ক.
সকালের রোদ তেজ ছড়ানোর আগেই কুঁজো ঘাড় আরও কুঁজো করে বেরুতে হলো সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনকে। জৈষ্ঠ্যের সকাল বলে কথা। একটু বেলাতেই রোদের গা থেকে ছিটকে বেরুতে থাকে ছেঁকা দেওয়া ঝলকানি। একটা ছাতা থাকলেও হতো। সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন বছর ঘুরেও ছাতা কেনার টাকা আর একসাথ করতে পারেনি। পারবে কোত্থেকে? আজ এটা, কাল ওটা, পরশু সেটা করে করেই তো সময় নামক গাড়িটা ঠেলে নিয়ে যাওয়া। না, ঠিক ঠিক সামনে যাওয়া নয়। নিঃশব্দে পিছিয়ে যাওয়াই হয়তো তার ভবিতব্য।
এই পিছিয়ে যাওয়া নিয়ে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের কোনো খেদ আছে বলে মনে হয় না। ছিলোও না কোনোকালে। মুদির দোকানটার সাথে বসতভিটাও ভেঙে দেয়ার পর থেকে ভোর ভোর ঘর ছেড়ে দূরের মুনিষের হাটে অনেকের ভিড়ে নিজেকে পণ্য বানিয়ে বিড়ি কিংবা কমদামী সিগারেট টানার ফাঁকফোকরে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়াই আবিদার বাপের নিয়তি। এছাড়া কিছু করারও কি ছিলো? ছিলো না। দিনমজুরি শেষে যা পায় তাই দিয়ে সন্ধ্যায় বাজারঘাট সেরে আবিদার বাপের বাড়ি ফেরাতেই সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের স্বস্তি। বাজারঘাট যাই আনুক না কেন, আবিদার বাপ তো ফিরেছে। সারাদিন চাতালে মুনিষ খেটে নিজে যা পায়, তা দিয়ে ডাল ভাত খাওয়া চলে। কিন্তু জীবন তো আর শুধু ডাল ভাতেই শেষ হয়ে যায় না? আবিদার স্কুলের বেতন, খাতাকলম, সবুজের মাদরাসার বেতন, ঘর ভাড়া এসবও তো লাগে। গুড়িয়ে দেওয়া ঘরটা খাড়া করাও তো বড় কাজ। আর ঘর খাড়া করা কি চাট্টিখানি কথা! বাঁশ কিনো, চাটাই কিনো, দড়িরশি কেনো, টিন কেনোÑ হোক সে পুরনো, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের এযে কতো বড় ধকল তা কি অন্য কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব? আবিদার বাপের আয়রোজগারটা নিয়মিত হলেও হতো। তাতো হবার নয়। সেতো আর সবদিন কাজ পায় না। পাবে কোত্থেকে? রোগা পাতলা চেহারার মানুষকে মুনিষ হিসেবে কে নিতে চায়! যেদিন মুনিষের হাটে খরিদ্দার বেশি থাকে সেদিনই ডাক পড়ে আবিদার বাপের। তা না হলে সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে আবিদার বাপের খালি হাতে বাড়ি ফেরা! সেদিনের খাবারের ভরসা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন। তখন কোনোক্রমে এটাসেটা দিয়ে চালিয়ে নেওয়া।
সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের যখন বিয়ে হয় তখন তার বয়সই আর কতো! ফ্রগের গলার কাছে কাপড়ের ঘন কুঁচিতে বুকের স্ফিতি ঢেকে রাখার বয়সও ঠিকঠাক হয়নি। তবে দৌড়ানোর সময় ফ্রগের ঘন কুঁচি বাতাসের ঝাপটায় সরে গেলে স্পষ্টত বোঝা যেতো মেয়ে ডাঙ্গর হয়ে উঠেছে। এদিকে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন ঋতুবতী হয়েছেও প্রায় বছর তিন আগে। সেদিনের কথা মনে হলে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন এখনও ভয়ে আঁতকে ওঠে। মায়ের দেয়া সাহস আর পরামর্শ সেদিন পাশে না থাকলে কীযে হতোÑ আর ভাবতে পারে না সে।
মুহাম্মদ আলী হোসেন পড়ালেখা তেমন করতে পারেনি। বাড়ির কাছে সরকারি প্রাইমারি স্কুল থাকায় কোনোক্রমে ক্লাস ফাইভ ডিঙ্গিয়েছে। বাবার নির্লিপ্ততায় প্রাইমারি স্কুলের পাশে থাকা জুনিয়র হাই স্কুলে বসার আর সুযোগ পায়নি। ফলে মুহাম্মদ আলী হোসেন পঞ্চম শ্রেণি পাস পর্যন্তই থেকে গেলো। একারণে বুদ্ধির দৌড়ে সে বারবারই হেরে গেছে। মসজিদ কমিটির সভাপতি হাফেজ শেখ মুহাম্মদ রব্বানী আর খতিব মাওলানা মুহম্মদ আলী আকবর যখন গায়ে পড়ে মুহাম্মদ আলী হোসেনকে মেয়ের বিয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, হোসেন মিয়া, মেয়ে তো ডাঙ্গর হইছে, এবার বাবার দায়িত্ব পালন করো। মেয়ে বেশিদিন ঘরে রাখার দরকার নাই, আর মেয়ের এত পড়াশুনাইর বা কী দরকার, সংসারজীবনে মেয়েদের এত পড়াশুনা কোন কাজে লাগে? একটু আধটু টাকা পয়সার হিসাব রাখতে পারলেই হলো। সে তোমার মেয়ে প্রাইমারির যে কয় ক্লাস পড়েছে তাতেই চলবে। এখন দেখেশুনে দিয়ে দাও। বাবার কাছে মেয়েকে বেশিদিন রাখতে নাই, জানো তো। না-কি?
সভাপতি-খতিবের সামনে মুহাম্মদ আলী হোসেন কী আর বলবে! ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়ে সরে আসে।
গরিবের পাত্র খুঁজে পেতে বেশি দূর যেতে হয় না। একে ওকে বলে কদিনেই পাওয়া গেলো মুদি দোকানী আলী আফসারকে। সে আবার মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের উত্তেজনা তখনও গা থেকে মুছে যায়নি। এরই মধ্যে পঁচাত্তরে পট পরিবর্তনের কারণে আলী আফসার নিজের ভেতর গুটিয়ে আসে। কী করবে আর কী না করবে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি তার। পিতার মৃত্যু, মায়ের অসুস্থতা, বেকারত্ব, স্বপ্নভঙ্গের হতাশা, অনেকটা সহায়সম্বলহীন জীবন নিয়ে সারাক্ষণ মানুষ থেকে দূরে থাকতে থাকতে কীভাবে এতোটা বয়স হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি আলী আফসার। ছোট্ট মুদি দোকানটায় বসে কেবলই টুকটাক বেচাকেনার বাইরে সকলকে এড়িয়ে চলার ভেতর দিয়ে নিজের মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়টি একান্ত ব্যক্তিগত মনে করে। একারণে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের তুলনায় পাত্র হিসেবে বয়স একটু বেশিই। ৩৫/৩৬ তো হবেই। হোক। গরিবের এতো কিছু দেখলে হয় না। দোকান একটা যখন আছে, আয় রোজগার কিছু না কিছু হবেই। চারটে ভাত ঠিকঠাক খেতে পারলেই হলো। প্ররোচনা আর পরামর্শ যাই বলা হোক না কেন সুমাইয়ার বাবা মুহাম্মদ আলী হোসেন অল্পবয়সেই মেয়েকে বিয়ে দিতে সম্মত হয়ে যায়।
সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের যখন বিয়ে হয় তখন লে. জে. আলহাজ্ব হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সামরিক সরকারের অধীনে ৭ মে ১৯৮৬-র নির্বাচন বয়কট করলেও আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি রাজাকার, আল বদর, আল শামসের দল জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। না নিয়ে করবে কী! ওদিকে বিএনপি সুযোগ পেলেই জামাতকে খপ করে ধরে নিজেদের ঘরে তুলে নেয়ার জন্য ওঁৎ পেতে আছে। জনধারণা, জামায়াত যে দলের সাথে নির্বাচন করবে, সেদলই ক্ষমতায় যাবে। এদিক থেকে বিএনপির দাবি ষোলো আনা। কারণ তারাই একাত্তরের পর রাজাকার, আল বদর, আল শামসের দলটি যখন দেশে বিদেশে কাদা পানিতে মুখ ডুবিয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টায় প্রাণাতিপাত করছিলো, তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহান জিয়াউর রহমানই জামায়াতকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার লাইসেন্স দিয়েছিলো। অতএব, বিএনপি জামায়াতকে ঘরে পাবে এরকম প্রত্যাশা শতভাগ অধিকারের মতো। কিন্তু নির্বাচনী খেলায় আওয়ামী লীগের কাছে পরাজয় মেনে নিতে না পেরে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন বয়কট করলেন, হয়ে গেলেন আপসহীন নেত্রী।
নির্বাচনী খেলায় বিএনপি হারলেই কি আর জিতলেই কিÑ এতে আলী আফসারের কিচ্ছু আসে যায় না। তার তো লাভালাভের কোনো বিষয় নেই। তবে বিষয় একটা আছে। ঐ ঘাতক দালাল রাজাকার, আল বদর, আল শামস। পুরো বিষয়টিকেই আলী আফসার তার ছোট মাথার ছোট বুদ্ধিতে মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের থিতিয়ে পড়া তেজের উত্তাপ তাকে আড়মোড় ভেঙে দাঁড় করিয়ে দেয়।
২০০১-এ যখন আবার নির্বাচন, দ্বারে দ্বারে প্রার্থীদের ভোটভিক্ষার তোড়জোড়, তখন আলী আফসার মনে করার চেষ্টা করে ১৯৮৬র নির্বাচনে সে ভোট দিয়েছিলো কি-না। হুট করে কোনো স্মৃতি তার চেতনায় ধরা পড়ে না। তবে আর পাঁচজনের সাথে ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিলো এটুকু বেশ মনে আছে। কেন্দ্রে ঢুকেছিলো কি? ব্যালট হাতে খুপরি ঘরে? তাও হয়তো করেছিলো। এখানে এসে আটকে যায়। স্মৃতি কেবল জট পাকাতে থাকে। জট আবার খুলতেও থাকে। মনে পড়ে। না, ১৯৮৬-র নির্বাচনে কাউকেই সে ভোট দেয়নি। ব্যালটের বুকে নৌকা, লাঙল, দাড়িপাল্লা আর সব কী কী যেন ছিলো। ব্যালট পেপারটি আড়াল-ঘরের টেবিলে বিছিয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে ছিলো আলী আফসার। নৌকা, লাঙল, দাড়িপাল্লা...। কাকে ভোট দেবে? নৌকাÑ জামায়াতের নির্বাচনী মদদ দাতা, লাঙলÑ স্বৈরাচারী এরশাদ, দাড়িপাল্লাÑ মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘৃণিত রাজাকার-আল বদর-আল শামস। ওয়াক করে একটা দলা পাকানো থুথু পাল্লার ঠিক মাঝ বরাবর ছিটিয়ে দিয়েছিলো। স্পষ্ট মনে করতে পারছে, কোনো প্রকার সিল না দিয়েই থুথু ছিটানো ব্যালট পেপারটি ভাঁজ করে বাক্সে ফেলেছিলো। ব্যালট পেপারটি বাক্সে ফেলার আগে কি পায়ের গোড়ালি দিয়ে থেতলে দিয়েছিলো। হ্যাঁ, দিয়েছিলো। তাও মনে পড়ে আলী আফসারের।
বিকাল ৫টার পর ভোট গণনা শুরু হলে বেশকিছু বাতিল ব্যালটের ভেতর গণনাকারীদের একজন থুথু ছিটানো ব্যালটটি খুঁজে পেয়ে সবাইকে দেখিয়ে বলেছিলোÑ এই ব্যালটটিতে কোনো সিল নেই। তবে ভাঁজ করা ব্যালটের দাড়িপাল্লায় আঠা মাখানো। হতে পারে ভোট দাতা রাগে বা ক্ষোভে কফ বা কাশি দিয়ে গেছে।
বিষয়টি এখানে থেমে গেলে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন নির্বাচন পরবর্তী সকলের মুখরোচক আলোচনা থেকে রেহাই পেয়ে যেতো। তা হওয়ার কি আর জো আছে? স্বামী আলী আফসার একজন মুক্তিযোদ্ধা। হোক গরিব গোবেচারা ছোট্ট মুদি দোকানের মালিক। গরিব গোবেচারা হয়ে থাকুক এতে কারো আপত্তি নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মেনে নিয়েই তো জামায়াতে ইসলামী কৌশল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচনের মাঠে নেমেছে। ভোটের খেলায় মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে পেরেছে। এটাকেই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিজয় বলে ধরে নিয়েছে। নেবে না কেন? মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে তো দেশে বিদেশে পালিয়ে পালিয়ে কোনোক্রমে জীবন নিয়ে বেঁচে ফিরেছে। আর এখন আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এতে জামায়াতে ইসলামী তো বগল বাজাতেই পারে। তাছাড়া পাকিস্তান ভাগের একমাত্র ক্রিমিনাল শক্তি আওয়ামী লীগকে জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে এতো মহাপ্রাপ্তি!
নির্বাচনী ফল যাই হোক, আওয়ামী লীগের ৭৬ আসনের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর ১০। এও তো কম নয়! তবে গোল বাদল ঐ একটি ভোট। বিষ ফোঁড়ার মতো বিঁধছে জামায়াতে ইসলামীর সকল নেতা কর্মীর পাছায়। কোথাও বসতে দিচ্ছে না। কে এমন কাÐ ঘটাতে পারে? দাঁড়িপাল্লায় থুÑ। থুথু পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারছে না জামায়াতের নেতা কর্মীরা। কীভাবে করে! পুরাটা বলতে গেলে যে দলের আমীর গোলাম আযম, সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীসহ কামারুজ্জামান, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মুজাহিদ অনেকের মুখই ভেসে উঠে।
এরই মধ্যে শুরু হলো তল্লাশি। দাঁড়িপাল্লায় থুথু দেয়াÑ না, এটা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা করবে না। এরা তো নিজেদের স্বার্থেই জামায়াত ইসলামীকে নির্বাচনে সাথে নিয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিÑ টিকে থাকার লড়াইয়ে ভোট নষ্ট করবে না। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী)Ñ কয়েকটি আসনের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ মুসলিম লীগÑ ওরা তো স্বজাতি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (রব)Ñ কোনোক্রমে অন্যের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে চলার চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (শাহজাহান সিরাজ)Ñ রবের মতোই মরিয়া। বাকি যে কয়টি আছে সেগুলো ধর্তব্যের মধ্যে নিতে নারাজ জামায়াতে ইসলামী। তবে? নিশ্চয়ই সকল দলের বাইরের কেউ হবেÑ এরকম অনুমান নিয়েই মাঠে নামে জামায়াতে ইসলামী।
এঘর ওঘর করে করে দিন চার খুঁজে দেখার পরও কাউকে সন্দেহের কাতারে আনতে পারছিলো না জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। এমনি অবস্থায় শিবিরের এক ছোকরা জোড়ালো কোনো কারণ ছাড়াই সন্দেহের তীর ছুঁড়ে আলী আফসারের দিকে। তবে ছোকরার সন্দেহে অনেকে যুক্তিও খোঁজার চেষ্টা করে। এলাকার সব মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগ বিএনপি জাতীয় পার্টিতে ভিড়ে গেলেও আলী আফসারকে কেউ কোনোদিন কোনো দলীয় পতাকার নিচে দেখতে পায়নি। বরাবরই গোবেচারা গোবেচারা হয়ে থেকে গেছে। তবে আলী আফসারের ভেতরকার মুক্তিযোদ্ধার তেজ সময়ে অসময়ে অনেকের কাছেই কারণে অকারণে প্রকাশ পেয়ে যায়। সেই কি তবে জামায়াতে ইসলামীকে ঘৃণা করতে গিয়ে ব্যালটে থুথু ছিটালো! হতেও পারে। তার তো ঘৃণা প্রকাশের কোনো সুযোগ কখনো আসেনি। গোপন কক্ষে, সকলের আড়ালে ব্যালটের বুকে আঁটকে থাকা দাড়িপাল্লায় ঘৃণা প্রকাশের সুযোগটা ছাড়বে কেন আলী আফসার। শুধু কি ধুথু! ব্যালটে দাড়িপাল্লার নিক্তিটা যে কুঁচকানো ছিল এটাও তো অনেকের চোখে পড়েছে। থুথু দেয়ার আগে হয়তো ব্যালটটি পায়ের নিচে ফেলে গোড়ালি দিয়ে চেপে ধরে দাড়িপাল্লার জান কবজ করার চেষ্টা করেছে। নইলে দাড়িপাল্লার নিক্তিতে এতো ভাঁজ কেন? ব্যালটটি একেবারে ছিঁড়ে যাবার দশা!
এসব চিন্তা শিবিরের ছোকরার। অন্যদের থেকে সবক্ষেত্রে একটু বেশিও ভেবে বসে। ভাববে না কেন? বাপ জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য। ছোটবেলা থেকেই বাপের হাত ধরে সভাসমিতিতে যাতায়াত। তার তো একটু বেশি বুঝতেই হয়।
একথা সেকথা হয়ে শেষ পর্যন্ত শিবির ছোকরার সন্দেহের দিকেই সকলে থিতু হয়। হ্যাঁ, আলী আফসারই করেছে এই কর্ম। তাকে দেখে নেয়া এখন সকলের দায়িত্ব বইকি।
সেদিন দুপুর থেকেই আকাশ গায়ে কাদা মেখে গুড়–ম গুড়–ম গর্জে উঠছিলো। সন্ধ্যায় টিপটিপ বৃষ্টিতে মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ভ্যাপসা গরমে সকলে যখন ঘামে নেয়ে উঠছিলো তখনই একটি বাজারের ব্যাগ নিয়ে তিন শিবির কর্মী পার্টি অফিসে ঢুকে। এদের চলাফেরা অন্যদের থেকে সবসময়ই আলাদা। এরা শব্দ দিয়ে কথা বলার চেয়ে ইশারাভাষাকেই গুরুত্ব দেয় বেশি। শব্দহীন। অনেকের ভেতরে থেকেও না থাকার একটা কৌশল। তবে এদের সবসময় পার্টি অফিসে দেখা যায় না। অভিজ্ঞদের ভাষায়, বিশেষ কোনো কাজেই ওরা পার্টি অফিসে এসে অনেকের সাথে যোগ দেয়। তবে কি আজই বিশেষ কোনো কাজে যাচ্ছে ইশারাভাষী দল? হবে হয়তো।
সন্ধ্যা গড়ানো আঁধারের সাথে পাল্লা দিয়ে পার্টি অফিসে লোক সমাগমও বাড়তে থাকে। ৫, ১০, ২০ করে করে ৫০ পার হয়ে গিয়েছে সেই কখন। তবে কাজের দিন এইসব ভিড়বাট্টা আমীর সাহেবের একেবারেই পছন্দের নয়। আমীরের কথাÑ কাজ মানে তো অপারেশন। অপারেশন যত নিরবে করা যায় ততই নিখুঁত আর নিরাপদ হয় বই-কি। তবে এসব কথা অনেকেই মানতে নারাজ। বিশেষ করে ’৭১র পর কাদায় নাক ডুবিয়ে থাকা দলটি যখন বলা যায় আইসিইউতে, তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক উদারতায় পুনর্বাসন না করলে আজ কি পার্টি অফিসে এতো লোকের সমাগম হতো! পার্টি অফিসই হতো! প্রথমবার নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েই ১০টি আসন! মানে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ এখন বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদের সদস্য! নেতাকর্র্মীদের ভেতরই কেমন বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে অবিশ্বাসের দানা বাঁধে।
রাত একটু ধরে এলে ইশারাভাষী তিনজনের সাথে আরও চারপাঁচজন গাঁট বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। এবার বাজারের ব্যাগের সাথে যুক্ত হয় রেক্সিনের একটি কালো ব্যাগ। বড়োসড়ো। না-ধরেই বোঝা যায় বেশ ভারী। শিবির ছোকরা দূর থেকে সাতআটজনের চলাফেরায় নজর রেখে কিছুদূর গিয়ে আবার পার্টি অফিসের দিকে ফিরে আসে। যা বোঝার বুঝে গেছে সে।
খ.
মধ্যরাতে আলী আফসারের আঁধার কাঁপানো চিৎকার লম্বা হতে হতে আচমকা থেমে যায়। চিৎকারের গলায় ফাঁস লাগিয়ে দিলে একটা ঝাঁকুনি হওয়ার কথা। হয়েছেও। ইশারাভাষীর একজন কাজটি ঠিকঠাক করতে পেরেছে কি-না তা পরখ করার জন্য অন্যজন এগিয়ে এসে পা দিয়ে আলী আফসারের বুক বরাবর একটা লাথি কষে। লাথিতে আলী আফসার সামান্যই নড়লো। আর শুধু ওয়াক করে একটু শব্দ করলো মাত্র। এর বেশি সামর্থ্য তার এখন আর নেই। হা করা মুখের চারপাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। সাথে রক্তও কি উঁকি দিলো! আলো-আঁধারিতে সবটুকু বোঝা ইশারাভাষীদের সম্ভব নয়। প্রয়োজনও নেই। বরং সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের মুখ ভর্তি কাপড় গুঁজে থাকা গোঙ্গানি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের মেঝেতেই গোঙ্গাচ্ছে সে। তার উপর চেপে আছে ইশারাভাষীদের একজন। তার হয়ে গেলে আর একজনের পালা। হলোও। অল্পক্ষণের মধ্যেই তিন ইশারাভাষীর হয়ে গেলে বিজয়ের তৃপ্তি নিয়ে তারা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনকে ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে।
এভাবে কতক্ষণ সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কিংবা আলী আফসার মাটিতে পড়ে ছিলো তা নিজেরাই জানে না। জানবে কী করে? তাদের কি তখন হুশ ছিলো? একজন বন্য হিং¯্রতা, অন্যজন আদিম উল্লাসের শিকার হয়ে নিস্তেজ, জড় মাংসপিÐ। হুশ রাখে কীভাবে? হুশ যখন হয় তখন তো দু’জন থানা হেলথ কমপ্লেক্সের বারান্দায় পাশাপাশি শুয়ে। একে অন্যের অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করবে সে সামর্থ্যও নেই। কেবল চোখ চাওয়াচাওয়ি।
গ.
২০০১-র সংসদ নির্বাচনের তুমুল আওয়াজ ঘরের দরজায় আছড়ে পড়লেও সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের নিত্যনৈমিত্তিকতায় কোনো ছেদ পড়ে না। পড়বেই বা কেন? সেকি কোনোদিন কাউকে ভোট দিয়েছে? আর দিবেই বা কোত্থেকে! কোনোদিন তো ভোটার তালিকায় নামই লেখায়নি! তবে ভোটের সময় এলেই তার মনে পড়ে ১৯৮৬-র কথা। হেসেখেলে বেড়ানোর বয়সেই বিয়ে হয়েছে মাত্র ক’দিন আগে। তখন না হয় সে ভোটের রাজনীতি কিছুই বুঝতো না। এখন? নিজের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নৃশংসতায় তার চেয়ে আর কে বেশি বুঝে। আলী আফসারও কি বুঝেনি? বুঝেছে। ডান পা যে একটু টেনে টেনে হাঁটে তা কি আর এমনি এমনি! বুঝেছে বলেই সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের প্রতি তার আত্মপরাধের কমতি নেই।
নিজেকে কতোভাবেই না সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করে আলী আফসার। মুক্তিযুদ্ধ তো অনেকেই করেছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার আলবদরের দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগও দিয়েছে। এজন্যে কি তারা সমাজ থেকে খারিজ হয়ে গেলো? তারাও কি রাজাকার আল বদর হয়ে গেলো? না, হয়নি। দীর্ঘকাল গর্তে লুকিয়ে থেকে ১৯৮৬র নির্বাচনে ১০টি আসন পাওয়ার পর ১৯৯১-এ ১৮টি, ১৯৯৬-এ না হয় ৩টি। এতে তো জামায়াতের কোনো দোষ ছিলো না। বিএনপি দেশটাকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি না ভাবলে এতো অপকর্ম কি হতো! তার শিকার বিএনপির পাশাপাশি হলো জামায়াতে ইসলামীও। বিএনপির ১১৬টি আসনের বিপরীতে জামায়াত পেলো মাত্র ৩টি। এযে কতোবড়ো ধাক্কা তা কি জামায়াত টের পায়নি! পেয়েছে। কড়ায় আর গÐায় পুরোপুরি হিসেবে পেয়েছে। আওয়ামী লীগের পাঁচ বছরের শাসনামলে জামায়াত প্রকাশ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এতে অবশ্য সুবিধাই হলো। রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামের চেয়ে গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রমে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পেরেছে দলটি। তার ফলাফলও পেয়েছে। ২০০১-এর নির্বাচনে ১৭টি আসন। হোক ১৯৯১-র চেয়ে একটি আসন কম। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৯৯৬-র ৩ থেকে ১৭টিতে উঠতে পেরেছে এতে জামায়াতে ইসলাম তো স্বস্তি পেতেই পারে। তাছাড়া বিএনপি তো সরকারে থাকলোই।
এসব চুলচেরা হিসাব আলী আফসারের মাথায় থাকার কথা নয়। তবে নির্বাচন শেষে উৎসাহী মানুষদের কথাবার্তা তার কানে এসে আছড়ে পড়লে সে তো আর কান থেকে সহসাই ঝেড়ে ফেলতে পারে না। কিছুদিন কানের ভেতর উপদ্রব হিসেবে থেকেই যায়। এই উপদ্রব থেকে কি আলী আফসার সহজে রেহাই পায়!
এবারের নির্বাচনে আলী আফসারের ভয় এখানেই। ১৯৮৬-র নির্বাচনের সময় সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের বয়স ছিলো ১৩ কি ১৪। এখন তো তার মেয়ে আবিদা বেগম বিনতে আফসারের বয়সও ১৩ কি ১৪। এমনই তো হবে। পোলার বয়স হিসেব করে আর কী হবে?
আবিদা বেগম বিনতে আফসারের বয়স ১৩ হলেই কী আর ১৪ হলেই কী। এই বয়সে মেয়েদের বাড়বাড়ন্ত শরীর বলে যে শরীর থাকার কথা তা তো আবিদা বেগম বিনতে আফসার পায়নি। কী যে এক জন্মবিষণœতা নিয়ে মেয়েটি পৃথিবীতে এসেছে তা একমাত্র খোদাই জানে। এ নিয়ে প্রথম প্রথম সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের হাপিত্যেশের শেষ ছিলো না। শেষে পথ্য কবিরাজ দিয়ে কিছুতেই যখন কিছু হলো না, তখন মেনে নেয়া ছাড়া আর কী করার আছে। তবে বিষণœতা আর রোগাটে শরীর নিয়ে যখন আবিদা বেগম বিনতে আফসার স্কুল পথে মেলা করে, তখন, স্কুলে যাবার ধরনটি সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনকে আছড়ে মারে। এমন হবে কেন? সেকি আমার মেয়ে নয়! আমিও তো অভাব আর অনটনের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি। এরকম রোগাপটকা তো কখনো ছিলাম না। সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন অঙ্ক কষে। ১৯৮৭-র শুরুর দিকে আদিবার জন্ম। গুণে গুণে ১০ মাস পিছন ফিরে দেখতে গিয়ে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন বারবারই অন্যমনস্ক হয়ে যায়। অংকে ভুল করে বসে। না না, তা হবে কেন? আর এগুতে পারে না।
এগুতে না পারলেই কী আর পারলেই কী। ঘটনা যে সেদিন ঘটেছিলো তা তো মিথ্যা নয়। সারা গ্রাম জুড়ে ছিছি পড়ার ভেতর থানা হেলথ কমপ্লেক্সে পড়েছিলো টানা ৫ দিন। ওষুধপত্তর যে কীভাবে কোত্থেকে জোগাড় হয়েছিলো তা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কিংবা আলী আফসার কেউই জানতে পারেনি। জানবে কী করে? তাদের কি তখন সে হুঁশজ্ঞান ছিলো! থানা হেলথ কমপ্লেক্সে থেকে ফেরার পর কানাঘুষার সাথে কত সান্ত¡নার বাণী। নেতার পর নেতা এলো। মাথায় হাত রাখল। কেউ কেউ আলী আফসারের হাতে এটাসেটা গুঁজে দিল। বলল, মামলা করো আলী হোসেন। মামলা করো। আসামী তো সক্কলকেই চিন। মধ্যডাঙ্গার আজিজ রাজাকারের বড় বেটা ইসমাঈল, তার জানি দোস্ত একরাম আর বড়ইবাড়ির আজিজুল। সাথে আর কে কে যে ছিলো তার সবই বেরিয়ে আসবে এই তিন বেটাকে ধরলে।
আলী আফসার মামলা করেনি। কতদিন কত সাহস, কত শলা পরামর্শ ঘুরঘুর করছিলো তার চারপাশে। তবে, কিছুই করেনি আলী আফসার। তার এক কথাÑ হবি না, কিচ্ছু হবি না। মামলা মোকদ্দমায় কিচ্ছু হবি না। আর আমার এতো টাকা কুঠি যে মামলা করবো! তাছাড়া এখন যে এত শলা পরামর্শ, দুদিন পর তো কাউকেই খুঁজি পাওয়া যাবি না। তখন?
আজ এতোদিন পর, আবিদা বেগম বিনতে আফসারের দিকে ভালো করে তাকিয়ে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের বুকটা হু হু করে উঠে। আবিদা, আমি তো পেটে ধরিছি তোকে। তো, তোর বাপ কেরে? বাপ কি তোর আলী আফসার, না-কি ঐ রাতের রাজাকার বেটাগোরের কেউ একজন? ফুঁফিয়ে উঠে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন। আঁচল টেনে জলে ভারি চোখ দু’টি ঢেকে নেয়। জল কি আর বাধ মানে! গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে গালে। গাল থেকে ঠোঁটের কোণায়। নোনতা স্বাদের টপ টপ জল পড়ে ঠোঁটের কোণ থেকে থুতনি হয়ে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের বুকে।
ঘ.
চারদিকের হৈহৈ আর শ্লোগান-সভার মাথায় পা রাখতে রাখতে নির্বাচনের দিনক্ষণ কখন যে আলী আফসার কিংবা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের ঢেড়ার সামনে এসে দাঁড়ালো তা কেউই বুঝে উঠতে পারেনি। রাত পোহালেই ভোট। এদিকে শেষ সময়ের সদব্যবহার করতে সন্ধ্যা থেকেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে নৌকা, ধানের শীষ, দাড়িপাল্লা, লাঙলসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মাঝারি থেকে বড় নেতারা। সবার হাতে লিফলেট। ঘরে ঘরে ডেকে ডেকে চাচা, খালু, মামা শুনছেন, লিফলেটের সাথে ভোটার নাম্বারের ¯িøপ বাড়িয়ে দিয়ে বলছে, আপনার ভোটার নাম্বার ১৭, ৬০৫, ২০৯। সকাল সকাল ভোটটা দিয়া আসবেন। আর কেন্দ্রে আমাদের লোকজন তো থাকবেই। সমস্যা হলে ডাকবেন। বুঝেনই তো, ধানের শীষ, দাড়িপাল্লা, নৌকা সব আমাদেরই। অযথা ভোট নষ্ট না কইরা নৌকা/ধানের শীষে/দাড়িপাল্লাতেই দিয়েন। আর আমাদের জন্য একটু দোয়া কইরেন যাতে আমরা ভালো হয়ে যেতে পারি। আসসালামু আলাইকুম চাচা। আদাব কাকা। তবে সকলকে তো শুধু শুধু সালামকালাম দিয়ে হয় না। নগদানগদিও কিছু দিতে হয়। ভোটের কাঙালেরা তাও দিচ্ছে। ১০০, ৫০০, ১০০০। যাকে যতটুকু না দিলেই নয়।
রাত ভোরের দিকে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলে আলী আফসারের ঢেড়ায় চারপাঁচজনের দল থেকে একজনের লাঠির বাড়ি পড়ে। লাঠির ঘা বুঝি আলী আফসারের পিঠেই পড়ল। হুড়মুড় করে উঠে দরজা খুলতে গিয়ে পাশে শুয়ে থাকা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের পায়ে পা লাগলে ঘুম ভাঙে তারও। আবিদা বেগম বিনতে আফসারের ঘুমও কি ভাঙলো? ভাঙলে ভাঙুক। দরজা তো দরজা, চাটাইয়ের পাল্লাটা একটু সরাতেই একসাথে কয়েকটি টর্চের তীব্র আলো এসে পড়ে আলী আফসারের মুখে। টর্চের তীব্র আলোয় কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না সে। টর্চওয়ালাদের একজনের গলা থেকে বেরিয়ে এলোÑ চাচা, সকালেই তো ভোট। খামাকা ফ্যাসাদ বাড়াইতে যাইয়েন না। আপনি ঘরেই থাইকেন। আপনার ভোট নিয়া চিন্তা করার দরকার নাই।
Ñঠিক আছে বাবা।
Ñহ্যাঁ, ঘরেই থাইকেন।
টর্চওয়ালাদের ভেতর থেকে একজন বললÑ যান, ঘরে গিয়া শুইয়া পড়েন।
Ñজ্বি বাবাÑ বলতে বলতে আলী আফসার সরে এসে দরজার পাল্লা টেনে দিতেই টর্চের মুখগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।
এসব কথাবার্তার ভেতর সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন ঘরের বেড়ার ফাঁকফোঁকড় দিয়ে বাইরের টর্চওয়ালাদের দেখছিলো। এতক্ষণ টর্চের আলোর বিপরীতে থাকায় কাউকেই চিনতে পারছিলো না সে। এবার টর্চের আলো নিভিয়ে দেয়ায় ক্ষয়ে আসা চাঁদের সামান্য আলোতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আগন্তুকদের চেহারাগুলো। রাজাকার মৌলানা মো. মহসীন আলীর পোলা সুরুজ আলী, ওর সাগরেদ সারাক্ষণ মিনার মার্কা গামছা গলায় ঝুলিয়ে রাখা তসলিম, ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি মো. দবির মোল্লার বড় পোলা মো. এখলাস উদ্দিন, অল্পবয়সে হজ্ব করে হাজ্বী হয়ে ওঠা শিবির নেতা আহমদ আলীÑ এদেরকে চিনতে পারলেও মুখে লম্বা দাঁড়ি প্যান্টের সাথে পাঞ্জাবি পরা বেঁটে লোকটাকে চিনতে পারেনি সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন। চিনবে কী করে?। ওকি এখানকার কেউ? এখানকার হলে তো চিনতোই।
কুঁজো ঘাড় আরও কুঁজো করে বিছানা নেয় আলী আফসার। পাশে বসা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কী আর জিজ্ঞেস করবে? বেড়ার ফাঁক দিয়ে সবই তো দেখেছে। শুনেছেও তো? দুজনের মাথার ভেতরই ঘুরপাক খাচ্ছে সকালের ভোট। আলী আফসারের ভোট দিলেই কী, আর না দিলেই কী। তবু একটি ভোট নিয়ে ওদের এতো ভীতির কী হলো? প্রশ্নটা নিজেকেই করে আলী আফসার। উত্তরও কি তার জানা? এমুহূর্তে ১৯৮৬-র নির্বাচনের কথা মনে পড়ে তার। যে ঘৃণা আর অবজ্ঞায় ব্যালট বাক্সে ব্যালটটি ফেলে এসেছিলো তার মূল্য তো সে পেয়েছে। শুধু কি পেয়েছে? জীবনের উপর দিয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে না! তার বাঁ পায়ের থেতলে যাওয়া গোড়ালি এখনও কি তাকে তার মতো চলতে ফিরতে দিচ্ছে! জোর পায়ে চলতে গেলে যে তাকে এখনও লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে হয় সেকি আর এমনি এমনি!
ঘোর ভাঙে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের কথায়। শুয়ে পড়েন। এতো ভাইব্যা কী হবে? ভোট দিতে না গেলেই হলো। আর এতো মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা কইরেন না। দেখছেন তো সবই। আর কত!
বিছানায় গেলেই কি আর ঘুম হয়? হয় না। দরকার হয় মানসিক একটু স্থিরতার। রাজাকারের পোলাদের এতো হম্বিতম্বির ভেতর নিজেকে সামলে রাখাই যেখান কঠিন, সেখানে ঘুম তো ঘুম, শুয়ে থাকাই তো কঠিন। আলী আফসার তবু শুয়ে থাকে। শুয়ে শুয়ে ভোরের প্রহর গোণে।
রাত গড়িয়ে কখন যে ভোরের বারান্দায় পৌঁছে গেছে ফজরের আজান কানে না এলে আলী আফসার বুঝতেই পারতো না। একটি নয়, পরপর কয়েকটি মসজিদের মাইক থেকে আজান এসে ভাঙা ঘরে হামলে পড়লে আলী আফসার অভ্যাসবশতঃ ফজরের নামায পড়ার জন্যে বিছানা ছেড়ে বাইরে আসে। বাইরে এলেই কি আর মসজিদে নামাজ পড়া হয়ে ওঠে! অন্তত আজকের রাতে যখন কিছুক্ষণ আগে রাজাকার পোলারা ধমকে গেলো, তখন! তবুও মসজিদই গন্তব্য ধরে হাঁটতে থাকে আলী আফসার।
একতেদাহেতুল বেহাজাল ইমামÑ বলে ইমামের পিছনে দাঁড়ালেও নামাজে মনোযোগ নেই আলী আফসারের। থাকবে কী করে? আজকের রাতটা তো অন্য আর দশটা রাতের মতো নিরুপদ্রব নিঃশঙ্ক রাত হয়ে আসেনি তার জীবনে। ছিয়াশির রাতটা কি এর চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিলো না! তখন সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে সে ঝড় এক জীবনে ক’জনের আসে। নামাযে দাঁড়িয়ে আজ সেসব কথাই মনে পড়ছে আলী আফসারের। তার সামনে পেছনে কয়েক সারি মুসল্লি, ইমাম সাহেবের সুরেলা কুলহু আল্লাহু পাঠ কোনো কিছুই তাকে নামাযে ধরে রাখতে পারছে না। কেবলই নামাযের নিয়ত বাঁধা হাত দুটি খুলে খুলে যাচ্ছে। রুকু দিতে গিয়ে সেজদা দিয়ে ফেলা সে তো আর নিজে থেকে করেনি। আজ নামাযেই কি সে নিজ ইচ্ছায় এসেছে না-কি বহুদিনের একটা অভ্যাস তাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে মসজিদে এনে ফেলেছেÑ এসবের জবাব আলী আফসার কী দেবে? তবে দোয়ার সময় সকলের সাথে সেও হাত তুলেছে। আজকে হাত দুটি যতটুকু সম্ভব উপরে তুলে ধরেছে। হায় আল্লাহ, ইমাম সাহেব যখন দোয়ায় বলেন, আল্লাহুম্মা আংতাস সালামু, আলী আফসার বলে, হায় আল্লাহ, তুমি আমার সুমাইয়া বিনতে হোসেনকে রক্ষা করো, ইমাম সাহেব বলেন, ওয়া মিনকাস সালামু। ইমাম সাহেবের দোয়ার সাথে তাল লয় না মিলাতে পেরে অথবা ইমাম সাহেবের দোয়ার কোনো অর্থ না বুঝার কারণে আলী আফসার বলে, হায় আল্লাহ, তুমি আমার আবিদা বিনতে আফসারকে রক্ষা করো, ইমাম সাহেব বলেন, তাবারাকতা ইয়া জাল ঝালালি ওয়াল ইকরাম, তুমি রাজাকারগুলোরে কঠিন শাস্তি দাও, ইমাম সাহেব বলেন, হায় আল্লাহ, তুমি আমাদের বাবা মায়ের কবরকে বেহেশতের বাগান বানিয়ে দাও, আলী আফসারের মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ে, হায় আল্লাহ, তুমি আমার মেয়েকে এইসব হিং¯্র দানবদের হাত থেকে রক্ষা করো, তুমি আমার সবুজকে রক্ষা করো, হায় আল্লাহ তুমি আমার স্ত্রী সুমাইয়া বিনতে হোসেনকে আলবদরের কুলাঙ্গারদের হাত থেকে হেফাজত করো, হায় আল্লাহ, তুমি আমাদের জীবনকে ওদের হাত থেকে ভিক্ষা দাও খোদা, ঐসব জেনাকারীদের ওপর তুমি গজব নাজিল কর...
আলী আফসারের দোয়া যে কখন কান্নায় রূপ নিয়েছে, চোখের জলের ধারা কখন যে দাড়ি মাড়িয়ে গায়ের গেঞ্জি ভিজিয়ে দিতে শুরু করেছে টেরই পায়নি সে। যখন টের পায় তখন তাকিয়ে দেখে তার চারপাশ ফাঁকা। যে দু’একজন মুসল্লি তখনও যায়নি তারাও মসজিদের দরজার মুখে রাখা জুতা জোড়ায় পা বাড়াচ্ছে।
ঙ.
বেলা বাড়ার সাথে সাথে সকালের মিহি রোদের শীতলতা কেটে উষ্ণতা জেগে উঠার উপক্রম হলে আলী আফসারের খোঁড়া পায়ের খোঁড়ামিও কমে যেতে থাকলো কি! কমলই তো। তা না হলে সারা সকাল সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন তাকে যে বুঝালো, কী দরকার ভোট দেবার, ভোট দিয়ে আপনের কী হবি, আমাদেরই-বা কী হবি। ভোট দেবার দরকার নাই, ঘরেই শুয়া থাকেন। আপনের একখান ভোটে কারও পাস ফেইল হবি না। তাছাড়া রাতেরবেলা যে শাসায়া গেলো তা কি ভুইলা গেলেন?
না, ভুলেনি আলী আফসার। বরং রাজাকারের পোলার ধমকধামকেই তার ভেতরকার ঝিমিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধার উত্তাপ কিছুটা আড়মোড়া ভেঙে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েছে তো ঘরের চারদেয়ালে আর থাকে কী করে। সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের আপত্তির মুখেও আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামে।
রাস্তায় নামা মানুষজন সকলই এখন ভোটকেন্দ্রমুখী। সকলের তাড়া একটাইÑ সকাল সকাল ভোটের লাইনে দাঁড়াতে হবে। বেলা করা যাবে না। নেতা-পাতিনেতা-মাস্তানদের যেরকম চলাফেরা এতে কখন কী হয় বলা মুশকিল। ভোটটা ভালোয় ভালোয় দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো।
হাঁটতে হাঁটতে আলী আফসার যখন ভোটকেন্দ্রে এসে হাজির হয় ততক্ষণে ভোটের লাইন কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ার দশা। আলী আফসার একবার ভাবলো দেরি না করে লাইনের লেজের মাথায় গিয়ে দাঁড়াবে। এগিয়েও গেলো দুই পা। তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় রাজাকার মৌলানা মো. মহসীন আলীর পোলা সুরুজ আলীর সাগরেদ তসলিম। Ñকী দরকার ছিলো চাচা কষ্ট করে ভোট দিতে আসার। তসলিম এদিক ওদিক তাকিয়ে গলাটা এবার খাদে নামিয়ে আলী আফসারের কানের কাছে ফিসফাস করে বলে, চাচা, আসছেনই যখন ভোটটা দিয়েই যান। তবে ভোট দিতে গিয়া উল্টাপাল্টা কিছু কইরেন না।
সুরুজ আলীর সাগরেদ তসলিমের কথায় আলী আফসারের কোনো ভাবান্তর ঘটেনি। তবে ভেতরে কিছু ঘটেছে কি? গতরাতের ঘরের বেড়ায় লাঠির বাড়ি, টর্চের আলোর দাপট, খামাকা ফ্যাসাদ বাড়াইতে যাইয়েন না বলে হুমকিÑ এক ঝটকায় সবই এসে দাঁড়ায় আলী আফসারের সামনে। ‘খামাকা ফ্যাসাদ’ তো মাথার ভেতর রীতিমতো দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে। সে দাপাদাপি আলী আফসারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দিচ্ছে না। এদিকে সুরুজ আলীর সাগরেদ তসলিম ‘উল্টাপাল্টা কিছু কইরেন না’ বলে কোথায় যে ডুব দিলো তাকে কাছে বা দূরে কোথাও আর দেখা যাচ্ছে না। সে কি তবে রাজাকার মৌলানা মো. মহসীন আলীর পোলা সুরুজ আলী, জামায়াতের সেক্রেটারি মো. দবির মোল্লার পোলা মো. এখলাস উদ্দিন, হাজ্বী আহমদ আলী এদেরকে খবরটা দিতে এদিক-সেদিক খুঁজে বেড়াচ্ছে। তা কেন হবে! ওর হাতে তো বেশ বড় এন্টেনাওয়ালা একটা মোবাইল দেখেছে আলী আফসার!
আর বেশি কিছু ভাবার সময় পায়নি আলী আফসার। তার পেছন থেকে দুই পাশে এসে দাঁড়ায় সুরুজ আলী, এখলাস উদ্দিন, আহমদ আলী, তসলিম। সকলেই চুপচাপ। কিছুই বলছে না কেউ আলী আফসারকে। সবাই আলী আফসারের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে আবার পিছন দিকে হেঁটে গেলো। যাক্Ñ। এই শু... একটা অশ্রাব্য গালি মুখ থেকে বেরুতে গিয়ে কী ভেবে দাঁতের ফাঁকফোকরে আটকে যায়।
ভোটের লাইনের লেজ ধরে আলী আফসার ভোট দিয়েছে মাথার উপর রোদের তেজ ঝরে পরার আগেই। তবু এখনও কিসের ঘোরাঘুরি আলী আফসারেরÑ কথাটা নিজেই নিজের দিকে ছুঁড়ে দেয়। আছে বৈকি। নৌকা, ধানের শীষ, দাড়িপাল্লা, মশাল আরও সব কী কী। ভোটের পাল্লা কোনদিকে হেলে তার শেষটা দেখে নেয়ার ভেতর যে একটা উত্তেজনা সেটা দেখে নিতেই এক জটলা থেকে আর এক জটলায় ঘোরাঘুরি আলী আফসারের। তবে দুপুরের প্রখর রোদ গড়িয়ে বিকালের দিকে হেলে পড়লে আলী আফসার নিজেকে ক্লান্ত অনুভব করে। আর ঘোরাঘুরি ঠিক হবে না ভেবে ধীরে ধীরে ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যায়।
দুপুরের রোদ গড়িয়ে পশ্চিমের ঘরের ছায়ায় এক চিলতে উঠান ছেয়ে গেলেও আলী আফসারকে বাড়ি আসতে না দেখে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কেবলই ফুসছিলো। এমন সময় আলী আফসারকে ঘরের দাওয়ায় উঠতে দেখে গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করেÑ কই গেছিলেন? আবার ভোট দিতে! এখনও শিক্ষা অয় নাই! এই পর্যন্ত বলেই বুঝতে পারে তার গলা চরানোটা প্রায় চিৎকারে রূপ নিয়েছে। চিৎকারের শব্দ ঘরের দাওয়া ছেড়ে বেশ কিছু দূর গিয়ে আবার ফেরত এসে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের কানে বসে। বলে, সুমাইয়া আস্তে। আস্তে। পাড়া গরম করবা না। করলে লাভের বদলে ক্ষতি বেশি হবি কিন্তু তোমাগেরই।
চ.
বিকাল থেকেই আকাশের মুখ ছাই ঘষা। মাঝে মধ্যে গুড়–ম গুড়–ম শব্দ বৃষ্টির আভাস দিলেও মেঘ কেটে যাওয়ায় রৌদ্র-ঝিলিক-আলোকচ্ছটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন আর বৃষ্টি নেমে আসার কোনো লক্ষণ চোখে পড়ে না। তবে মধ্য আশ্বিনে বৃষ্টি শুরু হলে ঢল হয়ে যে আসবে একথা গ্রামের কাউকে নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কিংবা আলী আফসারও তাই জানে। এনিয়ে অবশ্য এদের কারোরই কোনো মাথাব্যথা নেই। বৃষ্টি হয় হোক, ঢল হয় হোক।
সন্ধ্যার মুখে রৌদ্র-ঝিলিক মিইয়ে আসার সাথে সাথে শুরু হয় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। খনেক বাড়ে, খনেক কমে। বৃষ্টির সাথে মাঝে মধ্যে দমকা বাতাস উত্তর থেকে দক্ষিণে ছুটে গেলে শীতের আলোড়ন কিছুটা বেড়ে যায় বৈকি। এদিকে বৃষ্টি বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে চারদিকে ঘন হয়ে আসা রাতের নীরবতার সাথে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারদিকে এখন কেবল বাতাসের হুড়–হুড়ি। তারই ভেতর থেকে ভেসে আসছে মা মা বলে বৃষ্টিভেজা একটি আর্তনাদ। কখনোও বা বাঁচাও বলে তীব্র আকুতি। সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন বিছানায় আধোঘুমে শুয়ে থাকা আলী আফসারকে জাগিয়ে কান খাড়া করতে বলে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনতে পাচ্ছে সে। পাশের বাড়ির ছন্দার গলাই তো। নাকি তার মেয়ে রাখি! রাখির মাসির গলাও তো মনে হচ্ছে! কিন্তু মাসি তো গতকালই ভোট দেবে বলে চলে গেছে। তা হলে? আর চিৎকার করে অন্ধকার কাঁপাচ্ছে যে সে তো সুরেশ! নিরঞ্জনের বেটা।
ছন্দা রাখি মাসি সুরেশ এদের সাথে আরও কিছু মানুষের গলা শোনা যাচ্ছে কি-না বোঝার জন্য কান এগিয়ে দেয়ার আগেই দড়াম করে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে ক’জন মানুষ সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের ঘরে। মানুষজনের হুট করে ঘরে ঢুকে পড়া না দরজা ভেঙে পড়াÑ কোনটা আগে ঘটেছে তা বোঝার সময় পায়নি আলী আফসার কিংবা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কিংবা আবিদা বেগম বিনতে আফসার কিংবা সবুজ। চারজনকেই ভয়ার্ত এক বোবা আতঙ্ক আছড়াচ্ছে কেবল। এঅবস্থায় কারো গলা থেকে কান্নায় কোনো শব্দ বেরুচ্ছে কিনা কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের বায়ু ভেতর বাহির করছে কিনা তা নিজেরাই বুঝতে পারছে না। কতগুলো টর্চ লাইটের আলো কেবল মাটিমুখি হয়ে কাঁঁপছে। টর্চের আলোয় কতগুলো হাত এক একজনকে ধরে টেনে হিঁচড়ে আলাদা সরিয়ে নেয়। সরিয়ে নেয়ই আর কোথায়? ঘরতো একটাই। এরই মধ্যে সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন, আলী আফসার, আবিদা বেগম বিনতে আফসার আর সবুজের মুখে একটা করে কাপড় গুঁজে দেয়। কাপড় গুঁজে দেয়ার মধ্যেই দুইজন আবিদা বেগম বিনতে আফসারকে ঘরের বারান্দায় এনে চিৎ করে শুইয়ে দিলে দুইজন তার চার হাত পা চেপে ধরে। এরই মধ্যে একজন নিজের পায়জামা খুলতে খুলতে তার উপর চেপে বসে। তখন শুধু লাফিয়ে ওঠা একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পায় সকলে। এরই ভেতর একজন সুমাইয়া বেগম বিনতে আফসারকে খানকি মাগী বলে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বাইরে এনে আছড়ে ফেললে দুইজন চার হাতপা চেপে ধরে তার। এঅবস্থায় পাশ থেকে একজন সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের উপর চেপে বসে। সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেনের গোঙানি আগেই শুরু হয়েছিলো। এবার গোঙানির ভেতর গলা থেকে অস্ফুট বেরুতে থাকে আবিদা, মা, আবিদা। আর কোনো শব্দ নেই। আবিদার গোঙানি তো আগেই থেমে গিয়েছিলো। এবার কি তারও বন্ধ হলো? টর্চওয়ালাদের একজন আলী আফসারকে ছেচড়াতে ছেচড়াতে উঠানের মাঝখানে এনে গামছা দিয়ে পিঠমোড়া করে লেবু গাছের সাথে বেঁধে ফেলে। এই অবস্থায় একজনÑ এই শুয়োরের বাচ্চা বলে আলী আফসারের গায়ে লাথি মারে। আর একজন তেড়ে এসে জোরে এক চড় কষে বলেÑ এই কুত্তার বাচ্চা, ভোট দিতে গিয়েছিলি কেন? এতবার না করার পরও ভোট দিতে গেলি ক্যান? পাশ থেকে একজন আলী আফসারের বুকে শা করে লাথি মেরে বলেÑ ব্যালটের দাড়িপাল্লায় আবারও থুথু দিলি কেন? ওই কুত্তার বাচ্চা থুথু দিলি কেন? আগে একবার থুথু দিয়াও শখ মেটে নাই? কথা বলছিস না কেন শালার মুক্তিযোদ্ধা?
কী কথা বলবে আলী আফসার! তার মুখ থেকে কি স্বর বের হওয়ার জো আছে? পিঠে বুকে একটার পর একটা লাথি পড়তে থাকলেও কোনো শব্দ বেরোয় না তার মুখ থেকে। পাশেই পড়ে থাকা সুমাইয়া বেগম বিনতে হোসেন কিংবা আবিদা বেগম বিনতে আফসার এদের দিকে মাথা তুলে তাকাবে, এই নারকীয় দৃশ্য দেখবে সে সামর্থ্য কি তার আছে? সে বরং উপর্যুপরি লাথি আর লাঠির বাড়ির আঘাতে হাত পায়ের হাড়, বুকের পাঁজর ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও চোখ বন্ধ অবস্থাতেও জ্ঞান হারাতে হারাতে চেতনায় ফিরে থাকার চেষ্টা করে। হঠাৎই ওই খানকির পোলা বলতে বলতে ক্ষিপ্র গতিতে একজন তার বুকের উপর পা তুলে দিলে সে কাত হয়ে লেবু গাছের গোড়ায় চিৎ হয়ে পড়ে যায়। বুকে পা তোলা মানুষটার হাতে মোটা একটা লাঠি। দুই হাতে লাঠিটা মাথার উপর তুলে সরোজে আলী আফসারের মাথায় আঘাত করার মুহূর্তে আলী আফসারের চোখ দুটি খুলে যায়। ব্যথায় কাতরতা আর ঘোরাচ্ছন্নতার ভেতর দেখতে পায় বুকের উপর পা দিয়ে চেপে ধরে আছে রাজাকার মৌলানা মো. মহসীন আলীর পোলা সুরুজ আলী যার মুখভর্তি লম্বা রোশনাই দাঁড়ি যা তাকে কখনো কখনো তাদের নেতাদের সুরতের কথা মনে করিয়ে দেয়। সুরুজ আলীর হাতের লাঠির বাড়িটা মাথার ঠিক মাঝ বরাবর পড়ার মৌহূর্তিক সময়ে আলী আফসারের মুখ থেকে একদলা কাশি ছিটকে পড়ে তার নাকে-মুখে-চোখে। লাঠির বাড়িটা মাথায় পড়তেও বিন্দু মাত্র দেরি হয়নি।
*****
লেখক পরিচিতি: সরকার আশরাফ। ৪০ বছর ঘরে নিসর্গ সম্পাদনা আর দুটি গল্পগ্রন্থ ১. পুনর্বাসন : একটি রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, ২. হৃদয়শোধন অভিযান : একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
জন্ম ময়মনসিংহ। শেষ একাডেমিক পড়ালেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


1 মন্তব্যসমূহ
গল্প পড়া শেষ করলাম, ধন্যবাদ অগ্রজ, অকপটে নির্ভুল সত্য বয়ানের জন্যে, শুভেচ্ছা জানবেন ।
উত্তরমুছুন