ভাবেই না ", বুড়ো দারোয়ান বলল। " ভদ্রমহিলা যখন তার প্রদর্শনের ঘোষণা দেন তখন এখানকার যাবতীয় কাজকাম মুলতুবি রাখা হয়।" " কীসের প্রদর্শন? ", যান্ত্রিকভাবে জানতে চাইলাম। " আরে, এটাই তো আপনাকে বুঝিয়ে বলতে চাইছি আর আপনি তো ঠিকঠাক কানই দিচ্ছেন না। আমি আপনাকে শ্রেষ্ঠ সিটটি দিতে এসেছি, মহিলার এক্কেবারে ডানদিকে, আর আপনি, এমন করছেন যেন এটা কোনও বিষয়ই নয়... আপনি কি জানেন এখানে অনেকেই আছে যারা ওই আসনটি পাবার জন্য খুন পর্যন্ত করতে পারে?" " কিন্তু নতুন কাজে যোগ দেবার জন্য আমার হাতে তো সময় নেই বললেই চলে। আমি তো আর অপেক্ষা করতে পারব না। এই অন্ধ মানুষেরা খুবই সচেতন আর যাই হোক, প্রথম দিন কাজে যোগ দেবার ব্যাপারে প্রত্যেকেরই সময়নিষ্ঠ হওয়া উচিত। " বন্য জন্তুর মতো এগিয়ে আসা এক বিপুল হট্টগোলে আমার শেষের কথাটি চাপা পড়ে গেল। যেন এক সঙ্গে হাজারো পায়ের শব্দ দপদপিয়ে এগিয়ে আসছে, যেন অসংখ্য মুখ থেকে যন্ত্রণাকাতর ধ্বনি দিকবিদিক বিদীর্ণ করছে। "ও সব ইতর ক্ষ্যাপাদের দল", বেরোনোর যে দরজাপানে আমি ছুটে গেলাম সেদিকে নজর না দিয়ে বুড়োটা অক্লেশে বলল, " ওরা ওইসব উন্মত্ত লোকজন। যেহেতু পয়সা দিয়ে কিনতে পারে না, সেহেতু তারা সিট দখল করতে হুটোপাটা করে ; উপরন্তু তারা সব সময়ই বাইরের অতিথি, এবং এতে করে অসংরক্ষিত সিট ধরার হুড়োহুড়িতে বিষয়টা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। যত তাড়াতাড়ি এসে পৌঁছুবে ততই অ্যালবামের গা ঘেঁষে বসতে পারবে, এটাই ব্যাপার। " সে এবার লোকের সারি দেখতে মাথা ঘোরালো। " ওই মেয়েটাকে দেখুন - যে কিনা দলের একদম আগে! আগের বার যেহেতু কোনও সিট পায়নি আর সেই প্রদর্শন দু মাস ধরে চলেছিল, সে প্রচুর খুবই গুরুত্ববহ ছবি দেখতে পায়নি। একবার ভাবুন তো! প্রতি তিন চার ঘন্টা অন্তর তাকে বিশ্রাম নিতে হত, মেঝেতে শুয়ে পড়তে হত এবং এতে সে এতটাই হেদিয়ে পড়েছিল যে চরম অসুস্থ হয়ে পড়ল। " " কিন্তু এই বাড়িতে এত লোক বাস করে, জানতাম না তো। দেখুন, একশোর ওপর বাসিন্দার ভিড় পেরিয়ে গেল। " " হ্যাঁ, বুড়ো দারোয়ান বলল, " আর চল্লিশটির বেশি সংরক্ষিত আসনের হিসাব তো ধর্তব্যের মধ্যেই নেই। " " একেবারেই দুর্বোধ্য ", আমি বিড়বিড়িয়ে বললাম, " শুধু একটা ফোটো অ্যালবাম দেখার জন্য এদের এমন ত্যাগস্বীকার!" " এ তো কিছুই না!, বুড়ো শুনে বলল, " যেমন ধরুন, যদি এটা আগে থেকেই জানা যায় যে এই প্রদর্শন মাসাধিককাল চলতে থাকবে, তাহলে নিম্নবর্গের বোর্ডাররা দুদিন অন্তর খাবার খাওয়া ঠিক করে নেয় আর প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম বসা সিটের ওপরেই সেরে নেয়। কখনও কখনও পড়শিরা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে অভিযোগ জানিয়েছে ; ভাবতে পারেন, মলমূত্রের যে দুর্গন্ধ যা তখন এই বাড়ি থেকে বের হয় - বাইরে বেরোনো থেকে কঠিনভাবে সুরক্ষিত রাখা সত্ত্বেও - তা অসহ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু এ সবই তুচ্ছ ব্যাপার... " এই পর্যন্ত বলে খানিক দম নিয়ে শুরু করে, " মহিলার অ্যালবাম দেখার আর প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ব্যাখ্যা শোনার যে কাল্পনিক চরম আনন্দ তার কাছে এই ত্যাগস্বীকার তো একদমই তুচ্ছ! " " কিন্তু একটা অ্যালবাম ",আমি বেশ জোরের সঙ্গে বললাম, " এই পুরো বোর্ডিংটাকে এভাবে ক্ষুধা আর সংক্রামক ব্যাধির বিপদের সামনে আলগা করে দেওয়া সামান্য একটা অ্যালবাম দেখার জন্য... এটা কি সমর্থনযোগ্য কোনও যুক্তি হল!" " আপনি সিটটি নেবেন কি নেবেন না?" " কত পড়বে?" " পাঁচ ডলার। আপনি আপনার নতুন কাজে যোগ দিতে যেতে পারবেন, কিন্তু বিকেল পাঁচটায় - শুনছেন? - ঠিক বিকেল পাঁচটায় অবশ্যই আপনার আসন গ্রহণ করতে হবে। " এই আপনার পাঁচ ডলার ", এই বলে আমি পাঁচ ডলারের একটি নোট তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, " কিন্তু আমাকে বলুন, একটা ফোটো অ্যালবাম হাজির করার মাঝে কী এমন হাতি-ঘোড়া আছে?" " আপনি লক্ষ করেছেন ", আমার কবজি চেপে ধরে আমার ঘরের দরজার সামনে থামিয়ে দিয়ে, যে দরজার মাথার খিলানে নানারঙের কাচ আঁটা , সে বলল, "ওই কাচের সৌন্দর্য খেয়াল করেছেন? এটি ঔপনিবেশিক সময়কার। আমার যখন কিছু করার থাকে না, রাস্তায় বেরিয়ে স্বচ্ছ রঙিন কাচের জানলা- ওয়ালা বাড়ি খুঁজে বেড়াই। মনে হয়, কিছু মানুষ আছে যারা এ সবের খোঁজে থাকে। " " হ্যাঁ", আমি বললাম, "এই ধরনের স্বচ্ছ রঙিন কাচের জানলা খুঁজে বেড়ানোর একমাত্র লক্ষ্য নিয়ে বাইরে বেরোনো একটি মনোরম হবি বটে ; কিন্তু বলুন, স্বচ্ছ রঙিন কাচের মতো এই জাতীয় পুরনো শিল্পদ্রব্য আর এর আধুনিক নকল বস্তুর মাঝে আপনি ফারাক করতে পারবেন? " " আমার কাকা একরকম টুথপেষ্ট ব্যবহার করতেন যা আপনি এখন কোথাও খুঁজে পাবেন না ; তিনি এক নিখুঁত দাঁতের সেট নিয়ে পরমানন্দে প্রয়াত হয়েছেন। " " ঠিক, ঠিক, এটিই হল কথা, এক সেট নিখুঁত দাঁত ; কিন্তু দেখুন, আমার ওপরের মাড়িতে কয়েকটি মাত্র দাঁত বেঁচে আছে ", এই বলে হাঁ মুখে তার দিকে ছুটে গেলাম, বললাম, " আমাকে এই মাজনের ফরমুলাটি দেবেন? " " দশ বছর আগে থেকে আমি এই ফ্লোরের মেট্রনকে নিয়ে মজা করে চলেছি। রোজই তাকে উদোম দেখি ; আমাকে যদি ধরে ফেলতে পারত - এই দারোয়ানকে বিদায় জানাত!" " তা তেমন অস্বাভাবিক কেন?" " আমি রাতে কখনোই রুটি ও দুগ্ধপোষ্য শূকরছানা খেতে পারি না ; পেটে সহ্য হয় না। " " তাহলে অ্যান্টাসিড কিনে খান না কেন? " " জানেন, আমি কখনও মোজা পরিনি?" " আপনার এই বয়সে এ বড়োই অবিবেচনার কাজ! দেখতে পান না এখানে মেঝে কেমন স্যাঁতসেঁতে? " " এই টেবিলটা কী জঘন্য, কুশ্রী! এখানে আমার একটি ছোটো ইনামেল ক্যান আছে। দেখবেন, এটাকে কতো সুন্দর দেখায়..." " কিন্তু সমস্যাটা হল পাশের ঘরের শিশুটা সারারাত কান্নাকাটি করে। " " কী সব্বোনাশ...?" বুড়ো রাগে ফেটে পড়ল, " আপনি ক্ষেপেছেন? আমি তো কোনও শিশুর কথা বলিনি। আমি পরিষ্কার আপনাকে বললাম, আমার কাছে ইনামেলের ছোটো ক্যান আছে! " " কিন্তু ঘটনা হল, শিশুটা আমাকে সারারাত জাগিয়ে রাখে।" এরমধ্যেই আমরা ঘন্টা পড়ার খ্যানখেনে আওয়াজ পেলাম। বুড়ো দারোয়ান দরজার দিকে ছুটে গেল। " মালকিন ", সে বলল। " ফেল করবেন না ; আপনি বুঝে গেছেন... পাঁচটা। "

প্রায় দশটা বাজে। ট্যাক্সি নিলে সময়মতো নতুন কাজে যোগ দিতে পারব। এই ভেবে যখন রেডি হচ্ছি, শুনলাম, কেউ যেন আবার দরজার টোকা দিচ্ছে। " ভিতরে আসুন!" নতুন এই উৎপাতে বেশ বিরক্ত হয়েই বললাম। খুলে দেখি এক মুল্যাটো ( কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ পিতামাতার সন্তান) মেয়ে, বছর তিরিশের হবে, কোলে শিশু নিয়ে ঢুকল আর আমার দিকে ছুটে এল। " ফিটো এস, ভদ্রলোককে বলো, তুমি আর কাঁদবে না! বেচারা ফিটো। ওকে বলো, আর কাঁদবে না, একদমই না, তুমি তো তেমন নও। ওহ, কী সুন্দর! " সে যখন তার ভাষায় কথা বলছিল যা আমি একেবারেই বুঝতে পারছিলাম না, সে তার সন্তানকে ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে নিল ; তাকে বারবার এত চুমু খেল যে বাচ্চাটার গোটা মুখটা লালায় ভরে গেল। শেষ পর্যন্ত তাকে আমার হাতে গুঁজে দিল। " ম্যাম ", আমি বললাম, " আমাকে বেরুতে হবে ; নতুন কাজে যোগ দিতে আমার দেরি হয়ে যাবে।" " ওহো!", আমার কথাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সে বলল," এই বাচ্চার কাহিনি যদি জানতেন! ওর ঠাকুরদা সব সময় বলতেন ,' মিনার্ভা, ওই লোকটা তোমার উপযুক্ত নয়। ' সেই দিনগুলোতে আমি ভালোই চালাচ্ছিলাম ; আমার ঠাকুমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমাকে হাভানার পিটাস হাউজে গুঁজে দিল। হ্যাঁ স্যার, পিটাসে... ; সেখান থেকে একটি মেয়ে এক মুল্যাটোর সঙ্গে ভেগে গিয়ে কেচ্ছার একশেষ করল। সেখানে তিনটি মেয়ে ছিল : ম্যালভিনা, জুলিয়া আর এলিভিয়া, যে কিনা সেই মুল্যাটোর সঙ্গে পালিয়েছিল। তাদের মায়েদের তখন কী দুর্দশা...! সুতরাং বুঝতেই পারছেন, যে কিনা হঠকারীর মতো এভাবে বেরিয়ে যায় সে তার মায়ের উদাহরণ থেকেও কোনও লাভ ওঠাতে পারে না। আমি অনেক মেয়েকে জানি যাদের মায়েরা বেশ্যা ছিল আবার আদর্শ স্ত্রীও ছিল। আমি নই। আমি আমার পছন্দের মানুষটির কথা মাকে বলেছিলাম, বিয়েও করেছিলাম। হ্যাঁ, চার্চে গিয়ে আমাদের বিয়ে হয়েছিল, অন্যান্য আচার অনুষ্ঠানও পালন করেছিলাম। হ্যাঁ, মনে পড়ে, রেজিস্ট্রি বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি লোপেজের তৈরি নীল রঙের খরখরে কোঁচকানো পোশাকটি পরেছিলাম। পরনের স্কার্টটি ছিল ঘন্টা আকারের যার পাটে পাটে শাদা পাতলা রেশমি কাপড়( টিয়ুল) মোড়া। ব্লাউজটি ছিল দারুণ সুন্দর যেখানে রিবনের পাঁচটি পাক ছিল আর পিছনের সেলাই ছিল হাতে করা। " মনে করার জন্য কিছুক্ষণ থেমে সে আবার শুরু করল, " আর টুপিটা? " " প্লিজ", আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, " আর একদিন না হয় শুনব", এই বলে শিশুটিকে তার হাতে গুঁজে দিলাম। " আরে, না, না, তা হয় না। টুপিটা কেমন দেখতে ছিল তা আপনাকে শুনতেই হবে ", এই বলে শিশুটিকে ফের আমার হাতে ফিরিয়ে দিল। " এটি ছিল গত শীতের একটি মডেল যা টুপিনির্মাতা ক্যামাচো বিক্রি করতে পারেনি। সে এটি আমাকে এমনিই দিয়েছিল, তারপর আমার মাসিরা এটিকে সুন্দর করে সাজিয়েছিল - বড়াই করছি না, কিন্তু... তাদের কাজের হাত ছিল দারুণ! তারা এমনভাবে এটিকে নতুন রূপ দিয়েছিল যাতে করে কেউ না চিনতে পারে। আমরা চুমকি কিনে এনেছিলাম আর তারা মুকুটের চারদিকে এমব্রয়ডারি করে সে সব লাগিয়ে দিয়েছিল, " আর্ট " দোকানের জানলায় ডিসপ্লেতে রাখা প্রজাপতি নকল করে। আজ পরার জন্য আমার একটা ছেঁড়া কম্বলও নেই। কিন্তু তখন, বন্ধু, আমার ডজন ডজন পোশাক ছিল। কেননা, শুনুন, রং চাপিয়ে কিছু বলছি না, সত্যিই আমার কোনও অভাব ছিল না। "

এইসব বকবকানির মাঝে সে বসে পড়েছিল, নিঃসন্দেহে আরও আয়েসে যাতে সে তার ব্যাখ্যা - ট্যাখ্যা চালিয়ে যেতে পারে। সে যেহেতু দরজা থেকে মাত্র দুই পা ভিতরে ছিল, সে পারত - এবং সেটাই এখন সে করল - ডান পা দিয়ে দরজাটা ঠেলে দিল, আমাকে ইশারায় বুঝিয়ে দিল যে তার এখনও অনেক কিছু বলার আছে আর সবটা না শুনে আমি ঘর থেকে বেরুতে পারব না। ঠিক সেই মুহূর্তে, বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে আমার হাতের মধ্যে মোচড়াতে লাগল, হাত পিছলে পালাবে বলে। আমি ওর মায়ের দিকে তাকালাম। " ওর খুব খিদে পেয়েছে ", সে বলল, " বেচারা! শুয়োরছানাটা কী যা চায়? আমার ছোট্ট শুয়োরছানাটি কী চায়? হঠাৎই সে গম্ভীর হয়ে আমাকে বলল," আপনি প্রতিজ্ঞা করবেন? বলুন হ্যাঁ, যে আপনি প্রতিজ্ঞা করছেন। " তারপর আমার জ্যাকেটের কলার ধরে ফিসফিস করে বলল," হ্যাঁ? আপনি কি ভালোভাবে বসবেন? শুনুন! আমাকে নিয়ে মজা করবেন না... "। সে আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইল। " মিথ্যুক! তুমি পালিয়ে যেতে চাইছ। আমি যখন তোমার চোখের দিকে সরাসরি তাকাই... এইবার দেখুন : চোখের পাতা না ফেলে আমার দিকে তাকাও! কেন আমার দিকে তাকাতে পারছ না? " আমি তার চোখ বরাবর তাকালাম ; সেখানে এমন এক বোকাবোকা প্রকাশ যে আমি চোখ সরাতে বাধ্য হলাম। " তুমি তাকাও!", সে বলল। " দেখতে পাচ্ছ? তুমি পালাতে যাচ্ছ, আর আমাকে ফিটোর বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কাহিনি শেষ করতেই হবে। " " না," তাকে বললাম, " আমি যাচ্ছি না। আমার কাছ থেকে কী চাইছেন? " " ভালো কথা, তাহলে আপনি যাচ্ছেন না তো? আমি গিয়ে ফিটোর দুধের বোতলটি খুঁজে নিয়ে আসি। এক ঝটকায় ফিরে আসছি। " এই বলে সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল, আমি তার ঘরের জিনিসপত্র সরানো - নড়ানোর আওয়াজ পেলাম। বাচ্চাটার কান্না জোরদার হচ্ছিল। ঘড়িতে এগারোটা পেরিয়ে গেছে। আমার নতুন কাজে যোগদান নিশ্চিতভাবেই দেরি হবে। এখন যদি বাচ্চাটাকে বিছানায় শুইয়ে, বিন্দুমাত্র শব্দ না করে, হলপথে বেড়ালপায়ে বেরিয়ে যাই...? তাহলে অবশ্যই নতুন কাজে যোগ দিতে দু ঘন্টা দেরি হবে, কিন্তু একটি যুতসই বাহানা সব সময়ই তার প্রার্থিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে। আমি সেখানে বলতে পারি একটা অভাবিত দুর্ঘটনা... পরের দিন... আমি না হয় দ্বিগুণ সময় ধরে পড়ে শোনাব... তা ছাড়া, এই মেয়েটার জন্য আমি কোনওভাবেই অনুতপ্ত হব না, কেননা যদিও এটা সত্য যে আমি যাব না বলে কথা দিয়েছি, তা আমার ক্ষেত্রে এক ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। আমি তাকে চিনি না, এবং তার ও তার এই ভয়ংকর বাচ্চাটার প্রতি আমার কোনও দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু আমার সকল পরিকল্পনাই ব্যর্থ হল ; আমি দেখলাম সে আবার ঘরে ঢুকল, হাতে একটা বাচ্চাদের দুধের বোতল যা সে মাথার ওপর তুলে ঝাঁকাচ্ছিল। " বেশ, তুমি চালাকি কিছু করোনি! এখন আমি নিশ্চিত,চোখের পাতা পিটপিট না করে তুমি সরাসরি আমার দিকে তাকাবে। তুমি কি নিজ হাতে ফিটোকে দুধটা খাওয়াবে? এই চেয়ারটায় বোসো।" এই বলে বিছানার অপর প্রান্তে রাখা চেয়ারটা দেখিয়ে দিল। আমি বাধা দিতে লাগলাম,যদিও দুর্বলভাবে, কিন্তু চেয়ারে না বসা অবধি সে আমাকে ঠেলতে লাগল। " এইতো! বাঃ, ঠিকাছে। তোমার বাঁ হাতের ওপর মাথা রেখে বাচ্চাটি খানিক বিশ্রাম নিতে পারবে। আঃ! আমার সোনা, কী চালাক তুমি...! " এরপর সে আর একটি চেয়ার টেনে এনে আমার মুখোমুখি রাখল। " এখন আমরা নিশ্চিন্তে কথা চালিয়ে যেতে পারি।" আমি খানিক সময় নিয়ে বাচ্চাটার দুধ খাওয়ার চুকচুক শব্দ শুনতে লাগলাম। " হ্যাঁ, কোথায় ছিলাম যেন? টুপিটি দেখতে কেমন ছিল তা কি তোমাকে বলেছি? হ্যাঁ, হ্যাঁ, " আমার মুখে হাত চেপে সে বলল। আমি কিন্তু মুখ খোলার কোনও লক্ষণ দেখাইনি। " হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তো টুপির বিষয়টি তোমাকে বলেইছি। যা বলিনি তা হল আমার স্বামীর ব্যাপারে। এটা সত্যি, তুমি তাকে যা তা বলে ডাকতে পারো, কিন্তু আমাদের বিয়ে হয়ে যাবার পর, আমি একটি বস্তুরও অভাব বোধ করিনি। আমার ঘরটি ছিল বিস্ময়কর। শোনো, আমার এক সেট রুপোর টয়লেট সামগ্রী ছিল আর এমনকি অ্যালফনসোর আন্ডারপ্যান্টে চোদ্দোটা সোনার বোতাম ছিল। এমনকি আমরা বড়োলোক ছিলাম না ঠিকই কিন্তু বেশ সম্ভ্রান্ত জীবনযাপন করতাম। এবং এটি সে আমার স্বামী ছিল বলেই নয়, আসল কারণ হল সে ছিল এক দুর্দান্ত কল- মিস্ত্রি। আর সে এক গ্লাস জলে ডুবে মরার পাত্র ছিল না।... আমি নতুন পোশাক চাইবামাত্র এসে যেত ; শহরে সার্কাস এলে সামনের দামি অরকেস্ট্রা সিট কিনে আনত ও, একদম পিছনের সিট কখনোই নয়। - শুনছ? অর- কেস - ট্রা...; দোকানের কোনও জুতোজোড়া পছন্দ হয়ে গেলে তক্ষুনি তা চলে আসত। শোনো, আর পুরোপুরি বিশ্বস্ত ছিল, এইরকমই - " আর সে তার বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে যে বৃত্ত আঁকল তা আমাকে দেখাল। " কিন্তু রাতারাতি সে পালটে গেল। হ্যাঁ, পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে সে বদলে গেল ; সে নিজেকে নষ্ট করল। " এইখানে এসে হঠাৎ থেমে বাচ্চাটার দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকল, যে কিনা ঘুমিয়ে পড়েছিল। এই বিরতির সুযোগ নিয়ে আমি তাকে বোঝাতে চাইলাম যে আমার তক্ষুনি যাওয়া দরকার। " না,না," নিমেষের মধ্যে ক্ষণিকের আত্মমগ্নতা থেকে নিজেকে সামলে সে সাড়া দিয়ে বলল," আমার এখনও শেষ হয়নি। এস, তুমি ভেবেছিলে আমার কাহিনি ফুরিয়ে গেছে? কী বোকা! অ্যালফনসো আত্মহত্যা করল। হ্যাঁ, কারণ সে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। তুমি তো সে ব্যাপারে জানতে না? গোটা পাড়ার লোক জানে। এইতো এক বছরও হয়নি : সবে ফিটোর জন্ম দিয়েছি... একবার কল্পনা করো, এই বোঝা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে!... আর তুমি কি অ্যালবামের বিষয়ে জেনেছ? সতর্ক থাকো, নজর রাখো ; ওই বদমাশটা ব্ল্যাকমেইল করে। এক বছর আগে ওর মেয়ে এক ছোকরার সঙ্গে ভেগে গেল যে বরফ কেটে ডেলিভারি করে। কে বলতে পারত, অ্যালফনসো এভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে!... আর তুমি ওই অ্যালবামটা দেখতে চাও? আমি মনে করি, ওই মহিলা - জানো, ওই যে অ্যালবামের মালকিন - ওকে ছুঁয়েছিল... আর অ্যালফনসো আমার সামনে বসে নিজের মুখে বন্দুক ঢুকিয়ে বুলেট চালিয়ে দেয়। হায়রে! তুমি কী মনে করো? খুব সুন্দর একটি ব্যাপার না : নিজের মুখের মধ্যে গুলি চালাতে পারবে? এইযে, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? তুমি চিৎকার করে উঠছ না কেন? ওকে রক্তাক্ত দেখে আমি তো চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। এস - চ্যাঁচাও! গুলিটা যখন ওর ভিতরে তীব্র আঘাত হানল আমি এইভাবে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম - " এখানে সে চিৎকার না করে শুধু হাঁ করল। " দেখো, দেখছ? আমি হাঁ করে ফের মুখ বন্ধ করলাম। আবার হাঁ করলাম আর আরও একবার চিৎকার করে উঠলাম। বুঝতে পারছ? দাঁড়াও দেখাই : তুমি হাঁ করো আর অ্যালফনসো মুখের ভিতর গুলি চালানোর সময় যেমন চেঁচিয়ে উঠেছিলাম তেমনভাবে চেঁচাও। দেখো, তুমি কী বোকা! চেঁচাতে চাইছ না। দেখো, ফিটো, এই লোকটা চিৎকার করতে চাইছে না! ওহো, আমি তো ভুলেই গেছিলাম : আমাকে একটা দেশলাই বাকসো ধার দিতে পারো?" নিজেকে টেনেটুনে সামলে দেশলাই বাকসো খুঁজতে গেলাম। এরমধ্যে সে আমার ছোট্ট ঘরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। " তোমার তো জামাকাপড় বেশি নেই। হা হা! তুমি নিশ্চয় সে সব লুকিয়ে রেখেছ? তোমার মতো যুবকের সব সময় প্রচুর পোশাক থাকে। মোজা নিয়ে কী করো? ওহো, একটা ছবি ! তোমার বান্ধবী বুঝি? না? তোমার বোন? ঠিকাছে - " এরপর আমার দেওয়া দেশলাই বাকসো থেকে কয়েকটি কাঠি বের করে নিল, " - আমাকে কোথায় খুঁজে পাবে তা এবার বুঝতে পেরেছ... ফিটোকে একটি চুমু খাবে না? রাত-বিরেতে যদি পেট কামড়ানি ওঠে, তাহলে এখানে একটিবার আওয়াজ করবে।" আমাদের দুই ঘরের মাঝে যে পাতলা দেওয়ালটা আছে সেইদিকে ইশারা করল সে। " এইভাবে আওয়াজ দেবে - " এই বলে দুবার কাঠের পার্টিশনে বাড়ি মারল। " বুঝলে তো : অযথা কষ্ট পাবে না। বাড়ি মেরে জানাবে তো? কথা দিচ্ছ? তাহলে ওই কথাই রইল। গুড বাই। "

শরীরটাকে বিছানায় ছুঁড়ে দিলাম। ঘড়িতে প্রায় একটা। এই অবস্থায় আমি কাজে যেতে পারব না। লাঞ্চের জন্য নিচেও যাব না। এই ভেবে গায়ের জ্যাকেটটা যখন খুলে ফেলতে যাব, সেই সময়েই পার্টিশন দেয়ালে মিনার্ভার টোকা শুনতে পেলাম। " এখন আবার কী চাই?" খানিকটা কড়াভাবেই জানতে চাইলাম। সেও খুব উত্তেজিত গলায় সাড়া দিল : দরজা খুলে দেখো, ওরা পাথর মানবীকে হল পথে নামিয়ে আনছে, হুইলচেয়ারে! তাড়াতাড়ি - ওই তিনি আসছেন! " তার গলা আর স্পষ্ট হচ্ছিল না ; বুঝতে পারলাম, মিনার্ভা আর একজনের সঙ্গে কথা বলছে। ঠিক যখন দরজা খুলে উঁকি মারতে যাব তক্ষুনি তারা আমার দরজায় আলতো টোকা দিল। তৎক্ষণাৎ দরজা খুললাম। নিখুঁত শিষ্টতায় এক মাঝবয়েসী ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, " আপনিই কি নতুন বোর্ডার? " " হ্যাঁ, আমি নতুন এসেছি। কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?" "এই ভদ্রমহিলা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। " " ও হ্যাঁ, ওই ভদ্রমহিলা, " একেবারেই অবাকপানা ভাব প্রকাশ না করে উত্তর দিলাম আর আধ- লুকোনো অবস্থা থেকে সরে দরজার মুখ খুলে দিলাম। " আপনি কি আমাকে চেনেন? " বেশ গম্ভীর স্বরে এক মহিলা কণ্ঠের প্রশ্ন। " আমি কি এতটাই পরিচিত?" এই সেই পাথুরে মহিলার গলা যার কথা মিনার্ভা পার্টিশন দেয়ালের ওপাশ থেকে ঘোষণা করেছিল। মহিলার কথার উত্তর না দিয়ে সাহসে ভর করে হুইলচেয়ারপানে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। প্রথম দর্শনে বুঝলাম তিনি চেয়ারে বসে নেই বরং চেয়ারের ওপর রাখা একটা ঢালু বোর্ডের ওপর শুয়ে বিশ্রামরত আছেন। সম্পূর্ণ প্রস্তরীভূত তার হাতদুটো দেহের দু'পাশে দুটো ভারী দণ্ডের মতো পড়ে আছে। কিন্তু সবচেয়ে অসাধারণ জিনিস হল, তার কণ্ঠস্বরের দিকনির্দেশনা যা ঘাড়ের অনমনীয়তার কারণে খানিক অন্যরকম। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমি পাশ থেকে তাঁর গলা শুনতে পেলাম, কেননা অসুস্থতার জন্য তাঁর ঘাড় বাঁদিকে বেঁকে গেছে। " আমাকে একটি অনুগ্রহ করবেন? ", তিনি বললেন, " দারোয়ান আপনার কথা বলছিল। " " ঠিকাছে, " আমি উত্তরে বললাম, " ব্যাপারটা হল কি, দারোয়ানের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে ; তিনি অ্যালবামের বিষয়ে বলতে এখানে এসেছিলেন। " " অবশ্যই তাই, সেই ব্যাপারেই বলতে আসা। আপনি মালকিন ভদ্রমহিলার ডানদিকের সিটটি বুক করেছেন, সেটি যদি অনুগ্রহ করে আমায় ছেড়ে দেন...। " " কিন্তু, " আমি তো ওই সিটের জন্য পাঁচ ডলার দিয়েছি। " " আর আমি বড়োজোর আর মাসপাঁচেক বাঁচব, " অবিশ্বাস্য জোরের সঙ্গে তিনি এ কথাটা বললেন। " পাথুরে অবস্থা বুক অবধি উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে , আমি পরপারের মানুষ হয়ে যাব... একজন মৃত্যুপথযাত্রীকে এইটুকু অনুগ্রহ কি আপনি অস্বীকার করবেন? " " আপনি কি বিবাহিত? " " না, আমি অবিবাহিত। " " বয়স? " পাথুরে আক্রমণ যদি ছাড় দেয় তবে ছ'মাস পর চল্লিশ হবে। " " জীবনে কি কারও প্রেমে পড়েছেন? " এক কয়লা- ভেন্ডারের প্রেমে পড়েছিলাম যে ছিল ঈশ্বরের মতো। " " আর তিনি কি আপনাকে ভালোবেসেছিলেন?"

" না, তবে আমি তাকে বিছানায় নিতে পেরেছিলাম। এক রাতে সে আবিষ্কার করল, আমার শরীরে কোনও নড়াচড়া নেই, আর তখনই চরম ভয় পেয়ে সে আমার বিছনা ত্যাগ করল। " " আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?" " না, আমি পাথরে বিশ্বাস করি। " " আপনি প্রার্থনা করেন?" " হ্যাঁ, পাথরের কাছে, যাতে তা আমাকে দারুণ রেগে গিয়ে আক্রমণ না করে। " তারপরই তিনি যোগ করলেন, " অত সরল হবেন না ; এটা নিশ্চিত আমি পাঁচ মাসের মধ্যে মারা যাব। তারপর দেখা যাবে... আপনি সেটাই ভাবছেন তো?" " পায়খানা করেন কীভাবে? " " অ্যালবার্তো! ", তিনি এক চাকরকে হুকুম দিলেন, " ভদ্রলোককে ক্যাপটা দেখিয়ে দাও..." সেই নামের চাকরটা তখন ঝুঁকে পড়ে একটা ছিটকিনি থেকে দুটো ছোট্ট তালা খুলে আনল যা মহিলার ঠিক পায়ুর নিচে আটকানো ছিল, আর এক মিনিটের মধ্যে বুঝিয়ে বলল যে সেইখানে একটা পাত্র রেখে মহিলা পুরো সাবলীল ঢঙে শারীরিক কাজকাম সারতে পারেন। " আপনার ভয় হয় না, যদি কোনও পোকামাকড়...? " ফুটন্ত কৌতূহলবশে জানতে চাইলাম। " না, না, আদৌ নয় - আমি তা বুঝতেই পারি না! দাঁড়ান দেখাচ্ছি, অ্যালবার্তো, আমার শরীরের যে কোনও জায়গায় জোর চিমটি কাটো তো, " এই নির্দেশ দিয়ে তিনি আমার দিকে ঘুরলেন। খুব কাছ থেকে দেখুন যে জায়গাটায় ও চিমটি কাটছে। " অ্যালবার্তো গায়ের জোরে মহিলার ঊরুতে চিমটি কেটে বলল," ঠিকাছে ম্যাম, আমার চিমটি কাটা শেষ। " মহিলা ফের আমার দিকে ঘুরে বললেন, " স্যার, আমার মুখে কোনও যন্ত্রণার প্রকাশ দেখতে পেলেন? আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আপনি কখনও পাথরের মূর্তিকে চিমটি কেটেছেন...? " " আপনি কোন বস্তুটা পেতে একান্ত আগ্রহী? " বেশ ঘাবড়ে গিয়েও জোর হেসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। " তিনি বললেন, " কেউ কিছু আকাঙ্ক্ষা করে না, সে খালি সাজা গ্রহণ করে। " " মৃত্যুর?" আমি বললাম। " কিংবা জীবনের, " তিনি জোর দিয়ে বললেন। আমি তার হুইলচেয়ার আমার দিকে ঘুরিয়ে তার পানে গভীরভাবে তাকালাম : " পাথুরে অনাক্রমণ কী বিশাল সুখ বয়ে আনে তা আপনি অনুভব করেন?" " আর পাথুরে আক্রমণ কতখানি কলঙ্কজনক তা আপনার বোধগম্য হয়?", নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন আর অসীম উদারতায় বললেন :" আপনি আমার নাচের ভঙ্গিমা শিখতে চান?" " কোন নাচ?" তার গলার একঘেয়ে স্বরে কৌতূহলী হয়ে আমি দ্বিতীয়বার বললাম, " কোন নাচ?" কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না কেননা তিনি ততক্ষণে হুইলচেয়ারসহ চলে যাচ্ছেন, দুই চাকরের জোর হাসির সঙ্গে তার হালকা হাসি মিশে গেল।

বিকেল পাঁচটা, আমি তখন ডাইনিং হলে। সেই পাথুরে মহিলাকে আমার আসনটি ছেড়ে দেবার কারণে আমাকে বাঁদিকের দ্বিতীয় আসনটিতে বসতে হল ; অর্থাৎ অ্যালবাম প্রদর্শনকারিনীর স্বামীর পাশেরটি। গোটা হলটিতে তখন এক '' জাঁকালো পরিবেশ। " চেয়ারগুলো অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো হয়েছে যা দেখতে লাগছিল একটি ছোটোখাটো অ্যাম্পিথিয়েটারের মতো যার পিছনের দিকে সারিবদ্ধ নকল প্লাস্টারের স্তম্ভ এবং যা ডাইনিং হলের অতি- অলংকৃত অংশ। এক স্তম্ভ থেকে আর এক স্তম্ভ মালা ও বিচনাট, পাথরের তৈরি পাতা ও ফল দিয়ে গাঁথা যা সব চমৎকার তথা হাস্যকর হলুদ রঙে রাঙানো। হলের চার দেওয়ালে ঐতিহ্যবাহী ডিনার ও ভোজসভার আঁকা ছবি টাঙানো ; অন্যান্য ছবিগুলিতে অমেয় ফলের পাত্র যেখানে আছে সবেদা, আনারস, আম ও অন্যান্য দেশের ফলের ছবি যেমন আপেল, নাশপাতি, পিচ আর খেজুর। হলঘরের মাঝে ঝুলছে এক বিশাল আলো -দানি যার আটটি বাহু ও যেগুলোর শেষাংশে বেশ কিছু ট্রাইটনের ( গ্রিক সমুদ্র দেবতা যার দেহের ঊর্ধ্বাংশ মানুষের আর নিম্নাংশ মাছের মতো) মূর্তি। এর ব্রোঞ্জের বাহু ( যা মাছি জাতীয় পোকামাকড় দ্বারা নোংরা) আর অধিকতর নোংরা কেলাসের দিকে তাকিয়ে চিন্তামগ্ন হয়ে পড়লাম ঠিক যখন হঠাৎ এক নিস্তব্ধতা আমাকে দৃষ্টি নামাতে বাধ্য করল। এই নিস্তব্ধতার কারণ অ্যালবাম - লেডির আবির্ভাব তথা আগমন। বেঁটেখাটো গোলগাল চেহারার এক পুরুষ এক বিশাল ফোটো অ্যালবাম দুহাতে বয়ে পিছন পিছন আসছে ঠিক যেমন যাজকেরা ভেলভেট কুশনে রেখে পবিত্র বস্তু বয়ে আনে। অ্যালবামের কোনাগুলি নরম রেশমি কাপড়ে মোড়া, আর ঢাকনাটি নরম সোয়েড কাপড়ের। মালকিনের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ১৯১৪ বা তার কাছাকাছি সময়ের ফ্যাশন অনুযায়ী তাঁর পরনের পোশাক আর হাতে একটা পালকের পাখা যা তিনি মন্থরগতিতে চালিয়ে হাওয়া খাচ্ছিলেন। আসনস্থ হবার পর তিনি তীক্ষ্ণ গলায় ব্যাখ্যা করলেন যে অ্যালবামের ছবি দেখানোর ক্ষেত্রে তিনি কিছু উপায় উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বললেন, বোর্ডারদের চনমনে বাসনার তীব্রতা এড়িয়ে যাবার জন্য - সেই বাসনা যা তারা ভীরুতার কারণে আগে মুখ ফুটে বলতে পারেনি - কোনও না কোনও একটি ফোটো পুনরায় দেখার অভিপ্রায় প্রকাশ করতে পারেনি, সে সব ভেবে তিনি যে ফোটো দেখানোর ক্রম বদলে দিয়েছেন তাই নয়, সেগুলিকে এলোমেলোভাবে দেখানোর কথা ভেবেছেন। তিনি অ্যালবামের যে কোনও একটি পৃষ্ঠা খুলে তাঁর তর্জনী বৃত্তাকারে ঘোরাবেন - অবশ্যই চোখ বুজে - সেই পাতার ওপরে, স্বেচ্ছায় আঙুলটি পড়তে দেবেন, একটি ফোটোর ওপর এবং সুযোগের কৃপায় সেটিই দেখানো হবে। এবং কার্যত তিনি তাঁর ড্যাবডেবে চোখদুটো বন্ধ করে এলোমেলোভাবে খোলা পাতার ওপর বৃত্তাকারে তর্জনী ঘোরাতে লাগলেন। প্রত্যেকে দম আটকে বসে রইল। শীঘ্রই তাঁর আঙুল ফেললেন ও কয়েক সেকেন্ড পর ভেরি -নাদে ঘোষণা করলেন, যে ছবিটির ওপর আঙুল পড়েছে তা সেই বিশেষ মুহূর্তের ছবি যখন তিনি কনের পোশাক পরে বিয়ের কেক কাটতে প্রস্তুত।

" আপনারা যেমনটি দেখছেন " ( "দেখা " এখানে একটা ইউফিমিজম যেমন অপ্রিয় কথাকে মোলায়েম ভাবে বলা কেননা সেইসব বোর্ডাররাই যারা অর্থের বিনিময়ে সিট কিনে সামনের দুটি সারিতে বসেছিল, শুধু দেখতে পাচ্ছিল), " এই ছবিটি আমার কনের গাউন পরা মুহূর্তটিকে ধরে রেখেছে, পাশে আমার প্রিয় স্বামী, আর চারদিক ঘিরে আছে আত্মীয় বন্ধুরা আর আমি সেই মুহূর্তে ওয়েডিং কেকটি কাটতে যাচ্ছি। তাই না ওলেগারিয়? ", এই প্রশ্ন নিয়ে তিনি কৃত্রিম ভাবভঙ্গি দেখিয়ে স্বামীর দিকে ঘুরলেন। ভদ্রলোক হ্যাঁ - বাচক মাথা নাড়লে মহিলা ফের শুরু করলেন, " বসার ঘরের কোণে রাখা টেবিলটার পাশে ওই ছোট্ট শাদা কুকুরটিকে লক্ষ করুন "( অ্যালবামের প্রদর্শন শেষ হলে ছোট্ট কুত্তাটির বিষয়ে মালকিনের বক্তব্য বোর্ডার সম্প্রদায়ের ধারণায় ভিন্ন ভিন্ন অগণিত অবস্থান ধরা দিল কারণ যখন ছাদহীন উঠোনে হাওয়া খেতে ধনী ও গরিব বোর্ডাররা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হচ্ছিল তখন তারা ফোটোর সাধারণ ভূ- অবস্থানে ওই ছোট্ট প্রাণীটির সঠিক স্থান নিয়ে আলোচনা শুরু করল এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের মতের মিল হচ্ছিল না কেননা পয়সাওয়ালা বোর্ডাররা কুত্তাটিকে দেখতে পেলেও গরিব বোর্ডাররা তা পায়নি) " সে রক্তমাংসের কুকুর নয়, বিপরীতপক্ষে সেটা একটা ছোট্ট উলের কুকুর যা মিসেস দালমাউ আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। " এই জায়গায় এসে তিনি বেশ কিছুক্ষণ থেমে দর্শকদের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকলেন। " কীভাবে বের করলাম যে এটা একটা উলের কুকুর? তাহলে শুনুন : আমি আপনাদের ইতোমধ্যে বলেছি যে মিসেস দালমাউ আমাকে এটা উপহার দিয়েছিলেন ; কিন্তু এমনিই যদি বলি, এটা যোগ না করে যে মিসেস দালমাউ এটা এনেছিলেন ঠিক আমার কেক কাটার মুহূর্তেই, তাহলে আপনারা নিশ্চিত অনুমান করবেন ওই কুকুরটা কেক কাটার অনুষ্ঠানের আগে থেকেই আমার কাছে ছিল। ঘরে ঢোকামাত্র আমার পছন্দের একজনের হাতে ওটা দেখে বুঝেছিলাম " - এখানে আবারও তিনি স্বামীর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন, " তাই না ওলেগারিয়? - " এক সুখী ও হাস্যরত যুবা- জটলা আমার পিছপিছ আসছিল ( এদের বিষয়ে পরে বলব, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বর্ণনা দিয়ে), তখন আমি একটি সুন্দর ছোট্ট শাদা কুকুর দেখতে পেলাম। সামান্য চিৎকার দিয়ে আমি নিচু হয়ে কুকুরটিকে তুলতে গেলাম, আর বেশ জোরের সঙ্গে বললাম যাতে প্রত্যেকে শুনতে পায় : 'কী সুন্দর ছোট্ট উলের কুকুর! আমি কি জানতে পারি, এর ভাগ্যবান মালিক কে?' তৎক্ষণাৎ আমার প্রশ্নের উত্তরে একজনের চিৎকার কানে এল, যা আমি মিসেস দালমাউয়ের গলা বলে চিনতে পারলাম, ' ওহ! '( এভাবেই তিনি চেঁচিয়ে উঠেছিলেন) ' ডারলিং, এটি রক্তমাংসের কুকুর নয় ; না, এটি একটি উলের তৈরি কুকুর যা আমি তোমার এই বিয়ের দিনে উপহার হিসেবে দিচ্ছি। ' তারপর ওই ছোট্ট স্টাফড্‌ প্রাণীটা হাত থেকে হাতে ঘুরতে লাগল। কেক কাটার ছবিটি যখন তোলা হচ্ছিল, আমি ফোটোগ্রাফারকে অনুরোধ করলাম তিনি যেন অনুগ্রহ করে ওই ছোট্ট কুকুরটিকে সেই অবস্থানে রাখেন, ঠিক আমার পার্লারে বিজয় উদযাপন মুহূর্তের প্রবেশস্থানে। আমার বলা উচিত, বেচারা মিসেস দালমাউ বহুদিন আগে আমাদের ছেড়ে গেছেন। আমি বলতে চাইছি, তিনি এই অশ্রু - উপত্যকা পরিত্যাগ করে আমাদের স্রষ্টার কোলে চিরবিশ্রামে গেছেন। কী অদ্ভুত! বেশ মজার মনে হয় : রক্তমাংসের মিসেস দালমাউ আর আদৌ তেমন নেই ; অপরপক্ষে, যে ছোট্ট কুকুরটি যা আমাকে দিয়েছিলেন - যা আদৌ রক্তমাংসের নয় - এখনও আমার খোলা তাকের আলমারির একটায় তিনটি নরওয়ে পুতুলের পাশে বসে দুর্দান্ত বাহার দিয়ে যাচ্ছে। দেখুন : মিসেস দালমাউয়ের স্মৃতি বলতে এটুকুই পড়ে আছে, " ( এই বলে ছবির যে জায়গায় তিনি আঙুল ছোঁয়ালেন সেখানেই নিঃসন্দেহে মিসেস দালমাউয়ের প্রতিচ্ছবিটি ছিল)। " তার এই গোলাপি আভাযুক্ত গাল দেখে কেউ অনুমান করতে পারবে না। এটা সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে তার বাম স্তনে ক্যানসার হয়েছিল। কী অসহায় অবস্থা!... তার এই প্রতিচ্ছবি গ্রহণ তাকে বাস্তবিকই আতঙ্কে ফেলে দিয়েছিল, কিন্তু অকৃত্রিম গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে সারা জীবনে এইটিই তার একমাত্র তোলা ফোটো। বন্ধুতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, বন্ধুতার এক খাঁটি প্রমাণ যে কারণে ওপরে সেইসব দেবদূত আর স্বর্গীয় শক্তির মাঝে বসে তিনি পুরোপুরি জানেন আমি তার প্রতি কতটাই কৃতজ্ঞ ছিলাম আর চিরকাল সেরকমই থাকব!" তিনি একটা রুমাল বের করে চোখের ওপর রাখলেন, তারপর তাঁর আঙুল এসে এমন এক জায়গায় থামল যা আমার একদম বাঁয়ে। " এই যে উজ্জ্বল মুখের মেয়েটি, তাকে তো এভাবেই ডাকা যায়? হ্যাঁ, ওই যে যাকে আমরা দেখছি ফোলানো শাদা সচ্ছিদ্র রেশমি কাপড়ে সেজেছে ( এই বলে তিনি ফের যেখানটায় আঙুল ছোঁয়ালেন তা একমাত্র শাঁসালো বোর্ডারদেরই অনুভব করা সম্ভব)। তাকে আমার বিশেষিত করা উচিত : সাধারণভাবে তার মুখশ্রী ছিল পাণ্ডুর কিন্তু ভাগ্যের অমোঘ অভিপ্রায়ে, কেক কাটার সেই স্মরণীয় দিনটিতে তার মুখমণ্ডল এক গাঢ় লাল আদল ধরে রেখেছিল। লক্ষ করুন, যদিও ফোটোটি রঙিন নয়, আপনারা তার পোশাকের শাদা ভাব আর তার গম্ভীর মুখের মাঝে এক আপাত বৈপরীত্য দেখতে পাবেন। তাকে এত হতচকিত লাগছিল কেন? তার বাবা, পুরোপুরি আর্থিক ধ্বস্ত অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে, মেয়েটিকে বিয়ে দেবার নামে স্রেফ বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল , তার ব্যাবসার আগের অংশীদারের সঙ্গে যে ছিল এক ষাট বছরের বুড়ো। আমার বিয়ে উপলক্ষ্যে কেক কাটা অনুষ্ঠানের উদ্দেশে বেরোনোর ঠিক আগের মুহূর্তে সেই দুঃসংবাদ তার বাবা তাকে দিয়েছিল। আমি সেই মুহূর্তটা কখনোই ভুলব না যখন অনুষ্ঠান শেষে পায়ের মোজা আটকানোর ঢিল ফিতে বাঁধার জন্য আমার ব্যক্তিগত টয়লেটে যাবার সময় হঠাৎ করেই নজরে পড়ল মেয়েটি একটা নীল সোফায় শুয়ে পাগলের মতো হাতপাখা নাড়ছে। তার রক্তিম চেহারার দিকে খুব একটা মনোযোগ না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তার খুব গরম লাগছে কি না ও তাকে বললাম, যদিও ভোজসভা তখনও শুরু হয়নি, পরিবারের এক একান্ত বন্ধু হিসেবে, কোনও পরিচারিকার কাছ থেকে সে এক কাপ বরফ মেশানো শ্যাম্পেনের জন্য অনুরোধ করতেই পারে। কিন্তু আমার সেই আন্তরিক প্রস্তাবকে প্রবল প্রতিবাদদহ ধন্যবাদ জানিয়ে সে বলল যে সে দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত। ' দণ্ডাদেশ? ' বিপুল কৌতূহলে আমি উলটে বললাম। ' হ্যাঁ! ', সে প্রবল উত্তেজনায় উচ্চারণ করল যা মিনিটে মিনিটে বেড়ে যাচ্ছিল। ' আমার বাবা আমাকে এই শাস্তি দিয়েছে তার পার্টনারের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করে , ওই বুড়ো লোচ্চার সঙ্গে। ' ' ওহো!' আমি বললাম এবং, আমার পায়ের সোনার স্লিপারের গোড়ালি দিয়ে ফুলে ওঠা কার্পেটে হালকা বাড়ি মারলাম যেখান থেকে এক শ্বাসরুদ্ধকর শব্দ উঠল। ' বিক্রি করে দিয়েছে! ' আমি সঙ্গে সঙ্গেই যোগ করলাম : ' কিন্তু কেন?' ' বাবার ব্যাবসা ধ্বসে পড়ার কারণে, ' সে উত্তর করল আর পাখা চালিয়েই যেতে লাগল। তারপর আমি নিষ্প্রাণভাবে বললাম, ' শোনো সোনা, তুমি তুমিই আর তোমার বাবা অন্য একজন! এ বিয়ে কোরো না। ' আর একটা শব্দও উচ্চারণ না করে, আমি প্রধান হলঘরের উদ্দেশে গেলাম যেখানে আমাকে কেক কাটার কারণে প্রাণখোলা হাসি, অজস্র ফুল আর শ্যম্পেন সহযোগে অভ্যর্থনা জানানো হল। বেশ কিছুদিন পর, লিডো শহরে গ্রীষ্মযাপনের সময়, সংবাদপত্র মারফত সেই মেয়েটির বাবার আত্মহত্যার খবর পেলাম : আর্থিক ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই না পেয়ে তিনি পিস্তল দিয়ে নিজেকে শেষ করেছেন যা তিনি পুরো নিশ্চয়তার সঙ্গে এড়াতে পারতেন যদি তার সেই ধনবান পার্টনারের সঙ্গে মেয়েটিকে বৈবাহিক সম্পর্কে বেঁধে দিতে পারতেন। ' আর মেয়েটির খবর? ' আপনাদের মনে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে। আজ দশ বছর হল আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না ; শেষ যখন আমাদের দেখা হয়েছিল তার ওজন তখন দুশো পাউন্ড আর সে তখন অসহ্য তুর্কি চুরুট টানছিল। তাইতো ওলেগারিয়? '
ওলেগারিয় তখন ঘুমে অচেতন। মহিলা যখন দেখলেন, তাঁর সঙ্গী স্বামী অনিবার্য ঝোঁকে মাথা নাড়িয়ে কোনও সাড়া দিচ্ছে না,তখন তিনি তাঁর অবিরল ব্যাখ্যার ছন্দ হারিয়ে অস্বস্তিতে পড়লেন। মুহূর্তের জন্য প্রত্যেকে থম মেরে গেল যে সুযোগে আমি হলের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। মনে হল, উপস্থিত বোর্ডারদের সুখানুভূতি যেন চরমে, আর এই মহিলার বিস্তারিত বর্ণনা তাদের যতটা সন্তুষ্ট করেছে তা এমনকি সবচেয়ে দ্বর্থহীন সামাজিক ক্ষতিপূরণও করতে পারত না। এরমধ্যে রাত্রি আটটা বেজে গেছে আর ওই মহিলা তখনও বুকে মাথা রেখে আধঘন্টা যাবৎ শুয়ে আছেন। কিছু বোর্ডার তাদের সিটের নিচে রাখা মজুত খাবারের পাত্র থেকে নানান খাবার নিয়ে মনের সুখে গোগ্রাসে গিলতে লাগল। " বিয়ের কেক কাটার অভিজ্ঞতা যে কেমন সে বিষয়ে ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতেই পারবে না, " এই বলে মহিলা পুনরায় তাঁর বক্তব্যের খেই ধরে শুরু করলেন। " ওই মাহেন্দ্রক্ষণে আমার ছবিটির দিকে একবার নিবিড়ভাবে তাকান : কেকের গায়ে ছুরি বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে, চূড়ার ক্রিম কাটতে প্রস্তুত, যখন আমার বাম হাতটি আমার স্বামীর পুরোবাহুর ওপরে বিহ্বল ঢঙে বিশ্রামরত ; তখন আমি চোখ তুলে দেখলাম, অতিথিদের স্বাদ - কোরকগুলি ভয়ংকর গতিতে লালা নিঃসরণ করছে। ফোটোর পরিবেশ আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য আমার বলা উচিত যে এটিই ছিল সেই অবিস্মরণীয় সন্ধের চরম মুহূর্ত ; এই কারণেই ফোটোগ্রাফার এই জায়গাটিকে চিরকালের জন্য ফ্রিজ করে দিয়েছেন, ঠিক সঠিক মুহূর্তে তার ক্যামেরার উজ্জ্বল আলো ঝলসে দিয়ে, উপস্থিত সকলকে শাদা ধোঁয়ার ঘন মেঘে ঢেকে দিয়ে, মহিলাদের চমকানি আর পুরুষদের আনন্দ নিশ্চিত করে। এবারে আমি প্রত্যেক অতিথির নিজস্ব কাহিনি বিশদে বর্ণনা করার স্বাধীনতা নেব আর তাদের নিজ নিজ পোশাক সম্ভারের অনুপুঙ্খ বিবরণ দেব। শুরু করব গভর্নরের স্ত্রীকে দিয়ে, যাকে এখানে আপনারা দেখছেন ঝকমকে পোশাকে, একটি কালো প্যালেট গাউনে ", আর তাঁর আঙুল ফের এমন জায়গায় পড়ল যা একমাত্র শাঁসালো বোর্ডারদেরই নজরে পড়বে। " অ্যামেলিয়া, আমার প্রিয়তম বান্ধবীকে এই নামেই ডাকতাম, ছবিটি ঠিক সেই কেক কাটার মুহূর্তের, তার একটি মেয়ে ছিল, গভর্নরের সঙ্গে তার প্রেমের ফলস্বরূপ যার জন্ম হয়েছিল। হ্যাঁ, দরজার পাশে তাকেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি কি দরজা বললাম? ওহো, এক পবিত্র সন্ত্রাস আমাকে আচ্ছন্ন করছে!" কপালে হাত বুলিয়ে কয়েক সেকেন্ড পর আবার শুরু করলেন। " বাগানের দরজা দিয়ে ঢুকে যে পুবের পথটি ধরেছিল সে হঠাৎ ওই দরজার সামনাসামনি হয়েছিল। আপনারা অবশ্য এই বিস্ময়ের কারণ ধর‍তে পারবেন না কারণ আপনারা দরজার ছবি দেখছেন, আসল দরজা নয়। এটা উল্লেখ প্রয়োজনীয় নয় যে সেই সময় আপনারা আমার বন্ধু ছিলেন না আর ওই বাড়িটা কুড়ি বছর আগে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের সময় যদি আপনারা আমার অতিথি থাকতেন অথবা অন্য কোনও সময়ে, আপনাদেরও ওই একই সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতা হত যা তখন প্রত্যেককে আঁকড়ে ধরেছিল যারাই এই দরজার সামনে দিয়ে গিয়েছিল। দরজার পিছনে কে লুকিয়ে ছিল? কেউ না, কিছু না।এটা ছিল একটা নকল দরজা কিংবা বলা যায় একটা দরজার আঁকা ছবি; তাই এটাই বলার যে এর কোনও অস্তিত্ব ছিল না। আপনারা শুনতে পাচ্ছেন? এটার অস্তিত্ব ছিল না ঠিক যেমন সিলিঙে যে প্যানেলের কাজ দেখা যাচ্ছে সেটাও অস্তিত্বহীন যা আঁকা হয়েছিল বাস্তব প্যানেলকাজের আদল আনতে। ফলত, কেউই ওই দরজার মাঝ দিয়ে যেতে পারেনি। নির্দিষ্টভাবে এটাই আমার ভিতরে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল ; দরজার অস্তিত্ব থাকলে তাদের অন্তত উচিত ছিল একটি বেরনোর পথ বের করা; তা সে যে কোনও দিকেই হোক একটি পথের সন্ধান দেওয়া তো অবশ্যকর্তব্য ছিল। ঠিক এই দরজাটার সামনে - যেমনটি আপনারা দেখছেন - গভর্নরের স্ত্রী হেঁটে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন সেই ভাবগম্ভীর কেক কর্তন অনুষ্ঠানের মুহূর্তে। ক্যামেরার ম্যাগনেসিয়াম ঝলকানির ঠিক পরে ও ধোঁয়ার মেঘ বাতাসে মিলিয়ে যাবার পর, আমি লক্ষ করলাম যে অ্যামেলিয়া তখনও দরজার সামনে ছবি তোলার জন্য উদ্যত। এক টুকরো কেক হাতে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম : ' প্রিয় বান্ধবী, জিশুর নির্দেশানুসারে আমার শরীরের মাংস ভক্ষণ করো..., ' কিন্তু, ফরসা হাতের ভঙ্গিমায় আমার প্রস্তাব নস্যাৎ করে সে বলল : ' না বন্ধু, প্রথমে এই বিড়ম্বনাময় ব্যাগের ঝামেলা থেকে আমাকে মুক্ত হতে দাও, ' এই বলে সে ওই আঁকা দরজাটার মাঝ দিয়ে যেতে উদ্যত হল। উপস্থিত সকলেই একত্রে ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল আর তৎক্ষণাৎ আমার বান্ধবীর এক হৃদয়বিদারক গোঙানি শোনা গেল কেননা ওই নকল দরজা দিয়ে যেতে গিয়ে সে নাকে জোর আঘাত পায়। পরপরই আমরা জোর উল্লাসে ফেটে পড়লাম কেননা সবে বিয়ের কারণে করা দরজার রং তার নাকে লেপটে গেছে। আর ভালো কথা, আমি তার পোশাকের বর্ণনা দিই যার গায়েও ওই স্মরণীয় সংঘর্ষে কলঙ্কের দাগ লেগেছিল।"
এরপর গোটা একটা সপ্তাহ সেই মহিলার পোশাকের বিবরণ শুনে কাটিয়ে দিলাম। যেমন, গাউনের হাতায় এমব্রয়ডারির বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তার নকশাকার মেয়েটির কথা যা ওই অ্যালবামের মালকিন সেদিন তার কাছ থেকে জানতে চাইবেন - সেই নকশাকারের বিয়োগান্তক কাহিনি যেমন তার প্রেমিক তাকে অপহরণ করেছিল, তারপর ধর্ষণ করে নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছিল। এই বিবরণদানে মহিলার উৎসাহ বিচার করে বলা যায়, ওই বৈঠক যেন পূর্বের ছয় মাসের রেকর্ড সময় ভাঙতে বদ্ধপরিকর। থেমে থেমে বলার সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলোর একটিতে যখন তিনি এক বড়ো- গ্লাস ঠান্ডা লেমোনেড গলায় ঢালার জন্য থামলেন তখন উপস্থিত সকলে আন্তরিকভাবে আমাকে অভিনন্দন জানালেন কেননা আমাকে বলা হল, নিশ্চিতভাবে ওই বৈঠক পূর্বের বৈঠকগুলোর সময়সীমা পেরিয়ে যাবে। তারা এ বিষয়েও আমাকে আশ্বস্ত করল, যে সিটে বসে ছিলাম সেখানেই পায়খানা - টায়খানা করা মোটেও লজ্জা বা মর্যাদাহানিকর হবে না। আমি তাই আমার সিট জুড়ে প্রচুর পায়খানা করলাম যখন আমার পাশের যুবতী আমাকে এক টুকরো ঝলসানো মাংস খেতে দিল আর আমিও পারস্পরিক ভদ্রতা রক্ষায় তাকে খানিকটা ঠান্ডা চিকেন খেতে দিলাম। এরমধ্যে যেহেতু শীত এসে গেছে, রাত জুড়ে বেশ ঠান্ডা, দারোয়ান ইচ্ছেমতো ব্যবহারের জন্য কিছু কম্বল রেখে গেল, অবশ্যই যতক্ষণ তারা এর জন্য পয়সা দেবে ততক্ষণই তা ব্যবহার করতে পারবে। যেভাবে পাথর মানবী আমার কাছে ঘোষণা করেছিলেন, ঠিক সেই অনুযায়ীই বৈঠক শুরুর ঠিক পাঁচ মাস পর তিনি মারা যান। তার মুখ আমি কখনও ভুলতে পারব না। ঠিক যে মুহূর্তে তিনি মারা যাচ্ছেন তখন ওই অ্যালবামের মালকিন জোরের সঙ্গে বলছিলেন যে বিয়ের কেকটি তাঁর ব্যক্তিগত নির্দেশেই প্রস্তুত করা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি তিনি যখন গুনে গুনে বলছিলেন তখন সেই পাথর- মানবীর মুমূর্ষু মুখমণ্ডল, মনে হল, অ্যালবামের মালকিনকে তাড়াতাড়ি করার জন্য অনুরোধ করছে। কিন্তু সবই বৃথা হল, এবং আমি নিশ্চিত যে শেষ তিনটি তালিকাভুক্ত উপাদানের কথা সেই মহিলা শুনতে পাননি ; কেননা ঠিক তার চলে যাবার মুহূর্তে অ্যালবামের মালকিন ধীরে ধীরে কাটা কাটা শব্দে বলছিলেন : " শেষে একজন ফেটানো মণ্ডের সঙ্গে সমপরিমাণ ভ্যানিলা, দারচিনি ও লেবুর রস মেশায়..."

এরমধ্যেই আমরা অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছি আর সেই মালকিন তখনও আত্মীয় - স্বজন, বন্ধুদের কাছ থেকে বিয়েতে পাওয়া অসংখ্য উপহার গুনে শেষ করতে পারেননি - যে উপহারসামগ্রী, ফোটোগ্রাফ অনুযায়ী, বিশাল এক টেবিলের ওপর রাখা ছিল যার সামনের একটায় মিষ্টি ও মিঠে স্বাদের সুবাসিত মদ রাখা ছিল। অবশ্যই ফোটোতে যা দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল তা হল একটা টেবিল আর তার ওপরে রাখা এক বিশাল রঙের ছোপ ; কিন্তু মহিলা যেহেতু ওই বস্তুগুলোর প্রত্যেকটা হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছিলেন, তিনি চরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে সেগুলোর গণনা চালিয়ে যেতে পারলেন। তা বাস্তবিকই এক জমকালো দৃশ্যের জন্ম দিল, যা সেইসব বিরক্তিকর মুভির একটার অসহ্য ডার্ক চেম্বার প্রদর্শন ও তার অনিবার্য স্বমেহনাদি নয়। অষ্টম মাসের শেষ দিন বিকেল ছটা, মালকিন সবে এক ছোট্ট জলরঙের ছবির বর্ণনা শেষ করেছেন, যা এক সুন্দর মিউজিক বক্সের ওপরে রাখা অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল, যখন, জোর আওয়াজের সঙ্গে অ্যালবামটা বন্ধ করে, উঠে দাঁড়িয়ে তিনি হলত্যাগ করতে উদ্যত হলেন, পিছনে তাঁর স্বামী যার ওপরে তোলা হাতে ধরা সেই অমূল্য ধনটি। সকলেই তখন বুঝল, এতক্ষণে সেই চরম ক্লান্তিকর প্রদর্শন শেষ হল।
(১৯৪৪)

*****

অনুবাদক পরিচিতি: বিপ্লব বিশ্বাস ( জন্ম: ১৭.০১.১৯৫৪) মৌলিক তথা ভাষান্তরিত গল্প আঙিনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাপুষ্ট। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অবসৃত প্রধানশিক্ষক। নির্জন সৃজনে আস্থাশীল গল্পকারের ১৯৭৬-এ প্রথম লিখিত গল্পই ' সমতট ' আয়োজিত সারা বাংলা গল্প প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। তিনি কেন্দ্রীয় সাহিত্য অকাদেমির নথিভুক্ত অনুবাদক। এ রাজ্য,ভিনরাজ্য তথা ভিনদেশের ছোটো, বড় সাময়িক ও দৈনিক পত্র পত্রিকাতে তার গল্প প্রবন্ধ সসম্মানে প্রকাশিত। নানাবিধ টানাপড়েনে তার কলমচারিতা নিয়মিত হতে পারেনি। তার তিনটি মৌলিক, দুটি অনূদিত গল্পগ্রন্থ ও একটি অনূদিত উপন্যাস প্রকাশিত।

প্রকাশিত বইগুলি :১)এবং গণ্ডারের শোক ( গল্পগ্রন্থ/ পাণ্ডুলিপি) ২) ক্ষোভ বিক্ষোভের গল্প( গল্পগ্রন্থ / খোলা বারান্দা)৩) বাছাই ছাব্বিশ ( নির্বাচিত গল্পগ্রন্থ / দি সি বুক এজেন্সি) ৪) ইচ্ছেখাম ( গল্পগ্রন্থ / দোসর) ৫) দক্ষিণ ভারতীয় ছোটগল্প(অনুবাদ, ভাষাবন্ধন)৬) পড়শি ভাষার গল্প( অনুবাদ, দি সি বুক এজেন্সি) ৭)সামরিক সারমেয় কথা ( অনূদিত উপন্যাস / সন্দেশ, ঢাকা)৮) আহারের আড়কথায় শ্রীরামকৃষ্ণ ( প্রবন্ধগ্রন্থ / দি সি বুক এজেন্সি)।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ