মনিমালা মাসিকে আমি প্রথম দেখি মৃত্যুর পর। আশৈশব একটা মানুষকে দেখার সুপ্ত ইচ্ছা অবশেষে পূর্ণ হয় আমার।
ব্যাপারটা এমন নয় যে মনিমালা মাসির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমি দেখতে এসেছি। এমনও নয় যে মৃত্যুর পর তাঁকে আমার দেখতে আসার তীব্র ইচ্ছা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কারণ ছিল। বরং আজ আমার এই শহরে আসা আর মনিমালা মাসির মৃত্যু দুটোই কাকতালীয়।
আমার আব্বা এলাকার কৃতী সন্তান। ধনে-জনে-গৌরবে যে মানুষের খ্যাতির মিথ সাধারণে ছুঁতে পারে না। সহসা কেউ পারবে বলেও মনে হয় না। আজ তাকে এলাকায় নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হবে। এলাকাবাসীর আয়োজন। এলাকার জন্য তিনি ক্রমাগত এমন কিছু করেছেন, করে যাচ্ছেন, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এমন আয়োজন কাঙ্ক্ষিতই। এলাকায় ঢুকতে ঢুকতে আব্বার নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা, জনদরদী, পরোপকারীসহ আরো অগণন বিশেষণ শোভিত প্রবেশতোরণ দেখতে দেখতে এসেছি। আমাকে আসতে হয়েছে মূলত বাবার এই কৃতিত্বের গুণগান একেবারে সভার সামনে বসে শোনার জন্য।
আমার দাদাবাড়ি আর মনিমালা মাসিদের বাড়িটি পাশাপাশি হলেও আশৈশব দুই বাড়ির মাঝে দেয়াল তোলার পরিকল্পনা শুনে এসেছি। যদিও আজ পর্যন্ত সীমানাটা অচিহ্নিত ফাঁকাই রয়ে গেছে আর ও বাড়ির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার গন্ধ অনায়াসে এ বাড়িতে চলে আসে। হয়তো এসব গন্ধ দু-বাড়ির কেউই গায়ে মাখে না। দুপুর নাগাদ আমরা এসে পৌঁছানোর পর কয়েকটি ছোটখাটো মানুষের দল এদিক-সেদিক দিয়ে মনিমালা মাসিদের বাড়িতে ঢুকতে থাকলে আমার কৌতুহল হয়। ওদের ঢোকার ভঙ্গিটাই এমন যে ও-বাড়িটায় যা হচ্ছে হোক, ভেবে নির্বিকার থাকার উপায় নেই। আমি বাধ্য হয়েই প্রবেশোন্মুখ একটা দলকে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? দলের মাঝ থেকে উত্তর দিল শংকর কাকা, আরে আদনান বাপ আইছে, কী মজা, কহন আইছো? এরকম উচ্ছ্বসিত সম্বোধনে কোনো মৃত্যু সংবাদ দেওয়া যায় কিনা কে জানে। কিন্তু মনিমালা মাসি এমনই অপ্রয়োজনীয় একজন যার মৃত্যুতে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি তো হয়ই না, একটা পাতাও ঝরে পড়ার আগে দুবার ভাবে না। হাসিমুখে তার মৃত্যু সংবাদটা দেওয়া যায় এবং শংকর কাকা দিলেন।
মনিমালা মাসির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মনিমালা মাসীকে একটিবার, প্রথমবার এবং শেষবার দেখার তীব্র ইচ্ছেটাকে আমি দমন করতে পারি না। চাইও না আর। কতদিন মনিমালা মাসিকে নানাভাবে দেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনোভাবেই পারিনি। ঘর ছেড়ে কখনোই বাইরে আসতেন না মনিমালা মাসি। শুনেছি মনিমালা মাসি নিজে নিজে হাঁটতে পারেন না। হাঁটতে চলতে না পারা একটা মানুষ সারাদিন ঘরে শুয়ে থাকেন, তার দিনরাতের রং কেমন, কেমন তার বেঁচে থাকার ধরন আমার যতটা দেখার আগ্রহ হতো, সমবয়সীদের তেমন হতো কিনা আমার জানা নেই। এটা জানা খুব গুরুত্বপূর্ণও ছিল না আমার কাছে। কিন্তু ছুটিতে দেশের বাড়ি আসার অনেকগুলো আকর্ষণের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনিমালা মাসিদের বাড়িটি আর মনিমালা মাসি।
কেন যেন সম্পূর্ণ অদেখা একটা মানুষ মনিমালা মাসি নামের একটা মানুষ জীবন্ত অস্তিত্ব হয়ে আমাদের পরিবারে বেঁচে ছিলেন। শৈশব কৈশোরে প্রশ্নটি আমার মাঝে না জাগলেও আজ মনিমালা মাসির মৃত্যুর খবরটি শোনার পর প্রশ্নটি আমার মনে ঘাই মারতে থাকে। সেই ঘাইকে যদিও আমি বেশিদূর প্রশ্রয় দেই না। তবু তাকে শেষবার এবং প্রথমবার দেখার লোভটা সামলানোর চেষ্টা করি না। যে কারণে আমার আজ নানা মিটিং, সভা স্থগিত করে এই শহরে আসা, আব্বার সংবর্ধনা, আমি তাতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।
আমি আব্বার অনুষ্ঠানে যাবো না। আব্বা এত জোর জবরদস্তি করে আমাকে ঢাকা থেকে নিয়ে এলেন, মূলত নিজের কৃতি ও কৃতী পরিবারের সদস্যদের না দেখাতে পারলে যেন সব আয়োজনই বৃথা। আব্বা মূলত স্বনির্মিত (সেল্ফ মেইড) মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধফেরত যোদ্ধা বন্ধুদের অনেকেই দিগভ্রান্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেলেও আমার আব্বা প্রথম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি চাকরিতে ঢুকলেও কয়েক বছর পরই চাকরি ছেড়ে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়ে যান। গার্মেন্টস সেক্টর তখন মাত্র ফুলে-ফেঁপে উঠছে। প্রাথমিক যুগের উত্থানের অগ্রপথিকদের একজন ছিলেন আমার আব্বা। বাণিজ্য অঙ্গনের পাঁচজনে বলে আমার আব্বার হাতে সোনা ফলে। যে ব্যবসায় হাত দেন সেদিকেই তিনি সফল হন। সফলতার অনুষঙ্গ যে উঁচু তলার জীবন সেখানে আব্বার পাঁচ-তারা হোটেল আছে, মাসে মাসে বিদেশ ভ্রমণ আছে। সরকারের হোমড়াচোমরাদের সাথে অন্তরঙ্গতা আছে। কিন্তু তাই বলে তিনি নিজের জন্মভূমিকে অস্বীকার করেননি। মাটির সাথে শেকড়ের সাথে সম্পর্ক এক মূহুর্তের জন্য ছিন্ন করেননি। সবাই তাকে ধন্য ধন্য করে। বলা বাহুল্য সন্তান হিসেবে এসবকিছু আমাকে গর্বিত করে না বললে সত্যের অপলাপ হয়।
সব মানুষেরই হয়তো সুপ্ত বাসনা অমর হওয়ার। আর বেঁচে থাকতে থাকতেই উপলব্ধি করা কার মাঝে, কীসের মাঝে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে সে। জাগতিক কর্মকাণ্ড আর আমার মাঝে একটা আবেগী সংযোগ ঘটিয়ে যেতে চান আমার আব্বা। ফলে এই সংবর্ধনায় আমাকে নিয়ে আসার জন্য এত জোর জবরদস্তি।
কিন্তু মনিমালা মাসীকে একবার দেখার জন্য আমি সেই অনুষ্ঠানে যাব না বলার পর আব্বার তেমন কোনো ভাবান্তর দেখলাম না। তিনি যে উদ্দেশ্যে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন সেটা যেন তিনি ভুলে গেছেন এমনভাবে হ্যাঁ সূচক মাথাটা কাত করলেন। আমার কথাটা বলতে যে বিব্রতবোধ হচ্ছিল, সেই বোধটাই বরং বিব্রত হলো আব্বার নির্বিকারত্বে।
সারাজীবন মনিমালা মাসীকে একনজর দেখার ভীষণ ইচ্ছে আমার। আজই সেই দিন। আমি আব্বার অনুষ্ঠানে যাওয়া বাদ দিয়ে অবশেষে বাসায় থেকে গেলাম। মা ও পাশ থেকে বললেন, আমিও না যাই।তাতেও আব্বার কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখা গেল না। আব্বা দিব্যি কোট-প্যান্ট-টাই পরে বের হয়ে গেলেন।
আব্বার সাথে এই শহরে আসা প্রায় দুই যুগ পরে। কলেজ, ছাত্রাবাসসহ বিশাল কম্পলেক্সের উদ্বোধনও হবে আজ। আব্বার ব্যবসা ফুলে ফেঁপে আব্বাকে সি আই পি পরিচয় এনে দিলে আব্বা যেমন দুহাতে ব্যবসা সামলেছেন তেমনি এলাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা,স্কুল কলেজ কত কিছু যে স্থাপন করেছেন। শুধু কি তাই, নিয়মিত প্রচুর দান খয়রাত করেন আর এগুলো উপলক্ষে আব্বা মাঝে মাঝেই নিজ শহরে আসেন। মাও আগে সবসময় সাথে আসতেন, ইদানীং আব্বা এগুলো দেখাশোনার জন্য নিজে এলেও মা আর সবসময় সাথে আসতেন না। এবার অনেক দিন পর আব্বা আমাকে আর মাকে সাথে নিয়ে এলেন।
এ এক অদ্ভুত কাণ্ড! মনিমালা মাসি আর আমাদের পাশাপাশি বাড়ি হলেও দুই পরিবারে কোনো যাতায়াত ছিল না। অন্তত আমি দেখিনি। ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত ঠেকত আমার ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন করার মতো কোনো প্রয়োজনীয়তা মনে জাগেনি তখন। যেমন শোনা যায় আগেকার দিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা। তেমন কোনো সম্প্রীতি আমাদের দু-পরিবারে ছিল না। না ঈদের দিন আমাদের সেমাই তাদের বাড়ি যেত, না পূজার দিনে তাদের নাড়ু আমাদের বাড়ি আসত। কোনোই সামাজিক সম্পর্ক ছিল না দুই পরিবারের।
মনিমালা মাসির ভাই শচীন্দ্র জেঠু খুব খিটখিটে লোক। এদের ঘরে ঢোকার তো প্রশ্নই ওঠে না, বারান্দায়ও ওঠা যেত না। ছোটবেলায় ঢাকা থেকে ছুটিছাটায় বাড়ি এলে আমরা শিশুদের দল দৌড়ে দৌড়ে খেলতে খেলতে মনিমালা মাসিদের বাসায় ঢুকে পড়লে শচীন্দ্র জেঠু বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে তালপাতার পাখার বাতাস খেতে খেতে হাঁক দিতেন, হরি হরি বান্দরগুলারে খেদা। আর এদের বাঁধা কাজের লোক হরি হাতের তালপাতার পাখাটা নিয়ে আমাদের দৌড়ানি দিত। এমন নয় যে শচীন্দ্র জেঠুদের কাঠের দোতলার পেছনে যে কামরাঙা আর জলপাই গাছ ছিলো তাতে আমাদের ঢিল ছোঁড়ার ইচ্ছে হতোনা। কিন্তু শচীন্দ্র জেঠুর ভয়ে আমরা কখনো সেগুলোতে ঢিল ছুঁড়তাম না। তবু শচীন্দ্র জেঠুর আমার কিংবা আমার মতো সমবয়সী বাচ্চাদের উপর ভীষণ রাগ ছিল। দেখলেই ধরধর মারমার করে মারতে আসতেন। দাদুকে দেখলে আমরা পারতপক্ষে সেসব রাস্তা মারাতাম না। দেখতাম সন্ধ্যায় মাধবী জ্যাঠিমা সারা উঠান লেপছেন। মায়ের কাছে জেনেছি তার হাতের বালতিতে গোবর গোলা পানি। সারা বিকাল জুড়ে আমার মতো মুসলমানদের পায়ের ছোঁয়ায় অশুচি হয়ে যাওয়া উঠান সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানোর আগে শুচি করে নিতেন তিনি। মা কড়া ধমক দিতেন, কাল থেকে আর যাবি ও বাড়ির উঠানে তোর একদিন কী আমার একদিন। মা বিড়বিড় করতেন,বাচ্চাগুলো খেলে এজন্য নাকি উঠান অশুচি হয়ে যায়! ছি! ছি! এই যুগে এসব কী? তো এরকম যাদের ছুৎমার্গ তাদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা কঠিনই বটে। নইলে শংকর কাকা কাকীমা, শম্ভু জেঠুরা তো ঠিকই ঈদের দিন বায়না ধরত, ভাবি আপনার হাতের স্পেশাল ফিন্নিটা…।
এ প্রসঙ্গে মায়ের সব রাগ গিয়ে পড়ত বাবার উপর। কতদিন বলেছি সীমানায় দেওয়াল তোলো। না, সে তুলবে না। ঐ বাড়ির গন্ধ আটকাইয়া যাবে। বাড়ির গন্ধ ব্যাপারটাকে আমরা ভাইবোনেরা তেমন একটা পাত্তা দিতাম না। কিন্তু ভট্টাচার্য বাড়ির প্রসঙ্গ এলে বাবা আর মায়ের ঝগড়া তুমুলে পৌঁছাত। মা ভট্টাচার্য বাড়ির কথা বলা মাত্র বাবা ছ্যাঁৎ করে উঠত, আমি দেই না তো তুমি দিয়ে দাও। হ্যা হ্যা আমিই দেবো, বললেও কয়েক দশক পার হলেও আজও দেয়াল উঠেনি।
আমাদের আর ভট্টাচার্য বাড়ির মাঝে দেয়াল উঠে যাবে আর আমরা ভট্টাচার্য বাড়িতে যেতে পারব না ভাবতে আমার ছোটবেলায় খুব কষ্ট হতো। ভট্টাচার্য বাড়িটি আমার কাছে ছোটবেলা থেকেই এক বিরাট রহস্য। বিশাল কাঠের দোতলার বারান্দার কার্নিশ জুড়ে বড় বড় মানিপ্ল্যান্টের ঝার। দোতলার কাঠের দরজাটা সবসময় বন্ধ।
মা আর আব্বার গল্প থেকেই জেনেছি, এই পুরো তল্লাটটা ছিল শচীন্দ্র জেঠুদের। শচীন্দ্র জেঠু কোনো কাজকর্ম না করে সারাজীবন এসব বিক্রি করে বসে বসে খেয়েছেন। আমি যখন থেকে দেখেছি তখন থেকেই মনে হতো এদের ঘরের কম আলোর মিটিমিটি বালব আর পুরানা ফার্নিচার সব কিছুতেই আর্থিক দীনতা লেগে আছে। হয়তো বিক্রি করতে করতে শচীন্দ্র জেঠুর কাছে বিক্রি করার মতো জায়গাজমি তলানিতে পড়েছিল।
কাঠের দোতলার খোলা জানালা দুটো দিয়ে ঘর থেকে অপূর্ব এক ধোঁয়ার ঘ্রাণ সারা উঠানময় ছড়িয়ে যেত। আমার খুব প্রিয় ছিল ঘ্রাণটা। কেমন শার্টের কলারে বোতামে মিশে যেত। শুনেছি জেঠিমা ঠাকুর পূজা দিতেন আর পূজার সময় ধুপ জ্বালাতেন। মিষ্টি গন্ধটা ধুপের। পরে অবশ্য কবিতায় পড়েছি, আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিদুর ধুপ…। কী যে প্রিয় ছিল গন্ধটা আমার। এই গন্ধের নেশায় শচীন্দ্র জেঠুর চোখ এড়িয়ে বাড়িটার আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। বাসায় গেলেই মা খিটমিট করতেন, গা ভরতি হিন্দু বাড়ির গন্ধ। যা কলতলায় গোসল করে আয়।
ঢাকার বাড়িতে আমাদের আলাদা আলাদা গোসলের ঘর থাকলেও থানা সদরের বাড়িটিতে একটাই কলতলা, এখানেই গোসল, এখান থেকেই খাওয়া দাওয়া নিত্যকর্ম। আমার খুব ইচ্ছে হতো ভট্টাচার্য বাড়ির শান বাঁধানো ঘাটে নেমে এফোঁড়-ওফোঁড় সাঁতার কাটি। কিন্তু ভট্টাচার্য বাড়ির পুকুরে নামাও নিষেধ ছিল। মা বলতো আমরা মুসলমান, ওদের পানি অশুচি হয়ে যাবে। এসব অর্থহীন ব্যাপার মোটেই অর্থহীন মনে হতো না তখন। মনে হতো এটাই স্বাভাবিক এটাই নিয়ম।
শচীন্দ্র জেঠু আব্বার নয় শুধু, পাড়ার প্রায় সকল চাচা কাকাদের মধ্যে বয়স্থ। সম্পর্কে, শাসনে, মান্যতায় বড় ভাইয়ের মতো। জেঠু ডাকটা পাড়ার সমবয়সী সবার সাথে সাথে আমিও আত্মস্থ করেছি। সে অর্থে মনিমালা মাসিকে আমার পিসি ডাকার কথা। কিন্তু কে কখন কেন আমাকে মাসি ডাকতে শিখিয়েছে আমার মনে নেই। শৈশব-কৈশোরেই ব্যাপারটা মাথায় এসেছে আমার, কিন্তু তলিয়ে ভাবিনি কখনো।ভাবাটা খুব জরুরি ছিল না। কিন্তু আজ প্রশ্নটা জাগছে, ভীষণভাবে জাগছে, নানা প্রশ্ন ডালপালা মেলে জাগছে। মনিমালা মাসিকে তো আমার পিসি ডাকার কথা। মাসি কেন ডাকতাম?
শচীন্দ্র জেঠুরা খুব কড়া হিন্দু ছিলেন এটা পাড়ার সবাই কম বেশি জানতো। শচীন্দ্র জেঠু ধুতি পরে গায়ে কয়েক পরত সুতা বেধে বিড়বিড় মন্ত্র পড়তে পড়তে পুকুরে ডুব দিতেন। আমাদের কাউকে দেখলেই ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু তাদের প্রতি ভীষণ আকর্ষণ ছিল। তাদের ঘরটা ছিল আমার কাছে বিরাট রহস্য। বাইরে থেকে ঘরের ভেতরে এক আলমিরা বই আর তার উপর শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুর, সুভাষ বসু আর বিবেকানন্দের ছবি পাশাপাশি। অর্থহীন ছবিগুলো যখন অর্থ নিয়ে ইতিহাস নিয়ে জানার আওতায় এলো তখন আমি মিলাতে পারতাম না রামকৃষ্ণ ঠাকুর আর বিবেকানন্দের মাঝামাঝি কী করে সুভাষ বসু ঠাঁই নিয়েছিলেন।
আজও উঠান ময় সেই গন্ধ। মনিমালা মাসি শুয়ে আছেন মাটিতে। এক পরত চাটাই আর তার ওপর একটা চাদর বিছানো। মাথার কাছে একটা তুলসি চারা। মাথার পাশে পিতলের ধুপ দানিতে সেই পরিচিত ধুপের ঘন্ধ পোড়া নারকেলের ছোবা থেকে বাতাস কেটে কেটে এঁকেবেঁকে রাস্তা খুঁজে নিচ্ছে,আর আশেপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে গন্ধ। হিন্দু বাড়ির গন্ধ। মনিমালা মাসির জন্য কেউ কান্নাকাটির নেই। মনিমালা মাসির বিয়ে হয়নি। শুনেছি, না শুনেছি বলা ভুল। শহরের সবাই জানতো মনিমালা মাসি প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। দোতলা বাড়ির টিনের চাল মৃত্যুর মতো প্রশান্তি এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই অপর্যাপ্ত। মনিমালা মাসি ব্যর্থতার যন্ত্রণা ভুলে প্রশান্তি পেতে লাফ দিয়েছিলেন, কিন্তু পেয়েছেন দীর্ঘস্থায়ী পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা আর অসহায়ত্ব।
মাকে বলতে শুনেছি কার সাথে যেনো উথাল-পাতাল প্রেম ছিল মনিমালা মাসির। ঐ ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিলেন কোথাও। শহরে ঢি ঢি পড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের সময় ফিরে এসেছিলেন একা। যে ছেলেটির সাথে পালিয়েছিলেন সেই ছেলেটি মনিমালা মাসিকে ফেলে যুদ্ধে চলে গেলে মনিমালা মাসি দিশবিশ না পেয়ে বাপের ঘরেই ফিরে এসেছিলেন। মনিমালা মাসির বাবা-মা মেয়েকে ফেলে দিতে পারেননি। এক দুদিনের মধ্যে শহরে পাকিস্তানি সৈন্য ঢুকে গেলে মনিমালা মাসিও পরিবারের সাথে সীমান্ত পার হয়ে চলে যায় শরনার্থী শিবিরে। ফিরে আসলে সেই ছেলে আর মনিমালা মাসির খবর নেননি। এটুকুই জানা যেত বাতাসে কান পাতলে।
এক এক করে মানুষ জমে আর খোল করতালে হরিনাম গেয়ে গেয়ে সবাই মনিমালা মাসিকে শেষ কৃত্যের জন্য কাঁধে নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়। আর আমি চোখ ভরে মনিমালা মাসিকে খুব ভালো করে দেখি। চামড়া লেগে আছে হাড়ের গায়ে। টুকটুকে গায়ের রঙ দেখে আন্দাজ করা যায় কী অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন বয়সকালে। জীবিত অবস্থায় মনিমালা মাসিকে আমি দেখতে পাইনি কোনোদিন।
মনিমালা মাসিকে শেষ কৃত্যের জন্য নিয়ে বের হয়ে গেলে আমি বাসায় ফিরি। মায়ের ঘরে চুপচাপ মা। আমি ঘরে ফিরেছি টের পায়নি। যে মনিমালা মাসি দের বাসা নিয়ে এতো আপত্তি তার আজ যেনো তার মৃত্যুর শোকে ছেয়ে গেছে আমাদের বাড়িটা। অদ্ভুত নীরবতা চারদিকে, যেন ঘরের দেয়ালগুলোও চুপচাপ শুনে যাচ্ছে তাঁর কথা। মা ধীরে, খুব নীচু স্বরে কথা বলছেন। সেই স্বর যেন এক অচেনা ফিসফিসানি, কান্না আর অনুতাপের গোপন মিশ্রণ। কথাগুলো স্পষ্ট হলেও ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠছে, যেন প্রতিটি শব্দের সঙ্গে দমিত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে। তাঁর কণ্ঠে অদ্ভুত এক ব্যথা—মৃদু, তবুও গভীর—যা শুনলেই মনে হয়, এ যেন শুধু কথা নয়, বরং অশ্রুর ভেজা ইতিহাস।
মা বলছেন, একবার এসে শেষ দেখাটা দেখে যেতে পারতে। মায়ের বলার ভঙ্গিতে স্পষ্ট বুঝতে পারি আব্বাকেই বলছেন।
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হই দরজার সামনে।শোক-কষ্ট-আক্ষেপ সব মিলেমিশে আমার সামনে হঠাৎ একটা প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হয়ে যায় মূহুর্তে,কেন মনিমালা মাসিকে আমার মাসি ডাকতে হয়েছে। পিসি নয়। আব্বার বোন কিংবা বোনের মতো ছিলেন না তিনি।


2 মন্তব্যসমূহ
মনিমালা মাসীর গল্প আমাদের চেনা উঠোনের গল্প।
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ
উত্তরমুছুন