রবিশঙ্কর বলের প্রবন্ধ : কাফ্ফার উত্তরসূরী


কেউ বলেন বিপ্লবের বছর, কারুর মতে প্রতিক্রিয়ার। এভাবে চিহ্নিত না করেও বলা যায়, এই শতাব্দীর ইতিহাসে ১৯৮৯ সাল এমনই এক ঝোড়ো বছর যার ঘূর্ণি হাওয়ায় অনেক কিছুই ওলোটপালোট হয়ে গিয়েছিল। এমন এক সন্ধিক্ষণ যার পরের কয়েক বছরে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রটাকেই নতুন করে আঁকতে হল আমাদের। ওই বছরের কয়েকটি ঘটনার দিকে চোখ রাখা যেতে পারে : চেকোস্লোভাকিয়ার গণতন্ত্রকামী সমাবেশের ওপর পুলিশি আক্রমণ, আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েট সেনা অপসারণ শেষ, তিয়েনানামন স্কোয়্যারে ছাত্রহত্যা, পোল্যান্ডে সলিডারিটি ক্ষমতায়, জার্মানিতে আন্দোলন ও বার্লিন ওয়ালের পতন, বুলগেরিয়ায় অবাধ নির্বাচন ঘোষণা, রোমানিয়ায় একনায়ক চেসেস্কুর পতন ও হত্যা, চেকোস্লোভাকিয়া ভাক্‌লাভ হাভেল প্রেসিডেন্ট।

পরবর্তী তিন-চার বছরে এভাবেই একের পর এক ভাঙন এবং নতুন উন্মোচন : সুপার-পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয় এবং সোভিয়েত-অধীন দেশগুলির স্বাধীনতা; এর মধ্যে অনেক দেশ আবার জাতিসত্তার আন্দোলনে ভেঙে অনেকগুলি রাষ্ট্রে পরিণত । যেমন পূর্বতম চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে চেক ও স্লোভাক রিপাবলিক। একইভাবে ভাঙল যুগোস্লাভিয়া। স্বাধীন হল একে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত রাজ্যগুলিও।

দৃশ্যপট বদলের এই প্রক্রিয়ায় আমাদের সামনে উন্মোচিত হল এক বিস্তৃত ভূখণ্ড, যাকে বলা হয় পূর্ব ইউরোপ বা মধ্য ইউরোপ। চেক লেখক ইভান ক্লিমার মতে, it would be more precise to call it the Soviet realm, the Empire of Stalinist tyranny, the Empire of great illusions...”। কেননা পূর্ব ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশে ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজত্ব করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন—তার পুতুল সরকার, তার সেনাবাহিনী। আর এই রাজত্ব চালানো হয়েছে একটি মতাদর্শকে সামনে রেখে। এখানে সব মানুষ সমান, এখানে কোনও অত্যাচারী নেই। সোভিয়েতের হাত ধরে এই দেশগুলি এগিয়ে চলেছে সাম্যবাদের পথে। ১৯৮৯ সাল থেকে সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের (পূর্ব ইউরোপ) যে ভাঙন শুরু হল, তাকে বহু গুরুবাদীই (কমিউনিজম তো এঁদের কাছে গুরুবাদ) পুঁজিবাদের চোরাগোপ্তা আক্রমণ বা অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এইসব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা এতদিন কিছু জানতে পারিনি কেন? স্বদেশ চেকোস্লোভাকিয়ায় কেন নিষিদ্ধ থাকে কাফকার সাহিত্য? রাষ্ট্র প্রচারিত সাহিত্যের বাইরে সাহিত্য-শিল্পের অন্যান্য কন্ঠস্বর আমরা কেন এতদিন শুনতে পাইনি? গুরুবাদীরা মানতে পারেন না, সোভিয়েত ইউনিয়নও এতদিন পর্যন্ত আসলে সুপার-পাওয়ার হিসাবেই কাজ করেছে; যেমন আমেরিকা। ক্ষমতার লৌহ যবনিকার আড়ালে প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলিকে যেমন আমেরিকা শুনতে দেয় না, সোভিয়েত ইউনিয়নও চেপে রেখেছে। সোভিয়েতের চেপে রাখা আরও নিশ্ছিদ্র। কেননা সেখানে একনায়কতন্ত্র, তা সে প্রলেতারিয়েত বা যারই হোক না কেন, স্বীকৃত। আসলে তো ওই একনায়কতন্ত্র ছিল কমিউনিস্ট পার্টির, তার শীর্ষস্থানীয় নেতা ও আমলাদের। নাহলে সমাজতন্ত্রী সমাজ, তার আদর্শের জায়গা থেকেই কোনও সমালোচনা শুনবে না কেন? সমালোচনা উঠলেই কেন তাকে লেবার ক্যাম্পে বা গুলাগে পিষে মারা হবে? নাকি এই আদর্শের মধ্যেই একনায়কতন্ত্রের বীজ? ট্রটক্সি বলেছিলেন, সাম্যবাদী সমাজে ঘরে ঘরে অ্যারিস্টটল, মার্ক্স জন্মাবে। সব মানুষকে অ্যারিস্টটল, মার্ক্স করে তোলার মধ্যে কি কোনও ছাঁচ, ক্ষমতার অভীপ্সা নেই? একটি পার্টি ও তার নেতারাই সব ঠিকঠাক বোঝেন, অন্যেরা বিপথগামী, এই ভাবনার মধ্যেও কি ক্ষমতার দম্ভ নেই ? ,শিল্প-সাহিত্যেও এই ছাঁচই আমরা দেখেছিলাম সমাজতন্ত্রী বাস্তবতার ধারণায়, যাকে ক্লিমা বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসের সাহিত্য”। এই সাহিত্যের নায়ক শ্রমজীবী মানুষ, তার বিশ্বাস ন্যস্ত কমিউনিস্ট পার্টির ওপর, জগৎটা তার কাছে খারাপ বা ভাল, কোনও ছায়াময়তা নেই, বাধা কেটে কেটে নি এগিয়ে চলে জয়ের পথে। মানবমন, তার আকাঙ্ক্ষা-কামনার কোনও দ্বন্দ্ব জটিলতা সেখানে নেই। এই সাহিত্যের দীর্ঘ উদাহরণ বরিস পলেভয়ের ‘মানুষের মতো মানুষ' বা মিসাইল শোলোকভের ‘ধীরে বহে ডন’। সমাজতন্ত্রী বাস্তবতার ক্ষমতা ও প্রচারের চাপে মিখাইল বুলগাকভের মতো লেখককে তাই বিস্মৃতিতে হারিয়ে যেতে হয়।

মিখাইল বুলগাকভের মতো লেখকদের কাছে এতদিন আমরা পৌঁছতে পারিনি। এঁরা ছিলেন লৌহ যবনিকার আড়ালে। কেননা রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে এঁরা লেখেননি। মিলান কুন্দেরা, ড্যানিলো কিস্, জোসেফ সোভেরেকির মতো কয়েকজনের লেখা আমরা পেয়েছিলাম, যাঁরা দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছায় বা নির্বাসিত হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু নিজের দেশে থেকেও, নানা জিজ্ঞাসাবাদ ও অত্যাচার সহ্য করেও অনেকে এতদিন লিখে গেছেন, যাঁরা কোনওভাবেই রাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে নেননি।

তেমনই একজন লেখক চেকোস্লোভাকিয়ার ইবান ক্লিমা। হঠাৎই তাঁর ‘স্পিরিট অব প্রাগ’ বইটি আমার হাতে আসে। বইতে ফিলিপ রথের সঙ্গে তাঁর একটি দীর্ঘ কথোপকথন আছে। এই কথোপকথন থেকেই আমরা জানতে পারি, লৌহ যবনিকার আড়ালে সাহিত্য-রচনার সেই প্রক্রিয়াটিকে যা রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করেনি। ইভান ক্লিমা যা বলেছেন তা পূর্ব ইউরোপের প্রত্যেকেটি দেশের ক্ষেত্রেই অনেকাংশে সত্য। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নির্দেশ না মানলেই সাহিত্যকে চলে যেতে হয়েছে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে' এবং লেখকরা নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, অনেক লেখক বাধ্য হয়ে লেখা বন্ধ করেছেন।

১৯৪৮-এর অভ্যুত্থানের পর চেকোস্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল রাশিয়া। ১৯৬৮-তে প্রেসিডেন্ট ডুবচেক যে উদারনীতির পথ খুলে দিয়েছিলেন, তার পরিণতি ‘প্রাগ বসন্ত'। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উত্তাল জনগণ। তখনই ঘটল রুশ সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ। বসানো হল পুতুল সরকার। ক্লিমা এই পর্বের কথাই বলেছেন রথের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনে।

সাতের দশক থেকে সরকার নির্দেশিত মতাদর্শের বাইরে বা ওই মতাদর্শকে সমালোচনা করে যে-সব গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হয়েছে, তার সবটাই প্রকাশিত হয়েছে গোপনে, সামিজদাত সংস্করণে। সরকার যাঁদের সাহিত্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করেছিল, তাঁরা এই সময়ে প্রতিমাসে ইভান ক্লিমার বাড়িতে মিলিত হতেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ভাকলাভ হাভেল, জিরি গ্রুসা, লুদভিক ভাকুলিক, পাভেল কোহোট, আলেক্সান্দার ক্লিমেন্ট, জান ট্রেফুলকা, মিলান উডে। পরস্পরের লেখা পড়বার জন্যই তাঁরা মিলিত হতেন। বহুমিল হ্রাবালের মতো লেখক এই গোপনচক্রে না এলেও, নিজের নতুন লেখাটি পাঠিয়ে দিতেন। এখানেই শুরু হয় সামিজদাত সংস্করণের পরিকল্পনা। লেখা টাইপ করে বিক্রি করা হবে। একটি সাধারণ টাইপরাইটার ও একজন টাইপিস্টকে নিয়ে শুরু হল কাজ।

প্রথমে এক একটি লেখার দশ বা কুড়ি কপি টাইপ করা হত। কিন্তু দিনে দিনে গোপন পাঠ করে সংখ্যা বাড়ায় টাইপকপির সংখ্যা বাড়তে লাগল তখন বইয়ের মতোই তা বাঁধানো হতে থাকে। নিষিদ্ধ শিল্পীরা এইসব বইয়ের চিত্রণের কাজও করতেন। শুধু কবি-গল্পকার- ঔপন্যাসিকরা নন, দার্শনিক-ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিকরাও এসে যুক্ত হলেন। এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল সাম্প্রতিককালের ওন্যতম চেক দার্শনিক জান পাতোস্কার রচনাসংগ্রহ।

পুলিশও অবশ্য বসে থাকেনি। বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে আটক করেছে এইসব বই, টাইপিস্টদের গ্রেপ্তার করেছে, কাউকে কাউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সামিজদাতকে বন্ধ করা যায়নি। কেননা সামিজদাতের কাজ কখনও কেন্দ্রীভূত থাকেনি, গোপনে তা ছড়িয়ে গেছে নানা জায়গায়। এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দুশোর মতো সামিজদাত পত্রিকা ও কয়েক হাজার বই ।

বইয়ের বাজার ও সেন্সর এখানে কোনও ভাবে নাক গলাতে পারেনি। চেক যুবসমাজ এই প্রতিষ্ঠানবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেছে। ১৯৮৯-তে কমিউনিস্ট স্বৈরতন্ত্রের পতন এবং হাভেলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জমি তৈরি হচ্ছিল এভাবেই, শাসকের চোখের আড়ালে।

রাষ্ট্র যেসব লেখক, শিল্পীদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করছিল, তাঁরা জীবনধারণের জন্য কেউ উইনডো-ক্লিনারের কাজ করেছেন, কেউ বা ক্রেন অপারেটর হয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনের সমালোচক লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ইগো' এভাবেই ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে। একই ঘটনা সোভিয়েত এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশে। বছরের পর বছর এই পীড়ন সহ্য করতে না পেরে অনেকেরই সৃজনশীল কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।

পশ্চিমী পুঁজিবাদী দেশের বুদ্ধিজীবীরা সবসময়ই এইসব দেশের প্রতিবাদী রচনাকে কমিউনিজম-বিরোধীতার নিরিখে বুঝতে চেয়েছেন। কিন্তু সরকারি ঘেরাটোপের বাইরের লেখকের নিষিদ্ধ রচনায় প্রতিবাদ মানে সোচ্চার কমিউনিজম-বিরোধিতা নয়। তাহলে তো এইসব লেখাও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার মতোই এক ধরনের শ্লোগান হয়ে উঠবে। এসব লেখাও প্রতিবাদের ধরন আরও জটিল। পৃথিবী ও মানুষ সেখানে শুধু ভাল আর খারাপে বিভাজিত নয়। এখানে শুধুই পার্টি সেক্রেটারি, সিক্রেট পুলিশ আর প্রতিবাদী বিপ্লবী নেই। ক্লিমা একটি রচনায় লিখেছেন, “...it is full of ordinary people, loving and hating each other, comitting rape, suffering, dying, waging pointless wars: here (as eyerywhere) trees blossom in spring, sons love their mothers, husbands long for a mistress.” আসলে একনাকতন্ত্রের দমবন্ধ পরিবেশে একটি প্রেমের গল্পও হয়ে ওঠে প্রতিবাদ। রাজনীতি যেখানে সবকিছুর নির্ধারক, সেখানে রাজনীতি নিয়ে কথা না-বলাই প্রতিবাদ। সরকার নির্দেশিত সাহিত্যের ভাষা যেখানে সংবাদপত্রের ভাষার মতো স্বচ্ছ, একরৈখিক, সেখানে ভাষার জটিল বয়ান ও নির্মাণই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ। ক্লিমা জানান, আমরা যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি তা খুব সহজভাবে বোঝা যায় না ।

কথা বলা মানে যেখানে ধরা বাঁধা বুলি আউড়ানো নতুবা গম্ভীর হয়ে থাকা, সেখানে হাসি-ঠাট্টা মস্করাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ। তাই পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন লেখকদের নানা বৈশিষ্ট্যকে বুঝে নিয়েও আমরা যেন একটি বিশেষ ধরন চিহ্নিত করতে পারি যা একান্তভাবেই পূর্ব-ইউরোপীয়। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তার মিল নেই। এই শৈলীর কথা ফ্রেড মিশুরেলা প্রবন্ধে খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “It's ingredients : historical, determinism coupled with a flair for narrative caprice (often shown in the guise of fatal and fateful accidents that diminish the value of individual human effort); an ironic, personal narrative voice that combines sentimentality with an aloof, intellectual, darkly Philosophic humor, and finally, a willingness to mix essay with narrative, reality with fiction, regarding them ali as equally relevant...” এইসব রচনায় ইতিহাস ও ফ্যান্টাসি মিলেমিশে যায়, শিল্পের সঙ্গে মিশে যায় বিজ্ঞান ও দর্শন আর চিরজাগরুক থাকে এক অজ্ঞেয়বাদী দৃষ্টি।

পূর্ব ইউরোপের রচনায় এই যে অনির্ণেয়তা, যার শুরু ফ্রানজ কাফ্‌কা ও জারোস্লাভ হাসেকে, তা কিন্তু দৈনন্দিন, সাধারণ জীবনকে কখনও পাশ কাটিয়ে যায়নি। বরঞ্চ চরিত্ররা সবাই খুব সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষ। লেখার ভিতরে এইসব মানুষদের বেঁচে থাকার আনন্দ-দুঃখ, মানবিকতাই অনেক বড় হয়ে ওঠে তার চারপাশের শ্বাসরোধী ব্যবস্থার চেয়ে। ব্যক্তিকে তার রক্তমাংসের অস্তিত্বে ধরবার চেষ্টা অন্য কোনও জায়গার সাহিত্যে এত প্রবল নয়। পূর্ব ইউরোপের প্রতিবাদী লেখক-শিল্পী-চলচ্চিত্রকাররা বারবার রক্তমাংসময় মানুষের কাছেই ফিরে গেছেন। কোনও ভাবনা, তা সে যতই মহার্ঘ হোক, তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষ, ভাল বা খারাপ নয়, ছায়াময়, অনির্ণেয় মানুষ। একনায়কতন্ত্র যেখানে মানুষকে বিপ্লবী বা প্রতিক্রিয়াশীল পরিচয়েই আটকে ফেলতে চায়, সেখানে এমন অনির্ণেয়তাই তো প্রতিবাদ।

চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্দেরা, যুগোশ্লাভিয়ার ড্যানিলো কিস্ বা পোল্যান্ডের কাজিমিয়েজ ব্র্যান্ডিস বারবার তাঁদের লেখার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অস্বীকার করেছেন। কেননা পশ্চিমী দেশগুলি পূর্ব ইউরোপের প্রতিবাদী লেখাকে সবসময়ই কমিউনিস্ট-বিরোধিতার খোপে আটকে ফেলতে চেয়েছে, ফলে এইসব লেখায় যে পরীক্ষানিরীক্ষা, যে নন্দনতাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে গেছে, তা কেউ নজর করে দেখেননি। নাজি একনায়কতন্ত্রের শিকার ধাল্টের বেঞ্জামিন বলেছিলেন, যথার্থ নন্দনতত্ত্বই সঠিক রাজনীতির পথ খুলে দিতে পারে। একনায়কতন্ত্রী দেশ ও সমাজে বেঁচে থেকে পূর্ব ইউরোপের লেখকরা এই নন্দনতাত্ত্বিক প্রতিবাদকেই এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ইভান ক্লিমাকে একবার জিগ্যেস করা হয়েছিল, কাফা্‌কা তাঁর নিজের দেশে নিষিদ্ধ কেন। ক্লিমার উত্তর ছিল, “Because he was too genuine.” মিথ্যার উপর গড়ে ওঠা কোন একনায়কতন্ত্রই ‘genuine'-কে গ্রহণ করতে পারে না। পূর্ব ইউরোপের লেখক শিল্পীরা কাফ্ফার এই ‘genuineness'-কেই দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন। এটাই তাঁদের প্রতিবাদ স্বরূপ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ