ইংরেজি অনুবাদ : জন ব্যাটকি
বাংলা অনুবাদ : শুভশ্রী বিন্তু
“... stets das Böse will, und stets das Gute schafft.”
“... চিরকাল মন্দ চায়, অথচ চিরকালই কল্যাণ ঘটায়।”
— গ্যেটে, ফাউস্ট
----------------------------------------------------------------------------------------------
“আমি এখন সবকিছুর জন্যই তৈরি,” সে বলল। AK-74 রাইফেলটা একটু দূরে সরিয়ে রেখে নিজের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের নিচে হাত ঢুকিয়ে বগলে চুলকাতে লাগল। “অবশেষে সবটা বলতে পারব বলে আমি খুশি,” সে বলল। “এতদিন কোনো সুযোগ পাইনি। মাঝে মাঝে একটু বিরতি পেলে দু-একটা ছোটখাটো কথা বলেছি বটে, কিন্তু পুরো গল্প একবারে বলার সুযোগ কখনও হয়নি। বোমাবর্ষণের কারণে ঘুমও হয়নি। এখন অবশেষে সবটা একসঙ্গে বলা যাবে।”
“তবে শুরুতেই বলি,” সে বলল, “আমি কোনো ভবিষ্যতবিশ্লেষক বা ‘ফিউচারলজিস্ট’ নই। আমি ‘ট্রেন্ড অ্যানালিস্ট’—মানে প্রবণতা পর্যবেক্ষক। বরং বলতে পারো আমি একধরনের ‘অবজারভার’। ভবিষ্যত বিশ্লেষকরা ঘরে বসে মনিটরের দিকে তাকিয়ে কাজ করে—তাদের নিজস্ব কিছু পদ্ধতি আছে, ‘মডেল’, ‘ফিউচার হুইল’ ইত্যাদি। কিন্তু সমাজ, মানবজাতি, রোবট—এই বৃহৎ বিষয়গুলো নিয়ে তারা ভাবতে পারে না। এসব তাদের অস্থির করে তোলে। তাই আমি ভবিষ্যতের বিশ্লেষক নই; আমি প্রবণতা, তথ্য, ও বাস্তবতা নিয়ে কাজ করি।”
সে তিনটি শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করল—“প্রবণতা, তথ্য, বাস্তবতা।”
তারপর, যেহেতু তার একচোখ এখনো কিছুটা টিকে আছে, কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা, তাই সাবধানে হাত বাড়িয়ে দেখল, সে যে কাঠের প্যালেটের ওপর শুয়ে আছে তার কিনারা কোথায়। কারণ প্রথম মাসেই বুচার যুদ্ধে তার বাঁ পা কাটা পড়েছে, আর যে লাঠিগুলো ট্রেঞ্চের দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখত, সেগুলো বারবার পিছলে পড়ে যেত। এখন আবারও একটা ধরতে পারছে না। তাই হামাগুড়ি দিয়ে পাশের সাথির দিকে গেল। তার বুক, কাঁধ, গলা ছুঁয়ে খুঁজে পেল—আর আলতো করে মাথাটা গোটানো জ্যাকেটের বালিশে তুলে রাখল, কারণ সে দেখেছিল সাথির মাথাটা ধীরে ধীরে কাদায় গড়িয়ে পড়ছে।
তারপর নিজের ঝাপসা ডান চোখটা সাথির ব্যান্ডেজ বাঁধা পেটের ক্ষতের কাছে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল—
“দেখো বন্ধু, ব্যাপারটা খুব সহজ। পৃথিবী একটা বন্ধ সিস্টেম। জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে—এখন সাড়ে সাত বিলিয়ন, শিগগিরই আট হবে। আমরা ভাবি এটা যেন এক বিশাল বিস্ময়, কিন্তু না—আমরা অর্ধ শতাব্দী ধরে জানি, এই বিপুল মানুষের ভিড়ে টিকে থাকতে গেলে ‘অটোমেটেড কোঅপারেশন’-এর কোনো না কোনো রূপ দরকার হবে। আমরা সেটা জানতাম, অনুভবও করতাম। তাই আমি খুব পছন্দ করেছিলাম পঞ্চাশ বছর আগের সেই সিনেমা-- ২০০১: এ স্পেস অডিসি। সেখানে এক চরিত্র একটা চ্যাপ্টা যন্ত্র হাতে নিয়ে বোতাম টিপলেই যেকোনো কিছু চালু বা বন্ধ করতে পারত। এখন আমাদের কাছে এটা স্বাভাবিক লাগে, না? কিন্তু তখন এটা ছিল নিছক হাস্যকর কল্পনা—শিশুসুলভ ফ্যান্টাসি। আমরা তখন হাসতাম সেটি দেখে। অথচ আজ তোমার হাতে স্মার্টফোন, এক মুহূর্তে তুমি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছ।”
সে মুখ বাঁকাল—রক্তাক্ত ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে যেন অরুচি প্রকাশ করল—তারপর হামাগুড়ি দিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে এল।
সে দুটো প্যালেট নিজের জন্য আর দুটো সাথির জন্য পাশাপাশি ঠেসে রেখেছিল—এক পায়ে, এক হাতে, কাদার মধ্যে দুলতে দুলতে, কষ্টে।
তারা লুকিয়ে ছিল এক খোঁড়া গুহার মতো গর্তে, যেটা এত ভালোভাবে ঢাকা ছিল যে শত্রুরা টেরই পায়নি। পুরো প্লাটুন তীব্র আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল—যে যেদিকে পারে পালিয়েছে। এই দুজনকে ফেলে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
শত্রুরা—যাদের তারা ‘অর্ক’ বলত—উপরে দিয়ে ছুটে গেছে, শুধু ফাঁকা ট্রেঞ্চ দেখে চলে গেছে। ভেতরে গুহার অন্ধকারে এই দুজন যে শুয়ে আছে, সেটা দেখেনি।
তারা এখন পড়ে আছে প্যালেটের ওপর, অপেক্ষায়—কেউ যদি কোনোদিন ফিরে আসে।
কিন্তু আসা সম্ভব হয়নি। বোমাবর্ষণ এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।
তারা অনেক ঘণ্টা ধরে এই গুহায় পড়ে আছে, দুই বাই দুই প্যালেটের ওপর।
সে ঘড়ি দেখেনি—দৃষ্টি এত ঝাপসা যে কাঁটা দেখা যেত না। তাছাড়া সময় জানারও দরকার নেই।
সার্জেন্ট চিৎকার করে বলেছিল, “মেডিক পাঠাচ্ছি!”—কিন্তু তারপর থেকে এক মুহূর্তও লড়াই থামেনি, গোলা পড়তেই থেকেছে।
তারা পড়ে আছে এই গুহায়, দুই বাই দুই প্যালেটের ওপর।
“আর আমি কী করব বলো?” সে আবার বলল। “আমি এমন উন্নতিগুলো ভালোবাসি—মানুষের চিন্তার এই লাফগুলো। এখন আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষকে দেখতে পাই, কথা বলতে পারি—ভাবো তো, কী অদ্ভুত! ব্যবসা, যোগাযোগ—সব পাল্টে গেছে। একদিনে যত তথ্য আমরা পাই, মধ্যযুগীয় এক ক্রীতদাস সারা জীবনেও তত পেত না। মনে আছে পুরনো যোগাযোগবিষয়ক বইগুলোতে লেখা থাকত—‘দিনে আটবার মনোযোগ ভাঙলে মনোযোগ হারাবে’? এখন আটবার মনোযোগ ভাঙতে না ভাঙতেই সকালে টয়লেটে পৌঁছে যাওয়া যায়! কারণ পথে পথে আমরা ফোন দেখি—নতুন ইমেল আছে কি না, মেসেজ এসেছে কি না, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, খবর—সব দেখি। আমরা একদম নতুনভাবে বাঁচছি—অত্যন্ত ব্যস্ত, আকর্ষণীয় জীবনে। আজকের কিশোররা একাধিক কাজ একসঙ্গে করতে পারে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির চেয়েও দক্ষভাবে! হ্যাঁ, সে ছিল এক অনন্য প্রতিভা, তার মতো আর কেউ হয়নি, কিন্তু সে একসঙ্গে একটাই কাজ করত। দু-তিন দিন ধরে একটাই কাজে লেগে থাকত। আর এখন? ভাবো তো, কত চমৎকার!”
“হ্যাঁ,” পাশের আহত লোকটি মৃদু গলায় বলল, “চমৎকার।”
“আমি এখন এক সাধারণ পদাতিক,” সে আবার বলল। “আমি কী কাজ করতাম তা বললেও কেউ পাত্তা দেয়নি। ওরা বলল—‘দেশরক্ষার সময় দরকার বাস্তব কাজের লোক।’ আমি তো স্বীকার করেছিলাম, আমি তাত্ত্বিক মানুষ। তবু আমি এক পায়ে ইনফ্যান্ট্রিতে যোগ দিলাম। তারা বলল—‘ট্রিগার টানতে এক আঙুলই তো লাগে।’ মিথ্যে বলব না, এতে একটু হতাশ হয়েছিলাম। আমি কম্পিউটারে বেশ পারদর্শী, কিন্তু আসলে আমার আগ্রহ সংস্কৃতির দিকেই—মানুষের চিন্তা, বদল, উপসংস্কৃতি। আমি সবসময়ই দেখেছি মানুষ কীভাবে নিজেকে বদলায়—প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে প্রোগ্রাম করে নেয়। আমরা এখন সেই রি-প্রোগ্রামিংয়ের মাঝখানে আছি—বিশ্বকে নতুনভাবে দেখি, নতুনভাবে কথা বলি, নতুনভাবে বাঁচি। আর এসবের একটা কারণ আছে। সেই কারণটা বোঝা দরকার।”
সে বলল, “মানুষ কেন এসব করে, সেটা বুঝতে হবে—কারণ সংস্কৃতি আসলে মানুষের টিকে থাকার কৌশল। পৃথিবীতে অগণিত প্রাণী আছে—কেউ ধারালো দাঁত বেছে নিয়েছে, কেউ বিশাল লেজ, কেউ বিষ, কেউ বিদ্যুৎপ্রবাহ। আর আমরা বেছে নিয়েছি সংস্কৃতি।”
বোমাবর্ষণ চলছিল, আর সে ট্রেঞ্চের দেয়ালে গজিয়ে ওঠা গাছের শিকড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি, একজন প্রবণতাবিশ্লেষক, এই সংস্কৃতির সাফল্য-ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করি—তথ্য, ডেটা, বাস্তবতার ভিত্তিতে। কোনটা প্রযুক্তি সমাধান করতে পারে, কোনটা পারে না—সেটা দেখি। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো মানুষ নিজে—আমরা কেন এমন করছি, কেন ওমন করছি। আসল পরিবর্তনগুলো বোঝা দরকার। আমি কখনও ভাবি না কোন ফোনে কী নতুন ফিচার এসেছে—ওসব তুচ্ছ। আমার আগ্রহ হলো আমরা কীভাবে নিজেদের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করছি, হঠাৎ সবাই একসঙ্গে ভয় পাচ্ছি, একসঙ্গে বিশ্বাস করছি। আমরা আগে কখনও এত দ্রুত গতিতে বাঁচিনি। কখনও এত মানুষ ছিল না, এত ব্যস্ত জীবনও না। এই জিনিসগুলোই আমাকে টানে।”
সে নিজের বুকের দিকে আঙুল তুলে বলল, “আমি সবসময় একটা জায়গা থেকে শুরু করি—সবাই সুখী, ধনী, আর সুস্থ হতে চায়। ইতিহাস জুড়ে মানুষ এই তিনটা জিনিসের জন্যই কৌশল বদলেছে। আমরা সবাই চাই দীর্ঘজীবী হতে, সম্পদশালী হতে, সুখী হতে। আর সত্যি বলতে কি, আমরা অনেকটাই সে পথে পৌঁছে গেছি। আমার কাছে প্রমাণ আছে। মানবজাতির ইতিহাসের নিরানব্বই শতাংশ সময়, নিরানব্বই শতাংশ মানুষ অনাহারে ছিল। ১৮৮০ সালে ৮৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যে বাস করত, ১৯৮০ সালে ৪০ শতাংশ, আর ২০১৮ সালে মাত্র ১০ শতাংশ। আমরা আমাদের আয়ু দ্বিগুণ-ত্রিগুণ করেছি। হ্যাঁ, এখন আমাদের সংখ্যা বেশি, প্রকৃতির সম্পদ প্রায় নিঃশেষ, কিন্তু তবুও—”
সে তর্জনী তুলল—
“মানবজাতি কখনও এত ধনী ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী অর্থনৈতিক অবস্থা একই ছিল। ১৩০০ সালের ইতালিতে যে আয় একজন মানুষের হতো, ১৮০০ সালেও প্রায় একই—প্রায় ১৬০০ ডলার। কিন্তু তারপর এল নতুন নতুন উদ্ভাবন—যেগুলো ভোক্তা অর্থনীতির সূচনা করল—স্টিম ইঞ্জিন, রেলপথ, বাতি, গাড়ি—”
“ডিশওয়াশার, ডিশওয়াশার!!!”—সে হঠাৎ বলে উঠল—“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হঠাৎ করেই সমৃদ্ধি আমাদের ওপর ঝরে পড়ল। মানুষের চল্লিশ বছরের গড় আয়ু এক লাফে আশিতে উঠল। পৃথিবীর অর্থনীতি আড়াইশো গুণ বেড়ে গেল। হ্যাঁ, আমরা ভীষণ ধনী হয়ে পড়েছি। তুমি যদি দুটো সময়ের ছবি পাশাপাশি ধরো, দেখবে—অর্থনৈতিক দিক থেকে (আমি আবার বলছি, কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে) ১৮০০ সালের সবচেয়ে ধনী দেশের সবচেয়ে ধনী লোকের জীবনযাপনও আজকের সবচেয়ে দরিদ্র দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের জীবনের মতো স্বচ্ছন্দ ছিল না। আর ভেবে দেখ, রাজাদের হিংসে করা যায় বটে, কিন্তু খবর-বিহীন, গরমহীন প্রাসাদে বসে থাকা, ‘চেম্বার পট’ ব্যবহার করে কাজ সারতে হওয়া—না, মোটেই নয়। অবশ্য আমরা ট্রেন্ড অ্যানালিস্টরা বোকা নই—আমরা জানি, দুঃখ-কষ্ট আছে, দুর্ভাগ্য আছে, দারিদ্র্য আছে। তবু প্রজাতি হিসেবে যদি দেখি, মানুষের জীবনমান এত উঁচুতে আগে কখনও ওঠেনি।—ওহ, থামো, ছাই! তুমি আবার পিছলে যাচ্ছ, বন্ধু!” বলে সে নিজেই নিজের কথা থামাল। তারপর, হামাগুড়ি দেওয়ার মতো শক্তি না থাকায়, চিৎকার করে উঠল, “এই, জেগে ওঠো!”
অন্যজন ধীরে ধীরে মাথা তুলল—চোখ দুটো অক্ষত থাকলেও সে চোখ খুলল না—আর যা বলল, তা শুধু এটুকুই—
“চালিয়ে যাও।”
“BM-২১,” এখন সে ঘোষণা করল—যেন নতুন কিছু বলছে—যদিও মুখোমুখি সংঘর্ষের পর থেকে বিরামহীনভাবেই এইগুলো তাদের দিকে ছোড়া হচ্ছিল। সে নিঃশ্বাস চেপে ধরে গুনল—সব ক’টা চল্লিশটা—তারপর একটু থামল, গভীর শ্বাস নিল, এবং আবার শুরু করল, “হ্যাঁ, আমরা আজ যেসব জিনিসকে স্বাভাবিক ধরে নিই, সেগুলো সবসময় এমন ছিল না—আইনের চোখে সমতা, নারীর অধিকার, মানবাধিকার ইত্যাদি। আর সহস্রাব্দের সূচনা থেকে, বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর থেকে, আমরা পেয়েছি ‘পছন্দের স্বাধীনতা’। এখন অনেকের হাতেই অনেক বেশি বিকল্প। তুমি বিদেশে ভ্রমণ করতে পারো, এই শাস্ত্র না হলে ওই শাস্ত্রে পড়তে পারো, শখের কোনো কাজে নিজেকে সঁপে দিতে পারো। এমন অনেক নতুন ধরনের পেশা এসেছে—ভীষণ আকর্ষণীয়, ভীষণ সৃষ্টিশীল। যদিও মধ্যযুগের একজন মানুষ এসব কিছুই বুঝত না—ধরো, কিয়েভের এক অফিসে বসে কোনো ব্রোকার সারা দিন বোতাম টিপে যাচ্ছে—ওটা কেমন করে ‘কাজ’ হবে? তুমি সেই মানুষটিকে বোঝাতেই পারতে না যে ওই ব্রোকার আসলে ‘মূল্য’ সৃষ্টি করছে—সে সত্যি সত্যিই কাজ করছে—যেখানে আর কেবল উৎপাদন নয়, সৃজনশীলতাই মুখ্য সম্পদ। এখন আর কেবল কনটেন্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই নয়, বরং যখন দরকার ঠিক তখনই পৌঁছে দেওয়াটাই আসল। আর আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘কনেক্ট করা’—অর্থাৎ নির্দিষ্ট মুহূর্তে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে তথ্যকে জুড়ে দেওয়া—ঠিক সময়ে—না যে কন—”
কিন্তু শেষ করার আগেই পাশে শোয়া লোকটা বলল, “চালিয়ে যাও।”
“ওহ ভালো, খুব ভালো, বন্ধু—তুমি বেঁচে আছো জেনে আমি খুশি। ধরে রাখো, বন্ধু—কারণ জীবন বিস্ময়কর জিনিস,” সে বলল। “যেমন, আমাকে সবচেয়ে খুশি করে এই ভেবে—আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের স্বপ্নগুলো বাস্তব করেছি। ভাবো তো—পাঁচ হাজার বছর আগে পলিনেশীয়রা তাদের ছোট ছোট নৌকায় করে কত দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়াত, শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে দূরের কারও সঙ্গে কথা বলতে যেত। আর এখন? আমরা সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি—আমাদের আছে টেলিফোন। এক সময় এটাকে ‘টেলিপ্যাথি’ বলা হতো—কিন্তু না, এটা টেলিপ্যাথিক নয়, টেলিফোনিক। দু’জনের কারও ফোনই এখন কাজ করছে না—এটা দুঃখজনক, কিন্তু মানবপ্রজাতির স্তরে টেলিফোন তো আছেই। আর অচিরেই আমাদের হাতেও থাকবে—আমি নিশ্চিত, মেডিকেরা শিগগিরই চলে আসবে।
“এদিকে এটাও বলতে চাই—আমরা সবসময়ই সব জানতে চেয়েছি—আত্মা ডাকা, শামানের গাছে ওঠা—এই সবকিছুর মূলে সেই জানার বাসনা। আর এখন আমাদের আছে ইন্টারনেট। আরেকটা কথা—আমরা সবসময়ই চেয়েছি আমাদের হয়ে যেন অন্য কেউ কাজ করে—এখন আমাদের আছে রোবট। আমরা সবসময়ই চেয়েছি সব ভাষা যেন জানি—এখন আমাদের আছে গুগল ট্রান্সলেট। হ্যাঁ, যে সব জিনিস একসময় সর্বোচ্চ, সর্বাপেক্ষা অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্য বলে ধরা হতো—সেগুলোর অনেকটাই আজ বিদ্যমান। ধরো, একসময় পথ না হারানো ছিল বিরাট আশীর্বাদ—দিকচিহ্ন ধরতে পারা লোকদের সামাজিক মর্যাদা ছিল খুবই উঁচু। এখন জিপিএস সেই ক্ষমতা সবার হাতে দিয়েছে। তাই আমি পছন্দ করি না যখন লোকজন এই দুনিয়া নিয়ে নালিশ করে—‘সবাই স্মার্টফোনে আটকে আছে।’ আসল কথা হলো—মানুষ ফোনে কী করছে—সে পড়ছে, কথা বলছে, কিংবা সদ্য করা রক্তপরীক্ষার রিপোর্ট দেখে নিচ্ছে—যেটা ইতিমধ্যে ক্লাউডে উঠে গেছে—অথবা বাজার স্ক্যান করছে, এই মুহূর্তে বিটকয়েন কেমন আছে তা দেখছে।
“তাই আমাদের মানতেই হবে—সব মিলিয়ে—স্মার্টফোন অনেকগুলো সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে; সবটার নয়, কিন্তু অনেকটার। এখান থেকেই আসে প্রশ্নটা—ডিজিটাল সংস্কৃতি আসলে কীসের কাজে লাগে? বলছি—তুমি শুধু জেগে থেকো, প্লিজ!”
“জেগে আছি, বলো—চালিয়ে যাও,” আহত সঙ্গীটি বলল।
“ঠিক আছে, তুমি বেঁচে আছো, ভালোই করছো,” সে বলল, “কারণ এই পৃথিবীটা এক আশ্চর্য জায়গা। হ্যাঁ, এখন এটা শুনতে একটু ক্লিশে লাগে, কিন্তু আমি বারবারই বলি—আমরা এখন অনেক বেশি মানুষ। কল্পনা করো, একটা ছোট ঘরে রাত বারোটার পনেরো মিনিট আগে দশজন মানুষ আছে। তারপর পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে আরও ত্রিশজন ঢোকে। আমরা তখন ঠাসাঠাসি হয়ে যাই, ঠিক টিনের কৌটার ভেতর মাছের মতো। দেখো, আমরা শহরে এসে ঠাঁই নিয়েছি। শহর ভালো জিনিস—এখানে সবকিছু আছে। পৃথিবী তো আসলে সবসময়ই গ্রামীণ ছিল, কিন্তু ১৯৮০ বা ২০০০ সালের দিক থেকে নগরায়ণ সত্যিই জোরে শুরু হয়। এখন অর্ধেক মানুষ শহরে থাকে—শিগগিরই দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শহরে বাস করবে। অসংখ্য অচেনা মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছে। আর যদিও হ্যাঁ, শহর ভালো জিনিস—এখানে কাজ আছে, বিনোদন আছে, সংস্কৃতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা—তবু আমরা সবাই একে অপরের কাছে অপরিচিত, এবং আমরা অপরিচিতদের ভয় পাই।
কিন্তু যদি ভালোভাবে ভাবো, দেখবে—আমরা আসলে মাত্র পাঁচ-দশ বছর হলো ডিজিটাল সংস্কৃতি ব্যবহার করছি—মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট ইত্যাদি। আমরা ওগুলো এত ভালোবেসেছি যে সেগুলো আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ওগুলো এখন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজে”—এ বলে সে তার বুলেটপ্রুফ ভেস্টে আঙুল ঠেকাল—“রাস্তা দিয়ে হাঁটলে ভয় পাই, কারণ সবাই অপরিচিত। কিন্তু তবু রাত দুইটায় মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফেরার পথে একটা বোতাম টিপলেই এক অচেনা লোক গাড়ি নিয়ে আসে—ধরা যাক, একটা উবার—আর আমি উঠে বসি, সে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। বা ধরো, আমি আমার পরিবার নিয়ে ওডেসায় এক অচেনা লোকের বাড়িতে যাই ছুটি কাটাতে—এটা এখন একেবারে স্বাভাবিক। কিন্তু আগে এমন কখনও ছিল না। আগে তোমার বন্ধু গাড়ি দিত, প্রতিবেশী সাহায্য করত। কিন্তু এখন অচেনা লোকেরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে—এমনটা আগে কখনও হয়নি। এখন এটা সম্ভব হয়েছে কারণ এত অচেনা মানুষকে একসঙ্গে শহরে থাকতে হচ্ছে।
তাই এখন থেকে যারা বলে ‘মানুষ ফোনে অনেক সময় নষ্ট করছে’, তাদের কথা একদম বৃথা। এটাই বাস্তবতা, এভাবেই চলবে। সবাই নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্র পাবে—হয় মাথার ভেতর ইমপ্লান্ট করা থাকবে, নয়তো কবজিতে সেলাই করা। তাতে কী আসে যায়? আমরা ধীরে ধীরে মেশিনের সঙ্গে আরও বেশি সম্পর্ক তৈরি করব, যতক্ষণ না আমরা পার্থক্য করতে পারব—যেটা আসছে, সেটা মানুষ থেকে না মেশিন থেকে। আর আসল কথাটা হলো”—এবার সে আবার তর্জনী তুলল—“তা আর গুরুত্বপূর্ণও থাকবে না। আমরা আগে এটা পারতাম না, এখন পারছি—এটাই ভালো কথা।
এখন আমরা বাস করছি এক নেটওয়ার্ক সমাজে। আমরা পারছি অর্থ, জ্ঞান, শিল্পী, আর সংগ্রাহকদের সংযুক্ত করতে। যেমন ধরো, এখন থেকে ডিজিটাল শিল্পীরা একেবারে স্বকীয় শিল্পবস্তু হিসেবে এনএফটি আর্ট বিক্রি করতে পারবে, শতভাগ সত্যতা নিয়ে। আগে আমরা রাস্তা তৈরি করতাম, এখন আমরা তৈরি করছি নেটওয়ার্ক। এক অদৃশ্য জাল আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমরা বাধ্য হব এর ব্যবহার খুঁজে বের করতে, আর তার উপযোগিতা হবে তার নিজের মধ্যেই।
আমি নিশ্চিত—ডিজিটাল সংস্কৃতির মাধ্যমেই পৃথিবীর ধ্বংসের ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হবে। আমরা সেটা করবই, কারণ করতেই হবে। আমাদের হাতে প্রযুক্তি আছে—আর না থাকলেও খুব শিগগিরই আসবে।”
এ বলে সে নিচু গলায় কথা বলল, কারণ তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। পাশে হাতড়ে বোতলটা খুঁজে পেল, এক ঢোক খেল, গলা পরিষ্কার করল...
“চালিয়ে যাও,” পাশের লোকটি বলল।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” সে আবার শুরু করল, “ঠিক তাই হবে। সবকিছু এমনই হবে যেমনটা আমি বলছি। তুমি হাসতে পারো, বলতে পারো আমি শুধু সঙ্গীর মনোবল বাড়ানোর জন্যই এসব বলছি—তা কিছুটা সত্যি, কিন্তু আরেকটা কারণও আছে। কারণ ভবিষ্যৎ—যার ভেতর আমরা ইতিমধ্যেই ঝুলে আছি—এতটাই নতুন, এতটাই ভিন্ন হতে যাচ্ছে যে এটা কোনো কল্পনা নয়, কোনো সান্ত্বনা নয়—একদম স্পষ্ট বাস্তব। আমরা এখনো ভবিষ্যতের একেবারে শুরুতে আছি। হ্যাঁ, ভাবো তো—আমরা ভীষণ ধনী হয়েছি, কিন্তু ঘরটা এখন ভীষণ ভিড়। মানে, এখন থেকে আমরা ভালো জীবনের জন্য নয়, কেবল বর্তমান জীবনটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ব—যা আছে, সেটা ধরে রাখার জন্য। এখন সবকিছুই ‘ইন্টারঅ্যাকশন’ বা পারস্পরিক ক্রিয়া—সব উদ্যোগই নিচ থেকে উঠে আসছে। তুমি, আমি, যে কেউ—আমাদের চাওয়া-পাওয়া প্রকাশ করতে পারছি। এটা বিরাট পরিবর্তন। মানে আমরা সবাই মিলে, একত্রে, ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলতে পারব। এটা ভীষণ জরুরি, কারণ এখন চারপাশের শব্দ—‘নয়েজ’—অবিশ্বাস্য রকমের বেড়ে গেছে।
আমি এইটার কথা বলছি না—” সে মাথা একটু উঁচু করল—
ঠিক তখনই আরও এক ব্যাচ গ্র্যাড ক্ষেপণাস্ত্র মাথার ওপর দিয়ে ছুটে গেল, এক মুহূর্তের জন্য সে থেমে রইল, কী হয় দেখে নিতে—কিছুই হলো না। সবগুলোই অন্য কোথাও গিয়ে পড়ল।
সে আবার কথায় ফিরে এল, “আমি বলছিলাম—এই পারস্পরিক ক্রিয়ার...”
“তারা কি ফিরে আসবে আমাদের নিতে?” আহত লোকটি জিজ্ঞেস করল।
“তুমি কি ভবিষ্যৎ থেকে আসার কথা বলছ, বন্ধু? না, ওখান থেকে কেউ ফিরবে না। কিন্তু আমাদের নিতে নিশ্চয়ই আসবে, এটাই স্বাভাবিক,” সে বলল। “আমরাও তো পাল্টা আক্রমণ করব। তাই সামান্য পেটের ক্ষতের জন্য ভয় পেয়ো না। তারা আসবেই শিগগির। তার আগে মনোযোগ দাও আমি যা বলছি তাতে। আমি কোথায় ছিলাম? হ্যাঁ—প্রতিটি কাজ এখন ‘ইন্টারঅ্যাকশন’-এর অংশ হয়ে গেছে, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও হয়ে উঠবে। উদাহরণ দিই—এটা একদম তথ্যভিত্তিক কথা!—আমরা জিনিসের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়তে ভালোবাসি। যেমন, ধরো আমি একটা ডিজিটাল ব্রেসলেট পরলাম—না, বরং একটা জোড়া, সেই ‘বন্ড টাচ’ ব্রেসলেট, নীল আলোয় জ্বলজ্বল করে। আমি অনুভব করি যেন এটা আমার শরীরেরই অংশ, কারণ এটা আমাকে আমার প্রিয়জনের সঙ্গে যুক্ত করে।
এখানে সে সঙ্গীর দিকে ফিরল, বলল, “তোমারটার নাম কী? আমারটার নাম ‘জোর্যা’। সুন্দর নাম, না? সেও এমন একটা ব্রেসলেট পাবে। এভাবে বিষয়টা একেবারে ব্যক্তিগত হয়ে যাবে—নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের অনুভব, নিজের চিন্তা এতে জড়িত থাকবে। এটা আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। যেমন এখন, যখন জোর্যা হামবুর্গে—লাউয়েনস্টাইনস্ট্রাস ১৫ নম্বর বাড়িতে—আর আমি এখানে এই নোংরা গর্তে, তখন এই ব্রেসলেটটাই আমাদের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধন হয়ে থাকবে। এটা একেবারে আলাদা—ফুলের দোকানে গিয়ে গোলাপ কিনে পাঠানোর থেকে। একদম আলাদা। শিগগিরই আমি এই ছোট্ট যন্ত্রটা হাতে পরব, আর জোর্যাও পরবে—ওটা হবে আমার ক্রিসমাস উপহার, এই ছোট্ট প্রিয় ‘বন্ড টাচ’ ব্রেসলেট। তখন এটা-ই জোর্যা হয়ে যাবে আমার কাছে।
“তোমার মাথাটা আবার কাদায় পড়ে গেছে,” সে ধমক দিয়ে বলল সঙ্গীকে। আবার যেন হামাগুড়ি দিয়ে নামবে এমন ভান করল, কিন্তু করল না। তার বাঁ চোখের ব্যান্ডেজ থেকে রক্ত বেয়ে পড়ছিল, যদিও ঝরছিল না, তবু থামছিলও না। অনেক ঘণ্টা ধরে এমনই চলছে। ব্যান্ডেজটা একটু সোজা করতে গেল, কিন্তু তাতে রক্ত আরও বেরোতে লাগল, তাই তাড়াতাড়ি থামল। তারপর আবার সঙ্গীর দিকে ফিরল।
“আমি কিছুই অনুভব করছি না,” সঙ্গী বলল।
“অবশ্যই না,” সে বলল ধীরে। “আর নতুন ব্যান্ডেজ বাঁধার শক্তিও নেই আমাদের। তাই একসঙ্গে এটা সামলাতে হবে—না হলে এখানেই মরে যাব। কিন্তু শত্রুর চোখে ধুলো দিতে হলেও মরব না আমরা! তাই মন দিয়ে শোনো।"
সে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে সঙ্গীর ঝুলে থাকা মাথাটা তুলল, গোটানো জ্যাকেটের ওপর রাখল। তারপর তার পেটের ব্যান্ডেজটা ছুঁয়ে দেখল—গিঁটটা এখনও শক্ত আছে কি না। সব ঠিক আছে দেখে কাদার ভেতর দিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরল। প্যালেটের কিনারা ধরল, শরীরটাকে টেনে তুলল, গোঁ গোঁ শব্দ করল, রক্তাক্ত হাতটা প্যান্টে মুছে নিল, বাঁ চোখের ব্যান্ডেজে হাত না দিতে চেষ্টা করল। আর এদিকে তার মুখ থেকে অবিরাম কথা বেরোতে থাকল।
“এখন আমরা যাচ্ছি পরের স্তরে। ডিজিটাল জগতে তুমি যখন কিছু আপলোড করো, সেটা চিরদিন থেকে যায়। আমরা বুঝি না—ভাবি এই আপলোড করা জিনিসগুলো আসলে নেই, কিন্তু আছে—আর ওগুলো চিরকাল থাকে। তাই দায়িত্ব আমাদের—শুধু সেসব তথ্যই আপলোড করা উচিত যা আমরা সত্যিই প্রকাশ করতে চাই। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবার আপলোড করলে, মুছলেও সেটা আর মুছে যাবে না—কখনও না। তাই আমাদের বদলাতে হবে, আর আমরা বদলাবোও—আমাদের মনোভাব, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, বৈশ্বিকভাবে। কারণ ডিজিটাল সিস্টেম আমাদের আরও শৃঙ্খলিত, আরও সচেতন, আরও বুদ্ধিমান হতে বাধ্য করছে—যেমন আমরা জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও হতে চাই।
“আর এখন একটা কথা বলি—তুমি হয়তো অবাক হবে—কোনো কিছুই বিনামূল্যে নয়। তুমি যদি ভাবো, কিছু বিনা দামে পাচ্ছো, তাহলে বুঝে নাও, তুমি নিজেই সেই পণ্য।”
সে থামল, গভীর নিঃশ্বাস নিল, যেন নিজের কথার ভেতর নিজেই ডুবে যাচ্ছে।
“বিনামূল্যে? কীভাবে সম্ভব বলো তো!” সে প্রায় চিৎকার করল। “একটা অ্যাপ তো তৈরি করতে হয়, নকশা করতে হয়, তার জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি খুঁজে বের করতে হয়, সেটা বানাতে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, পরে আবার হালনাগাদও করতে হয়—আরও হাজারো কাজ লাগে। এসব কিছু কীভাবে বিনামূল্যে হবে? তাই যারা বলে ‘ফ্রি’, তারা আসলে কিছু কিনছে—তোমার মনোযোগ, তোমার আচরণ। তারা তোমাকে কিছু বিজ্ঞাপন দেখাবে, আর তুমি সেসব বিজ্ঞাপনে দেখানো পণ্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাবে—তোমার প্রতিক্রিয়াই তাদের মুনাফা। আমার মতে এটা মোটেও অন্যায় কিছু নয়। হ্যাঁ, এটা ‘ম্যানিপুলেশন’, কিন্তু আদতে নতুন কিছু নয়—পুরোনো আমলের ফেরিওয়ালার মতোই তো ব্যাপারটা। তারা যেমন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পণ্য বিক্রি করত, প্রশংসা করত, গান গাইত—যাতে তোমার কিনতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু এখন ব্যাপারটা অন্য—আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায়, ‘বিনামূল্যে’ অ্যাপের মাধ্যমে যে ব্যবসা চলছে, সেটা আর সেই পুরোনো ফেরিওয়ালার মতো নয়। এখন তা অসীম পরিসরে—অগাধ লাভের ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ডিজিটাল কর্পোরেশনগুলোর অভিশপ্ত খেলোয়াড়দের কথা এ পর্যন্তই বলি—তবে এটা সত্যি, নিঃসন্দেহে সত্যি—ফেসবুক প্রতি ব্যবহারকারীর কাছ থেকে বছরে বারো ডলার আয় করে। হ্যাঁ, সত্যি। কিন্তু তারা তোমাকে কিছু দেয়ও তো—তাদের প্ল্যাটফর্ম তুমি বিনামূল্যে ব্যবহার করো, বিনিময়ে তারা তোমার সম্পর্কে তথ্য বিক্রি করে—সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞাপন চলে। এটা ব্যবসা—শোনায় খারাপ, কিন্তু অনেক ভালো ফলেও পৌঁছে দেয়। তাই আসল সমস্যা এটা নয়। সমস্যা তখনই, যখন তুমি এই ব্যাপারটা বোঝো না—কারণ তোমার আগ্রহই নেই জানার। তখন তুমি ভাবো, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টা—সবই নাকি ফ্রি। অথচ ছাই! মোটেও না—তুমি নিজেকেই বিক্রি করছো ওদের কাছে, বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে। এটাই বাস্তবতা। এটা বুঝতে হবে, জানতে হবে—তুমি কী পাচ্ছো আর কিসের বিনিময়ে পাচ্ছো, সেটা জানা জরুরি।
আর যেহেতু এমনটাই হচ্ছে, তোমার উচিত পাওনা দাবি করা। আমাদের এই অসচেতনতা, এই আরামের প্রতি ভালোবাসা ঝেড়ে ফেলতে হবে। সহজ কথায়—বোকামি আসলে প্রতিবন্ধকতা। প্রযুক্তি কেবল প্রযুক্তি—এটা কিছু জিনিস সম্ভব করে তোলে, কিন্তু ব্যবহার করবে কি না, সেটা তোমার ব্যাপার। প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ো না। তোমার যদি স্মার্টফোন থাকে, তুমি আর কখনো হারাবে না—বাড়িতে বসে কাজ করতে পারবে, গান শুনতে পারবে, পিৎজা অর্ডার করতে পারবে।
আর একবার বলি, কারণ এটা গুরুত্বপূর্ণ—এই সবকিছুই আমাদের বদলে দিচ্ছে। হ্যাঁ, আমাদের বদলাতে হবে, আর আমরা বদলাতে পারি। ধরো, ধূমপানের কথাই বলি। যখন আমরা বন্ধ জায়গায় ধূমপান নিষিদ্ধ করেছিলাম, অনেকে ভাবত—অসম্ভব, বিশৃঙ্খলা বেধে যাবে! অথচ কিছুই হলো না। কোনো বিদ্রোহ হলো না। আজ কল্পনাই করা যায় না কেউ ঘরের ভেতর, লোকসমাগমের জায়গায়, সিগারেট ধরাচ্ছে। খুব অল্প সময়েই এই পরিবর্তন এসেছে। আশ্চর্য দ্রুততা! মানুষ শেখে খুব সহজে, বদলায়ও খুব সহজে। চাও তো দুই দিনেই দারিদ্র্য দূর করতে পারি, বন্ধু—আমাদের ব্যবসার মডেলগুলো তো তৈরি আছে—”
“আমার মনে হয় না তারা আর ফিরে আসবে,” আহতজন ফিসফিস করে বলল।
“অবশ্যই আসবে—আসবে না আবার কেন ছাই!” সে কণ্ঠ উঁচু করল। “বদমেজাজ করো না, শুধু মন দিয়ে শোনো আমি যা বলছি। আমরা ভীষণ অপচয়ী জাতি। এখন, এই মুহূর্তে, একদম দ্রুতগতিতে আমাদের সেই অভ্যাস বদলাতে হবে। না হলে আমাদের জীবনমান পড়ে যাবে—ব্যক্তিগতভাবেও, আর যা আরও গুরুত্বপূর্ণ, বৈশ্বিকভাবেও।
“তবে একটা জিনিস আছে—যেটাকে আমি বলব ‘গির্জা বানানোর ক্ষমতা’। এই ক্ষমতাটা আমরা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছি। ধরো, মধ্যযুগের কথা—আমি মধ্যযুগের উদাহরণ ভালোবাসি। তখন শহরের মানুষ সিদ্ধান্ত নিত—‘এখন পর্যন্ত আমরা নিজেদের জন্য ছোট ছোট ঘর বানিয়েছি, এবার বানাই ঈশ্বরের উপযুক্ত এক মহৎ স্থাপনা।’ তারা জানত, তাদের জীবদ্দশায় সেই গির্জা তারা দেখতে পাবে না, যা তিনশ বছর পর তাদের প্রপৌত্রদের চোখে পড়বে—তবু তারা শুরু করত।
আজ আমাদের চিন্তাভাবনা খুবই স্বল্পমেয়াদি। আমরা কেন এমন ছোট হয়ে গেছি? হওয়া উচিত ছিল না। আমাদের সেই ‘গির্জা বানানোর ক্ষমতা’ ফিরিয়ে আনতে হবে। জানো কেন? কারণ আমাদের প্রয়োজন স্বপ্ন, প্রয়োজন বিশাল পরিসরের, সাহসী কল্পনা—”
“ছাই কল্পনা, আমার জল চাই,” আহতজন কাতর স্বরে বলল।
“জল নেই,” সে বলল। “এই নাও ভদকা—তৃষ্ণা পেলে এটাও চলে। না, নিতে চাও না? ঠিক আছে, বুঝতে পারছি। কিন্তু গোঙানো বন্ধ করো, অনুনয় করো না। আমি জানি তুমি যন্ত্রণায় আছো—আমিও আছি। কিন্তু উপেক্ষা করো। শোনো—সংস্কৃতি এক ধরনের ‘কোড’। এটা ভেবে দেখা দরকার। এমন এক কোড, যেটা পড়ে তুমি বুঝতে পারবে মানুষ কেমন—তাদের ইচ্ছে কী, তারা কী ভালোবাসে, কী ভয় পায়, কী ভালো আর কী মন্দ মনে করে, তাদের লক্ষ্য কী ইত্যাদি।
আগে, ধরো, রাতে ঘুমের সময় বুকের ওপর চাপ অনুভব করলে তুমি জানতেই—কোনো এক দুষ্ট আত্মা এসে বুকে বসেছিল, তারপর ঘুরে ঘুরে উড়ে গেছে, তুমি বেঁচে গেছো বলে খুশি। এখন আমরা জানি ওটা ‘অ্যাসিড রিফ্লাক্স’। আমরা অনেক কিছুই জানি এখন—আমরা ভীষণ যুক্তিবাদী হয়ে গেছি, বাস্তবতা ধরতে পারি খুব দ্রুত। কিন্তু আমাদের মনোযোগ এখন অনেক কম সময় স্থায়ী হয়।
অন্যদিকে, আমরা নিজেদের বদলাতেও পারি খুব দ্রুত। মধ্যযুগের মানুষ যেমন হাঁটত, তা আমাদের হাঁটার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের জুতো ছিল অনেক খসখসে, পাতলা তলা; রাস্তাও ছিল না, কেবল পাথর-বিছানো কাঁকর পথ। নানা জিনিস পায়ে বিঁধত। তাই তারা হাঁটত—আগে পায়ের আঙুল নামাত, তারপর গোড়ালি। এখন আমাদের হাঁটা একেবারে অন্যরকম।
“আর এখানেই আমরা পৌঁছে যাই এক নতুন স্তরে—এই বদলটা কী? প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কারণে জৈব পরিবর্তন? হ্যাঁ, ঠিক তাই। এখন আমরা হাঁটলেও চোখ ফোন থেকে সরাতে পারি না। ফলে আমাদের পারিপার্শ্বিক দৃষ্টিশক্তি উন্নত হয়েছে, কিন্তু বিপদের অনুভূতি কমে গেছে। চাও তো আমি তথ্য দেখাই? না? ঠিক আছে, বাদ দাও।
“সময়টার কথাই ধরো। আমরা সবাই সময়কে বিশ্বাস করি—ঘড়ি দেখি, দিন ভাগ করি, দশ মিনিট পর কী করব, দশ বা বিশ বছর পর কী করব, সেই পরিকল্পনা করি। আর রোবটের কথাও ভাবো। ওরা এখন এখানে। ওদের ভয় পাবে কেন? সব একঘেয়ে, তবু দরকারি কাজ ওদেরই করতে দাও। ফল কী হবে? আমরা সময় পাব—খেলাধুলা, বিনোদন, শিক্ষা, শেখা, আরও নতুন নতুন জিনিস জানার জন্য।
“আর এবার আমি একটা কথা স্বীকার করছি—আমি সাধারণত এমন বলি না, কিন্তু এখন বলি—এখনও একটা সমস্যা রয়ে গেছে। যদি আজ, বিশেষ করে আজই, আমি একটু অবসর পাই, সঙ্গে সঙ্গে সেটা ভরাট করতে চাই—কোনো না কোনো কাজে। অথচ আমার উচিত ছিল শুধু বেঁচে থাকা উপভোগ করা—বেঁচে থাকা আর সুস্থ থাকার আনন্দে ভরা থাকা—গাছের পাতায় আলোর ঝিলিক দেখা, ঝরনার পাথরের গুঞ্জন শোনা, পায়ের নিচে ঘাসের মৃদু সরসরানি অনুভব করা। এটাই তো আসল কথা, তাই না? এখানে থাকা—এই মুহূর্তে। হ্যাঁ, একদম তাই।
“এটাই তো প্রকৃত সাফল্য, এক অভাবনীয় অর্জন—আর এটা আমরা ভবিষ্যতের আড়ালে ঠেলে রাখব কেন? আমি জানি, আমার মুখে এমন কথা শুনে হাস্যকর লাগছে—একজন তথাকথিত ‘ফিউচারোলজিস্ট’ বলে কথা! তবু সত্যি এটাই—আমাদের তা করা উচিত নয়।
“আর ভেবে দেখো—আমরা একমাত্র এমন প্রজাতি, যারা যন্ত্র ব্যবহার করে, আর এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবার—যখন এক ‘যন্ত্র-ব্যবহারী প্রজাতি’ নিজেই কাজটা যন্ত্রের হাতে তুলে দিচ্ছে।
“দেখো, রোবটরা আসলে মজার, কারণ তারা ডিজিটাল সংস্কৃতিকে বাস্তব জগতে নিয়ে আসে। তারা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিকশিত হচ্ছে। আজ তারা যা করতে পারে, সেটা হারাবে না—বরং আরও বুদ্ধিমান হবে। রোবটদেরও বিবর্তন নির্ধারিত—আমাদের মতোই। আমি রোবটকে ভয় পাই না, বরং ভালোবাসি।
“অবশ্য রোবট ভয়ানক লাগতে পারে, যেমনটা একসময় চাকা লাগত, টেলিস্কোপ লাগত, বাষ্প ইঞ্জিন বা দ্রুতগামী গাড়ি, কিংবা বিমানের শব্দ লাগত। কিন্তু দেখো, এসব জিনিস প্রথমে ভয় ধরালেও, পরে আমরা অভ্যস্ত হই, ব্যবহার করি, ভালোও বেসে ফেলি। আমাদের মেনে নিতে হবে—ওরা আমাদের জন্যই। তাই ভয় পেয়ো না।
“রোবটের কোনো বাসনা নেই, কোনো অনুভূতি নেই। সে তোমাকে প্রলুব্ধ করবে? তারপর গুলি করবে? কেন করবে? এসব ভাবো না। ভয় পেয়ো না—সব ঠিক হবে। বরং সব হবে দারুণ।”
“আমার পিপাসা লেগেছে,” আহতজন ধীরে বলল।
“আমি তো আগেই বলেছি,” সে ঝাঁজিয়ে উঠল, “আমাদের কাছে শুধু ভদকাই আছে। নিতে না চাইলে ঠিক আছে। কী বলো—ওটা দিয়ে ক্ষত ধুয়ে ফেলব? ছাই না—এটা দামী ভদকা। পানি পরে পাব। শান্ত থাকো। এই অভিশপ্ত গ্র্যাডগুলো প্রায় শেষের দিকে—ওদের ছেড়ে দাও, পাত্তা দিও না। ব্যথা করলে ব্যথা হোক—ব্যথা ভালো জিনিস, শরীর যে লড়ছে সেটা বোঝায়—লড়ুক। কিন্তু এর ফাঁকেই আমার কথা শোনো। তুমি ভালোই করছ। এবার আসি টাকার কথায়—টাকা আর আমরা সেটা কীভাবে ব্যবহার করি। হ্যাঁ, মানি—আমরা টাকা ব্যবহার করি; কিন্তু আসলে টাকাটা কী—সেটা আমরা বুঝি না। হাতে ধরি বলেই মনে করি এটা কোনো বস্তু। তুমি ভাবো, হাতে হাজার হৃভনিয়ার নোট ধরেছ। অথচ ওটা—আর অনেক দিন ধরেই—একটা কাগজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এর মূল্য সোনার ওপর নির্ভর করে না। তাহলে কিসের ওপর? এইখানেই আসল কথাটা—মনোযোগ দিয়ে শোনো। অনেক দিন ধরেই টাকা আসলে ‘ভার্চুয়াল’। এখনকার দিনে এর সেরা প্রমাণ হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি। ভবিষ্যতে ক্রিপ্টোকারেন্সি আমাদের সমাজের জন্য ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ হবে—এটা অনুমান করা মোটেও শক্ত নয়। আমরা আজই তার ইঙ্গিত জানি—তাই এটা কোনো আজগুবি দাবি নয়। আসল প্রশ্ন—ঠিকভাবে কীভাবে এটা করা যায়। পদ্ধতি আছে, আর সেই পদ্ধতি মানতেই হবে। অনেকেই ভাবে, কেবল উত্তেজনা থাকলেই হবে—না, অনেক ‘নো-হাউ’ দরকার। আর সে নো-হাউ চাই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি—ক্রিপ্টো কী, কী নয়, কোথায় কাজে লাগে, কোথায় লাগে না—এসব জানা প্রয়োজন। কেউ কেউ আছে—মাস্কের মতো—যাকে আমরা ইউক্রেনে অনেক কিছুর জন্য ধন্যবাদ জানাতে পারি; তিনি যেসব জিনিস সমর্থন করেন, তার মধ্যে আছে স্বপ্ন, আছে ভিশন। এই উঁচু দৃষ্টিভঙ্গি আমরা ভুলব না। কারণ ক্রিপ্টো-জগত বুঝতে গেলে তীক্ষ্ণ বিচক্ষণতা দরকার—ঠিক আছে—কিন্তু ভিশনও দরকার। ওই ভিশন থেকেই শুরু করলে ভালো—তবেই ক্রিপ্টোকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো যাবে।
“এখন তুমি আপত্তি করতে পারো—‘ক্রিপ্টোকারেন্সি আবার কী? পুরো ব্যাপারটাই তো ধাপ্পা; হাতে ধরা যায় না, নেই—তো থাকা বলছ কী করে?’—এর জবাব হলো, ক্রিপ্টোর জগতের একটা প্রযুক্তি আছে—ব্লকচেইন—সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় উদ্ভাবন। আমরা সেটা বুঝি না—ঠিক আছে—কিন্তু ব্যবহার করতে বুঝতে হবে—এমন কথা নেই। যেমন টিভি দেখার সময় তো জানতে হয় না—ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে স্ক্রিন জুড়ে ছুটে যায়। একইভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির অন্তর্নিহিত প্রযুক্তি—একটা বা একগুচ্ছ—না বুঝলেও চলে; ব্যবহার করলেই হয়।
“আমার দৃষ্টিতে”—এখানে সে নিজের দিকে আঙুল তুলল—“ক্রিপ্টো মানে উদ্ভাবন। ক্রিপ্টো আর ব্লকচেইন মিলে এমন এক অপারেশনাল মডেল, যা কিছু বিশেষ গুণ সম্ভব করে—যেমন অখণ্ডতা (অথেনটিসিটি), সামঞ্জস্য (ইউনিফর্মিটি), পরিচয়যোগ্যতা (আইডেন্টিফায়েবিলিটি), আর এক দুর্দান্ত নমনীয়তা—বা চাইলে বলো ‘এক্সটেরিটোরিয়ালিটি’। আমাদের বর্তমান টাকার শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে। নানারকম নতুন ক্রিপ্টোকারেন্সি জন্ম নিলে, ছড়িয়ে পড়লে—সমাজজুড়ে এর ব্যবহারিকতা বাড়বে, এতে ক্রিপ্টো আরও নির্ভরযোগ্য হবে, বিশ্বসমাজের ভেতর আরও গভীরভাবে প্রবিষ্ট হবে। তখন একেবারে জল-স্ফটিকের মতো স্পষ্ট হবে—এই সর্বব্যাপী সত্তাটার স্রষ্টা ও চালুকারী যিনি, তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সিকে সামাজিক মূল্যতায় রূপান্তরিত করেছেন।”
এই পর্যন্ত এসে আবার থামতে হলো—নতুন শব্দ—ট্রেঞ্চের ওপারে আরও জোর বিস্ফোরণ। এবার তিনটা গ্র্যাড থেকে গুলি—মানে ১২০টা ক্ষেপণাস্ত্র। তারপর হঠাৎ নিস্তব্ধতা—মাঠের কোথাও থেকে পাখির চিঁ চিঁ শোনা যায়। সে একটু অপেক্ষা করল—কি হয় দেখে। কিছুই হলো না—শুধু পাখির ডাক। তাই সে আবার শুরু করল—
“তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক—আমরা মঙ্গল গ্রহে যাচ্ছি। তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক—আমরা মঙ্গলকে উপনিবেশ বানাব—করতেই হবে বলে। পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য নয়—পৃথিবী ঠিকই থাকবে—মানুষকেই নিজেকে বাঁচাতে হবে। আমরা এখানে ফাঁদে আটকা—বেরোতে হবে—তাই আমরা এগোচ্ছি মঙ্গলের দিকে। হ্যাঁ, বন্ধু। আর এখানে দুটো জিনিস পরিষ্কার বোঝা দরকার—এক, ব্যবসা আর বিশ্বাস—এরা হাত ধরাধরি করে চলে। ট্রেন্ড দেখলেই বোঝা যায়। তাই যখন ভৌত জগত ও ভার্চুয়াল জগত পরস্পরে যুক্ত হবে—তখন তুমি-আমি যারা আগে হব, তারাই জিতব। আমি আমার ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগ করেছি এক ভিশনে। এমন বিনিয়োগে টাকা লাগে—তাই ওটা হোক ‘ক্রিপ্টো মানি’। নামটা কী হল না হল—তাতে কিছু যায় আসে না। টাকা মানে বিশ্বাস—একটা সিদ্ধান্ত—আমি কি এতে বিশ্বাস করি? আমি কি এটা ভরসা করি? আমাদের সময়ে ক্রিপ্টোর জন্ম আর শৈশব দেখে এটা চোখে আঙুল দিয়ে বোঝা যায়। একাধিক পেমেন্ট-মাধ্যম থাকবে—একটা হবে আজকের টাকা, আরেকটা হবে ক্রিপ্টো টাকা, তৃতীয়টা হবে ‘কর্ম’—আর এই তিনটি একে অপরের সঙ্গে মিশে যাবে, যেমনটা আজই হচ্ছে—ক্রিপ্টোর উদাহরণে স্পষ্ট। বিশেষ করে আমাদের দেশে। ইউক্রেনে ক্রিপ্টোর জনপ্রিয়তা বিশ্বে পঞ্চম। কারণ, আমরা ইউক্রেনীয়রা স্পষ্ট দেখছি—ভবিষ্যতে পুঁজি আর মূল্য হবে ‘কর্ম’-ভিত্তিক। এর মডেল ক্রিপ্টো জগতেই আছে। তুমি যদি এমন এক পেমেন্ট-মাধ্যম বানাও, যা সীমান্ত ছাড়িয়ে কাজ করে—তাহলে ভৌত আর ভার্চুয়াল জগৎ জুড়ে গেলে তুমি-ই হবে ‘প্রাইমারি ব্যাংক’। তুমি কি প্রাইমারি ব্যাংকের অংশীদার হতে চাও না? অবশ্যই চাও—কারণ তুমিও তো এমন জায়গায় থাকতে চাও, যেখানে ‘প্ল্যাটফর্ম’ তুমি নিজেই। তুমি এমন এক পেমেন্ট-মাধ্যম বানাও যেটাকে মানুষ বৈধ বলে বিশ্বাস করে—তাহলে মানুষ সেটাই ব্যবহার করবে। টাকা মানে বিশ্বাস—কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—কতজন এতে বিশ্বাস করে, বা বলা ভালো—যে ভিশনের জন্য এই টাকার দরকার, তাতে কতজন বিশ্বাস করে। যথেষ্ট মানুষ বিশ্বাস করলে—প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। প্রযুক্তিগত সৃজনশীলতা থাকলে এমন কোনো স্বপ্ন নেই, যা বাস্তবে পরিণত হতে পারে না। দেখছো—স্বপ্ন বাস্তব হয়। এটা আর খালি বুলি নয়—এমনটা আগে কখনও ছিল না—এখন থেকে হবে, এবং চলতেই থাকবে—”
“আমরা মরেই যাচ্ছি,” পাশ থেকে কাঁপা গলায় শোনা গেল।
“ওহো—ওই যে, অন্য প্যালেট থেকেও জীবনের চিহ্ন,” সে কষ্টে হাসল, তারপর বলল, “চলো, একদম শুরুতে ফিরি। আবার প্রশ্নটা তুলি—টাকা আসলে কী? জবাব—টাকা হলো বিনিময়ের মাধ্যম। মানুষ তো বেশির ভাগ সময়ই ছোট ছোট কমিউনিটিতে থেকেছে। কোনো এক সময়ে কোথাও তারা ঠিক করেছিল—একটা বড় গোলাকার পাথরের চাকাকেই টাকা বলা হবে। আর সত্যি কথা বলতে কি—এই নোংরা, পচা, দুর্গন্ধময় গুহায় আমরা দু’জনের মধ্যে বলি—ওটা অনেকটা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতোই ছিল। কারণ ওই পাথরের চাকাটা আসলে কেউ কোথাও নাড়াত না। আসল কথা হলো—কমিউনিটির সবাই যেটাকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মেনে নেয়—সেটাই টাকা। কমিউনিটি যদি গ্রহণ করে, বিশ্বাস করে—তাহলে নতুন মুদ্রা চালু করা মোটেও কঠিন নয়। ইতিহাসে অগণিত ‘লোকাল কারেন্সি’ জন্ম নিয়েছে। প্রশ্ন সবসময়ই ছিল—এক ইউনিট টাকার মূল্য কিসে মাপব—একটা ভেড়ি? না কি এক বস্তা গম?
“এবার এখান থেকে সরাসরি ক্রিপ্টোর কথায় আসা যাক—এই মুদ্রার বৈধতা—সে যেই রূপেই থাকুক—অনেকাংশে নিজের দ্বারাই প্রমাণিত হয়। সে একটা সম্ভাবনা দেয়—‘আমাকে টাকা হিসেবে ব্যবহার করো।’ ঠিক আছে—কিন্তু কখন থেকে ব্যবহার শুরু হবে? জবাব—যখন ভার্চুয়াল জগতের মুদ্রা ভৌত জগতে ঢুকতে শুরু করবে—যখন প্রথম বিটকয়েন এটিএম বসবে, যখন কোনো দোকান ক্রিপ্টোকারেন্সিতে দাম নেওয়া শুরু করবে—তখন ভার্চুয়াল ‘বাস্তব’ হয়ে উঠবে—এবং শুরু হবে এক অপ্রতিরোধ্য প্রক্রিয়া।
“এইভাবে আমরা দ্বিতীয় স্তরে ঢুকে পড়ি—যেখানে বহু ক্ষেত্রে আমরা বিটকয়েন, ইথার, কিংবা আরও স্থিতিশীল ধরন—যেমন ‘স্টেবলকয়েন’—ব্যবহার করছি, অথচ বুঝতেও পারছি না যে ব্যবহার করছি। ধরো, আমি একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে গেলাম—ব্লকচেইন প্রযুক্তির কল্যাণে আমি একটা ছুটির প্যাকেজ কিনে ফেললাম—তারপর বাড়ি ফেরার আগে কোথাও বসে এক কাপ কফি খেলাম। মানে, বহু ‘লেজার ট্রানজ্যাকশন’ আজ ‘রিয়েল মানি’ নয়—ক্রিপ্টোর মাধ্যমে হচ্ছে। ভার্চুয়াল মুদ্রা মানুষ যা ভাবছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ছড়িয়ে আছে—এক সময় সবাই সেটা বুঝতে পারবে, খেয়াল করবে—‘আরে, আমি তো ইথার/বিটকয়েন/স্টেবলকয়েনের বিনিময়ে কিছু পেয়ে গেলাম!’ অর্থাৎ আমি এটাকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে নিয়েছি—অন্যরাও নেবে—তারপর সবাই নেবে—এবং তখন থেকে ক্রিপ্টোর জগত স্থিত হবে, শান্ত হবে।
“এই ক’দিন রেটটা রোলার-কোস্টারের মতো ওঠানামা করে—জুয়াড়ি আর প্রতারকদের কারণে—দাম দুলতে থাকে। তাই কখনও কখনও ভেঙে পড়া এক্সচেঞ্জ রেটকে আবার কেনা দামের কাছাকাছি ফিরতে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু আমাদের স্বীকার করতেই হবে—এটা ইতিমধ্যে ঘটছে। আমাদের হাতে এই টাকা আছে—ভার্চুয়াল টাকা। স্মার্টফোনে থাকা সব ‘ফ্রি’ অ্যাপ আসলে ভার্চুয়ালি কাজ করা টাকা—আমরা ফ্রি ব্যবহার করি, কিন্তু প্রত্যাশিত আচরণ করে তার দাম দিই। আমি আমার মনোযোগ বিক্রি করি—বিনিময়ে সেবা ফ্রি ব্যবহার করি।
“সোভিয়েত আমলে কমিউনিস্টরাও একধরনের মিলিত পরিকল্পনা করেছিল—বলেছিল, ‘টাকা উঠে যাবে; সবাই তাদের প্রয়োজনমতো কাজ করবে, পাবে।’ কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল—কারণ এক আচরণ আরেক আচরণের সমমান নির্ধারণের জন্য কোনো সার্বজনীন মুদ্রা তখন ছিল না। আজ আমাদের কাছে সেই ‘সমমান’ আছে—আর থাকবে।”
“এইটা তুমি বাজি ধরেই ধরে নিতে পারো,” সে বলল, “এবার সময় হলো সারসংক্ষেপের”—এবং তখনই সে নিজের অস্থায়ী শয্যা থেকে উঠে বসল, আশা করল যে তার সঙ্গী এখনো জেগে আছে, কারণ কিছুক্ষণ ধরে পাশে কোনো শ্বাসের শব্দ পাচ্ছিল না।
“এখন ঘুমিয়ে পড়ো না,” সে বলল, “না, এখনো না—কারণ এখন আসছে আসল জায়গাটা, মন দিয়ে শোনো।”
কিন্তু কোনো সাড়া এলো না। গুহার ভেতরে নিস্তব্ধতা, আর বাইরে—তাতেও যেন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। মনে হলো, গ্র্যাডগুলো এবার একটু বিরতি নিয়েছে; পোপাসনা দিক থেকে নতুন একদল সেনা এগিয়ে আসছে। এখন কেবল ছিটেফোঁটা মর্টার-গুলির শব্দ—যা প্রায় নীরবতার মতোই শোনায়।
তাই সে আবার সতর্ক করল, “ঘুমিও না, একদম না, এক্ষুনি ওরা এসে যাবে আমাদের নিতে। হয়তো তার আগেই শেষ করতে পারব।”
সে একটু উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল, আর একচোখা দৃষ্টি রাখল তার সঙ্গীর ওপর।
“আমি কি চালিয়ে যাব? হ্যাঁ বলো? অন্তত মাথা নাড়ো, না হয় চোখের পলক দাও… থাক, না দিলেও বলি।”
সে নিজের আধা-অন্ধ চোখ মুছে নিল, বলল, “আমি থামতে পারি না—বারবার বলতেই হয়, কারণ পুনরাবৃত্তিই জ্ঞানের মূল, এটাই আমার বিশ্বাস। যাই হোক, সারাংশটা হলো—এটা এক বন্ধ-প্রণালী (closed system)। আমরা অতিরিক্ত মানুষ হয়ে গেছি, এবং একই সঙ্গে বহু প্রক্রিয়া পরস্পরকে বাড়িয়ে তুলছে, সব এক দিকেই এগোচ্ছে। আমাদের এখন আগের চেয়ে দ্রুত কাজ করতে হয়, আর কাজ করার সময় একাধিক মানুষকে একসঙ্গে ভাবতে হয়। এই কারণেই আমরা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (AI) নিখুঁত করতে চাই—যাতে মুহূর্তের মধ্যে অনেক মানুষের সঙ্গে একযোগে যোগাযোগ সম্ভব হয়।
আমাদের জীবন মূলত পাল্টে গেছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক চমকে-দেওয়া, অজানা অথচ গণনাযোগ্য বিশ্বের দ্বারে। এখন আর কেউ অফিসে আট ঘণ্টা কাজ করে না—বরং সাবওয়েতে বসেই দু’মিনিটে একটা কাজের ইমেল পাঠিয়ে ফেলো, বাড়ি ফিরে গেম খেলো, আর তাতেই কিছু টাকা আয় হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—তুমি খেলছো, না উপার্জন করছো?—দুটোই আসলে এক হয়ে যাচ্ছে। শত শত পরিবর্তন একই সঙ্গে ঘটছে, একে অন্যকে ত্বরান্বিত করছে।
এখন এসেছে এই ‘স্মার্ট কনট্রাক্ট’—যা মানুষকে কাজ দেয়, হয়তো মাত্র তিন মিনিটের জন্য। আজ একটি চুক্তি তৈরি করতে চার দিন লাগে, কিন্তু ব্লকচেইন তো এখনই আছে—একসময় সবই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। তখন আইনজীবীদের দরকার থাকবে না—উভয় পক্ষ মুহূর্তেই সব জেনে যাবে। আমি সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তোমাকে কাজের জন্য নিয়োগ দিতে পারব—সব কিছুই ব্লকচেইন আর AI সামলাবে।
এখনও আমাদের ‘ভ্যালিডেটর’ লাগে—ধরো, তুমি তোমার ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চাও, আমি কিনতে চাই; তখন একজন মধ্যস্থ আইনজীবী ঢুকে পড়ে, প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, তার পারিশ্রমিক দিতে হয়। কিন্তু এখন আর তেমন হবে না—ভ্যালিডেশন ব্লকচেইনের ভেতরেই থাকবে। ব্লকচেইন নিজেই প্রমাণ করবে তুমি সত্যিই তুমি, আমি আমি। তখন দুই পক্ষই শতভাগ নিশ্চিত থাকবে—একে অন্য সম্পর্কে যা জানার দরকার, তা জানে। চুক্তি শেষ। পিরিয়ড।
আইনজীবীদের জন্য দুঃখ করার দরকার নেই—তারা ব্লকচেইন দিয়েই টাকা উপার্জন করবে। ব্যাংকের জন্যও নয়—তারা তাদের নিজস্ব ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু করবে। তখন কেউ বলতে পারো—‘এই ব্যাংক আমাকে এক লক্ষ হৃভনিয়া অগ্রিম দিয়েছে, কিন্তু আসলেই কি এর মূল্য এক লক্ষ?’ আমার মনিটরে দেখা যাচ্ছে—আমার অ্যাকাউন্টে এক লক্ষ হৃভনিয়া আছে। তাই আমি এই ব্যাংক কোনোদিনও ছাড়ব না—কারণ ওর টাকা মানেই আমার টাকা।
এবং এই ধারণাটাই সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে—কারেন্সির সীমা ছাড়িয়ে ‘সিস্টেমিক’ হয়ে উঠবে। তবে এ সবকিছু ঘটতে হলে নজরদারি ব্যবস্থাকে ভীষণ উন্নত হতে হবে—যা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, বিশেষত একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে। কিন্তু শেষে পুরো পৃথিবীতেই নজরদারি দরকার হবে—কারণ পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনের জন্য যে কোনো ব্যক্তির বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্যপ্রাপ্যতা দরকার, বৈশ্বিক স্তরে। কেবল তখনই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে লেনদেনের অপরপক্ষ সত্যিই সেই ব্যক্তি, যাকে সে বলছে—এবং তার দেওয়া তথ্য বিশ্বাসযোগ্য।
হ্যাঁ, এটা কিছুটা ভয়ানক শোনায়, কিন্তু এভাবেই হবে—অপরিহার্য। ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। ব্লকচেইন তাৎক্ষণিক যাচাই এনে দেবে—মানুষ ছাড়াই, তথাকথিত ‘গেটকিপার’ ছাড়াই। এতে সমাজ থেকে অবিশ্বস্তদের বাদ দেওয়া হবে, আর বিশ্বস্তরা থাকবে। যারা নিরাপত্তা মানদণ্ডে ব্যর্থ, তারা আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না। তোমাকে নির্ভরযোগ্য হতে হবেই, সৎ হতে হবেই—নইলে তুমি সমাজের নেটে যুক্ত হতে পারবে না।
“এই অবস্থায় তুমি বলতে পারো—এটা তো সম্পূর্ণ নজরদারি ছাড়া সম্ভব নয়—ঠিক বলছো, একদম ঠিক। এর মানে হচ্ছে—সম্পূর্ণ উন্মোচন, সম্পূর্ণ অসহায়তা। হ্যাঁ, সত্যি তাই। কিন্তু উপায় নেই। পানির ঘাটতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। পানির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। ঠিক আছে—কিন্তু এজন্য জানতে হবে তুমি কতটা পানি খাও, কতটা টয়লেট ফ্লাশে যায়, কতটা গোসল আর বাগানে দাও—এবং তার ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি দিতে হবে। মানে, সবাইকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।”
এখানে এসে সে একটু নিচু স্বরে বলল, শরীর টেনে সঙ্গীর দিকে এগিয়ে গেল, হাত বাড়িয়ে ধরল—হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে হাত ছাড়ল না, বরং ধরে রেখেই বলল,
“সবকিছু ভয়ানক শোনাচ্ছে বুঝি, কিন্তু একটা জিনিস আছে যা এসব সম্ভব আর সহনীয় করে তোলে—তা হলো ‘সচেতনতা’ আর ‘স্বেচ্ছা অংশগ্রহণ’। আগের মতো আর চলতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া, বৈশ্বিক জীবনে অংশ নিতে হবে—জানতে হবে সে কী করছে, কেন করছে, কী দামে করছে, আর সেটা আদৌ ভালো কি না। এখনকার মতো নির্বোধভাবে অন্যদের আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অন্য কোনো পথ নেই—একদমই নেই। যাদের হাতে প্রযুক্তি থাকবে, তারাই শাসন করবে, তারাই হবে প্রভু।”
কিন্তু সে ভয় পাচ্ছিল না। বরফঠান্ডা হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
“কারণ কেউ এতে আপত্তি করবে না,” সে বলল, “মানুষ কেবল উপভোগ করবে তার আরামদায়ক জীবন—নজরদারির ভেতরেই। এটাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এখান থেকে এক পা এগোলেই আমরা পৌঁছে যাব ভার্চুয়াল জগতে—কারণ এতক্ষণ যা বললাম, সবই আমাদের সেখানে নিয়ে যাচ্ছে।
“আমরা এখন পনেরো বছর ধরে ইন্টারনেট ব্যবহার করছি। যদি কেউ পনেরো বছর আগে বলত—‘একজন মানুষ কোনো গেমে একটা আলো-তরবারির জন্য টাকা দেবে—একটা এমন তরবারি, যেটা ধরাই যায় না, কারণ সেটা বাস্তব জগতে আদৌ নেই,’—তাহলে সবাই বলত, ‘অসম্ভব!’ অথচ আজ সেটাই সবচেয়ে বড় বাজার।
“অথবা, কেউ বলত—‘মানুষ এমন জুতো কিনবে, যেটা কোনোদিন তার পায়ে পরবে না।’ তখনও বলতাম—‘কখনো না।’ অথচ এখন তাই হচ্ছে। ভাবো তো, শেষ কবে হাতে ধরে ছবি দেখেছো? এখন আর দরকার নেই—ফোনে বা স্ক্রিনে দেখলেও অনুভূতিটা একই।
“আমরা একটার পর একটা জিনিস ভার্চুয়াল জগতে স্থানান্তর করছি। চল, এবার একবার চোখের পলক দাও।”
সে রক্তাক্ত ঠান্ডা হাতটা চেপে ধরল।
“আমরা যেন ভুলে না যাই NFT—অর্থাৎ Non-Fungible Token-এর কথা—যা আমাদের এক সম্পূর্ণ বিপ্লবাত্মক ভবিষ্যতে নিয়ে যাবে—যদি না বলি, আসলে ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমানের কথাই বলছি, কারণ NFT ইতিমধ্যেই আছে, বিশেষ করে শিল্পের জগতে। এই NFT-গুলো ব্লকচেইনের মাধ্যমে ডিজিটালি সৃষ্ট শিল্পকর্মের সঙ্গে একটি অনন্য টোকেন যুক্ত করে, ফলে এই একান্ত ডিজিটাল সৃষ্টিও শতভাগ অখণ্ড ও বাজারযোগ্য হয়ে ওঠে।
“হ্যাঁ, স্বীকার করি, এই বিকাশ কিছুটা পাগলামির মতো শোনায়—হয়তো সফল হবে, হয়তো হবে না। আমরা বিপুল নতুন জিনিস নিয়ে পরীক্ষা করছি—কিছু টিকবে, কিছু হারিয়ে যাবে। শিল্পবিপ্লব আমাদের অপচয়ী জীবন শিখিয়েছিল; ডিজিটাল বিপ্লব সেই অপচয়কে দমন করবে—দোষীদের শাস্তি দিয়ে।
“আমরা ক্রমেই যন্ত্রে ঘেরা হব—আর সম্ভবত জীবিত মানুষের চেয়ে যন্ত্রের সঙ্গেই বেশি কথা বলব। ভার্চুয়াল ক্ষেত্র আমাদের জীবনে ক্রমেই বড় ভূমিকা নেবে। আরেকটা জিনিস—আমরা অমর হতে চাই। এটা সম্ভব হবে যখন আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বকে ডিজিটালাইজ করে ‘আপলোড’ করতে শিখব। তাত্ত্বিকভাবে সেটাও ইতিমধ্যেই সম্ভব। আমরা শরীর বদলাতে পারব, মন ‘ডাউনলোড’ করতে পারব, অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে পারব—এগুলো সবই খুঁটিনাটি। আসল বিষয় হলো—‘ইউটোপিয়া’। কারণ ইউটোপিয়া মানে সেই দিক, যা আপাত অসম্ভব বলে মনে হয়। এক মিলিয়ন ইউটোপিয়া ব্যর্থ হলেও, এক মিলিয়ন এক নম্বরটি সফল হবে। এটা সেই ‘ক্যাথেড্রাল বানানোর’ কাজ।”
সে আশা করল, তার কথাগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হবে তার সঙ্গীকে জেগে রাখার জন্য।
“জেগে ওঠো, সৈনিক! আমি ট্যাংকের শব্দ পাচ্ছি—T-৬৪, ওরা আসছে আমাদের নিতে! আমি যদি টিকে থাকতে পারি, তুমিও পারবে। শুধু শেষ কথাটা শুনে নাও—তুমি কখনো হাল ছেড়ো না, কারণ জীবন আশ্চর্য সুন্দর হবে। একবার—শুধু একবার—চোখের পলক দাও, দয়া করে একবার পলক দাও—
যাতে বুঝি—তুমি এখনো আমাকে শুনতে পাচ্ছো।”


0 মন্তব্যসমূহ