ঠিক দুপুর বেলাতেই একটা মৃদু স্বর শোনা যায় মৌমাছির গুঞ্জরণের মতো। তখন একটা হাওয়া ওঠে। কড়ইগাছের পাতাগুলো অকারণে সড়সড় করে। তারপর স্তব্দ হয়ে যায় সবকিছু। তার মধ্যে সেই গুঞ্জরণটি সহসা প্রবল হয়ে চারদিকে ধাক্কা মারে। তখন মনে হয়, এটা মৌমাছির গুঞ্জরণ নয়, নয় কাকের কলরব। তবে মাথার মধ্যে বিজ বিজ করে। অস্বস্তি লাগে। এটা কোনো পুরনো কোনো গান। তার কথা বোঝা যায় না।
হোটেলের কেয়ারটেকার বলে, স্যার ভয় পাইবেন না। এটা কোনো আজগুবি ব্যাপার না। এটা এ শহরে মাঝে মাঝে শোনা যায়। প্রত্যেক দিন না।
কেয়ার টেকারের নাম আবুল। আবুল এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু গলা খাটো করে বলে, বুঝলেন স্যার, ঝামেলা শুরু হলেই এইরকম আওয়াজ শোনা যায়। খুব সাবধান। এই কথা আমার না। আমার আব্বাজান কইয়া গেছেন।
–কী ঝামেলা?
–ঝামেলা স্যার। বলে হুট করে থেমে যায় আবুল। কী ভেবে চারিদিকে তাকায়। ঢোক গেলে। যেন কেউ শুনে ফেলল কিনা তা যাচাই করে নিচ্ছে। কেউ আশেপাশে নেই বুঝতে পেরে হাঁফ ছাড়ে। বলে, ঝামেলা আবার কী। কোনো ঝামেলা নেই। এখানে ঝামেলা হয় না। ঝামেলা হওয়ার কোনো রেকর্ড নাই।
আবুল আর কোনো কথা বলবে না আবুল। অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। ব্যস্ত হওয়ার আগে জনান্তিকে বলে, রাস্তার দিকের জানলাটা বন্ধ রাখন ভালো।
এই ছোট্ট শহরটা একটু রিমোট এলাকায়। হতে পারে এটা তালতলী। অথবা মেহেন্দীগঞ্জ। হয়তো পাতারহাট। সড়ক যোগাযোগ নেই। লঞ্চযোগে আসা যাওয়া করতে হয়।
এই ঝামেলা ব্যাপারটি যে কী, তা বোঝা যায় না। সব কিছু ছিমছাম। কোথাও কোনো ছন্দপতন নেই। দোকানপাট খোলা। অফিস টফিস চলছে মফস্বলে যেমন চলে। বেলা দশটা থেকে দুটো পর্যন্ত, তারপরে সব ফাঁকা। লাঞ্চে গিয়ে আর কেউ ফেরে না। কয়েকটা রেস্টুরেন্ট এ সময় বিক্রিবাটা চলে। চারটায় শেষ লঞ্চ ছেড়ে যায়। সপ্তায় দুদিন হাট। সেদিন দুদিনই শহরটা সরগরম থাকে। তারপর শুনশান।
এ দুদিন মালেক চেয়ারম্যান লালমিয়া সাহেব আসেন। তার গদিঘরে বসেন। লোকজনের সঙ্গে নানা দেন দরবার করেন। এইটুকু। এর মধ্যে ঝামেলা টামেলা থাকার কথা নয়।
একথাটা গান্ধীবাবুর লঞ্চের সারেং বলেছেন। বাজার সমিতির সেক্রেটারি মাহতাব মোল্লা বলেছেন, আমগো এলাকায় সুপারি আমড়া, নারকোল নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ব্যাপারিরা আসে যায়। মাল লঞ্চে তুইলা দেই। ফিনিস।
স্থানীয় বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিয়ার মোল্লা একটু বয়স্ক মানুষ। দৈনিক ইত্তেফাকের স্থানীয় সংবাদদাতা। সব তার নখদর্পনে। তিনি সরু চোখে তাকিয়ে বলেন, ঝামেলা টামেলা না থাকলে আমগো চলে ক্যামনে। একটু আধটু হয় বটে। তবে সেগুলো খবর হওয়ার আগেই মিটে যায়। মিটে না গিয়ে উপায় নাই।
–তাইলে আপনার চলে কিভাবে?
এই প্রশ্নে প্রবীন সাংবাদিক একটু নীরব থাকেন। বলেন, চলে আর কি। শুপারির ফলন ভালো। পানচাষীদের মুখে হাসি। পাতা পচন রোগ হয় নাই। জাটকা ইলিশ ধরা রোধে জেলেদের নিয়ে উঠোন বৈঠক। এইসব খবরই দেই। মাঝে মাঝে মফস্বল পাতায় ছাপা হয়। মাঝে মাঝে ছাপা হয় না। তো কী করি– কবিতা লিখি। কবিতা পণ্ডিত প্রেস থেকে ছাপা হয়। কড়ইতলায় কিছু বেচাবিক্রি চলে। আর চেয়ারম্যান দেইখা রাখেন।
বলে মতিয়ার মোল্লা পকেট থেকে একটা কবিতা বের করেন। রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়েই পড়তে শুরু করেন–
চারিদিকে সুপারি নারিকেল আর পাঙ্গাশের ঘাট–
তেতুলিয়া নদীকুলে সুন্দরীতমা পাতার হাট।।
তাহা দেখিয়া কারো বাড়িতেছে রোমহর্ষ–
সব কিছু সুনশান নাই কোনো সংঘর্ষ।।
ওসি সাহেব বিশিষ্ট ভদ্রলোক। যত না পুলিশগিরি তার গায়ে গতরে আছে তার চেয়ে বেশি গান-বাজনার বড়ো সমজদার। ফ্যামিলি ঢাকায় একা থাকেন। হেসে হেসে বলেন, এলাকায় চুরিচামারি নাই। কী আর করি। খাই দাই ঘুমাই। আর ফাঁকে ফোকরে গায়কদের লগে সময় কাটাই।
স্থানীয় কালীমন্দিরে একটা নাটমন্দির আছে। উপরে টিনের ছাদ। কোনো এককালে গান্ধীবাবুদের কাকা অথবা জ্যাঠা কেউ একজন বানিয়েছিলেন। দেবোত্তর সম্পত্তি। পূজাটুজা এখন বিশেষ হয় না। কিন্তু বছরে একটা মেলা হয় বটে। কার্তিকে। এই নাটমন্দিরেই গানের আসর বসে। ওসি সাহেব সেখানেই তশরিফ রাখেন। ভাইওয়া, ভাটিয়ালি, বিচ্ছেদী– এমন কি অঞ্জু ঘোষ ও ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না ছায়াছবির জনপ্রিয় গানগুলোও এখানে গীত হয়। কিশোর কুমার, মান্না দে অথবা লতা মুঙ্গেশকরের গান করার মতো শিল্পী এই এলাকায় নেই।
কিন্তু দুপুর নেমে আসার পরপরই মৌমাছির গুঞ্জরণের মতো যে সুর শোনা যায়, তার প্রতি একটু মনোযোগ দিয়ে কান রাখলে বোঝা যায় এটা আসলে একটা গানই বটে। দুএকটা কথা কানে আসে। পুরোটা আসে না। যেগুলো কানে আসে তাতে মনে হয়, সেগুলো বাংলা ভাষা নয়। হয়তো উর্দু, হিন্দি অথবা হিন্দুস্থানীও হতে পারে। এই রিমোট এলাকায় কেউ এ ভাষায় গাইতে পারে এমন কোনো হদিশ কেউ দিতে পারে না। হদিশ না পেলে মাথার মধ্যে হিজ বিজ বেড়ে যাচ্ছে। ঘুমের বারো বাজার দশা। কোনো কাজ করা যাচ্ছে না। শুনে হোটেলের কেয়ারটেকার আবুল শুধালো, গানের কোনো কথাটথা কিছু বুঝতে পারছেন?
জানালা থেকে তখন রোদের একটা ঝলকে তার মুখে পড়েছে। বেশ উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। বলল, মনে কিছু করতে পারেন?
–মনে পড়ছে কয়েকটা শব্দ। মওলা মেরে মওলা… করম…হো করম…
এবারে আবুল দ্রুত জানলার কাছে গেল। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করল, কোন দিক থেকে আসে বলে মনে হয়? ঐ কড়ুইতলা থেকে?
হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। কিন্তু গানটা তো ভেসে আছে বাইরে থেকেই।
আবুল এবারে জানলাটা ভালো করে এটে দেয়। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। যেতে যেতে বলে খুলবেন না। জানলাটা মোটেই খুলবেন না। দিনকাল খারাপ।
গুগল ডক নোট/১
পরিসংখ্যান অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ :
মো: মোহসিন আলী, বিএসসি (অনার্স, জীববিজ্ঞান), এমএসসি। ঢাঃবিঃ।
তিনি আজ অফিসে আসেন নাই। তাকে পাওয়া গেল ডাকবাংলোতে। সপ্তায় দুদিন অফিস করেন। আর তিনদিন বরিশাল শহরে। বগুড়া রোডের হক মঞ্জিলে থাকে তার স্ত্রী ও দু সন্তান। স্ত্রী স্থানীয় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ান।
পরিসংখ্যান অফিসার অতি সজ্জন অফিসার হিসেবে পরিচিত। ছাত্রজীবনে একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখনো তিনি আদর্শ ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
ডাকবাংলোতে তিনি শুয়ে ছিলেন। ঢাকা থেকে এসেছি শুনে উঠলেন। চেয়ারটা টেনে বসতে দিলেন।
তাকে ইত্তেফাক পত্রিকার আইডি কার্ডটা দেখালাম। তিনি একটু শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করলেন, তা আমার কাছে কেনো? এ উপজেলার টিনএনও ওসি, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা আছেন। তারাই তো সব খবর টবর দিতে পারবেন।
মিষ্টি হেসে বললাম, তা জানি। তাদের কাছেও যেতে হবে। সবাই আপনার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন আপনি অনেস্ট অফিসার। একমাত্র আপনার কাছেই জেনুইন তথ্য পাওয়া যাবে।
শুনে খুশী হলেন পরিসংখ্যান অফিসার। কৌতুহলী হয়ে শুধালেন, কী তথ্য জানতে জানতে চান?
–শুনেছি এ এলাকায় কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামা হয় না। কোনো রাজনৈতিক বিবাদও দেখা যায় না। এমন কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও প্রবাদতুল্য। লোকজন অতি সুখে মিলেমিশে আছে।
শুনে হাসলেন তিনি। তার উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে বিবিসির একটা রিপোর্ট বের করে দিলাম। সেখানে হেডলাইন লেখা– ‘বাংলাদেশে সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রতি বছরই কমছে।’
আমরা খবর নিয়ে জেনেছি, এ এলাকাটি হিন্দু-মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যার প্রায় সমান সমান ছিল সাতচল্লিশের আগে। এখানকার অবস্থা কী?
প্রশ্নটি শুনে একটু ঢোক গিললেন পরিসংখ্যান অফিসার। এক গ্লাস পানি খেলেন। একটা হাইও তুললেন। বললেন, হ্যাঁ, তা ঠিকই শুনেছেন। দুপক্ষের মধ্যে কোনো ঝামেলার তথ্য আমার অফিসে নেই।
আমার অনুরোধে তিনি অফিসে এলেন। বেশ কয়েকটি আদম শুমারী বের করে দেখালেন। দেখলাম–
সাত চল্লিশের আগে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল ৪৫ শতাংশ।
১৯৫১ সালে যে আদমশুমারি ছিল তাতে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে এসেছে ১৪ শতাংশে। আর সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে।
এখানে তো দাঙ্গাফ্যাসাদ হয়নি। তাহলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এভাবে কমে গেল কেনো?
তিনি নিরবে আমার কথা শুনলেন। নতুন কিছু বললেন না। বললেন, হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রজনন হার কম। তারা দেশত্যাগ করে।
কিন্তু এ এলাকায় তো দেশত্যাগ করার মতো কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে রেকর্ড পাওয়া যায় না!
তিনি আর কোনো কথা বললেন না। লঞ্চঘাটের উদ্দেশ্যে যাবেন। তাকে বরিশালে ফিরতে হবে। তার বড় মেয়ের পরীক্ষা।
……………………
কড়াইতলাটা ঠিক পোড়া মন্দিরের গা ঘেষেই।
বেশ সাফ-সুতারো। একটা ঠেক আছে বটে, কিন্তু এ কদিন সেখানে কাউকে বসতে দেখা যায়নি। এর পাশে একটা ঝুপড়ি ঘর। সেটার ঝাঁপ ফেলা। অফিস আওয়ারে সকালের দিকে আর হাটের দিনে সন্ধ্যে অব্দি খোলা থাকে। এটা সুনীল দাসের সেলুন। কোনো সাইনবোর্ড নেই। কিন্তু সাকিব খানের একটা সিনেমার পোস্টার সাটা আছে। তার গায়ে বড় করে লেখা–এখানে সুলভে চুল কাটা হয়।
সুনীল দাস তার কেঁচি চালাতে চালাতে বলে, আপনে নতুন আইছেন, তাই জানেন না। কড়ুইতলা আসলে কড়ুইতলা নয়। ওটা অমৃত মুচির চালা। তিনি এলেমদার লোক। এই ভূভারত তার হাতের মুঠোর মধ্যে। কখনো তিনি করাচি তো কখনো বোম্বাই। কখনো চিরির বন্দর তো কখনো কলকাতার খিদিরপুর ডকে। তাকে দেখাও ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্যবানরা তারে দেখা পায়। আমিও অখনতরি দেখি নাই। দেখার হাউস আছে। বাঁইচা থাকলে দেখন যাবে।
একটু থেমে সুনীল দাস বলে, তবে?
–তবে স্যার, ঘটনা হইল তারে যেমন দেখতে চায়, আবার দেখতেপাইলেও ঝামেলা আছে। মনে হয়-- না দেখনই ভালো। দিনকাল খারাপ।
পরদিন দুপুর গড়িয়ে পড়তেই শহরটা ঝিমিয়ে পড়ে, রাস্তাঘাট ফাঁকা। হোটেলের কেয়ার টেকার আবুলও লবির টেবিলে মাথ রেখেঘুমিয়ে পড়েছে। জানালাটা খুলতে দেখা দেখা গেল, কড়ুই গাছের তলাটা আজ ফাঁকা নেই। সেখানে কে একজন বসে আছে। ঝুঁকে বসে আছে। আর তার সামনে একটা হাওয়া এসে পাক খাচ্ছে। সেই হাওয়ার মধ্য থেকে গেই গুঞ্জরণটা যেন অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জানালার শিকে কান পাতলেই শোলা গেল– স্পষ্ট একটা গানের লাইন–
মৌলা মৌলা মেরে মৌলা মৌলা মৌলা মেরে মৌলা
তুমসে ফরিয়াদ করতে হ্যায় হাম
মেরে মৌলা করম হো করম…
ধীর পায়ে ইত্তেফাকের ভ্রাম্যমাণ সংবাদ পরিবেশক হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েন। সুনীল দাসের সেল্যুনের ঝাঁপ ফেলা। সেখানে নায়িকা অপু বিশ্বাসের একটা পোস্টার সাঁটা। অপু বিশ্বাসের মুখের কাছে কয়েকটা মাছি ভন ভন করছে। কড়ুইতলাটা ফাঁকা। কেউ নেই। কিন্তু একটা ছোট্ট ঘুর্ণি হাওয়া সেখানে খেলছে। সেখানে যেতেই দেখা গেল, মৌলা মৌলা গানটা ঘুর্ণি ভেদ করে আসছে। হয়তো আসছে কড়ুইতলার পেছন থেকে। অথবা পোড়ো কালীমন্দির থেকে। গানের সুরটা এতো মিষ্টি যে তাতে নেশা ধরে যায়। পা থেমে আসে। কড়ুইতলার নিচে থানের উপর বসে পড়ে। বসে পড়ে মাথা নিচু করে শুনতে থাকতে–
এ জমিন আউর ইয়ে আসমান
তেরে খাব্জে ম্যায় হাই দো জাহান
সব পে তু হি মেহেরবান
এ গানের সঙ্গে নিজেও অজান্তে গলা মেলাতে শুরু করেন। কখনোই তার মনে হয় না এ গানটি আগে তিনি কখনো শোনেননি। গানের কথাও সে জানেন না। কিন্তু এখন আশ্চর্য রকমভাবে গাইতে পারছেন। পাকা গায়কের মতোই সেই গায়ন ভঙ্গি মনে হয়। চোখ বন্ধ করে গাইতে গাইতে তার মনে হয় কড়ুইতলায় থানে সে একা নয়–আরো একজন এসে বসেছে। বসে তিনিও গাইছেন।
এটা মনে হতেই বার্তা পরিবেশক চোখ খোলেন। তবে একবারে চোখের পাপড়িটা খোলে না। খুলতে পারে না। ধীরে ধীরে খোলে। এই ধীর গতিতে খোলার কারণে শুরুতে ধোয়ার কুণ্ডলীর মতো কিছু একটা দেখতে পাওয়া যায় তার গা ঘেষে। তারপর সেই ধোয়ার কুণ্ডলীটা আরো ঘনিভূত হয়ে একটা মানুষের আকার ধারণ করে। যখন চোখের পাপড়ি দুটো পুরোটা খুলে যায় তখন দেখতে পান, কোনো ধোয়ার কুণ্ডলী নয়। একজন বুড়ো মানুষ নিচু হয়ে বসে আছে। বসে জুতো সেলাই করছে।
তার চুল পাকা হওয়ার কথা। কিন্তু পাকা নয়। জুতোর কালি মাখা বলে চুলগুলো কিছুটা কালো, কিছুটা খয়েরি। পিঠটা ধনুকের মতো বাঁকা।
লোকটা সেই গানটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাইতে থাকেন। কখনো নিচু স্বরে। কখনো উঁচু স্বরে। গাইতে গাইতে সেই সুর মিলিয়ে যায় এক সময়। মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো কড়ুইতলাটা যেন থম ধরে থাকে।
কেউ কোনো কথা বলে না। বার্তা পরিবেশক তার জুতো সেলাইয়ের দিকে শুধু চেয়ে থাকেন। এক সময় শুধান, আপনি কি অমৃত মুচি?
শুনে একটু মৃদু হাসেন তিনি। কিন্তু মাথাটা নোয়ানোই থাকে। সেই একটু হাসি থামিয়ে বলেন, হইতে পারি। আবার নাও হইতে পারি।
এবারে ধন্ধ লাগে এ কথায়। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, হইতে পারে, আবার নাও হইতে পারে– এইটা কেমন কথা?
শুনে বুড়ো মানুষটি গুড়গুড়িয়ে হাসেন। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে রাখা জুতাটিতে ছেনি চালাতে চালাতে বলেন, সেই রকম কথা। আপনে যদি তারে দেখতে চান–তাইলে তারে দেখতে পাবেন। আর যদি দেখতে না চান–তবে দেখবেন না। অন্য কাউরে দেখবেন। তারপর আরেকটু কুঁজো হয়ে সুর ধরেন, নড়ে চড়ে হাতের কাছে/ খুঁজলে জনম ভর মেলে না।
এরপর আর কথা বলছেন না বুড়ো লোকটি। যেন তার অনেক কাজ পড়ে আছে। কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। কাজে মনোযোগ দেন। তিনি কখনোবা ফসাফস করে ছেনি দিয়ে চামড়া কাটেন। কখনোবা সুতো দিয়ে সেলাই করেন।
গুগল ডক নোট/২
সার্কিট হাউজের সামান্য দূরে একটি পুরনো ইটের বিল্ডিং দেখিতে পাইয়াছি। তাহার সম্মুখে একটি মাঠ। সেখানে আজ সামিয়ানা খাটানো হইতেছে। মাঠের চতুর্দিকে বেড়ায় নানা রঙের বৈদ্যুতিক বাতি ঝোলানোই হইতেছে। আর মাঠের মাঝখানে নির্মাণ হইতেছে একটি স্টেজ। অদূরে পাঁচটি সাদা ঘোড়া চরিতেছে। ইহারা নতুন বলিয়া বালকবৃন্দ বিস্মিত হইয়া নিরীক্ষণ করিতেছে।
জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম উক্ত বাড়িটি গান্ধীবাড়ি নামে পরিচিত। যাহার নামে বাড়িটি হইয়াছে তাহার আদি নাম মতিলাল। তিনি মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধীর সহচর ছিলেন। স্বদেশী করিতেন। খদ্দর পরিতেন। অত্র বাড়িতে একটি চরকাও স্থাপন করিয়াছিলেন। আর নিয়মিত ছাগদুগ্ধ পান করিতেন। নোয়াখালিতে ১৯৪৬ সালে মহাত্মা গান্ধী দাঙ্গা থামাইতে আসিয়াছিলেন। তখন দুর্বৃত্তরা তাহার ছাগল চুরি করিয়া কাটিয়া খাইয়াছিল শুনিয়া পাতারহাটের মতিলাল গান্ধীবাবু বিষম দুঃখ পাইয়াছিলেন। পরে মহাত্মাকে দিবেন বলিয়া গোটা চারেক ছাগল লইয়া দিল্লীর উদ্দেশ্য রওনা হইয়াছিলেন। খুলনা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া শুনিতে পাইলেন মহারানী ভিক্টোরিয়া আর ভারতের রানী নাই। পাকিস্তানের জন্ম হইয়াছে। ভারত নামে আরেকটি রাষ্ট্রের জন্ম হইবে আগামী কল্য। তাহা শুনিয়া তিনি খুলনা হইতে ফিরিয়া আইসেন। তাহার মনোরথ ভগ্ন হইয়াছে। তিনি ছাগল চারটিকে ছাড়িয়া দিলেন। উৎফুল্ল জনতা তাহা কাটিয়া ভোজন করিল। ভোজন শেষে তাহারা নারায়ে তকবির ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করিতে ছুটিল। গান্ধীবাবুর লঞ্চ পাতারহাট ঘাটে আসিয়া ভিড়িল। তিনি দেখিলেন তাহার বাড়ির বহির্বারান্দায় স্থাপিত চরকাটি নদীমুখে কে বা কাহারা নিক্ষেপ করিতেছে। লোকে দেখিল গান্ধীবাবু মাথা নিচু করিয়া বাড়ির দিকে চলিতেছেন।
সেই গান্ধীবাবুর নাতির বিবাহ উপলক্ষে এইসব সাজসজ্জা চলিতেছে। পাতার হাটের সব গাছেই মরিচ বাতি ঝুলিবে। অচিরেই ঢাকা হইতে ব্যান্ডপার্টি আসিয়া পৌঁছাইবে। বোম্বে হইতে এ আর রহমানকে আনার ইচ্ছে আছে। তবে তাহার নিউ ইয়র্কে কনসার্ট থাকায় আসিতে পারিবেন না বলিয়া জানাইয়াছেন। সেক্ষেত্রে দেশের নগর বাউল খ্যাত জেমস আসিবেন। সাকিব খান আর অপু বিশ্বাস আসিবেন। আসিবেন চঞ্চল চৌধুরী। সম্প্রতি তাহার হিট 'সাদা সাদা কালা’ গানটি নাচিয়া নাচিয়া গাহিবেন।
………..
সকালবেলায় ব্যান্ডপার্টির শব্দে ঘুম ভাঙলো। জানালার পাশে ইত্তেফাকের বার্তা পরিবেশক দাড়িয়ে দেখতে পেলেন, সুসজ্জিত নারীরা শোভাযাত্রা সহকারে তেতুলিয়া নদীর দিকে এগিয়ে চলেছে। কাঁখে তাদের পিতলের কলস। এই জল নিয়ে তারা গান্ধীবাবুর নাতিকে স্নান করাবেন। তারাপর তারা কণে বাড়ির উদ্দেশে বর-যাত্রা করবেন।
বেলা একটু বাড়তেই সাদা ঘোড়া চারটি দুলকি চালে সারা শহরটাতে ঘুরতে লাগল। ঘোড়ার উপরে বসা রঙিন লোকজন চারিদিকে আতর গোলাপ ছড়াতে ছড়াতে বিবাহ-যাত্রার কথা ঘোষণা করছে। আর চলতে লাগল ব্যান্ড পার্টিতে দিল তো পাগল হ্যায় গানটি। এ গানের সঙ্গে কয়েকটি সুবেশে কিশোর ও কিশোরী নেচে চলেছে। আর উড়ছে বেলুন। সলমা জরি উঠছে চিকচিকিয়ে।
রাস্তার ঘর থেকে অনেকেই বেরিয়ে পড়েছে। জানালা খুলে মহিলারা দেখতে লেগেছে। বহুদিন পরে—বহু বছর পরে এরকম জমকালো বিয়ে উৎসব তাদের সামনে ঘটতে চলেছে। বহু কাল ধরে এই বিয়ে উৎসব নিয়ে তারা কথা বলতে পারবে।
মাথার উপরে সূর্য ওঠার আগেই একটি সুসজ্জিত হাতিকে দেখা গেল হেলে দুলে এগিয়ে আসছে।
তার পেছনে নানা বয়সী লোকজন। হাতির পিঠে বসে আছে বর। তার মাথায় পাগড়ি। রূপকথার রাজপুত্রের মতো তাকে দেখাচ্ছে। তার মুখে হাসি। উজ্জ্বল দুটি চোখ মনে করিয়ে দিচ্ছে তার প্রয়াত ঠাকুরদা গান্ধীবাবুর রূপমাধুর্যের কথা।
ইত্তেফাকের ভ্রাম্যমাণ বার্তাপরিবেশক এ জানালা থেকে দেখতে পেলেন, হাতিটি কড়াইতলার কাছে এসে পড়েছে। কে একজন কড়াইগাছের একটা ডাল থেকে লাফ দিয়ে নেমে হাতির উপর চেপে বসেছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বরকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে রাস্তায়।
চারিদিকে একটা মস্ত হল্লা উঠেছে। শোভাযাত্রাটি মুহূর্তের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। রাস্তার পাশের দর্শনার্থীরা ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। আর ঝটাপট জানলাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে ফাঁকা। শুধু একটা ছোট ছেলে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে চিৎকার করে কেঁদে বলছে, লোকটাকে মেরে ফেলছে।
এই ঘটনা দেখে বার্তা পরিবেশকের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মাথার ভেতরে চক্কর দিয়ে ওঠে। চেয়ারের উপর বসে পড়ে। আর তখনি কেয়ার টেকার আবুল ঘরে ঢোকে। ঝট করে জানলা লাগিয়ে দেয়। বারবার বলে, বাইরে যাবেন না। নিন্দ পাড়েন। বলে আবুল আবার বেরিয়ে গেল। তার ঘুম পাচ্ছে। তার অফিস রুমে গিয়ে ঘুমুবে।
বার্তা পরিবেশক আবার জানলা খুলবে কিনা এটা নিয়ে দোনামোনা করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। রাস্তাটি ফাঁকা। তবে রাস্তায় যে শিশুটি ভয় পেয়ে চিৎকার করছিল সে নেই। কিন্তু তার চিৎকারটি আছে। হাওয়ার উপরে ভর করে ভেসে আছে। চিৎকারটি অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন কড়ুইতলার কাছে একটি লোক কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে। তার গলা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। পাশে পড়ে আছে রক্তভেজা একটি কিরিচ। কিরিচের মাথায় বরের টোপর। ডালে বসা কয়েকটি কাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। তারা কা কা ডাকতে ভুলে গেছে।
সড়ক ফাঁকা। ভোজবাজির মতো রাস্তাটি নির্জন হয়ে গেছে। গভীর রাতের মতো বাড়িঘরগুলোও নিশ্চুপ। যেন সবাই ঘুমিয়ে আছে। অথবা কেউ নেই। সবাই যেন এ শহর ছেড়ে চলে গেছে। অথবা কেউ কোনোদিন এ শহরে ছিলই না।
কী করবে বুঝতে না পেরে বার্তাপরিবেশক সাহায্যের জন্য চিৎকার করে লোক ডাকতে লাগলেন। সে চিৎকার শুনে কাক দুটির নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। তারা ডাল থেকে ঝটপট করে উড়ে গেল। চক্রাকারে সারা শহর জুড়ে কা কা রবে ডাকতে লাগল। আর তখনি ঘরবাড়িগুলোর জানালা দরজাগুলো খুলে গেল। পিলপিল করে লোকজন বাইরে বেরিয়ে এলো। বাজারের ব্যাগ হাতে কেউ চলেছে বাজারে–দোকানপাটে। কেউ বা চলেছে অফিসে। কেউ কেউবা চলেছে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে।
কে একজন চৌরঙ্গিতে জড়বুটি নিয়ে নাপিতের দোকানের পাশে বিছানা পেতে বসার উদ্যোগ করছে। আরেকজন কেটলি হাতে ‘চাই চা চাই চা’ বলে হেঁকে যাচ্ছে। তাকে হাত ইশারা করে বার্তা পরিবেশক ডাকলেন। লোকটি তার ডাকে সাড়া দিয়ে কাছে আসতে গিয়েও এলো না। অন্যদিকে ছুটে গেল। একজন রিকশাওয়ালা যাত্রী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। তার কাছে দৌঁড়ে গিয়ে থামালেন বার্তা পরিবেশক। অনুনয় করে বললেন, ওদিকে একজন গলাকাটা লোক পড়ে আছে। তাকে হাসপাতালে নিতে হবে।
রিকশাওয়ালাটি তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। বোঝার চেষ্টা করতে লাগল তার কথাগুলো। তার আগে রিকশা বসা যাত্রীটি বলল, কোথায় আবার গলাকাটা লাশ?
–ঐ যে, কড়ুইতলার নিচে।
–কড়ুইতলার নিচে! সেদিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে বলল, কোথায়, কেউই তো নেই কড়ুইতলায়।
শুনে আশ্চর্য হলেন বার্তাপরিবেশক। বললেন, ঐ যে, কড়ুইতলার নিচে–গলাকাটা লোকটি এখনো বেঁচে আছে। ছটফট করছে। এখনো মরেনি। হাসপাতালে নিতে পারলে বেঁচে যাবে।
এটা শুনে যাত্রী লোকটি রিকশাওয়ালার পিঠে টোকা দিয়ে বলল, কোথায় কী। যত্ত সব। চল। চল। দেরী করিস না। লঞ্চ ধরতে হবে।
রিকশাওয়ালা প্যাডেল দিতে লাগল দ্রুত। আর যাত্রী লোকটি তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল-- দিনে দুপুরে গাঁজা খেয়ে বেরিয়েছে। আমরা কিছু দেখছি না। আর উনি গলাকাটা লোক দেখতে পাচ্ছেন।
অন্য সময় হলে মাথায় রাগ উঠে যেতো। কিন্তু আহত লোকটির মরো মরো অবস্থা দেখে এসব ঠাওর করার উপায় নেই। লোকটির বুক সাংঘাতিকভাবে ওঠানামা করছে। জল জল করে করছে। আশেপাশে টিউকল নেই। তিনি রাস্তার ওপারে একটা বাসার দরজার কড়া ধরে নাড়া দিলেন। যিনি খুললেন তিনি প্রবীণা। মাথায় হালকা ঘোমটা। তার দিকে উৎস্যুক হয়ে তাকালেন।
বার্তাপরিবেশক তাকে গলাকাটা লোকটির কথা বললেন। বললেন এক গ্লাস খাওয়ার জল দিতে। প্রবীণা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। তারপর কড়ুইতলার দিকে ভালো করে নজর দিলেন। সেদিকে চোখ রেখে একবার শিউরে উঠলেন বটে। কিন্তু উত্তরে বললেন, বাবা, আমি তো কিছুই তো দেখতি পাচ্ছি না। চোখে ছানি পড়েছে। ছেলে বলেছে– বরিশাল নিয়ে যাবে। ছানি কাটবে।
তারপর দূরে কাউকে দেখতে পেয়েছেন এমন ভাব করে ঘরের কারো উদ্দেশে বললেন, ফেরিওয়ালার আসতেছে। ফুটো বাসনকোসন বের কর। সারাই করণ লাগবে।
তিনি আর দাড়ালেন না। দরোজাটি বার্তাপরিবেশকের চোখের সামনেই বন্ধ করে দিলেন।
বন্ধ দরজার দিকে কিছুক্ষণ হতবিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি রাস্তায় নেমে এলেন। দেখতে পেলেন বেশ দূরে একজন লোকের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। তার কাঁধে বাঁক। কাছে আসতেই দেখা গেল, বাঁকের দুধারে দুটো ঝুড়ি। একটিতে বাসনকোসন। আরেকটিতে লবণ, বিস্কুট, লেবুলজেঞ্জ, স্নো সাবান সহ চানাচুরও আছে।
লোকটি তার কাছে এসে থামল। রাস্তায় তাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে কিছুটা বিস্মিত হলো। বাঁকটা কাঁধ থেকে নামাল। বলল, ঘটনা কি? একটু খুলে বলেন তো।
বার্তাপরিবেশক শুধু বলতে পারলেন, খুন।
–খুন? আঁতকে উঠল ফেরিওয়ালা। জিজ্ঞেস করল, কোথায়? কোন জায়গায়?
–ঐ যে। হাত তুলে কড়াইগাছ তলাটা দেখালেন।
কড়াইগাছ তলার দিকে ফিরল ফেরিওয়ালা। বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। সেখানে কয়েকটি কুকুর এসেছে। তারা জায়গাটিতে চক্রাকারে দাঁড়িয়ে আছে।
ফেরিওয়ালা বাঁক কাঁধে তুলে নিল। তার তাড়া আছে। বলল, শোনেন স্যার। আপনি মনে হয় এই এলাকার লোক নন। সেইজন্য আপনি যা দেখতে পান, আমরা তা দেখতে পাই না।
–কিন্তু খুনটা তো আমার চক্ষের সামনে হয়েছে। লোকটা এখনো জ্যান্ত আছে।
এবার ফেরিওয়ালা আর দাঁড়ায় না। একপা দুপা বাড়ায়। যেতে যেতে বলে, আপনি যদি মনে করেন, কেউ একজন খুন হইছে, এখনো জ্যান্ত আছে–তাইলে দাড়ায় আছেন ক্যান? তাকে নিয়ে হাসপাতালে যান। মন্দিরের পিছনে হাসপাতাল।
–কিন্তু নেবো কীভাবে?
–সেটা আমি কি জানি। আপনে তারে দেখছেন, আপনি তারে নিয়ে যাবেন। আমি তারে দেখি নাই। কিছু শুনিও নাই। তারে নেওনের কথা দায়ও আমার নাই।
এবারে ফেরিওয়ালা আর দাঁড়াল না, হন হন করে চলে গেল।
কড়ুইতলায় ততক্ষণে কুকুরগুলো আহত লোকটার আরো কাছে চলে এসেছে। তারা ঘেউ ঘেউ বাড়িয়ে দিয়েছে। কাছে এসে দেখা গেল–লোকটা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে এসেছে। বুকের ওঠানামা আছে কি নেই। এই অবস্থায় তাকে ঘাড়ে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া ঠিক হবে না। তার চেয়ে বার্তা পরিবেশক ছুটে গেলেন মন্দিরের পিছনে–হাসপাতালে।
হাসপাতালে তখন লোকজন বিশেষ ছিল না। একজন মাত্র ডাক্তারকে পাওয়া গেল। তিনি বিল ভাউচার সই করছিলেন। তার রুমে ঢুকতে বাঁধা দিল পিওন। জোর করে রুমে ঢুকে পড়লেন বার্তা পরিবেশক। ডাক্তার মোটেই বিরক্ত হলেন না--যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তার কথা তিনি মনোযোগ শুনলেন। শুনে তার পিওনকে চা দিতে বললেন। চা খেতে খেতে বললেন, আপনি যা বললেন তার মানে হলো–আপনি দেখেছেন কড়ুইতলায় একজন গলাকাটা লোক পড়ে আছে। তাই না?
বার্তা পরিবেশক এবারে উৎসাহিত হয়ে বললেন, হ্যাঁ স্যার। এখনো মনে হয় বেঁচে আছে। হাসপাতালে আনতে পারলেই বেঁচে যাবে।
–হুম। সব বুঝতে পেরেছেন এমন ভাব করলেন ডাক্তার বললেন। বললেন, এরকম অভিযোগ মাঝে মাঝে কেউ কেউ নিয়ে আসেন আমাদের কাছে। তারা বলেন, তারা কাউকে খুন হতে দেখেছেন। কেউ কেউ আবার আমাদের কাছে ছুটে আসেন আপনার মতো। আমাদেরকে অনুরোধ করেন তার সঙ্গে যেতে। গেলেই নাকি গলাকাটা লোকটিকে সুস্থ করা সম্ভব। কেউ কেউ দিনের বেলা পথেঘাটে ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখেন বলে জানান। এগুলো এক ধরনের পাগলামির লক্ষ্মণ।
এরপরে একটা ফাইল টেনে বের করলেন ডাক্তার। তার ভেতরে কয়েকটা পেপার কাটিং। একটা বিবিসির রিপোর্ট। বড়ো বড়ো করে লেখা–
“দেশে দেড় কোটি পাগল। সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে।” তবে–
ডাক্তার মনে করেছিলেন বার্তা পরিবেশক কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করবে–তবে?
কিন্তু লোকটি সে প্রশ্ন না করে তার টেবিলে হাত দুটো রেখে অনুনয় করে বললেন, ডাক্তার সাহেব, দেরি করা ঠিক হবে না। লোকটির জন্য এখুনি যাওয়া দরকার।
ডাক্তার এবারে চুপ করে রইলেন। তার মুখে কথা আসছে না। কিছু ক্ষণ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলেন। রিপোর্টগুলো ফাইলে ঢোকালেন। সেলফে যত্ন করে রাখলেন।
তিনি চায়ের কাপে মুখ দিলেন। বার্তা পরিবেশ তার দিকে সকাতরে চেয়ে আছেন। মনে করছেন ডাক্তার এখুনি রওনা হবেন।
কিন্তু ডাক্তার অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি চুমুক দিতে দিতে বললেন, আপনি যতক্ষণ ধরে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন তাতে মনে হয়– লোকটি সম্ভবত আর বেঁচে নেই। কিন্তু কথা হলো–যদি কোনো লোকের গলা কাটা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে, যদি লোকটি কড়ুইতলার মতো শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় গলাকাটা লোকটি দীর্ঘ ক্ষণ ধরে কাটা মুরগীর মতো ছটফট করে থাকে, তবে তার চিৎকার করার কথা–তবে এলাকার কারো না কারো সে চিৎকার কানে ঢোকার কথা, শহরের লোকজনের চোখে পড়ার কথা। তাই না?
তারপর ডাক্তার পিওনকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এই যে তমিজ মিয়া, তুমি তো সকাল থেকে বেশ কয়েকবার কড়ুইতলার সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করেছ–তুমি কি ওখানে গলাকাটা কাউকে দেখেছ?
–না। তমিজ মিয়া জবাব দিল, না স্যার। দেখি নাই। ওখানে কয়েকটা কুকুর কাত হয়ে শুয়ে বসে আছে। প্রত্যেক দিনই ওখানে বসে থাকে।
‘বিশ্বাস করলেন না তো। দাঁড়ান।’ বলে ফোন টেনে থানায় রিং করলেন। ওসি সাহেব অফিসে নেই। বাইরে আছেন। থানার সামনে প্যারেড গ্রাউন্ডে সামিয়ানা টানানো হচ্ছে। আজ সন্ধ্যার পরে সেখানে গানের আসর বসবে। ঢাকা থেকে বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী সামিনা নবী গান করবেন। সেটার তদারকি করছেন।
সেকেন্ড দারোগা জানালেন, শহরের পরিস্থিতি অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। টাউন দারোগা প্রতি ঘণ্টায় টহল দিচ্ছে। তাছাড়া সিভিল ড্রেসেও পুলিশের লোকজন ঘুরছে। এ শহরে গাছের একটা পাতা নড়লেও তা পুলিশের নজর এড়ায় না। সেকেন্ড দারোগা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তার মধ্যে কিছুটা গণতন্ত্র বোধ অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই আছে। তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমাদের কথা বিশ্বাস না করলে স্থানীয় সাংবাদিকের কাছে খোঁজ নিতে পারেন।
এরপরে আর কথা নেই। ডাক্তার একটা সিগারেট ধরালেন। মুচকি হেসে বললেন, আপনি ইমার্জেন্সি রুমে বসুন। আপনার জন্য একটা রেফারেল লিখে দিচ্ছি। প্রখ্যাত মনোচিকিৎসক ডা: মোহিত কামাল। ঢাকায় তার ক্লিনিক আছে। আপনার হেলুসিনেশনের সমস্যা তিনি দূর করে দেবেন।
বার্তা পরিবেশক বেরিয়ে যেতে যেতে শুনলেন, ডাক্তার সাহেব তাকে উদ্দেশ্য করে, হয়তো তাকে উদ্দেশ্য নিজের উদ্দেশ্যেই বলছেন, দেশে এক কোটি মানুষের জন্য মাত্র সাতজন ডাক্তার আছে দেশে। দিন দিন পাগলের সংখ্যা বাড়ছে। ডাক্তাররের সংখ্যা বাড়ছে না। এভাবে দেশ চলতে পারে না।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মানসিক চিকিৎসকের পোস্টিং চেয়ে একটি চিঠি লিখতে বসলেন।
বার্তা পরিবেশকের মনে হলো এ শহরে মৃত্যুপথযাত্রী লোকটির সাহায্যের জন্য কেউ আসবে না। প্রশাসন পুলিশ এবং পুলিশকে কাজে লাগানোর কোনো উপায় না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় ইত্তেফাকের সম্পাদককে ফোন করবেন। সম্পাদক নিজে বা উর্ধতন কাউকে দিয়ে ফোন করাবেন। তাহলে এরা তৎপর হবেন।
ফোনটি বের করলেন। দেখলেন তাতে নেট নেই। ফোন করা, বা টেক্সট মেসেজ করা বা ইমেইল করারও উপায় নেই।
তিনি কড়াইতলায় এসে দেখতে পেলেন লোকটির মুখে মাছি পড়ছে। গলার কাটা জায়গা থেকে একটা রক্তের ধারা গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার মাঝখান দিয়ে ওধারে চলে গেছে। আর কুকুরগুলো তার গায়ের কাছাকাছি এসে শুয়ে আছে। তাদের মাথা নিচু। চোখ দিয়ে জল পড়ছে।
লোকটিকে বাঁচাতে না পারলেও তার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটির খবর অবিলম্বে ঢাকায় পাঠানো দরকার মনে করে প্রেস ক্লাবের সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক মতিয়ার মোল্লার খোঁজে বের হলেন। তার ফোনে নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। অথবা কী করে ঢাকায় নিউজটি পাঠানো যাবে তার উপায় পাওয়া যেতে পারে।
মতিয়ার মোল্লাকে পাওয়া গেল নদীর পাড়ে। তিনি ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা লিখছিলেন তার নোটবুকে। মাথার পেছন দিকে চুল কমে এসেছে। সেখানে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। মাঝে মাঝে সেখানে হাত রাখছেন। আর বিড়বিড় করছেন। বার্তা পরিবেশককে দেখে উল্লাশভরে কাছে ডেকে নিলেন। তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নোট বুকটি বের করলেন। তদ্গত হয়ে সদ্য লেখা কবিতাটি শোনাতে লাগলেন। বার্তা পরিবেশক তাকে কোনো ভাবেই থামাতে পারলেন না। কবি কবিতাটি শেষ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটি পাখি উড়ে এসে জল ছুঁইয়ে আবার উড়ে গেল। সেটা দেখে বলে উঠলেন, বাহ্।
কবি নোট খাতার আরেকটি পাতা উল্টালেন। সেখানে কলম বাগিয়ে ধরতে যাবেন। এ সময় বার্তা পরিবেশক কলমটি হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন। বললেন, লোকটিকে বাঁচাতে পারলাম না।
–কী করতে পারলেন না? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কবি সাংবাদিক মতিয়ার মোল্লা।
–বাঁচাতে পারলাম না।
–কাকে?
–লোকটিকে।
এইটুকু শুনে মরিয়ার মোল্লা আবার নদীর দিকে তাকালেন। বললেন, মহাভারতের কথা মনে করুন। ধর্মিরূপী বক পাখি একপায়ে সরোবরের পানির উপর দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে না তাকিয়ে জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির অঞ্জলি ভরে জল নিতে গেলেন। বক পাখিটি গুরুগম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন, বৎস, আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। তারপর জল পান করো।
বকপাখি মানুষের গলায় কথা বলছে। নিশ্চয়ই এ কোনো সাধারণ পাখি নয়। তাকে অগ্রাহ্য করা যায় না।
যুধিষ্ঠির নম্র কণ্ঠে শুধালেন, প্রশ্ন করুন।
– এ জগতে বিস্ময় কী?
যুধিষ্ঠির অভিজ্ঞতা হেতু প্রাজ্ঞ লোক। তিনি জানেন আত্মীয়, বন্ধু, চেনাজানা, অজানা লক্ষ লক্ষ লোকের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হবে। ধর্মপুত্র হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যে কথা বলে যুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য নিজের গুরুকে হত্যা করবেন অন্যায়ভাবে। তিনি জানেন এ জগতের সকল মীমাংসা। উত্তর দিতে দেরি করলেন না। বললেন, যে জন্মেছে তাকে অবশ্যই মরতে হবে। কোনো ভাবেই মৃত্যু ঠেকানো যাবে না। কিন্তু সে বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে। এই-ই হলো বিস্ময়। ফলে–
বার্তা পরিবেশক জিজ্ঞেস করে বসলেন, ফলে?
–বৃথা শোক করবেন না, জনাব। মৃত্যু স্বাভাবিক। জীবিত থাকতে চাওয়াটাই অস্বাভাবিক।
–কিন্তু লোকটি তো বিনা চিকিৎকায় মারা গেল।
–কে মারা গেল? এবার যেন সম্বিত ফিরে পেলেন মতিয়ার মোল্লা। নোটখাতাটি বন্ধ করে পকেটে পুরলেন।
–আজ যে লোকটি বিয়ে করতে রওনা হয়েছিল। বলে তার ফোন থেকে গুগল ডক বের করে কিছুক্ষণ আগে লেখা জরুরী খবরটি বের করে পড়ে শোনাতে লাগলেন।
গুগুল ডক নোট/৩
অদ্য বেলা এগারো ঘটিকায় প্রকাশ্য দিবালোকে একজন বিয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করারকালে বরকে চাপাতি দিয়া গলা কাটিয়া হত্যা করা হইয়াছে। যুবকটি নাম–প্রসূনকান্তি সিকদার। বয়স ২৮ বৎসর। যুবকটির বিবাহ উপলক্ষ্যে বন্দর এলাকায় বর্ণাঢ্য আয়োজন চলিতেছিল। হাতির পিঠে করিয়া শোভাযাত্রা সহকারে কণেগৃহের উদ্দেশ্যে বিবাহ-যাত্রা করিয়াছিলেন তখন একজন আততায়ী একটি কড়াইগাছ হইতে লাফ দিয়া নামে। বকরির মতো তাহার গলায় চাপাতি চালাইয়া জবেহ করে। সবার চোখের সামনেই হাঁটিয়া আততায়ী অকুস্থল ত্যাগ করে।
যুবকটি বেশ কিছু সময় বাঁচিয়া ছিল। তাহার সাহায্যে কেহই আগাইয়া আসে নাই। সবাই পালাইয়া যায়। স্থানীয় চিকিৎসক বা পুলিশেরও কোনোরূপ সহযোগিতা পাওয়া যায় নাই।
…………
শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইলেন মতিয়ার মোল্লা। তারপর বললেন, আজব তো।
বার্তা পরিবেশক মাথা নেড়ে বললেন, আজব নয়। সত্যি ঘটনা। আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। আমার ফোনে নেট নেই। খবরটি ঢাকায় পাঠানো দরকার। আপনার ফোনটি দিন। ইমেইল করব।
মৃদু হাসলেন মতিয়ার মোল্লা। তিনি ফোনটি বের করলেন। তার ফোনে নেট আছে। গুগল সার্চ করে তার পত্রিকাটির ওয়াবলিঙ্কটি লিখে সার্চ দিলেন। পত্রিকাটির ওয়েবপেজ থেকে বের করলেন একটি খবর। খবরটি প্রকাশিত হয়েছে আজকের তারিখে। প্রকাশিত হয়ে বেলা সাড়ে এগারটায়। হেডলাই।।
……………………
পাতারহাটে বিপুল উদ্দীপনায় বিবাহযাত্রা
বন্দর এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান প্রসূণ কান্তি সিকদার বিয়ে উপলক্ষ্যে পাঁচশত লোক সমবিব্যভারে কণেবাড়ি যাত্রা করিয়াছে। প্রাচীণকালের রাজন্যরীতি অনুসারে বরবেশী যুবক যাত্রা করেন মহালক্ষ্মী নামে একটি হাতির পিঠে। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের একটি চৌকশ দল তাহার পাশে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হন। নদী পার হইবার জন্য নদী ও সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি বিশালকায় ফেরীও ভাড়া করা হইয়াছিল। এরকম বিবাহ অত্র এলাকায় অভূতপূর্ব বলে অভিজ্ঞমহলসূত্রে জানা গিয়েছে।
আরো প্রকাশ থাকে যে এলাকার জনদরদী মেয়র জনাব আব্দুল মালেক তাহাদের সঙ্গে তেতুলিয়া ফেরী পর্যন্ত গমণ করেন।
…………………………
পড়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন বার্তা পরিবেশক-- সে কি?
–হ্যাঁ। আরো দেখুন। বলে তিনি আরো কিছু পত্রিকার সাইট দেখালেন। এমন কি ইত্তেফাক পত্রিকার মফস্বল পাতা বের করলেন। অবাক হয়ে বার্তা পরিবেশক দেখলেন, সেখানেও হবহু খবরটি ছাপা হয়েছে।
বার্তা পরিবেশক বেশ কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কে পাঠিয়েছে?
–তা আমি কি জানি। আপনার পত্রিকা। আপনি ছাড়া আর কে পাঠাবে।
–আমি পাঠাইনি। আর লোকটি মোটেই বরযাত্রা করেনি। আমি নিজের চোখে দেখেছি–তাকে জবাই করা হয়েছে। বেঁচে নেই। তার ডেডবডি কড়াইতলায় এখনো পড়ে আছে।
–বুঝতে পেরেছি। বলে উঠে হাঁটতে লাগলেন নদীর পাড় ধরে মতিয়ার মোল্লা। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, সারা বন্দর দেখছে--আনন্দ-উল্লাহে বরযাত্রীসহ বর বিয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। আর আপনি দেখছেন, বরকে কেউ একজন চাপাতি দিয়ে মেরে ফেলেছে। এটা আপনার জন্য সত্যি। কিন্তু আমাদের জন্য মিথ্যা। সত্যির অনেক রূপ। যে যেটা মন থেকে দেখতে চায় সেটাই সে দেখতে পায়।
–কিন্তু আমি তো লোকটির মৃত্যু চাইনি!
–হতে পারে আপনি সচেতনভাবে চাননি। কিন্তু আপনার অবচেতন মন তো মৃত্যুটা দেখতে চেয়েছে। জানেন তো অবচেতন মনের ক্ষমতা অসীম। আমাদের রিয়েলিটিকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে।
–কীরকম?
–আপনি হয়তো কারো কাছ থেকে শুনেছেন, এই প্রসূণ কান্তি সিকদারের ঠাকুরদাকে একাত্তরে পাক বাহিনী হত্যা করেছিল। প্রকৃতপক্ষে পাক বাহিনী তাকে হত্যা করেনি। এ এলাকার কাউকেই হত্যা তারা করেনি। তারা গানবোটে এ শহরে এসেছিল সত্যি। তাদের আগমণ বার্তা শুনে হিন্দু জনগোষ্ঠী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাইল। তখন এলাকার মেয়র ছিলেন বর্তমান মেয়র আব্দুল মালেকের আব্বা হুজুর জনাবআব্দুল খালেক মোড়ল। মেয়র সাহেব ভীত সন্ত্রস্ত হিন্দুদের বোঝালেন, তিনি থাকতে কাউকে মরতে দেবেন না। সবাইকে নিয়ে মেজর সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন। তারপর সবাইকে নিয়ে ফিরে আসবেন।
মেয়র তাদেরকে নিয়ে স্থানীয় ফুটবল মাঠে জড়ো হলেন। মিলিটারিরা খুব খুশী। তারা তখুনি সবাইকে ব্রাস ফায়ার করবে ঠিক হলো।
হিন্দু জনগোষ্ঠী মেয়রকে বলল, এখন কী হবে?
তিনি আবারো আশ্বাস দিলেন, মিলিটারিরা কাউকে গুলি করে মারতে পারবে না।
মেজরকে তিনি বোঝালেন এদেরকে হত্যা করার জন্য গুলি খরচ করার দরকার নেই। বিনাগুলিতেই ধর্মীয় বিধান অনুসারের জবাই করার ব্যবস্থা করছেন। তারা দাঁড়িয়ে দেখুন।
মেয়র সাহেব বাজারের রমিজ কসাইকে নিয়ে এসেছিলেন। সঙ্গে তার অতি ধারালো গরুকাটা চাপাতি। মিলিটারিরা স্টেনগান তাক করে মাঠের চারিদিকে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষগুলোকে ঘিরে আছে। কারো পালানোর সুযোগ নেই। পালালেই গুলি করবে।
রমিজ কসাই চাপাতি নিয়ে লোকদের দিকে এগিয়ে গেল। প্রসূণ কান্তির ঠাকুরদা গান্ধীবাবু এবারে ভীতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী হলো–এবার তো আপনি মারার ব্যবস্থা করলেন!!
মেয়র গান্ধীবাবুর কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ভয় পাবেন না। রফিজ আপনাদের জবাই করবে বটে। কিন্তু আপনাদের কিছু হবে না। আপনারা মরার মতো পড়ে থাকবেন। আমি অমৃত মুচিকে এনেছি। সন্ধ্যার আগেই মিলিটারিরা চলে যাবে। অমৃত মুচি কামরূপ কামাখ্যা থেকে যাদু বিদ্যা শিখে এসেছে। রাতের অন্ধকারে আপনাদের কাটা গলা সেলাই করে দেবে। সে সেলাই করার পরেই আপনার বেঁচে উঠবেন। হেটে ঘরে ফিরে যাবেন। গলায় কোনো দাগও থাকবে না।
এসব কথা বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনো সময় ছিল না। রমিজ কসাই বন্দরের প্রায় দুশো মানুষকে চাপাতি দিয়ে জবাই করল। সবাই কাটা গরুর মতো ছটফট করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে গেল।
–তারপর?
–তারপর আর কি।
–সবাই মরে গেল!
-মরে তো যাবেই। কিন্তু…
–কিন্তু?
–শোনেন আগে। সন্ধ্যা পড়ার পরে অমৃত মুচি এলেন। তিনি এলেমদার লোক। একটা হাত বাক্স থেকে বের করলেন কামরূপ কামাখ্যা থেকে আনা চামড়ার সুতো আর সুঁই। আসামের নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত দেবী কামাখ্যার মন্দির থেকে এই সুতো শোধন করে আনা হয়েছে। তিনি একেকজন মৃত লোকের গলা সেই সুই সুতো দিয়ে সেলাই করে দেন। আর তারা জীবিত হয়ে ওঠে।
–তারা জীবিত হয়ে উঠল?
–নিশ্চয়ই। তারা জীবিত হয়ে উঠল। বিশ্বাস না হয় আব্দুল খালেক সাহের ছেলে বর্তমান মেয়র আব্দুল মালেকের কাছে যান। তিনি সব জানেন। তিনি নিজেও ছিলেন সে ঘটনার সাক্ষী। তার কথাই সত্যি।
–সেই লোক সকল জীবিত হয়ে গেল ধরে নিলাম। কিন্তু তারা জীবিত হয়ে গেল কোথায়?
–সেটা কি জানি। তবে শোনা যায় তারা সবাই জীবিত হয়ে কামরূপ কামাখ্যায় চলে গেছেন। এইজন্য তাদেরকে আর এ এলাকায় দেখা যায়নি।
মতিয়ার মোল্লা তখন গলা খাটো করে বললেন, আমিও দেখেছি। সেটা একাত্তরে নয়– দুই হাজার এক সালে। দিল্লীতে একটি মসজিদ ভাঙা হলো। আর এদেশে কিছু লোক মারা গেল। আমাদের এ এলাকায়ও কিছু লোকের গলা কাটা হয়েছিল। তখন এই অমৃত মুচিই সেলাই করে তাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তারা বেঁচে কামরূপ কামাখ্যাতেই চলে গেছেন। গেলবার গোলোক দত্ত মশাই কামরূপ কামাখ্যা মন্দির দর্শনে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তারা বেশ বহাল তবিয়তে আছে। এমন কি গান্ধীবাবুও সেখানে দেহ রেখেছেন বছর বিশেক আগে। তার সমাধিও দত্ত বাবু দেখেছেন।
এবারে বার্তা পরিবেশক জিজ্ঞেস করলেন, সেই দত্ত বাবু কোথায়? একবার আলাপ করতে চাই তার সঙ্গে।
–দত্ত বাবু? গলাটা খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর করলেন মতিয়ার মোল্লা, দত্তবাবু আর ফিরে আসেননি। তিনিও কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরে থেকে গেছেন। বয়স হয়েছে তো। তীর্থে দেহ রাখলে স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে। তিনি স্বর্গে বিশ্বাসী।
আর কথা বলবেন না মতিয়ার মোল্লা। সন্ধ্যা হবো হবো করছে। তিনি এবার বাড়ি ফিরবেন। তার বেশ ক্লান্তি লাগছে। বিশ্রাম নেবেন। যেতে যেতে বললেন, আপনি বিদেশি মানুষ। এলাকাটি আপনার কাছে নতুন। সব বোঝার সাধ্য নাই। বুঝতে চাওয়াটাও ঠিক হবে না। বিভ্রম নিয়ে এখানে থাকা ঠিক হবে না।
যেতে যেতে মতিয়া মোল্লা গুণ গুণ করে একটি গানের সুর ভাজতে লাগলেন। সুরটি এক সময় ঘনায়মান অন্ধকারে ঝিঁঝির শব্দের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
কড়াইতলায় ফিরে এসে দেখলেন কুকুরগুলো তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। তিনি লাশের পাশে এসে বসলেন। বুঝতে পারলেন– এ শহরে একজন লোক মরে গেল, তিনি ছাড়া আর দেখেছে বলে স্বীকার করছে না। পুলিশও আসবে না। কোনো মার্ডার কেসও রজ্জু হবে না। পোস্ট মর্টেমও হবে না। কোনো প্রতিবাদ করারও কোনো উদ্যোগ দেখা যাবে না। লাশটার দাফন কাফনেরও কোনো সুযোগ হবে না। তাকিয়ে দেখলেন লাশটি যে বাড়ির সেই সিকদার বাড়িতে আলো জ্বলে উঠছে না। হয়তো জ্বালাবার মতো কেউ আর নেই। হাওয়া হয়ে গেছে। আর ভাবতে পারছেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
কতক্ষণ এভাবে বসে আছে বুঝতে পারছেন না। কিন্তু বুঝতে পারছেন তার কানে একটা সুর ভেসে আসছে। ভেসে আসছে বহু দূর থেকে। এই সুরটিই যেন মতিয়ার মোল্লা গাইতে গাইতে চলে গেছেন। ধীরে ধীরে সুরটির কথা বোঝা যেতে পাগল। বুঝতে পারলেন কেউ একজন গাইতে গাইতে এদিকে আসছেন–
এ জমিন আউর এ আসমান
তেরে কব্জে মে হ্যাই দো জাহান
সব পে তু হি হ্যাই মেহেরবান
হাম তেরে দার সে জায়েইন কাহান
তু হি সুন্তা হ্যায় সবকি সদা
তুহি রখতা হাই সাব কা করম—
.এই আবছা অন্ধকারে বার্তা পরিবেশকের মনে হলো এই লোকটিকেই সেদিন এই কড়াইতলায় দেখেছিলেন। এই গানটিই লোকটি গেয়েছিলেন। এই লোকটিকেই তিনি প্রশ্ন করেছিলেন তিনি অমৃত মুচি কিনা। উত্তরে বলেছিলেন হতে পারেন। আবার নাও হতে পারেন।
লোকটি কড়াইতলায় এসে বসলেন। হাত থেকে বাক্সটা পাশে রাখলেন। কোনোদিনে না তাকিয়ে লাশটিকে তার কাছাকাছি টেনে আনলেন। আর কুকুরগুলো তখনি অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
বার্তা পরিবেশক তাকে সেদিনকার মতো জিজ্ঞেস করলেন–আপনি কি অমৃত মুচি?
লোকটি কোনো কথা বললেন না। গান গাইতে থাকলেন। হাত বাক্সটা খুললেন। তার ভেতর থেকে বের করলেন সুই আর সুতো। এক টুকরো চামড়ায় ঘষে সুইয়ের আগাটিকে ধার করে নিলেন। তারপর সুতো পরালেন ছিদ্রে। গলার কাটা জায়গাটি বাঁহাত দিতে টিপে টিপে দেখলেন। সুতো দিতে সেইলাই করতে লাগলেন।
তিনি সেলাই করছেন। আর গান গাইছেন। সেলাই করতে করতে কাটা চামড়া সঙ্গে তার বাঁহাতের বুড়ো আঙুলটিও সেলাই হয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে। সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না। শুধু বুঝতে পারছেন তার আঙুলটি আর আগাচ্ছে না। সেটা কোথাও আটকে গেছে। সেখান থেকে ছাড়াতে পারছেন না। তাকে দিশেহারা মনে হচ্ছে। তার আঙুল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত লোকটির ধুকিয়ে যাওয়া রক্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।


20 মন্তব্যসমূহ
এত বিরক্ত লাগল গল্পটা পড়ে! আগ্রহ নিয়েই পড়তে বসেছিলাম। আগামাথা খুঁজতে বেগ পেতে হয়। আপনারা সব ভাবের সাহিত্যিক। ভাব নিয়া চলেন। মনে করেন উচ্চমার্গিয় সাহিত্য রচনা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এসব লেখা পাঠককে টানে না। পাঠক বিরক্ত হয়। গল্পপাঠের বেশিরভাগ লেখাই এই শ্রেণির।
উত্তরমুছুনকিছু কিছু গল্প অনুভব নির্ভর। ভবিষ্যতে হয়তো এই গল্পটি বিশ্বসাহিত্যে উল্লিখিত হবে। দেখেও না দেখা,সত্যকে অস্বীকার করা,চরম অমানবিকতা-- একে সবাই অনুভব করতে চায় না,গল্পের চরিত্রগুলির মতো।
মুছুনআসলেই, পূর্ববর্তী পাঠকের মন্তব্য সমর্থন করছি। লুলুভুলু টাইপের লেখাকে যারা সাহিত্য বলে, তারা লুলুভুলু টাইপের হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
উত্তরমুছুনঅমর মিত্রঃ যিনি নাম গোপন করে অনর্থক নিন্দা করলেন, তাঁর গল্প পড়ার অভ্যাস বদল করতে হবে,। গল্পটি অসাধারণ। বাংলাদেশের বাস্তবতা এই।
মুছুনআশ্চর্য এক গল্প। এই গল্প কখনো কখনো লেখা হয়।
উত্তরমুছুনকী অসাধারণ একটা গল্প! হায় বাংলাদেশ! এদেশের সব মুসলমানই এখন অন্ধ! আর যারা বাস্তবতা দেখতে পায় তারা সব পাগল!
উত্তরমুছুনঅসাধারণ রূপক একটি গল্প ! বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা , দেশের অবস্থার এতো সুন্দর করে উপস্থাপন ! এক কথায় অসাধারণ I ধন্যবাদ লেখক কে I
উত্তরমুছুনঅসাধারণ গল্প। এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম।
উত্তরমুছুন-- অচিন্ত্যরূপ রায়
যে বাস্তবকে সমবেতভাবে অস্বীকার করবে তাই একদিন নাই হয়ে যাবে। অবহেলায়, অমনোযোগে সব মৃত্যু আর দেশত্যাগ একদিন মনে হবে মরীচিকা, অমৃত মুচির আত্মা ঢুঁড়ে বেরাবে মৃতকে জীবন্ত করার জন্য। কুলদার গুগোল ডক যেন বিস্মরণের আগেই ভরে ওঠে বহু অমৃতের কাহিনিতে। এটি একটি কষ্টকর অভিযান, সেই অভিযানটিই কুলদা করছে। - দীপেন ভট্টাচার্য
উত্তরমুছুনগীতা দাস:
উত্তরমুছুনগল্পটির মধ্যে তো আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া বাস্তব চিত্র দেখছি। প্রথম পাঠক যা বলেছেন তা গল্পের চরিত্রগুলির মতো। বরের কাটা লাশ কড়ই তলায় দেখেন না।
একদম অন্যরকম কথা ও ঘটনার বুনন! খুব ভালো লাগল!
উত্তরমুছুনগল্প পড়ার অভ্যাস পরিবর্তন করার কোনোই প্রয়োজন নাই। আপনাদের মতো ভাবের লোকজনও থাকবে আবার স্বাভাবিক গল্প পড়ে সহজ সুন্দর বিমল আনন্দ লাভ করবে এমন পাঠকও থাকবে। বিভূতিভূষণ কিংবা শীর্ষেন্দুকে কি আমরা ভালো লেখক বলি না? অথবা সমরেশকে অথবা সত্যজিৎ রায়কে? তারা যা লিখতেন পড়ে আনন্দ পেয়েছি সবসময়। আপনারা ঘোড়ার ডিমের সাহিত্য রচনা করে শুধুই এই সময়ে আমাদের বিরক্তির কারণ হচ্ছেন। দয়া করে আলাদা গ্রহে গিয়ে বাস করেন আপনারা যারা এই গল্পপাঠে লিখেন। ফালতু!!!
উত্তরমুছুনকুলদা রায় অত্যন্ত নেগেটিভ একজন মানুষ। তার ফেসবুক জুড়ে শুধু হিংসার বসত। এই গল্প শেয়ার করে উনি তৈল মর্দনকারিদের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। সৎ সাহস থাকলে দয়া করে মুদ্রার অন্য পিঠটাও দেখবেন।
উত্তরমুছুনএকটা গল্প কোনো পাঠকের ভালো নাই লাগতে পারে। সততার সঙ্গে সেটা প্রকাশ করা দোষণীয় নয়। পাঠভাবনায় ভালোলাগার পাশাপাশি অপছন্দের কথা কিংবা সুস্থ-গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানো সাহিত্যচর্চার জন্য স্বাস্থ্যকর। গল্পপাঠও সেটা চায়। কিন্তু এই গল্পকে কেন্দ্র করে যেভাবে মন্তব্য করা হয়েছে, তাতে যেন মনে হচ্ছে আদৌও গল্প বা গল্পকার কুলদা রায় নন– ব্যক্তি কুলদা রায়-ই নামহীন মন্তব্যকারীদের লক্ষ্য। শুধু তাই নয়– ‘গল্পপাঠ’কেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটা সূক্ষ্ণ প্রবণতাও যেন মন্তব্যকারীদের ভাষায় লক্ষ করা যাচ্ছে। আপনাদের(নামহীন) ভেতরে যদি কেউ গল্পকার থেকে থাকেন– আপনার সেরা লেখাটি গল্পপাঠে পাঠিয়ে দিন– গল্পপাঠ ভালো লেখা প্রকাশে আলস্য দেখায় না। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয় বরং গঠনমূলক সমালোচনা করুন– এবং সেটি স্বনামেই হোক। সবার জন্য শুভকামনা।
উত্তরমুছুনগল্পটি অসাধারণ লাগল।
উত্তরমুছুনঅনেকে অনেকরকম মতামত জানিয়েছেন। তাই সময় নিয়ে গল্পটি পড়লাম। সত্যিই খুব ভাল লাগল।
উত্তরমুছুনশ্বাসরুদ্ধকর। এত চমৎকার করে কীভাবে গল্প বলা যায়?
উত্তরমুছুনঅসাধরণ বুনন। ধীরে পড়ার গল্প। টিকে থাকার গল্প।
উত্তরমুছুনএকটা অসাধারণ গল্প পড়লাম! সময়, বাস্তবতা, ম্যাজিক রিয়েলিজম সব কিছু এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
উত্তরমুছুনগল্পটি চমৎকার, বর্তমানের বাস্তবতা। তবে কিছু তথ্য দেয়া হয়েছে গল্প, সেগুলো গল্প বলার ঢঙে বলা হলে আরো সুন্দর হতো।
উত্তরমুছুন