হত্যা করার জন্য আমাকে ভোররাতে বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যে নিয়ে চলেছে সে আমার হাত ধরেনি, কারণ হয়ত বুঝে নিয়েছে আমি পালাব না। অবশ্য মৃত্যু থেকে পালানো যায় না। তাছাড়া, আগে মরা এবং পরে মরার মধ্যে তফাতটা শুধু সময়ের। আর মহাকালের নিরিখে দু-দশ বছর কমবেশির কী মূল্য আছে!
কোনও ঘাতকের 'এরকম প্রসন্ন মুখ আমি দেখিনি। চোখেমুখে কোথাও নিষ্ঠুরতা নেই। শান্ত দৃষ্টি নিচে নামিয়ে ভোররাতের ঘুমন্ত রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে। পাশাপাশি হেঁটে চলেছি আমিও, ওর কোনও জাদুর শেকলে যেন বন্দী হয়ে। পালাবার ইচ্ছে যে একদম অনুভব করছিলাম না সেটাও হয়ত এর কোনও সম্মোহনক্রিয়ার প্রভাবে। একবার মনে হল সে যদি আমাকে ছেড়েও চলে যায়, এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমি একাই বধ্যভূমিতে গিয়ে উপস্থিত হব ! এ শহরটা আমার অচেনা। তবু একা বধ্যভূমিতে পৌঁছতে আমার ভুল হত না। যে রাস্তার শেষে মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে সেটায় পা রাখতে কেউ ভুল করে না, পৃথিবীর যেখানেই সে থাকুক না কেন।
চারপাশের অস্পষ্ট দৃশ্য ভাল লাগছিল। মনে মনে সব কিছুকে বিদায় জানাচ্ছিলাম। কিংবা ওরা আমাকে বিদায় জানাচ্ছিল। একবার মনে হল আমি হয়ত আমার কোনও স্বপ্নের ভেতর দিয়েই হাঁটছি। এবং বাড়ি ফিরে গেলে হয়ত দেখতে পেতাম আমি বিছানায় ঘুমিয়ে আছি। সেক্ষেত্রে অবশ্য আমাকে তাড়াতাড়ি বিছানার আমিকে ঘুম থেকে টেনে তুলে দিতে হবে, যাতে ঘাতকের হাত থেকে সে পালাতে পারে। অবশ্য এসব করার কোনও উৎসাহ অনুভব করছিলাম না। আমি যেন একটুকরো জলের ধারা হয়ে গিয়েছি, যা ওপর থেকে নিচের দিকে বইছে। উল্টোদিকে বয়ে যাওয়া একেবারে অসম্ভব।
সঙ্গের লোকটা প্রসন্ন মনে মুখ নিচু করে আগের মতো হেঁটে চলেছে। সম্মোহিতের মতো পাশাপাশি আমি। মাঝেমাঝে একটু পিছিয়ে পড়ছিলাম। সে কোনও কথা বলছিল না বলে স্বস্তি অনুভব করছিলাম, কারণ কথা বলতে আমারও ইচ্ছে করছিল না। এসব মুহূর্তে শুধু ভাবতে ইচ্ছে করে, অনুভব করতে। মাঝেমাঝে অবশ্য সব গুলিয়ে যাচ্ছিল, যদিও যা ঘটতে চলেছে সেটা মৃত্যুর মতো একটা স্বাভাবিক ঘটনা। ভয় না পেতে প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম। আমার একবার মনে হল ভয় পেলে আমি কষাইখানার সামনে বাঁধা পাঁঠাদের চেয়েও ছোট হয়ে যাব, কারণ ওই পশুরা তখন ভয় পায় না। ওদের ভয় না পাওয়ার কারণটা অবশ্য এই যে ওদের মৃত্যুজ্ঞান নেই। মৃত্যুজ্ঞান মানুষকে যেমন মহৎ ও ত্যাগী করেছে, তেমনি আতঙ্কিতও। আমি মহৎ ও ত্যাগী নই, তা বলে আতঙ্কিত হতেও রাজি নই। ভয় থেকে বাঁচার জন্য এই মুহূর্তে আমি পশুদের মতো নির্বোধ চেতনা ধারণ করতেও রাজি। ভয় না পাবার পক্ষে আরও কিছু যুক্তি খাড়া করছিলাম মনে মনে। প্রতিটি যুক্তিকেই আশ্চর্য শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছিল।
একটা গভীর বাঁক দিয়ে লোকটা ডানদিকে ঘুরল। বাঁকটার পর যে বাড়িঘর চোখে পড়তে লাগল সেগুলো খুব প্রাচীন। নোনাধরা ইটের সারি সারি বাড়ি। মাঝেমাঝে ছানি পড়া চোখের মতো দেখতে নিশ্চল পুকুর। একটা পোড়োবাড়ির কোনও এক গর্ত থেকে একটা ধূসর বেড়াল রাস্তায় লাফ দিল। দূরের এক নির্জন গলি দিয়ে একটা সওয়ারহীন ঘোড়াকে খুব জোরে দৌড়ে মিলিয়ে যেতে দেখলাম। যেন আকাশে উঠে গেল। খুব দূর থেকে ট্রেনের হুইসিল কানে এল । একটা পুরনো ঝুলবারান্দায় একজন গৃহবধূ নিচু হয়ে ঝাঁট দিচ্ছে। ভোর হয়ে আসছে।
এতক্ষণে এই প্রথম আমি এই সব দৃশ্যকে জোর করে ভুলতে চাইলাম । দৃশ্যগুলোয় কোথাও যেন একটা মায়া, একটা আকর্ষণ আছে। ফলে ওগুলো কষ্ট দিচ্ছিল আমাকে। মৃত্যুমুখী মানুষের মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই ভাল লাগা উচিত নয় । তবেই সে নির্ভয়ে মরতে পারে ।
‘এখানেই সে আসবে।' হঠাৎ লোকটা বলল একটা খুব ভাঙা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। দু-পাশে বাঁশঝাড়, জঙ্গল।
'কে?' অনর্থক প্রশ্নটা করলাম।
“যে তোমাকে হত্যা করবে।”
কিছু না বুঝে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এটা আশ্চর্যের যে মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তেও মানুষ সব কিছু বুঝতে চায়।
পরক্ষণেই বাড়ির ভেতরের স্বচ্ছ অন্ধকার থেকে একটা লোক বেরিয়ে এল। তাকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। এবং এই প্রথম তীব্র ভয় পেলাম। লোকটাকে আমি চিনি। আমার বহুকালের শত্রু। একবার একজোড়া নেশাগ্রস্ত অ্যালশেসিয়ান লেলিয়ে দিয়েছিল আমার পেছনে।
সে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে প্রকাণ্ড কাটারি। ঠোঁটে হাসি।
'তুমি যাও’, অন্য লোকটাকে সে বলল। 'তোমার কাজ হয়ে গিয়েছে।'
'হ্যাঁ, আমার কাজ হয়ে গিয়েছে,' অন্য লোকটা বলল আমার দিকে তাকিয়ে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। চোখ নামাতে আমিও পারছিলাম না। এই প্রথম যেন ওর প্রশান্ত মুখটায় ফুটে উঠছিল একটু বেদনার আভাস ! পূবের আকাশে ক্ষীণ আলোর আভাসের মতো।
'আমি জানি তুমি বিশেষ ভয় পাচ্ছ না,” সে বলল। 'কী করে ওটা জয় করলে?'
এতক্ষণ যে ভাবনাটা মনে সবচেয়ে বেশি আসছিল সেটাই সরলমনে বললাম :
'জন্মাবার আগে তো ছিলাম না। সেটা ভেবে যদি কখনও ভয় না পাই, তবে মৃত্যুর পর থাকব না সেটা ভেবে ভয় পাওয়ার কী আছে!'
লোকটা ওরকম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। হঠাৎ হেসে ফেলে। তারপর আস্তে আস্তে সামনের ফাঁকা মাঠ দিয়ে হাঁটতে থাকে। এবং আমাকে হতবাক করে ভোরের আকাশে মিলিয়ে যায়।
'হাঁটু মুড়ে বসে ঘাড় নামাও’, আমার শত্রু গম্ভীর গলায় বলল। 'আর এটা জেনে যাও, তোমাকে হত্যা করার জন্য আমার কোনও অনুতাপ হবে না ?
ওর কথামতো হাঁটু মুড়ে ঘাড় নামিয়ে বসার সময় আমার মাথায় হঠাৎ এল এই অপ্রত্যাশিত, নীচ, করুণ ভাবনা যে একদিন তো এই লোকটাও পৃথিবীতে থাকবে না।
বেশ কিছুক্ষণ নিজের রক্তের নদীতে গড়াগড়ি দিয়ে ছটফট করেছিলাম। তারপর এল শব্দ করে হাসির শব্দ। যেন কোনও নির্জন, বিস্তীর্ণ, বর্ষার জলাভূমির ওপর দিয়ে একঝাঁক পাখি সুরেলা গলায় ডেকে উড়ে গেল ।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা, যে নিজে ঘাতক নয় কিন্তু ঘাতকের কাছে আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল। তার মুখে তখনও হাসি। কিন্তু লোকটা যে কে এবং কেন আমাকে আমার শত্রুর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল আমি বুঝলাম না। তবু বিস্মিত হয়ে আমিও হাসছিলাম। দু-চোখ দিয়ে হঠাৎ অশ্রুও গড়াচ্ছিল আমার ।
'একটা কথার উত্তর দাও’, বন্ধুর মতো আমার হাত ধরে সে বলল : 'মৃত্যুভয় দূর করার ব্যাপারে কোন ভাবনাটা বেশি কার্যকরী? মৃত্যুতেই সব শেষ? না, এখন যেমন বুঝলে যে মৃত্যুই নেই?'
"আমি আমার আগের মতটা পালটাব না,' হাসতে হাসতে বললাম । 'প্রথম ভাবনাটাই বেশি কার্যকরী। কারণ, মৃত্যু নেই জানা মানে এটা জানা যে আবার জীবন পাব। এবং তাহলে এই ভয়ে আবার ভোগা যে একদিন মারা যেতে হবে’।


3 মন্তব্যসমূহ
একেবারেই নতুন ধাঁচের
উত্তরমুছুনভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনআমার প্রিয় গল্পকার। সবসময় ভালো লাগার রেশ রেখে দিয়ে যান। সমৃদ্ধ হই।
উত্তরমুছুন