অলোকপর্ণার গল্প : অদিতির কাছে যাই



দিতির কাছে যাই, গা আমার ছমছম করে।
অদিতির বর উঁচু থেকে আমার দিকে তাকায়। আমি হাসিমুখে তাকে হ্যাঁ বলি। ভ্রূ কুঁচকে ছেলেটি তবু তাকিয়েই থাকে, যেন সে আমায় নয়, অন্য কোনো এক অপেক্ষার দিকে চেয়ে আছে সাগ্রহে। যেন কিছু একটা ভেল্কি হবে আর পায়রাটা বদলে যাবে রুমালে, তাসের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে আসবে রূপকথার বিশ টাকার কয়েন, সব্বাই হাততালি দেবে সোল্লাসে। অদিতির একেকটা টসে বদলে বদলে যাবো আমি, আমরা আর যারা অদিতির চুল, অদিতির বাম মধ্যমার নখ, অদিতির পিঠের পালক বুকপকেটে নিয়ে ঘুরি। আমরা অদিতির কাছে যাই, গা আমাদের পাটুলি পাটুলি করে।

১.
এহেন ভূতুড়ে অদিতিকে নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করি পাহাড়ে যাওয়ার। অদিতির বর, অদিতির প্রেমিকা আর আমি একদিন এসেও পড়ি পাহাড়ে। আমাদের সবার গা ছম ছম করতে থাকে, যেন আমরা জোনাকি, জ্বলা নেভা করি, ওঠা নামা করি অদিতি আগুনকে ঘিরে।

অদিতি আমাদের আগে আগে চলে, আমরা তিন ছাগশিশু তাকে অনুসরণ করে পাহাড়ি ধাপ বেয়ে উপরে আরও উপরে উঠতে থাকি। একসময় অদিতি লুপ্ত হয়, পথের বাঁকে তাকে হারাই আমরা, আর তাজ্জব হয়ে থমকে দাঁড়াই, যেন এই অপেক্ষাই ছিল অদিতির বরের, যখন সে আমার দিকে চেয়েছিল। যেন এই অপেক্ষাতেই আমাদের এবার কার্শিয়ং যাওয়া। অদিতি পথের বাঁকে হারিয়ে গেলে অদিতির বর, অদিতির প্রেমিকা আর আমি, আমরা তিনজন হাততালি দিয়ে ফেলি। অদিতির ভেল্কি আমাদের মুগ্ধ করে। যেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, এই-ই একমাত্র দর্শণীয়। যেন মানুষে পাহাড়ে যায় অদিতিকে পেতে, আর পেয়ে হারাতে। মানুষ অদিতির কাছে যায়, মানুষের গা গতর ছমছম করে।

ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলে অদিতির হাতে কফির কাপ তুলে দিই। কলকাতা খুব জ্বালাচ্ছে আমাদের। আমরা ফুঁ দিয়ে দিয়ে কলকাতা ঠান্ডা করি, কলকাতা বশ মানাই। অদিতি আমায় ওর স্বপ্নের কথা বলে, একদলা উল নিয়ে সে সোয়েটার বুনতে বসেছে, শতসহস্র ঘর বোনার পরেও তার উল ফুরোচ্ছে না, সোয়েটারও খতম হচ্ছে না। আমার ইচ্ছে করে অদিতিকে বলি, ‘ওটা আমায় দাও!’ জবাব তো চাই, জবাব তো দাও! চাইতে পারি না। অদিতির বর আর অদিতির প্রেমিকার কথা ভেবে আমার বুক ফেটে যায়। উহাদের অন্ন বস্ত্র বাসস্থান সংকুলান না হলে যেন আমি গ্রাসাচ্ছাদন করবো না―এমন এক অনশনে বসেছি অদিতির গুহার মুখে।

অদিতির প্রেমিকাকে আমি একটু দূর থেকে দেখি, তাকে আমার একটা কাগজের নৌকোর মতো লাগে, গতিপথে জল বেড়ে বা কমে গেলে যে সাঙ্গ হবে। আমার ইচ্ছে হয় তার উপর এক মগ জল ঢেলে দিতে। অথবা তাকে তুলে এনে মরুভূমির মাঝে বসিয়ে দিতে, লক্ষ কোটি বছর পর অত্যাধুনিক মানুষেরা তাকে বালির মাঝে পেয়ে, সেখানে এক অলীক ঐতিহাসিক সমুদ্রের কথা কল্পনা করে শিহরিত হবে।

অদিতির সঙ্গে দক্ষিণ কলকাতার পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি এসব ভাবি। সে অনর্গল আমায় আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনার কথা বলে চলে। আমার ইচ্ছে হয় অদিতির হাত চেপে ধরতে, আমার ইচ্ছে হয় অদিতিকে অদিতি বলে ডাকি। ‘অদিতি, অদিতি’ বলে ডাকি।

পোড়ো অদিতি আমায় পার্ক স্ট্রিট চেনায়, নিয়ে যায় গোরোস্থানে, যেখানে সবাই ঘুমিয়ে, কেবল আমরা এখনো জেগে আছি।
অদিতির কাছে এসে, গা আমার টিচ্ক্যাও!
অদিতি ট্রিগার টিপে দেয়, অদিতি আমার মাথাটা ফাঁক করে ঘিলুতে তার জিভ রাখে।

২.
অদিতির প্রেমিকাকে আমি একফাঁকে বলে এসেছি, ‘পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব’, অদিতির বরকে দেখে আমি দেঁতো হাসি হেসেছি। অদিতি এসব জানেনা।
অদিতিকে আমি লুকোনো কচ্ছপ দেখাই, অদিতি আর আমি, আমরা দুজনে মিলে রাতের বেলা বেড়ালের ডাক ডাকি। আমাদের হাসি পায়, আমাদের প্রাণপন কান্না আসে।

আমরা কেউ কাউকে আলিঙ্গন করি না ঘুমের ঘোরে। আমাদের স্বপ্নে তাই আমাদের একত্রে দেখা যায় না। অদিতি কেবল পাশ ফেরে। আমি কেবল স্বপ্নের ভিতর আকাশ থেকে পড়ি, মাটি থেকে পড়ি, পিছলে পড়ে যাই অদিতির বুকের ভিতর। অদিতিকে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। অদিতিকে ছুঁয়ে দেখি―আমি সত্যি কিনা। অদিতির গায়ে চিমটি কেটে বুঝি―আমি আমাকে স্বপ্ন দেখছি না তো? অদিতির ঘাড় কামড়ে ধরে তার রক্তের স্বাদ বুঝে নিতে চাই। অদিতি তার এলোচুল দিয়ে আমার চোখ ঢেকে দেয়, মুখ ঢেকে দেয়, অদিতির হাত খামচে ধরে আমি মাটিতে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখি। নিজেকে উড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাই।
আমি অদিতির কাছে যাই, গা আমার নিশপিশ করে।

৩.
ওই যে অদিতি দাঁড়িয়ে আছে, SRFTI, পাশে তার বর, আরও পাশে তার প্রেমিকা। তারপর আমি, কারেন্টের তার কাকের মতো আঁকড়ে ধরে আছি। আমার দেহে কোনো বিদ্যুৎ কখনো খেলে না, যদি না অদিতি আমার দিকে ফেরে, যদি না সে হেসে শুধোয়, ‘এতদিন কোথায় ছিলাম আমরা, বল তো?’
আমি বোকার মতো হাসি।
অদিতি আমার কাছে এগিয়ে আসে। গা অদিতির আমি আমি করি।





লেখক পরিচিতি: অলোকপর্ণা। ঔপন্যাসিক, গল্পকার। তার প্রকাশিত গ্রন্থের ভেতর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, ঝিঁঝিরা, যাহা বলিব সত্য বলিব, দাস্তানগো, রণ বিশ্ববাস করো নাম নয়, সবুজ অন্ধ করেছে, হাওয়া শহরের উপকথা, ইত্যাদি। লেখক বর্তমানে বেঙ্গালুরুে থাকেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. এটি কি একটি ক্যুয়ার প্রেমের গল্প, যেখানে লেখক অদিতির বর ও প্রেমিকা দুজনের প্রতিই সমানভাবে ঈর্ষান্বিত?

    উত্তরমুছুন