শহীদুল জহিরের গল্প : আমাদের বকুল




গ্রা
মের লোকেরা তার প্রত্যাবর্তণের প্রতীক্ষায় ছিল।
সন্ধ্যার আগ দিয়ে আকালু সুহাসিনীতে ফেরে, সেই সময় গ্রামের যারা হেমন্তের বিস্তীর্ণ মাঠে নুয়ে থাকা ফসলের ওপর দিয়ে তাকায়, তারা তাকে বহুদূরে বৈকুন্ঠপুর গ্রাম পার হয়ে খোলা মাঠের কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে আসতে দেখে। গ্রামের এইসব মানুষ তখন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, আকালু অস্পষ্ট সোনালি রঙের ঈষৎ ঢেউ খেলানো ধান ক্ষেত্রের দূর প্রান্তে যখন উদয় হয় তাকে একটি বিচ্ছিন্ন বিষণ্ন ধলা বকের মত দেখায়; এবং গ্রামের লোকদের মনে হয় যে, ফাতেমার জন্য সত্যি কি আকালুর হৃদয় কাঁদে! বিশ্বাসপাড়ার কাছে এসে জেলা বোর্ডের কাঁচা রাস্তা ছেড়ে সে ধান ক্ষেতে নেমে আলপথ ধরে; তখন সন্ধ্যার ম্লান আলোর ভেতর তার লম্বা শরীর মূর্ত হয়ে উঠতে থাকে ।

সে তার শ্বশুরবাড়িতে তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী, ফাতেমাকে খুঁজতে গিয়েছিল।

আকালু যখন গ্রামের কাছে এসে পড়ে গ্রামের লোকেরা তার মুখের দিকে তাকায়; তাদের মনে হয় যে, তার মুখে ঘনায়মান সন্ধ্যার অন্ধকারের ভেতরেও বিষণ্ণতার গভীর ছায়া লেগে আছে। সে কোনাইবাড়ির কাছে এসে ধান ক্ষেতের ভেতর থেকে বের হয়ে গ্রামের লোকদের সামনে দিয়ে হেঁটে মিঞা বাড়ির পিছনে তার ভিটার দিকে যায়। সুহাসিনীর লোকদের তখন খুব ইচ্ছা হয় তাকে ডাক দিয়ে থামায়, বলে, শোনেক বাপু, খাড়া, কি হইলো ক, শুনি। কিন্তু তখন তারা অত কিছু বলতে পারে না, তাদের কেউ কেউ তার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকায় এবং বলে, ক্যারে আকালু, ফিরলি বাপু, তারপর তাদের কথা ফুরিয়ে যায়; আকালু ঘাড় সামান্য কাত করে গ্রামের লোকদের মুখের দিকে তাকায় তারপর কোন কথা না বলে, মিঞা বাড়ির প্রাঙ্গণ ঘেঁষে মাথাভাঙা আম গাছ তলা দিয়ে নিজের ভিটায় জীর্ণ কুঁড়ে ঘরে গিয়ে ওঠে।

যেদিন ফাতেমা নিখোঁজ হয়, সেদিন সকালে অথবা দুপুরে অথবা বিকালে বাড়ির সকলে যখন বুঝতে পারে যে, ফাতেমাকে অনেকক্ষণ হলো দেখা যাচ্ছে না, তারা, বাড়ির লোকেরা, আকালু বকুল এবং আমির হোসেন তাকে চারদিকে খোঁজে ।

আকালু বলে, দেখতো রান্দে নাকি।

তারা রান্না ঘরে যায়, দেখে যে, রান্না ঘর খা খা খালি পড়ে আছে; তাদের মনে হয় যে, সেদিন রান্নাই হয় নাই এবং তারা সারাদিন কিছু খায় নাই; তাদের তখন তেষ্টা পায়, তারা মাটির কলসি থেকে পানি ঢেলে খাওয়ার চেষ্টা করে এবং দেখে যে, কলসিও খালি, তখন আকালু কুয়াতলার গিয়ে কলসিতে পানি ভরে আনে।

আকালু বলে, দেখতো গোয়াইল ঘরে কিছু করে নাকি ।

তখন তারা গোয়াল ঘরে যায়, দেখে যে, গরুর চাড়িতে জাবনা নাই, তাদের একটা মাত্র গাই, সেটা বেড়ার পাশে বসে ঝিমায়; তারা ফাতেমাকে পায় না, তাদের বিষণ্ণতা হয়, হয়তো তারা ভয় পায়, বকুল এবং আমির হোসেন, মা মা, বলে কাঁদে। আকালু বুঝতে পারে না ফাতেমা কোথায় গেল, কেন গেল, এবং সে কি করবে।

তখন আকালু বলে, দেখ হয়তো বাড়ির পিছনে পাতা কুড়াইব্যার গেছে, কিম্বা হয়তো পালানে কিছু করে ।

গোয়াল ঘর থেকে বের হয়ে তারা বাড়ির পিছনে বাঁশ ঝাড়ের কাছে যায়, যদি সেখানে ফাতেমা থাকে, হয়তো সেখানে সে ঝরে পড়া শুকনা পাতা ঝাঁট দিয়ে জড়ো করে। বাঁশ বনের কাছে গিয়ে তারা দেখে যে, বাঁশ গাছের নিচে ঝরা পাতায় ছেয়ে আছে, হেমন্তের হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাসে এই পাতা এলোমেলোভাবে ওড়ে, কিন্তু ফাতেমা নাই। তারা তখন বাড়ির উত্তর পাশের পালানে যায়, হয়তো ফাতেমা কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে ডাটার বিচি লাগায়, অথবা হয়তো বরইয়ের কাঁটা পুঁতে বেড়া দেয়, হয়তো এই কাজ করতে গিয়ে তার বাড়ির কথা মনে থাকে না; কিন্তু ফাতেমাকে পালানে পাওয়া যায় না ।

তখন আকালু বকুলকে রৌহার বিলে পাঠায়, বলে, যাতো বকুল, যায়া দেখতো বিলে গেছে নাকি শাক তোলার নেইগা।

বকুল দৌড়ে বাড়ির পিছন দিয়ে বেরিয়ে যায়, মহির সরকারের বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে সে জঙ্গলে ভরা শুকনা রৌহার দিকে তাকায়, বিলে কোন মানুষ নাই, ফাতেমাও না; তখন বকুল এবং আমির হোসেনকে বাড়িতে রেখে আকালু গ্রামের

ভেতর ফাতেমাকে খোঁজে, হয়তো সে কারো ঢেঁকি ঘরে কাজ করে, হয়তো তার প্রবল নিতম্ব দুলিয়ে মিঞা বাড়িতে ধান ভানে অথবা চিড়া কোটে। কিন্তু সুহাসিনীর কোন ঢেঁকি ঘরে ফাতেমাকে পাওয়া যায় না।

যেদিন আকালু তার শ্বশুর বাড়ি থেকে খালি হাতে ফিরে আসে তার পরদিন গ্রামের লোকেরা লক্ষ্মীকোলার মাঠে মহির সরকারের ধান ক্ষেতে তাকে কামলা দিতে দেখে। সেসময় যারা লক্ষ্মীকোলার মাঠে ধান কাটার কাজ করে তারা তাদের কাজের ফাঁকে নাড়ার আগুনে হুকোয় তামাক সেজে টানে। তারা হুঁকোর ফুটোয় লেগে যাওয়া ধুতু হাতের চেটোয় মুছে আকালুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, কোনো খবর পাইলি তর বৌয়ের?

সে হুঁকোর ফুটোয় মুখ লাগিয়ে দম ধরে থাকে, কিছুক্ষণ পর ছোট ছোট কয়েকটা টান দিয়ে বলে, মাগি, তারপর প্রবল শব্দ করে পুনরায় হুঁকো টানে। তখন লক্ষ্মীকোলার মাঠের মধ্যে রোদের ভেতর বসে সুহাসিনীর ক্ষুদে কৃষক এবং দিনমজুর কামলারা আকালুর কথার অর্থ বুঝতে পারে না; তারা আকালুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, বলে, পাইছিস ? এবং তাদের মনে হয় যে, আকালু এবার তাদের কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে পারবে না। কিন্তু আকালু তাদের প্রশ্ন শুনে পুনরায় চুপ করে থাকে, তারপর চোখ কুঁচকে খকখক করে থুতু ফেলে বলে, এই মাগির নেইগা তিনটা দিন নষ্ট কইরল্যাম, কাম কইরলে একশ/দেড়শ ট্যাহার কাম করা যাইতো!

গ্রামের লোকের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয় না, তারা কাজে উঠে যেতে যেতে বলে, ট্যাহার হিসাব পরে করিস, শালার ব্যাটা চামার, তর বউয়েক পাইছিস নাহি ক ৷

পাইলে কি রাইখ্যা আসি, শালির বিটির চুলের মুঠ ধইরা নিয়্যা আইসত্যাম না!

তিন দিন ধইরা তর বৌয়ের খোঁজ নাই, তুই হারামযাদা চুপচাপ বইস্যা বইস্যা তামাক খাইস, আর এই রকম কইরা কথা কইস!

তামুক খামু না তো কি করমু, বৌ কি গরু নাহি যে রাস্তা ঘাটে খুঁইজব্যার যামু, জনে জনে যায়া জিগাস করমু, বাপু আমার বৌয়েক দেইখছেন নাহি!

তার নেইগা তুই এই রকম কইরা বইসা থাকপি।

কি করমু আমি, আমি কোনে যামু খুঁইজব্যার!

তখন আকালু কাঁদে, হেমন্তের নরম রোদের স্পর্শ এবং পাকা ধান গাছের সোঁদা গন্ধের ভেতর বসে সুহাসিনী গ্রামের ভূমিহীন দিনমজুর আকালু শেখ চোখের পানি ফেলে। তার এই হঠাৎ ভেঙে পড়ার ঘটনায় লক্ষ্মীকোলার মাঠের ভেতর বসে সুহাসিনীর কৃষকেরা হয়তো সত্যি বিচলিত হয়, হয়তো হয় না, কারণ, তারা আকালুকে বলে, মাইরা ফালাইস নাইতো!

আকালু তাদের এই কথা হয়তো শোনে, হয়তো শোনে না, সে চুপ করে থেকে গামছার খুঁট দিয়ে চোখ মুছে কাঁচি হাতে উঠে যায়। সুহাসিনীর কৃষকেরা সূর্য মাথার ওপর উঠে আসা পর্যন্ত একটানা কাজ করে। দুপুরে তাদের বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে, তারা ক্ষেতের আলের ওপর বসে খায়; আকালুর খাবার আসে না, সে নাড়ার আগুনে পুনরায় তামাক ধরিয়ে টানে।

ক্যারে আকালু, দুপুরে খালি তামাক খায়া থাকপি ?

তোমাগোরে এত কথা দিয়া কাম কি, আমি তামুক খায়া থাকি, গু খায়া থাকি, তোমাগোরে কি!

তর বাড়িত কি রান্দাবাড়া করা বন্দ? তর ছাওয়াল পাওয়াল কি খায়? বকুল রাইনব্যার পারে?

পান্তা আছে খাইবনি, আমি সইন্দায় খায়া বানমু।

তখন আকালু মাঠের কৃষকদের দেয়া খাবারের ভাগ খায়। তারপর তারা পুনরায় সারি বেঁধে ফসলের মাঠের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে, নুয়ে কাত হয়ে থাকা ধান গাছের গোড়া কেটে মাটির ওপর শুইয়ে দিতে দিতে এগোয়। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর দিনের আলো যখন নরম হয়ে আসে এই কৃষকেরা ধান কাটার কাজ বন্ধ করে, সারা দিনে কাটা ধান আঁটি বেঁধে মহির সরকারের প্রাঙ্গণে নিয়ে গিয়ে ওঠায়। তখন মহির সরকারের কাচারি ঘরের বারান্দায় বসে তারা দিনের শেষ হুঁকা সাজায়। আকালু মুখ কালো করে টিনের বেড়ার সঙ্গে পিঠ লাগিয়ে বসে থাকে।

ক্যারে আকালু, তামুক খাবি না! তামুক খায়া বাড়িত যা, বৌ না থাইকলে কেমন নাগে বোঝ গা।

আকালু হুঁকো নিয়ে চুপচাপ টানে, তারপর বলে, তোমরাতো কও আমি বৌ মাইরা ফালাইছি!

অন্য এক হেমন্তে আকালু যেদিন বিয়ে করে তেবাড়িয়া থেকে ফেরে সেদিন সুহাসিনীতে এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সুহাসিনীর কৃষকেরা যারা বিশ্বাসপাড়ার মাঠে পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত ছিল তারা দিগন্তের প্রান্তে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের কাছে আকালু এবং তার নবপরিণীতা স্ত্রীকে দেখে। সেদিন গ্রামের লোকেরা দেখে যে, মলিন পাঞ্জাবি এবং লুঙ্গি পরা আকালু, রাস্তার ধুলো উড়িয়ে তার পিছনে দড়ি বাঁধা একটি ধূসর রঙের গরুর বাছুর টেনে নিয়ে আসে। আকালু এবং তার গরুর একটু পিছনে হেঁটে আসে ঘোমটা টানা নুয়ে পড়া একটি মেয়ে ।

পরদিন আকালু গ্রামের লোকদের সঙ্গে কামলা খাটতে যায়, বিশ্বাসপাড়া, লক্ষ্মীকোলা অথবা চকনূরের মাঠে। তখন সুহাসিনী অথবা ব্যাঙনাই অথবা বাঁশরিয়া গ্রামের কৃষকেরা তাকে বলে, ক্যারে আকালু একলা একলা বিয়া কইর‍্যা ফালালি।

তাদের কথা আকালু হয়তো শোনে না, কারণ সে চুপ করে হুঁকো টানে। কিন্তু গ্রামের কৃষক এবং ভূমিহীন ক্ষেতমজুরেরা তাকে ছাড়ে না, তারা তার পিছন লেগে থাকে।

--ক্যারে, নিজে নিজে বিয়া কইরলি, আমাগোরে দাওয়াত দিলি ন্যা!

--দাওয়াতের কাম নাই !

--ক্যা, আমরা দাওয়াত পাওয়া জানি ন্যা!

--দাওয়াত খাওয়া লাগবি না ।

ঠিক আছে, দাওয়াত না খাওয়াইস বৌ দেখা, এমন একখান বৌ পাইলি, সঙ্গে একখান গাইও পাইলি, আমাগোরে দেখা, আমরা কি তর বৌয়েক খায়া ফালায়া দিমুনি।

--বৌ কি এই বালের ক্ষেতের মইদ্দে আইন্যা তোমাগোরে দেখাইন নাইগব! বৌ দেখা নাগে, বাড়িত যায়া দেইখো ।

আকালুর বৌয়ের সঙ্গে সুহাসিনীর লোকদের দেখা হয়, তারা তার শ্বশুর আইজ্জল প্রামাণিকের দেয়া গরুর বকনা বাছুরটাও দেখে। স্বামীর বাড়ি আসার পর ফাতেমা দ্রুত ঘোমটার ভেতর থেকে বের হয়ে আসে, সংসারের কাজে বাস্ত হয়ে পড়ার পর থেকে তার ভরাট স্তন, বিস্তৃত নিতম্ব এবং মোটা পায়ের গোছা প্রকাশিত হয়; গ্রামের লোকেরা চলতে ফিরতে দেখে, তারা বলে, ক্যারে আকালু, এমন বৌ বিয়্যা কইরলি, এমন ধামার নাহাল তর বৌয়ের শরীল !

ফাতেমা হারিয়ে যাওয়ার পর, যখন তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন সুহাসিনীর লোকদের গ্রামের মসজিদের প্রাক্তন মুয়াজ্জিন, চান্দাইকোনা মাদ্রাসার দাখিল ক্লাশের তালেবুল এলেম রফিকুল ইসলামের কথা মনে পড়ে। সে মিঞা বাড়িতে জাইগির থাকতো, গ্রামের বাচ্চাদের আরবি পড়াতো এবং মসজিদের ইমাম, মোহসিন আলিকে আজান দিয়ে সাহায্য করতো। ফাতেমা তার যমজ সন্তান বকুল এবং আমির হোসেনকে যখন মসজিদে পাঠাতে চায় রফিকুল ইসলামের কাছে কোরাণ শরিফ পড়ার জন্য, আকালু প্রথমে গ্রাহ্য করে না, তখন ফাতেমা খাওয়ার ধান চুরি করে রফিকুল ইসলামকে দুই খাদি ধান দিয়ে দেয়। রফিকুল ইসলাম ধানঘড়ার হার্টে এই ধান বেচে দুটো কায়দা, দুটো সেপারা এবং একটা সহজ নামাজ শিক্ষা কিনে আনে। বকুল এবং আমির হোসেন আলিফ বে তে সে শিখতে শুরু করার কয়েকদিন পর আকালু বিষয়টি টের পায়, সে

ফাতেমাকে ধরে।

--ট্যাহা পাইলি কেনে?

--ধান বেইচছি ।

--ধান পাইলি কোনে?

ফাতেমা চুপ করে থাকে ।

--মাগি, এই কয়ড়া ধান শ্যাষ হইলে স্যাটার মইদ্দে কি দেও দেখমুনি, তখন না খায়া থাকা লাইগবনি গুষ্টি সুদ্দা!

--কত না খায়া আছি, তার আবার কথা!

--তর প্যাটতো কোন দিনই ভরে না, মাগি, বাপের বাড়িত থেইক্যা আইন্যা খাইস !

তখন বাপের বাড়ির কথায় ফাতেমার রাগ হয়, সে তার হাতের ভাতের এলুমিনিয়ামের হাড়ি আকালুর দিকে ছুড়ে মারে; এবং তখন সম্ভবত বর্ষাকাল ছিল, বর্ষার পানি আকালুর বাড়ির ভিটার কানার কাছে পৌঁছেছিল; ফাতেমা যখন তার সুপারি গাছের মত সবল হাতে ভাতের হাড়ি ছুড়ে মারে, সেটা আকালুর গায়ে না লেগে উড়ে গিয়ে পানিতে পড়ে। ঝগড়া মিটে যাওয়ার পর ফাতেমা যখন তার হাড়ির খোঁজে ভিটার কিনারায় যায় সে দেখে যে, পানির ওপর বিরাট এক বোয়াল মাছ চিৎ হয়ে ভেসে আছে; বোয়ালটা হয়তো বন্যার পানিতে ভেসে এসে আকালুর ভিটার কাছে কিছু খুঁটে খাচ্ছিল, তখন ফাতেমার ছোড়া এলুমিনিয়ামের হাড়ির আঘাতে এই প্রচীন মাছের মাথার খুলি চূর্ণ হয়ে যায়। আকালু ধানঘড়া হাটে গিয়ে আড়াই হাত লম্বা এই মাছ দেড়শ টাকায় বিক্রি করে আধমন ধান কিনে আনে; একই সঙ্গে সে আতপ চাল আনে, তেল আনে, গুড় আনে এবং ফাতেমাকে বলে, পিঠা তৈরি কর। পরদিন সন্ধ্যায় ফাতেমা চাল বেটে গুঁড়া করে, তারপর চিতই পিঠা বানায়। তখন ফাতেমা রফিকুল ইসলামকে ডেকে আনার জন্য বকুলকে পাঠায়, বলে, যা, তগোরে আরবি পড়ায় অই চ্যাংড়াটাক ডাইক্যা আনগা ।

বকুল গিয়ে মিঞা বাড়ি থেকে রফিকুল ইসলামকে ডেকে আনে, রান্না ঘরে ফাতেমা মাটির খোলার ওপর থেকে গরম পিঠা তুলে বকুল, আমির হোসেন এবং রফিকুল ইসলামকে দেয়; তারা গুড়ের শিরার ভেতর ডুবিয়ে পিঠা পায় আর গল্প করে। রফিকুল ইসলাম বলে, বুবু আপনেক একবার বাঘবেড় আমাগোরে বাড়িত নিয়্যা যামু। আমাগোরে বাড়িত খেজুর গাছ আছে, শীতের দিন যখন রস হয় তখন এই রস দিয়া দুধ পিঠ্যা বানাইলে যা মজা, আপনেক শীতের দিনে একবার নিয়্যা যামু, আমার মা খুব মজার পিঠা বানায় ।

ফাতেমার কাছে হয়তো এই সন্ধ্যার আয়োজন অন্য রকম আনন্দের মনে হয়, রফিকুল ইসলামের সঙ্গ হয়তো তার ভাল লাগে; সে পিঠা বানায় এবং বকুল, আমির হোসেন এবং রফিকুল ইসলাম খায়। ফাতেমা রফিকুল ইসলামকে সাধে, বলে, খাও, নইজ্জা কইরো না ।

পিঠা বানাতে বানাতে ফাতেমার চালের গুঁড়া ফুরিয়ে যায়, তখন তার খেয়াল হয় যে, আকালু বাকি রয়ে গেছে। তখন সে পুনরায় চাল ভিজিয়ে বেটে গুঁড়া করতে বসে এবং তখন আকালু মিঞা বাড়ির কাচারি ঘরে তামাক খাওয়ার আড্ডা থেকে ফেরে; সে ফিরে দেখে যে, একটা পিঠাও নাই, ফাতেমা কেবল পাটার ওপর চাল বাটে।

--কি করিস তুই?

--চাইল বাটি ।

--এই দুপুর আইতে চাইল বাটিস ক্যা, পিঠা বানাবি কখন!

--বানাইছিল্যাম, ফুরায়া গেছে ।

--কেডা খাইলো?

তখন সব শোনার পর আকালু ফাতেমার সঙ্গে ঝগড়া করে, বলে, তর এই ভাতারেক খাওয়ানের নেইগা পিঠ্যা বানাইবার কইছিলাম!

ঘটনাটা যখন গ্রামের লোক জানতে পারে তখন চান্দাইকোনা মাদ্রাসার তালেবুল এলেম রফিকুল ইসলাম একদিন মিঞা বাড়ির জাইগির ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, কিন্তু সুহাসিনীর লোকেরা তাকে ফাতেমার পিঠা খাওয়ানোর কথা ভোলে না । ফাতেমা হারিয়ে যাওয়ার পর আকালু যখন তাকে খুঁজে পায় না, তখন ধান কাটার অবসরে রৌহার মাঠের ভিতর বসে গ্রামের কৃষক এবং ক্ষেতমজুরেরা বলে, তর বৌয়েক পাইলি?

আকালু কথা বলে না ।

--তর বৌ ভাইগ্যা গেছে নাকি দেখ গা ।

--কোনে যাইব ভাইগ্যা?

--চান্দাইকোনার মাদ্রাসার ছাত্র, তার কাছে যায় নাই তো?

আকালু পুনরায় চুপ করে থাকে ।

--খোঁজ নিয়া দেখ ।

--তোমরা বাপু কি সব কথা যে কও!

আকালু যখন ফাতেমাকে তেবাড়িয়া থেকে বিয়ে করে আনে, তার সঙ্গে ফাতেমার বাপের দেয়া বকনা বাছুরটাও সুহাসিনীতে আসে। ফাতেমা জাবনা বানিয়ে গরুটাকে খাওয়ায়, গলায় দড়ি দিয়ে বাড়ির কাছের রাস্তায় নিয়ে গিয়ে খুঁটার সঙ্গে বেঁধে ঘাস খাওয়ার জন্য রেখে আসে; খেয়ে খেয়ে গরুটা নধর চিক্কন

হয়ে ওঠে। সুহাসিনীর লোকেরা তার সঙ্গে যখন পরিহাস করে বলে, বিয়া কইর‍্যা এমন একখান বৌ আনলি, বিয়া কইরা এমন একখান গরু আনলি, দুইট্যাই একরকম; তখন আকালু বলে, গাইটা বেইচ্যা ফালামু।

--ফালা, তর গাইয়ের দিকে তাকাইলে শালার কাপড় খারাপ হয়া যায়!

কিন্তু গরু বেচে ফেলা আকালুর পক্ষে সম্ভব হয় না, ফাতেমাকে সে যখন এই কথা বলে, ফাতেমা রাতে খুনখুন করে কাঁদে। তখন আকালু নতুন বৌয়ের চোখের পানি দেখে কিছুদিন চুপ করে থাকে, তারপর আবার একদিন বলে, দে, গরুটা বেইচ্যা ঘরে নতুন ছন লাগাই; ফাতেমা শুনে পুনরায় রাতে যখন খুনখুন করে কাঁদে, আকালু আপাতত এই ইচ্ছা বাদ দেয়। কিন্তু একবছর পরেও যখন ফাতেমা এবং তার বাপের বাড়ি থেকে আনা গাভী গর্ভ ধারণ করে না, তখন এরকম মনে হয় যে, আকালুর শ্বশুর আইজ্জল প্রামাণিক হয়তো দুটোই বাঁজা জিনিস দিয়েছে তাকে ।

গ্রামের লোকেরা আকালুকে বলে, ক্যারে আকালু, তর হওর তক বঞ্জা গরু দিল!

--বাঞ্জা নাহি?

--তা নাইলে আর কি, কয় দাঁত হইলো? আর কবে গাবিন হইব?

আকালু রাতে তার বৌকে ব্যাপারটা বলে, এইট্যা বাঞ্জা গরু দিছে তর বাপ,এই গরু আমি বেইচ্যা দিমু ।

--বাঞ্জা কইলো কেডা?

----না হইলে গরম হয় না ক্যা? এই গরু আমার লাইগব না, বেইচ্যা দিমু!

ফাতেমার কিছু বলার থাকে না, সে তার বিয়েতে বাপের দেয়া গরু বেঁচে দেয়ার সম্ভবনায় আবার কাঁদে; তখন আকালু পুনরায় গরু বেচে দেয়া স্থগিত করে। তখন গ্রামের লোকেরা বলে, ক্যারে আকালু, তুই বিয়্যা কইরলি কয় বছর হইলো?

- -ক্যা?

--তর হওর তক বাঞ্জা ম্যায়া দেয় নাই তো?

রাতে আকালু যখন ব্যাপারটা তার বৌকে বলে, তর বাপের দেওয়া এই গাইয়ের নাহাল তুইও বাঞ্জা ম্যায়া নোক নাতো, তখন ফাতেমা অপমানে দুঃখে চুপ করে থাকে।

--কথা কইস না ক্যা ?

--কি কমু!

--কি জিগাস করি ?

--আপনে এইসব কি কথা কন !

--কি কথা কই বুইজব্যার পারিস ন্যা!

--না পারি ন্যা।

--তর বাপ আমাক বাঞ্জা ম্যায়া, বাঞ্জা গাই গছায়া দিছে; তুমি মাগি এত বোজ, এই কথা বোজ না!

তারপর আকালু আরও প্রায় এক বছর অপেক্ষা করে, তখন একদিন আইজ্জল প্রামাণিকের দেয়া বকনাটা গরম হয়; ফাতেমা সেদিন সন্ধ্যায় রাস্তা থেকে গরু ঘরে আনতে গিয়ে ব্যাপারটা খেয়াল করে। পরদিন আকালু গ্রামপাঙ্গাসি নিয়ে গিয়ে ফাতেমার এই কাজলা গাইকে পাল দেখিয়ে আনে এবং এর কিছুদিন পর আকালু ফাতেমার গর্ভবর্তী হওয়ার খবর পায়। এই দুই যুবতী প্রাণীর একসঙ্গে গর্ভধারণের ঘটনায় আকালু হয়তো অবাক হয় না, অথবা হয়তো হয়; কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর যখন উভয়েই যমজ বাচ্চা প্রসব করে তখন আকালুর শুধু একার নয়, সুহাসিনীর সকল লোকের বিস্ময় হয়; তারা আকালুকে বলে, ক্যারে, তর হওরতো দেখি তক ভালই ম্যায়া দিছে, ভালই গাই দিছে, দুই জন একই রকম দেইখতে, আবার দুই জনেই একসঙ্গে দুইখান কইরা বাচ্চা দেয়।

আকালু তখন বিষয়টা আরো ভাল করে ভেবে দেখে; ফাতেমার দুটো বাচ্চা হয়, একটা ছেলে একটা মেয়ে, কাজলি গাভীরও দুটো বাছুর হয়, একটা এঁড়ে একটা বকনা। সে বলে, আসলেই!

আকালু তার ছেলেমেয়ের নাম রাখে, আমির হোসেন এবং বকুল, অবসর সময়ে সে তার মেয়েকে ডাকে, আয়রে আমার বকুল ফুল; ফাতেমা কাজলা গরুর দুই বাছুরের নাম রাখে, ময়না এবং টিয়া; সে জাবনার চাড়িতে ভুসি গুলে দিয়ে ডাকে, আয় ময়না পক্ষি, টিয়া পক্ষি।

কিন্তু ময়না টিয়া একদিন তার মায়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়; সকালে উঠে ফাতেমা গোয়ালঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখে যে, কাজলা গাই এবং ময়না টিয়া নাই, গোয়ালঘর শূণ্য। প্রথমে তার মনে হয় যে, আকালু হয়তো গরুগুলোকে মাঠে নিয়ে গেছে, কিন্তু আকালু বলে যে, সে গরু মাঠে নিয়ে যায় নাই । তখন, গরু গেল কনে, গরু গেল কনে, করতে করতে আকালু এবং ফাতেমা খোঁজাখুঁজির করে, বাড়িঘর মাঠ বিল খোঁজা হয়, কাজলি এবং ময়না টিয়াকে আর পাওয়া যায় না। ফাতেমা সারারাত খুনখুন করে কাঁদে, পরদিনও কাঁদে, তার পরদিনও; আকালু শোনে আর ধমকায়, বলে, কানের কাছে খুনখুন করবি না!

তখন আউসের ক্ষেতে নিড়ানির কাজ করতে করতে, অথবা পাট কেটে জাগ দিতে দিতে, অথবা আমনের জন্য জমি চষতে চষতে, অবসরে, সুহাসিনীর কৃষকেরা তামাক খায় এবং গল্প করে।

--ক্যারে আকালু, তর হওরের দেওয়া গাইডো হারায়া গেল !

--হেঁ, খুঁইজ্যা পাই ন্যা।

--কোনে খুঁইজলি ?

--সারা গাঁওয়েই তো খুঁইজল্যাম !

--এই রকম গাঁওয়ের মইদ্দে থেইক্যা গরু হারায় শুইনছিস কোনো দিন!

--হারাইলে আমি কি করমু!

--তর তিন তিনটা গরু এইরকম কইর‍্যা হারায়া গেল আর তুই বইস্যা বইস্যা তামাক খাইস, কইস, আমি কি করমু !

--সারা গ্রামে খুঁইজল্যাম পাইলাম না, পাঙ্গাসি যায়া খোঁয়াড়ে খুঁইজল্যাম, নাই; এখন কি করমু, গরু খোঁজার নেইগ্যা এখন কোনে যামু!

-এই রকম কইর‍্যা কারু গরু হারায়?

--হারায় না ?

তখন গ্রামের কৃষকেরা পুনারায় কাজে উঠে যেতে যেতে যখন বলে, তুই বেইচ্যা দিস নাই তো, রাইতের বেলা পঙ্গাসি হাটের পাইকাররা আইস্যা নিয়্যা যায় নাই তো, তখন আকালু চুপ করে থাকে, তার হয়তো মনে হয় যে, এইসব কথার উত্তর হয় না। গ্রামের কৃষকেরা তাকে পুনরায় যখন বলে, তর এত লোভ ক্যা, তখন আকালু ক্ষেপে যায়, তোমরা বাপু এত কথা কও ক্যা, আমার গরু

বেইচপের চাইলে আমি চুরি কইরা বেচমু ক্যা!

ফাতেমা হারিয়ে যাওয়ার পর গ্রামের কৃষকেরা প্রতিদিন আকালুকে মাঠে পায়; তাদের আকালুর বৌয়ের শরীরের কথা মনে পড়ে, এবং ফাতেমার শরীরের কথা মনে হলে তাদের আকালুর শ্বশুরের দেয়া কাজলা গাইয়ের কথা মনে হয়; এই গাভীটির পিছন দিকে তাকালে তাদের মনে হতো যে, তাদের অজু নষ্ট হয়ে যাবে; এবং এই গাভীটির কথায় তাদের ফাতেমার কথা মনে পড়ে, সবল এবং অপরিমিত যৌবনবতী ছিল এই নারী; এবং এই নারীর সঙ্গে তার বাপের বাড়ির কাজলা গরুর এক সম্পর্ক ছিল। তারা পুনরায় তামাক খাওয়ার ফাঁকে আকালুকে তার নিখোঁজ স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করে, ক্যারে আকালু, কোন খোঁজ পাইলি?

--না ।

--এইরকম কইর‍্যা একটা মানুষ উধাও হয়া গেল, এইট্যা কোন কথা হইলো!

--কি করমু আমি তোমরাই কও!

--কি আর করবি, বইস্যা বইস্যা কামলা দে আর তামুক খা, আর কি করবি!

তখন আকালু পুনরায় কাঁদে, তা দেখে গ্রামের কৃষকদের হয়তো করুণা হয়, হয়তো হয় না; তারা বলে, তর বৌয়েক বেইচ্যা ফালাইস নাইতো !

--বৌ বেইচ্যা ফালাইছি! কোনে বেইচছি?

--সিরাজগঞ্জ নিয়া যায়া নডি বাড়িত বেইচ্যা দিছিস, তর বৌয়ের যা শরীল আছিল, ভাল পয়সা দিছে তক!

--হেঁ, পয়সার নেইগা আমি বৌ বেইচ্যা দিমু?

--ক্যা, পয়সার নেইগ' তর বৌয়ের বাপের বাড়ির গরু চুরি কইর‍্যা বেইচ্যা দিস নাই ?

--গরু আর মানুষ এক হইলো! গরিব হইছি দেইখ্যা বৌ বেইচ্যা দিমু, কেউ দেয় ?

--দেয় না? ঠিক আছে, তুই না দিয়্যা থাইকলে এই রকম গরুর নাহাল আর বইস্যা না থাইক্যা থানায় যা; একলা যাওয়ার সাহস না পাইস ছোট মিঞাক সঙ্গে নিয়্যা যা ।

--ছোট মিঞা কি যাইব?

--যাইব না ক্যা, তর বৌয়েকতো খুব পছন্দ কইরতো আলতাফ হোসেন, এখন যাইব না ক্যা!

গ্রামের লোকদের পরামর্শ অনুযায়ী আকালু রায়গঞ্জ থানায় যায়; কিন্তু মিঞা বাড়ির ছোট ছেলে আলতাফ হোসেন সঙ্গে যায় না, সে আকালুর কথা শুনে ক্ষেপে যায়, বলে, আমার বালের ঠেকা পইড়ছে থানায় যাওয়ার নেইগ্যা, এবং তারপর সে গ্রাম থেকে উধাও হয়, তখন আকালুকে একাই যেতে হয়। রায়গঞ্জ থানার ডিউটি অফিসার সব শুনে চুপ করে থাকে, তার সামনে এক সঙ্কট দেখা দেয়, মামলা নিলে তা নারী অপহরণ অথবা খুনের মামলায় দাঁড়িয়ে যেতে পারে, তাতে থানার পরিষ্কার রেকর্ডের ক্ষতি হয়। সে বলে, তাইলে মামলা দিবেন ?

--আপনে যা কন, ছার।

--আপনের বৌয়ের কি হইছে তাইতো বুঝতে পারলাম না ।

আকালু চুপ করে থাকে ।

--- -আপনের নাম কি ?

--আকালু শ্যাক।

--বাপের নাম কি ?

--জহিরদ্দি মোল্লা ।

--আপনে কি করেন?

--কাম করি ছার।

--কি কাম?

--কিষি কাম করি।

--জমি আছে কয় বিঘা?

--আমার কোন জমি নাই ছার, অন্য মাইনষের জমিত কামলা দেই।

থানার ডিউটি অফিসার এবং ছোট দারোগার আর কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে না, আকালু ভূমিহীন ক্ষেতমজুর এটা বুঝতে পারার পর সে নিশ্চিত হয় যে, এই হারিয়ে যাওয়া নারীর বিষয়ে কিছু আর করার নাই; তখন সে আকালুকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলে; সে বলে যে, কেস হলে তদন্ত করতে হবে, তদন্ত করতে গেলে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, কত লোককে হয়তো হাজতে নিয়ে রাখতে হবে, হয়তো আকালুকেও হাজত বাস করতে হবে; তখন এ এক মহা ঝামেলা হবে। সে আকালুকে বলে, কয়েকদিন অপেক্ষা কইরা দেখেন, হয়তো কোনখানে গেছে, আইসা পরবো।

কিন্তু ফাতেমা আর ফিরে আসে না।

আকালু মন খারাপ করে মাঠের কাজ করে, বকুল এবং আমির হোসেন একা একা বাড়ির প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ায়, তারা সকালে উঠে অজু করে মসজিদে যায় কায়দা এবং সেপারা পড়ার জন্য। চান্দাইকোনা মাদ্রাসার তালেবুল এলেম রফিকুল ইসলাম চলে যাওয়ার পর থেকে জুমা মসজিদের ইমাম মোহসিন আলি আরবি পড়ানোর এই কাজও করে। তার সামনে বসে গ্রামের এই ছেলেমেয়েরা ঝুঁকে ঝুঁকে পড়ে, আলিফ বে তে সে পড়ে, আলিফ জবর আ আলিফ জের ই আলিফ পেশ উ, আ ই উ পড়ে, কুলহু আল্লাহু আহাদ, আল্লাহু সামাদ ….। গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক এবং জুমা মসজিদের ইমাম মোহসিন আলি বলে, ক্যারে বকুল, আস্তে পড়িস ক্যা, জোরে পড় ।

বকুল তখন কাঁদে।

--কান্দিস ক্যা, ক্যারে গেছি !

--আমার মাওটা হারায়া গেল, দাদা মিঞা, আর ফিরা আইসলো না ।

-আইসপনি দেহিস, কান্দিস না ।

--কখন আইসপ, মা মইরাই গেছে !

তখন মোহসিন আলি মৌলবির হৃদয়ে এই বালক-বালিকার জন্য মমতা জেগে ওঠে, সে তার পাঞ্জাবির খুঁট দিয়ে বকুলের গালের ওপর নেমে আসা অশ্রু মুছে দেয় ।

--তর মা মইরা গেছে কেডা কইলো ?

--তাইলে আসে না ক্যা ?

মোহসিন আলি মৌলবি তখন সাত বছর বয়সের এই বালিকার সঙ্গে এক খেলায় নিয়োজিত হয়, সে তাকে বলে যে, সে বলে দিতে পারে তার মা বেঁচে আছে না মরে গেছে; এবং বকুল যখন বলে, কন না দাদা মিঞা, তখন মোহসিন আলি এই বালক-বালিকাকে খেলার বিষয়টা বুঝিয়ে বলে।

--এহন একটা গাছ লাগাইন লাইগবো, ঠিক আছে?

--আচ্ছা।

--কি গাছ লাগন যায় ক দেহি ।

--আম গাছ লাগান, দাদা মিয়া ।

--না, আম গাছ না ।

--তাইলে জাম গাছ লাগান ।

--না, জাম গাছও না ।

--তাইলে গাব গাছ লাগান ।

--না, গাব না।

--তাইলে, আপনে কন ।

--না, তরা ক ।

--তাইলে সুপারি।

--না, সুপারি না ।

--তাইলে লেবু গাছ।

--না, লেবুও না।

--তাইলে কলা গাছ লাগান ।

--হেঁ, আমরা কলা গাছ লাগামু ।

তারপর সেদিন বিকালে মোহসিন আলি আকালুর ভিটায় আসে, সে দেখে যে, আকালুর ছনের ঘরে বাঁশের মাচার ওপর বকুল এবং আমির হোসেন ঘুমায়। সে তাদেরকে ডেকে ওঠায়, ক্যারে বকুল, ক্যারে গেদি, যাবি ন্যা? তখন বকুল এবং আমির হোসেনকে সঙ্গে করে মোহসিন আলি বের হয়। সুহাসিনীর লোকেরা দেখে যে, তাদের জুমা ঘরের ইমাম মোহসিন আলি নিখোঁজ ফাতেমার ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের ভেতর দীর্ঘক্ষণ ঘুরে বেড়ায়, তারপর তারা রব্বেল ডাক্তারের বাড়ির বিচি কলার ঝোপ থেকে একটা চারা সংগ্রহ করে আনে। মোহসিন আলি, আকালুর বাড়ির পিছনে, ভিটার কিনারায় খুঁজে খুঁজে একটা নরম ভিজা জায়গায় কলার চারাটা লাগায়, বকুল এবং আমির হোসেন তার সঙ্গে থাকে। মোহসিন আলি বলে, তরা আলহামদু সূরা পড়, তিনবার পইড়া গাছে ফুঁ দে ।

তখন তারা তিনজন আকালুর ভিটার পিছনে গাছপালার ছায়ার ভেতর বুকের ওপর দুই হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে সুরা পাঠ করে, আউজুবিল্ল্যা হি মিনাশ শায়তনের রাজিম, বিসমিল্ল্যা হির রহমানির রাহিম

.. আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন…. । মোহসিন আলি তখন বকুল এবং আমির হোসেনকে পুনরায় নিয়মগুলো বুঝিয়ে বলে; সে বকুল এবং আমির হোসেনকে বলে যে, এই গাছটাতে কোন দিন পানি দেয়া হবে না, তারপরও যদি গাছটা বেঁচে থাকে তাহলে বোঝা যাবে ফাতেমা মা বেঁচে আছে, সে ফিরে আসবে; আর যদি গাছটা মরে যায়…।

কিন্তু গাছটা মরে না ।

গ্রামের লোকেরা জুমা ঘরের বুড়ো ইমাম, মোহসিন আলির চালাকি বুঝতে পারে, কিন্তু বকুল এবং আমির হোসেন বোঝে না : তারা এই গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিচিকলার চারাটা শুকনোর দিনগুলা চুপচাপ পড়ে থেকে কাটায়, পরবর্তী বর্ষায় সেটা দ্রুত জেগে ওঠে। কয়েকদিনের ভেতর এই গাছ এমন সবল এবং লম্বা হয়ে ওঠে যে, গ্রামের যারা দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়, তাদের মনে হয় যে, বুড়ো মৌলবি কি এই জন্যই ফাতেমার নামে পৃথিবীর সব গাছ রেখে খুঁজে খুঁজে বিচিকলার গাছ লাগিয়েছিল । তারা যখন এই গাছের গোল এবং স্ফীত হয়ে ওঠা গুঁড়ির দিকে তাকায়, টলোমলো পল্লবকাণ্ডের দিকে দেখে, তাদের এক নারীর কথা মনে পড়ে; তারা নিশ্চিত হয় যে, এই নারী ফাতেমা, এবং আকালুর বাড়ির ভিটার পিছনে কখনো বিচিকলার ঝোপের দিকে তাকিয়ে সুহাসিনীর লোকদের হারিয়ে যাওয়া ফাতেমার জন্য মন খারাপ লাগে। বকুল এবং আমির হোসেন সকালে কিংবা দুপুরে কিংবা সন্ধ্যায় ডিটার পিছনে কলা গাছের কাছে যায় এবং তারা ক্রমে এই গাছের সঙ্গে কথা বলা শুরু করে ।

--ক্যা মা, তুই আর ফিরা আসপি ন্যা?

--ক্যা, আসপি ন্যা কা?

--আমাগোরে খারাপ নাগে না বুজি তর নেইগ্যা?

সময় যখন পার হতে থাকে বিচিকলা গাছের কুশি গজিয়ে ঝোপ হয়ে ওঠে, আকালু বিরক্ত হয়; সে যখন বলে, বিচ্যা কলা বেচা যায় না, দাম নাই, এই গাছ কাইট্যা ফালামু, তখন বকুল খুনখুন করে কাঁদে, আমির হোসেন খুনখুন করে কাঁদে, তখন আকালুকে বিচিকলা গাছ কেটে ফেলার পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। সে বলে, মোহসিন আলি চাচা মিঞা তগোর নগে তামাশা কইরছে, তরা যে গাছ লাগাইছিলি তা কবে মইরা গেছে।

--না মরে নাই ।

--মরে নাই, তরা কয়টা গাছ লাগাইছিলি ?

--একটা ।

--এহন কয়টা গাছ

--অনেক।

--তরা যে গাছটা ল'গাইছিলি সেইটা কি আছে?

--ক্যা, নাই?

--কবে কলা ধ‍ইরা মইরা গেছে সেই গাছ, এহন যেগুলি দেহিস এইগুলা অইন্য গাছ, আগেরটা না!

তখন অনেক দিন কাটে, মৌলবি মোহসিন আলির মৃত্যু হয়, আকালু আবার বিয়ে করে এবং ফাতেমার কথা সবাই ভুলে যায়। আকালু চান্দাইকোনা থেকে যেদিন পুনরায় বিয়ে করে ফেরে, সেদিন গ্রামের লোকেরা এক পুরানো দৃশ্য দেখে; এবার লক্ষ্মীকোলার ভিতর দিয়ে আকালু হেঁটে আসে, তার হাতে দড়িবাঁধা একটা কালো রঙের গরু, এবং এই গরুর পিছনে ঘোমটা টানা এক মেয়ে, সখিনা, আকালুর নতুন বিয়ে করা বৌ।

সখিনাকে বিয়ে করে আনার পরদিন গ্রামের মাঠে সুহাসিনীর কৃষকদের সঙ্গে আকালুর দেখা হয়, তারা পুনরায় কাজ করে, হুঁকা খায় এবং গল্প করে ।

- -ক্যারে আকালু, তর কপালই ভাল; আবার বৌ পাইলি, গাইও পাইলি।

--এত কথা কও ক্যা তোমরা!

--ঠিক আছে, বিয়া করলি বৌ দেখা ।

--বৌ কি তোমাগেরে এই বালের ক্ষেতের মইদ্দে আইন্যা দেখাইন নাইগব!

--বৌ দেখাবি না?

--বৌ দেখা নাগে বাড়িত যায়া দেইখো।

তখন আকালু পুনরায় বিচিকলার ঝোপ কেটে ফেলার চেষ্টা করে, বকুল এবং আমির হোসেন পুনরায় খুনখুন করে কাঁদে; সব শুনে সখিনা বলে, থাইক ন্যা ।

বিচিকলার কোনো দাম আছে? মোহসিন চাচা মিঞা তামশা কইরছে, আার এই ছাওয়াল ম্যায়া তাই ধইরা বইস্যা রইছে!

--থাইক ন্যা, ভিটার এক পাশে পইড়া অইছে, থাইক।

--এইগুলিতো সেই গাছ না, সেই গাছ কবে মইরা গেছে!

কিন্তু বিচিকলার ঝোপের গাছগুলো দেখে বকুল এবং আমির হোসেনের মনে হয় যে, এগুলো একই গাছ, একই রকম দেখতে, সবুজ সবল এবং কান্তিময়; তারা এই গাছের সঙ্গে কথা বলে বড় হয়ে ওঠে। তখন, বকুল শাড়ি পরা শুরু করার পর গ্রামের লোকদের পুনরায় বহুদিন পর ফাতেমার কথা মনে পড়ে; এগার/বার বছর বয়স হওয়ার আগেই বকুল লম্বা হতে থাকে, তার নগ্ন পায়ের গোছা মোহসিন আলি মৌলবির লাগানো বিচিকলা গাছের মত মোটা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ স্ফীত ও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। গ্রামের লোকেরা যখন বলে, তর ম্যায়াটা তর হারায়া যাওয়া বৌয়ের নাহাল হইছেরে আকালু, তখন বকুল হয়তো ব্যাপারটা বোঝে অথবা কিছু বোঝে না; কিন্তু সে রান্না ঘরে মাচানের ওপর যখন শোয় শাড়িতে তার শরীর ঢাকা পড়ে না, সে যখন গোসল করার সময় গা মাজে তার করতলের ভেতর তার নিজের কালো দেহের বিস্ময় ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হয়। তখন একদিন রাতে মাচার ওপর শুয়ে সে তার পেটের ব্যথাটা টের পায়, ব্যথা অল্প অল্প করে বাড়ে, তারপর তার মনে হয় যে, তার তলপেট ছিড়ে গেল; এবং তখন বকুলের কাপড় ভিজে যায়। সেরাতে এক বিহবলতার ভেতর বকুল রান্না ঘরের মাচা থেকে নেমে ভিটার পিছনে বিচিকলার ঝোপের দিকে যায়, সেখানে সে একটা মোটা কলাগাছের গোড়া জড়িয়ে ধরে মাটির ওপর কাত হয়ে পড়ে থাকে, মা মা, বলে কাঁদে; তখন বিচিকলা ঝোপের ভেতর লাল পিঁপড়া প্রতীক্ষায় ছিল, তারা তাদের ঢিপি ছেড়ে উঠে আসে।

পরদিন সকালে গ্রামের যারা আকালুর ভিটার পিছন দিকে যায় তারা বিচিকলার ঝোপের কাছে বকুলের রক্তাক্ত শাড়ি পড়ে থাকতে দেখে, সুহাসিনীর লাল পিঁপড়া বকুলকে খেয়ে যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ