কোথাও যেন মোরগ ডাকছে।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে আছি, মাথা নিচু, মাথার ওপর জড়ানো এক টুকরো ময়লা কাপড়--হুডি। মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছি—মোরগ আছে কতগুলো, তারা খাঁচায় কি বন্দি, না কি খোলা ঘেরাটোপের মধ্যে আছে।
ছেলেবেলায় বাবা লড়াইয়ের মোরগ পুষতেন। আমায় দেখবার কেউ ছিল না, তাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন সেই মোরগের আসরে। প্রথম দিককার দিনগুলোতে বালির ওপর মোরগের শরীর ছিন্নভিন্ন হতে দেখে আমি হাউমাউ করে কাঁদতাম। বাবা হেসে উঠতেন, আর ঠাট্টা করে বলতেন—আমি নাকি মেয়ে।
রাতে ঘুমের মধ্যে বিশাল ডাইনি ভ্যাম্পেয়ার জাতের মোরগ আমার বুক চিরে ভেতরটা খেয়ে ফেলত। আমি চিৎকারে বিছানা ভাসাতাম। বাবা ছুটে এসে আবারও বলতেন—
“আরে, এত মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস কেন? ওরা তো শুধু মোরগ!”
ধীরে ধীরে আমার চোখের জল শুকিয়ে গেল। আর হেরে যাওয়া মোরগের গরম নাড়িভুঁড়ি ধুলায় ছড়িয়ে থাকতে দেখে আমি নির্বিকার হলাম। পালক আর রক্তজমা গাদাটা পরিষ্কার করে ঝুড়ি ভরে আমাকেই ফেলে আসতে হতো। যেতে যেতে মোরগটার কানে কানে বলতাম—
“বিদায় মোরগ। স্বর্গে সুখে থেকো—সেখানে অসংখ্য কেঁচো আছে, খোলা মাঠ আছে, ভুট্টাক্ষেত আছে, আর আছে মোরগপ্রেমী পরিবার।”
পথে লড়াইবাজদের একজন আমাকে ছোঁয়ার জন্য মিষ্টি দিত বা কয়েন গুঁজে দিত। এগুলো দিত আমাকে চুমু খাওয়ার জন্য, কিংবা যাতে অরে আমি যেন তাকে ছুঁয়ে দেই বা চুমু খাই। বাবাকে বললে আবার মেয়ে বলবেন—এই ভয়ে মুখ খুলতাম না।
“আরে, এত মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস কেন? ওরা তো শুধু লড়াইবাজ!”
একদিন আমি এক মৃত মোরগকে বাচ্চার মতো কোলে নিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ তার পেট ফেটে গেল। তখন দেখলাম, যারা কিছুক্ষণ আগেই এক মোরগ যাতে আরেকটার পেট চিরে ফেলে সেজন্য চেঁচিয়ে উঠছিল, তারাই মৃত মোরগের রক্ত-মল-মূত্রে বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সেই মুহূর্তেই আমি হাত, হাঁটু, মুখ—সব ভিজিয়ে নিলাম সেই রক্ত আর ময়লায়। তারপর থেকে আর কেউ আমায় স্পর্শ করার সাহস করেনি।
তারা বাবাকে বলল, “তোমার মেয়ে একেবারে দানব।”
বাবা ঠান্ডা গলায় জবাব দিলেন, “দানব তো তোমরাই।”
আর মদের গ্লাস ঠুকে সবাই গলা মিলিয়ে উঠল—“দানব তো তোমরাই। চিয়ার্স!”
লড়াইয়ের আঙিনার গন্ধটা ছিল ভীষণ বাজে।
মাঝে মাঝে আমি যখন গ্যালারির নিচে কোনো কোণে ঘুমিয়ে পড়তাম, একদিন হঠাৎ জেগে উঠে দেখি লোকগুলোর একজন আমার স্কুল ইউনিফর্ম তুলে উঁকি মেরে আমার আন্ডারওয়্যার দেখছে। এরপর ঘুমোবার আগে আমি পায়ের মাঝখানে একটা মোরগের মাথা গুঁজে রাখতাম। কখনও একটা, কখনও একাধিক। একেবারে পুরো কোমর জুড়ে মোরগের কাটা মাথার মালা। ওই তথাকথিত পুরুষরা স্কার্ট তুলে ভেতরে কাটা মাথা দেখতে পছন্দ করত না।
কখনও পেট চেরা মোরগ পরিষ্কার করার জন্য বাবা আমায় ডেকে তুলতেন । কখনও তিনি নিজেই করতেন সেই কাজ। তখন তাঁর বন্ধুরা তাঁকে গালাগাল দিত—তাকে ‘হিজড়া’ বলত, জিজ্ঞেস করত কেন সে মেয়ে সন্তানকে নিয়ে আসে। বাবা কোনো উত্তর দিতেন না। শুধু রক্তে ভেজা, টুকরো হওয়া মোরগটা কুড়িয়ে নিতেন। তারপর দরজার দিক থেকে ওদের দিকে উড়িয়ে দিতেন একটুখানি চুমু। বন্ধুরা হেসে উঠত।
আমি জানি, এখানেও কোথাও মোরগ আছে, কারণ সেই গন্ধ আমি হাজার মাইল দূর থেকেও চিনে নিতে পারি। এটাই আমার জীবনের গন্ধ, বাবার গন্ধ। এ গন্ধে মেশানো আছে রক্ত, পুরুষ, মলমূত্র, সস্তা মদ, টকটকে ঘাম আর যান্ত্রিক তেলের ঝাঁজ। বুঝতে কোনো বুদ্ধির দরকার নেই—এ নিশ্চয়ই কোনো পরিত্যক্ত জায়গা, ঈশ্বর জানেন কোথায়, আর আমি একেবারে ফেঁসে গেছি।
একজন লোক কথা বলে। বয়স হবে চল্লিশের কাছাকাছি। আমি কল্পনা করি—সে মোটা, টাক পড়া, নোংরা, গায়ে সাদা হাতকাটা আন্ডারশার্ট, পরনে শর্টস আর পায়ে চটি; তার কড়ে আঙুল আর বুড়ো আঙুলের নখ লম্বা। তার বলার ভঙ্গি শুনেই বুঝি, এখানে আরও লোক আছে। শুধু আমি নই, আরও অনেকে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, সবার মাথা নত, গায়ে কালচে বাজে গন্ধওয়ালা বস্তা চাপানো।
“সবাই শান্ত হও—প্রথম যে হারামজাদা মুখ খুলবে, তার মাথায় গুলি ছোড়া হবে। তোমরা যদি ঠিক মতো সহযোগিতা করো, তাহলে কারও ক্ষতি হবে না—রাতটা পার হয়ে যাবে।”
আমি টের পাই তার পেট আমার মাথায় ঠেকল, তারপরই বন্দুকের নল।
না, সে একটুও ঠাট্টা করছে না।
আমার ডানদিকে কয়েক ফুট দূরে এক মেয়ে কেঁদে ওঠে। নিশ্চয়ই তার কপালে বন্দুকের ঠাণ্ডা স্পর্শ সহ্য তার হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল এক চড়ের শব্দ।
“দেখো প্রিন্সেস, কান্নাকাটি চলবে না, শুনতে পাচ্ছ? নাকি তুই তোর সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে দেখা করতে চাইছিস?”
এরপর মোটা বন্দুকধারীটা হেঁটে চলে যায়। ফোনে কথা বলতে গেছে। একটা সংখ্যা বলে—“ছয়, ছয়টা হারামজাদা।” সে আরও বলে, “দারুণ মাল, সত্যিই দারুণ, মাসের সেরা।” সে বলে এ সুযোগ কেউ মিস করবে না। একের পর এক ফোন করতে থাকে। কিছুক্ষণ আমাদের কথা ভুলে যায়।
আমার একেবারে পাশে কেউ কাশল। হুডিতে চেপে রেখে কাশি দিলেও বোঝা যায় লোকটা পুরুষ।
“আমি এসবের কথা শুনেছি,” সে খুব আস্তে বলল। “ভাবতাম মিথ, শহুরে কিংবদন্তি। এদের বলে ‘নিলাম’। ট্যাক্সি চালকেরা কিছু যাত্রী বেছে নেয়—যাদেরকে ভালো দামে বেচে দেওয়া যাবে বলে তারা মনে করে। তারপর তাদেরকে অপহরণ করে। তারপর ক্রেতারা আসে, নিজেদের পছন্দসই মানুষকে বেছে নেয়, দর হাঁকে, আর নিয়ে যায়। ওরা তাদের জিনিসপত্র রেখে দেয়, তাদের দিয়ে ডাকাতি করায়, ঘর খোলায়, ক্রেডিট কার্ডের নম্বর আদায় করে। আর মেয়েদের সাথে তো… মেয়েদের সাথে…”
“কি?” আমি জিজ্ঞেস করি।
সে বুঝতে পারে আমি মেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে চুপ মেরে যায়।
সেদিন রাতে ট্যাক্সিতে উঠতেই আমার মাথায় প্রথম ভাবনা আসে—অবশেষে। আমি সিটে মাথা রেখে চোখ বুজে ফেলেছিলাম। কয়েক পেগ খেয়েছিলাম, মন ভীষণ খারাপ ছিল। এক পুরুষ আর তার স্ত্রীর সঙ্গে বারে গিয়েছিলাম—ভান করেছিলাম যেন আমি তাদের বন্ধু। আমি সব সময় ভান করি, ভান করতে আমি পারদর্শী। কিন্তু ট্যাক্সিতে উঠে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলেছিলাম, “কি স্বস্তি—এবার বাড়ি গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়তে পারব।”
মনে হয় এক মিনিটের জন্য তন্দ্রায় ঢুলে পড়েছিলাম। হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, অচেনা জায়গায় আছি। শিল্পাঞ্চল, ফাঁকা, অন্ধকার। মগজ জমে যাওয়ার মতো ভয়ের ঢেউ: বুঝতে পারলাম কেউ আমার জীবন চিরকালের জন্য তছনছ করতে চলেছে।
ট্যাক্সিচালক বন্দুক বের করল, সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল, আর অযথা ভদ্র স্বরে বলল—
“আমরা আপনার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, ম্যাডাম।”
তারপর সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেল। আমি দরজা ভেতর থেকে লক করার আগেই কেউ সেটি খুলে ফেলল। মাথায় একটা বস্তা চাপিয়ে দিল, হাত বেঁধে দিল, ঠেলে নিয়ে গেল একরকম গ্যারেজে—যার গন্ধ পচা ককপিটের মতো—আর আমাকে কোণে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিল।
কথোপকথনের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। মোটা লোকটা, তারপর আরও একজন, আরও একজন, তারপর আরও। লোকজন আসতে থাকল। হাসির শব্দ, বিয়ার খোলার শব্দ। গাঁজার গন্ধ, আর কোনো এক ঝাঁঝালো মাদকের গন্ধ। আমার পাশের লোকটা অবশেষে আমায় শান্ত হও বলা বন্ধ করল। এখন হয়তো সে নিজেকেই বলছে।
সে আগেই বলেছিল তার এক আট মাসের শিশু আছে, আর তিন বছরের এক ছেলে। নিশ্চয়ই এখন সে ওদের কথাই ভাবছে। আর ভাবছে, এ নেশাখোর দানবগুলো কীভাবে তার বসতবাড়ির নিরাপত্তা-ঘেরা গেটের ভেতর ঢুকবে। নিশ্চয়ই ভাবছে, কিভাবে গার্ডকে হাত নাড়বে গেট খুলতে, আর পিছনের সিটে ঝুঁকে বসা এই জানোয়ারগুলোকে নিয়ে যাবে সরাসরি নিজের বাড়িতে।
সে তাদের নিয়ে যাবে তার সুন্দরী স্ত্রীর কাছে, তার আট মাসের শিশুর কাছে, তার তিন বছরের ছেলের কাছে।
সে তাদের নিয়ে যাবে তার নিজের ঘরে।
আর কিছুই সে করতে পারবে না।
আরও ডানদিকে, কিছুটা দূরে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে এক মেয়ে কাঁদছে। জানি না, আগের যে মেয়েটি কাঁদছিল সেই একই মেয়ে কিনা। মোটা লোকটা হঠাৎ বন্দুক ছুঁড়ল—আমরা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। সে আমাদের গুলি করেনি, শুধু একটা ফাঁকা গুলি চালিয়েছে। কিন্তু তাতে কী—ভয়ের আগুন আমাদের ভেতরকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। সে আর তার সঙ্গীরা হেসে উঠল। তারা এগিয়ে এল, আমাদের সবাইকে টেনে ঘরের মাঝখানে দাঁড় করাল।
“আচ্ছা ভদ্রলোকেরা, ভদ্রমহিলারা, আজ রাতের নিলাম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। সবাই কি সুন্দর, কি শান্তশিষ্ট! এখন দাঁড়াও এখানে। আরেকটু কাছে, প্রিন্সেস। হ্যাঁ, ঠিক এখানেই। ভয় পেয়ো না, ছোট্ট মেয়েটি, আমি কামড়াই না। একেবারে ঠিক আছে। এমনভাবে দাঁড়াও যাতে তোমাদের মধ্যে কাকে নিয়ে যাবে সে ব্যাপারে এই ভদ্রলোকেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নিয়ম তো সবসময় যেমন থাকে—যার টাকাই বেশি, সেরা পুরস্কারও তার। আপনারা দয়া করে যদি এখানে নিজেদের বন্দুকগুলো রেখে যান—তাহলে নিলাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি সেগুলো সামলে রাখব। ধন্যবাদ। আপনাদের উপস্থিতিতে আমি আনন্দিত—যেরকম সবসময়ই আনন্দিত হই।”
মোটা লোকটা যেন এক টিভি শো-এর সঞ্চালকের মতো আমাদের প্রদর্শন করছিল। আমরা দর্শকদের দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু জানতাম যারা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, মাপজোক করছে, তারা চোর। আর ধর্ষক। হ্যাঁ, অবশ্যই ধর্ষক। আর খুনি। হয়তো তারা খুনি। কিংবা খুনির থেকেও ভয়ানক কিছু।
“লাাাাাাডিস এন্ড জেন্টলমেন!”
যারা কাঁদে, বা বলে তাদের বাচ্চা আছে, বা যারা মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে—“তুমি জানো না কার সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছ!”-- মোটা লোকটা মোটেই তাদেরকে পছন্দ করে না। না, সে আরও কম পছন্দ করে তাদের, যারা বলে যে সে জেলে পচে মরবে। এদের সবাইকে—পুরুষ, নারী নির্বিশেষে—পেটে আঘাত করা হয়েছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে তাদেরকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে আমি শুনেছি।
আমি মনোযোগ দিলাম মোরগগুলোর দিকে। হয়তো সত্যিই তারা নেই। তবু আমি ওদেরই শুনি, নিজের মনের গভীরে—শুনি পুরুষ আর মোরগের শব্দ।
এই যে, এত মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস কেন? ওরা তো শুধু লড়াইবাজ, ধ্যাত।
“এই ভদ্রলোক, আমাদের প্রথম অংশগ্রহণকারীর নাম কী? কী? জোরে বলো, বন্ধু। রিকারদোওওওও, স্বাগতম! তার হাতে এক দারুণ ঘড়ি আর কী চমৎকার অ্যাডিডাস জুতো। রিকারদোওওও মানেই টাকাও আছে প্রচুর! আসো দেখি রিকারদোর মানিব্যাগে কী আছে। ক্রেডিট কার্ড, ওহহহ, একেবারে ভিসা গোল্ড, মেসির কার্ড।”
মোটা লোকটা বাজে কৌতুক করছে।
রিকারদোকে নিয়ে দর হাঁকা শুরু হলো। কেউ তিনশো দিল, আরেকজন আটশো। মোটা লোকটা যোগ করে বলল, রিকারদো শহরের বাইরে রিভারভিউ নামে গেটেড কমিউনিটিতে থাকে।
“যে এলাকা আমাদের মতো গরিবদের দেখারও ভাগ্য হয় না, সেখানেই থাকে আমাদের বন্ধু রিচি। তোমাকে রিচি ডাকলে কিছু মনে করো না তো? ঠিক ( টিকা। Richie Rich হলো আমেরিকান কমিকসের এক চরিত্র (Harvey Comics থেকে), যাকে বলা হয় “the poor little rich boy”। সে অসীম ধনী, সবসময় টাকার মধ্যে ঘেরা, বিলাসী জীবন যাপন করে। ১৯৫০–৬০ দশকে প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছিল, পরেও কার্টুন, মুভি হয়েছে।)
এক ভয়ঙ্কর গলা দাম হাঁকলো—পাঁচ হাজার। সেই ভয়ঙ্কর গলার মালিক রিকারদোকে নিয়ে গেল। বাকিরা হাততালি দিল।
“গোঁফওলা ভদ্রলোকের কাছে বিক্রি হলো—পাঁচ হাজারে!”
মোটা লোকটা এবার হাত বাড়াল ন্যান্সির দিকে। সে এমন এক মেয়ে যার কণ্ঠ সুতোয় ঝুলে থাকার মতো ক্ষীণ। আমি বুঝলাম লোকটি তাকে স্পর্শ করছে, কারণ সে বলছে—“এই তো কী দারুণ বুক, কী টাইট স্তনবৃন্ত।” তারপর নিজের লালা গিলে নিচ্ছে, এমনসব কথা বলছে যা না ছুঁয়ে বলা যায় না। আর তাকে থামাবে কে? কেউই নয়।
ন্যান্সির গলা শুনে মনে হলো সে তরুণী—কুড়ির কোটার শুরু। সে হয়তো একজন নার্স, বা স্কুলশিক্ষিকা। মোটা লোকটা ন্যান্সির জামাকাপড় খুলতে শুরু করল। আমরা শুনলাম তার বেল্ট খুলছে, জিন্সের বোতাম খোলা হচ্ছে, আর তার অন্তর্বাস ছিঁড়ে ফেলা হলো। ন্যান্সি কাঁপতে কাঁপতে অসংখ্যবার “প্লিজ” বলছে, সেই কণ্ঠে এমন ভয় মেশানো যে আমরা সবাই আমাদের নোংরা হুড ভিজিয়ে ফেললাম অশ্রুতে।
“এই যে একেবারে সুন্দর ছোট্ট পাছা। কী যে রূপসী।”
সে ন্যান্সিকে চেটে খেল—চেটে খেলো ন্যান্সির পাছা। আমরা সেই শব্দ শুনতে পেলাম। পুরুষগুলো ঠাট্টা করে, হো হো করে চেঁচায়, তালি বাজায়। হঠাৎ শোনা যায় মাংসের সঙ্গে মাংসের আঘাতের শব্দ। তারপর শুধু হাহাকার। আর হাহাকার।
“ভদ্রলোকেরা, আপনাদের জন্য একটু কোয়ালিটি কন্ট্রোল হলো। আমি তাকে দশের মধ্যে দশ দিচ্ছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিলে আমাদের বন্ধু ন্যান্সি হবে সত্যিই এক আনন্দ।”
নিশ্চয়ই ন্যান্সি সুন্দরী, কারণ দর হাঁটা শুরু হলো সঙ্গে সঙ্গেই—দুই হাজার, তিন হাজার, তিন হাজার পাঁচ। ন্যান্সি গেল তিন হাজার পাঁচে। ধনী হওয়া সেক্সি হওয়ার চেয়েও দামি।
“আর ভাগ্যবান সেই ভদ্রলোক, যিনি এই সুন্দরী শরীরটিকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন—তার হাতে সোনার আংটি আর ক্রস চিহ্ন।”
আমাদের একে একে বিক্রি করা হলো। মোটা লোকটা আমার পাশের লোকটির কাছ থেকে অনেক তথ্য বের করল—যার আট মাসের শিশু আর তিন বছরের ছেলে আছে। এখন সে নিলামের আসল পুরস্কার: আলাদা আলাদা একাউন্টে টাকা, বড় করপোরেটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীর ছেলে, আর্ট কালেক্টর, সন্তান, স্ত্রী—লোকটা যেন একেবারে লটারি। নিশ্চয়ই ওরা তার জন্য মুক্তিপণ চাইবে। দর শুরু হলো পাঁচ হাজার থেকে। উঠল দশে, তারপর পনেরোতে। থামল বিশ হাজারে। কেউ ভয়ঙ্কর একজন এসেছে—শুধু তার জন্যই। আর কারও জন্য সময় নষ্ট করতে চায়নি।
মোটা লোকটা এ সময় আর কোনো কৌতুক করল না।
যখন আমার পালা এলো, আমি ভাবলাম মোরগদের কথা। আমি চোখ বুজলাম, আর মলদ্বার শিথিল করলাম। জানি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ—তাই আমি সেটা ঠিক মতো করলাম। ভিজিয়ে দিলাম আমার পা, পায়ের নিচের মেঝে। আমি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, আমার চারপাশে অপরাধীরা, আমাকে প্রদর্শন করছে গরুর মতো, আর গরুর মতো আমিও অন্ত্র খালি করে দিলাম।
যতটা পারি, এক পা আরেক পায়ের সাথে ঘষে নিলাম। কাটা পুতুলের মতো শরীরের ভঙ্গি নিলাম। উন্মাদের মতো চিৎকার শুরু করলাম। মাথা দোলালাম, অশ্লীল গালাগাল বললাম, অর্থহীন বকবক করলাম—সেইসব কথাই, যা আমি একসময় মোরগদের বলতাম—'স্বর্গে আছে অন্তহীন ভুট্টাক্ষেত আর কেঁচোর ভাণ্ডার’। আমি জানতাম, মোটা লোকটা এখনই আমাকে গুলি করবে।
কিন্তু গুলি করল না। তার বদলে, সে আমার ঠোঁট ফাটিয়ে দিল থাপ্পড় দিয়ে। আমি নিজের জিহ্বা কামড়ে ফেললাম। রক্ত ঝরতে লাগল বুকে, নেমে এলো পেটে, মিশে গেল মল আর প্রস্রাবের সাথে। আমি হাসতে শুরু করলাম—পাগলের মতো। হাসতে, হাসতে, হাসতে লাগলাম।
সে বুঝতে পারছিল না কী করবে।
“এই দানবটার দাম কত?”
কেউ দর হাঁকলো না।
মোটা লোকটা আমার ঘড়ি, মোবাইল, ব্যাগ—সব দেখাল। এগুলো সব সস্তার, চাইনিজ জিনিস। সে আমার বুক চেপে ধরল, যেন অন্যদের উৎসাহ দিতে পারে। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
“পনেরো? কুড়ি?”
কিন্তু কিছুই না, কেউ নয়।
তারা আমাকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। হোস পাইপ দিয়ে ধুয়ে দিল, তারপর একটা গাড়িতে তুলে দিয়ে গেল—ভিজে, খালি পায়ে, স্তব্ধ অবস্থায়—হাইওয়ের ধারে।
২. অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক সেটিং
শৈশবে বাবার সঙ্গে সে যেত cockpit বা মোরগ লড়াইয়ের আসরে।
সেখানে রক্ত, পালক, নাড়িভুঁড়ির দুর্গন্ধ; পুরুষদের মাতলামি; আর দর্শকদের গ্যালারি।
এই মোরগ লড়াইয়ের অঙ্গন গল্পে প্রতীকীভাবে বর্তমান গ্যারেজের সঙ্গে মিশে গেছে।
👉 অর্থাৎ দ্বিতীয় সেটিং = শৈশবের মোরগ লড়াইয়ের আসর।
৩. মানসিক/প্রতীকী সেটিং
মোরগ আর পুরুষদের শব্দ সবসময় মেয়েটির “ভেতরে” শোনা যায়।
তাই গল্পের আরেকটা স্তরে সেটিং হলো তার মানসিক জগৎ—যেখানে অতীতের ট্রমা আর বর্তমানের ভয়ের মিশ্রণ ঘটছে।
২. হরর/গ্রোটেস্ক (Horror / Grotesque Fiction)
মোরগের দুঃস্বপ্ন, কাটা মাথা কোমরে গুঁজে রাখা, রক্ত-মল-মূত্রে ভিজে নিজেকে দানবে রূপান্তর—এসবই গ্রোটেস্ক ইমেজারি।
পাঠকের মধ্যে ভয়, ঘৃণা ও অস্বস্তি তৈরি করা—এ গল্পের প্রধান নান্দনিক কৌশল।
৩. ফেমিনিস্ট ডিস্টোপিয়া (Feminist Dystopia)
নারী এখানে বাজারের পণ্য, পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার খেলনা।
গল্পে নারী চরিত্রের দানবে পরিণতি আসলে প্রতিরোধের এক রূপক, যা নারীবাদী সাহিত্যধারার সঙ্গে যুক্ত।
নিলামের দৃশ্যটিকে এক ধরনের ডিস্টোপিয়ান বাজার বলা যায়, যেখানে মানবতা পুরোপুরি অনুপস্থিত।
৪. ট্রমা ন্যারেটিভ (Trauma Narrative)
শৈশব থেকে পাওয়া সহিংসতার স্মৃতি, বাবার অবহেলা, দুঃস্বপ্ন—সব মিলিয়ে এটি এক ট্রমাটিক জীবনের ধারাবাহিকতা।
গল্পে “ভ্যাম্পায়ার মোরগ” আসলে ট্রমার প্রতীক।
৫. ম্যাজিক রিয়ালিজমের ছোঁয়া (Trace of Magical Realism)
বাস্তবের সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সীমারেখা মুছে যায়।
“মোরগেরা আমার ভেতরটা গিলে খেল” — এই বাক্যটা বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবের মতোই সত্য মনে হয়। এটি ম্যাজিক রিয়ালিজমের নান্দনিক কৌশল ব্যবহার করে।
গল্পটির ক্রাফট
১. প্রথম পুরুষ বর্ণনা (First-person narration)
গল্পটি বলা হয়েছে “আমি”-এর কণ্ঠে।
এতে পাঠক সরাসরি ভুক্তভোগীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনার ভয়াবহতা অনুভব করে।
শিকার ও কণ্ঠ মিলেমিশে একধরনের confessional tone তৈরি হয়—যেন ডায়েরি বা সাক্ষ্য।
৩. গ্রোটেস্ক ইমেজারি (Grotesque imagery)
রক্ত, মল, প্রস্রাব, নাড়িভুঁড়ি, কাটা মাথা—সব মিলে এক ঘৃণ্য অথচ শক্তিশালী চিত্র তৈরি করে।
এগুলো পাঠকের মনে আতঙ্ক ও অস্বস্তি জাগায়, কিন্তু একইসঙ্গে নারীর প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও উঠে আসে (যেমন: নিজেকে মল-মূত্রে ঢেকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা)।
৫. রূপকের ব্যবহার (Use of symbols/metaphors)
মোরগ: পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতা, লড়াইবাজ সমাজ।
ভ্যাম্পায়ার মোরগ: দুঃস্বপ্নে জমে থাকা ট্রমা।
নিলাম: নারীর শরীরের পণ্যায়ন, মানবপাচার।
নিজেকে “দানব” বানানো: নারীর মরিয়া প্রতিরোধ, শোষণের বাজার ভেঙে দেওয়া।
৭. কাঠামো (Structure)
গল্পটি ধাপে ধাপে এগোয়—
১. শৈশব স্মৃতি ও ট্রমার বীজ
২. অপহরণ ও বন্দিত্ব
৩. নিলামের ভয়ঙ্কর বাজার
৪. নারীর মরিয়া প্রতিরোধ
এই কাঠামোতে দেখা যায়, সহিংসতা একক নয়, বরং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
৮. শক ভ্যালু (Shock value) এবং ক্যাথারসিস
লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে ভয়ঙ্কর দৃশ্য বর্ণনা করেন যাতে পাঠক অস্বস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে।
এই শক-ভ্যালুই গল্পটিকে রাজনৈতিক করে তোলে—এটি পাঠককে জোর করে দেখতে বাধ্য করে সেই সহিংসতাকে, যা সমাজ চেপে রাখতে চায়।
শেষের দিকে নায়িকার প্রতিরোধ একধরনের ক্যাথারসিস এনে দেয়।
উপসংহার
“নিলাম”-এর ক্রাফট দাঁড়িয়ে আছে—
প্রথম পুরুষের কণ্ঠের ঘনিষ্ঠতা,
গ্রোটেস্ক ইমেজারির ভয়াবহতা,
রূপক ও প্রতীকী নির্মাণ,
বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি,
এবং ট্রমার ধারাবাহিক মিশ্রণর ওপর।
এমন নির্মাণকৌশল গল্পটিকে কেবল একটা ভয়ঙ্কর কাহিনি বানায় না, বরং এটিকে নারীবাদী প্রতিবাদের সাহিত্যে রূপান্তর করে।
অনুবাদক : আনন্দ রোজারিও
-------------------------------------------------------------------
গল্পকার পরিচিতি :
মারিয়া ফের্নান্দা আম্পুয়েরো
(María Fernanda Ampuero Velásquez)
জন্ম-- ১৯৭৬ সালের ১৪ এপ্রিল, ইকুয়েডরের গুয়ায়াকুইল শহরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য, ভাষা ও সমাজসংক্রান্ত বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গুয়ায়াকুইলের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (Universidad Católica de Santiago de Guayaquil) সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।
২০০৪ সালে তিনি স্পেনে যান মূলত অভিবাসীদের জীবনযাত্রা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালেখি করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ধীরে ধীরে স্পেনেই বসতি স্থাপন করেন। সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে তিনি অভিবাসীদের দুঃখ-কষ্ট, সামাজিক অবিচার, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদন ও ক্রোনিকা (crónica) লিখতে শুরু করেন।
আম্পুয়েরোর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকর্মের একটি বড় দিক হলো নারীর অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে সমাজের সহিংসতা ও অন্ধকার উন্মোচন করা। তার লেখা পাঠককে আরাম দেয় না, বরং অস্বস্তিতে ফেলতে বাধ্য করে। এই অস্বস্তিই তাঁর সাহিত্যিক সাফল্য—কারণ এর মাধ্যমে তিনি পাঠককে মুখোমুখি দাঁড় করান সমাজের অন্ধকার সত্যের সঙ্গে।
নিলাম গল্পটি নিয়ে আলোচনা :
গল্পটির টাইম ফ্রেম--
গল্পের শুরুতেই নায়িকা হাঁটু গেড়ে বসে আছে, মাথায় বস্তা চাপানো, চারপাশে অচেনা গন্ধ।
তাকে নিয়ে আসা হয়েছে এক পরিত্যক্ত গ্যারেজ বা গুদামঘরে।
জায়গাটা নোংরা, ভেজা, দুর্গন্ধে ভরা—“পচা লড়াইয়ের আঙিনার মতো” গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এখানে নিলাম হবে, যেখানে অপহৃত মানুষদের ক্রেতাদের সামনে দাঁড় করানো হয়।
👉 অর্থাৎ প্রধান সেটিং = শহরের বাইরে অন্ধকার, পরিত্যক্ত, গোপন এক গ্যারেজ/গুদামঘর, যা মানুষের নিলামের বাজারে রূপ নিয়েছে।
গল্পটির টাইম ফ্রেম--
এখানে বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ আর অতীতের স্মৃতি একসঙ্গে বোনা হয়েছে।
১. বর্তমান টাইম ফ্রেম
গল্পের মূল ঘটনাগুলো ঘটছে এক রাতের মধ্যে, যখন প্রোটাগোনিস্ট মেয়েটি ট্যাক্সি থেকে অপহৃত হয়ে একটি পরিত্যক্ত গ্যারেজে বন্দি হয়।
এখানে তাকে এবং অন্য অপহৃতদের নিয়ে শুরু হয় নিলাম প্রক্রিয়া।
পুরো গল্পের প্রধান আখ্যানরেখা এই রাতের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।
২. অতীত টাইম ফ্রেম (ফ্ল্যাশব্যাক)
মেয়েটির শৈশবের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে → বাবার সঙ্গে cockpit (মোরগ লড়াইয়ের আসর)-এ যাওয়া, মৃত মোরগ পরিষ্কার করা, দুঃস্বপ্নে ভ্যাম্পায়ার মোরগ দেখা।
এগুলো বর্তমান গন্ধ, শব্দ বা পরিস্থিতির সঙ্গে হঠাৎ মিশে যায়।
৩. মানসিক টাইম ফ্রেম
মেয়েটির ভেতরের ট্রমা ও দুঃস্বপ্ন এমনভাবে ফুটে ওঠে যে সময় একেবারেই লিনিয়ার বা সরলরেখা থাকে না।
“But I hear them. Inside me. Men and roosters.”—এখানে বোঝা যায়, অতীত ও বর্তমান মানসিকভাবে একই সঙ্গে ঘটছে।
গল্পের সেটিং
১. বর্তমান সময়ের প্রধান সেটিংগল্পের শুরুতেই নায়িকা হাঁটু গেড়ে বসে আছে, মাথায় বস্তা চাপানো, চারপাশে অচেনা গন্ধ।
তাকে নিয়ে আসা হয়েছে এক পরিত্যক্ত গ্যারেজ বা গুদামঘরে।
জায়গাটা নোংরা, ভেজা, দুর্গন্ধে ভরা—“পচা লড়াইয়ের আঙিনার মতো” গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এখানে নিলাম হবে, যেখানে অপহৃত মানুষদের ক্রেতাদের সামনে দাঁড় করানো হয়।
👉 অর্থাৎ প্রধান সেটিং = শহরের বাইরে অন্ধকার, পরিত্যক্ত, গোপন এক গ্যারেজ/গুদামঘর, যা মানুষের নিলামের বাজারে রূপ নিয়েছে।
২. অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক সেটিং
শৈশবে বাবার সঙ্গে সে যেত cockpit বা মোরগ লড়াইয়ের আসরে।
সেখানে রক্ত, পালক, নাড়িভুঁড়ির দুর্গন্ধ; পুরুষদের মাতলামি; আর দর্শকদের গ্যালারি।
এই মোরগ লড়াইয়ের অঙ্গন গল্পে প্রতীকীভাবে বর্তমান গ্যারেজের সঙ্গে মিশে গেছে।
👉 অর্থাৎ দ্বিতীয় সেটিং = শৈশবের মোরগ লড়াইয়ের আসর।
৩. মানসিক/প্রতীকী সেটিং
মোরগ আর পুরুষদের শব্দ সবসময় মেয়েটির “ভেতরে” শোনা যায়।
তাই গল্পের আরেকটা স্তরে সেটিং হলো তার মানসিক জগৎ—যেখানে অতীতের ট্রমা আর বর্তমানের ভয়ের মিশ্রণ ঘটছে।
আলোচনা
১. প্রেক্ষিত ও আবহ
গল্পটি একেবারেই ভয়ঙ্কর এবং ট্রমাটিক অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন। এখানে লেখক এমন এক নারীর কণ্ঠ ব্যবহার করেছেন, যিনি শৈশব থেকে সহিংসতা, যৌন নির্যাতনের হুমকি এবং অবমাননার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। মোরগের লড়াই, নোংরা পুরুষালী খেলা, বাবার অবহেলা—সব মিলিয়ে এক নারীর জীবনের ভয়ঙ্কর শৈশব স্মৃতি এবং পরবর্তী সময়ে অপহরণ ও মানব পাচারের অভিজ্ঞতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পুরো টেক্সট জুড়ে একটা দুঃস্বপ্নময় বাস্তবতা তৈরি হয়।
২. মোরগের রূপক (Symbolism of Roosters)
মোরগ এখানে শুধু প্রাণী নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার প্রতীক।
শৈশবে বাবার সঙ্গে মোরগের লড়াই দেখতে যাওয়া → শিশুমন সহিংসতা শিখে ফেলা।
মোরগদের দুঃস্বপ্নে ভ্যাম্পায়ারে রূপান্তরিত হওয়া → ভয়ের গভীরতম অবচেতন।
কাটা মোরগের মাথা দু পায়ের ফাঁকে গুঁজে রাখা → নিজের শরীরকে যৌন হিংসা থেকে রক্ষার মরিয়া প্রতিরোধ।
অর্থাৎ, মোরগ = হিংস্র পুরুষ, সমাজের ‘ককফাইটার’।
৩. নারীর শরীরের ওপর পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ
গল্পের মূল ফোকাস হচ্ছে নারীর শরীরকে পণ্য হিসেবে দেখা:
অপহরণ ও নিলাম: নারীরা এখানে বাজারে বিক্রির বস্তু।
ন্যান্সির ধর্ষণ ও “কোয়ালিটি কন্ট্রোল”: যৌন সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং প্রদর্শনী ও বিনোদনের অংশ।
প্রধান চরিত্রের শরীর: যখন তাকে আর কেউ কিনতে চায় না, তখন বোঝা যায় নারীর মূল্যও নির্ধারিত হয় কেবল ভোগ্যপণ্যের দিক থেকে।
৪. বাবার চরিত্র
বাবা মেয়েকে সুরক্ষা দেননি, বরং শৈশবে সহিংস জগতে ঠেলে দিয়েছেন।
যখন মেয়ে কাঁদত, বাবা বলতেন “তুই মেয়ে” → লিঙ্গভিত্তিক অপমান।
বাবার বন্ধুরা যখন যৌন হয়রানি করত, তখনও মেয়ের ভয় ছিল বাবা আবার তাকে ‘মেয়ে’ বলবেন।
শেষে বাবা বন্ধুদের বলেন, “দানব তো তোমরাই”—এটা প্রতিরোধ হলেও অনেক দেরিতে, আর তাতে সুরক্ষা আসেনি।
৫. ট্রমা ও বেঁচে থাকার কৌশল
প্রধান চরিত্র বেঁচে থাকার জন্য নিজের শরীরকেই ব্যবহার করে প্রতিরোধে:
মল, রক্ত, প্রস্রাবে নিজেকে ঢেকে অভীষ্ট ভোগ্যপণ্য থেকে রূপান্তরিত হয় “দানবে”।
হাসি, পাগলামি, উন্মাদ আচরণ → এই প্রতিরোধ পুরুষদের জন্য ভয়ানক হয়ে ওঠে, ফলে তাকে আর কেউ কিনতে চায় না।
এখানেই গল্পকার দেখান, নারী নিজের শরীরকে অস্ত্র বানাতে পারে—even in the most dehumanizing situation.
৬. থিম ও বার্তা
সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন: গল্পে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পশুসুলভ রূপ উন্মোচিত।
মানবপাচার ও আধুনিক দাসত্ব: “auction” বা নিলাম শুধুই প্রতীক নয়—এ বাস্তব অভিজ্ঞতারই শিল্পিত রূপ।
নারীর শরীর = পণ্য: নারীর মর্যাদা কেবল ভোগ্যদ্রব্যে সীমাবদ্ধ।
প্রতিরোধের ভাষা: গল্পের নায়িকা শেষ পর্যন্ত দানবে রূপ নিয়ে সেই বাজারের লজিক ভেঙে দেয়।
৭. নান্দনিকতা ও ভাষারীতি
গ্রোটেস্ক ইমেজারি: মোরগের নাড়িভুঁড়ি, রক্ত, মল, প্রস্রাব—সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর ছবি তৈরি করে।
দুঃস্বপ্ন ও বাস্তবের মিশ্রণ: শৈশবের আতঙ্ক ও বর্তমানের অপহরণ একত্রে বোনা।
বিদ্রূপাত্মক হাস্যরস: নিলাম পরিচালকের কথাবার্তা যেন টিভি শোর হোস্টের মতো, যা সহিংসতাকে বিনোদনে পরিণত করে।
“নিলাম” কেবল একটি অপহৃত নারীর গল্প নয়। এটি লাতিন আমেরিকার সমাজে—এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে—নারীর দেহকে ভোগ্যপণ্য বানানো, মানবপাচার, দারিদ্র্য, পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতা এবং শৈশবের ট্রমার বিরুদ্ধে এক অগ্নিসাক্ষ্য। María Fernanda Ampuero এই গল্পে দেখিয়েছেন, নারীকে শেষ পর্যন্ত “দানব” হতে হয়—না হলে সে কেবল শিকার হয়ে থাকে।
নিলাম গল্পটিতে কয়েকটি ঘরানা খুঁজে পাওয়া যায়--
১. সামাজিক বাস্তববাদ (Social Realism)
গল্পে যে “নিলাম” বর্ণনা করা হয়েছে, তা কেবল প্রতীকী নয়, বরং বাস্তব জগতে মানব পাচার, যৌন দাসত্ব ও নারীর শরীরকে বাজারে বিক্রি করার নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিফলন।
ট্যাক্সি ড্রাইভারের মাধ্যমে অপহরণ, ক্রেতাদের দর হাঁকানো—এগুলো লাতিন আমেরিকার অপরাধ-সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
১. সামাজিক বাস্তববাদ (Social Realism)
গল্পে যে “নিলাম” বর্ণনা করা হয়েছে, তা কেবল প্রতীকী নয়, বরং বাস্তব জগতে মানব পাচার, যৌন দাসত্ব ও নারীর শরীরকে বাজারে বিক্রি করার নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিফলন।
ট্যাক্সি ড্রাইভারের মাধ্যমে অপহরণ, ক্রেতাদের দর হাঁকানো—এগুলো লাতিন আমেরিকার অপরাধ-সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
২. হরর/গ্রোটেস্ক (Horror / Grotesque Fiction)
মোরগের দুঃস্বপ্ন, কাটা মাথা কোমরে গুঁজে রাখা, রক্ত-মল-মূত্রে ভিজে নিজেকে দানবে রূপান্তর—এসবই গ্রোটেস্ক ইমেজারি।
পাঠকের মধ্যে ভয়, ঘৃণা ও অস্বস্তি তৈরি করা—এ গল্পের প্রধান নান্দনিক কৌশল।
৩. ফেমিনিস্ট ডিস্টোপিয়া (Feminist Dystopia)
নারী এখানে বাজারের পণ্য, পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার খেলনা।
গল্পে নারী চরিত্রের দানবে পরিণতি আসলে প্রতিরোধের এক রূপক, যা নারীবাদী সাহিত্যধারার সঙ্গে যুক্ত।
নিলামের দৃশ্যটিকে এক ধরনের ডিস্টোপিয়ান বাজার বলা যায়, যেখানে মানবতা পুরোপুরি অনুপস্থিত।
৪. ট্রমা ন্যারেটিভ (Trauma Narrative)
শৈশব থেকে পাওয়া সহিংসতার স্মৃতি, বাবার অবহেলা, দুঃস্বপ্ন—সব মিলিয়ে এটি এক ট্রমাটিক জীবনের ধারাবাহিকতা।
গল্পে “ভ্যাম্পায়ার মোরগ” আসলে ট্রমার প্রতীক।
৫. ম্যাজিক রিয়ালিজমের ছোঁয়া (Trace of Magical Realism)
বাস্তবের সঙ্গে দুঃস্বপ্নের সীমারেখা মুছে যায়।
“মোরগেরা আমার ভেতরটা গিলে খেল” — এই বাক্যটা বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবের মতোই সত্য মনে হয়। এটি ম্যাজিক রিয়ালিজমের নান্দনিক কৌশল ব্যবহার করে।
গল্পটির ক্রাফট
১. প্রথম পুরুষ বর্ণনা (First-person narration)
গল্পটি বলা হয়েছে “আমি”-এর কণ্ঠে।
এতে পাঠক সরাসরি ভুক্তভোগীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনার ভয়াবহতা অনুভব করে।
শিকার ও কণ্ঠ মিলেমিশে একধরনের confessional tone তৈরি হয়—যেন ডায়েরি বা সাক্ষ্য।
২. ফ্র্যাগমেন্টেড স্মৃতি ও বর্তমানের মিশ্রণ
শৈশবের মোরগের লড়াইয়ের স্মৃতি → বর্তমানের অপহরণের পরিস্থিতির সঙ্গে বোনা।
অতীত ও বর্তমান ক্রমাগত মিশে গিয়ে ট্রমার ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করে।
ফলে পাঠক বুঝতে পারে, সহিংসতা কখনো আলাদা ঘটনা নয়, বরং শৈশব থেকে জমে থাকা অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি।
শৈশবের মোরগের লড়াইয়ের স্মৃতি → বর্তমানের অপহরণের পরিস্থিতির সঙ্গে বোনা।
অতীত ও বর্তমান ক্রমাগত মিশে গিয়ে ট্রমার ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করে।
ফলে পাঠক বুঝতে পারে, সহিংসতা কখনো আলাদা ঘটনা নয়, বরং শৈশব থেকে জমে থাকা অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি।
৩. গ্রোটেস্ক ইমেজারি (Grotesque imagery)
রক্ত, মল, প্রস্রাব, নাড়িভুঁড়ি, কাটা মাথা—সব মিলে এক ঘৃণ্য অথচ শক্তিশালী চিত্র তৈরি করে।
এগুলো পাঠকের মনে আতঙ্ক ও অস্বস্তি জাগায়, কিন্তু একইসঙ্গে নারীর প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও উঠে আসে (যেমন: নিজেকে মল-মূত্রে ঢেকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা)।
৪. বিদ্রূপাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি
মোটা লোকটা যখন নিলাম পরিচালনা করে, তার ভঙ্গি ঠিক যেন এক টিভি শো-এর সঞ্চালক।
এই ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি গল্পটিকে আরও বিভীষিকাময় করে তোলে, কারণ এখানে সহিংসতাকে বিনোদন বানানো হচ্ছে।
এটা লেখকের একটি ক্রাফট—হররকে স্যাটায়ারের সঙ্গে মেশানো।
মোটা লোকটা যখন নিলাম পরিচালনা করে, তার ভঙ্গি ঠিক যেন এক টিভি শো-এর সঞ্চালক।
এই ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি গল্পটিকে আরও বিভীষিকাময় করে তোলে, কারণ এখানে সহিংসতাকে বিনোদন বানানো হচ্ছে।
এটা লেখকের একটি ক্রাফট—হররকে স্যাটায়ারের সঙ্গে মেশানো।
৫. রূপকের ব্যবহার (Use of symbols/metaphors)
মোরগ: পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতা, লড়াইবাজ সমাজ।
ভ্যাম্পায়ার মোরগ: দুঃস্বপ্নে জমে থাকা ট্রমা।
নিলাম: নারীর শরীরের পণ্যায়ন, মানবপাচার।
নিজেকে “দানব” বানানো: নারীর মরিয়া প্রতিরোধ, শোষণের বাজার ভেঙে দেওয়া।
৬. ভাষা ও ছন্দ
ভাষা ছোট, খণ্ডিত, সরাসরি।
সংলাপগুলো raw ও unfiltered, যেমন—“আরে, এত মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস কেন?”
এই কাঁচা ভাষাই সহিংস বাস্তবতার তীব্রতাকে বাড়ায়।
ছন্দময় পুনরাবৃত্তি আছে: যেমন “আমি হাসতে শুরু করলাম—পাগলের মতো। হাসতে, হাসতে, হাসতে লাগলাম।” → এটি মানসিক ভাঙনের ছন্দ।
ভাষা ছোট, খণ্ডিত, সরাসরি।
সংলাপগুলো raw ও unfiltered, যেমন—“আরে, এত মেয়ে হয়ে যাচ্ছিস কেন?”
এই কাঁচা ভাষাই সহিংস বাস্তবতার তীব্রতাকে বাড়ায়।
ছন্দময় পুনরাবৃত্তি আছে: যেমন “আমি হাসতে শুরু করলাম—পাগলের মতো। হাসতে, হাসতে, হাসতে লাগলাম।” → এটি মানসিক ভাঙনের ছন্দ।
৭. কাঠামো (Structure)
গল্পটি ধাপে ধাপে এগোয়—
১. শৈশব স্মৃতি ও ট্রমার বীজ
২. অপহরণ ও বন্দিত্ব
৩. নিলামের ভয়ঙ্কর বাজার
৪. নারীর মরিয়া প্রতিরোধ
এই কাঠামোতে দেখা যায়, সহিংসতা একক নয়, বরং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
৮. শক ভ্যালু (Shock value) এবং ক্যাথারসিস
লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে ভয়ঙ্কর দৃশ্য বর্ণনা করেন যাতে পাঠক অস্বস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে।
এই শক-ভ্যালুই গল্পটিকে রাজনৈতিক করে তোলে—এটি পাঠককে জোর করে দেখতে বাধ্য করে সেই সহিংসতাকে, যা সমাজ চেপে রাখতে চায়।
শেষের দিকে নায়িকার প্রতিরোধ একধরনের ক্যাথারসিস এনে দেয়।
উপসংহার
“নিলাম”-এর ক্রাফট দাঁড়িয়ে আছে—
প্রথম পুরুষের কণ্ঠের ঘনিষ্ঠতা,
গ্রোটেস্ক ইমেজারির ভয়াবহতা,
রূপক ও প্রতীকী নির্মাণ,
বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি,
এবং ট্রমার ধারাবাহিক মিশ্রণর ওপর।
এমন নির্মাণকৌশল গল্পটিকে কেবল একটা ভয়ঙ্কর কাহিনি বানায় না, বরং এটিকে নারীবাদী প্রতিবাদের সাহিত্যে রূপান্তর করে।
Grotesque ঘরানাটি কি
Grotesque শব্দটি এসেছে ইতালিয়ান “grottesco” থেকে, যার আদি অর্থ ছিল “গুহার মতো আঁকা অলঙ্করণ” (grotto = cave)। রেনেসাঁ যুগে রোমান ধ্বংসাবশেষে পাওয়া দেয়ালচিত্রে অদ্ভুত, বিকৃত, অর্ধেক মানুষ-অর্ধেক পশুর ছবি দেখা যেত—সেই থেকেই grotesque শব্দটি জনপ্রিয় হয়।
আজকের অর্থে grotesque মানে হলো অস্বাভাবিক, বিকৃত, ভয়ঙ্কর অথচ আকর্ষণীয়—যেখানে ভয় ও হাস্যকরতা মিশে থাকে।
🎭 Grotesque-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. বিকৃতি (Distortion)
স্বাভাবিক শরীর বা জিনিসকে অস্বাভাবিকভাবে বড়, ছোট বা বিকৃত করে দেখানো।
যেমন—অতিরিক্ত লম্বা হাত, চওড়া মুখ, কাটা মাথা ইত্যাদি।
২. ভয় ও হাসির মিশ্রণ (Mixture of horror and comedy)
গ্রোটেস্ক জিনিস একদিকে ভয় জাগায়, আবার অন্যদিকে হাস্যকর লাগে।
উদাহরণ: কোনো দানবকে ভয়ঙ্করভাবে দেখানো হলেও তার আচরণ মজার।
৩. অস্বস্তি তৈরি (Discomfort / Uncanny)
পাঠক বা দর্শকের মধ্যে এক ধরনের “এটা ভয়ানক, কিন্তু চোখ সরাতে পারছি না” অনুভূতি সৃষ্টি করে।
৪. অতিরঞ্জন (Exaggeration)
রক্ত, মাংস, নাড়িভুঁড়ি, প্রস্রাব-মল ইত্যাদিকে বাড়িয়ে তুলে ধরা।
৫. মানব-অমানব মিশ্রণ (Hybrid / Monstrous figures)
আধা মানুষ–আধা পশু, জীবিত–মৃত মিশ্রণ, কিংবা বাস্তব–অবাস্তব একসঙ্গে হাজির হওয়া।
📚 সাহিত্যে Grotesque
ফ্রানৎস কাফকা: তাঁর গল্পে (যেমন Metamorphosis) মানবদেহের রূপান্তর—অমানবিক কিন্তু প্রতীকী।
ফ্ল্যানারি ও’কনার: আমেরিকান দক্ষিণী সাহিত্যে গ্রোটেস্ক চরিত্র—অস্বাভাবিক শারীরিকতা ও বিকৃত নৈতিকতা।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: অনেক গল্পে (যেমন Very Old Man with Enormous Wings) ভয় ও মমত্বের অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
🎨 শিল্পকলায় Grotesque
মাইকেলেঞ্জেলো বা রাফায়েল-এর আঁকা grotesque decorations।
আধুনিক শিল্পে সালভাদোর দালি বা ফ্রান্সিস বেকনের বিকৃত দেহচিত্র।
🩸 “নিলাম” গল্পে Grotesque
María Fernanda Ampuero-র “নিলাম” গল্পটি গ্রোটেস্ক-এর দারুণ উদাহরণ—
মোরগের নাড়িভুঁড়ি, রক্ত, মল-মূত্রের গন্ধ।
মেয়েটির শরীরকে পণ্য করে তোলা, আবার নিজের শরীরকে মল-মূত্রে ভিজিয়ে দানবে রূপ দেওয়া।
নিলামের দৃশ্যে সহিংসতার সঙ্গে বিনোদনের মিশ্রণ।
এখানে ভয়, ঘৃণা, ব্যঙ্গ—সব একসঙ্গে মিশে গেছে।
Grotesque হলো এক ধরনের নান্দনিক কৌশল যেখানে অস্বাভাবিকতা, বিকৃতি, ভয় ও হাসির দ্বন্দ্বমিশ্রিত অনুভূতি তৈরি করা হয়। এটি পাঠক বা দর্শককে অস্বস্তি ও আতঙ্কের ভেতর আটকে রেখে সমাজের গভীর অসুস্থতা ও সত্য উন্মোচন করে।


0 মন্তব্যসমূহ