নিকষ কালো অন্ধকার রাতগুলোতে দশন নদী পাথরগুলোর গায়ে আছড়ে পড়ে। পাথর ভাঙ্গার শব্দের মতো মধুর শব্দ তৈরি করে। নদীর ডান পাড়ে একটি ছোট্ট টিলা। বুনো লতা-পাতা, গাছপালায় ঘেরা একটা প্রাচীন দূর্গ এর শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে আছে। টিলাটার পূর্বদিকে একটা ছোট্ট গ্রাম। এই দূর্গ আর গ্রামটা বুন্দেল বংশের স্মৃতি রক্ষা করে চলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে। বুন্দেলখান্দ অনেক রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে আছে। মুসলমানরা এসেছে। অনেক বুন্দেল রাজার উত্থান হয়েছে। পতনও হয়েছে। এমন কোন গ্রাম নেই, এমন কোন লোকালয় নেই যা এই উত্থান-পতনের ইতিহাসের অভিঘাতে আলোড়িত হয়নি। কিন্তু এই দূর্গটি দূরারোধ্যভাবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের কেউ কখনও এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি। এটিই এর সৌভাগ্য।
অনিরূদ্ধ সিং ছিলেন একজন সাহসী ক্ষৈত্রীয় বীর। সেকালে সবাই ওর বাহুবল ও সাহসিকতার উপর নির্ভর করতো। একদিকে মুসলমান সেনারা সবসময় আক্রমণ করতে চাইত। আর অপরদিকে, শক্তিশালী রাজারা প্রস্তুত থাকতেন তাদের দুর্বল জাতভাইদের চাপকে তাড়িয়ে দিতে। অনিরূদ্ধ সিংয়ের ছোট হলেও প্রাণবন্ত একটি ঘোরসওয়ার বাহিনী ছিল। পদাতিক বাহিনীও ছিল। এটুকু দিয়েই তিনি তাঁর বংশ ও নিজের মর্যাদা রক্ষার লড়াই করতেন। কখনও স্বস্তিতে থাকতে পারতেন না। তিনবছর আগে শীতলা দেবীকে বিয়ে করেন। সুখে-শান্তিতে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দিনাতিপাত করতেন বসবাসের অযোগ্য বনভূমিতে। তাঁর স্ত্রী তাঁর দীর্ঘ জীবন কামনা করে প্রার্থনা করতেন। প্রায়ই স্বামীর পা ধরে অনুরোধ করতেন যুদ্ধে না যেতে। “আমরা হরিদুয়ারে চলে যাব। আমি আপনার সঙ্গে বনেও বাস করতে পারব। কিন্তু আপনাকে ছাড়া এখানে থাকতে পারব না।” তাঁর স্ত্রী তাঁকে মিষ্টি কথায় ভুলানোর চেষ্টা করত। কখনও কখনও অনুনয়-বিনয় করত। অনিরূদ্ধ একজন বুন্দেলা। শীতলার কোন ছলাকলা তাকে বাগে আনতে পারে না।
তখন নিঃছিদ্র অন্ধকার রাত। গোটা বিশ্ব ঘুমে বিভোর। তারাগুলো আকাশে জ¦লজ¦ল করছে। শীতলা দেবী বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছেন। অনিরূদ্ধর বোন স্বারন্ধা মিষ্টি সুরে গান গাইছেন।
“প্রিয়া ছাড়া কাটে না রজনী।”
শীতলা বললেন, বিরক্ত করো না। তুমিও কি ঘুমাও না?
স্বারন্ধা: আমি তো তোমাদের ঘুমপাড়ানি গান শুনাচ্ছি।
শীতলা: আমার চোখ থেকে ঘুম পালিয়ে গেছে।
স্বারন্ধা: নিশ্চয় কাউকে খুঁজতে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজাটা খুলে গেল। একজন সুঠামদেহী ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করলো। ওর নাম অনিরূদ্ধ। শরীরের সব পোশাক-আশাক ভেজা। সঙ্গে কোন অস্ত্রশস্ত্র নেই। শীতলা বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে বসলো।
স্বারন্ধা: তোমার অস্ত্রশস্ত্রের কী হলো?
অনিরূদ্ধ: হারিয়ে ফেলেছি।
স্বারন্ধা: তোমার লোকজন?
স্বারন্ধা:ওরা সবাই মারা পড়েছে।
শীতলা এবার আস্তে আস্তে বলে ভগবান তোমাকে বাঁচিয়েছেন।
কিন্তু স্বারন্ধা ভ্রু কুচকালো। ওর চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। বলল: ভাই, তুমি আমাদের পরিবারের মানসম্মান ভূলুণ্ঠিত করেছো। এমনটা আগে কখনও ঘটেনি।
স্বারন্ধা তার ভাইকে অনেক ভালোবাসে। তার তিরস্কার শুনে অনিরূদ্ধ এবার লজ্জা আর দুঃখে মূহ্যমান হয়ে গেল। যে অগ্নিশিখা কিছুক্ষণের জন্য ছাইচাপা পড়েছিল, তা এবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। তৎক্ষণাৎ সে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলল, “স্বারন্ধা, তুমি আমাদের সবসময়ই সতর্ক করে দাও। তোমার একথা আমি কখনও ভুলব না।”
তখন নিকষ কালো রাত। তারাগুলো আকাশে ম্লান হয়ে এসেছে। অনিরূদ্ধ দূর্গের বাইরে গেল। তারপর মুহূর্তেই নদীটা পার হয়ে ওপারে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। শীতলা দূর্গের সীমানা পর্যন্ত ওর সঙ্গে সঙ্গে গেল। কিন্তু যখন সে নদীতে ঝাপ দিয়ে চলে গেল তখন সে একটা পাথরের ওপর বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
ইতোমধ্যে স্বারন্ধা ওখানে এসে পড়েছে। শীতলা জিজ্ঞেস করে, “মানসম্মান কি এতই গুরুত্বপূর্ণ?”
স্বারন্ধা: হ্যাঁ
শীতলা: তোমার স্বামী হলে তো ঠিকই তাকে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে রাখতে।
স্বারন্ধা: নাহ, আমি হলে ওর বুকে ছুড়ি বসিয়ে দিতাম।
বিরক্ত হয়ে শীতলা বলে, তুমি ওকে দোপাট্টা দিয়ে বেঁধে রাখতে। আমি যা বলছি তা মনে রেখ।
স্বারন্ধা: যেদিন এমনটা ঘটবে সেদিন আমি আমার কথা রাখব।
এ ঘটনার তিনমাস পর মেহরনি জয় করে অনিরূদ্ধ ফিরে এলো। বছরখানেক পর স্বারন্ধা চম্পাত রাইয়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো। ওরাক্কার রাজা চম্পাত রাই। সেদিনের আলাপচারিতার রেশ উভয় নারীর হৃদয়ের গভীরে গেঁথে রইলো।
রাজা চম্পাত রাই বুদ্ধিমান ব্যক্তি। পুরো বুন্দেলা জনগোষ্ঠীর মানুষ ওর জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। সিংহাসনের বসার পর পরই তিনি মুঘল রাজাদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। শক্তি প্রয়োগ করে রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দিলেন। মুঘল সেনারা তাঁকে বার বার আক্রমণ করে। কিন্তু প্রত্যেকবারই হতাশ হয়, পরাজিত হয়।
এরকম সময়েই অনিরূদ্ধ স্বারন্ধাকে চম্পাত রাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। স্বারন্ধার ইচ্ছাগুলো পূরণ হলো। তার স্বামী বুন্দেলার মানুষদের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে আসুক তার এই ইচ্ছাও পূরণ হলো। যদিও ইতোমধ্যে রাজার পাঁচজন স্ত্রী ছিলেন, তবুও তিনি বুঝতে পারলেন, যে রাণী তাঁকে ভালোবেসে পূজো করেন তিনি আর কেউ নন, তিনি স্বারন্ধা।
কিন্তু কতিপয় পরিবর্তনের কারণে চম্পাত রাই মুঘল রাজাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি তার রাজ্যভার তাঁর ভাই পাহাড় সিংয়ের হাতে নিয়ে দিল্লী চলে আসেন। তখন বাদশাহ শাহজাহানের শাসনামলের শেষের কয়েক বছর। রাষ্ট্র বিষয়ক নানান ব্যাপারে তখন বাদশাহ পুত্র দারাশুকো ছিলেন সর্বশেষ ব্যক্তি। বাদশাহ-পুত্র ছিলেন নম্র, ভদ্র ও উদার প্রকৃতির মানুষ। তিনি চম্পাত রাইয়ের সাহসিকতার গল্প শুনেছেন। কাজেই, তিনি চম্পাত রাইকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে তাঁকে কালপির রাজত্ব দিয়ে দিলেন। ওখানকার বাৎসরিক আয় তখন নয় লক্ষ রুপি। এবারই প্রথম চম্পাত রাই নিয়মিত যুদ্ধবিগ্রহ থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। এবার তিনি বিলাসী জীবন-যাপন শুরু করলেন। দিনরাত শুধু আমোদ-প্রমোদ আর খোশগল্পে মেতে রইলেন। ভোগ-বিলাসে মেতে উঠলেন। রাণীরা হীরা-জহরত খঁচিত পোশাক-আশাক পরে দিনাতিপাত করতে লাগলেন। কিন্তু স্বারন্ধা এই দিনগুলোতে খুব বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তিনি একাকী বোধ করতে লাগলেন। নিজেকে নাচ-গান, বিলাসিতা ও মেহফিল থেকে দূরে রাখলেন।
একদিন চম্পাত রাই স্বারন্ধাকে বললেন, স্বরণ, তুমি কেন এত বিষণ্ন? তোমাকে কখনও হাসতে দেখি না। তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ?
স্বারন্ধার চোখ ছল ছল করে উঠলো। বললেন, আমার প্রাণপ্রিয় স্বামী, আপনি কেন এমনটা ভাবছেন? আপনি যেখানে সুখী, আমিও সেখানে সুখী।
চম্পাত রাই বললেন, “এখানে আসার পর থেকে কখনও তোমার সুন্দর মুখে হাসি দেখিনি। তুমি আর নিজের হাতে আমাকে খিলিপান সাজিয়ে দাও না। আমার মাথার চুল আঁচড়ে দাও না। আমাকে আর তুমি অস্ত্রে সজ্জিত করে দাও না। আমাদের প্রেমের বৃক্ষের পাতা কি ঝরে পড়েছে?”
স্বারন্ধা: প্রিয় স্বামী, আপনি আমাকে এমন সব প্রশ্ন করছেন, যেগুলোর উত্তর আমি জানি না। সত্যিই আজকাল আর আমার মন ভালো থাকে না। খুশি থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু মনে হয় কী যেন এক ভারী পাথর আমার বুকের উপর চেপে বসেছে।
চাম্পাত রাই নিজে আনন্দে মেতে ছিলেন। কাজেই, তিনি বুঝতে পারলেন না, কেন স্বারন্ধা অসুখী হবেন। ভ্রু কুচকে বললেন, তোমার অসুখী হওয়ার কোন কারণ তো আমি দেখছি না। ওরাক্কায় যা ছিল এখানে কি তা নেই?
স্বারন্ধার মুখ লাল হয়ে গেল। “আমি কিছু বললে আপনি কি রাগ করবেন?”
“নাহ, বলো।”
স্বারন্ধা: ওরাক্কায় আমি একজন রাজার রাণী ছিলাম। আর এখানে আমি একজন জায়গীরদারের স্ত্রী। ওরাক্কায় আমার অবস্থান ছিল আওয়াধের কৌশল্যার মতো। আর এখানে আমি সম্রাটের চাকরের স্ত্রী। যে সম্রাট একসময় আপনার নাম শুনে ভয়ে কাঁপতেন, এখন আপনি তার সামনে মাথা নত করে কুর্নিশ করেন। রাণী থেকে কাজের মেয়েতে পরিণত হয়ে আমি সুখী হতে পারি না। এই অবস্থা এবং বিলাস-ব্যাসনের জন্য আপনি প্রচুর মূল্য দিয়েছেন।
স্বারন্ধার কথা শোনার পর চম্পাত রাইয়ের চোখের উপর থেকে পর্দা সরে গেল। এতদিন পর্যন্ত তিনি স্বারন্ধার মানসিক উচ্চতার ব্যাপারে ওয়াকিফ ছিলেন। কারো কাছে মা’র গল্প শুনে এতিম বাচ্চা যেমন কাঁদে, ওরাক্কায় ফেলে আসা জীবনের কথা মনে পড়ার পরও তেমনি চম্পাত রাইয়ের চোখ জলে ছল ছল করে উঠলো। সম্মান ও ভালোবাসা মিশ্রিত বিশেষ এক আবেগে আপ্লুত হয়ে চম্পাত রাই স্বারন্ধাকে আলিঙ্গন করলেন।
সেদিন থেকে তিনি ফেলে আসা সেই স্বভূমির কথা পুনরায় ভাবতে লাগলেন, যেটি তিনি উচ্চাভিলাস, খ্যাতি ও সম্পদের লোভে ছেড়ে চলে এসেছেন।
মা যেমন তার হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন, চম্পাত রাইয়ের ফিরে আসায় বুন্দেলখান্দও উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লো।
এবার ওরাক্কার ভাগ্যের চাকা চিরদিনের জন্য ঘুরে গেল। উৎসবের আনন্দে ঢোল বেজে চলল। স্বারন্ধার চোখে মুখে তার গোত্রের মানুষের গর্বের আভা দৃশ্যমান হয়ে উঠলো।
ওরাক্কায় বসবাস শুরু করার পর কয়েক মাস কেটে গেল। বাদশাহ শাহজাহান অসূস্থ হয়ে পড়লে সব রাজপুত্রের ঈর্ষার ঘা গিয়ে পড়লো দাড়াশুকোর কাঁধে। এ খবর শোনার পর সবখানে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলো। রাজপুত্র মুরাদ ও মহিউদ্দিনের সেনাদল দক্ষিণ থেকে রওনা হয়ে গেল। তখন ছিল বৃষ্টিস্নাত বর্ষাকাল। উর্বর ধরিত্রি তার সব রূপ, রঙের প্রাচুর্য নিয়ে নিজেকে তুলে ধরেছে।
দারুণ উত্তেজনায় মুরাদ ও মহিউদ্দিনন এগিয়ে চলেছে। ওরা ধৌলপুরে চম্বল নদীর ধারে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু ওখানে এসে সম্রাটের সেনাবাহিনীর সামনে পড়ে গেলো।
এবার রাজপুত্ররা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। ওদের সামনে ক্রোধে ফুসতে থাকা নদী। এ যেন এক সন্ন্যাসী যিনি সব পিছুটান উপেক্ষা করে সামনের দিকে ধেয়ে চলছেন। বাধ্য হয়ে ওরা চম্পাত রাইয়ের কাছে সাহায্যের আশায় বার্তা পাঠালেন। খোদার দোহাই দিয়ে ডুবন্ত নৌকাকে উদ্ধার করতে অনুরোধ করেন।
রাজা এবার স্বারন্ধার ঘরে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কীভাবে এই বার্তার উত্তর দেব?”
স্বারন্ধা: আপনার ওদের সাহায্য করা উচিত।
চাম্পাত রাই: সেটি কিন্তু দাড়াশুকোর বিরোধিতা করা হবে।
স্বারন্ধা: সে-কথা সত্যি। কিন্তু যারা আমাদের কাছ থেকে সাহায্য চায়, তাদের সাহায্য করা উচিত।
চাম্পাত রাই: প্রিয়তমা, তুমি কিন্তু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত দিলে না।
স্বারন্ধা: মহারাজ। আমি জানি, এটি কঠিন কাজ। আমাদের সাহসী যোদ্ধাদের স্রোতের মতো রক্ত ঝরাতে হবে। কিন্তু আমরা এ কাজ করব। চম্বল নদীর ঢেউ আবারও রক্তে লাল হবে। বিশ্বাস করুন. যতদিন এই নদী বয়ে যাবে ততদিন আমাদের সাহসী সৈনিকদের গৌরব-গাঁথা গাওয়া হবে। একজন যোদ্ধাও যদি বেঁচে থাকে, তবে তার কপালে এই রক্ত সিঁদুর হয়ে শোভা পাবে।
আকাশের যে কালো মেঘ থেকে বজ্রপাত হয়, সেই কালো মেঘের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে সৈন্যদল এসে পড়লো। ওরাক্কা দূর্গ থেকে বুন্দেল সেনাদল স্বতঃস্ফূর্তভাবে চম্বল নদীর দিকে এগিয়ে চললো। প্রতিটি সৈনিকের মধ্যে যুদ্ধের স্পৃহা। স্বারন্ধা উভয় রাজপুত্রকে আলিঙ্গন করলেন। রাজাকে খিলিপান বানিয়ে খাওয়ালেন। বললেন, বুন্দেলের সম্মান তোমাদের হাতে।
আজ স্বারন্ধার মুখ থেকে হাসি সরছে না। অন্তরে আনন্দের ফোয়ারা ছুটছে। বুন্দেলের সৈন্যদল দেখে মুঘল রাজপুত্রগণ যার পর নেই খুশি হলেন। রাজা এখানকার প্রতি ইঞ্চি জায়গা চেনেন। তিনি বুন্দেলের সৈন্যদের নদীর এক তীরে লুকিয়ে রাখলেন। আর রাজপুত্রের সৈন্যদের মোতায়েন করলেন নদীর পশ্চিম তীরে। দারাশুকো ভাবলেন, শত্রুরা অন্য ঘাট থেকে নদী পার হতে চায় (ঘাটটা ঢালু হয়ে নদীতে নেমে গেছে।) তিনি ঘাট থেকে তাঁর সৈন্যদের সরিয়ে নিলেন। লুকিয়ে থাকা বুন্দেলরা এই মোক্ষম সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল। ওরা শীঘ্রই বেরিয়ে এসে সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াগুলো নিয়ে পানিতে নেমে পড়লো। দারাশুকোর চোখে ধূলো দিয়ে চম্পাত রাই তাঁর সৈন্যদের ফিরিয়ে নিলেন। তারপর বুন্দেলদের পেছনে পেছনে গিয়ে নদী পার হলেন। এই কষ্টসাধ্য কৌশল বাস্তবায়নে দীর্ঘ সাত ঘন্টা লাগলো। প্রায় সাতশ বুন্দেল সৈনিক মৃত্যুবরণ করলো।
তাদের রাজাকে দেখে বুন্দেল সৈনিকগণ উৎসাহিত বোধ করলো। রাজপুত্রদের সৈন্যসামন্তও ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলে দ্রুত এগিয়ে চললো। সম্রাটের সেনাদল দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে লাগলো। ওদের মধ্যকার শৃংখলা ভেঙ্গে পড়লো। সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলো। যুদ্ধক্ষেত্র রক্তে লালে লাল হয়ে গেল। আকাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল। কিন্তু যুদ্ধ প্রচণ্ডভাবে চলতে থাকলো। সম্রাটের সৈন্যদল বিদ্রোহী রাজপুত্রদের উপর চাপ অব্যাহত রাখলো। হঠাৎ করে পশ্চিম প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক বুন্দেল সৈন্যরা সম্রাটের সৈন্যদলের উপর আক্রমণ করলে ওরা হার মানতে বাধ্য হলো। প্রায় জিতে যাওয়া যুদ্ধে ওরা হেরে গেল। সবাই অবাক হলো এই ভেবে যে, এমন সৌভাগ্যের উদয় হলো কোত্থেকে। যারা সহজে সবকিছু বিশ্বাস করে তারা ভাবলো─ রাজপুত্রদের রক্ষা করতে আসমান থেকে স্বয়ং ফেরেশতারা এসেছে। কিন্তু চম্পাত রাই যখন এই ‘ফেরেশতাদের’ দিকে এগিয়ে গেলেন তখন একজন নারী ঘোড়া থেকে নেমে এলেন। রাজার সামনে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলেন। রাজা অত্যন্ত খুশি হলেন। আসলে মহিলাটি ছিলেন স্বারন্ধা।
যুদ্ধক্ষেত্রে একটি মারাত্মক দৃশ্যের অবতারণা হলো। কিছুক্ষণ আগেও যে সৈন্যদল গৌরবের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন তারা এখন লাশ হয়ে যত্রতত্র পড়ে আছে। অনন্তকাল থেকে মানুষ হীন স্বার্থে নিজের ভাইদেরকেই হত্যা করে চলেছে।
এবার বিজয়ী সেনাদল লুটপাটে মত্ত হয়ে গেল। প্রথম দিকে পুরুষ মানুষ পুরুষ মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। সেটা অবশ্য সৌর্য-বীর্যের প্রতীক। আর এখন যা ঘটছে সেটি হীনতা, নীচতা ও দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতিতে মানুষ পশু হয়ে যায়। সে খুব বাজে আচরণ করে।
লুটপাটের সময় সম্রাটের সৈন্যদলের সেনাপতির লাশ পাওয়া গেল। তার নাম ওয়ালি বাহাদুর খান। কাছেই তাঁর ঘোড়া দাঁড়িয়ে লেজ দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছিল। ঘোড়া রাজার পছন্দের প্রাণী।
সুন্দর-দর্শন ঘোড়া উচ্চ জাতের। মজবুত শরীর। সিংহের মতো তার সিনা। বাঘের মতো কটিদেশ। প্রভূর প্রতি এর মমতা ও আনুগত্য দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। রাজা আদেশ দিলেন, ‘সাবধান! কেউ ঘোড়াটিকে আঘাত করবে না। একে আমি জ্যান্ত নিয়ে যেতে চাই। এটি আমার আস্তাবলের শোভা বর্ধন করবে। যে একে আমার কাছে নিয়ে আসবে তাকে আমি নগদ অর্থ পুরস্কার দেব।
যোদ্ধারা চারপাশ থেকে তার দিকে ছুটে গেল, কিন্তু কেউ কাছে ঘেষতে পারলো না। কেউ আদর করতে চাইলো। কেউ চাইলো ফাঁদে আটকাতে। কিন্তু কোনকিছুই কাজ করলো না। শীঘ্রই ঘোড়ার চারপাশে বিপুল সংখ্যক সৈন্য জড় হয়ে গেল।
এবার স্বারন্ধা তার তাবু থেকে বেরিয়ে এসে নির্ভয়ে ঘোড়াটির কাছে গেলেন। তাঁর চোখেমুখে মমতা ছড়িয়ে রয়েছে। সেখানে কোন প্রতারণার ছাপ নেই। ঘোড়া তাঁর সামনে মাথা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রইলো। রাণী এর কাঁধে হাত রাখলেন। পীঠ চাপড়ালেন। ঘোড়া তাঁর দোপাট্টার আড়ালে মুখ লুকালো। রাণী ঘোড়ার লাগাম ধরলেন। তারপর একে তাবুতে নিয়ে এলেন। ঘোড়াটি এমনভাবে তাঁকে অনুসরণ করলো যেন এটি সবসময় তারই খেদমত করেছে। তবে ঘোড়াটি তার অবাধ্য হলেই বরং ভালো হতো। এই সুন্দর ঘোড়াটিই পরবর্তীতে রাজ-পরিবারে ঝামেলা বাঁধিয়েছিল।
পৃথিবীটা একটা রণক্ষেত্র। রণক্ষেত্রে যে সেনাপতি জয়লাভ করেন, তিনিই সুযোগ নেন। সুযোগ পেলে যতটা উৎসাহে তিনি এগিয়ে যান বিপদ দেখলে ঠিক ততটাই দ্রুততার সঙ্গেই সটকে পড়েন। এই সাহসী ব্যক্তিই জাতির ভ্রাতা এবং ইতিহাস তাঁকে খ্যাতির পুষ্পমাল্যে শোভিত করে।
কিন্তু এদেশেই কখনও কখনও এমনও সৈনিকের জন্ম হয় যাঁরা জানেন সুযোগ এলে কখন সামনে এগিয়ে যেতে হয়। তবে তাঁরা বিপদ দেখে সটকে পড়েন না। এই মহান সৈনিকগণ নীতির কারণে তাদের বিজয় বিসর্জন দেন। এরা এদের বাহিনী ত্যাগ করতেও প্রস্তুত। কিন্তু যেখানে পৌঁছেছেন সেখান থেকে কখনই পিছু হটবেন না। যদি একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি কোন জাতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, তবে যে সৈনিক কখনও যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেন না এবং প্রয়োজনে প্রাণ বিসর্জন করতেও প্রস্তুত তিনি তাঁর জাতির মানসপটে গৌরব গাঁথা রেখে যান। এমন মানুষরা বৈষয়িক সাফল্য লাভ করতে পারেন না বটে, কিন্তু কোন সভায় বা জনসমাগমে যখন তাদের প্রসঙ্গ আসে তখন সম্ভ্রমের সঙ্গে তাঁদের নাম উচ্চারিত হয়। স্বারন্ধা তাঁদের একজন যিনি সম্মানের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
রাজপুত্র মহিউদ্দিন যখন চম্বল নদীর তীর থেকে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করলেন, তখন নিয়তি তাঁকে অভিবাদন জানাতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আগ্রায় পৌঁছলে বিজয়ের দেবতা তাঁর জন্য সিংহাসন প্রস্তুত করে দেন। আওরাঙ্গজেব মানুষ চিনতেন। তিনি রাষ্ট্রের সব অপরাধীকে ক্ষমা করে দেন। তাঁদের পদ-পদবী ফিরিয়ে দেন। তিনি চাম্পাত রাইকে সেনাবাহিনীতে মাসিক বার হাজার রুপি বেতনের চাকুরি দেন তার মূল্যবান কাজের প্রতিদান স্বরূপ। তাঁকে ওরাক্কা থেকে বেনারাস, বেনারাস থেকে যমুনা নদী পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ডের জায়গীরদারী দিয়ে দেন। এভাবে এই বুন্দেল রাজা আবারও সম্রাটের অধীনস্ত হয়ে গেলেন। আবারও ভোগ-বিলাসে মেতে উঠলেন। আবারও স্বারন্ধা গোলামীর কাঁটায় জর্জরিত হলেন।
ওয়ালী বাহাদুর খান একজন বাকপটু মানুষ। তাঁর মিষ্টি কথায় সম্রাট আলমগীরের মন গলে গেল। রাজদরবারের সবাই তাঁকে সমীহ করতে লাগলেন। খান তাঁর ঘোড়া হারিয়ে অসুখী বোধ করেন। একদিন রাজপুত্র ছাত্রাসাল ঐ ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি খানের প্রাসাদের কাছাকাছি চলে যান। ওয়ালি বাহাদুর এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ইশারা করলেন। রাজপুত্র একা কী আর করবেন? তিনি ঘোড়া হারিয়ে পদব্রজে বাড়ি ফিরলেন। তারপর এই ঘটনা যখন তিনি স্বারন্ধাকে বললেন, রাণী তখন ক্ষেপে গেলেন। রাণী বললেন, ঘোড়া হারানোয় আমার কোন আফসোস নেই। কিন্তু যে বিষয়টি আমাকে পীড়া দিচ্ছে তা হলো─ তুমি জীবিত কেন ফিরে এলে? তোমার শরীরে কি বুন্দেলদের রক্ত বইছে না? ভালো হতো যদি তুমি দেখাতে পারতে যে, একজন বুন্দেল বালকের হাত থেকে ঘোড়া কেড়ে নেওয়া অত সহজ কর্ম নয়।
এ কথা বলে তিনি তাঁর পঁচিশজন যোদ্ধাকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। নিজেকে অস্ত্রে সজ্জিত করলেন। এরপর ওয়ালি বাহাদুর খানের বাসস্থানের দিকে রওনা দিলেন। ক্ষীপ্র স্রোতস্বিনী নদীর মতো তিনি রাজপ্রাসাদে পৌঁছে গেলেন। এ দৃশ্য দেখে রাজদরবারের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। কর্মকর্তারা জড় হলেন। সম্রাট নিজে রাজদরবারে চলে এলেন। সবাই তলোয়ার গ্রহণ করলো। সবার মধ্যে হট্টগোল লেগে গেলো। রাজদরবারের অনেকের চোখ অমর সিংয়ের তলোয়ারের ঔজ্জ্বল্যে ধাঁধিয়ে গেল। ওদের পুর্বের একই ধরনের ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল।
স্বারন্ধা চিৎকার করে বললেন, “খান সাহেব, একটা নিরীহ বালকের সাথে সাহসিকতা দেখানো আপনার জন্য লজ্জাজনক। এ বীরত্ব চম্বল নদীর ধারে গিয়ে দেখাতে পারতেন। তার কাছ থেকে ঘোড়াটা কেড়ে নিয়ে কি ঠিক করেছেন?”
ওয়ালি বাহাদুরের চোখ থেকে আগুন যেন ঠিকরে পড়ছিল। কড়া গলায় বললেন, “আমার সম্পত্তি ব্যবহার করার সাহস দেখায় কে?”
রাণী─ "ওটা আপনার সম্পত্তি নয়। ওটা আমার। যুদ্ধক্ষেত্রে আমি ওটাকে পেয়েছি। যুদ্ধের এই অতি সাধারণ নিয়মটাও কি আপনি জানেন না?"
খান- "আমি আপনাকে ঘোড়াটা ফেরত দিতে পারব না। ওটার পরিবর্তে আপনি আমার পুরো আস্তাবল নিয়ে যেতে পারেন।"
রাণী─ "আমি ঘোড়াটাই চাই।"
খান- "ঘোড়ার মূল্যের সমপরিমাণ হীরে জহরত আপনাকে দেব।"
রাণী -"তাহলে এই হিসেব আমাকে তলোয়ার দিয়েই চুকাতে হবে দেখছি।"
বুন্দেল যোদ্ধারা তলোয়ার বের করলেন। রাজদরবার যখন রক্তস্নাত হওয়ার উপক্রম তখন সম্রাট আলমগীর বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করলেন। “রাণী সাহেবা, আপনার সৈনিকদের থামান। আপনার ঘোড়া আপনি ফেরত পাবেন। তবে এর জন্য আপনাকে বড় একটা মূল্য দিতে হবে।”
রাণী -"এর জন্য আমি যেকোন কিছু দিতে প্রস্তুত আছি।"
সম্রাট- "জায়গীরদারী এবং উপাধীও?"
রাণী- "আমার কাছে এসবের কোন মূল্য নেই।"
সম্রাট- "আপনার রাজ্যও?"
রাণী- "হ্যাঁ, সেটাও।"
সম্রাট- "একটা সামান্য ঘোড়ার জন্য?"
রাণী- "না, যেটি পৃথিবীতে সবচেয়ে দামী, তার জন্য।"
সম্রাট- "কী সেটা?"
রাণী- "আমার সম্মান।"
এভাবে রাণী একটি ঘোড়ার জন্য তাঁর বিশাল ভূখণ্ডের জায়গীর, রাজ্য, এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মর্যাদা হারালেন। ভবিষ্যতের পথে কাঁটা বিছিয়ে দিলেন। এরপর থেকে চাম্পাত রাই আর কখনও থিতু হতে পারলেন না। রাজা চাম্পাত রাই আবারও ওরাক্কার দূর্গে ফিরে গেলেন। জায়গীরদারী এবং উপাধী হারিয়ে তিনি অত্যন্ত অসুখী হয়ে পড়লেন। কিন্তু অভিযোগ করে টু শব্দটিও করলেন না। তিনি খুব ভালো করেই স্বারন্ধার স্বভাব জানতেন। এ সময় কোন ধরনের অভিযোগ করলে তিনি মনে কষ্ট পাবেন। তাঁর মর্যাদায় আঘাত লাগবে।
কিছুদিন শান্তিতেই কাটলো। কিন্তু সম্রাট স্বারন্ধার রূঢ় ভাষ্য ভুলতে পারলেন না। তিনি ‘ক্ষমা’ কী, তা জানতেন না। তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করেই চম্পাত রাইয়ের অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে বিশাল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিলেন। এই অভিযানের জন্য বাইশ জন অভিজ্ঞ সেনানায়ক নিয়োগ দিলেন। শুভকরণ বুন্দেলা ছিলেন সম্রাটের গভর্নর। তিনি ছিলেন চাম্পাত রাইয়ের বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী। চম্পাত রাইকে পরাস্ত করার দায়িত্ব তিনিই নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। আরো অনেক বুন্দেল সেনাপতি রাজার বিরুদ্ধে গভর্নরের সঙ্গে যোগ দিলেন। আর একটা যুদ্ধ হলো। ভাইয়ে ভাইয়ে নিজেদের রক্তে তলোয়াড় রঞ্জিত করলো। যদিও রাজা যুদ্ধে জিতে গেলেন তবুও তার শক্তি চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেল। ভূখণ্ড বুন্দেল রাজাগণ সম্রাটের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য লালায়িত হয়ে পড়লেন। বন্ধুদের মধ্যে কেউ বিশ্বস্ত রইলেন। আবার কেউ কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এমনকি আত্মীয়রাও দূরে সরে গেলেন। কিন্তু এমন বিপর্যয় স্বত্ত্বেও চম্পাত রাই সাহস হারালেন না। ধৈর্য ধারণ করলেন। ওরাক্কা ছেড়ে বুন্দেলখণ্ডের গভীর জঙ্গলে তিন বছর লুকিয়ে রইলেন। শিকারি পশুর মতো সম্রাটের সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে ফিরলেন। প্রায়ই রাজা কারো না কারো মোকাবেলা করেন। স্বারন্ধা সবসময় তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। তাঁকে সাহস দেন। গভীর দুর্যোগের সময় যখন তাঁকে হতাশা পেয়ে বসে, ধৈর্য হারিয়ে যায়, তখন সহজাত আত্মশক্তি দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেন। তিন বছর পর সম্রাটের গভর্নরগণ সম্রাটকে বললেন, "আর কেউ নন, কেবলমাত্র সম্রাটই বাঘ শিকার করতে পারবেন।" উত্তরে সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে এনে অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা বলা হলো। রাজা ভাবলেন, সংকট কেটে গেছে। কিন্তু শীঘ্রই এটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হলো।
গত তিন সপ্তাহ ধরে ওরাক্কা অবরোধ করে রেখেছে সম্রাটের সেনাবাহিনী। কড়া কথা যেমন অন্তর ভেদ করে দেয়, তেমনি কামানের গোলাগুলো দূর্গের দেয়ালগুলো গুঁড়িয়ে দিলো। দূর্গে বিশহাজার মানুষ আটকা পড়েছে। তবে তাদের অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। প্রত্যেক দিন পুরুষের সংখ্যা কমতে লাগলো। সবগুলো দরজা বন্ধ করে রাখা হলো। বাতাসও ঠিকমত প্রবেশ করতে পারে না। খাবার পানীয়ের তীব্র সংকট দেখা দিলো। মহিলারা তাদের স্বামী ও বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য নিজেরা খাবার গ্রহণ করা বন্ধ করে দিলো। সবাই প্রচণ্ড হতাশ হয়ে পড়লো। মহিলারা সূর্যদেবতার উদ্দেশে হাত বাড়িয়ে শত্রুসেনাদের অভিসম্পাত করতে লাগলো। রাগে, ক্ষোভে বাচ্চারা দেয়ালের ওপর থেকে শত্রুদের উদ্দেশে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। সেই ঢিলগুলো অবশ্য দূর্গের প্রাচীর অতিক্রম করে না।
রাজা চাম্পাত রাই জ্বরে পড়লেন। অনেক দিন শয্যাশায়ী হয়ে রইলেন। লোকজন তাঁকে দেখে সাহস পায়। কিন্তু তাঁর অসুস্থতায় তাদের মধ্যে হতাশা সংক্রমিত হলো।
রাজা স্বারন্ধাকে বললেন, “আজকে নিশ্চয় শত্রুসেনা দূর্গে ঢুকে পড়বে।"
স্বারন্ধা- "ঈশ্বর মাফ করুন। এমন দিন যেন আর দেখতে না হয়।"
রাজা- "আমার উদ্বিগ্নতা এইসব বিধবা মহিলা ও তাদের বাচ্চাদের নিয়ে। সব গম পোকা খেয়ে ফেলবে।"
স্বারন্ধা- "এখান থেকে পালিয়ে গেলে কেমন হয়?"
রাজা- "এইসব এতিম বাচ্চাদের ফেলে পালিয়ে যাব!"
স্বারন্ধা- "এই মুহূর্তে এদের এখানে রেখে যাওয়াই ঠিক হবে। আমরা এখানে না থাকলে শত্রুরা তাদের প্রতি করুণা দেখাবে।"
রাজা- "নাহ। আমি ওদের ফেলে যেতে পারি না। এই মহিলাদের স্বামীরা আমাদের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আমি ওদের স্ত্রী-সন্তানদের ফেলে যেতে পারি না।"
স্বারন্ধা- "কিন্তু এখানে থেকেও আমরা ওদের সাহায্য করতে পারব না।"
রাজা- "আমরা ওদের সঙ্গে মরব। ওদের রক্ষা করতে জীবন দিয়ে দেব। ওদের জন্য প্রয়োজনে শত্রুদের তোষামোদ করব। ওদের জন্য বরং জেলে যাব। তবুও এই সংকটের মুহূর্তে ওদের ফেলে যেতে পারব না।"
লজ্জায় স্বারন্ধার মস্তক নত হয়ে গেল। ভাবলেন, সত্যিই সহযোদ্ধাদের বিপদের আগুনের মধ্যে রেখে পালিয়ে যাওয়া সংকীর্ণতার পরিচয়। "আমি কীভাবে এতোটা স্বার্থপর হতে পারি"─ তিনি নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "যদি আপনাকে নিশ্চিত করা হয় যে, এদের কোন ক্ষতি হবে না, তাহলে কি আপনি আমার সঙ্গে যেতে একমত হবেন?"
রাজা (একটু ভেবে)─ "কে আমাকে নিশ্চিত করবে?"
স্বারন্ধা- "সম্রাটের সেনাপ্রধানের কাছ থেকে একটি আশ্বস্তপত্র।"
রাজা- "তাহলে আমি সানন্দে তোমার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত।"
স্বারন্ধা এবার গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। কীভাবে আমি আশ্বস্তপত্র পাব? এই প্রস্তাব নিয়ে কে যাবে তাঁর কাছে? আর এই নির্দয় লোকগুলো কেনই বা আমাদের আশ্বস্তপত্র দেবে। ওরা ওদের বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত। কূটনীতিতে দক্ষ কে আছে যে এই কঠিন কাজটি করতে পারে? চাত্রাসাল চাইলে এ কাজ করতে পারে। তার সব গুণই রয়েছে।
এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে রাণী চাত্রাসালকে ডেকে পাঠালেন। তাঁর চার ছেলের মধ্যে সেই সবচেয়ে সাহসী এবং জ্ঞানী। রাণী তাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন। চাত্রাসাল দেখা করতে এলে রাণীর সুন্দর চোখ দু’টো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। হৃদয়ের গভীরে বেদনা জেগে উঠলো।
চাত্রাসাল- "মা, আমার প্রতি আপনার কী আদেশ?"
রাণী- "আজকে যুদ্ধের খবর কী?"
চাত্রাসাল- "আমাদের পঞ্চাশজন সেনা প্রাণপাত করেছেন।"
রাণী- "বুন্দেলের সম্মান ভগবানের হাতে।"
চাত্রাসাল- "আজ রাতে শত্রুর ডেরায় হানা দেব।"
রাণী তার কাছে সংক্ষেপে তাঁর প্রস্তাবের কথা পেশ করলেন। বললেন, "এ কাজ করতে আমি কাকে বলব?"
চাত্রাসাল- "আমি করব এ কাজ।"
"তুমি কী এ কাজ করতে পারবে?"
"হ্যাঁ, আমার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস রয়েছে।"
"ঠিক আছে, তাহলে তুমিই যাও। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। চাত্রাসাল যেতে উদ্যত হলে রাণী তাকে আলিঙ্গন করলেন। দু’হাত উঁচিয়ে বললেন, ওহে দয়াময় ভগবান, আমি আমার তরুণ, বুদ্ধিদীপ্ত পুত্রকে বুন্দেলের সম্মানে নিবেদন করলাম। এবার এই মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আপনার। আমি আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস দান করলাম। গ্রহণ করুন।"
পরের দিন সকালে স্নান সেরে স্বারন্ধা একটি থালায় পূজার অর্ঘ্য নিয়ে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁর মুখমন্ডল হলুদ হয়ে গেছে। সামনে শুধুই অন্ধকার। মন্দিরের ফটকে পৌঁছতে না পৌঁছতেই একটি তীর তার থালায় এসে পড়লো। তীরের আগায় এক টুকরো কাগজ গাঁথা রয়েছে। স্বারন্ধা থালাটা মন্দিরের মেঝেতে রেখে কাগজের টুকরোটি খুললেন। তাঁর চোখমুখে আনন্দের আভা ফুটে উঠলো। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। হায়! আমি এই এক টুকরো কাগজের বিনিময়ে আমার সন্তানকে হারালাম! এক টুকরো কাগজের এতটা মূল্য কে দেয়?
মন্দির থেকে ফিরে স্বারন্ধা তাঁর স্বামী চম্পাত রাইয়ের কাছে গেলেন। বললেন, প্রিয়তম, এবার তুমি তোমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করো। রাজা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি তোমার প্রতিজ্ঞা রেখেছো?" রাণী তাঁকে আশ্বস্তপত্র দেখালেন। চম্পাত রাই নিবিড়ভাবে পত্রটি পড়লেন। এরপর বললেন, "এবার আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারি। ভগবান চাইলে শত্রুদের জয় করব। কিন্তু স্বরণ, আমাকে সত্য কথাটা বল দেখি। এই চিঠিটির জন্য কত মূল্য তোমাকে দিতে হয়েছে?" নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে রাণী উত্তর দিলেন "অ নে ক।"
রাজা- "তা কি আমি জানতে পারি?"
রাণী- "একজন যুবক সন্তানকে।"
রাজা যেন শরবিদ্ধ হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, "কে? অঙ্গাদ রাই?"
রাণী- "নাহ।"
রাজা- "রতন শাহ?"
রাণী- "নাহ।"
রাজা- "চাত্রাসাল?"
রাণী- "হ্যাঁ।"
শরবিদ্ধ হওয়ার পর পাখি যেমন ছেটফট করতে করতে প্রাণপাত করে, ঠিক তেমনি কথাটা শুনে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে আবারও পড়ে গিয়ে রাজা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। চাত্রাসাল ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। তাঁর সব ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিল তাঁকে ঘিরে। জ্ঞান ফিরে এলে বললেন, "স্বরণ, তুমি এক ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছো।"
তখন গভীর নিকষ কালো রাত। রাণী স্বারন্ধা চম্পাত রাইকে একটা পালকিতে নিয়ে গোপন পথে দূর্গ থেকে বেরিয়ে গেলেন। অনেক দিন আগের একটি রাত এমনই দীর্ঘ, অন্ধকার ছিল। সে রাতে স্বারন্ধা শীতলা দেবীকে কিছু কড়া কথা শুনিয়েছিলেন। শীতলা দেবী সেদিন যা বলেছিলেন, আজ তা ফলে গেল। সেদিন শীতলাদেবীকে স্বারন্ধা যা বলেছিলেন, আজকে কি তা তিনি পূরণ করতে পারবেন?
তখন দুপুর। মাথার উপরে সূর্য আগুন বর্ষণ করছে। নির্দয় ঝলসে দেওয়া উষ্ণতা বন, পর্বতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। যেন আগুনের দেবতা তার সব শক্তি নিয়ে ধরণীতে নেমে এসেছেন। আকাশটা ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। স্বারন্ধা একটা ঘোড়ায় চড়ে রাজা চাম্পাত রাইয়ের সঙ্গে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। ওরাক্কা এখন বিশ মাইল পেছনে। প্রতিটি মুহূর্তে তাঁরা মনে করছেন যে, তাঁরা বিপদ থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছেন। রাজা পালকিতে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছেন। বেয়ারাদের শরীর ঘামে ভিজে গেছে। পাঁচজন ঘোড়সওয়ার তাদের অনুসরণ করছে। ওরা সবাই প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত। ওদের মুখের তালু পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। ওদের চোখ ব্যাকুল হয়ে বৃক্ষরাজির ছায়া ও জলের কূপ অণ্বেষণ করছে।
হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে স্বারন্ধা কয়েকজন ঘোড়সওয়ারকে তাঁদের দিকে আসতে দেখলেন। ভাবলেন, খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। ওরা অবশ্যই আমাদের শত্রু হতে পারে। আবার আমাদের ছেলেরাও তাদের সৈন্যসামন্ত নিয়ে আমাদের সাহায্য করতে আসতে পারে। হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিতে কারোই আশা হারানো উচিত নয়। কয়েক মিনিট তিনি আশা ও ভীতির মাঝখানে দোলাচলে দুলতে লাগলেন। ওরা এতোটাই কাছে চলে এলো যে, ওদের পরনের পোশাক-আশাক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। রাণী হতাশায় দীঘশ্বাস ছাড়লেন। তাঁর সারা শরীর ঘাসের মতো কেঁপে উঠলো। আসলে ওই ঘোড়সওয়াররা সম্রাটের সেনাবাহিনীর লোক।
স্বারন্ধা পালকিবাহকদের থামতে বললেন। বুন্দেল সৈনিকরা তাঁদের তলোয়ার বের করলেন। রাজার অবস্থা তখন নাজুক। ছাইচাপা আগুন যেমন মৃদু বাতাসে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, তেমনি সংকট দেখে রাজা তাঁর ভগ্ন শরীরের আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠলেন। পর্দাটা তুলে পালকি থেকে বেরিয়ে এলেন। তীর-ধনুক টেনে বের করে নিলেন। কিন্তু যে ধনুক একসময় তাঁর হাতে ইন্দ্রের বজ্রে পরিণত হতো, সেটি আর এবার বাঁকা হলো না। তাঁর মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। পা দু’টো কাঁপতে লাগলো। তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। জানতেন, এবার কী ঘটতে যাচ্ছে। ডানা-ভাঙ্গা পাখি তার দিকে সাপকে ছুটে আসতে দেখলে যেমন ছটফট করে, রাজা চম্পাত রাইও সেভাবে উঠে দাঁড়িয়ে আবারও পড়ে গেলেন। স্বারন্ধা তাঁকে স্থির করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। শোরগোলের মধ্যে তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন। কিন্তু শুধু বললেন, “প্রিয়তম”। আর একটা কথাও বলতে পারলেন না। স্বারন্ধা যিনি মর্যাদার জন্য মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করতে প্রস্তুত, তিনি একজন সাধারণ নারীর মতো শক্তি হারিয়ে ফেললেন।
চম্পাত রাই বললেন. "স্বরণ, দেখ আমাদের আরেকজন যোদ্ধা মারা গেল। হায়! সারাটা জীবন আমি যে বিষয়টাকে ভয় পেয়েছি, শেষ পর্যন্ত সেটিই আমার সামনে এসে পড়েছে। আমার চোখের সামনে শত্রুরা তোমার কোমল শরীরে আঘাত করবে আর আমাকে নিষ্ক্রিয়ভাবে তা দেখতে হবে। হায়! কখন যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব!" এবার স্বারন্ধাকে বললেন, "প্রিয়তমা, অনেকবার তুমি আমার সম্মান বাঁচিয়েছো।"
এ কথা শুনে স্বারন্ধার মলিন মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। দু’চোখের অশ্রু শুকিয়ে গেল। তার হৃদয়ের কোণে জমে থাকা এক চিলতে আশায় এবার তাঁর স্বামী শক্তি সঞ্চার করলেন। রাজার প্রতি আশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, "ভগবান চাইলে আমি আমৃত্যু আমার কথা রেখে যাব।" রাণী ভাবলেন, রাজা তাঁর প্রাণবিসর্জনের প্রতি ঈঙ্গিত করছেন।
চম্পাই রাই- "তুমি কখনও আমার অনুরোধ প্রত্যাখান করোনি।"
স্বারন্ধা- "আমি জীবনে কখনও তা করিনি। আমৃত্যু করব না।"
চম্পাই রাই- "এটি আমার শেষ অনুরোধ। ফিরিয়ে দিও না।"
স্বারন্ধা তলোয়ার বের করলেন। বুকের ওপর রেখে বললেন, "এটি আপনার আদেশ নয়, এটি বরং আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আমি যেন আপনার পায়ে মাথা রেখে মরতে পারি।"
চম্পাত রাই- "তুমি আমার কথা ঠিক বুঝতে পারো নি। তুমি কি আমাকে শত্রুর হাতে ছেড়ে দিতে চাও যারা আমার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দিল্লিতে নিয়ে যাবে?"
রাণী তাঁর দিকে কৌতুহল নিয়ে তাকালেন। তিনি রাজার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন না।
রাজা- "আমি তোমার আশীর্বাদ চাই।"
রাণী- "দয়া করে বলুন।"
রাজা- "এটিই আমার শেষ অনুরোধ। আমি যা বলব তুমি কি তা শুনবে?"
রাণী- "যেকোন মূল্যে আমি তা করব।"
রাজা- "দেখ, তুমি কিন্তু প্রতিজ্ঞা করেছ। ভাঙ্গবে না।"
রাণী- ("কাঁপতে কাঁপতে) শুধু বলে দেখুন। সঙ্গে সঙ্গে এর বাস্তবায়ন করব।"
রাজা- "তোমার তলোয়ারটা আমার বুকে ঢুকিয়ে দাও।"
রাণী- "যেন বজ্রাহত হলেন। বললেন, প্রিয়তম। তিনি আর কথা বলতে পারলেন না। তাঁর চোখেমুখে হতাশা ফুটে উঠলো।"
রাজা- "আমি বাঁচতে চাই না। আমার হাতে হাতকড়া পড়াক সেটি আমি চাই না।"
রাণী- "এ কাজ আমি কীভাবে করব?"
এতক্ষণে তাদের পঞ্চম ও শেষ সৈনিকও মারা গেল।
রাজা বিরক্ত হয়ে বললেন, "আমাদের মর্যাদার জন্য তুমি সবকিছু করতে পার বলে যে গর্ব করতে এখন তা কোথায় গেল?"
সম্রাটের সৈনিকরা রাজার দিকে ছুটে এলেন। রাজা হতাশায় রাণীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাণী দ্বিধান্বিত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু সংকটের সময় আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি বেড়ে যায়। যখন সৈনিকরা রাজাকে এই ধরে ফেলবেন বলে, ঠিক সেই মুহূর্তে স্বারন্ধা বিদ্যুৎগতিতে তাঁর তলোয়ার রাজার বুকে গেঁথে দিলেন।
প্রেমের তরী প্রেমের সাগরে তলিয়ে গেল। রাজার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। কিন্তু তার চোখে-মুখে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়লো। মানুষের হৃদয়ের মতিগতি এমনই! যে মহিলা গতকাল পর্যন্ত তাঁর স্বামীর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলেন, তিনিই আজ তাঁকে হত্যা করলেন। যে হৃদয় আলিঙ্গনে সুখ পেতেন, যে হৃদয়ে তাঁর সব আশা-আকাঙক্ষা ঘর বেঁধেছিল, যে হৃদয়ে তার সব অহংকার আশ্রয় নিয়েছিলো, সেই হৃদয়কেই স্বারন্ধার তলোয়ার বিদীর্ণ করে দিলো! কোন মহিলার তলোয়ার কখনও কি এমন করেছে?
আহা, আত্মঅহংকারের করুণ পরিণতি! উদয়পুর ও মারওয়ারের ইতিহাসে এমন ঘটনা আপনারা আর কোথাও দেখবেন না।
স্বারন্ধার সাহসিকতা ও ধৈর্য দেখে সম্রাটের সৈনিকরা অবাক হয়ে গেলো। সৈন্যদের প্রধান এগিয়ে এসে বললেন, "রাণী সাহেবা, খোদা সাক্ষী, আমরা আপনার খেদমতে হাজির। আপনি যা বলবেন, আমরা তাই করব।" স্বারন্ধা বললেন, "আমাদের ছেলেদের কেউ যদি বেঁচে থাকে, তাহলে তাঁর কাছে এই দুটি মৃতদেহ হস্তান্তর করবে।"
এ কথা বলে তিনি তার তলোয়ার নিজের বুকে ঢুকিয়ে দিলেন। যখন তাঁর প্রাণহীন দেহটি লুটিয়ে পড়লো তখন তাঁর মাথাটা রইলো চম্পাত রাইয়ের বুকে।
*****
লেখক পরিচিতি: মুন্সি প্রেমচাঁদ এর আসল নাম ধনপাৎ রাই শ্রীবাস্তব। ১৮৮০ সালের ৩১শে জুলাইয়ে বারানসীর কাছে রামাহিতে তাঁর জন্ম। হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যে তাঁর অবদান বিস্তর। ব্রিটিশ শাসিত ভারত উপমহাদেশে প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব তিনি। তাঁর ছোটগল্প সংকলন সজ-এ-ওয়াতান প্রকাশের পর ১৯১০ সালে জামিরপুর ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর এই গ্রন্থ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। অভিযোগ─ গ্রন্থটি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে উস্কে দিতে পারে। তিনি নবাব রাই ছদ্মনামে উর্দু ভাষাতেও লিখেছেন। হিন্দি সাহিত্যে রিয়েলিজম বা বাস্তববাদ প্রবর্তনেও তিনি অগ্রগণ্য সাহিত্যিক। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি সরকারী চাকুরিকে ইস্তাফা দেন। সাধারণ মানুষের ভাষায় এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সব ইস্যু, যেমন দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র, অশিক্ষা, কুসংস্কার, ঔপনিবেশিকতা ইত্যাদি বিষয় হিন্দি ও উর্দু ভাষায় রচিত সাহিত্যের আখ্যানে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও প্রাসঙ্গিকভাবে নিয়ে আসেন। তিনি সিনেমা ও টেলিভিশনেও কাজ করেন। সত্যজিত রায় তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে সদ্গতি ও সাতরঞ্জি কে খিলাড়ি সিনেমা নির্মাণ করেন। ১৯৩৬ সালের ৮ই অক্টোবর তারিখে মুন্সি প্রেমচাঁদ মারা যান।
অনুবাদক পরিচিতি: এলহাম হোসেন একাধারে গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচক। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এম.ফিল. করেছেন ঔপনিবেশিক সাহিত্যে। পিএইচডি করেছেন আফ্রিকান সাহিত্যে। এ যাবত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৮। ইংরেজি ভাষায় রচিত তার তিনটি গ্রন্থ মুম্বাই ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন চিনুয়া আচেবের থিংস ফল এপার্ট, বেন ওকরির দি ফ্রিডম আর্টিস্ট, সাজ্জাদ জহিরের রোশনাই এবং আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের বেশকিছু সংখ্যক ছোটগল্প। বাংলা ভাষায় রচিত তার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধের সংখ্যা একশোর বেশি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে ছাপা হয়েছে ৪০ টির অধিক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ। আফ্রিকার সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, দর্শন, নৃতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান, উত্তর - ঔপনিবেশিক সাহিত্য তার আগ্রহের বিষয়। বর্তমানে গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করছেন।
*****

0 মন্তব্যসমূহ