বিমান পাণ্ডার গল্প : বিরিঞ্চির দাঁত



মুড়ি খেতে খেতে দাঁত গিলে ফেলেছিল বিরিঞ্চি I দাঁত টা কদিন ধরেই নড়বড় করছিল, সেটা এখন একেবারেই ভেঙে পেটে গিয়ে সেঁধিয়েছে I বিরিঞ্চি একটু বিষম খেল I তারপর থম মেরে বসে রইল I

দাঁতটা এখন পেটে গিয়ে কি তান্ডব করবে কে জানে ? নিজের দাঁতকে বিরিঞ্চি হাড়ে হাড়ে চেনে I আজ না হয় ব্যাটা বুড়ো হয়ে নেতিয়ে পড়েছে, কিন্তু এককালে ওই দাঁত কম খেল দেখিয়েছে ? লজেঞ্চুস , কাঠি আইসক্রিম , বাতাসা , সুপুরি , তিলের নাড়ু , ভেলিগুড় , ফুট কড়াই , মাছের মাথা , শালীর হাতের কটকটি ভাজা , কুঁকড়োর ঠ্যাং , কাঁকড়ার দাঁড়া ,নরম টুকটুকে ঠোঁট , টোল খাওয়া গাল, অধস্তনের চাকরি , সরকারি জমি , ডাইজিন ট্যাবলেট , নামে বেনামে নানা সাবসিডি - এই সব নানা খাদ্যাখাদ্য কুড়কুড় করে চিবিয়ে খেয়েছে , সে নিশ্চই পেটে গিয়ে নিরীহ বোষ্টম সেজে বসে থাকবেনা I

একটু দূরেই বারান্দার সিঁড়িতে বসে জুলজুল করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল কুসুমকোমল I ভ্যাবলামুখের বিরিঞ্চিকে দেখে জিজ্ঞেস কি হলো জ্যাঠা ?

হলো তোর মাথা , খেতে খেতে দাঁত টাই গিলে ফেললাম I কষের দাঁত টা কদিন ধরেই নড়বড় করছিল I তোলাতে যাবো তোর জেঠির আর পারমিশান হয় না I আজ অমাবস্যা , কাল প্রতিপদ , পরশু গুরুবার , তরশু মাদার্স ডে , কিছু একটা লেগেই থাকে I

দাঁত তোলার আবার দিনক্ষণ কি ?

ফিক করে হেসে ওঠে কুসুমকোমল I

বিরিঞ্চি লোকটা পয়সাঅলা দাপুটে হলে কি হয় , সে যে ভারী স্ত্রৈণ একথা সবাই জানে I তবে স্ত্রৈণর ও তো নানা প্রকারভেদ আছে I বিরিঞ্চি হলো একেবারে টপ লেভেলের স্ত্রৈণ I যদিও তেএঁটে বুড়ো বুড়ির দল গলা ফাটিয়েই যাচ্ছে যে আজকাল পুরুষ মানুষের সংখ্যা ক্রমশই কমে যাচ্ছে I বোয়ের আঁচল ধরা ভেড়ুয়ার দলে দেশ টা ভরে গেছে I তবু তারাও এবং আরো কিছু চালবাজ ধান্দাবাজ পোড়খাওয়া মা বাপ এখনো স্বীকার করে যে স্ত্রৈণ হিসেবে বিরিঞ্চি হলো এক নম্বর , তাদের নিজেদের বিবাহিত বড় ছেলেটা এখনো ততটাও উচ্ছন্নে যায়নি I

কুসুমকোমল কী বলবে ঠিক করতে পারেনা I দাঁত গিলে ফেললে ঠিক কী ভাবে যে সান্তনা দিতে হয় সেটাই সে বুঝতে পারেনা ; কিংবা পরিস্থিতির ঘনত্ব টা ঠিক উপলব্ধি করতে পারেনা I

একটু সাবধানে খেতে পারতে তো , তা ছাড়া এই অবস্থায় তোমার ওই ছাতার মাথা মুড়ি খাওয়ার দরকার টাই বা কি ? আইসক্রিম , তার পর ধরো পাতলা সুজি , হোটেল ওরিয়েন্টের পুডিং , দালিয়ার খিচুড়ি , হট চকোলেট, শীতল ঘোষের দই কিংবা কমলা সুইটসের রাবড়ি , এই সব ও তো খেতে পারো , তা না মুড়ি I এই রকম ক্যাংলাপনা করেই বাঙালি গুলো মারালো I

বিরিঞ্চির এই ভাইপোটা যে একেবারে উচ্চমার্গের খচ্চর সেটা তার ভালোই জানা I তবে এই হারামি সংকুল বিশ্ব সংসারে লোকজনের সাথে যত কম মাখামাখি করা যায় ততই মঙ্গল I কিন্তু কথা না বললেও নয় , এক আধ জন চাই যাদের সাথে বুক হালকা করে কথা বলা যায় , তা না হলে পেটের বায়ু মাথায় চড়ে বসবে , সেও এক জীবনমরণ সমস্যা I কাজেই বিরিঞ্চি যে দুয়েক জনের সাথে মন খুলে কথা বলে , ভাইপো কুসুম কোমল তাদের এক জন I

দেখো, আর মটকা টা তাতিয়ে দিয়োনা I

ভাইপো বুঝলো জ্যাঠা বেশ রেগে আছে , কেবল রেগে গেলেই সে তুমি দিয়ে বলে I

যেটা জানোনা তা নিয়ে টিপ্পনি কেটো না I কমলা সুইটসের রাবড়ি মারাচ্ছো ? আমার সমস্যা অন্য I দাঁত টা গিলে ফেললুম কারণ আমি অন্যমনস্ক ছিলাম I একটা বিজাতীয় জ্বলনে জ্বলছি আমি I

কুসুম কোমল নড়েচড়ে বসে I এতো বেশ সিরিয়াস ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে I কেমন একটা মনমাতানো শুঁটকি পচা গন্ধ I

এটা দেখো , পুরানো দলিল খুঁজতে গিয়ে পুঁচি র - সরি , কলকাকলির ঘরে এটা পেলাম I

পুঁচি কিংবা কলকাকলি হলো জ্যাঠার মেয়ে , কুসুমকোমলের বোন I

কি এটা ?

এটা হলো প্রেম পত্র I

কুসুম কোমল একটু অবাক হয় I পুঁচিদি একেবারে তার মায়ের ধাত পেয়েছে , তাকে লাভলেটার লিখবে এরকম বুকের পাটা এপাড়ায় কার হলো ? অবশ্য যদি কোনো ফরেন মাল কিংবা পাগল হয় তবে অন্য কথা I তাছাড়া আরও একটা কথা , প্রেমপত্র ব্যাপারটা কি এখনো টিকে আছে ? ঢেঁকি কিংবা ফ্লপি ডিস্কের মতো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি এখনো ?

সে চিঠিটা হাতে নেয় I জীবনে প্রথমবার হাতে লেখা ,কাগজের প্রেমপত্রকে ছোঁয়ার সোভাগ্য হয় তার I কেমন একটা গন্ধ ! আচ্ছা এটাই কি সেই বহু কথিত রোমান্টিক গন্ধ ? আরো একবার শুঁকে দেখে I কেমন একটা কর্পূর , ছুঁচো আর ন্যাপথলিন মেশানো গন্ধ বুকটা কেমন করে ওঠে কুসুম কোমলের I জ্যাঠা চিঠিটা নিয়ে নেয় I

দেখো , পুঁচি- সরি কলকাকলিকে প্রেম পত্র দিয়েছে তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই I সে- ছোঁড়ারা দিয়েই পারে , কিন্তু বিরিঞ্চির মতো একটা বিচক্ষণ লোকের মেয়ে হয়ে সে চিঠি যত্ন করে কাঠের বাক্সে রাখবে কেন ?

তার চিঠি I তাকে দিয়েছে I নাহ্যত ধর্মত এটা তার প্রপাটি I সে তো রাখবেই I এতো তারই অধিকার I

না তুমি প্রেমপত্র সম্পর্কে কিছুই জানোনা , মেয়েরা প্রেমপত্র পাবে I কিন্তু সবার চিঠি যত্ন করে রাখবে না , তারা অজস্র চিঠি পাবে , এইট্টি পার্সেন্ট চিঠি তারা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলবে ; কিংবা ছাগল কে খাওয়াবে I কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ কিছু চিঠি , লিমিটেড এডিসন , সেগুলি কেবল রেখে দেবে I আর ওখানেই আমার আক্ষেপ I ওই চিঠি দেখেই আমি ধরে ফেলেছি সে ছোঁড়া কেমন ?

কেমন ?

অতি আহাম্মক, রুচিহীন, অশিক্ষিত , উচ্ছন্নে যাওয়া একটি ছেলে I

কিভাবে ?

পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান I হাতের লেখা I

লাইনগুলো দেখো , কোনো ছিরিছাঁদ আছে ? ত্যাড়াব্যাঁকা I মার্জিনের বালাই নেই I দেখে মনে হচ্ছে না , একপাল রোঁয়া ওঠা কালো কুকুর ভুলভাল ভাবে প্যারেড করছে ?

কুসুম কোমল চিঠি টা মেলে দেখে I তবে লাইন গুলো একঝলক দেখে তার মনে হলো যেন একপাল ছাতারে পাখি দল বেঁধে ভোট দিতে চলেছে I

এরপর ইন্ডিভিজুয়েলি অক্ষর গুলোতে ফোকাস কর I এটা প , না ঝড়ে ছেঁড়া কলাপাতা ? ম টা দেখে মনে হচ্ছে না যে মৃগী রোগ হয়েছে ? বাংলায় সব চাইতে সহজ অক্ষর হলো ব কেবল তিনটে লাইন I তেকাঠি I সিম্পল একটা ত্রিভুজ I আঁকড়ি নেই , শুঁড় নেই, পুটকি নেই , বিন্দু নেই , কোনো বায়নাক্কা নেই I সেটা লিখতেই যেন ছড়িয়ে দিয়েছে I পাতলুন হলুদ করে ফেলেছে I ওটা একটা ব লিখেছে ? চিমসে অখাদ্য একটা ব I ওই রকম ব দিয়ে কেবল বেজম্মা , ব্যাদড়া, বেহায়া ,বিতিকিচ্ছিরি এইসব বিটকেল বিটকেল কথা লেখা যায় I কিন্তু ওরকম নালঝোলমাখা ব দিয়ে কি বিকশিত লেখা যায় ?

ভাষাতত্ত্ব নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের এরকম ব্যাখ্যা কুসুমকোমল শোনেনি I

ব তো ব ই হয় I বিটকেলের ব আর বিকশিতর ব কি আলাদা হবে নাকি ?

তোর জেঠিমাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়, যে চাল দিয়ে চিতই পিঠা হয় সেই আলবাল চাল দিয়ে কি বিরিয়ানি রাঁধা যায় ? সবারই একটা হিসেবে আছে যে ব দিয়ে বাঁদর লিখবি সে ব দিয়ে কি আর বীরবাহু কিংবা ব্রহ্মবৈবর্ত লেখা যায় ? বুলবুলির ব কি আর বৃকোদরের গায়ে ফিট করবে ?

কুসুম কোমল এতক্ষনে ব্যাপারটা ধরে ফেলে I

এটা তুমি ঠিক বলেছো জ্যাঠা , বুলবুলির ব টা কিন্তু বৃকোদরের ফিট করবেন না আবার বৃকোদরের ব তেমনি বুলবুলির ফিট করবে না I ভাইস ভারসা I



তবে I জ্যাঠা বোঝাতে পেরে তৃপ্ত হন I এরপর পয়েন্ট নাম্বার দুই I বানান

এই টুকু একটা চিঠিতে সাতাত্তর টা বানান ভুল আছে I সম্ভব ?

সাধারণের হিসেবে সম্ভব নয় I তবে তেমন প্রতিভা হলে সবই সম্ভব I

কারেক্ট বলেছিস I আমাদের এই জাঁদরেল লেখক তাও করে দেখিয়েছে I হ্যাঁরে চিঠির প্রথম শব্দেও বানান ভুল , "প্রিয়তমাষু "-

শুধু প্রিয়তমা লিখলেই ল্যাঠা চুকে যেত , কিন্তু সেটাকে আরো জোর দেওয়ার জন্যে করেছে প্রিয়তমাষু I গাধা ওটা জানেনা যে ওখানে সু হয় I ষু নয় I

বুঝলেনা জ্যাঠা , ওটা ষু করেছে আরও বেশি পোক্ত করার জন্য I

হবেও বা I বানান নিয়ে আর বেশী কচ্লাস না , মাথা টা ধরে আছে I পরের পয়েন্টে যাই I

পয়েন্ট নাম্বার তিন I এটাই আসল I চিঠির ভাষা এবং ভাব I এ থেকেই মানুষটির , যদি তর্কের খাতিরে ধরা যায় যে চিঠির লেখক একজন মানুষ - তার শিক্ষা দীক্ষা , রুচি , বংশমর্যাদা এ সবের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়

তুমি পাচ্ছ ?

অবশ্যই I তৃতীয় লাইন টা লক্ষ্য কর, “ক্ষুধার্ত ভ্রমরের মতো অপেক্ষা করে আছি “ I

এর মানেটা কী ?

অতি অশ্লীল I তুই ছেলেমানুষ তোর আর জেনে কাজ নেই I তবে লাইন টা পড়েই মনে হচ্ছে ,লম্পট একটা ছেলে I খ্যাঁচা ভুলো কুকুরের মতো উপোসী ঘুরে বেড়াচ্ছে , শুধু ওই ধান্দা I

কী ধান্দা ?

তুই ছেলেমানুষ , ওসব বুঝবিনা I

বুঝলাম I

আর এই লাইনটা , “তোমার জীবন শুধু প্রেম দিয়া ভরাইয়া রাখিব “ , শুধু প্রেম বিলোবে I ব্যাটা নিতাই গোউর এসেছে , হরির লুটের বাতাস ছড়াচ্ছে I এতে কী বোঝা যায়না , ক্যাংলা পার্টি , দু পয়সার অওকাত নেই I হিম্মত আছে তো ডায়মন্ড নেকলেস দে ?

আর লাস্টের লাইন টা তো একেবারে মেরে রেখে দিয়েছে , " কিস জানিবে "

শুনেছিস এরকম লাইন , ইচ্ছে করছে ব্যাটার মাথায় ঘিলুটা বাঁধিয়ে বসার ঘরে টাঙিয়ে রাখি I

প্রেসার টা অনেক কষ্টে কন্ট্রোলে রেখে ছিলাম রে, এখন নির্ঘাত একশো বিশ / দুশো ত্রিশ যাচ্ছে I

কুসুম কোমল চিন্তিত মুখে বলে , সবই তো বুঝলাম , কিন্তু আমার মাথায় দুটো পয়েন্ট ঘুরছে I

বলে ফেল I

পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান - আজকালকার ছেলেরা তো লিখবে না , ওরা টেক্সট করবে I কাগজ কলমে চিঠি লেখা , হাউ বোরিং I

পয়েন্ট নাম্বার টু এই সব ভ্রমর ,মধু ,প্রিয়তমা এই শব্দ গুলো তো বিলুপ্ত মানে ডেড হয়ে গেছে I

এখন কী আছে ?

এখন আছে, সোনু , জানু , রোজ , সুইটহার্ট , মাই ড্রিম , মাই বেবি এই সব আরকি I এদের মধ্যে থেকে যেটাকে বেশি কুল মনে হবে সেটা চুজ করবে I এখানেই তোমার সোসিও ইকোনমিক ফ্যাক্টর , কালচারেল ব্যাকগ্রাউন্ড , তার ফ্রেন্ডসার্কেল , লেটেস্ট ট্রেন্ড, হ্যান্ড সেটের মডেল , এরা সব মেজর রোল প্লে করবে I

তার মানে তুই বলছিস এটা কোনো বয়স্ক লোকের কাজ I

তাই তো মনে হয়

এ যে সর্বনাশের কথা I

ততটাও নয় I পরের পয়েন্টে আসি I পয়েন্ট নাম্বার থ্রী চিঠিটার থোবড়া দেখে আর তার খুসবু থেকে কিন্তু আরো একটা সিদ্ধান্তে আসা যায় যে , চিঠিটা কিন্তু কচি নয় , তার বয়স হয়েছে I যদি বারো চোদ্দ বছর আগেও চিঠিটা পাঠানো হয় তখন কিন্তু পুঁচিদির নাক দিয়ে জল গড়াচ্ছে , খালিগায়ে এক্কা দোক্কা খেলছে - সেটা কিন্তু লাভলেটার পাবার বয়স নয় I আমার মনে হচ্ছে জ্যাঠা , এই চিঠিটা কিন্তু পুঁচিদিকে দেওয়া হয় নি I

সে কী রে ? এ যে আরো বড়ো সর্বনাশের কথা I



ঠিক সেই সময় গোলগাল ফর্সা মোটা কিছুটা থলথলে চুমকিরানী কী একটা দরকারে বারান্দায় আসেন I চুমকি রানী হলেন বিরিঞ্চির স্ত্রী , কলকাকলির মা এবং কুসুমকোমলের জেঠিমা I

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে উনি খুব শক্ত ধাঁচের মহিলা , এবং কলকাকলি নাকি তারই মতো হয়েছে I

বিরিঞ্চি বাবু চুমকি রানীকে খুব ভয় পান , তাই লোক জন ওকে স্ত্রৈণ বলে , এ সবই বলা হয়েছে I

কিন্তু চুমকি রানীর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে এখনো কিছু বলা হয়নি

তিনি হলেন এরকম মহিলা , সংসার যার ধ্যান জ্ঞান I সেই যে তাকে এই গাড়িতে জুতে দেওয়াহয়েছে তিনি টেনে যাচ্ছেন I খুশিতে নয় , অখুশি তে নয় , ইচ্ছায় নয় , অনিচ্ছায় নয় , যেন এটাই তার কাজ এজন্যই এই ধূলিমলিন পৃথিবীতে তাঁর আবির্ভাব , সেইরকম নিস্পৃহতার সঙ্গে তিনি কর্ম করে যান I

সর্বদাই তিনি স্বামী এবং কন্যার চিন্তায় চিন্তিত I কলকাকলি এবং বিঞ্চিবাবুর খুব খেয়াল রাখেন I তবে অধিকাংশ সময় ই সে খেয়াল রাখাটা মাত্রা ছেড়ে যায় I কলকাকলি আর কচি খুকুটি নেই, চিমসে কিশোরী থেকে সে এখন গত্তি লাগা যুবতী I তার আলাদা স্পেস আছে I সে এখন অন্য এক্সিসে ঘোরে I

এদিকে বিরিঞ্চি বাবুও সেই খোকা কাত্তিকটি নেই I সে এখন পাকানো বুড়ো I বিয়ের বয়স জেনারেশন টু জেনারেশন বেড়ে বেড়েই যাচ্ছে I তা সে সরকারের নাক গলানোর জন্যই হোক কিংবা লোকজনের নিজেদের ফাজলামির জন্যই হোক , তা না হলে বিরিঞ্চি এতদিনে দাদু হয়ে যেত I বিরিঞ্চির নিজেরই একটু বেশি বয়সে বিয়ে I যাক এসব তাদের অতি ব্যক্তিগত কিস্সা I ওই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কচলাকচলি করে লাভ নেই I

কিন্তু চুমকি দেবী অতশত বোঝেন না I বিরিঞ্চি বাবু এবং তার মেয়ে দুজনেই যে নির্বোধ সরল এবং গুড ফর নাথিং , তাদের কে সদা সর্বদা এই ঘাঁটাপড়া বিষাক্ত সংসারে সামলে রাখার জন্যই চুমকি দেবীর এই প্লানেটে আবির্ভাব এ তার বিশ্বাস I বিশেষ করে বিরিঞ্চির মতো ঢেঁড়স মানুষ যে এই জটিল কুটিল সমাজে করে খাচ্ছে তা একান্তই চুমকিরানীর মার্গ দর্শন ছাড়া সম্ভব নয় I

এই সব কারণে দুজনের সম্পর্ক টা গুবলেট হয়ে আছে না দিনকে দিন আরো বেশি চ্যাটচেটে আঠালো হয়ে যাচ্ছে তা কিন্তু জানিনা I এই জটিল মনোস্তাত্তিক ও দাম্পত্য সমীকরণ বোঝা সম্ভব নয়, আর বুঝে কিছু হাতিঘোড়া লাভ ও নেই I

বরং ঘটনায় ফেরা যাক চুমকি দেবী আর পাঁচ জন জেঠিমার মতোই ওই উজবুক ভাইপো টিকে দু চক্ষে দেখতে পারেন না I এই অসম সঙ্গদোষে যে তার ন্যালাখ্যাপা স্বামী বখে যেতে পারে কিংবা ইতিমধ্যে হাফ নষ্ট হয়েই গেছে , তা চুমকিদেবীর বদ্ধমূল ধারণা I তাই প্রায়শই তার কান থাকে বিরিঞ্চি আর কুসুমকোমলের আলোচনার বিষয়ের দিকে I

তবে আজকে যেন ঘটনা অন্য I মানুষটা আজ যেন বেশি কেৎরে পড়েছে , মাথায় হাত দিয়ে বাসি পাঁপড়ের মতো নেতিয়ে বসে আছে I তবে কি দাঁতের ব্যাথাটা বাড়লো ? চুমকি দেবী একপা দুপা করে কাছে আসেন I

বিরিঞ্চিবাবু নিজের মনে বিড়বিড় করে যাচ্ছেন I ঘটনাটা কী ?

চুমকি দেবী সবকিছু লক্ষ্য করে বলেন, কি হলো রে ? লোকটা এরকম সাপ ঝাড়ার মতো বিড়বিড় করে কেন ?

আগেই বলেছি কুসুমকুমার খুব উচ্চ মার্গের খচ্চর I

সে বলে , একটা লাভ লেটার পাওয়া গেছে জেঠিমা I

এতো বড় সাহস , কোথায় পুঁচি ?

পুঁচিদি, পুঁচিদির জায়গায় আছে I কিন্তু লজিক্যালি ভেবে দেখো জেঠিমা , এখন তো আর লাভলেটার নেই I

কেন, নেই কেন ?

ব্যান হয়ে গেছে I

কে ব্যান করলো ? কোন সরকার ? রাজ্য না কেন্দ্র ? দ্যাখ কুসুম আমার সামনে বেশি কুল হবিনা I তোদের ওই ফচকে গিরি ছেড়ে ঝেড়ে কাশ , না হলে চিল করে ছেড়ে দেব I

না মানে একটা লাভ লেটার পাওয়া গেছে ,কিন্তু এখন তো আর ওই সব হয়না I তাই জ্যাঠার মনে হচ্ছে , মানে প্রসেস অফ এলিমিনেশন থেকে ওটাই সাব্যস্ত হচ্ছে যে , ওই লেটার টা অন্য কাউকে , আর এঘরে এক্সট্রা মহিলা বলতে তো তুমি , মানে সন্দেহের তীর তোমার দিকেই , তাই জ্যাঠা ওরম মিইয়ে গেছে I তা ছাড়া একটু আগে একটা দাঁত ও গিলে ফেলেছে ,দুয়ে মিলে অমনি তিনতিরিক্কে অবস্থা I

সর্বনাশ I দাঁত গিলে ফেলেছে ? কই হাঁ করো দেখি , কোন দাঁত টা ? যেটা নড়ছিলো ? পেটে চলে গেছে ? যাক ভালো হয়েছে , কালকে চালুনি নিয়ে কমোডে যাবে I

কেন ?

দাঁত টা উদ্ধার করতে হবে না , ওটাকেই বাঁধিয়ে আবার লাগিয়ে দেব I

বিরিঞ্চি বাবু শিউরে ওঠে বলেন সেকি ?

তা ছাড়া I দাঁতের শোকে যেমন কেৎরে পড়েছো I

দাঁতের শোকে নয় I

তবে ?

ওই যে লাভলেটার I

কই দেখি কেমন লাভলেটার I

অল্প একটু নিস্তব্ধতা , আর তার পরই , পড়পড় ফটফট যেন মুড়ি পটকার বান্ডিলে আগুন দিয়েছে কেউ , নির্বোধ ,নিমকহারাম , মাথামোটা , বুড়বক , ম্যাদা মারা , স্বার্থপর , অলম্ভুস , ঢেঁড়শ , ল্যাদোশ , বিটকেল, খিটকেল,উদগাণ্ডু ভোতড়গাজী , ঢ্যামনা , পাজি , বেহায়া ,বেলাজ , পামর, নির্লজ্জ , ক্যাকলাস ,চামচিকে, কেন্নো ,পাগল, ছাগল , গর্ধব ,খচ্চর , ছুঁচো ,বেল্লিক, উল্লুক ,হাড়জ্বালানো, ধান্দাবাজ ,যমের অরুচি - চোখের মাথা খেয়ে বসে আছ ? নিজের লেখাটাও চিনতে পারনা ? এই চিত্তিরবিত্তির পিত্তি পড়া হাতের লেখা টা কার ? সব ভুলে মেরে দিয়েছ I ছি ছি I ঝাঁটা মেরে পুরো মুখ লাল করে দিতে হয় I এই সেদিনের কথা I আমি তখন বাপের বাড়িতে I কদিন পরেই পুঁচির জন্ম হলো , সব ভুলে মেরে দিয়েছিস I কুসুম তুই আমাকে আজ ক্লিয়ার করে বল তোর জেঠা কী নেশা করে ? না হলে তোর কপালে দুঃখ আছে I

না নেশা টেশা তো করে না , তবে বোধহয় কোনো টেনশন ফেনশন চলছিল ,মেমোরি ডাউন করেছে I বেশি টেনশন নিলে ওরকম হয় I চাপ নিওনা I

এতক্ষনে বাবু বিরিঞ্চি একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন I তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন I দেখো দেখি কী কান্ড ! মিছিমিছি সন্দেহ I

তিনি বোকার মতো হাসেন I এক্কে বারে নির্বোধ, ক্যালানে মার্কা হাসি I

সেই হাসি দেখে কুসুম কোমল বলে , জানো জেঠিমা , লেখাটা দেখে আমারও মনে হচ্ছিল -

কী মনে হচ্ছিল ?

যে লিখেছে, সে হলো অতি আহাম্মক, গজবন্ধু মার্কা , আতাক্যালানো একটি লোক I


গল্পটা এখানেই শেষ করা যেতে পারতো I বেশ একটা কমেডি হতো তাহলে I কিন্তু জীবন যেহেতু কমিটি আর ট্র্যাজেডি র একটা সুন্দর অনুপাত , তাই কমেডির পরেই প্রবেশ করে ট্র্যাজেডি I কারণ বিরিঞ্চির গিলে ফেলা দাঁত টা ইতিমধ্যে পাকস্থলী তে গিয়ে তার কাজ শুরু করে দিয়েছে I আগেই বলেছি বিরিঞ্চির দাঁত টা কিন্তু খুব নিরীহ নয় , লোকে যেমন দেখে সে যে আসলেই তেমনি তা কিন্তু নয় I তুমি ভাবলে সে একটা তিলে খচ্চর কিন্তু সে তোমার সাথে এতো ভালো ব্যবহার করলো যে তুমি পালতে পথ পাবে না , অনুশোচনায় নাকের জলে চোখের জলে হয়ে যাবে I আবার যদি ভাব সে খুব ভালোমানুষ তবে তোমাকে নিয়ে এমন খেলা খেলবে যে তুমি খতম I এমন বস্তু কে গাছ হারামি বলবে না খচড়ার আঁদি বলবে তা তোমার ব্যক্তিগত রুচি I

দাঁত টা ততক্ষনে বিরিঞ্চির স্টমাকের মিউকোষা - সাব মিউকোষা মেমব্রেনের লেয়ার ভেদ করে কামড় বসিয়েছে সাব সেরোসার চিমড়ে পেশিতন্তুতে I সেই তীক্ষ্ণ ব্যাথা স্নায়ু বাহিত হয়ে বিরিঞ্চির মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবে গিয়ে সোজা পৌঁছে যায় হিপোক্যাম্পাসে I যেখানে মেমোরি টেমোরি গুলো জমা থাকে I সেখানে গিয়ে বহুযুগ আগের জমা করা স্মৃতি গুলোকে বের করে আনে , তাদের ধুলো টুলো ঝাড়ে ও আরো নানা ক্যারিকেচার করে I

আর তার ফলে বিরিঞ্চির সেই দিনটির কথা ঝপাঝপ মনে পড়ে যায় I একেবারে ডিটেলে ,দাঁড়িকমা সমেত I

আষাঢ় মাস I আকাশ মেঘে ঢাকা I সকাল থেকেই ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে I বিরিঞ্চি বাড়িতে একা I চুমকি বাপের বাড়িতে I পুঁচি তখন মায়ের পেটে I চুমকিকে দেখতে বিরিঞ্চির শশুর বাড়ি যাওয়ার কথা I কিন্তু তার যাওয়া হলোনা I কাজের জায়গায় একটা ঝামেলা চলছে , কিছুতেই ছুটি ম্যানেজ করা গেলনা I বিরিঞ্চির তখন উচাটন অবস্থা I ইচ্ছে করছে এই বৃষ্টির মধ্যে এক ছুটে পৌঁছে যায় চুমকির কাছে , তবে তার শশুর বাড়িতো আর একটুখানি নয় I বাসে ট্রেনে বিশ ঘন্টার ধাক্কা I নিজেকে তার মেঘদূতের বিরহী যক্ষের মতো লাগছিল I বিরহকাতর বিরিঞ্চি তার ছোট কাঠের বাক্সটা খুলে বের করে মোটা হলুদ রুলটানা চিঠির কাগজ I কাগজের মাথায় ছাপা সেই লালরঙের গোলাপ ফুল টা বিরিঞ্চি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে I

বিরিঞ্চি গোটা গোটা অক্ষরে লিখলো- আমার প্রিয় চুমকি -

না , সে কোনো দিন ভুল বানানে প্রিয়তমাসু লেখেনা I

সে কোনো দিন ওই জ্যালজেলে সাদা কাগজে চুমকি কে চিঠি লেখেনি I

বিরিঞ্চি লিখেছিলো মেঘদূতের লাইন , বিরহী যক্ষের আবেগ I

মেঘালোকে ভবতি সুখিনোৎপন্নথা বৃত্তি চেতহ:

কন্ঠা শ্লেষI প্রণয়িনী জনে কিং পুনরদুর্গসংস্থে

বিরিঞ্চি লিখেছিল, “তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে I মনে হচ্ছে এক ছুটে তোমার কাছে পৌঁছে যাই “

সে লিখতে পারেনা , “ক্ষুধার্ত ভ্রমরের মতো অপেক্ষায় আছি”

সে কখনোই লিখতে পারেনা , “কিস জানিবে “

বিরিঞ্চি লিখেছিলো , “তুমি শরীরের যত্ন নিও”

শেষ দিকটায় তার চোখ জলে ভরে এসেছিল ,তাই সে যখন লিখছিল- “ ইতি তোমারই বিরিঞ্চি –“

তখন একফোঁটা চোখের জল পড়ে ছিল লেখাটার উপরে I


বিরিঞ্চি এখন চোখ বন্ধ করে বসে আছে I সে দেখতে পাচ্ছে চোখের জলে ধ্যাবড়া হয়ে যাওয়া সেই বিরিঞ্চির ‘ব’ টা I


লেখক পরিচিতি :
বিমান পণ্ডা।  পেশা : ইঞ্জিনিয়ার I  লেখেন ছোটগল্প , কবিতা ও উপন্যাস I
‘ভজদা ও ক্যাকলাসপুর’ লেখকের প্রকাশিত উপন্যাস। 









একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ