মারিয়া বার্গাস য়োসার লেখা : তরুণ লেখককে চিঠি


অনুবাদ : এমদাদ রহমান

১ কীর্ণলিপি কিংবা প্রবেশক

বলিভিয়া'র শহর কোচাবাম্বায় দে লা স্যাল একাডেমি'র ব্রাদার জাস্তিনিয়ানো'র শ্রেণিকক্ষে, মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই আমি পড়তে শিখেছিলাম। এই ব্যাপারটিই আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান। এভাবে পাঠের জগতে একে একে সত্তর বছরের বেশি সময় কাটিয়ে দেবার পর আমার এখনও মনে পড়ে বইয়ে লেখা শব্দগুলিকে ছবিতে রূপান্তরের সেই অদ্ভুত জাদুবিদ্যা নিজের জীবনটিকে ঠিক কতোটা পূর্ণ করে তুলেছিল, কাল ও স্থানের দেওয়ালগুলি ভেঙে গিয়েছিল ধীরে ধীরে, পথ দেখিয়ে দিয়েছিল ক্যাপ্টেন নিমো'র সঙ্গে সমুদ্রের অতল জলরাশির বিশ হাজার লিগ তলে অভিযাত্রায় চলে যেতে, আরামিস, অ্যাথোস, পার্থোসের লড়াই দ্য'আরতাঁনা'র সঙ্গে, রিশেলিও'র গূঢ় অভিপ্রায়ের দিনগুলিতে রাণি'র সহায়তা, প্যারিসের ভূগর্ভস্থ নর্দমায় নেমে গিয়ে জ্যঁ ভালজাঁয় রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া, তারপর ম্যারিউসের অচেতন শরীরটাকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে যেতাম বহুদূর।

বইপড়া ব্যাপারটি এমন- এই পড়া স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দেয়, বাস্তব হয়ে যায় স্বপ্ন; পাঠের জাদুস্পর্শে একদিন যে এক ছোট্ট বালক ছিল, তার সামনে জীবন ও স্বপ্নের ঘোর দিয়ে তৈরি সাহিত্যের বিপুলা পৃথিবী তার দরোজা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। মায়ের মুখ থেকে একদিন এই কথাটি শুনতে পেলাম- আমি প্রথম যা লিখতে শুরু করেছিলাম তা ছিল আমার পঠিত গল্পগুলির এক সম্প্রসারণ, কারণ গল্পগুলি যে-জায়গাটিতে গিয়ে পৌঁছাত, শেষ হত, সেই শেষটা আমাকে বিষণ্ণ করে ফেলত, আমি তাই গল্পের সমাপ্তিটিকে নিজের মত করে বদলে নিতাম। সম্ভবত ব্যাপারটি ঠিক মত বুঝতে না পেরেই আমি সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছি, আর এখনও বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হয়েও, যে-গল্পগুলি আমার ছোটবেলার বিষণ্ণতা ও আনন্দের উৎস ছিল- তাদেরকেই নিজের মত করে লিখে গেছি। আজ যদি মা এখানে থাকতেন! আমাদো নেরভো আর নেরুদা'র কবিতা যখন পড়তেন, আমার মায়ের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ত; আমার পিতামহ- পেদ্রো, যার নাকটি ছিল বিশাল, সঙ্গে একটি দীপ্তি-বিচ্ছুরিত টেকো মাথা- আমার লেখাকে তিনি উদযাপন করতেন; আর একজনের কথা বিশেষভাবে বলব, তিনি আমার লুসো কাকা। এই লুসো কাকাই আমাকে শরীর ও আত্মা নিয়ে লেখায় ডুবে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটিকে আরও বেশি করে উসকে দিতেন যদিও সেই সময়ে লেখালেখি করা নিজেকে উজাড় করার নামান্তর ছিল, সেটা জেনেও। জীবনভর আমি আমার পাশে এরকম মানুষকেই পেয়েছি, যারা এভাবেই আমাকে ভালবেসেছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন, আর যখনই আমি নানামাত্রিক সংশয়ে ভুগেছি তখনই তাদের বিশ্বাসে আর ভরসায় আমি আস্থা রাখতে পেরেছি।'

নোবেল বক্তৃতা; আংশিক, স্টকহোম, ২০১০



২ লেখক-জীবন

মারিও বার্গাস য়োসা বছরের বিভিন্ন সময় লিমা, মাদ্রিদ, প্যারিস ও লন্ডনে বসবাস করেন। পেরুর লিমায় খুব কমই থাকেন কিন্তু এবার আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে যে তিনি সেখানে ছিলেন; গ্রীষ্মে, বারাঙ্ক'য় সমুদ্রের কাছে তার বাড়িতে সাক্ষাৎ হয়ে যায় তার সঙ্গে। লিমা উপকূলে কিছু সময়ের জন্য কথা বলার সুযোগ পাই। বার্গাস ইয়োসা সম্ভবত সবচেয়ে প্রতিভাবান সমসাময়িক লাতিন আমেরিকান লেখক, যার বহু উপন্যাস ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।

লাতিন আমেরিকার শিল্পসাহিত্য, গত শতকের প্রথম দশকগুলোয় আধুনিকতাবাদের স্পর্শে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। নেরুদা'র মতো বিশ্বখ্যাত কবিদের সমমর্যাদায় লাতিন উপন্যাসিকরাও উঠে আসতে শুরু করলেন। বলা যায়, উপন্যাসিকরা নিজস্ব স্বর খুঁজে পেতে লাগলেন। শতাব্দীর মধ্যভাগে, অর্থাৎ ষাটের দশকে লাতিন উপন্যাস হঠাৎ খুব

শক্তিশালী হয়ে উঠল, মহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারাবিশ্বে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল। হোর্হে লুইস বোর্হেস, কার্লোস ফুয়েন্তেস, হুলিও কোর্তাসার, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, মারিও বার্গাস য়োসা'র মতো একদল আধুনিক কথাসাহিত্যিকের দেখা পাওয়া গেল; তাকে বলা হলো 'লাতিন আমেরিকান বুম'। এই লেখকরা সেই বুমের ভিত্তিভূমি তৈরি করে দিলেন, নিজেরা হয়ে উঠলেন মহাদেশের কথাকার। বার্গাস য়োসা এসব বড় লেখকদের মধ্যে অন্যতম, লাতিন আমেরিকার বুম-উত্তর লেখকদের ওপরও যার রয়েছে ব্যাপক প্রভাব।

য়োসা'র প্রতিটি উপন্যাস এবং অন্যান্য গদ্যলেখা এক একটি আবিষ্কার কেননা নিজেকে কখনওই তিনি পুনরাবৃত্তি করেন না। তার 'দ্য টেমপটেশন অফ দ্য ইম্পসিবল : ভিক্টর হুগো ও লা মিজারেবল' (আলফাগুরা, মাদ্রিদ, ২০০৪) হলো লা মিজারেবলের এক বুদ্ধিদীপ্ত অধ্যয়ন, এমন এক লেখকের বিচারপদ্ধতি যিনি সত্যিকার অর্থেই হুগো’র শৈলীটাকে জানেন! য়োসা’র ‘দ্য সিটি অফ ডগস’, দ্য গ্রিন হাউস’, ‘ কনভারসেশন ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’, অ্যান্ট জুলিয়া এন্ড দ্য স্ক্রিপ্টরাইটার’, ‘দ্য ওয়ার অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘দ্য স্টোরি টেলার’, ‘ ইন দ্য প্রেইজ স্টেপমাদার’, ‘দ্য নোটবুকস অফ দ্য রিগোবার্তো’, ‘দ্য ফেস্ট অফ দ্য গৌট’ উপন্যাসগুল ইতিমধ্যেই লাটিন আমেরিকার গণ্ডি পেরিয়ে সারাবিশ্বের সাহিত্যপ্রেমির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। তার নোবেল বক্তৃতা পড়ল মনে হয় এ এক হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিকথা শুধু নয়, একটি দীর্ঘ কবিতা। 'এ ফিশ অন দি ওয়াটার : এ মেমোয়ার' নামে তার স্মৃতিকথাও প্রকশিত হয়েছে। এ রাইটার্স রিয়েলিটি, লেটার্স টু এ ইয়াং নভেলিস্ট', টাচস্টোনস এসেজ অন লিটারেচার, আর্ট এন্ড পলিটিকস, মেকিং ওয়েভস : এসেজ, ১৯৬২-৯৩- নামে অসাধারণ সব গদ্যের বই রয়েছে যে-বইগুলিতে স্থান পেয়েছে তার তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যিক উপলব্ধিসমূহ। 'দ্য কাবস এন্ড আদার্স স্টোরিজ' হচ্ছে য়োসা'র গল্প-সংগ্রহ। ৩টি নাটক নিয়ে বের হয়েছে 'থ্রি প্লেজ'। পত্রিকায় প্রকাশিত কলামগুলি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে 'দ্য ল্যাংগুয়েজ অব প্যাশন : সিলেক্টেড কমেন্টারি'। তিনি '৯৪ সালে 'মিগেল দে সের্ভান্তেস প্রাইজ'-এ সম্মানিত হন, ২০১২'য় তাকে দেওয়া হয় 'কার্লোস ফুয়েন্তেস ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারারি ক্রিয়েশন ইন দ্য স্প্যানিশ ল্যাংগুয়েজ'। ২০১০-এ পেয়েছেন সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মাননা- নোবেল পুরস্কার।

অনূদিত গদ্যটি নেওয়া হয়েছে ১৯৯৭-এ য়োসা'র Cartas a un joven novelista বইটির নাতাশা উইমারকৃত ইংরেজি ভাষান্তর 'লেটার্স টু এ ইয়াং নভেলিস্ট' থেকে।


প্রিয় বন্ধু,

আপনার চিঠি পড়ে নিজের ভেতরের আলোড়ন টের পেয়েছিলাম, কারণ- আপনার চিঠি পড়ে আমি লিমায় নিজের চৌদ্দ পনেরো বছর বয়সের সেই উত্তেজনায় যেন ফিরে গিয়েছিলাম, সেই ধূসর রাজধানী শহর লিমা, যখন সে ছিল জেনারেল ওড্রিয়া'র একনায়কতন্ত্রের অধীনে; হ্যাঁ, সেই ধূসর লিমা! নিজেকে দেখছিলাম, সেই শহরে, যে লেখক হবার আকাঙ্ক্ষায় ভেতরের আগুনে পুড়ছিল! একদিন লেখক হবো! কিন্তু আমি একদমই জানতাম না কীভাবে লেখক হয়ে ওঠতে হয়, লেখক হওয়ার পদ্ধতিগুলো কী, কীভাবে প্রস্তুতি নেব, কীভাবে কোন পথে গেলে লেখক হতে পারব আর কীভাবে আমি আমার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের কিছু সৃষ্টি করতে পারব; কীভাবে এমন একটি গল্প লিখতে পারব যে-লেখা আমার পাঠকদেরকে চমকে দেবে, যেমনটি আমি আমার ব্যক্তিগত পাঠের ভেতর দিয়ে মহৎ লেখকদের আস্বাদন করতে পেরেছি, পড়ে চমকে ওঠেছি আর যাদের লেখা আমি সেই বয়সে গভীর মনোযোগে পাঠ করেছি- ফকনার, হেমিংওয়ে, মার্লো, দজ পাসোজ, কামু, সার্ত্রে, একদিন আমিও তেমন একজন লেখক হবো, কীভাবে?

বহুবার এমন হয়েছে যে আমি তাদের যেকোনও একজনকে (তাঁরা তখনও লেখালেখিতে সক্রিয়) চিঠি লিখতে চেয়েছি, কীভাবে লেখক হয়ে ওঠতে হয়, সে পরামর্শ চেয়েছি; কিন্তু সেই সাহস আমার কখনওই হয়নি; চিঠি লেখার ইচ্ছে দমিয়ে

রেখেছি, লজ্জায়- যদি তাঁরা উত্তর না দেন? আপনি কেন লেখেন, কেন লেখালেখি? আমার এইসব প্রশ্নের উত্তর তাঁরা যদি দিতে না চান, তাহলে? এভাবেই, ইচ্ছের অবদমন দেশের বহু তরুণকে হতোদ্যম করে ফেলে, আমাদের দেশে (সব মহাদেশেই) সাহিত্য বিবেচিত হয় অপ্রয়োজনীয় কাজ হিসেবে, এ কাজ করতে হয় লুকিয়ে, আড়ালে থেকে। এ প্রচণ্ড এক বাজে আর হতাশাজনক অবস্থা, অনেকটা পক্ষাঘাতের মতো, তরুণ লেখক যেন সমাজে থেকেও অন্তেবাসী ঘরের মতো একা! যদি আপনি নিজেকে এমন অবস্থায় দেখতে না পান, তাহলে বন্ধু, স্বাগতম। আপনি আমাকে লিখেছেন, তার মানে আমি ধরে নিচ্ছি এটাই যে- আপনি পক্ষাঘাতের শিকার নন।

লেখালেখি যে একটি চাঞ্চল্যকর অভিযাত্রা, আপনি যে সেই অভিযাত্রায় শামিল হতে চান, অভিযাত্রাটি শুরু করতে চান, আকাঙ্ক্ষা করেন- যা আমি নিশ্চিত হয়েছি- যা আপনি হয়তো চিঠিতে এতোকিছু বলেননি, তবুও আপনি অসাধারণ কিছু সূত্রের কথা বলেছেন, লেখালেখির অসুখের থেকে মুক্তির পথ জানতে চেয়েছেন, লিখতে চেয়েছেন নিজের গল্পটি, সেজন্য আমি আজ আনন্দিত।

আপনার অভিযাত্রার সূক্ষ্ম সূচনা আপনার ভেতর থেকেই শুরু হবে। তরুণ লেখক মনে করে আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি- খুব বেশি আশা করবেন না, সাফল্যকে কোনওদিনও গুরুত্ব দেবেন না, এমনকি হিসেবেই ধরবেন না। অবশ্যই, আপনার ব্যর্থ হওয়ার কোনও কারণই নেই, কেন আপনি সফল হতে পারলেন না- তারও কোনও বিশেষ কারণ নেই, কিন্তু আপনি যদি লেখালেখিতে অবিচল থাকেন, লেখা প্রকাশে অবিচল থাকেন, নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগে কাজ করেন, তাহলে খুব শীঘ্রই আপনি আবিষ্কার করবেন যে- পদক, পুরস্কার, উচ্চৈঃস্বরে প্রশংসা, করতালি, সংবর্ধনা, বই বিক্রি, লেখকের সামাজিক অবস্থান- সব কিছুরই একটি বিশেষ আবেদন রয়েছে, গূঢ় অভিসন্ধিও রয়েছে, হ্যাঁ, যারা এসব পেয়ে যান, তাঁরা সাধারণ নন, এক্সট্রাওর্ডিনারি, তবে, অনেক সময় তাঁরা বিপুল করতালিতে নিজেরা নিজেদের ভুলে যান, নিজেকে ঠিকঠাক চিনতে পারেন না, নিজের ভেতরের লেখার প্রতিভাকে তাঁরা মুক্তির পথ দিতে পারেন না, কারণ তাঁরা ইতিমধ্যে সফল হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁরা যতোটা সফল, ততোটাই তাঁরা তাদের স্বপ্ন থেকে দূরে সরে গেছেন, নিজের স্বপ্নকে আর উপলব্ধি করতে পারেন না। সফলতাকে যারা মূল লক্ষ্য হিসাবে দেখেন, তেমন লেখকরা সম্ভবত তাদের স্বপ্নকে কখনই উপলব্ধি করতে পারেন না, তারা খ্যাতির জন্য ক্ষুধার্ত, টাকার জন্য ক্ষুধার্ত (যদিও তাদের সংখ্যা বেশি নয়)। এখানেই পার্থক্য। লেখক-বৃত্তির নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যটি হলো- ক্র্যাফটকে (শৈলী) যারা অবিরাম চর্চায় অনাস্বাদিত প্রকাশে উন্মুখ করে তুলতে পারেন, তারাই শ্রেষ্ঠ, তারাই মহৎ হবেন, লেখকের ক্র্যাফটই তার আসল পুরস্কার, প্রকৃত সফলতা, লেখালেখি করতে গিয়ে তাঁরা জাগতিক যা কিছু অর্জন করেন না কেন, কিছুই মূল্যবান নয়, শেষ পর্যন্ত অসামান্য লেখাটিই টিকে থাকে। লিখতে আসার পর, আমার মধ্যে যেসব অনিশ্চয়তার জন্ম হয়েছে, তাকে আমি নানাভাবে মোকাবেলা করি, করতে চেষ্টা করি, তার মধ্যে যে ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে : লেখকের ‘পরানের গহীন ভিতর'; একজন লেখক এটা অনুভব করেন যে- তার সঙ্গে যা কিছু ঘটছে, তিনি যা কিছু করছেন, কিংবা যা কিছু তিনি করবেন, তার মধ্যে একমাত্র লেখালেখিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ কাজ, কারণ, যতটুকু নিজেকে তিনি চিনতে পেরেছেন, তাতে তিনি বুঝেছেন যে- লেখালেখিই জীবনের সবচে সন্তোষজনক কাজ, জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনাময় উপায়; তা তিনি লিখে লিখে যতোই সামাজিক রাজনৈতিক এবং আর্থিক দিক থেকে সফল হোন না কেন, লেখা ছাড়া তার কাছে কোনও বিকল্প নেই। পদক পুরস্কারকে তিনি মূল্যবান মনে করেন না, উদাসীন থাকেন। এখন, এই যে লেখকজীবন, যে-জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি একজন লেখক; এই যে তার লেখকবৃত্তি- এ প্রসঙ্গে আমার মনে হচ্ছে আপনাকে কিছু কথা বলা অনিবার্য হয়ে পড়েছে, যা আপনাকে উত্তেজিত করবে আবার খুব গোলমেলে ব্যাপার বলেও মনে হতে পারে, যেমন : কীভাবে আপনি একজন লেখক হয়ে ওঠবেন? হ্যাঁ, আমি জোর দিয়ে বলবো, অবশ্যই এ এক বিস্ময়কর কাজ, যা সংশয় এবং আত্মনিষ্ঠার মধ্যে অবগুণ্ঠিত হয়ে থাকে, থাকে এক কুয়াশার পর্দা, যা নিয়তই রহস্যময়, লেখক হয়তো স্বনির্মিত এক ঈশ্বর, কিংবা দেবতাদের মধ্যে এমন এক দেবতা যিনি ঐশ্বরিক শব্দগুলো লিখবার জন্য আদেশ পেয়েছেন! লেখকের ভেতরে এমন এক অপার্থিব আলোর জন্ম হয়েছিল আর সে আলো একদিন প্রকাশিতও হয়েছিল, যার উত্তাপ লেগেছিল মানব সভ্যতায়, মানবাত্মায়, আর লেখককে তার সমাজ, তার সময় গ্রহণ করে নিয়েছিল, কারণ তাঁরা দেখতে পেয়েছিল লেখকের হাতে আছে সৌন্দর্য সৃষ্টির সমস্ত উপকরণ আর অমরত্বের এক আশ্চর্য ক্ষমতা!

যদি আমার ধারণাটি ভুল না হয় (যদিও তেমন একটা ভুল হবে না জানি)- একজন পুরুষ বা একজন নারী শৈশব কিংবা কৈশোর বয়স থেকে চেতন-অবচেতনে, এমনভাবে বেড়ে ওঠেন, তার ভেতরে এমন এক অবস্থা তৈরি হয় বা জন্ম হতে থাকে যার মাধ্যমে মানুষ, পরিস্থিতি, উপাখ্যান, যে-জগতে সে বাস করে তার সঙ্গে অন্য জগতের ভিন্নতা ইত্যাদি সম্পর্কে তার ভেতর স্বপ্ন এবং কুহক-বিভ্রমের জন্ম হয়; আর এই স্বপ্ন কিংবা বিভ্রমই প্রথম লক্ষণ, যা পরে লেখক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ সম্ভব করবে। আবার গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের ভেতরের কোথায় যেন এক অতল গহ্বর আছে, যারা কখনই বাস্তব

জগতের দিকে তীব্র চোখে তাকায় না, কখনও তাকাবেই না, যে-চোখে তাকালে তার কাছেও হয়তো জগত সংসার অন্যরকম মনে হতো, তার মধ্যে বিপুলা কল্পনাশক্তির জন্ম হতো, আর তাতে সে প্রকৃত সাহিত্য চর্চার পথে অগ্রসর হতো, কল্পনার সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হতো। আসলে কেউ কেউ কল্পনার সৃষ্টির দিকে যায়, সকলে যায় না। আর যারা বাস্তব আর কল্পনার দেয়াল অতিক্রম করে, কেবল তারাই লিখিত শব্দের ভেতর দিয়ে বিশ্বজগতের স্রষ্টা হয়ে ওঠেন- তারা হলেন লেখক, তাঁরাই সেই অল্পসংখ্যক ব্যক্তি, যারা দিনে দিনে নিজেদের প্রস্তুত করেছেন, গড়ে নিয়েছেন, অবিরাম ভাঙনের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আরও শানিত করেছেন লেখনি-শক্তিকে, আরও অধিক সংবেদনশীল হয়েছেন, সার্তে যাকে বলেছেন- লেখকরা বাছাই করেন; আর গ্রহণ, সৃষ্টি ও মুক্তির সেই অলৌকিক মুহূর্তে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে সব কিছুর বদলে কেবল লেখকই হবেন, আর কিছু না, কিছুই না। তাঁরা এটাই নিজেদের জন্য পছন্দ করেছেন, বেছে নিয়েছেন- কেবলই হয়ে ওঠার জন্য।

তারা লিখিত শব্দের মাধ্যমে সূক্ষ্মতম অনুষঙ্গগুলোকে লিখবার পক্ষে জীবিতকালকে অবিরাম গড়ে চলেন, যেন তারাই, একমাত্র তারাই জীবনকে মালা পরাবেন, পূর্ণতা দেবেন, মনের দুর্বোধ্য অবস্থাকে ভাষায় প্রকাশ করবেন, নিজের জীবন, অন্য জীবন এবং জগতের রূপকার হবেন, চাক্ষিক হবেন, আপনি এখন ঠিক এই অবস্থায় রয়েছেন : জীবনের রূঢ় এবং রোমাঞ্চকর মুহূর্তে আপনাকে অবশ্যই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আপনি- কল্পিত বাস্তবতার (ফিকশনাল রিয়েলিটি) সৃষ্টিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন, না কি কল্পিত বাস্তবতাকে নিয়ে জীবনের অমোঘ বাস্তবতার উন্মোচনে লিখতে বসবেন। এই দায় একান্তই আপনার, হে তরুণ লেখক।

আপনি যদি এদের যেকোনও একটিকে গ্রহণ করেন, তাহলে এর জন্য আপনাকে অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে, অর্থাৎ আপনাকে- ঝুঁকি নিতে হবে, আপনাকে আনত থাকতে হবে, অবিরাম লেগে থাকতে হবে, প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে, যদিও লেখক হিসাবে আপনার ভবিষ্যৎ এখনও কুয়াশাচ্ছন্ন, সবচে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে- নিজের জীবনকে উদ্দেশ্য পূরণের দিকে ধাবিত করার প্রতি আপনার যে সিদ্ধান্ত, আপনার নিজের কমিটমেন্টের প্রতি আপনার গভীর মনোযোগ, তা-ই হচ্ছে সবচে কার্যকর পদ্ধতি এবং পথ, সম্ভবত একমাত্র ইতিবাচক পদ্ধতি — যা, একজন লেখক হওয়ার দিকে যাওয়ার সূচনাবিন্দু।

লেখক জীবনের সূচনার দিকের আকাঙ্ক্ষা বা ঝোঁক কীসের? কোন সে আকাঙ্ক্ষা? আপনার কী এ ব্যাপারে ধারণা আছে? তা কি চরিত্র সৃষ্টি এবং গল্প আবিষ্কারের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর যদি আমি দিই, তাহলে বলব- বিদ্রোহ।

আমি নিশ্চিত যে, তারা, যারা নিজেদের নিমজ্জিত করেন, জীবনের বহুমূল্য 'সময়' সৃষ্টির জন্য খরচ করেন, সৃষ্টির জন্য পরিশ্রম করেন, তারা আসলে 'বিদ্রোহ’ করেন নিজের জীবনের বিরুদ্ধে, সমালোচনা এবং প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে, যার প্রতিপক্ষ- এই বাস্তব পৃথিবী, এবং তারা তাদের আকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করে দেন, এবং তারা তাদের সৃজনকল্পনা এবং স্বপ্নকে সৃষ্টির জন্য এক বিকল্প জগত গড়ে তোলেন।

কেন সেই লেখক হতে চাওয়া 'একজন' যে বাস্তব-কে গভীর অর্থে জেনেও, বাস্তব জীবনকে রক্তেমাংসে ছেনে ঘেটে যাপন করেও, ক্লেদাক্ত কুসুমে বেঁচে থেকেও, নিজেকে এমন কিছুর জন্য উৎসর্গ করে দেবে যা অলীক, অবাস্তব, উদ্ভট, খেয়ালি, কল্পনাপ্রবণ, এবং যা আখ্যানের বাস্তব কিংবা কল্পিত বাস্তবের সৃষ্টি? আমি নিশ্চিত, যারাই জীবনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, তারা সেই ক্ষমতা নিয়েই জন্ম নিয়েছেন, তারা চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেন, নতুন জীবনের জন্ম দিতে পারেন, আবিষ্কার করেন যাপনের এমন সব কলাকৌশল, যা প্রকৃত মানুষের যাপন করবার কথা ছিল, হ্যাঁ, সেই আবিষ্কার প্রত্যাখ্যানের হতে পারে, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসম্মান প্রদর্শন হতে পারে, আবার সমাজে নিষিদ্ধ, এমন কিছুর প্রতি আকাঙ্ক্ষাও হতে পারে। বাস্তবকে প্রশ্ন করবার মৌলিক প্রকৃতি, যা আমিসহ সকল লেখকের লেখালেখি শুরুর আগ থেকেই মনে সুপ্ত অবস্থায় ছিল বলে মনে করি, এবং এ থাকাটা স্বাভাবিক। লেখককে ক্ষেপিয়ে দেয়, রাগিয়ে দেয়, ক্রুদ্ধ করে- এমন একটা জায়গাই তো বাস্তব দুনিয়া, লেখক মনে মনে তাই যুদ্ধ করেন- একটা একটা শব্দ লিখে লিখে।

বাস্তবকে অনবরত প্রশ্ন করে যাওয়া হচ্ছে সাহিত্যের একটি ভেতর-বাস্তব বিষয়, তাতে লেখক নিশ্চিত হয়ে থাকেন - জীবন তাঁকে মৌলিক কিছু নিশ্চয়ই দেখাবে, জীবন- উপন্যাসে যেভাবে বর্ণিত হয় (বিশেষ করে প্রধান উপন্যাসগুলোয়), আসলে জীবন কখনই তেমন জীবন হয় না, হতে পারে না। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাঋদ্ধ লেখকরা জীবনকে কল্পনা করেছিলেন, লিখেছিলেন। পড়েছিলেন অথবা প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু আসলে কল্পনার জীবনই ছিল তাদের আকাঙ্ক্ষিত: লিখতে গিয়ে তারা জীবনকে মিথ্যা মিথ্যা নির্মাণ করেছেন, নিজেদের মতো করে বর্ণনা করেছেন, ছবি এঁকেছেন, কারণ তারা কিছুতেই চেনা বাস্তবতায় বাস করতে পারছিলেন না, অন্তর্গত যাপনকথা লিখতে অনেকটা বাধ্য হয়েছিলেন কারণ শুধু বাস্তবে বেঁচে থাকতে পারছিলেন না, পালাতে চেয়েছিলেন, পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন মনের ভেতরকার এক স্বনির্মিত

জগতে- নিজেদের স্বপ্নে, এবং ফিকশনে (কথাসাহিত্যে)। ফিকশন গভীর সত্যে মোড়ানো এক মিথ্যা, ফিকশনের জীবন যেন কখনও কোথাও ছিল না, ফিকশনের জীবন এমন এক জীবন কিছু মানুষ যে-জীবনটাকে যাপন করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি, কোথাও সে-জীবনকে তারা খুঁজে পায়নি, পায়নি বলেই তারা নির্মাণ করেছে। আবিষ্কার করেছে। যা কিছু কল্পনা করেছে, তাকেই তারা শব্দে ধরেছে, জীবনকে অর্থবহ করার চেষ্টা করেছে। সের্ভান্তেসের 'দন কিহোহে' এবং ফ্লবেরের 'মাদাম বোভারি' হলো এমনই বিদ্রোহ, বাস্তবের বিরুদ্ধে কল্পনার জীবনকে দ্বন্দ্বে আহ্বান; ব্যক্তি যেখানে জীবন নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়, এ-উপন্যাস তখন জীবনের দিকে তাকে উন্মুখ করে তোলে, কিন্তু হয়তো সে কোথাও সেই জীবনকে খুঁজে পাবে না।

সাহিত্যের খেলা কিন্তু নিষ্পাপ নয়, এ হচ্ছে বাস্তবজীবনের সঙ্গে গভীর অসন্তোষের ফল, কথাসাহিত্য নিজেই অস্বস্তি এবং অসন্তুষ্টির উৎস। সেভান্তেস (দন কিহোতে) এবং ফ্লবেরের (মাদাম বোভারি) নাম উল্লেখের মাধ্যমে আমি যে-দুটি-গল্পের-কথা আগে বলেছি--তারা, যারা এই গল্প পড়ার ভেতর দিয়ে গেছেন, পাঠের অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, তারা- জীবনের সীমাবদ্ধতা এবং অসম্পূর্ণতাগুলির প্রতি তীব্র সংবেদনসহ বাস্তবজীবনে ফিরে আসার এক অদ্ভুত নাটুকেপনার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেন, তারা অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই সতর্ক থাকেন এ-দুটি অনন্যসাধারণ ফিকশনের অন্তর্গত সত্যের দ্বারা যেখানে বাস্তব জগত এবং জীবন, যেখানে তারা বেঁচে থাকেন, তা হলো- বহুগুণ বেশি অসামান্য এক জগত, যা নির্মিত হয় লেখকের দ্বারা।

পাঠক যখন সত্যিকারের জগতের মুখোমুখি হয় (শ্রেষ্ঠ সাহিত্য হয়তো পাঠকের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়), পাঠক তখন সাহিত্যকে কর্তৃত্ব, প্রতিষ্ঠান এবং অনুমোদিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারে। এখানে লেখার আসল শক্তি।

এই কারণেই হিস্পানি শাসকরা কথাসাহিত্যকের কাজকে কখনওই বিশ্বাস করেনি, করতে পারেনি বলে ফিকশনের ওপর নিয়ন্ত্রণ (সেন্সরশিপ) আরোপ করে, ফলে তিনশোবছর ধরে আমেরিকান উপনিবেশগুলিতে ফিকশনকে কঠোর নজরদারিতে থাকতে হয়েছেন শুধুমাত্র মামুলি এই অজুহাতে যে- বুনো গল্পগুলো ইন্ডিয়ানদের ঈশ্বর উপাসনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যের অনুরূপে প্রতিটি দেশের সরকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে, সব সরকারই নাগরিকের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী থেকেছে, এবং একইভাবে তারা ফিকশনকে ভয় পেয়েছে, অবিশ্বাস করেছে, এবং শুধু নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার অজুহাতে কেবল গল্পের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। এখন কথা হলো- প্রাচীন পৃথিবীর দণ্ডধারী শাসক এবং আজকের শাসক, যার কথাই ধরি না কেন, তারা ভুল করেনি, গল্প-দমনে তারা সঠিক ছিল- এতে আমি কোনোরূপ দোষ তো দেখিই না, উল্টো এই কথাটি বলি- গল্প লেখা হচ্ছে স্বাধীনতা চর্চার সর্বোৎকৃষ্ট উপায়, এবং তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং তর্কের এক পদ্ধতি- হোক তারা ধর্মবাদী কিংবা সেক্যুলার-- যারা সাহিত্যকে সব সময় ভয় পায়, সাহিত্যকে নির্বাসিত করতে চায়।

লেখালেখি শখের বিষয় নয়, খেলাধুলো কিংবা অবসরের বিনোদনমূলক কিছু নয়- লেখলেখি ভেতর সংবেদী, জরুরি এবং সার্বক্ষণিক এক কাজ, যাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে কেউ বাধ্য করে না, লেখালেখি নিজে নিজে মেনে নেওয়া এক দাসত্ব, যা ভিকটিমকে (ভাগ্যবান ভিকটিম) তার দাসে পরিণত করে। সাহিত্য লেখকের সমস্ত চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে, দখল করে রাখে, চিরদিনের জন্য তার ভেতরে স্থায়ী হয়ে যায়। লেখকের সমস্ত অস্তিত্বকেই সে অধিকার করে, যাকে জীবনের পুরো সময়টা দিয়ে দিতে হয়। এ এমন একটি বিষয় যা আপনার পুরো অস্তিত্বকে গ্রহণ করে আপনার ভেতর দিয়েই আত্মপ্রকাশ করে।

ফ্লবের যেমন বলেন- ‘লেখাই হচ্ছে বেঁচে থাকবার অন্য একটি উপায়'। অন্যভাবে বললে- যারা শুধু লেখালেখিকে মন্ত্র হিসেবে জীবনে গ্রহণ করেন তারা কিন্তু বাঁচার জন্য লেখেন না, লিখবার জন্য বাঁচেন, লিখতেই বাঁচেন। আমি কেবলই ওল্ফ-কে (থমাস ওল্ফ : দি অটোবায়োগ্রাফি অভ অ্যান আমেরিকান নভেলিস্ট) পড়লাম, লেখকবৃত্তিকে যিনি কৃমির সঙ্গে তুলনা করেছেন, এভাবে : 'ঘুম যেন চিরদিনের জন্যই মরে গিয়েছিল, শৈশবের সে কোমল পুষ্পের মতো ঘুম আমার শেষ হয়ে গিয়েছিল, যেদিন কৃমিকীটটি আমার হৃদয়ে প্রবেশ করল। কৃমিটি আমার মগজ, আমার আত্মা, এবং আমার সমস্ত স্মৃতিকে পেঁচিয়ে ধরল, ধরে শুয়ে থাকল, আমি সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করলাম যে অবশেষে আমি আমার নিজের আগুনে ধরা পড়ে গেছি, আমি আমার নিজের ক্ষুধা নিজেকে খেয়েই মেটাব, উপলব্ধি করলাম যে আমি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি, লটকে গেছি একটা ক্রুশিকাঠির ওপর যা কি না ক্ষিপ্ত, উন্মত্ত, অসংযত, প্রচণ্ড এবং সংবেদনহীন নিঃসাড় এক আকাঙ্ক্ষার ভেতর আমি হারিয়ে গেলাম যা চিরদিনের জন্য আমার জীবনকে তার ভেতরে টেনে নিয়েছে, আত্মীভূত করেছে। দ্রুতই আমি জেনে গেলাম যে আমার মাথায় অথবা হৃদয়ে, অথবা স্মৃতিতে একটি উজ্জ্বল কোষ এখন থেকে চিরদিনের জন্য জ্বলবে এবং অদ্ভুত আলোর দ্যুতি ছড়াবে; সমস্ত রাত, প্রতিটি দিন, প্রতিটি পদক্ষেপে, ঘুমে-বিভ্রমে-কুহকে, স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে, আমার ভেতরের কৃমিটি নিজেকে পরিপূর্ণ করে নিত, আমার আমিকে খেয়ে খেয়েই নিজেকে সে বাঁচিয়ে রাখতো, এবং বাতিগুলো জ্বলে

উঠতো, কেউ তা আটকাতে পারতো না--না ব্যথানাশক ওষুধ, না কারও বন্ধুত্ব, না কোথাও ভ্রমণ, খেলা কিংবা নারী, কেউই কিছু করতে পারতো না, কেউই ভেতরের অশান্তি দূর করতে পারতো না, জ্বালাযন্ত্রণা দূর করতে পারতো না, এবং মৃত্যুতে আমার জীবনের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত অন্ধকার নেমে আসার এক মুহূর্ত আগেও আমি আর পালাতে পারব না। এভাবেই, ঠিক এভাবেই, শেষ পর্যন্ত আমি বুঝতে পারলাম যে আমি লেখক হয়েছি আর শেষ পর্যন্ত আমি জানতে পেরেছিলাম যে এমন একজন লোকের কী হয় যখন সে নিজের জীবনকে লেখকের জীবন করে তোলে।' আমি মনে করি- কেবলমাত্র তারাই, যারা লিখতে আসে, তারা যেন প্রস্তুত থাকে নিজেদের সময়, শক্তি এবং চেষ্টাকে লেখালেখির জন্য উৎসর্গ করে দিতে, যেন তারা সত্যিকারের লেখক হতে পারে এবং প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অতিক্রম করে অনন্যসাধারণ হতে পারে। উপন্যাস লিখতে জিনিয়াস হওয়ার দরকার নেই, দরকার দীর্ঘ প্রস্তুতি, ক্রাফটের চর্চা, যদিও, কখনও কখনও কবি কিংবা সঙ্গীতজ্ঞের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া যায়, যারা সত্যিই জিনিয়াস (সবচে ক্ল্যাসিক উদাহরণ হচ্ছেন আর্তুর র‍্যাঁবো এবং ভোল্‌ল্ফগাঙ এমাদিয়ুস মোৎসার্ট),- বহুবছরের চর্চার শেষে স্পষ্ট হয়- খাঁটি লেখক কে। উপন্যাস-লেখায় প্রতিভার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত বলে কোথাও কিছু নেই।

সমস্ত মহৎ (শ্রেষ্ঠ, কালোত্তীর্ণ) এবং সমস্ত শ্রদ্ধেয় উপন্যাসিক ছিলেন শুরুর দিকে ছিলেন সেইসব প্রথম শিক্ষানবিশ লেখক যাদের উন্মোচন-উন্মুখ প্রতিভার জন্য জরুরি দরকার ছিল প্রত্যয়ের দৃঢ়তা, এবং গভীর মনোনিবেশ। সেইসব লেখকের ব্যাপারে-- র‍্যাঁবো'র নামটি এখানে আসবে না, র‍্যাঁবো কিশোর বয়সেই একজন উজ্জ্বল কবি--আপনার ধারণা কেমন, যারা একদম শুরু থেকেই প্রতিভাকে শানিয়ে নিতে নিরন্তর চর্চা করে গেছেন, নিজেদের গড়েছেন? আপনি কি তাদের কথা ভাবেন?

যদি সত্যিকার অর্থেই আপনি লেখালেখির প্রতি আগ্রহী থাকেন, তাকে জীবনে লালন করতে চান, নিমজ্জিত হতে চান— তাহলে, আমি আপনাকে অনুরোধ করব, গুস্তাভ ফ্লবেরের চিঠিগুলো পড়তে শুরু করুন, বিশেষ করে- প্রেমিকা লুইজ কোলকে ১৮৫০ থেকে ১৮৫৪ পর্যন্ত সময়কালে লিখিত চিঠিগুলো আপনাকে পড়তেই হবে, কারণ এই সেই সময়, ফ্লবের যখন বোভারি লিখছেন- তার প্রথম মাস্টারপিস!

আমি চিঠিগুলো পড়তে শুরু করি ঠিক যখন আমার প্রথম বইটি লিখছি! চিঠিগুলো আমাকে সাহস যুগিয়েছিল নানাভাবে, যদিও ফ্লবের ছিলেন মানববিদ্বেষী লেখক, তাঁর চিঠিগুলি ছিল মানবসমাজের প্রতি ঘৃণা ও তিরস্কারে পূর্ণ কিন্তু সাহিত্যের প্রতি তার প্রেম ছিল সীমাহীন, আর সেকারণেই- লেখকবৃত্তির প্রতি নিজেকে নিবেদিত করতে পেরেছিলেন তিনি, নিজের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, অবিরাম দিনরাত্রি নিজেকে সৃষ্টি দিয়ে ঘিরে রাখতে পেরেছিলেন নিরলস বিদ্রোহীর মতো, আর ছিলেন প্রতি মুহূর্তে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় মগ্ন বিভোর এক শিল্পী, এবং তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে দিনে দিনে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন (তার প্রথম দিকের রচনাগুলো প্রথাগতই ছিল), এবং এক সময় ‘মাদাম বোভারি' আর 'এ সেন্টিমেন্টাল এডুকেশন'-এর মতো উপন্যাস লিখেছিলেন যা সম্ভবত প্রথম দুই আধুনিক উপন্যাস। আর যে-বইটি আপনাকে অবশ্যই পড়তে হবে, আপনাকে পড়তে বলবো এই চিঠিতে, তা হচ্ছে- উইলিয়াম এস বারোজ লিখিত 'জাংকি’; বারোজ একজন ভিন্নধারার লেখক; যদিও তিনি আমায় টানেন না, উপন্যাসিক হিসেবে তেমন একটা টানতে পারেন না, তাঁর এক্সপেরিমেন্টাল এবং সাইকোডেলিক গল্পগুলো সব সময়ই আমাকে একঘেয়েমির ক্লান্তি দিয়েছে, বিরক্ত করেছে, এতো বেশি ক্লান্ত করেছে যে আমি তার লেখা খুব কমই শেষ করার কথা ভেবেছি।

আজ এখানে শেষ করছি... আবারও বিনিময় হবে- আরও কিছু জটিলতা নিয়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ