রাখির খুব ইচ্ছে হয়েছিল বিদায়ের সময় কোনো এক আড়ালে দেবাশ্রুকে একটা চুমু খেতে। পুশকিনের মত কোকড়া দাড়ি সারা মুখে। গোঁফে ঢাকা পড়া আঁকা ঠোঁট। মানুষটাকে মানায় হাতে যদি তুলি থাকে। না, ক্যামেরা। ফুলস্লিভ শার্টের হাতা ভাঁজ করে কনুই পর্যন্ত গুটানো। হাতা গুটানো শার্টে মানুষকে এতো সুন্দর লাগে রাখি ওর আগে কাউকে দেখেনি। হ্যাঁ, ইচ্ছে ছিল নাকি চারুকলায় পড়া। আর্থিক অনটনে পারেনি। বড়লোক বন্ধুর প্রায় ফেলে দেয়া পুরোনো মডেলের ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে রোজগার শুরু। আগ্রা ফোর্টের বুলান্দ দারোয়াজার আড়ালে আলোছায়ার ঝরোকায় বসে রাখি ওর হাতে হাত রেখেছিল।
‘অশ্রু বলে আমার এক বন্ধু আছে ঢাকায়। মানুষের নাম কেন অশ্রু হবে?’ রাখি ওর ঘামে ভিজে ওঠা হাত দেবাশ্রুর হাতের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে ঘাড়ে মাথা রেখে জিজ্ঞাসা করেছিল।
‘আমার জন্মের দুমাস পর আমার বাবা মারা যান ক্যান্সারে। দুখি মায়ের অনাথ ছেলের নাম আর কী হতে পারে?’
‘দেবতারা বুঝি কাঁদে?’
‘তোমার মুখের পরে, বুকে, নাতিশীতল হৃদয়ে
আমারি চোখের অশ্রু, অকস্মাৎ স্খলিত বিন্যাস
দুঃখের মুকুর তুমি অন্ধকারে আমার সান্ত্বনা।’
‘শক্তি আমারও প্রিয় কবি। এতো সুন্দর আবৃত্তি করো তুমি? কোথাও শিখেছ?’
কিছু বলে না দেবাশ্রু। চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করে।
রাখি ওর এনজিওর কাজে একটা জরিপের জন্য দিল্লি গিয়েছিল। আগ্রা যাবে না, তাজ দেখবে না সেকি হয়? সেই প্রথমবার ওর তাজ দেখা। রাখি আগাগোড়াই একা ঘুরতে ভালোবাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির রেজাল্ট ওর ছিল না। ও পড়াতে পছন্দও করে না। এনজিওর কাজ ওকে টানতো। একটাতে শুরুও করেছিল কিন্তু কমিউনিকেশনের ওপর কমনওয়েলথ এর একটা বৃত্তিও জোগাড় করে ফেললো। ওখানে কোর্স শুরু হতে মাস ছয়েক বাকি। এরই মধ্যে তাজ দেখার সুযোগ। দেখা হলো দেবাশ্রুর সাথে। দেবাশ্রু আর তাজমহলে কোনো মিল নেই কিন্তু রাখির মনে পড়লো ওর মাতামহীর পলেস্তারা ওঠা দেয়ালে টাঙানো জরির সুতোয় কাজ করা একটা ফ্রেমের কথা। লেখা ছিল ‘তাজমহলের মর্মরে গাঁথা কবির অশ্রুজল’। খুব ছোটবেলায় ও লেখাটার মানে বুঝতো না কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসাও করেনি। মর্মর যে পাথর তা ও জানতো না। ওর ধারণা ছিল বানানটা ভুল লেখা হয়েছে। হবে আসলে মর্ম। মর্ম হলেই না অর্থটা সুন্দর হয়! রাখি হাসতে হাসতে দেবাশ্রুকে গল্পটা বলেছিল। দেবাশ্রু ওর অন্তত পয়তাল্লিশটা ছবি তুলেছিল। পুরো এক রিল। তাজমহলকে সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে রেখে বিভিন্ন কোণ থেকে ওর ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছিল। তিনদিন দেবাশ্রু আর কারো ছবি তোলেনি। তাজের ধবধবে গায়ে হাত দিয়ে বলেছিল-
‘বোকা মেয়ে, এই যে দেখো, এটাই মর্মর পাথর’
‘কিন্তু আমার যে এখনো মর্ম বলতেই ভালো লাগে। মর্মরে যাদের অশ্রুজল ঘামজল জমে আছে তারা তো কেউ কবি নয়। তারা শ্রমিক। যার স্বপ্নে গড়া সে কবি হতে পারে, তার মর্মে অশ্রু থাকতে পারে কিন্তু তাজের ভাঁজে তার আনন্দ’
‘এতো বিশ্লেষণে গেলে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে না। কাল সকালে তোমাকে ‘সুভা কি তাজ’ দেখতে বলছি, আর রাতে পূর্ণিমার তাজ’।
খুব ভোরে দেবাশ্রু ওর মোটরবাইকে হেলান দিয়ে হোটেলের চত্ত্বরে দাঁড়িয়েছিল। সেই ফুলস্লিভ গুটিয়ে হাফহাতা বানানো অস্থিরতাহীন ক্যামেরার যুবক। রাখি প্রথমদিন একা একা ঘুরছিল ফতেপুর সিক্রিতে। সত্যি বলতে কি তাজের চেয়েও ফতেপুর সিক্রি রাখির বেশি ভালো লেগেছিল। ওর কাছেও ছোট একটা ক্যামেরা ছিল। ওটাতেই যতটুকু আসে ধরার চেষ্টা। আকবরের বিবিদের জন্য বানানো মহলগুলো বিবিদের নিজের ধর্ম অনুযায়ী তৈরি। তবে যোধামহল সবার সেরা। ওটার সামনে গিয়ে ছবি তুলতে গেলে কে যেন পেছন থেকে বলে –
‘অনুমতি দিলে আমি ক’টা তুলে দিতে পারি আপনাকেসহ’।
দেবাশ্রু। যেন আলেক্সান্ডার পুশকিন। রাখির প্রিয় লেখক। দেবাশ্রু সেদিন দুপুর থেকে ভিজিটিং আওয়ার শেষ হওয়া অব্দি রাখির সাথে। ওরা যখন সন্ধ্যায় কফি শপে বসে কফি খাচ্ছিল তখন রাখি চিনির পট এগিয়ে দিয়ে বললো-
‘চিনি খাও?’
‘খাই না তবে তুমি দিলে খাবো’।
‘চিনি কিন্তু একধরনের বিষ’ – বলে হাসলো রাখি।
দেবাশ্রু কাপের চিনি নাড়ে আর রাখির মুখের পানে তাকিয়ে বলে-
‘যতই হাসি দিয়ে দহন করে
ততই বাড়ে তৃষা প্রেমের তরে
প্রেম অমৃতধারা যতই যাচি
ততই করে প্রাণে অশনি দান’
ওরা একে অন্যকে খুব সহজে তুমি ডেকে বসলো। এমন সহজ যেন ঢেউয়ের আঘাতে বালিয়াড়ি ভাঙার মত।
রাখি চটপট একটা টপ আর জিন্স পরে নেমে এলো। গতকাল শাড়ি পরেছিল। কিন্তু এতো বাতাস ছিল যে শাড়ি সামলে চলাই দায় হয়ে পড়েছিল। উড়তে থাকা আঁচলসহ দেবাশ্রু বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছিল। ও পাঠাবে প্রিন্ট করে একমাসের মধ্যেই। সত্যি বলতে কি ‘সুভা কি তাজ’ রাখিকে বিস্মিত করতে পারেনি। কুয়াশার মধ্যে তাজমহলকে শাদা মসলিনে ঢাকা এক বিষণ্ন তুষারকন্যা মনে হয়েছিল। দেবাশ্রু অবশ্য বলেছিল-
‘সেও তো একধরনের সৌন্দর্য। তোমার উপমাটা ভালো। আমি তো মাকে শাদা শাড়ি ছাড়া দেখিনি তাই আমার মনে হয় মা সকালে পুজো সেরে যখন মাথায় তেকোণা ঘোমটা টেনে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে – অনেকটা সেরকম’।
রাখি মুগ্ধ হয়। তবে চাঁদের আলোর তাজ অনবদ্য। মর্মরের খাঁজে খাঁজে আলো পড়ে হিরের দ্যুতি ছড়ায়। মনে হয় হিরে বসানো তাজ ঝলমল করছে।
রাখি বলে ‘এরপর কোনোদিন এলে তোমার মায়ের সাথে দেখা করে আসবো’
‘মানে আবার আসার বীজ বোনা যায়না যমুনার মরা চরে?
চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়ায়, সদা মনে হয় যদি দেখা পাই,
‘কে আসিছে’ বলে চমকিয়ে যাই কাননে ডাকিলে পাখি’
রাখি, হায় কী আশায় রাখি?’
সেই আলো আঁধারিতে লাল প্রত্মের আবির মেখে কাঁধে মাথা রেখে রাখি চেয়েছিল দেবাশ্রুকে একটা চুমু খেতে।
দেশে ফিরে এসে রাখি দুটো চিঠি পেয়েছিল দেবাশ্রুর। নিজে তিনটে লিখেছিল। আর অপেক্ষায় ছিল ছবিগুলোর। প্রথম প্রথম ওর মনে হতো সব ছেড়েছুঁড়ে দেবাশ্রুকে নিয়ে ওখানে ঘর বাঁধে। দিল্লির একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খোঁজখবরও শুরু করেছিল। রাখির উদ্ভট বাসনাগুলোকে ওর আব্বা-আম্মা সবসময় সমর্থন না করলেও মেয়ের জেদের কাছে হার মানতে হয়েছে। দিল্লিতে ভর্তির কথা শুনে বাবা বলেছিল ‘কমনওয়েলথ থেকে কী জানায় আগে সেটা দেখো’। সেই এক ঘোর বরষার রাতে বিছানায় বসে রাখি বাবার ঘাড়ে মাথা রেখে আওড়েছিল মেঘদূত-
‘মেঘালোকে ভবতিসুখিনোহপান্যথাবৃত্তি চেতঃ
কণ্ঠাশ্লেষপ্রণয়িনি জনে কিং পুনর্দূরসংস্থে’।
যদিও প্রেমে পড়া রাখির এই প্রথম নয় তবুও দুর্লভ দূরতমের জন্য এমন অস্থিরতা আর কারো জন্য বোধ করেনি। বাবা হয়তো কিছু একটা আঁচ করেছিল কিন্তু কিছু না বলে মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে গিয়েছিল। তার খেয়ালি মেয়েটার কখন যে কী হয়!
দিল্লিতে ভর্তির অনুমতি আসার আগেই কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশান থেকে আমন্ত্রণপত্র চলে এলো। রাখি ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’র দোলাচলে থেকে দেবাশ্রুকে চিঠিতে জানিয়ে উড়াল দিল লন্ডনে।
**
রাখি লন্ডনে চলে আসার কদিন পরেই ওর মা জানিয়েছিল কোলকাতা থেকে একটা প্যাকেট এসেছে। সম্ভবত দেবাশ্রুর পাঠানো ছবিগুলো। ওর হাতে পৌঁছাতে আরও দু’মাস লেগে গেল। সব ছবি পাঠায়নি দেবাশ্রু। ধন্যবাদ জানিয়ে দেবাশ্রুকে একটা চিঠি দিয়েছিল রাখি। ততদিনে ওর বিষাদের মেঘ সরে গিয়ে লন্ডনের শরৎ মিঠে রোদ ছড়াচ্ছিল। দেবাশ্রু তার ধন্যবাদের কোনো জবাব দেয়নি। যোগাযোগও অন্তিম চাঁদের মত কখন বাঁশবনের চিকন পাতার সাথে ঝরে পড়েছে। রাখি দেবাশ্রুর দক্ষ কুশলী শিল্পময় হাতে তোলা অসাধারণ ছবিগুলো দেয়ালে-টেবিলে সাজিয়ে রেখেছিল। পেশাদারিত্বের সাথে প্রেম না মিশলে এমন ছবি তোলা সম্ভব নয় বলেছিল ওর বৃটিশ বর দু’বছর পর। রাখি ছবিগুলোতে ধুলো জমতে দিত না। ছবিগুলো মুছতে মুছতে বাংলা না বুঝা, শিল্প নিয়ে অতো মাথা না ঘামানো একজন মানবিক মানুষের মুখের পানে তাকিয়ে ও সুনীল মেলে দিত -
‘পেছনে তাকাই আর দেখা যায় না
জ্যোৎস্না নেই বোবা কালা অন্ধকার
শুকনো পাতার শব্দ…
সেই পথ দিয়ে ফিরে যাওয়া, ফিরে যেতে যেতে যেতে।
কই, কেউ তো ছিল না’
কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশান তাদের বিশেষ ফেস্টিভ্যালগুলোতে রাখিকে বরাবরই নিমন্ত্রণ করতো। ওর অর্থনীতিবিদ বর আর কলেজ পড়ুয়া ছেলে আগে কালেভদ্রে সঙ্গ দিলেও ইদানিং রাখি একা যেতেই ভালোবাসে। এশীয় আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছিল। তিনদিনের প্রথমদিন প্রদর্শনীর ছবির ওপর আলোচনা, পুরস্কার প্রদান ও শিল্পী সমাগম। দ্বিতীয় ও শেষদিন আমন্ত্রিত ও অভ্যাগতদের জন্য উন্মুক্ত। রাখি আস্তে ধীরে শেষদিন গেল। প্রদর্শনী হলের দোরগোড়ায় পুরস্কারপ্রাপ্তদের ছবিগুলোর দিকে এগিয়ে নাকের ওপর চশমা তুলে যার ছবি দেখতে পেল, সে দেখতে খানিকটা অবনঠাকুরের আঁকা বিরহী যক্ষের মত। ওটা দেবাশ্রু? নিশ্চয় সে দেবাশ্রু। অথবা দেবাশ্রুর মতই কেউ। রাখির পা আটকে গিয়েছিল ছবির সামনে। কাঁপা পায়ে হলের মধ্যে প্রবেশ করে একটা ছবির কাছে গিয়ে অচঞ্চল দৃষ্টিতে চঞ্চল হয়ে উঠলো সে। তাজমহলের চূড়ায় আটকে আছে তারই মাইসোর সিল্কের আঁচল। যেন এক ডানাওয়ালা তাজমহল। আঁচলের মেয়েটি পেছন থেকে খাজুরাহোর নারীমূর্তি, অতৃপ্ত যৌনতার বিলোল প্রতিমা।


1 মন্তব্যসমূহ
খুব সুন্দর গল্পটা, পড়ে ভাল লাগল
উত্তরমুছুন