ফ্রান্‌ৎস কাফকার চিঠি (১৭ নভেম্বর ১৯১২)


ফেলিস বাওয়ার (Felice Bauer, ১৮৮৭ – ১৯৬০) ছিলেন এক জার্মান-ইহুদি নারী। ফ্রাঞ্জ কাফকার সঙ্গে ফেলিসের প্রথম দেখা হয়েছিল আগস্ট ১৯১২ সালে, কাফকার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের (Max Brod) বাড়িতে। তার কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয় চিঠিপত্র বিনিময়। কাফকা ছিলেন প্রাগে, ফেলিস বার্লিনে—তাদের সম্পর্কের সেতু ছিল এই চিঠিগুলো। প্রায় ৫ বছর ধরে চলা সম্পর্কের সময়ে কাফকা ফেলিসকে ৫০০টিরও বেশি চিঠি লিখেছিলেন। দু’বার বাগদান হয়েছিল, কিন্তু দু’বারই ভেঙে যায় (১৯১৪ এবং ১৯১৭ সালে)। কাফকার রোগভোগ, দাম্পত্য নিয়ে সংশয় ও আত্মদ্বন্দ্ব সম্পর্কের ভাঙনের প্রধান কারণ। ফেলিসকে লেখা চিঠিতে যেমন প্রবল প্রেম আর আকর্ষণ প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি অনিশ্চয়তা, ভয় ও আত্মবিশ্বাসের অভাবও স্পষ্ট।চিঠিগুলো Letters to Felice নামে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। এই চিঠিগুলো কাফকার ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর মানসিক দোদুল্যমানতা, ভেতরের ভয় ও প্রেমের আকাঙ্ক্ষা বোঝার প্রধান উৎস।

নিচের চিঠিটিতে মেটামরফোসিস লেখার উল্লেখ আছে।


ফ্রান্‌ৎস কাফকার চিঠি (১৭ নভেম্বর ১৯১২)

প্রিয়তমা, অতি প্রিয়তমা! আমি সত্যিই একেবারে অভিশপ্ত প্রাণী, কারণ আমিই তোমার মতো এক সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলেছি! নিজের খেয়াল রেখো, শোনো তো, নিজের যত্ন নাও, আর আমার খাতিরে অনুগ্রহ করে সুস্থ হয়ে ওঠো—যা আমি ঘটিয়েছি তার ক্ষতিপূরণ করো! অথচ সাহস করে আমি তোমাকে লিখে দোষ দিচ্ছি, লিখছ না বলে, নিজের উৎকণ্ঠা আর আকাঙ্ক্ষার ভিড়ে এমনভাবে ডুবে আছি যে টেরও পাইনি তুমি অসুস্থ, বরং মূর্খের মতো সন্দেহ করেছি তুমি নিশ্চয় রিহার্সেলে বা পার্টিতে আছো। সত্যি বলছি, যদি আমাদের মাঝে মহাদেশের ব্যবধান থাকত, তুমি যদি এশিয়ার কোনো প্রান্তে থাকতে, তবুও আমরা আর দূরে হতে পারতাম না। তোমার প্রতিটি চিঠি, যতই ছোট হোক, আমার কাছে অন্তহীন (হে ঈশ্বর, সবকিছুই যেন অভিযোগে পরিণত হয়, আজকের চিঠিটা ছোট নয়, বরং আমার প্রাপ্যের চেয়ে দশ হাজার গুণ দীর্ঘ); আমি ওটা পড়ি স্বাক্ষর পর্যন্ত, আবার শুরু করি, আবার পড়ি, ঘুরতে থাকে। কিন্তু অবশেষে মানতে হয়, চিঠির শেষ আছে, তুমি উঠে চলে গেছো আর আমি অন্ধকারে ডুবে গেলাম। নিজের উপরেই হতাশ হয়ে পড়তে হয়!

আজকের চিঠি ঠিক সময়েই এসেছে। আমি তোমার মতো দৃঢ় নই; বার্লিনে যাওয়ার কথা ভাবিনি, আমি কেবল ঠিক করেছিলাম তোমার চিঠি না আসা পর্যন্ত বিছানা থেকে উঠব না, আর এই সিদ্ধান্তের জন্য কোনো বিশেষ দৃঢ়তার দরকারও ছিল না—আমি এতটাই দুঃখী ছিলাম। মনে হচ্ছিল রাতারাতি আমার উপন্যাস খারাপ হয়ে গেছে, আমি সবচেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিলাম। তবু এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই আনন্দ, যেদিন তোমার রেজিস্টার্ড চিঠি পেয়েছিলাম; আর যখনই চোখ তুলতাম, দেখতাম—আমি, যে এত দুঃখী—আনন্দে আকাশে ভেসে যাচ্ছি।

পরশু রাতে আমি দ্বিতীয়বার তোমার স্বপ্ন দেখলাম। এক ডাকপিয়ন তোমার দুটি রেজিস্টার্ড চিঠি এনে দিল—এক হাতে একটি করে, তার হাতদুটি ঠিক যেন স্টিম ইঞ্জিনের পিস্টনের মতো নিখুঁত ভঙ্গিতে নড়ছে। ঈশ্বর! কী জাদুকরী চিঠি ছিল সেগুলো! আমি টেনে টেনে কাগজ বের করছিলাম, অথচ খাম কখনো ফাঁকা হচ্ছিল না। আমি সিঁড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ছিলাম আর (মনে রাগ কোরো না) পড়া পাতাগুলো সিঁড়িতে ছড়িয়ে দিচ্ছিলাম যাতে খাম থেকে আরও পাতা বের করতে পারি। পুরো সিঁড়ি জুড়ে পাতার স্তূপ জমে গেল, পাতাগুলোর ঝরঝর শব্দ হচ্ছিল। সত্যিই এটা ছিল এক পরম ইচ্ছার স্বপ্ন!

আজ সকালে ডাকপিয়নকে ডাকতে আমাকে ভিন্ন কৌশল নিতে হয়েছিল। আমাদের ডাকপিয়নরা একেবারেই সময় মেনে চলে না। তোমার চিঠি এল ১১টা ১৫ মিনিটে। আমি দশবার নানা লোককে বারান্দায় পাঠালাম যেন ডাকপিয়নকে তাড়ানো যায়; আমি নিজে উঠতে সাহস পাইনি। অবশেষে ১১টা ১৫তে তোমার চিঠি সত্যিই এল—খোলা হলো, এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম। তোমার অসুস্থতায় আমি দুঃখিত হয়েছি, কিন্তু এখন আমার আসল স্বভাব প্রকাশ পেল: তুমি সুস্থ থেকে যদি আমাকে লিখতে না, তবে আমি আরও বেশি অসুখী হতাম। এখন আবার আমরা একে অপরকে পেলাম, দৃঢ় করমর্দনের পর আমাদের চেষ্টা করতে হবে একে অপরকে সুস্থ করার, তারপর একসঙ্গে ভালোভাবে বাঁচতে হবে।

আজও কোনো উত্তর দিলাম না, কিন্তু উত্তর মৌখিকভাবে দেওয়া উচিত; লিখে তেমন কিছু হয় না, কেবল সুখের এক পূর্বস্বাদ পাওয়া যায়। তবু আমি আজ আবারও তোমাকে লিখব—যদিও অনেক দৌড়ঝাঁপ বাকি আছে, আর এক ছোটগল্প মাথায় এসেছে, যা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে আর লিখতে বাধ্য করছে।

তোমার
ফ্রান্‌ৎস

[মার্জিনে লেখা] (চিন্তা কোরো না, আমি একেবারেই টেলিফোন করব না। তুমিও কোরো না; আমি সেটা সহ্য করতে পারব না।)
---------------------------------------------------------------------------------------------------
ফ্রান্‌ৎস কাফকার চিঠি (রাত ১টা ৩০ মিনিট, ১৭ থেকে ১৮ নভেম্বর ১৯১২)

আমার প্রিয়তমা, রাত এখন দেড়টা। যে গল্পটার কথা বলেছিলাম, সেটার এখনও শেষ হয়নি, উপন্যাসের এক লাইনও লেখা হয়নি আজ, আর আমি একেবারেই অনিচ্ছায় শুতে যাচ্ছি। যদি রাতটা অবাধ থাকত—কলম কাগজে চলত ভোর পর্যন্ত! তাহলে কী দারুণ রাত হতো। কিন্তু শুতে যেতেই হবে, কারণ গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি, দিনে প্রায় ঘুমাইনি, আর অফিসে একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থায় যাওয়া চলবে না।

আগামীকাল তোমার চিঠি, প্রিয়তমা, প্রিয়তমা! যখন আধো-ঘুম ভাঙে, তখন তোমার চিঠি আমাকে শক্তি দেয়। কিন্তু যখন আধো-ঘুমে থাকি, তখন একটাই ইচ্ছে—চিঠি হাতে নিয়ে চেয়ারে ডুবে যাই আর দাঁত বের করে তাকাই যে কেউ কাছে এলে। না, আমি অফিস নিয়ে অতটা বিচলিত হই না; বরং বিস্ময় যে আমি টানা পাঁচ বছরের অফিস-জীবন টিকিয়ে রেখেছি। প্রথম বছরটা ছিল এক প্রাইভেট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে—সকাল ৮টা থেকে রাত ৭টা, ৮টা, এমনকি সাড়ে ৮টা পর্যন্ত—একেবারে ভয়াবহ। অফিসে যাওয়ার সরু করিডরের এক জায়গায় প্রায় প্রতিদিনই আমাকে এমন হতাশা গ্রাস করত যে আমার চেয়ে শক্ত মনের মানুষ হলে হয়তো খুশিমনেই আত্মহত্যা করত।

তবে এখন অনেক ভালো। আমাকে অযথাই দয়া করা হয়, বিশেষ করে আমার উর্দ্ধতন ডিরেক্টর। সেদিন তাঁর অফিসে আমরা একসঙ্গে হাইন-এর কবিতা পড়ছিলাম, আর বাইরে দূত, ডিপার্টমেন্ট প্রধান, ক্লায়েন্ট—সম্ভবত জরুরি কাজ নিয়ে—অপেক্ষা করছিলেন। তবু এটাও যথেষ্ট খারাপ, আর এনার্জির মূল্য বিবেচনায় তেমন সার্থকও নয়।

মনে হলো তুমি হয়তো এই রকম কাগজে লেখা দেখে বিরক্ত হতে পারো। কয়েকদিন আগে আমি আমার বোনের লেখার কাগজ শেষ করে ফেলেছি, নিজেরও কখনো তেমন ছিল না। তাই ভ্রমণ-ডায়েরি থেকে পাতা ছিঁড়ে তোমাকে লিখছি। তবে এর ক্ষতিপূরণ দিতে চেষ্টা করছি একটি গান সংযুক্ত করে, যা এই বছরের স্যানাটোরিয়ামে অনেক সকালে একসঙ্গে গাওয়া হতো—আমি ওটার প্রেমে পড়েছিলাম, কপি করে রেখেছিলাম। আসলে গানটা খুবই পরিচিত, হয়তো তুমি জানোও। তবু পড়ো। আর অবশ্যই আমাকে ফেরত পাঠিও, আমি ওটা ছাড়া থাকতে পারব না। কবিতার গঠন দারুণ, প্রতিটি স্তবক একটুকরো বিস্ময়, তারপর মাথা নত করা। আমি শপথ করে বলছি কবিতার দুঃখ সত্যিকারের। আহা, যদি সুরটা মনে রাখতে পারতাম! কিন্তু সুর মনে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। আমার ভায়োলিন শিক্ষক একসময় হতাশ হয়ে আমাকে লাঠি ধরিয়ে দিতেন লাফ দেওয়ার জন্য, আর আমার অগ্রগতি হতো শুধু লাঠি উঁচু হওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই আমি এই গানটায় যে সুর বসাই, সেটা খুবই একঘেয়ে, আসলে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস। প্রিয়তমা!

--ফ্রান্‌ৎস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ