স্কট ফিটজেরাল্ড আমাদের আমন্ত্রণ জানাল দুপুরের খাবারের জন্য। তার স্ত্রী জেল্ডা আর তাদের ছোট্ট মেয়ে ছিল সঙ্গে। রু দ্য তিলসিত রাস্তার ১৪ নম্বর বাড়ির আসবাবপত্রস একটি ফ্লাট আসবাবপত্রসহ তারা ভাড়া নিয়েছিল।
ফ্ল্যাটটির তেমন কিছুই আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, জায়গাটি ছিল অন্ধকার, হাওয়াহীন। আর সেখানে এমন কিছুই ছিল না যা সত্যি সত্যি তাদের বলে মনে হয়। শুধু স্কটের প্রথমদিককার বইগুলো, ছিল। সেগুলো হালকা নীল চামড়ার বাঁধাই করা। নাম লেখা ছিল সোনালি অক্ষরে।
স্কট আমাদের দেখাল একটি বড় খাতা। সেখানে প্রতি বছর ধরে তার প্রকাশিত গল্পগুলোর তালিকা, তাদের জন্য কত টাকা পেয়েছে, সিনেমার জন্য বিক্রি হয়েছে কি না, আর বই বিক্রি আর রয়্যালটির হিসাব— জাহাজের লগবুকের মতো যত্নে করে সব লেখা আছে।
সে এগুলো আমাদের দেখাল নির্লিপ্ত গর্ব নিয়ে, যেন সে কোনো জাদুঘরের কিউরেটর। স্কট নার্ভাস ছিল, কিন্তু আতিথেয়তাও দেখাচ্ছিল। তার উপার্জনের এই হিসাব সে এমনভাবে দেখাচ্ছিল যেন এটাই আসল দৃশ্য। অথচ জানালার বাইরে কোনো দৃশ্য ছিল না।
জেল্ডা আগের রাতে প্রচুর মদ খেয়েছে। তার প্রতিক্রিয়ায় মাথা ঝিম ঝিম করছে। আগের রাত মঁমার্ত্রে কাটিয়েছে তারা। স্কট মদ খেতে চাইছিল না বলে সেখানে ঝগড়া হয়েছিল। সে ঠিক করেছিল কঠোর পরিশ্রম করবে আর মদ্যপান করবে না। আর জেল্ডা তাকে দোষারোপ করছিল যেন সে আনন্দ নষ্টকারী বা উৎসবভঙ্গকারী।
এটাই ছিল তার ব্যবহৃত শব্দ। আর এ নিয়েই তর্কবিতর্ক চলছিল। মাঝে মাঝে জেল্ডা বলত, “আমি তো এটা করিনি, একদমই করিনি, সত্যি নয়, স্কট।” আবার হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেলে খুশি হয়ে হেসে উঠত।
এই দিনে জেল্ডা তার সেরা রূপে ছিল না। তার সুন্দর গাঢ় সোনালি চুল নষ্ট হয়েছিল, লিয়ঁ শহর, খারাপ এক কৃত্রিমভাবে চুল কোঁকড়ানো করানোর কারণে। সে সময় বৃষ্টি হচ্ছিল বলে গাড়িটা ফেলে আসতে হয়েছে। । তার চোখ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, মুখটাও ছিল টান টান ও অবসন্ন।
সে আমাদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করছিল, কিন্তু তার বড় একটা অংশ যেন অনুপস্থিত ছিল। যেন এখনো আগের রাতের পার্টিতেই পড়ে আছে। জেল্ডা আর স্কট দুজনেই মনে করছিল, লিয়ঁ থেকে ফেরার পথে স্কট আর আমি দারুণ সময় কাটিয়েছি। এ কারণে জেল্ডা ঈর্ষান্বিত ছিল।
সে স্কটকে বলল, “যখন তোমরা দু’জনে একসঙ্গে এত সুন্দর সময় কাটাতে পারো, তখন আমারও ন্যায্য অধিকার আছে এখানে প্যারিসে আমাদের ভালো বন্ধুদের সঙ্গে একটু আনন্দ করার।”
স্কট ছিলেন নিখুঁত অতিথিপরায়ণ। আমরা ভীষণ বাজে এক লাঞ্চ খেলাম, যেটি কিছুটা হলেও ওয়াইন সামলে দিল। তাদের ছোট মেয়ে ছিল স্বর্ণকেশী, গোলগাল মুখ, শক্তসমর্থ গড়ন, আর দেখতে বেশ সুস্থ। সে ইংরেজি বলত গাঢ় ককনি উচ্চারণে।
স্কট বুঝিয়ে বলল, তার জন্য একজন ইংরেজ ন্যানি রাখা হয়েছে। কারণ সে চায় মেয়ে বড় হয়ে লেডি ডায়ানা ম্যানারস–এর মতো কথা বলুক।
জেল্ডার চোখ ছিল বাজপাখির মতো, ঠোঁট পাতলা, আর আচার-আচরণে ছিল গভীর দক্ষিণের স্বভাব ও উচ্চারণ। তার মুখের দিকে তাকালে বোঝা যেত, তার মন হঠাৎ টেবিল ছেড়ে চলে যাচ্ছে পার্টিতে, আবার ফিরে আসছে শূন্য চোখে, তারপর খুশি হয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
স্কট অতিথিপরায়ণ ভঙ্গিতে হাসিখুশি ছিল। আর জেল্ডা সে সময়ে তার দিকে তাকাত, হাসত। তার চোখে-মুখে খুশি ফুটে উঠত যখন স্কট ওয়াইন খেত। আমি সেই হাসি খুব ভালো করেই শিখে চিনেছিলাম। এর মানে ছিল—সে জানে স্কট লিখতে পারবে না।
স্কটের কাজকে জেল্ডা হিংসা করত। আমরা তাদের চেনার পর দেখলাম, এটি এক নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
স্কট প্রতিজ্ঞা করত—সে আর রাতভর পার্টি করবে না। প্রতিদিন একটু ব্যায়াম করবে, নিয়মিত কাজ করবে। সে কাজ শুরু করত। আর যতক্ষণে ভালোভাবে কাজ শুরু করত তখন জেল্ডা অভিযোগ শুরু করত। বলত, সে বিরক্ত হচ্ছে। তারপর তাকে আবার মাতাল পার্টিতে টেনে নিত।
তারা ঝগড়া করত। আবার মিলও করত। এরপর স্কট আমার সঙ্গে লম্বা হাঁটায় বেরোত, ঘাম ঝরাত, শরীর থেকে অ্যালকোহল বের করত। তখন বলত, এবার সত্যিই কাজ করবে। আর সত্যিই ভালোভাবে শুরু করত। তারপর আবার একই চক্র শুরু হয়ে যেত।
স্কট জেল্ডাকে খুব ভালোবাসত। এবং সে নিজেও খুব ঈর্ষান্বিত ছিল। হাঁটার সময় বারবার আমাকে বলত, কীভাবে জেল্ডা একবার ফরাসি নৌবাহিনীর এক পাইলটের প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে আর কোনো পুরুষ তাকে সত্যিই ঈর্ষান্বিত করতে পারেনি।
কিন্তু এবার, এই বসন্তে, জেল্ডা তাকে অন্য নারীদের কারণে হিংসান্বিত করছিল। মঁমার্ত্রের পার্টিগুলোয় স্কট ভয়ে থাকত। সে ভয় পেত, যদি সে অজ্ঞান হয়ে যায় বা জেল্ডা অজ্ঞান হয়ে যায়।
তাদের প্রধান প্রতিরক্ষা সবসময়ই ছিল এটাই—মদ খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। তারা এত মদ বা শ্যাম্পেন খেত, যা অভ্যস্ত কারও জন্য সামান্যই। কিন্তু তারা ঘুমিয়ে পড়ত শিশুদের মতো। আমি দেখেছি তারা অচেতন হয়ে যেত, যেন মদ্যপ নয়, বরং অজ্ঞান করার ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তখন বন্ধুরা বা ট্যাক্সিচালক তাদের বিছানায় নিয়ে যেত। আর ঘুম থেকে উঠেই তারা সতেজ, সুখী হয়ে উঠত। শরীরের কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই অচেতন হয়ে যেত বলে।
কিন্তু এবার তাদের সেই স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা হারিয়ে গিয়েছিল। এখন জেল্ডা স্কটের চেয়ে বেশি মদ খেতে পারত। স্কট ভয়ে থাকত, জেল্ডা যদি অচেতন হয়ে পড়ে, বিশেষত তাদের সেই বসন্তের সঙ্গ আর জায়গাগুলোয়।
স্কট নিজেও পছন্দ করত না সেসব জায়গা, সেসব মানুষকে। অথচ সেখানে টিকে থাকতে হলে তাকে নিজের সীমার বাইরে মদ খেতে হতো। অনেক সময় শুধু জেগে থাকার জন্যই মদ খেতে হতো। ফলে কাজ করার সময় প্রায় আর থাকত না।
সে সবসময় চেষ্টা করত কাজ করতে। প্রতিদিন চেষ্টা করত, ব্যর্থ হত। ব্যর্থতার কারণ হিসেবে সে দোষারোপ করত সে প্যারিসকেই—যে শহর আসলে একজন লেখকের জন্য সেরা জায়গা। সে ভাবত, নিশ্চয়ই এমন একটি জায়গা আছে যেখানে সে আর জেল্ডা আবার ভালো জীবন শুরু করতে পারবে।
সে স্বপ্ন দেখত রিভিয়েরার। তখনও জায়গাটি অত নির্মিত হয়নি। সেখানে ছিল নীল সমুদ্রের ফালি, বালুকাবেলা, পাইন বনের টানা অংশ, আর এসতেরেলের পাহাড়, যা সমুদ্রের দিকে নেমে গেছে।
সে মনে করত সেই সময়কে, যখন সে আর জেল্ডা প্রথমে সেখানে গিয়েছিল। তখন এখনকার মতো ভিড় জমেনি গ্রীষ্মে।
স্কট আমাকে বলত রিভিয়েরা নিয়ে। বলত, আমি আর আমার স্ত্রীকে পরের গ্রীষ্মে সেখানে আসতে হবে। সে আমাদের জন্য সস্তা জায়গা খুঁজে দেবে। আমরা দু’জন কাজ করব, প্রতিদিন সমুদ্রে সাঁতার কাটব, সৈকতে শুয়ে রোদে কালো হব। দুপুরের আগে এক গ্লাস, আর রাতের আগে এক গ্লাস—শুধু এপারিটিফ খাব।
সে বলত, জেল্ডা সেখানে সুখী থাকবে। সে সাঁতার ভালোবাসে, সুন্দর ডাইভ করতে পারে। সেই জীবনে সে খুশি থাকবে। তখন চাইবে স্কট কাজ করুক। সবকিছু নিয়মমাফিক হবে।
সে বলল, ওরা এই গ্রীষ্মেই সেখানে যাবে। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যেন গল্পগুলো যতটা সম্ভব ভালোভাবে লেখে, কোনো ফর্মুলায় ফেলে না। যেমনটা সে নিজেই আমাকে স্বীকার করেছিল যেভাবে লিখতে হবে।
আমি তাকে বলেছিলাম, “তুমি এখন ভালো একটা উপন্যাস লিখেছো। এখন বাজে কিছু লিখো না।”
সে বলল, “কিন্তু উপন্যাসটা বিক্রি হচ্ছে না। আমাকে গল্প লিখতে হবে। আর গল্পগুলো এমন হতে হবে, যেগুলো বিক্রি হবে।”
আমি বললাম, “যতটা পারো সেরা গল্প লেখো। যতটা পারো সরাসরি লেখো।”
সে বলল, “আমি তাই করব।”
কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, কিছু কাজ করতেই পারলে সেটাই হবে তার ভাগ্য।
জেল্ডা দাবি করত, সে অন্যদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক করছে না। শুধু মজা পাচ্ছে। কিন্তু এতে স্কট হিংসান্বিত হত। তাকে সেই জায়গাগুলোতে যেতে হতো জেল্ডার সঙ্গে। আর এতে তার কাজ ভেঙে যেত। জেল্ডা তার কাজের চেয়েও বেশি কিছুর প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল না।
সেই দেরি বসন্ত আর শুরুর গ্রীষ্মে স্কট লড়াই করেছিল কাজ করার জন্য। কিন্তু কেবল টুকরো টুকরো সময়েই লিখতে পেরেছিল।
আমি যখন তাকে দেখতাম, সে সবসময়ই হাসিখুশি থাকত। কখনও মরিয়া হয়ে আনন্দ দেখাত। রসিকতা করত, ভালো সঙ্গী ছিল। খুব খারাপ সময় এলে আমি তার কথা শুনতাম। তাকে বোঝাতে চাইতাম—যদি সে নিজেকে সামলাতে পারে, তবে সে লিখতে পারবে যেমনটা সে জন্মগতভাবে পারে। আর মৃত্যু ছাড়া কিছুই চূড়ান্ত নয়।
সে তখন নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করত। যতক্ষণ সে তা করতে পারত, আমি ভাবতাম সে নিরাপদ।
এসবের মাঝেও সে একটি ভালো গল্প লিখেছিল—দ্য রিচ বয়। আমি নিশ্চিত ছিলাম, সে আরও ভালো লিখতে পারবে। পরে যেমন লিখেছিলও।
গ্রীষ্মে আমরা স্পেনে ছিলাম। আমি একটি উপন্যাসের প্রথম খসড়া শুরু করলাম। সেপ্টেম্বরে প্যারিসে ফিরে এসে শেষ করলাম।
স্কট আর জেল্ডা তখন ক্যাপ দ’অঁতিবে ছিল। শরতে যখন আবার স্কটকে দেখলাম --সে বদলে গিয়েছে।
রিভিয়েরায় সে কোনো শোধরানো জীবন কাটায়নি। এখন দিনে যেমন, রাতে তেমন মাতাল থাকত। আর এখন আর কিছু যায় আসত না—কে কাজ করছে, কে করছে না।
সে মাতাল অবস্থায় দিনে বা রাতে, যেকোনো সময় আসত ১১৩ রু নোত্র-দাম-দে-শঁ এ।
সে ক্রমশ উদ্ধত হয়ে উঠেছিল—যাদের সে নিজের নিচু স্তরের মনে করত, তাদের সঙ্গে।
একবার সে ছোট মেয়ে নিয়ে এলো, কারণ ন্যানির ছুটির দিন ছিল। সিঁড়ির গোড়ায় মেয়ে বলল, তার বাথরুমে যেতে হবে। স্কট তাকে জামাকাপড় খোলাতে শুরু করল। তখন নিচতলায় থাকা বাড়িওয়ালা এসে বলল, “মসিয়ে, সিঁড়ির বাঁ দিকে সামনে একটা ক্যাবিনে দ্য তোয়ালেত্ত আছে।”
স্কট বলল, “হ্যাঁ, আর সাবধান না হলে তোমার মাথাটাও ওখানেই রাখব।”
সারাটা শরৎ জুড়ে সে কঠিন হয়ে উঠল। কিন্তু মাঝেমধ্যে উপন্যাসের কাজ করত, যখন মাতাল থাকত না। এ অবস্থায় অবস্থায় দেখা হলে সে সবসময় ভদ্র ছিল, রসিকতাও করত, মাঝে মাঝে নিজেকেও নিয়ে মজা করত। কিন্তু মাতাল হলে সে আমার কাজের ক্ষতি করত—যেমন জেল্ডা তার কাজের ক্ষতি করত।
এটা বহু বছর চলেছিল। কিন্তু অমদ্যপ অবস্থায় আমার এর চেয়ে বেশি অনুগত বন্ধু আর কেউ ছিল না।
১৯২৫ সালের সেই শরৎ এল বিপত্তি নিয়ে। কারণ আমি তাকে আমার উপন্যাস The Sun Also Rises–এর প্রথম খসড়া পড়তে দিইনি। আমি বুঝিয়ে বলেছিলাম, খসড়াটি তখন কিছুই বোঝাবে না, যতক্ষণ না আমি তা কাটছাঁট ও পুনর্লিখন করি। আমি চাইনি তখন কারও সঙ্গে আলোচনা করতে।
আমরা ভোরআর্লবার্গের শ্রুনসে চলে গিয়েছিলাম প্রথম তুষারপাত নামার সঙ্গে সঙ্গে। আমি সেখানে পাণ্ডুলিপির প্রথমার্ধ পুনর্লিখন করলাম, জানুয়ারিতে শেষ করি। নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাই, স্ক্রিবনার্স-এর ম্যাক্স পারকিন্সকে দেখাই। আবার শ্রুনসে ফিরে গিয়ে বইটি শেষ করি।
যতক্ষণ না সম্পূর্ণ পুনর্লিখিত পাণ্ডুলিপি এপ্রিলের শেষে স্ক্রিবনার্সে পাঠানো হয় ততক্ষণ স্কট বইটি দেখেনি। আমি তাকে এ নিয়ে ঠাট্টা করেছিলাম। সে চিন্তিত ছিল, সাহায্য করতে চেয়েছিল, যেমন সবসময় করে। কিন্তু আমি তখন সাহায্য চাইনি।
আমরা ভোরআর্লবার্গে থাকাকালে স্কট, জেল্ডা আর তাদের মেয়ে প্যারিস ছেড়ে পিরেনিসের এক স্পা টাউনে চলে গিয়েছিল। জেল্ডা তখন অসুস্থ ছিল—অতিরিক্ত শ্যাম্পেনের কারণে পরিচিত অন্ত্রের অসুখে। তখন এর নাম দেওয়া হতো কোলাইটিস।
স্কট মদ খাচ্ছিল না, কাজ শুরু করেছিল। সে চাইছিল আমরা জুন মাসে জুয়ান-লে-প্যাঁ–এ যাই। সেখানে আমাদের জন্য সস্তা ভিলা খুঁজে দেবে। এবার সে আর মদ খাবে না। সবকিছু পুরোনো দিনের মতো হবে। আমরা সাঁতার কাটব, রোদে পুড়ে কালো হব, সুস্থ থাকব। দুপুরের আগে এক গ্লাস, রাতে এক গ্লাস এপারিটিফই যথেষ্ট।
জেল্ডা সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। দুজনই ভালো ছিল। তার উপন্যাসও দারুণ এগোচ্ছিল। দ্য গ্রেট গ্যাটসবির নাট্যরূপ মঞ্চে সফল হচ্ছিল, সিনেমায় বিক্রি হবে। টাকার চিন্তা ছিল না। সবকিছু শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে।
আমি তখন মাদ্রিদে একা কাজ করছিলাম মে মাসে। সেখান থেকে তৃতীয় শ্রেণির কামরায় ট্রেনে করে জুয়ান-লে-প্যাঁ এলাম। টাকা ফুরিয়ে গিয়েছিল বোকামির কারণে, তাই হেনদায়েতে সীমান্তে শেষবার খেয়েছিলাম। বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম।
ভিলাটি সুন্দর ছিল। স্কটেরও কাছেই একটি দারুণ বাড়ি ছিল। আমার স্ত্রীকে দেখে খুব খুশি হলাম। সে ভিলাটা দারুণভাবে চালাচ্ছিল। আমাদের বন্ধুরাও ছিল। দুপুরের আগে এক গ্লাস এপারিটিফ খুব ভালো লাগল। তবে আমরা কয়েক গ্লাস বেশি খেলাম।
সেই রাতে ক্যাসিনোতে আমাদের স্বাগত জানাতে ছোট একটি পার্টির আয়োজন হলো। ম্যাকলিশরা, মারফিরা, ফিটজেরাল্ডরা, আর আমরা। কেউ শ্যাম্পেন ছাড়া শক্ত মদ খেল না। পরিবেশ ছিল হাসিখুশি। সত্যিই লেখার উপযুক্ত জায়গা মনে হচ্ছিল। শুধু একা থাকার অভাব ছাড়া আর সবই ছিল।
জেল্ডা তখন খুব সুন্দরী। তার গায়ের রঙ সোনালি হয়ে পুড়ে গিয়েছিল। চুলও ছিল গাঢ় সোনালি। সে খুব বন্ধুবৎসল ছিল। তার বাজপাখির মতো চোখ ছিল পরিষ্কার আর শান্ত। আমি জানতাম, সব ঠিক আছে।
তখন সে হঠাৎ আমার দিকে ঝুঁকে তার এক মহা-গোপন কথা বলল, “আর্নেস্ট, তুমি কি মনে করো না, আল জোলসন যীশুর থেকেও মহান?”
তখন কেউ এ নিয়ে কিছু ভাবেনি। এটা ছি্ল জেল্ডার গোপন কথা , যা সে আমার কাছে শেয়ার করেছিল—এমনভাবে করেছিল যেন কোনো বাজপাখি কোনো মানুষের কাছে কিছু শেয়ার করেছে।
কিন্তু বাজপাখিরা শেয়ার করে না।
স্কট আর কোনো ভালো লেখা লিখতে পারেনি, যতক্ষণ না সে নিশ্চিত হলো যে জেল্ডা পাগল হয়ে গেছে।


0 মন্তব্যসমূহ