শাশ্বত নিপ্পনের গল্প : জয়নালের ধূসর এক গল্প


জেলে যাওয়া মানুষকে কেউ মনে রাখে না। আমাকেও কেউ মনে রাখেনি এই সুদীর্ঘ সময়। এতদিন আমার মতো এক জয়নালকে মানুষ মনে রাখবেসেটা আশা করাও অবশ্য ভীষণ বাড়াবাড়ি। এখন এখানে আমাকে কেউ চেনে না, পুরনো মানুষেরা ছাড়া। এই তো গেল মঙ্গলবার সকালে, মন্টুর চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে সবে বিড়িটা ধরিয়েছি, অমনি একটা চ্যাংড়া টাইপের ছেলে, আমাকে উঠে গিয়ে বিড়ি খেতে বলল। জয়নাল ভাই, কবে আইলে, জিজ্ঞেস করল মন্টু চা দেওয়ার সময়। শরিল ভালো? আমি নিঃশ্চুপ থাকি।

এখন কার্তিক মাস। কার্তিকের সকালে হয় খুবই আলসে। আমি দেখি একটা কুড়ে সকাল কুয়াশার চাদর গায়ে দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা হয়ে। তার গায়ে এসে বসে শালিক। শালিকের মাথার চূড়া সূর্যের কমলা আভায় ঝলমল করে। মসজিদ থেকে আসে নামাজী মুসল্লীরা। মৃদু পায়ে হাঁটে। তাদের কারো কারো হাতে বিদেশি তসবিহ; সূর্যের কোমল আভায় তখনো তসবিহের সোডিয়াম জীবন্ত থাকে। কোথাও শব্দ করে গড়িয়ে পড়ে রাতের শিশির বিন্দু। আমি নির্বাক এই সকালকে দেখি। মনে মনে এই সকালের ভাষা পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি নিরক্ষর মানুষ, মূর্খ চাষা। তবে কার্তিকের সকালের ভাষা পড়ার জন্য বিদ্যালয়-এর বিদ্যা লাগে না। জয়নাল ভাই, তুমার কাছে ছত্রিশটা ট্যাকা পাওনা ছেল, জানাল মন্টু চায়ের কাপ নিতে এসে। ভেতরে ভাল ছিলি ভাই? আমি চুপ থাকি। মনে করার চেষ্টা করি আমার কোন পকেটে টাকা আছে। পঞ্চাশ টাকার একটা লালচে নোট। মন্টু চলে যায়।

কার্তিকের সকাল ঘন হয়। প্রাণ পেতে থাকে। নিস্তরঙ্গন পুকুর যেমন জেগে ওঠে শিশুদের ঢিল ছোঁড়া খেলার মধ্য দিয়ে। ঢিলের আঘাতে পুকুরের পানিতে জেগে ওঠা তরঙ্গ মালা, পৌঁছে যায় সর্বত্র, তেমনি সকালের আলো শালিকের মাথার চূড়ো থেকে ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। রাস্তা কাঁপিয়ে নছিমন, আলগামন ছোটে। আমি উঠে পড়ি। তারপর হাঁটতে থাকি। কী জয়নাল, কবে আসলি? শরিল ভাল? জিজ্ঞেস করে একজন।

আমার ভাঙা ঘরের সামনে একটা মরা লাউ-এর মাচা। রুপালি রোদে মাচাটায় গা এলিয়ে পড়ে থাকে। আমি সেই রুপালি রোদে বসি। বিড়ি জ্বালাই। মন্টু ছত্রিশের জায়গায় ত্রিশ টাকা রেখেছে। মানুষের স্মৃতি আছে এখনোআমি অবাক হই। স্মৃতি থাকে সব হারানো মানুষের। যারা বসে থাকে তাদের স্মৃতি থাকে। যেমন আমার স্মৃতি আছে। কিন্তু মন্টুর ব্যস্ত মানুষ। আমার মনে আছে আমাকে যেদিন পুলিশে নিল, সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল একঘেয়ে ভাবে। গত দুদিন ধরে বৃষ্টি লেগে ছিল। সেদিনের আকাশটা চামড়া ছেলা কচি তালশাঁসের মত ঘোলাটে দেখাছিল। হারেচার আধভেজা কাপড় বৃষ্টিভেজা সোঁদা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমার কাজ নেই গেল দুদিন। ছেঁড়া খেজুর পাটিতে তেলচিটে, শক্ত একটা বালিশ বুকে নিয়ে শুয়ে ছিলাম আর হারেচার আধভেজা শরীর দেখছিলাম। কাদা খেতখেতে উঠানের কোণে নাম মাত্র রান্না ঘরে হারেচা গত তিনদিন আগে কুড়িয়ে আনা পাতা জ্বালিয়ে চাল ভাজার চেষ্টা করছিল আর গজগজ করছিল, তিন দিন ধরি খালি পানি আর পানি; খানকীর ম্যাগের থামার কুনু নাম ন্যাই...। আমি আধ পোড়া আমপাতার ধোঁয়াটে গন্ধ পাই। সেই ধোঁয়ার সাথে ভেসে আসে হারেচার ভেজা শরীরের গন্ধ। আমি দেখি আর বুক ভরে হারেচার কোমরের ভাঁজ, গলা, বাহু আর বুকের গন্ধ নিতে থাকি। ঠিক তখনি পুলিশ এসেছিল গাড়ি নিয়ে। বাড়িতে কিডা আছেপুলিশ হাঁকে। হারেচা ভেজা কাপড়ে শরীর ঢাঁকে। ঘার উঁচু করে দেখার চেষ্টা করেতারপর পুলিশ দেখে ভয় পায়। বলে, পুলিশ এয়িচে ক্যানে? তুমাকে ডাক্চি...

ওরা, মানে পুলিশ, যখন আমাকে হাতকড়া পড়িয়ে, মাজায় মোটা দড়ি দিয়ে থানার ঘরের জানালার সাথে বেঁধে পেটাতে শুরু করল তখন বুঝলাম, আমি একটা খুন করেছি। খুন করে সেই লাশ কোথায় যেন ফেলে দিয়েছি। আমি অল্পক্ষণ পরই একটা অবসন্ন ঘোরে চলে গেলাম। তখনো হারেচা জানে না, আমি একটা খুন করেছি। তখনো হারেচা জানে না সে একটা খুনির সঙ্গে শোয়। সেই অবসন্ন ঘোরে আমি দেখতে পাই আকাশ জোড়া মেঘ; তালশাঁসের মতো ঘোলাটে মেঘ আমাদের পশ্চিম মাঠের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, বাতাস ছুটছে। সেই বাতাসে ঘর ফেরা বকের ঝাঁক সারিবদ্ধ ওড়ে। মাঠের গাঢ় কাদায় পা ডুবিয়ে খুনি জয়নালের বাবা হাবেল উদ্দিন শেখ, মাথাল মাথায়, পাছা উঁচু করে সবুজ ধানের চারা গেঁড়ে দিচ্ছে মাঠের ঘন গাঢ় থ্যাকথেকে কাদার মধ্যে। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাবিলউদ্দিন শেখ ফ্যাসফেসে গলায় বলে, জয়নাল বাড়ি যা, এখানে কি করিস...। আমি বৃষ্টির গন্ধ পাই! আমার নাকে ভেসে আসে ঘন গাঢ় কাদার গন্ধ। অনেক দিনপর আমি আব্বার গায়ের গন্ধ পাই।

আমি চোখ মেলি। আমার চোখ ভরে গেছে রক্তে। আমি সেই রক্তের মধ্য দিয়ে দেখি বাইরে একটা নিসঙ্গ লাইট; তার নিচে ধূসর কুয়াশা জমেছে। বিন্দু বিন্দু পোকা উড়ছে ওটাকে ঘিরে। লাইটটাকে লাল দেখায়। বুঝতে পারি এখন রাত। বাইরে নিঝুম নিঃস্তব্ধ অন্ধকার। তবে এখানে কেউ জেগে আছে। কেউ শব্দ করে চা খাচ্ছে। আমার বিড়ির তৃষ্ণাতে বুক ফেটে যায়।

আমি কোথায় আছি বুঝতে পারি না। আমার ঘরটা অন্ধকার। বাইরে থেকে এক চিমটে আলো ছিটকে এসে পড়ছে হিমধরা মেঝেতে। একটা দুর্গন্ধযুক্ত কম্বল, একটা ছোট পানির বোতল, কলার খোসা, একটা আধ খাওয়া বনরুটি। অন্য পাশে একটা নুতন বদনা, একটা ভাঙা বালতি, তাতে সামান্য পানি। গু-মুতের দুর্গন্ধ...আমি কি পেচ্ছাব করে ফেলেছি? মোটা লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস আসে। দুর্গন্ধময় ঘরে। আমি বিড়বিড় করি, চাল ভাজাগুলা দে হারেচা...আর চাচীদের বেড় থেকি একটা ঝাল নিয়ি আই... হারেচা আমি খুন করেচি জানিস... তুই আমার পাশে বস ক্যান্ত...। জুতোর শব্দ হয়। সেই শব্দ আমার ঘরের শিকের সামনে এসে থামে। শব্দ জোরে করে ধমক দেয়, ঐ শালার বিটা শালা... চুপ থাক... হারেচা তখনো জানে না আমি কোথায় আছি, কেমন আছি।

কার্তিক মাসের রোদ ক্রমেই তেতে ওঠে। আমি আবার বিড়ি জ্বালাই। আকাশের গায়ে ভাসমান মেঘ ফুঁড়ে সূর্যের ঝাঝালো আভা বাঁকা হয়ে এসে পড়ে আমার গায়ে। আমার ঠান্ডা গরম কিছুই লাগে না। জেলখানার অভ্যাস। কিন্তু চোখে রোদ সহ্য হয় না মোটেও। আলোতে আমি ঘোলা দেখি। অথচ লোকে স্পষ্ট দেখতে পায়। আমি চোখ নামিয়ে নিই। আর তখনি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে একটা ধূসর দেওয়াল। আমি দৌড়াচ্ছি। মাথার উপর খোলা আকাশ। সেই আকাশের গায়ে টাল খেতে খেতে উড়ে যাচ্ছে একটা নাটাই কাটা ঘুড়ি। আমি দৌড়াচ্ছি। শুধু আমি কেন দৌড়াচ্ছি আমরা। লক্ষ্য কাটা ঘুড়িযে আগে পাবে ঘুড়ি তার হবে....আমার পায়ের আঘাতে পিছনে চলে যাচ্ছে দীগন্তজোড়া মাঠ। আমি দৌড়াই দৌড়াই... রোদের ঝাঁঝে আমার সারা গায়ের মরা পাচড়াগুলো জেগে উঠে। জ্বালা করে।

হারেচা ডাক দেয়, ভেতরে আসেন, গোসলের পানি দিইচি। হারেচা আগে আমাকে ‘আপনি’ বলত না। এখন বলছে। আমি বাধ্য বালকের মত উঠি। আমি আপনার মাথায় পানি দিয়ি দিই, হারেচা বলে। আমি ওর দিকে তাকাই। রোদে আমার চোখ জ্বালা করে। হারেচা মাথায় গায়ে পানি ঢালে। ঠান্ডা পানি। আমার ঠান্ডা গরম লাগে না। হারেচা আমার পিঠ কাচলাতে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, আপনার পিঠে এ কিসের দাগ? মাইরের, আমি ভোতা গলায় উত্তর করি। হারেচা চুপ হয়ে যায়। আমার ঘুম পায়। খানিক পরে হারেচা আবার কথা বলে, এই ঘাগুলো কিসের? আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তবে জেলের মেট বলত, এই পচড়াগুলো ছোঁয়াচে না। আমি আবার সেই ধূসর দেওয়ালটা কে চোখের সামনে দেখতে পাই

আমি ঐ লোকটার গা টিপতাম। তার জন্য আমি শুতে পেতাম। পেতাম খাবার। রাত যত ঘন হত, আবার ডিউটি বাড়ত। আমাকে সারা শরীর ম্যাসেজ করতে হতো। লোকটার গায়ে ঘা ছিল। কাজ শেষে বমি করতাম। তারপর ধূসর দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখতাম, আমি জয়নাল, হাবিলউদ্দিন শেখের বেটা, আব্বার ঘারে চড়ে হাটে যাচ্ছি, হাটে ছোট ছোট দোকান, এককোণে পিঁয়াজু ভাজা হয়। আমার হাতে পেঁয়াজুহাটুরেদের পায়ের দাপটে হাটের আকাশে ধুলো মেঘ উড়ে; ঘর ফেরা বকের ঝাঁক নিয়ম মেনে উড়ে যায়ওদের পাখায় ঘরে ফেরার আনন্দ...

রাত যখন গাঢ় হয়, ঘরের মসৃণ দেওয়ালের ওপাশে দু-একটা জোনাক ওড়েতখন রাতের গন্ধ নামে। মরা সাপের মত পাংশু মেঘের রেখা জমতে শুরু করে রাতের আকাশের গায়ে, গুড়গুড় মেঘ ডাকেসেই ডাক আমার ধূসর দেওয়ালে ক্ষীণ কম্পন জাগায়তখন লোকটা আবার আসে। আমাকে জড়িয়ে শোয়... আমার পিছনে... আমি তখন হারেচার শরীরে গন্ধ পাই। হারেচার তলপেট, বুক আর বাহুর গন্ধে আমার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। ধূসর দেওয়ালে ভেসে উঠে লাউ-এর মাচানে সাদা লাউ, মৃদু হাওয়ায় দোল খায়। চাল ভাজার স্বাদ তখন আমার মুখ জুড়েযাকে আমি খুন করেছি তার মতোই অবসন্ন নিথর হয়ে যাই আমি।

শেষ বিকেলে জবেদা চাচী আসে। আমাকে দুধ দিয়ে যায় আধা কেজি। আমাকে ধরে কাঁদে। তারপর বলে, আমি তুমার জন্যি উজা রেকিলাম আব্বা। যেকানে তুমি ছিলি, সেকানে ভাল ছিলি তো বাপ...। আমি উত্তর না দিয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। দেখি বাষ্পের মত উড়ে যাচ্ছে বিকেল, গলিত মোমের মত নামছে হেমন্তের সন্ধ্যা।

রাত নামে। হিম জড়ানো গ্রামের রাত। আমি শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখি। কলা গাছের ছেঁড়া পাতার ফাঁকে একটা গোটা চাঁদ ঝুলে থাকে। একদল ঝি ঝি পোকা পাল্লা দিয়ে গলা ফাটায়। আমার ঘুম আসে না। আমি হারেচার শরীরের গন্ধ পাই। পুরনো টিনের চালে কি যে শব্দ করে হেঁটে যায়। হয়তো বিড়াল, মেকুর। হারেচা কাছে আসে। আমার গায়ে হাত রাখে। তারপর মাদক লাগা গলায় বলে, নেবেন? লাগবে আপনার? কী? ভোতা গলায় আমি জানতে চাই। হারেচা উত্তর করে না। আমার চোখে তখন ধূসর সেই দেওয়ালআমি দেখি একটা খসখসে শরীর আমাকে জড়িয়ে, একটা পাচড়া লাগা হাত আমার শরীর হাঁতরায়। আমি আচমকা জিজ্ঞেস করি, মায়ের কব্বরটা কুতাই জানি ছিলুরে? উত্তর আসে না। হালকা নাক ডাকার শব্দ রাতের আঁধারকে আরো ভারি করে তোলে।

আমি বাইরে এসে দাঁড়াই। আমার চারপাশে দগদগে ঘায়ের মত অন্ধকার। সেই অন্ধকারের গা বেয়ে কান্নার মত গড়িয়ে পড়ছে শিশির। শিশির পতনের শব্দে চূড়মার হচ্ছে নীরবতা। আমি অন্ধকারের গন্ধ পাই। আঁধার আমার বড় চেনা। আমি যেখানে থাকতাম সেখানে আলো-আঁধারের ফারাক বড়ই কম। মোটা লোহার শিকের ফাঁক গলে এক মুঠো আলো, এক পশলা রোদ ঝিলিক দিয়ে যেত আমার ঘরের কালো মেঝেতে। আমি লম্বা করে শ্বাস নিইআর তখনই আমার চোখে ভেসে উঠে ধূসর একটা মসৃণ দেওয়াল, যার ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মিশে আছে যন্ত্রণা, কান্না আর আইন। আমি জয়নাল খুনের আসামীএকজনকে খুন করেছিকোথায় কখন কেনআমি জানি না। সেই লাশ কোথায় ফেলেছি তাও জানি নাকিন্তু ওরা জানে। সেই অপরাধে ওরা আমাকে ইচ্ছে মতন মেরে এখানে রেখে গেছে। এই অপরাধে আমাকে প্রতি রাতে বমি করতে হয়, ধূসর দেওয়ালে দেখি প্রতি জুম্মাবারে ইমামছাব আসে। নামাজের আগে বয়ান করে। আমিও শেষ কাতারে গিয়ে বসি এবং নামাজ শেষ না করেই উঠে আসি।

এক সময় হুজুর আমার কাঁধে হাত রাখেন। তারপর বলেন, আল্লাহ তায়ালা শ্রেষ্ঠ রায় দাতা। আপনি তাঁর কাছে মুক্তি চান। আমি সব জানি, আমি আপনার জন্য সব জায়গায় দরখাস্ত করব। তবুও আমার নামাজে যাওয়া হয় না।

ঘরের পাশে কদম গাছের ডাল নড়ে ওঠে হঠাৎ। আমি চমকে ওঠি। চোখের সামনের বায়োস্কেপের পর্দার মতো ধূসর দেওয়ালটা দুলে ওঠে। আমি অন্ধকার দেখে সময় ঠাওর করি। আমার স্মৃতি ভালো, তারপরও মনে করতে পারি না আমার মায়ের কব্বরটা কোথায় ছিল। উঠানেই তো ছিল মনে হয়।

মনে পড়ে, আমার চলে আসার আগে সকালে কতগুলো চকচকে মানুষ এসে খাতির করে আমাকে ডাকল, ছবি তুলল, কীসব বলল। তারপর বলল, আপনি কাল ছাড়া পাবেন। কেন? আমি মুখ ফসকে বলে ফেলি।

রাতের বেলায় খসখসে লোকটা আসে। আমি মনে মনে বমির প্রস্তুতি নিই। লোকটা আমাকে জড়িয়ে ধরে, হু হু করে কেঁদে দেয়। তারপর বলে, জয়নাল আমাকে মাফ করি দে.... আমি বড় পাপী... আমি পাপ করেছি। আমি তাকিয়ে থাকি নির্বাক। তোকে কটা কথা বলি জয়নাল। আমি মনযোগ দিই। লোকটা বলে চলে, বিনা দোষে খেটে গেলি। হাশরের বিচারে আল্লা তর শাস্তি কম করবে। ভাগ্যের খেলা এমন হয় রে জয়নাল। আমিও প্রথম খুনটা করতে চাইনিহয়ে গিয়েছিল। আমি শুনতে থাকি।

শুনশান রাতে জুতোর শব্দ ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই। রাত জাগা পাখির ডাক এখানে পৌঁছে না। তবে আমি মাঝে মাঝে শেয়ালের হল্লা শুনতে পাই। লোকটার কথা আমার ঘরে ধূসর দেওয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। আমি সেই প্রতিধ্বনি শুনতে থাকি। লোকটা বলে, জয়নাল, তোর সব জানি আমি; তোর বউ হারেচা, পাশের বাড়ির জবেদার ছেলের সাথে চলে গিইল। পাঁচ-ছয় মাস ছ্যাল; এ্যকুন আবার ফিরি এইচে। তুই দুক্কু করিসনি। যদি পারিস বউকে মাফ করে দিস রে জয়নাল...

এই ট্যাকা গুলান রাখ। এসব তোর ইনকাম। আর আমাকেও মাফ করে দিস। ভাল কতা, তোর মুক্তির ব্যবস্থা করে আমাদের জেলখানার হুজুর ছাব। তার জন্যে দোয়া করিস... নামাজ পড়িস জয়নাল।

আমি আতরের গন্ধ পেতে থাকি। খসখসে লোকটা উঠে যায়। আমি ওর চলে যাওয়া দেখতে থাকি। বড় অসহায় লাগে ওকে। কিন্তু আমার যেতে ইচ্ছে করছে না কোথাও। আর যাবোই বা কোথায়? এই লোহার ঘর, ধূসর দেয়াল, কালো মেঝে, কম্বল, পায়খানা সব কিছুর ওপর কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে আমার। দীর্ঘ দিনের মায়া। চলে আসার সময় ক্যান্টিন থেকে আমাকে কিছু টাকা দিল। আমার পানি এনে দেওয়ার ইনকাম। ভদ্র লোকগুলাও আমার হাতে পরিস্কার কিছু টাকা তুলে দিল। টাকাগুলোর গায়ে কেমন অচেনা গন্ধ লেগেছিল।

হঠাৎ আমার ঘাড়ে গরম শ্বাস পড়ে। আমার ধ্যান ভাঙে। ধূসর দেয়ালটা দুলে ওঠে। আপনে বাইরি ক্যানে? হারেচা প্রশ্ন করে। জানতে চায়, রাতে আমি কেন ঘুমাই না? তারপর আমার পাশে বসে হারেচা। আমি অন্ধকার দেখি। নিঃসঙ্গ চাঁদের কান্না শুনি। কদম গাছের ফাঁক দিয়ে হেমন্তের আকাশে তারা দিপদিপ করে। হঠাৎই হারেচা কেঁদে ওঠে হুহু করে। ভাতের বলগের মত কান্নার বেগে হারেচার পিঠ বুক দুলে দুলে ওঠে, দুলতে থাকে। তার আচমকা কান্নার শব্দে ডানা ঝাপটে উড়ে যায় এক জোড়া পেঁচা। হারেচা আমার গায়ে মাথা রেখে কেঁদে চলে।

রাতের গায়ে হিম। কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভোর হতে বেশি দেরি নেই। চাঁদও নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে শামুকের মতো। কোথায় যেন শেয়াল ডাকে। আমি শূন্য চোখে শুধু তাকিয়েই থাকি, কিছু দেখি না। রাতের শেষ প্রহরে মেয়ে মানুষের কান্না চারপাশকে রহস্যময়তা গ্রাস করে। আমাদের চারপাশের এই রহস্য আমাকে আরো শূন্য করে তোলে। ·


লেখক পরিচিতি : শাশ্বত নিপ্পন গল্পকার। ‘অনতিক্রম’, ‘মেঘমল্লার’, ‘থমকে যাওয়া সময়ের গল্প’, ‘বৃত্তচ্যুত’ তার গল্পের বই। বসবাস করেন মেহেরপুরে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. ব্রতী মুখোপাধ্যায়২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ৪:৫৩ AM

    ভাল লাগল। খুব দক্ষ গল্পকার। সুঠাম গদ্য। সংযমও। কাহিনির সুন্দর বিন্যাস। ডার্ক কাহিনি।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ গল্প। খুব ভালো লাগলো। জয়নাল চরিত্রটি অসাধারণ হয়েছে।

    উত্তরমুছুন