ভাষান্তর : উৎপল দাশগুপ্ত
পর্ব: ৪০
সে রাত্রে স্কারলেটের ভাল ঘুম হল না। ভোরবেলায় সূর্যের আলো ফুটে যখন পুবদিকের টিলার ওপরের কালো পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল, স্কারলেট অবিন্যস্ত বিছানা ছেড়ে উঠে জানলার ধারে একটা টুলে বসে হাতের ওপর ক্লান্ত মাথাটা ভর দিয়ে টারার গোলাবাড়ির উঠোন আর ফলের বাগান পেরিয়ে তুলোর খেতের দিকে চেয়ে রইল। সব কিছুই তরতাজা, শিশিরে ভেজা, নীরব আর সবুজ। তুলোর খেতগুলো দেখে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কিছুটা সান্ত্বনার প্রলেপ লাগল। সূর্যোদয়ের মুহুর্তে টারাকে ভালবাসা আর সেবা যত্নে ধন্য শান্তির নীড় বলে মনে হচ্ছে। গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি মুরগি রাখার ঘরে কাদা লেপে চুনকাম করে দেওয়া হয়েছে, যাতে ইঁদুর আর বেজির আক্রমণ থেকে বাঁচানো যায়। গুঁড়ি দিয়ে তৈরি আস্তাবলেও একই ব্যবস্থা। ভুট্টা, স্কোয়াশ, বরবটি আর শালগমের খেত থেকে সব রকম আগাছা আর পরগাছা পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে, আর ওক কাঠ ফালি করে চিরে বেড়া দেওয়া। ফলের বাগানও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। বড় বড় গাছের তলা থেকে ঝরাপাতা আর আগাছা সাফ করে দেওয়া হয়েছে। গাছের নীচে শুধু সারি সারি ডেজ়ি ফুল ফুটে আছে। সবুজ পাতার আড়াল থেকে আপেল আর গোলাপি পীচ ফল উঁকি দিচ্ছে। সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। ঠিক এর পরেই, তুলোর খেত। সোনালি আকাশের তলায় নিশ্চল সবুজের সমারোহ। হাঁস আর মুরগির পাল হেলতে দুলতে মাঠের দিকে এগোচ্ছে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কীটপতঙ্গের লোভে। লাঙ্গল চালিয়ে মাটি ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়ায় খুব সুবিধে হয়েছে।
উইলের প্রতি মমতা আর কৃতজ্ঞতায় স্কারলেটের মন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠল। উইলের জন্যই এই সব সম্ভব হয়েছে। অ্যাশলের প্রতি অনুরাগ সত্ত্বেও স্কারলেট বিশ্বাস করতে পারল না, এই কৃতিত্বের সিংহভাগ ওর প্রাপ্য। কারণ টারার এই যে বাড়বাড়ন্ত, এটা কোনও সম্ভ্রান্ত প্ল্যান্টারের কাজ নয়, বরং একজন “ক্ষুদ্র চাষীর” অক্লান্ত হাড়ভাঙা খাটুনির ফল, যার সঙ্গে মিশে আছে জমির প্রতি অপার ভালবাসা। মাত্র দুটো ঘোড়া সম্বল করে একটা খামার, অতীতের সেই রাজকীয় খামার – যতদূর চোখ চলে সবুজ খেত, অনেক খচ্চর আর ঘোড়া – তার সঙ্গে তুলনা টানা অবশ্যই যাবে না। তবু এখন যেটুকু করা সম্ভব হয়েছে তা মোটেই ফেলনা নয়, আর যে জমি এখন পতিত হয়ে পড়ে আছে, যখন আবার দিন আসবে, পুনরুদ্ধার করার পর সেই সম জমির উর্বরতা অনেক বেড়ে যাবে এতদিন বিশ্রাম পাওয়ার ফলে।
উইল কয়েক বিঘায় শুধু চাষ আবাদ করেই ক্ষান্ত দেয়নি। জর্জিয়ার প্ল্যান্টারদের দুই শত্রুকেও কবলে রেখেছে – পাইনের চারা আর ব্ল্যাকবেরির কাঁটাঝোপ। বাগান, ঘাসজমি আর তুলোর খেতে ওদের চুপিচুপি আসর জমিয়ে বসতে দেয়নি। দেউড়ির পাশেও ওদের গজিয়ে উঠতে দেয়নি। জর্জিয়ার অগুনতি প্ল্যান্টেশনে এটা বিরাট এক সমস্যা।
টারার সেই ছন্নছাড়া দশার কথা মনে পড়ে যাওয়ায়, স্কারলেটের বুক ধক করে উঠল। উইল আর ওর নিজের চেষ্টা বিফলে যায়নি। ওরা ইয়াঙ্কি, কার্পেটব্যাগার আর প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে। আর সব থেকে বড় কথা হল, উইল ওকে বলেছে, এবার শীতে তুলোর ফসল উঠে যাওয়ার পর ওকে আর টাকাও পাঠাতে হবে না – যদি না আর কোনও কার্পেটব্যাগারের টারার ওপর কুনজর পড়ে আর ট্যাক্সের পরিমাণ আকাশছোঁয়া না করে দেয়। স্কারলেট জানে অর সাহায্য ছাড়া উইলের পক্ষে এত কিছু করা শক্ত হত, কিন্তু তবুও ওর স্বাধীনচেতা স্বভাবটার ও তারিফ করে, সম্মান করে। এতদিন একজন শ্রমিকের মত কাজ করেছে, তাই স্কারলেটের কাছ থেকে টাকা নিতে ওর অসম্মান হয়নি। তবে এখন উইল ওর ভগ্নীপতি হতে চলেছে, তাই ওর ঐকান্তিক চেষ্টা হবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। উইলকে সত্যি সত্যি ঈশ্বরই পাঠিয়েছেন।
***
আগের রাত্রেই পোর্ক কবর খুঁড়ে রেখেছে, এলেনের কবরের পাশেই। এখন কোদাল হাতে ভেজা লাল মাটির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, মাটিগুলো আবার যথাস্থানে ফেলার জন্য। স্কারলেট ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে, গ্রন্থিল বেঁটে সেডার গাছের ছায়ায়। জুন মাসের আতপ্ত রোদ ওর শরীর ঝলসে দিচ্ছে আর সামনের লাল মাটির পরিখার থেকে ওর চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। ওক কাঠের দুটো পাটাতন দিয়ে বানানো কফিনে করে জেরাল্ডের দেহ নিয়ে জিম টার্লটন, বেঁটে হিউ মুনরো, অ্যালেক্স ফোনটেন আর বৃদ্ধ ম্যাকর্যে’র ছোট নাতি ধীরে ধীরে শোকার্ত ভঙ্গীতে বাড়ি থেকে আসার পথ ধরে এগিয়ে আসছে। খানিক দূরত্ব রেখে পাড়া-প্রতিবেশী আর বন্ধুরা আলুথালু পোশাকে নীরবে শোকার্ত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। রোদে ভেজা রাস্তা ধরে ওদের আসতে দেখে পোর্ক কোদালের হাতলের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। স্কারলেট অবাক হয়ে লক্ষ্য করল ওর মাথার পেছনের কোঁকড়া চুলগুলো – যেগুলো ওর অ্যাটলান্টা চলে যাওয়ার সময়েও কুচকুচে কালো ছিল – পাক ধরে সেগুলো সব সাদা হয়ে গেছে।
মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল, গতকাল রাতে চোখের সব জল ঝরিয়ে ফেলতে পারায় আজ শুকনো চোখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে। পেছন থেকে স্যুয়েলেনের কান্নার আওয়াজ এসে ওকে ক্ষিপ্ত করে ফেলছে। ঘুরে গিয়ে স্যুয়ের কান্নায় ফুলে যাওয়া গালে টেনে এক চড় মারার বাসনা থেকে নিজেকে অনেক কষ্টে নিবৃত্ত করে রেখেছে। ইচ্ছে করেই হোক বা অনিচ্ছেতেই, স্যু’ই জেরাল্ডের মৃত্যুর জন্য দায়ী। বিরূপ প্রতিবেশীদের সামনে ওর উচিৎ কান্না দমিয়ে নিজেকে শান্ত রাখা। সকাল থেকে কোনও একজন মানুষই ওর সঙ্গে কথা বলেনি, বা ওর দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায়নি। ওরা স্কারলেটকে চুম্বন করেছে, হাতে হাত রেখেছে, ক্যারীনকে এমনকি পোর্ককেও সান্ত্বনার দিয়েছে, কিন্তু ভুলেও কেউ স্যুয়েলেনের দিকে তাকায়নি। এমন ভাব করেছে যেন স্যুয়েলেন ওখানে হাজিরই নেই।
ওরা মনে করে স্যুয়েলেন ওর পিতাকে হত্যা করার থেকেও জঘন্য অপরাধ করেছে। ওঁকে দক্ষিণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করবার জন্য প্ররোচিত করবার চেষ্টা করেছিল। শুধু তাই নয়, ওর এই হীন প্রচেষ্টা এই একরোখা সুসম্বদ্ধ সম্প্রদায়ের সম্মানহানির সমতুল বলে মনে করা হচ্ছে। বৃহত্তর পরিসরে এই কাউন্টি যে নিবিড় সংহতিবোধের ভাবমূর্তি তুলে ধরেছিল, তাতে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। ইয়াঙ্কি সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ গ্রহণের প্রচেষ্টার ফলে স্যুয়েলেন কার্পেটব্যাগার আর স্ক্যালাওয়াগদের দলে নাম লেখানোর চেষ্টা করেছে – ইয়াঙ্কি সৈন্যদের থেকেও যাদের অনেক বেশি ঘৃণার চোখে দেখা হয়। প্ল্যান্টার পরিবারের মেয়ে হয়ে – কনফেডারেটদের প্রতি যাদের দৃঢ় আনুগত্য নিয়ে কোনও সংশয় নেই – সে কিনা শত্রুপক্ষে যোগদান করতে গেছিল? এটা করে ও শুধু নিজের পরিবারকেই নয়, কাউন্টির সমস্ত পরিবারকেই কলঙ্কিত করেছে।
শোকে বিহ্বল মানুষ রাগে অপমানে ফুঁসছিল, বিশেষ করে বৃদ্ধ ম্যাকর্যে – যিনি অনেক বছর আগে স্যাভান্না থেকে পশ্চিমে চলে আসার সময় থেকে জেরাল্ডের অভিন্নহৃদয় বন্ধু এবং সঙ্গী, গ্র্যান্ডমা ফোনটেন – এলেনের স্বামী হিসেবে যাঁকে উনি সম্মান করতেন, আর মিসেজ় টার্লটন – অন্যান্য প্রতিবেশীর নিরিখে জেরাল্ডের সঙ্গে যাঁর বন্ধুত্ব নিবিড়তর ছিল কারণ, মিসেজ় টার্লটনের ভাষায় বলতে গেলে কাউন্টির একমাত্র লোক যিনি গেল্ডিং১-এর সঙ্গে স্ট্যালিয়ন২-এর কী পার্থক্য সেটা বুঝতে পারতেন।
উঠোনের ছায়ায় যেখানে শেষকৃত্যের আগে জেরাল্ডকে শুইয়ে রাখা আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই তিনমূর্তির বিক্ষুব্ধ মুখ দেখে অ্যাশলে আর উইল অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে লাগল। নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য ওরা চুপিচুপি এলেনের অফিসে চলে এল।
“ওদের মধ্যে কেউ কেউ স্যুয়েলেনকে নিয়ে কিছু বলবে মনে হচ্ছে,” হাতে ধরা খড়টা দাঁত দিয়ে দু’টুকরো করে ফেলে উইল অধীর স্বরে বলে উঠল। “বলবার মত যথেষ্ট কারণ আছে বলে ওদের মনে হচ্ছে। আছেই হয়ত। আমার বলার কথা নয়। তবু অ্যাশলে, ঠিক কি ভুল যাই হোক না কেন, পরিবারের সদস্য হিসেবে ব্যাপারটা সুখকর হবে না। সমস্যা হবেই। বুড়ো ম্যাকর্যে তো বদ্ধ কালা, ওঁকে থামানোর যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, ওঁর কানেই ঢুকবে না। আর গ্র্যান্ডমা ফোনটেনকে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া যে অসম্ভব, সে তো তোমার অজানা নয়। আর মিসেজ় টার্লটনকে লক্ষ্য করেছ? যতবার স্যুয়েলেনের দিকে তাকাচ্ছেন, ওঁর রক্তচক্ষু বনবন করে ঘুরছে! মনে হচ্ছে স্যুয়েলেনকে ঝেড়ে কাপড় পরানোর জন্য ওঁর আর তর সইছে না! ওঁরা যদি কোনও কথা তোলেন, আমাদের খুব সাবধানে সামাল দিতে হবে। একেই টারার সমস্যার অন্ত নেই এখন, প্রতিবেশীদের অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নেওয়া একদম ঠিক হবে না!”
অ্যাশলে চিন্তিত মুখে শ্বাস নিল। প্রতিবেশীদের মেজাজ সম্পর্কে উইলের থেকে অ্যাশলেই বেশি অবহিত ছিল। লড়াই লাগার আগের প্রায় অর্ধেকের বেশি ঝগড়াঝাঁটির ইতিহাস আর গুলি চালিয়ে দেওয়ার বেশ কিছু ঘটনা অ্যাশলের মনে পড়ে গেল। কাউন্টির রেওয়াজ মেনে কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দু’চার কথা বলা হয়ে থাকে। সেখানে সম্মানার্থে যে সব ভাল ভাল কথা বলা হয়, সেগুলো একটু অতিশয়োক্তির পর্যায়েই পড়ে। তবে অন্যরকম কথা যে বলা হয় না তাও নয়। অনেক সময় আবার সম্মানার্থে বলা কথা নিয়েও ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায়। কবরে মাটি ভরাট হতে না হতেই তা নিয়ে তুমুল বিতণ্ডা বেধে যায়।
যাজকের অনুপস্থিতিতে, অ্যাশলেকেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিতে হয়েছে, ক্যারীনের প্রার্থনা পুস্তকের সাহায্য নিয়ে, কারণ জোন্সবোরো আর ফ্যেয়াটভিলের মেথডিস্ট এবং ব্যাপটিস্ট ধর্মযাজকদের সাহায্য কৌশলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অন্য বোনেদের তুলনায়, ক্যারীন বেশ গোঁড়া ক্যাথলিক, অ্যাটলান্টা থেকে একজন যাজক নিয়ে আসার ব্যাপারে স্কারলেট আগ্রহ না দেখানোয় যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হয়েছে। তবে উইল আর স্যুয়েলেনের বিবাহ সম্পন্ন করবার জন্য যে যাজক আসবেন তিনিই রীতি অনুযায়ী জেরাল্ডের আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করতে পারেন, এই কথাটা ওকে মনে করিয়ে দেওয়ায়, বেচারা খানিক শান্তি পেয়েছে। আশেপাশের প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজকদের ব্যাপারে ক্যারীনই আপত্তি জানিয়েছে। প্রার্থনা পুস্তকের প্রাসঙ্গিক জায়গাগুলো দাগিয়ে দিয়ে অ্যাশলের ওপরেই সেগুলো পাঠ করবার দায়িত্ব দিয়েছে। পুরোনো সেক্রেটারিয়েট টেবিলে ভর দিয়ে অ্যাশলে উপলব্ধি করল যে গোলমাল সামাল দেওয়ার দায়িত্বও ওরই ওপরে, কিন্তু রগচটা কাউন্টির এই সব মানুষদের কী ভাবে শান্ত করবে সেটা ভেবেই পেল না।
“কোনও আলো দেখতে পাচ্ছি না, বুঝলে উইল,” মাথার চিক্কণ চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করতে করতে অ্যাশলে বলে উঠল। “গ্র্যান্ডমা ফোনটেন বা বুড়ো ম্যাকর্যেকে তো আমি জোর করে থামিয়ে দিতে পারব না! আর মিসেজ় টার্লটনের মুখও বন্ধ করতে পারব না! খুব নরম করে বললেও, স্যুয়েলেনকে খুনি আর বিশ্বাসঘাতক তকমা তো দিয়ে দেবেনই, আর বলে দেবেন ওর অপরাধের জন্যেই মিস্টার ও’হারা আর আমাদের মধ্যে নেই। মৃত ব্যক্তির স্মরণে কিছু বলার রেওয়াজটাই গোলমেলে। একেবারে বর্বরোচিত প্রথা!”
“আমার কথা শোনো, অ্যাশ,” উইল ধীরে ধীরে বলল। “স্যুয়েলেনের বিরুদ্ধে কেউ কিছুই বলবে না, এতটা আমি আশা করি না। অনেকেই অনেক কিছু বলতে পারে। তুমি ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। তোমার যখন প্রার্থনা পুস্তক পড়া হয়ে যাবে, তুমি বোলো, ‘কেউ যদি দু’চার কথা বলতে চান’ বলে তুমি আমার দিকে তাকিয়ো, যাতে আমিই প্রথমে বলার সুযোগটা পেয়ে যাই।”
এদিকে স্কারলেট ব্যস্ত চোখে লক্ষ্য করছিল যে সঙ্কীর্ণ প্রবেশদ্বার দিয়ে দেহ নিয়ে শববাহকদের সমাধিস্থলে আসতে খুবই অসুবিধে হচ্ছে। শেষকৃত্যের পরেই যে কিছু ঝামেলা অপেক্ষা করে আছে, তার বিন্দুমাত্র আঁচ পায়নি। ভারাক্রান্ত মনে ভাবছিল, জেরাল্ডকে কবরে শুইয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসিখুশিময় আর ভাবনাহীন পুরোনো দিনগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত শববাহকেরা কফিনটা কবরের কাছে নামিয়ে রেখে নিজেদের টাটিয়ে যাওয়া আঙুলগুলো খোলা বন্ধ করতে থাকল। অ্যাশলে, মেলানি আর উইল সার বেঁধে ঘেরা জায়গায় ঢুকে ও’হারা মেয়েদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। যাঁরা নিকটবর্তী প্রতিবেশী, তারা ঠিক ওদের পেছনেই ভিড় করে দাঁড়িয়েছেন। বাকি যারা, তারা ইট দিয়ে ঘেরা জায়গার বাইরে। এদের অনেককেই আগে কখনও দেখেনি স্কারলেট, তাই এত জনসমাগম দেখে অবাক হল, আবেগপীড়িত হয়ে পড়ল। যানবাহনের এত অভাব থাকা সত্ত্বেও এরা চলে এসেছে, প্রাণের টানে। প্রায় পঞ্চাশ ষাট জন এমন অনেকেই আছে যারা খুবই দূর থেকে এসেছে। স্কারলেট অবাক হয়ে ভাবল, কতটা প্রাণের টান, জানতে পেরে ঠিক সময়ে চলে এসেছে। জোন্সবোরো আর ফ্যেয়াটভিল, এমনকি লাভজয় থেকেও সবাই সপরিবারে চলে এসেছে – কিছু নীগ্রো দাসদাসীও এসেছে। নদীর ওপারে অনেক দূর থেকে ছোট চাষীরা এসেছে। সুদূর বনাঞ্চল থেকে ক্র্যাকার সম্প্রদায়ের আর জলাভূমির মানুষরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলাভূমির লোকেদের দৈত্যের মত বিশাল চেহারা, মুখে পাতলা দাড়ি, পরনে হাতে বোনা পোশাক, মাথায় ভালুকের চামড়ার টুপি, গালে টোপলা করা তামাক। ওদের বউরাও সঙ্গেই এসেছে। খালি পা কাদামাটিতে ডোবা, নস্যি নিয়ে নীচের ঠোঁটের কাছে জমিয়ে রেখেছে। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রুগির মত সাদাটে কিন্তু পরিচ্ছন্ন চকচকে মুখ বেরিয়ে আছে রোদটুপির তলা থেকে। পরনে মাড় দিয়ে সদ্য ইস্ত্রি করা ক্যালিকো পোশাক।
নিকটবর্তী প্রতিবেশীরা তো সবাই এসেছেন। গ্র্যান্ডমা ফোনটেন – শুকনো চেহারা, চামড়া কুঁচকে গিয়ে পালক ঝরে যাওয়া পাখির মত হলদেটে হয়ে গেছে – লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পেছনেই স্যালি মুনরো ফোনটেন আর অল্পবয়সী মিস ফোনটেন। ওরা ওঁর স্কার্ট ধরে টেনে, কানে কানে ওকে ইটের দেওয়ালের ওপর বসে পড়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছে। গ্র্যান্ডমার স্বামী, বৃদ্ধ ডাক্তারবাবু, উনি আর নেই। দু’মাস হল মারা গেছেন, ফলে বৃদ্ধার ছানিপড়া চোখ থেকে কলহপ্রিয় চাউনিটা উধাও হয়ে গেছে। ক্যাথলিন ক্যালভার্ট হিল্টন একা দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। আজকের এই বিপত্তির জন্যে তো ওর বরই দায়ী। রঙচটা রোদটুপির আড়ালে মাথা নীচু করে রয়েছে। স্কারলেট অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, ওর ঠাসবুনুনির পোশাকে অসংখ্য তেলের ছোপ। হাতদুটোও ছুলিপড়া আর অপরিষ্কার। নখের তলায় কালো ময়লা জমে আছে। ভদ্রবাড়ির কেউই ক্যাথলিনের পাশে দাঁড়িয়ে নেই। ক্র্যাকারদের থেকেও ওকে খারাপ দেখাচ্ছে, সাদা চামড়ার গরীবগুর্বোদের একজন যেন, নিরূপায়, অপরিচ্ছন্ন আর তুচ্ছ।
“আর ক’দিনের মধ্যেই ওরও নস্যি নেওয়ার অভ্যেস হয়ে যাবে, যদি না এখনই হয়ে গিয়ে থাকে,” স্কারলেট ঘৃণাভরে ভাবল। “কী অধঃপতন, হে ঈশ্বর!”
ক্যাথলিনের দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে নিতে নিতেই ও শিউরে উঠল। ভদ্রলোক আর গরীব সাদা চামড়ার মানুষের মধ্যে ফারাক যে খুব একটা যে নেই এই কথাটা উপলব্ধি করতে পারল।
“কেবল একটু কাণ্ডজ্ঞান বাদে, যেটা আমার আছে,” স্কারলেট ভাবল। মনে হল আত্মসমর্পণের পরে ও আর ক্যাথলিন একই উপকরণ সম্বল করে যাত্রা শুরু করেছিল – রিক্ত এই হাতদুটো আর চিন্তাভাবনা করার মত মাথা। কথাটা মনে হতেই গর্বের অনুভূতি দেহে মনে ছড়িয়ে পড়ল।
“এতটা দুর্দশা আমার হয়নি,” চিবুক তুলে সামান্য হেসে ভাবল।
কিন্তু মিসেজ় টার্লটনকে তীব্র দৃষ্টি হেনে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসিটা মুখেই মিলিয়ে গেল। অতিরিক্ত কান্নায় জবার মত লাল ওঁর দু’চোখ। স্কারলেটকে খরদৃষ্টি হেনে উনি আবার স্যুয়েলেনের দিকে চোখ ফেরালেন। ক্রুদ্ধ সে দৃষ্টি, স্যুয়েলেনের কপালে নির্ঘাত দুঃখ আছে।
ওঁর আর ওঁর স্বামীর পেছনেই চারজন টার্লটন কন্যা দাঁড়িয়ে। শোকের আবহে ওদের লাল চুল অসংবৃত, ওদের পিঙ্গলবর্ণের চোখ ক্ষুধার্ত পশুর মত সজীব এবং বিপদের সঙ্কেতবাহী।
ক্যারীনের জীর্ণ প্রার্থনাপুস্তক হাতে নিয়ে অ্যাশলে এগিয়ে যেতেই, সবাই মাথা থেকে টুপি খুলে নিয়ে সুস্থির হয়ে দাঁড়াল, মেয়েদের স্কার্টের খসখস শব্দ থেমে গেল। কয়েক মুহুর্তের জন্য মাথা নীচু করে দাঁড়াল অ্যাশলে, ওর সোনালি চুল সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। জনতার কোলাহল বন্ধ হয়ে গেল। নিস্তব্ধ পরিবেশ, কেবল ম্যাগনোলিয়া পাতাগুলো আন্দোলিত করে বাতাস মর্মরধ্বনী তুলে যাচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসা একটা মকিংবার্ডের একঘেয়ে ডাক পরিবেশ বিষণ্ণ করে তুলছে। অ্যাশলে প্রার্থনা পাঠ শুরু করল। ওর মন্দ্র সুললিত কণ্ঠের আবেগমথিত পাঠ শুনে সকলেই শ্রদ্ধায় ভক্তিতে মাথা নীচু করল।
“আহ্!” স্কারলেট আবেগতাড়িত হয়ে ভাবল। “কী সুন্দর কণ্ঠস্বর ওর! বাপির জন্য এটা যদি কাউকে করতেই হত, তাহলে সেটা যে অ্যাশলে করছে, তাতেই আমি খুব খুশি। যাজকের বদলে অ্যাশলেকেই এই কাজে আমার বেশি পছন্দ। অপরিচিত কারোর বদলে বাপিকে সমাধিস্থ তাঁর নিজের লোকেরাই করুক।”
যখন অ্যাশলে ক্যারীনের দাগিয়ে দেওয়া পার্গেটরি৩ সংক্রান্ত প্রার্থনার জায়গায় পৌঁছল, আচমকা বইটা বন্ধ করে ফেলল। ব্যাপারটা একমাত্র ক্যারীনই লক্ষ্য করল। অ্যাশলে প্রভুর উদ্দেশ্যে স্তব শুরু করতেই ও হতভম্ব হয়ে মুখ তুলে তাকাল। অ্যাশলে জানত উপস্থিত মানুষদের অর্ধেকেরই পার্গেটরি সম্বন্ধে কিছু জানা নেই, আর যাঁরা জানেন, তাঁরাও ব্যাপারটাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেবেন, যদি ও কোনও ভাবে প্রতিপন্ন করতে চায় – এমনকি প্রার্থনার মধ্যে দিয়েও প্রতিপন্ন করতে চায় – যে মিস্টার ও’হারার মত একজন অতি সজ্জন মানুষও সরাসরি স্বর্গে যেতে পারেননি। সমবেত মানুষের ভাবপ্রবণতার প্রতি সম্মান জানিয়ে অ্যাশলে তাই পার্গেটরির অংশটার উল্লেখই করল না। সমবেত জনতা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে প্রভুর স্তবে গলা মেলালো। কিন্তু অ্যাশলে যখন ‘হেইল মেরি’৪ স্তব শুরু করল তখন জনতার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হতে হতে এক অস্বস্তিকর নীরবতায় মিলিয়ে গেল। এই স্তব এরা আগে কখনও শোনেনি, ও’হারা বোনেরা, মেলানি আর টারার দাসদাসীরা যখন গাইছে, ‘আমাদের নিমিত্ত প্রার্থনা করিবেন, এক্ষণে, এবং যখন আমরা মৃত্যুর সমীপবর্তী হইব সেই ক্ষণেও । আমেন।’, তখন চুপিচুপি ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
এবার অ্যাশলে উঠে দাঁড়াল। মাথা তুলে উপস্থিত জনতার দিকে তাকাল। পলকের জন্য অনিশ্চয় চাউনি। পাড়াপড়শিরা প্রত্যাশাপূর্ণ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে। দীর্ঘ এক বক্তৃতা শোনার জন্য গুছিয়ে বসছে। অ্যাশলে যে ক্যাথলিক প্রার্থনার সমাপ্তি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, সেটা বুঝতে না পেরে, বাকি ক্রিয়াকর্মের প্রতীক্ষা করতে লাগল। সাধারণত কাউন্টিতে শেষকৃত্যের কাজকর্ম বেশ অনেকটা সময় নিয়েই চলতে থাকে। ব্যাপ্টিস্ট কিংবা মেথডিস্ট যাজকদের শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট কোনও প্রার্থনামন্ত্র নেই। পরিস্থিতি বুঝে ওঁরা নির্বাচন করে নেন। শোকার্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে দেওয়া আর পরিবারের মহিলা সদস্যরা বুক চাপড়ে বিলাপ করতে শুরু করার আগে পর্যন্ত ওঁরা মন্ত্রোচ্চারণ বন্ধ করেন না। প্রিয় বন্ধুর মরদেহের সামনে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত হলে প্রতিবেশীরা যে বিস্মিত, ব্যথিত এবং ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে পারেন সেটা অ্যাশলের থেকে বেশি কেউ জানে না। কাউন্টির ঘরে ঘরে খাবার টেবিলে এটা একটা আলচনার বিষয় হয়ে উঠবে। ওরা মনে করে নেবে ও’হারা কন্যারা তাদের পিতার প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাতে পারেনি।
ক্যারীনের দিকে দ্রুত এক কুণ্ঠিত দৃষ্টি হেনে, মাথা আবার নত করে, টুয়েলভ ওকসে ক্রীতদাসদের কবর দেওয়ার সময় বিশপ পরিচালিত চার্চের রেওয়াজ মেনে যেসব মন্ত্রোচ্চারণ ও নিজেই অনেকবার করেছে, সেগুলোই স্মৃতির ওপর নির্ভর করে আবৃত্তি করতে লাগল।
“আমিই পুনরুজ্জীবন এবং চেতনা – তোমরা যাহারা আমার প্রতি বিশ্বাস রাখিবে – তাহারা সকলেই অমরত্ব লাভ করিবে।”
কথাগুলো মনে পড়তে সময় লাগছিল। তাই খুব ধীরে ধীরে বলতে হচ্ছিল, মাঝে মাঝে চুপ করেও যাচ্ছিল, যাতে কথাগুলো স্মৃতি হাতড়ে উঠে আসে। কিন্তু ওর এই থেমে থেমে আবৃত্তি করায় জনতার অনুভূতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করল। এতক্ষন পর্যন্ত যাদের চোখে জল ছিল না, তারাও পকেট থেকে রুমাল বের করতে বাধ্য হল। গোঁড়া ব্যাপ্টিস্ট এবং মেথডিস্ট হওয়ার সুবাদে, ওদের মনে ক্যাথলিক শেষকৃত্যের রেওয়াজ যে আসলে পোপের শেখানো লঘু, বৈশিষ্টহীন ব্যাপার, এরকম একটা বিশ্বাস ছিল। এখন মনে হল ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে। স্কারলেট আর স্যুয়েলেনও এসব ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। কথাগুলো ওদের কাছে সুন্দর এবং সান্ত্বনাদায়ী বলে মনে হল। একমাত্র মেলানি আর ক্যারীনই বুঝল যে একজন গোঁড়া ক্যাথলিক আইরিশম্যানকে চার্চ অফ ইংল্যান্ডের প্রথা মেনে কবর দেওয়া হল। শোকে আর অ্যাশলের বিশ্বাসঘাতকতায় ক্যারীন এতটাই হতচকিত হয়ে পড়েছিল যে কিছুই বলে উঠতে পারল না।
বলা শেষ হওয়ার পর অ্যাশলে বিষণ্ণ ধূসর চোখ মেলে জনসমাবেশের দিকে তাকাল। একটু বিরতি নিল। উইলের চোখে ওর চোখ পরল। বলল, “উপস্থিত কেউ কি দু’চার কথা বলতে চান?”
মিসেজ় টার্লটন বিচলিত মুখে একটু নড়েচড়ে বসলেন। কিন্তু উনি কিছু বলার আগেই উইল কাঠের পা ফেলে কফিনের কাছে এগিয়ে এসে বলতে শুরু করল।
“বন্ধুগণ,” ক্ষীণ একঘেয়ে কণ্ঠে বলতে শুরু করল, “আপনারা হয়ত ভাবছেন – প্রথমেই কথা বলতে আসাটা আমার পক্ষে উচিৎ হয়নি – এই এক বছর আগেও আমি মিস্টার ও’হারাকে জানতামই না – আর আপনারা কুড়ি বা তারও বেশি বছর ধরে ওঁকে চিনতেন। আমি একটা সাফাই দিতে চাই, সেটা হল, আর এক মাসও যদি উনি বেঁচে থাকতেন, তাহলে ওঁকে আমার বাপি বলে ডাকার অধিকার পেয়ে যেতাম।”
জনতার মধ্যে চাঞ্চল্যের একটা স্রোত বয়ে গেল। অবাক হয়ে নিজেদের মধ্যে কানাকানি করার মত হীন মানসিকতা ওদের নেই। তাই উঠে দাঁড়িয়ে ক্যারিনের নত মস্তকের দিকে তাকাল। উইলের ক্যারীনের প্রতি নীরব নিষ্ঠার কথা সবাই জানত। জনতার নজর কোন দিকে যাচ্ছে দেখে নিয়ে উইল ওর বক্তব্য চালিয়ে যেতে লাগল, যেন কিছুই লক্ষ্য করেনি।
“যা ঠিক হয়েছে তা হল আমি মিস স্যুয়েলেনকে বিয়ে করব – অ্যাটলান্টা থেকে শুধু যাজক এসে পৌঁছনোর অপেক্ষা। তাই ভাবলাম হয়ত এই সম্পর্ক আমাকে প্রথমে কথা বলার অধিকার দেবে।”
ওর বক্তব্যের এই শেষের অংশটা জনতার মৃদু অথচ ক্ষুব্ধ গুঞ্জনে ডুবে গেল। সেই গুঞ্জনে ক্ষোভের সঙ্গে সঙ্গে হতাশাও মিশে ছিল। উইলকে প্রত্যেকেই ভালবাসত। টারার জন্য যা করেছে, তার জন্য ওকে সম্মানও করত।
উইলের নিষ্ঠা ক্যারীনের প্রতি ছিল বলেই সবাই জানত। তার বদলে উইল পাড়া যাকে ব্রাত্য করেছে এমন একজনকে বিয়ে করতে চলেছে শুনে ওদের খারাপ লাগল। ভালমানুষ উইল কিনা শেষে ওই জঘন্য, চক্রান্তকারী স্যুয়লেন ও’হারার পাণিগ্রহণ করবে!
কয়েক মুহুর্তের জন্য পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল। মিসেজ় টার্লটনের দৃষ্টি খর হয়ে উঠল, ওষ্ঠযুগলে নিঃশব্দ ক্রোধের অভিব্যক্তি। নৈঃশব্দের মধ্যে বৃদ্ধ ম্যাকর্যে’র উচ্চকণ্ঠ শোনা গেল, নাতির কাছে জানতে চাইছেন উইল কী বলল। উইল খুব শান্তভাবে পরিস্থিতির মোকাবেলা করল। কিন্তু ওর ফ্যাকাসে নীল চোখের ভাষায় এমন কিছু ছিল যে ওর হবু বউয়ের বিরুদ্ধে কেউ কোনও কথা বলতে সাহস করল না। কিছুক্ষণ ধরে উইলের প্রতি ওদের অকৃত্রিম স্নেহ আর স্যুয়েলেনের প্রতি ঘৃণা নিয়ে ওদের মনের মধ্যে টানাপোড়েন চলল। শেষ পর্যন্ত জয় হল উইলের। বক্তৃতার মধ্যে ক্ষণিকের বিরতিটা যেন স্বতঃস্ফূর্ত এরকম একটা ভাব করে ও কথা বলা চালিয়ে গেল।
“তরুণ মিস্টার ও’হারাকে আমার জানার সুযোগ হয়নি, যেমনটা আপনারা সকলেই ওঁকে জেনেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি যা জানতে পেরেছি, তার থেকে বলতে পারি উনি একজন অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন। তবে আমার প্রত্যক্ষ জ্ঞান খুবই সীমিত। উনি কী ধরণের মানুষ ছিলেন সেটা আমি আপনাদের কাছ থেকেই বেশি জেনেছি। তার ভিত্তিতে আমি একটা কথা বলতে চাই। উনি একাধারে একজন লড়াকু আইরিশম্যান, দক্ষিণী সংস্কৃতির ভদ্রলোক এবং একজন অনুগত কনফেডারেট ছিলেন। এর চেয়ে ভাল সংযোগ আর কী হতে পারে? এই রকম একজন মানুষ আজকের যুগে বিরল। কারণ এই ধরণের মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, যে যুগ এই সব মানুষের জন্ম দিয়েছে, সেই যুগও অতীত হয়ে যাচ্ছে। অনেক দূরের একটা দেশে ওঁর জন্ম হয়েছিল, কিন্তু আজ যাঁকে আমরা এখানে সমাধিস্থ করছি তিনি সমবেত শোকস্তব্ধ মানুষের থেকে কোনও ভাবেই কম জর্জিয়ান ছিলেন না। আমাদের মতই ছিল ওঁর জীবনযাপন, আমাদের এই দেশকেই মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিলেন, আর সব থেকে বড় কথা, আমাদের সৈন্যরা যে আদর্শের জন্য লড়াই করেছিল, উনি সেই আদর্শের জন্যই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। উনি ছিলেন আমাদেরই একজন। আমাদের যা কিছু ভাল, যা কিছু খারাপ, সবই ওঁর মধ্যেও ছিল। আমাদের শক্তির জায়গা, আমাদের দুর্বলতা, ওঁরও শক্তির জায়গা, ওঁরও দুর্বলতা। কোনো ব্যাপারে একবার মনস্থির করে নিলে, ওঁকে আটকানোর সাধ্য কারুরই ছিল না। বাইরের কোনও শত্রুর ভয়ই ওঁকে দমিয়ে দিতে পারত না।
“যে ইংরেজ সরকার ওঁকে ফাঁসিতে লটকাতে চেয়েছিল, তাদের উনি ভয় পাননি। অগ্রপশ্চাত না ভেবে উনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। এই দেশে যখন এলেন, তখন উনি কপর্দকশূন্য, কিন্তু উনি বিন্দুমাত্র ভয় পাননি। কঠোর পরিশ্রম করে অনেক অর্থ উপার্জন করলেন। তখন এই এলাকা ছিল বনজঙ্গলে ভর্তি, ইন্ডিয়ানরা সবে এখান থেকে পালিয়ে গেছে। উনি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাননি। বনজঙ্গল কেটে উনি বিশাল এক প্ল্যান্টেশন প্রতিষ্ঠা করলেন। তারপর যখন যুদ্ধ শুরু হল, ওঁর সঞ্চয়ে হাত পড়ল, অভাব বাড়তে থাকল, কিন্তু ওঁকে বিচলিত করতে পারল না। তারপর ইয়াঙ্কিরা এল টারাতে। ওরা আগুন লাগিয়ে দিতে পারত, ওঁকে খুন করতে পারত, কিন্তু উনি ভয় পাননি, ইয়াঙ্কিরা ওঁকে দমিয়ে দিতে পারেনি। উনি কঠোর হাতে ওদের বাধা দিয়েছিলেন। তাই বলছি, এগুলোই ওঁর স্বভাবের গুণের দিক। বাইরের কোনও শক্তিই আমাদের হারাতে পারে না।
“ঠিক আমাদেরই মত ওঁর স্বভাবের একটা দোষের দিকও ছিল। আভ্যন্তরীণ সমস্যায় উনি বিচলিত হতেন। মানে আমি যা বলতে চাইছি তা হল, বাইরের বিপদ ওঁকে হারাতে না পারলেও অন্তরে আঘাত পেলে উনি সহ্য করতে পারতেন না। মিসেজ় ও’হারার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ওঁর অন্তরাত্মারও মৃত্যু হয়ে গেছিল। উনি হেরে গেলেন। যে মানুষটাকে আমরা চলতে ফিরতে দেখতাম, উনি সেই আগের মানুষ আর ছিলেন না।”
কথা বলা বন্ধ রেখে উইল নীরবে একবার চারপাশে শ্রোতাদের মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে নিল। কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্যুয়েলেনের বিরুদ্ধে যে আক্রোশ ওদের মনের মধ্যে জমা হয়েছিল সেটা ওরা ভুলে গেছে। পলকের জন্য উইল স্কারলেটের দিকে তাকাল। চোখের কোনে একটা ঢেউ খেলে গেল, যেন নীরবে স্কারলেটকে সান্ত্বনা দিতে চেয়ে। স্কারলেট প্রাণপণে অশ্রু সম্বরণ করার চেষ্টা করতে ব্যস্ত। স্কারলেট সত্যি সত্যিই সান্ত্বনা পেল। উইল সর্বসাধারণের বোধগম্য ভাষায় কথা বলছে। পরলোকে মৃত প্রিয়জনদের সঙ্গে পুনর্মিলন বা শ্রেষ্ঠতর জীবনে উত্তরণ, এই জাতীয় হাবিজাবি কথা বলে মিছিমিছি সময় নষ্ট করছে না। আর সর্বসাধারণের বোধগম্য ভাষাই স্কারলেটকে সর্বদা সান্ত্বনা আর মনের জোর জুগিয়েছে।
“উনি হেরে গেছিলেন। তবে আমার মনে হয় না এই হেরে যাওয়ার জন্য, ওঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা কমে যাবে। ওঁর মতই আমরাও তো কখনও কখনও হার মানতে বাধ্য হই। আমরা সকলেই। কখনো কখনো আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি, ভেঙে পড়ি। ইয়াঙ্কি বা কার্পেটব্যাগার বা অন্য কোনও শত্রুকে উনিও ভয় পেতেন না, আমরাও পাই না। কিন্তু যখন আঘাতটা আমাদের হৃদয়ে লাগে, তখন হয়ত আমরা হেরে যেতে বাধ্য হই। তাই বলে কি ভালবাসা, শ্রদ্ধা কম হয়ে যায়? মিস্টার ও’হারা এই রকম আঘাত পেয়েই হেরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা চালিকাশক্তি কাজ করে। আর যখন সেই শক্তি আর আমাদের চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে না, তখনই আমাদের মৃত্যু হয়। ওঁদের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে যায়, মৃত্যু এসে ওঁদের শান্তি দেয়। তাই বলি, আজ যখন আমরা মিস্টার ও’হারাকে সমাধিস্থ করতে এসেছি, যখন ওঁর শরীর আর মন অন্তরাত্মায় বিলীন হয়ে গেছে, তখন আমরা শোকার্ত হয়ে তাঁর আত্মাকে অসম্মান করব না। খুব স্বার্থপরের মত কাজ হবে সেটা। আমি ওঁকে নিজের পিতা বলেই মনে করতাম – শ্রদ্ধা করতাম … সেই অধিকারেই বলি, যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে, তাহলে আর ওঁকে স্মরণ করে আমরা আর কোনও কথাই বলব না। পরিবারের মানুষজন শোকে এতটাই মুহ্যমান, যে এখন মিস্টার ও’হারাকে নিয়ে আরও কিছু বলা মানে ওঁদের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো।”
উইল থামল। তারপর মিসেজ় টার্লটনের দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় বলল, “যদি কিছু মনে না করেন, স্কারলেটকে একটু বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে পারবেন, ম্যাম? এতক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকলে ও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর গ্র্যান্ডমা ফোনটেনকেও তো খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।”
শ্রদ্ধাজ্ঞাপন থেকে আচমকা স্কারলেটের প্রসঙ্গে চলে আসায় সকলের দৃষ্টি ওর দিকে ঘুরে গেল। স্কারলেট লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কী দরকার ছিল উইলের ওপরপড়া হয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার যে ও অন্তসত্ত্বা, যখন ব্যাপারটা সকলেই বুঝতে পারছে? রাগ রাগ চোখ করে উইলের দিকে তাকাল। উইলের শান্ত দৃষ্টিতে নীরব আবেদন।
ও যেন বলতে চাইছে, “প্লীজ়, কথাটা যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করেই বলেছি।”
উইল ইতিমধ্যেই বাড়ির সকলের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। তাই উচ্চবাচ্য না করে অসহায়ভাবে মিসেজ় টার্লটনের দিকে তাকাল। উইল ঠিক যেমনটা চেয়েছিল – যে কোনও প্রজননসংক্রান্ত ব্যাপারকে কেন্দ্র করে মিসেজ় টার্লটনের যেরকম সজীব আকর্ষণ – স্যুয়েলেনের ভাবনা মন থেকে সরিয়ে দিয়ে স্কারলেটের বাহু স্পর্শ করলেন।
“বাড়ির ভেতরে চল, সোনা।”
স্নেহ মেশানো, উৎসুক দৃষ্টি মিসেজ় টার্লটনের চোখে। ওঁর হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে কুণ্ঠিত পদক্ষেপে স্কারলেট চলল। দু’পাশে সরে গিয়ে জনতা একটা সরু পথ করে দিল ওঁদের যাওয়ার জন্য। সমবেদনাসূচক গুঞ্জন। অনেকে হাত বাড়িয়ে ওর কাঁধে সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিল। গ্র্যান্ডমা ফোনটেনের কাছে আসতেই উনি সস্নেহে শীর্ণ হাত স্কারলেটের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, “তোমার বাহুটা ধরতে দাও সোনা,” তারপর স্যালি আর অল্পবয়সী মিস ফোনটেনের দিকে কঠিন দৃষ্টি হেনে বললেন, “তোমরা এসো না। তোমাদের দরকার নেই আমার।”
ধীরে ধীরে জনতার মধ্য দিয়ে ওরা ছায়াছন্ন পথ ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মিসেজ় টার্লটন স্কারলেটকে কনুইয়ের কাছে এমন বজ্রমুঠিতে ধরে রেখেছিলেন, মনে হচ্ছিল প্রতি পদক্ষেপে ওকে যেন ভূমি স্পর্শ করতেই হচ্ছে না।
“কিন্তু উইল এরকম কাজ করল কেন?” যখন আর কারও কর্ণগোচর হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তখন স্কারলেট রাগস্বরে বলল। “ও যেন লোকের দিকে আঙ্গুল তুলে বুঝিয়ে দিল, ‘তাকিয়ে দেখ, ওর বাচ্চা হবে!’”
“ঈশ্বরের অসীম কৃপা স্কারলেট, তুমি ঠিক আছ, তাই না?” মিসেজ় টার্লটন বলে উঠলেন। “ঠিকই তো করেছে উইল। অমন রোদে দাঁড়িয়ে তুমি মূর্চ্ছা যেতে পারতে! তোমার গর্ভপাত হয়ে যেতে পারত!”
“উইল মোটেই স্কারলেটের গর্ভপাত নিয়ে কোনও দুশ্চিন্তায় ছিল না,” চলতে চলতে হাঁপ ধরে যাওয়া গলায় গ্র্যান্ডমা বলে উঠলেন। ঠোঁটের কোণে চতুর হাসি। “খুব চালাক লোক, উইল। তুমি বা আমি সমাধির জায়গায় থাকি, সেটা ও চায়নি। আমরা কী বলব, সেটা ও আন্দাজ করে নিয়েছিল – আর ওখান থেকে আমাদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য এটাই সব থেকে ভাল পন্থা – তবে আরও একটা দিকও আছে। কফিনের ওপর মাটি ফেলার শব্দটা ও স্কারলেটকে শুনতে দিতে চায়নি। ঠিকই করেছে। মনে রেখো স্কারলেট, যতক্ষণ না ওই শব্দটা তুমি শুনছ, ততক্ষণ তোমার কাছে তিনি মৃত নন। একবার ওই শব্দটা শুনে ফেললেই … আসলে ওটাই অন্তিম যাত্রার নিদারুণ সঙ্কেত … সিঁড়ি চড়ার জন্য একটু সাহায্য কর বাছা – হাতটা একটু দাও তো বিয়্যাট্রিস। ঠিক আছে স্কারলেট, তোমার বাহুতে আর ভর না দিলেও চলবে, যেমন ওর লাঠিতে ভর না দিলেও চলে। আর আমি সত্যিই ক্লান্তিবোধ করছি – উইল ঠিকই ধরেছে … তুমি যে তোমার বাপির খুব আদরের, সেটাও উইল জানে, তাই তোমার কষ্ট যাতে আরও না বাড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখেছে। ও ঠিকই বুঝেছে তোমার অন্য বোনেদের জন্য ব্যাপারটা অত কঠিন হবে না। স্যুয়েলেন ওর জঘন্য কাজের জন্য মনে মনে জ্বলবে। আর ক্যারীনের জন্যে তো স্বয়ং ঈশ্বর রয়েছেন। কিন্তু তোমাকে ভরসা দেবার মত কেউ কি আছে, বাছা?”
“উহুঁ, বৃদ্ধাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে সাহায্য করতে করতে জবাব দিল। বৃদ্ধার গলায় ওর মনের কথাটা প্রতিধ্বনিত হতে দেখে সামান্য অবাকই হল। “ভরসার জায়গা বলতে আমার কখনোই কিছু ছিল না – একমাত্র মা ছাড়া।”
“তবে তোমার মা যখন চলে গেলেন, তুমি বুঝতে পারলে, তুমি নিজের ওপরেও ভরসা করতে পার, তাই না? অনেকেই পারে না। তোমার বাপি পারেননি। উইল ঠিকই বুঝেছে। মনে কষ্ট রেখো না তুমি। এলেনকে ছেড়ে উনি থাকতে পারতেন না। তাই এলেনের কাছেই চলে গেলেন। সুখেই থাকবেন। আমি যেদিন বুড়ো ডাক্তারবাবুর কাছে চলে যেতে পারব, আমিও সুখী হব।”
কথাগুলো বললেন, কিন্তু তার মধ্যে সহানুভূতির কোনও প্রত্যাশা নেই। ওরা সেই চেষ্টাও করল না। কথাগুলো বললেন বেশ জোর দিয়ে। যেন ওঁর স্বামী বেঁচেই আছেন। গাড়িতে ঘোড়া জুতে জোন্সবোরোর পর্যন্ত অল্প দূরত্ব পার করতে পারলেই দেখা হবে। গ্র্যান্ডমা যথেষ্ট বৃদ্ধ, সংসারের অনেক কিছুই দেখেছেন, অনেক অভিজ্ঞতা। তাই মৃত্যুকে ভয় পান না।
“কিন্তু – নিজের ওপর ভরসা তো আপনারও খুব,” স্কারলেট বলল।
বৃদ্ধা দীপ্তচোখে স্কারলেটকে নিরীক্ষণ করলেন।
“তা ঠিক। তবে কি জানো, কখনো কখনো বড় একা লাগে।”
“আমার মনে হয়, গ্র্যান্ডমা,” মিসেজ় টার্লটন বাধা দিয়ে বললেন, “স্কারলেটের সঙ্গে এখন এসব কথা না বললেই ভাল করবেন। বেচারা এমনিতেই খুব মনমরা হয়ে আছে। একে তো এত লম্বা একটা সফর করে এল, তার ওপরে শোক, রোদের তাপ – সব মিলিয়ে যথেষ্ট ধকল গেছে, এখন যদি ওকে এসব কথা বলে মন ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে ওর গর্ভপাত হয়ে যাওয়া কে আটকাবে?”
“নিকুচি করেছে!” বিরক্ত মুখে স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “আমি একটুও মনমরা হয়ে নেই! আর যাদের কথায় কথায় গর্ভপাত হয়ে যায়, আমি সেরকম বুদ্ধু মেয়েদের দলে নই!”
“অত জোর দিয়ে কিছু বলা যায় না,” বেশ একটা সবজান্তা মুখ করে মিসেজ় টার্লটন বললেন। “আমিই প্রথম সন্তানটা হারিয়েছি – একটা ষাঁড় গুঁতিয়ে দিল আমাদের একটা নীগ্রোকে – নিজের চোখে দেখলাম! আমার ওই লাল মাদী ঘোড়াটাকে মনে আছে – নেলী? এমন স্বাস্থ্যবতী মাদী ঘোড়া খুব কমই দেখা যায়। তবে ওটা ছিল খুবই ছটফটে আর বদমেজাজি! যদি আমি খেয়াল না রাখতাম, তাহলে ও – ”
“তুমি একটু থামবে, বিয়্যাট্রিস,” গ্র্যান্ডমা বলে উঠলেন। “স্কারলেটের গর্ভপাত হবে না, আমি শর্ত লাগাতে রাজি আছি। এস, এই হলটা ঠাণ্ডা আছে – এখানে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। কী ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে! যাও তো, আমাদের জন্য একটু লস্যি নিয়ে এস তো বিয়্যাট্রিস – কিচেনে যদি থাকে। কিংবা প্যান্ট্রিতে যদি একটু ওয়াইন পাওয়া যায়। আমার এক গেলাস হলেই হবে। সবাই ফিরে এলে দেখা করে চলে যাব।”
“স্কারলেটের এখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার,” মিসেজ় টার্লটন দমে না গিয়ে বললেন। যেন গর্ভাবস্থার শেষ অবস্থা পর্যন্ত ওঁর হিসেব করা আছে।
“কী হল? গেলে না?” গ্র্যান্ডমা হাতের ছড়ি দিয়ে ইশারা করলেন। মিসেজ় টার্লটন কিচেনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। যেতে যেতে হ্যাটটা সাইডবোর্ডের ওপর ফেলে দিয়ে ভিজে লালচুলের ভেতর হাত চালালেন।
স্কারলেট চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে টাইট ব্লাউজ়ের ওপরের দুটো বোতাম খুলে দিল। উঁচু সিলিংঅলা হলঘরটা আরামদায়কভাবে ঠাণ্ডা। এতক্ষণ রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘরের পেছন থেকে সামনে বয়ে আসা মৃদুমন্দ বাতাসটা বেশ ভাল লাগছে। হল পেরিয়ে ওর চোখ চলে গেল বসার ঘরের দিকে, যেখানে জেরাল্ডকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর চোখ তুলে গ্র্যান্ডমা রোবিল্যারের ছবির দিকে তাকাল, এলোমেলো ভাবনা চিন্তাগুলো দূরে সরানোর জন্য। বেয়নেটে ক্ষতবিক্ষত ছবিতে চুড়ো করে বাঁধা ওঁর কেশরাশি, অর্ধোন্মোচিত বক্ষদেশ আর উদ্ধত চাউনি। সর্বদা যেমন হয়ে থাকে, ছবিটার দিকে চেয়ে স্কারলেটের মনের জোর ফিরে এল।
“ঠিক বুঝতে পারি না বিয়্যাট্রিস টার্লটনকে কোনটা বেশি আঘাত করেছে – ছেলেদের চলে যাওয়া না ওর ঘোড়াদের?” গ্র্যান্ডমা ফোনটেন বললেন। তুমি তো জানোই জিম বা ওর মেয়েদের দিকে কোনোদিনই বিশেষ নজর দেয়নি। উইল যাদের কথা বলছিল, বিয়্যাট্রিস তাদের মধ্যে একজন। ওর চালিকাশক্তি আর কাজ করছে না। মাঝে মাঝে আমার ভয় হয় ওরও না তোমার বাপির মত অবস্থা হয়। ঘোড়া হোক কি মানুষ, বংশবৃদ্ধি চোখের সামনে না দেখতে পেলে ও স্বস্তি পেত না। ওর একটা মেয়েরও বিয়ে হল না এখন পর্যন্ত, ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না। মনেপ্রাণে ও যদি একজন লেডি না হত, তাহলে অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ হয়ে পড়ত … আচ্ছা স্যুয়েলেনকে বিয়ে করার ব্যাপারটা – উইল কথাটা কি সত্যি বলল?”
“সত্যি,” স্কারলেট বৃদ্ধার চোখে চোখ রেখে বলল। মনে পড়ল ছোটবেলায় গ্র্যান্ডমা ফোনটেনকে যমের মত ভয় পেত! কিন্তু এখন ও আর ছোট নেই। যদি উনি টারার ব্যাপারে নাক গলাতে আসেন তবে মুখে ঝামা ঘষে দেবে।
“আরেকটু ভাল কিছু করতে পারত,” গ্র্যান্ডমা রাখঢাক না করেই বললেন।
“তাই বুঝি?” স্কারলেট উদ্ধতভাবে বলল।
“পা দুটো একটু মাটিতে নামাও, মিস,” তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলেন বৃদ্ধা। “তোমার গুণধর বোনের ব্যাপারে কিছু বলছি না। সমাধিক্ষেত্রে থাকলে হয়ত বলতাম। বলতে চাইছি, এখন তো আমাদের এলাকায় ছেলেদের আকাল পড়ে গেছে, তাই উইল অন্য যে কোনও মেয়েকেই বিয়ে করতে পারত। বিয়্যাট্রিসের চারজন প্রাণচঞ্চল মেয়ে আছে, তারপর মুনরোদের মেয়েরা আর ম্যাকর্যেদের – ”
“কিন্তু ও স্যুকেই বিয়ে করবে, সেটার নড়চড় হবে না।”
“কী ভাগ্য স্যুয়ের, উইলকে পাচ্ছে।”
“কী ভাগ্য টারার, উইলকে পেয়েছে।”
“এই জায়গাটাকে তুমি খুব ভালবাস, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“এতটাই ভালবাস যে তোমার বোনের সাথে যার বিয়ে হবে তার সামাজিক মর্যাদা তোমাদের সমান না হলেও কিছু এসে যায় না, তাই না? টারার ভাল মন্দ দেখার জন্য একজন পুরুষমানুষ হলেই চলবে!”
“সামাজিক মর্যাদা?” কথাটা স্কারলেটকে চমকে দিল। “সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন এখন উঠছে কেমন করে? যখন একটা মেয়ে স্বামী হিসেবে একজনকে পাচ্ছে যে ওর দেখভাল করতে পারবে?”
“কথাটা তর্কসাপেক্ষ,” বৃদ্ধা বললেন। “কেউ কেউ হয়ত বলবে তুমি সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছ। আবার অন্যরা বলতে পারে এতে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। উইলকে কোনোভাবেই ভদ্রলোক পর্যায়ভুক্ত করা যায় না, যেমন তোমাদের পরিবারের কেউ কেউ ছিলেন।”
তীক্ষ্ণ চোখে বৃদ্ধা গ্র্যান্ডমা রোবিল্যারের ছবির দিকে তাকালেন।
মনে মনে স্কারলেট উইলের একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করল। ডিগডিগে, বৈশিষ্টহীন, ঢিমে, এক টুকরো খড় চিবিয়েই চলেছে। চেহারা ছবিতে যেন তৎপরতার অভাব, ঠিক ক্র্যাকারদের মত। সম্পদশালী, প্রতিষ্ঠিত, সম্ভ্রান্ত পূর্বপুরুষের লম্বা তালিকাও কিছু নেই। জর্জিয়ার মাটিতে উইলের যে পূর্বপুরুষ প্রথম পা রেখেছিল সে হয়ত ওগেলথর্প৫-এর একজন দেনদার ছিল অথবা কোনও চুক্তিভুক্ত শ্রমিক। উইল কলেজে পড়াশোনা করেনি। পাড়াগাঁয়ের কোনও স্কুলে বছর চারেকের পড়াশোনাই হয়ত ওর বিদ্যের দৌড়। ওর মধ্যে সততা আছে, ও অনুগত, ধৈর্য আছে আর কঠোর পরিশ্রম করতে পারে। হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই ওর কোনও সামাজিক মর্যাদা নেই। আর রোবিল্যারদের মাপকাঠি মোতাবেক, স্যুয়েলেনের সামাজিক মর্যাদায় স্খলন ঘটবে।
“তাহলে উইল তোমাদের পরিবারের একজন হলে তোমার কোনও আপত্তি নেই?”
“একটুও নেই,” স্কারলেট বেশ হিংস্রভাবে জবাব দিল। ভাবটা এমন যেন কোনোরকম নিন্দে শুনলেই একেবারে বৃদ্ধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
“তুমি আমাকে একটা চুমু খেতে পার,” স্কারলেটকে অবাক করে দিয়ে গ্র্যান্ডমা বলে উঠলেন। মুখে অনুমোদনের হাসি। “স্কারলেট, তোমাকে আমি খুব যে পছন্দ করতাম, সেটা বলতে পারি না। খুব তেজ তোমার। আর কেবল নিজেকে ছাড়া আর কোনও মহিলার মধ্যে তেজ থাকা আমার পছন্দ নয়। তবে তোমার সংকট মোকাবেলা করার সাহসের আমি তারিফ করি। যেটা অনিবার্য, সেটা নিয়ে অযথা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড় না। এমনকি সেটা যদি তোমার চরম অপছন্দ হয়, তাও। একজন দক্ষ শিকারির মত তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পার।”
দ্বিধাভরে স্কারলেট হেসে উঠে বাধ্য মেয়ের মত বৃদ্ধার এগিয়ে দেওয়া শীর্ণ গণ্ডে ঠোঁট ঠেকাল। ওঁর মঞ্জুরিসূচক কথাগুলো শুনতে বড় ভাল লাগছিল। যদিও সব কথা ঠিক মত বুঝেছে কিনা সে ব্যাপারে সংশয় থেকে গেল।
“স্যুকে একজন ক্র্যাকারের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া নিয়ে তোমার সিদ্ধান্তকে নিন্দা করার লোকের অভাব হবে না। উইলকে কিন্তু এরা ভালবাসে, পছন্দও করে। একদিকে ওরা বলবে উইল খুব ভাল লোক। আবার অন্যদিকে বলাবলি করবে সামাজিক মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে একজন ও’হারা মেয়ে এমন কলঙ্কজনক বিয়েটা করেই ফেলল! তুমি ওদের কথায় কান দিও না।”
“অন্যদের কথায় আমি কখনোই কান দিই না।”
“সে আমি ভাল মতই জানি,” বৃদ্ধার গলায় সামান্য তিক্ততা। “যাই হোক, লোকে কী বলছে, তাতে কান না দেওয়াই ভাল। আমার নিজের ধারণা এই বিয়েটা খুবই সফল হবে। একথা ঠিক যে উইলকে চিরদিন ক্র্যাকারের মতই দেখতে লাগবে, আর বিয়েটা হলেও ওর ভাষাজ্ঞানের উন্নতিও হবে না। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকাও যদি উপার্জন করতে পারে, টারার সেই ঝকঝকে চকচকে ভাবটা – যেটা তোমার বাপির সময়ে ছিল – সেটা আর ফিরে আসবে না। ক্র্যাকারদের মধ্যে ঝকঝকে ব্যাপারটা একেবারেই নেই। তবে অন্তর থেকে উইল একজন ভদ্রলোক। সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার এক সহজাত ক্ষমতা আছে ওর। আজ সমাধিক্ষেত্রের হাওয়াটা যে ভুল দিকে বইতে চলেছে, সেটা ও নিখুঁতভাবে আন্দাজ করে নিয়েছিল। এই কাজটা ভদ্রলোক না হলে কেউ করতে পারে না। আমাদের অহঙ্কার দুনিয়ার কোনও শক্তি আমাদের সর্বনাশ করতে পারবে না। অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করে যাচ্ছি – যা আর ফিরে পাওয়া যাবে না তার জন্য অনর্থক বিলাপ করে, হারিয়ে যাওয়া অতীত নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। হ্যাঁ, উইলএর সঙ্গে বিয়ে হলে, স্যুয়েলেনের ভাল হবে, টারারও।”
“তাহলে কি ধরে নিতে পারি যে উইল আর স্যুয়েলেনের বিয়েতে আমার মত দেওয়া নিয়ে আপনার কোনো আপত্তি নেই?”
“হে ভগবান! সে কথা কখন বললাম?” বৃদ্ধার গলার স্বরে তিক্ততা, ক্লান্তি, কিন্তু তেজী। “সম্ভ্রান্ত পরিবারে ক্র্যাকারের বিয়ে মেনে নেওয়া? অবাক করলে! সদ্বংশজাতর সঙ্গে নামগোত্রহীনের বিয়ে মেনে নেওয়া? মানছি, ক্র্যাকাররা মানুষ ভাল হয়, সৎ হয়, কিন্তু – ”
“কিন্তু আপনি নিজেই তো বললেন, এই বিয়েটা খুব সফল হবে!” স্কারলেটকে খুব বিহ্বল লাগল।
“না, আমার মনে হয় স্যুয়েলেনের উইলকে বিয়ে করাটা ভালই হবে – অবশ্য সেটা উইল ছাড়া অন্য কেউ হলেও চলবে। কারণ ওর একজন স্বামী দরকার, ভীষণ দরকার। তবে দরকার আছে বললেই তো পাওয়া যায় না, তাই না? আর টারাকে চালানোর জন্য এত ভাল লোকই বা তুমি কোথা থেকে পাবে? তার মানে এই নয় যে ব্যাপারটা আমার খুব পছন্দ হচ্ছে, যেমন তোমারও হচ্ছে না।”
“কিন্তু আমার পছন্দ হচ্ছে,” স্কারলেট মনে মনে ভাবল। বৃদ্ধার কথাগুলোর সঠিক অর্থটা ধরার চেষ্টা করল। “উইল যে স্যুয়েলেনকে বিয়ে করতে চলেছে, এতে আমি খুবই খুশি হয়েছি। উনি কেন ভাববেন যে আমার আপত্তি আছে? উনি ধরেই নিয়েছেন, ওঁর মত আমারও আপত্তি আছে!”
স্কারলেট একটু ধাঁধায় পড়ে গেল, লজ্জাও পাচ্ছিল একটু একটু। যখন কেউ তার নিজের আবেগ বা যুক্তিকে ওরও আবেগ আর যুক্তি বলে ভুল করে তখন ওর এরকম হয়ে থাকে।
তালপাখার পাখাটা নেড়ে গ্র্যান্ডমা বাতাস করতে করতে দ্রুত বেগে বলে চললেন, “ঠিক তোমারই মত, আমিও এই বিয়েটা মেনে নিতে পারি না। কিন্তু তোমারই মত আমিও বাস্তবকে অস্বীকার করে চলি না। কিন্তু কখনও যদি এমন এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয় যাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তখন সেটা নিয়ে অযথা শোরগোল তোলবার পাত্রী আমি নই। জীবনের উত্থান পতনের মোকাবেলা করার উপায় সেটা নয়। খুব ভাল করেই এটা আমার জানা আছে, কারণ আমাদের পরিবার আর বৃদ্ধ ডাক্তারবাবুর পরিবার – দুই পরিবারকেই এরকম অনেক উত্থান পতন দেখতে হয়েছে। নীতি বলে আমরা যদি কিছু মেনে চলি, তবে সেটা হল, “অযথা চেঁচামেচি কোরো না, হাসিমুখে দিন গুজরান কর”। হাসিমুখে দিন গুজরান করে অস্তিত্বের অনেক সঙ্কট থেকেই আমরা রক্ষা পেয়েছি। অস্তিত্ব রক্ষা করে চলার ব্যাপারে আমাদের অনেক দিনের অভিজ্ঞতা। উপায় ছিল না কিছু। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে অনেক ভুল করেছি আমরা। হুগনটদের৬ হাত ধরে ফরাসি দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া, ক্যাভেলিয়ারদের৭ হাত ধরে ইংল্যান্ড থেকে, তারপর বনি প্রিন্স চার্লির৮ সঙ্গ নিয়ে স্কটল্যান্ড থেকে চলে যাওয়া, নিগারদের তাড়া খেয়ে হাইতি থেকে পালানো, আর এখন ইয়াঙ্কিদের হাতে আমাদের সর্বনাশ! কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা সামলে নিতে পেরেছি। কেন জান?”
বলে উনি মাথা ঝাঁকালেন। স্কারলেটের মনে হল ওঁকে ঠিক এক বৃদ্ধ সবজান্তা তোতাপাখির মত লাগছে।
“না, আমি ঠিক জানি না,” খুব নম্রস্বরে স্কারলেট জবাব দিল। কিন্তু এসব শুনতে ওর খুবই একঘেয়ে লাগছিল। যেদিন গ্র্যান্ডমা খাড়ি যুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন, সেদিনের মত।
“তবে কারণটা শোন। ভবিতব্যের কাছে আমাদের নতিস্বীকার করতেই হয়। আমরা গমের গাছের মত নই, আমরা বাজরা গাছের মত। পাকা গমের খেতের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেলে গম গাছ মাটিতে পড়ে যায়, কারণ পাকা গম গাছ একেবারে শুকিয়ে যায়। কিন্তু পাকা বাজরা গাছে প্রাণরস সঞ্চিত থাকে। ঝড়ের দাপটে নুয়ে পড়ে ঠিকই, আবার ঝড় চলে গেলেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, আবার সেই আগের মতই স্বাস্থ্যবান। আমরা গোঁয়ার বা একগুঁয়ে নই। যখন ঝড় চলে আমাদের ওপর দিয়ে আমরা নমনীয় থাকতে পারি, কারণ আমরা জানি নমনীয় থাকতে পারলেই আখেরে লাভ হয়। বিপদ এলে, আমরা ভয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি না, বরং অবশ্যম্ভাবীকে স্বীকার করে নিই। হেসে নিজের কাজ করে যাই আর ভাল দিনের প্রতীক্ষা করি। তখন নিম্নরুচির মানুষের সঙ্গেও মেলামেশা করি। তারপর যখন আবার নিজ বলে বলীয়ান হয়ে উঠি, তখন যাদের সহায়তা নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ালাম, তাদের লাথি মেরে ভাগিয়ে দিই। অস্তিত্ব বজায় রাখার এটাই হল গোপন মন্ত্র, বাছা।” তারপর একটু থেমে আবার বললেন, “এই গোপন মন্ত্রটা আমি তোমাকে শিখিয়ে দিলাম।”
বৃদ্ধা ফিকফিক করে হাসলেন, যেন নিজের কথায় নিজেই খুব মজা পেয়েছেন, কথাগুলোর মধ্যে যদিও তিক্ততা ছিল। স্কারলেটের প্রতিক্রিয়া আশা করছিলেন। কিন্তু স্কারলেটের কাছে কথাগুলো খুবই অর্থহীন মনে হচ্ছিল। তাই ভেবে উঠতে পারল না কী বলবে।
“এটা ঠিকই যে,” বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা বলে চললেন, “আমাদের লোকেরা নুয়ে পড়তে বাধ্য হয়, তারপর আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়, আবার এমন অনেকেই আছে, যারা আমাদের খুবই পরিচিত, তাদের নিয়ে অন্য রকম বলতে হয়। এই ক্যাথলিন ক্যালভার্টকেই দেখ না! কী হাল হয়েছে খেয়াল করেছ? গরীব শ্বেতাঙ্গ! যাকে বিয়ে করল তার থেকে অনেকটাই হীন অবস্থা। আবার ম্যাকর্যে’ পরিবারকে দেখ! ভূলুণ্ঠিত, অসহায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টাও নেই! সারাক্ষণ শুধু পুরোনো দিনগুলো কত ভাল ছিল তাই নিয়ে বিলাপ করে কাটিয়ে দেওয়া! এই কাউন্টির বাকি লোকদেরও দেখ, কেবল আমার অ্যালেক্স আর স্যালি, তুমি, জিম টার্লটন আর ওঁর মেয়েদের ছেড়ে দিলে, সবারই তো এক অবস্থা! একেবারে নুয়ে পড়েছে, কারণ এদের মধ্যে জীবনীশক্তি ফুরিয়ে গেছে। ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। টাকা পয়সা আর ডার্কি ছাড়া এদের কাছে আর কিছুই ছিল না। এখন যখন এই দুটোই হাতছাড়া হয়ে গেছে, দেখো, ঠিক এক প্রজন্মের মধ্যেই এরাও ক্র্যাকার হয়ে যাবে!”
“উইল্কসদের কথা বলতে ভুলে গেলেন।”
“না, ভুলিনি। ভাবলাম ওদের কথা না তোলাটাই বোধহয় ভাল। হাজার হলেও অ্যাশলে তোমাদের ছাদের তলায় অতিথি হিসেবে রয়েছে। তা তুমি যখন কথাটা তুললেই, তাহলে বলি, ওদেরও দেখ! ইন্ডিয়ার সম্বন্ধে শুনতে পাই ও নাকি বুড়িয়ে একেবারে ঝুনো হয়ে গেছে, যুদ্ধে স্টু টার্লটনের মারা যাওয়ার পর থেকে বিধবা বিধবা ভাব দেখায়, ওকে ভুলে অন্য কোনও ছেলের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার চেষ্টাই নেই। ওর বয়স হয়েছে নিশ্চয়ই, তবে চেষ্টা করলে বড় পরিবার আছে এমন কোনও বিপত্নীক পুরুষমানুষের কথা ভাবতেই পারে। আর হানি বেচারা, ছেলেদের পেছনে ছোঁক ছোঁক করে বেড়াত বুদ্ধুটা – একটা মুরগিরও যেটুকু বুদ্ধি আছে, সেটাও ওর নেই। আর বাকি থাকে অ্যাশলে, ওকেও দেখ!”
“অ্যাশলে খুব খাঁটি লোক,” স্কারলেটের রোঁয়া দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আমি তো বলিনি ও খাঁটি লোক নয়, কিন্তু চিৎপাত হয়ে উলটে পড়া কচ্ছপের মতই অসহায় হয়ে পড়েছে। উইল্কস পরিবার কোনোদিন যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তবে সেটা হবে মেলির জন্য। অ্যাশলে পারবে না!”
“মেলি! হায় কপাল, গ্র্যান্ডমা! বলেন কী? মেলির সঙ্গে অনেকদিনই তো কাটালাম। একে তো ও চিররুগ্ন, তার ওপর গলা তুলে কাউকে ধমকানোর সাহসও নেই!”
“খামোখা কাউকে ধমকাতে যাবে কেন? আমার তো মনে হয় এতে সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু হয় না। হয়ত কাউকে ধমক দেবে না, কিন্তু যদি ওর অ্যাশলের, বা ওর ছেলের, বা ওর নিজের স্বাভাবিক সৌজন্যবোধের ধারণায় যদি কেউ আঘাত হানে, তাহলে ও দেখিয়ে দেবে সাহস কাকে বলে! ওর পথটা একেবারে আলাদা, স্কারলেট। ও তোমার পথেও চলবে না, আমার পথেও না। ওর পথ কী জান? তোমার মা বেঁচে থাকলে যে পথ বেছে নিতেন, সেই পথটা। মেলিকে দেখলেই আমার তোমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায় – যখন ওঁর বয়স কম ছিল … আর হয়ত একদিন মেলিই উইল্কস পরিবারকে আবার টেনে দাঁড় করাবে।”
“হ্যাঁ, মেলির মনটা খুবই ভাল, খুবই নরম-সরম। কিন্তু আপনি অ্যাশলেকে একটু খাটো করে দেখছেন। ওর – ”
“আরে ছাড় তো ওর কথা! ও শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকতেই শিখেছে, আর কিছুই নয়। আর সেটা করে কোনও পুরুষমানুষ বিরাট সঙ্কট – আমরা সবাই যে সঙ্কটের মোকাবেলা করে চলেছি – তার থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারে না। আমি তো শুনেছি, এই কাউন্টিতে লাঙ্গল চষার ব্যাপারে ওই সব থেকে আনাড়ি! তুমি শুধু ওর সঙ্গে আমার অ্যালেক্সকে পাশাপাশি রেখে দেখ! যুদ্ধ বাঁধবার আগে অ্যালেক্স ছিল একটা অকর্মণ্যের ধাড়ি, নতুন নতুন টাই কেনা, মদ খেয়ে মাতলামি করা আর বখাটে মেয়েদের নিয়ে বেলেল্লাপনা করা – এর বাইরে কিছু ভাবতেই পারত না। কিন্তু আজ ওকে তুমি দেখ! চাষবাসের কাজ শিখে ফেলল, কারণ ওকে শিখতেই হত। নইলে ওকে উপোস করে থাকতে হত, সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরকেও। এখন ও কাউন্টির এক নম্বর তুলো ওই উৎপাদন করে – ঠিকই বলছি মেয়ে! টারার তুলোর তুলনায় অনেক গুণ ভাল! আর শুয়োর আর মুরগির ব্যাপারটাও ভালই বোঝে। বদমেজাজটুকু বাদ দিলে, একেবারে হীরের টুকরো ছেলে। সময়কে কী ভাবে কাজে লাগাতে হয় সেটা জানে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে কী ভাবে বদলাতে হয় সেটাও জানে, আর এই পুনর্গঠনের ঝামেলা মিটতে দাও না একবার, দেখবে ও আবার ওর বাপ-ঠাকুর্দার মতই বড়লোক হয়ে যাবে। কিন্তু অ্যাশলে – ”
অ্যাশলেকে খাটো করে দেখানোয়, স্কারলেট রাগে ফুঁসছিল।
“মনে হচ্ছে যেন রূপকথার গল্প শুনছি,” অত্যন্ত শীতলস্বরে কথাটা বলল।
“মনে হওয়ার কারণ নেই,” গ্র্যান্ডমা বললেন। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ওকে জরিপ করলেন। “অ্যাটলান্টা গিয়ে থেকে তুমি যে পথ বেছে নিয়েছ, ও ঠিক সেটাই বেছে নিয়েছে। আর হ্যাঁ। তুমি ওখানে কেমন শোরগোল ফেলে দিয়েছ, সে আমাদের কানে এসেছে – যতই আমরা একটা গাঁয়ে পড়ে থাকি না কেন! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তুমিও নিজেকে বদলে নিয়েছ। ইয়াঙ্কি, বজ্জাত সাদা চামড়া আর উঠতি বড়লোক কার্পেটব্যাগারদের নাকে দম দিয়ে তুমি কেমন টাকা কামাচ্ছ, সেসব খবরও আমাদের কাছে আসে। শুনেছি তোমার মুখে নাকি মিছরির ছুরি। আমার মতে, ঠিকই করছ তুমি। পাইপয়সার হিসেব বুঝে নাও ওদের কাছ থেকে, আর যখন আবার বড়লোক হয়ে যাবে, লাথি মেরে ওদের দূর করে দিও। তখন তোমার আর ওদেরকে দরকার নেই। কাজটা অবশ্যই করবে, আর খুব বুদ্ধি খাটিয়ে করবে যাতে ওই লেজুড় হয়ে জুড়ে থাকা জঞ্জালগুলো তোমাকে বিপদে ফেলতে না পারে।”
ভুরু কুঁচকে স্কারলেট ওঁর পানে চেয়ে কথাগুলো হজম করার চেষ্টা করল। কথাগুলো ঠিক বোধগম্য হচ্ছিল না, তবে অ্যাশলেকে চিৎপাত হয়ে উলটে পড়া কচ্ছপ বলায় চটে গেল।
“আমার মনে হয় অ্যাশলের ব্যাপারে আপনি ঠিক কথা বললেন না,” কথাটা আচমকা বলে উঠল।
“তুমি বুদ্ধিমতী নও স্কারলেট।”
“সে আপনি ভাবতেই পারেন,” কথাটা বলল খুব রুক্ষভাবে। ইচ্ছে করছিল ঘুঁষি মেরে যদি বুড়ির চোয়াল ফাটিয়ে দেওয়া যেত।
“টাকা পয়সার হিসেবের ব্যাপারে তোমার অনেক বুদ্ধি। ছেলেদের যেমন হয়ে থাকে। কিন্তু মেয়েলি বুদ্ধি তোমার নেই। কিন্তু মানুষের চরিত্র বিচার করা তোমার কম্মো নয়।”
স্কারলেটের চোখ থেকে আগুন বেরোতে লাগল। হাত দুটোর মুঠো কেবলই বন্ধ করতে লাগল আর খুলতে লাগল।
“তোমাকে খুব রাগিয়ে দিলাম, তাই না?” বৃদ্ধা হেসে জিজ্ঞেস করলেন। “যেমনটি আমি চেয়েছিলাম।”
“ও তাই চেয়েছিলেন বুঝি? আচ্ছা! কিন্তু কেন? বলুন?”
“কারণ আছে, অনেক কারণ, আর যুক্তিসঙ্গত কারণ।”
গ্র্যান্ডমা চেয়ারে এলিয়ে পড়লেন। আচমকা স্কারলেটের মনে হল ওঁকে খুবই পরিশ্রান্ত আর অসম্ভব বৃদ্ধ লাগছে। পাখাটা ধরে আছেন ক্ষুদ্র দু’খানা হাতে। হাতের চামড়া ঠিক মৃত মানুষের মত কেমন যেন হলদেটে মেরে গেছে। স্কারলেটের মন থেকে সমস্ত ক্রোধ নিমেষে উধাও হয়ে গেল। একটা ভাবনা মনের কোণে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। ঝুঁকে পড়ে একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিল।
“আপনি এক নম্বরের মিথ্যেবাদী কিন্তু সোনা বুড়ি,” ও বলল। “এতক্ষণ যে হাবিজাবি কথাগুলো বলে গেলেন, তার এক বর্ণও আপনি বিশ্বাস করেন না! আপনি এসব কথা বলে বাপির কথা থেকে আমার মন সরিয়ে দিতে চাইছিলেন, তাই না?”
“বোকার মত কথা বোলো না!” বৃদ্ধা মহিলা রাগ রাগ ভাব করে বললেন। হাতটা এক ঝটকায় ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। “হ্যাঁ, ওটাও একটা কারণ। তবে, কথাগুলো কিন্তু সত্যি। তুমি বোকা বলেই বুঝতে চাইছ না।”
কথাটা উনি কটুতা বর্জন করে হেসে হেসেই বললেন। ফলে স্কারলেটের মন থেকে অ্যাশলের ব্যাপার নিয়ে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সেটা সরে গেল। গ্র্যান্ডমা কথাগুলো মন থেকে বলেননি, এটা ভেবে ও হাঁপ ছাড়ল।
“তবুও আপনার কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞ। আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। স্যুয়েলেন আর উইলের বিয়ের ব্যাপারে আপনি যে আমার পেছনে আছেন – যদিও অনেকের মনেই এই ব্যাপারে সংশয় আছে – তাতেও আমার খুব স্বস্তি লাগছে।”
দু গেলাস লস্যি হাতে মিসেজ় টার্লটন হলঘরে এলেন। গৃহকর্মে উনি খুব পটু নন। গেলাস দুটো একেবারে কানায় কানায় ভরা।
“এটা আনতে আমাকে স্প্রিং হাউস পর্যন্ত যেতে হল,” মিসেজ় টার্লটন বললেন। “তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন আপনারা। সমাধিক্ষেত্র থেকে ওরা এখুনি ফিরে আসবে। আচ্ছা স্কারলেট, তুমি কি সত্যি সত্যি উইলের সঙ্গে স্যুয়েলেনের বিয়ে দেবে? উইল ওর উপযুক্ত নয় তা বলছি না, তবে ও যে একজন ক্র্যাকার সেটা তো জানোই আর – ”
গ্র্যান্ডমার চোখে স্কারলেটের চোখ পড়ল। বার্ধক্যগ্রস্ত দুটো চোখে দুষ্টুমির ঝলক। স্কারলেট জবাব খুঁজে পেল।
*****
টীকা :
১ গেল্ডিং – খোজা করা/ খাসি করা পশু
২ স্ট্যালিয়ন – মদ্দা ঘোড়া
৩ পার্গেটরি – নরক, যেখানে পাপীতাপীদের আত্মার শোধন করা হয়।
৪ হেইল মেরি – কুমারী মাতা মেরি’র উদ্দেশ্যে প্রার্থনা। (Hail Mary,/ Full of Grace, / The Lord is with thee./ Blessed art thou among women, / and blessed is the fruit of thy womb, Jesus./ Holy Mary,/ Mother of God,/ pray for us sinners now, / and at the hour of death.)
৫ ওগেলথর্প – জেমস এডওয়ার্ড ওগেলথর্প – একজন ইংরেজ সৈনিক, যিনি ১৭৩২ খ্রীস্টাব্দে জর্জিয়াতে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অধমর্ণদের জন্য উপনিবেশ তৈরি করার সনদ পেয়েছিলেন।
৬ হুগুনট – ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকের ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ অনুসারী গোষ্ঠী। এঁরা জন ক্যাল্ভিনের দেখানো পথ অনুসরণ করতেন। ফরাসি দেশের ক্যাথলিক সরকারের সঙ্গে তীব্র বিবাদে লিপ্ত হয়ে এঁদের সপ্তদশ শতাব্দীতে ফরাসি দেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল।
৭ ক্যাভেলিয়ার – ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের সময় যাঁরা রাজা চার্লস ১-এর সমর্থক ছিলেন।
৮ বনি প্রিন্স চার্লি – চার্লস এডোয়ার্ড স্টুয়ার্ট, যিনি চার্লস ৩ নাম নিয়ে ইংল্যান্ডের সিংহাসনের দাবীদার ছিলেন। ১৭৪৫ সালের অভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে স্মরণ করা হয়। এপ্রিল ১৭৪৬-এ কুলোডেনের যুদ্ধে পরাজয়ের পর স্টুয়ার্টদের সিংহাসনে বসবার আশা লুপ্ত হয়ে যায়। স্কটল্যান্ড থেকে ফরাসি দেশে পালিয়ে যান।


0 মন্তব্যসমূহ