অনুবাদ : ফারহানা আনন্দময়ী
কী তার নিয়তি, সেটা ফেলিসিটি বুঝতে পারল রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই। মানুষটি ওর জন্য অপেক্ষা না করেই চলে গেছে। বিগত সময়কে স্পর্শ করা যায়, ঠিক এরকম একটা অনুভবে সে যেন দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া তার গাড়ির পেছনের লালচে আলোটুকু দেখতে পেল। কান্ট্রিসাইডের গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে মাত্র দুটো হতাশাই ওকে ঘিরে ধরল; এক হলো ওর বিয়ের পোশাকটি, আর অপরটি হলো বাথরুমে সময়টা একটু বেশি নেয়া।
দরজার পাশে একটা পাথরের পরে বসে বসে, নিজের বিয়ের গাউনের সূচিকর্মতে বসানো শস্যদানাগুলো খুঁটছিল সে। ওর শূন্যদৃষ্টিতে খোলা প্রান্তর, হাইওয়ে আর পাশের বাথরুমটা বাদে আর কিছুই ছিল না।
দানাগুলো খুঁটে খুঁটে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে সময় গড়িয়ে গেল অনেকটা। প্রত্যাখ্যানের এই তীব্র আঘাতেও তার চোখে জল আসেনি। ভাজ হয়ে থাকা জামাটি সমান করে নিজের নখগুলো দেখল সে আর এমনভাবে হাইওয়ের দিকে তাকাল যেন মানুষটি ফিরে আসবে।
“তারাও আর ফিরে আসে না।“ নেনে বলল। শুনে ফেলিসিটি আর্তনাদ করে উঠল। “হাইওয়ে একটা অসহ্য ফালতু জিনিস।“
“একদম ফালতু। সবচেয়ে অসহ্য ধরনের।“ ফেলিসিটির পেছনে দাঁড়িয়ে লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলে উঠল নেনে।
মনের কষ্টটা গিলে ফেলে ফেলিসিটি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল, সে গাউনের স্ট্র্যাপটা ঠিকঠাক করল।
“এটাই প্রথম?” সন্ত্রস্ত ফেলিসিটিকে একটু সামলে নেবার সময় দিয়ে, নির্বিকার ওর দিকে তাকিয়ে থাকল নেনে। “মানে, বলছিলাম, এই লোক তোমার প্রথম স্বামী?”
জোর করে হাসল ফেলিসিটি। নেনের বয়স্ক এবং বিরক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সে আবিষ্কার করল, এই নারী একটা সময়ে ওর চেয়েও সুন্দর ছিল দেখতে। মুখের ত্বকে অকালবার্ধক্যের ছাপ পড়লেও, তার উজ্জ্বল চোখ আর নিঁখুত আকারের ঠোঁট এখনও সৌন্দর্যের প্রমান রাখছে।
“হুম, এটাই প্রথমবার।“ জড়তামিশ্রিত কণ্ঠ, যা তার বুকের ভেতর থেকে বেরলো।
হাইওয়েতে গাড়ির একটা সাদা আলো ওদের দুজনকে লাল আভায় উদ্ভাসিত করে পার হয়ে গেল।
“তো? তুমি তাহলে তার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকবে?” জিজ্ঞেস করল নেনে।
ফেলিসিটি হাইওয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল যেদিক দিয়ে ওর স্বামী ফিরতে পারে। নেনের প্রশ্নের উত্তর দেবার দায় বোধ করল না সে।
“দেখো, আমি খুব সংক্ষেপে বলছি কারণ এখানে এত বেশি কিছু বলবার নেই।“ আরেকটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে নেনে বলল, “অপেক্ষা করতে করতে এরা ক্লান্ত হয়ে যায় এবং ছেড়ে চলে যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা একসময় অবসন্ন করে তোলে।“
ফেলিসিটি সতর্কভাবে সিগারেটে ধোয়া ওঠা ওর মুখটা খেয়াল করছিল,তার ঠোঁট কীভাবে সিগারেটটা চেপে ধরে আছে, সেটা দেখছিল।
নেনে বলতে থাকল, “জানো তো, মেয়েরা কেঁদে কেঁদে শুধু অপেক্ষাই করতে থাকে তার জন্য। অপেক্ষা করে আর পুরো সময়টাই তাদের কাটে অপেক্ষায় অপেক্ষায়। শুধু কান্না, কান্না।“
ধুমপানরত নেনের দিকে আর তাকাল না ফেলিসিটি। একজন সদ্য বিবাহিত নারীর স্বামী তাকে একলা ফেলে চলে যাবার পরে হাইওয়ের পাশে একটা লেডিজ বাথরুমের সামনে বসে নারীটির মনের অবস্থা বুঝবার জন্য যখন সহমর্মী কারো কাঁধ দরকার; ঠিক এরকম সময়ে সে কি না পেল একজন মেজাজি মহিলাকে। এতক্ষন কথা বলেই যাচ্ছিল, এখন তো রীতিমত চিৎকার করছে।
“তারা কাঁদতেই থাকে, কাঁদতেই থাকে সারাক্ষণ, সারা রাত ধরে, প্রতিটা মিনিট।“
ফেলিসিটি গভীর একটা শ্বাস নিল, তার দু’চোখ জলে ভরে উঠল।
“সবকিছু গণ্ডগোল পাকিয়ে এরপর কাঁদতেই থাকে... তোমাকে বলব। এই-ই হয়। তোমাদের এইসব সমস্যা শুনে শুনে ক্লান্ত লাগে আমার। এই শোনো, কী যেন নাম বলেছ তোমার?”
ফেলিসিটি একবার ভাবল ওর নামটা বলবে। কিন্তু ও জানে যদি সে মুখ খোলে শুধু ডুকরে ওঠা কাঁন্নার আওয়াজই বেরোবে। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
“এই যে, তোমার নাম হলো..?”
ফেলিসিটি তার ডুকরে ওঠা কান্নাকে আটকে রাখতে পারছিল না।
“ফেলি...” সে খুব চেষ্টা করল নিজেকে সামলে নিতে, কিন্তু পারল না। এরপর কোনোমতে শেষ করল “সিটি” এটুকু বলে।
“আচ্ছা, ফেলিসিটি। আমি বলতে চাইছি যে, এখন এই অবস্থাটা আমরা ঠিক গুছিয়ে আনতে পারব না। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।“
বড় একটা শ্বাস নেবার পরে ফেলিসিটি আবার ডুকরে কাঁদতে শুরু করল। চোখের জলে ভেজাভেজা হয়ে গেল ওর মুখটা। যখন সে কেঁপে কেঁপে কাঁদছিল প্রতিটি নিঃশ্বাসে সময়ে ওর মাথাটাও নড়ে উঠছিল।
সে হাঁপিয়ে উঠে বলল, “আমি বিশ্বাস করি না... সে…।“
নেনে এবার উঠে দাঁড়াল। সিগারেটটাকে বাথরুমের দেয়ালে ঘষে ফেলে দিয়ে ফেলিসিটির দিকে একবার তাকাল অবজ্ঞাভরে, এরপর হাঁটা শুরু করল।
ফেলিসিটি ওর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললে উঠল, “নিষ্ঠুর।“
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই ওর যখন মনে হলো ও তো একলা হয়ে যাবে, তখনই সে হাতটা চেপে ধরল নেনের।
“দাঁড়াও। প্লিজ, যেয়ো না। তোমাকে তো বুঝতে হবে...“
নেনে থেমে ওর দিকে তাকাল।
“থামো।“ সে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “কান্না থামাও। যা বলি, শোনো।“
সে কান্না থামিয়ে ঢোক গিলল যেন আরেকটা কষ্ট শুরু হবে এরপরে।
এরপর খানিকটা সময় চুপচাপ কাটল যেটা নেনেকে মোটেই স্বস্তি দিল না। বরং আগের চেয়ে আরো ক্ষিপ্ত, আরো অস্থির করে তুলল।
অন্ধকার মাঠের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “ঠিক আছে, শোনো। শুনতে পাচ্ছ আমাকে?”
ফেলিসিটি চুপ করে মনোযোগ দিতে চাইল। কিন্তু সে কিছুই শুনতে পেল না। ওর মাথাটা নাড়া দিয়ে নেনে ওর অসম্মতি বুঝে নিল।
“তুমি অনেক বেশি কেঁদেছ, তাই তোমাকে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কানে শুনবার জন্য।“
সে মাথাটা নেড়ে মাঠের দিকে দৃষ্ট মেলল। অস্ফুট স্বরে বলল, “ওরা কাঁদছে।“
“হ্যাঁ, ওরা কাঁদছে। ওরা কাঁদতেই থাকে নারকীয় রাত জুড়ে। তাকাও, আমার মুখটা দেখছ না? কখন ঘুমাই বলতে পার তুমি? কক্ষনো না। সারারাত ধরে শুধু এসবই শুনি। কিন্তু আমরা এসব আর নেব না। বুঝতে পেরেছ?”
ওর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল ফেলিসিটি। প্রান্তর জুড়ে শুনতে পেল শুধু বিলাপী নারীদের আক্ষেপ, ওরা ওদের স্বামীদের নাম ডেকে ডেকে হাহাকার করছে।
নেনে বলল, “তারা সবাই কাঁদে।“
সেইই কণ্ঠস্বরগুলো সমস্বরে বলে উঠল, সাইকো। অসহ্য। নিষ্ঠুর ডাইনি।
ওদের সাথে অন্যরাও গলা মেলাল, আমাদের কাঁদতে দাও।
হিস্টিরিয়াগ্রস্ত ঝগড়াটে মহিলা।
নেনে এবার মাঠের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল, “তাহলে আমাদের কী হবে? তোমাদের মধ্যে এমন কতজন আছে যারা চল্লিশ বছর ধরে বিলাপ করছে। আমাদেরকে সারারাত ধরে তোমাদের এসব আক্ষেপ শুনতে হয়, রাতটা নরকসম লাগে। আমাদের কী হবে তাহলে?”
চারদিকে একটা নীরবতা। ফেলিসিটি ভয়ে ভয়ে নেনের দিকে তাকাল।
ওরা সবাই মাঠের ওদিকে চলে গেছে, হাইওয়েটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক এর সমান্তরালে একটা বাড়ির পাশ দিয়ে দুটো সাদা আলো দেখা গেল।
“ওই যে, আরেকজন” এমনভাবে বলল যেন এরপরে নেনে আর কিছুই নিতে পারবে না, এমনই ক্লান্ত সে।
“আরেকটা? তার মানে আরেকজন নারী? কিন্তু লোকটি কি তাকে ছেড়ে যাচ্ছে? মনে হয়, এ অপেক্ষা করবে।“
নেনে ওর ঠোঁটটা কামড়ে ধরে মাথাটা নাড়াতে লাগল। মাঠে ওই কান্নার শব্দ আরো জোরালো শোনা গেল।
বিরাগে ভরপুর সেইসব কান্না...
আসো আসো তোমার চেহারাটা দেখি বেহায়া মেয়েছেলে।
আসো আসো, এখন তো তোমার বিদ্রোহী বন্ধুগুলো নেই।
আসো, আধমরা কুৎসিত ডাইনি বুড়ি।
ফেলিসিটি তাড়াতাড়ি ওর হাতটে ধরে টেনে উঠিয়ে বাথরুমে নিয়ে গেল। আর বলতে থাকল, “এবার আমাদের কিছু একটা করতে হবে। ওই দরিদ্র মহিলাদেরকে সতর্ক করতে হবে।”
কিন্তু হঠাৎ সে থেমে গেল। ঠিক একইরকম একটা বেদনাদায়ক দৃশ্য চোখে পড়ল তার, ওর সাথে আগে যেরকম হয়েছিল। বাড়ির পাশে গাড়ির যে সাদা লাইটটা ওরা দেখেছিল সেটা ধীড়ে ধীরে লাল আলো হয়ে দূরে মিলিয়ে যেতে থাকল। তার মানে এবারও একই ঘটনা।
“সে চলে গেল। ফেলিসিটি বলল, “মেয়েটাকে রেখেই লোকটা চলে গেল।“
একটু আগে যেমন হয়েছিল, ঠিক সেরক আবারও মাটিতে পড়ে গেল নেনে। ওর হাতটা ফেলিসিটির গায়ে ছেড়ে দিয়ে সে বসে পড়ল।
“সবসময় এরকমই হয়, প্রিয়।“ ফেলিসিটির হাতটা বুলাতে বুলাতে নেনে বলতে থাকল, “এটা ঠেকানো যায় না। বিশেষ করে এই হাইওয়েতে... সবসময়ই হয়।“
“কিন্ত?”
“সবসময়ই হয়।“
ধিঙ্গি মেয়েটা, তুমি কোথায়?
নেনের মুখের দিকে তাকিয়ে ফেলিসিটি অনুভব করতে পারল, নিজের কষ্টের চেয়েও অনেক বেশি কষ্ট ওর।
সরি।
বুড়ি কুকুরী কোথাকার!
“ওকে একা ছেড়ে দাও।“ ফেলিসিটি বলল। নেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ছোট শিশুর মতো জড়িয়ে ধরল ওকে।
ওহ!... কী ভয়ংকর! তুমি একটা সহচরও পেয়ে গেছ! একটা স্বর শোনা গেল।
ফেলিসিটি বলল, “আমি মোটেও কারো সহচর নই। আমি কেবল চেষ্টা করছি ওকে সাহায্য করতে।“
“চুপ করো।“ নেনে বলে উঠল।
তোমরা সকলেই জানো তো কেন সে এই হাইওয়েরতে একলা পড়ে আছে?
কারণ সে একটা হাড়গিলে সিন্ধুঘোটক।
না, না, সে এখানে পড়ে আছে কারণ ও যখন ওর ছোট্ট বিয়ের গাউনটা গায়ে দেবার চেষ্টা করছিল, ততক্ষণে আমরা গাউন পয়রে ওর মানুষটির কাছে চলে গেছিলাম।
হাসির আওয়াজটা আরো কাছে চলে এলো, কান্নার গোঙ্গানি ছাপিয়ে। বাথরুমের ওদিক দিয়ে তখন কোনো একটা অবয়ব বেরিয়ে এলো হেঁটে, নেনে আর ফেলিসিটির দিকে।
এখানে আরো একজন... ট্র্যাম্প!
অবয়বটা যত কাছে এলো, বোঝা গেল সে একজন বয়স্ক নারী। প্রতিটা পদক্ষেপে সে ঘুরে ঘুরে হাইওয়ের দিকে দেখছিল। তার পরনে একটা সোনালি পোশাক, গলার কাছ থেকে কালো লেইসের অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছিল। বৃদ্ধ নারীটি কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই ফেলিসিটি বলে উঠল, “ঠাকুমা, জানো তো, সবসময়; সবসময়ই এটা হয় হাইওয়েতে।”
বৃদ্ধ নারীটি ওদেরকে বিয়ের পোশাকে মাঠের মধ্যে বসে থাকতে দেখল। সোজাসুজি, বিরক্তভরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু কীভাবে...?”
ফেলিসিটি ওর মুখের কথাকে কেড়ে নিয়ে বলল, “প্লিজ, আর কেঁদো না। কান্নাকাটি করে পরিবেশটাকে আরো খারাপ কোরো না।“
“কিন্তু এটা হতে পারে না।“ এটা বলতে বলতে হতাশায় নিমজ্জিত বৃদ্ধাটির হাত থেকে ওর বিয়ের কাগজটি মাটিতে পড়ে গেল।
সে অবজ্ঞার সাথে হাইওয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল গাড়িটি চলে যাচ্ছে।
“বদমাশ! ধ্বজভঙ্গ বুড়ো জল-কুক্কুট একটা!”
চল যাই, অপদার্থ একটা!
“তুমি কি এবার থামতে পারো না, বাচাল মেয়েছেলে একটা!” নেনে চিৎকার করে বলার সাথে সাথে বৃদ্ধাটি তীব্রভাবে ওর পায়ের কাছে এসে পড়ল। ভয়ার্ত চাহনিতে তাকিয়ে দেখল।
“বিশ্রি বুড়ি কোথাকার!” নেনে বলতেই থাকল।
আমরা তোমাকে ধরবোই, তুমি একটা সাপ।
কিছু একটা বুঝবার চেষ্টায় সেই বৃদ্ধ নারী- নেনের মতো, সে ফেলিসিটির মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। এবং তটস্থ অবস্থায় অন্ধকার মাঠের মধ্যে দেখতে লাগল।
কই, এদিকে এসো, তোমার মুখটা দেখাও। ওইসব মহিলাদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে এবার আরো কাছে।
নেনে আর ফেলিসিটি পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল তখন। তাদের মনে হলো, যে মাটিতে তারা দাঁড়িয়ে আছে সেটা মাঠের দিক থেকে আসা অসংখ্য মহিলার পদধ্বনিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
“কী হচ্ছে এখানে?” বৃদ্ধাটি জানতে চাইল। “কারা এরা? এ গলার আওয়াজ কাদের? কী চায় এরা?”
বলতে বলতে সে মাটিতে পড়ে থাকা বিয়ের দলিলটি তুলে নিল নীচু হয়ে। ফেলিসিটি আর নেনের মতো হাইওয়ের দিকে পিঠ দিয়ে, পেছন না ঘুরেই কালো অন্ধকারময় মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদিক থেকে সেইসব কণ্ঠস্বর কাছ থেকে আরো কাছে এগিয়ে আসতে লাগল যেন।
“ওরা কতজন হবে?” ফেলিসিটি জানতে চাইল।
“অনেক। অগনিত।“ নেনে উত্তর দিল।
এত বেশি অভিশাপ আর অপমান জড়িয়ে আছে ওইসব এগিয়ে আসা কণ্ঠস্বরে, যে ওদেরকে শান্ত করা বা জবাব দেবার মতো উপায় নেই।
“আমাদের এখন কী করা উচিত?” ফেলিসিটি জিজ্ঞেস করল। তারা তিনজনই একে অপরকে দ্রুত সহায়তা দিতে চাইছিল।
“আর যাই করো, কান্নাকাটি করবার চিন্তা যেন কোরো না।“
বৃদ্ধ নারীটি ওর বিয়ের পোশাকটি মুঠোর মধ্যে নিয়ে এক হাত দিয়ে কুচকাতে লাগল আর ফেলিসিটির বাহু আঁকড়ে ধরে রাখল অন্য হাত দিয়ে।
“এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই”
কিন্তু এত সব বিদ্রুপের আওয়াজের মধ্যে বৃদ্ধাটি কিছুই শুনতে পেল না ফেলিসিটি কী বলল। হাইওয়েতে একটু দূরে সাদা আলোর বিন্দুটা নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিল ওদের মনে। হয়তো এটাই সেই মুহূর্ত যখন ফেলিসিটি শেষবারের মতো ভালোবাসার কথা ভাবছে। হয়তো সে মনে মনে ভাবছে, “তাকে ছেড়ে যেতে দিয়ো না। তাকে তোমাকে ছুড়ে ফেলে যেতে দিয়ো না।“
“শোনো, এটা যদি থামে, আমরা উঠে যাব।“ নেনে চেঁচিয়ে বলল।
“ও কী বলল?” জানতে চাইল বৃদ্ধা। ওরা তখন বাথরুমের পাশে চলে এসেছে।
“যদি গাড়িটা থামে...”
“কী?” ফেলিসিটির কথার উত্তরে বৃদ্ধা বলল।
ততক্ষণে সব আর্তনাদ ওদের দিকেই ধেয়ে আসছে। ওরা কাউকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু বুঝতে পারছে ওদের কয়েক গজ দূরত্বের মধ্যেই তারা আছে। ফেলিসিটি হঠৎ চিৎকার করে উঠল। মনে হলো, কারো একটা হাত ওর পা, ওর গলা, ওর আঙুলের ওপর দিয়ে বুলিয়ে গেল। সে আবারও চেঁচাল, কিন্তু নেনেকে শুনতে পেল না, কারণ নেনে তখন অনেকটা দূর সামনে এগিয়ে গিয়েছিল আর বলছিল বৃদ্ধাকে আঁকড়ে ধরে দৌড় দিতে। ওই গাড়িটা বাথরুমের সামনে এসে থেমে গেল। নেনে পেছনে ফিরে ফেলিসিটির কাছে এসে বলল, দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধাকে কাছে টেনে নিতে। কিন্তু বৃদ্ধা ফেলিসিটিকে নেনের দিক থেকে টেনে নিল, নেনে ইতোমধ্যে গাড়ির কাছটায় পৌঁছে গেছিল। ও গাড়ি থেকে আরেকজন নেমে যাবার অপেক্ষা করছিল, যাতে সে নামতেই ও উঠে যেতে পারে আর ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে নির্দেশ দিতে পারে।
“ওরা যেতে দেবে না।“ ফেলিসিটি চিৎকার করে বলল, “ওরা আমাকে যেতে দেবে না।“ ও খুব চেষ্টা করছিল যে হাতটা ওকে আঁকড়ে ধরে আছে তা থেকে মুক্ত হতে।
বৃদ্ধ নারীটি টানছে। গায়ের সব শক্তি দিয়ে ফেলিসিটিকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। নেনে অস্থিরভাবে অপেক্ষা করছে কখন গাড়ির দরজা খুলে মহিলাটি গাড়ি থেকে নামবে। কিন্তু সামনে যে আবির্ভূত হলো, সে একটা পুরুষ। রাস্তায় ঠিকড়ে পড়া গাড়ির হেডলাইটের আলোতে লোকটা কোনো মহিলাকে দেখতে পেল না। আর তাড়াহুড়োতে সে প্যান্টের জিপার লাগাতে তালগোল পাকিয়ে ফেলল। এদিকে হট্টগোল বেড়েই চলেছে। সেই অট্টহাসি আর আর্তনাদ নেনে আর ফেলিসিটিকে ভুলে লোকটার দিকে ধাবিত হলো এবার। তারা লোকটার কানের কাছে চলে এলো একেবারে। লোকটার চোখের মধ্যে সেই ভয়, খরগোশ ভয় পেলে যেমন হয়। সে থামল, তবে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। নেনে লোকটার আসনে বসে পড়ল গিয়ে। সে মহিলাটিকে সামলে নিয়ে, ফেলিসিটি আর বৃদ্ধার জন্য পেছনের দরজা খুলে দিল।
“ওকে ধরো।“ নেনে এটা বলে ওই মহিলাটিকে বৃদ্ধার হাতে ছেড়ে দিল। বৃদ্ধাটি নেনের কথামতোই কাজ করল।
“সে যদি বেরিয়ে যেতে চায়, ওকে যেতে দাও। আমার মনে হয় ওরার পরস্পরকে চায়। আর সেটা যদি হয়, আমাদের উচিত হবে না ওদের সামনে বাধা হয়ে দাড়াতে।“ বলল ফেলিসিটি।
নতুন মহিলাটি ওই বৃদ্ধার কাছ থেকে সরে গেল কিন্তু দরজা খুলে বেরল না। সে জিজ্ঞেস করল,”কী চাও? কোত্থেকে এসেছ?” নেনে যতক্ষণ না যাত্রীদরজা না খুলল, সে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগল।
“নেমে যাও তাড়াতাড়ি।“
তারা ওইসব মহিলাদের কান্নার আওয়াজ গাড়িতে বসেও শুনতে পাচ্ছিল। গাড়ির সামনে, হেডলাইটের আলোয় অন্ধকার থেকে আলাদা করে ওই ভয়ঙ্কর লোকটাকে দেখতে পেল ওরা, যে এক মিনিট আগেও কী ছিল, সেটা চিন্তা করতে পারেনি।
“কোনোভাবেই আমি নামব না।“ নবাগত মহিলাটি বলল। কোনো রকম দয়ামায়া ছাড়াই লোকটার দিকে তাকাল সে। এরপর নেনের দিকে তাকিয়ে বলল, “লোকটা ফিরে আসবার আগেই আমাদেরকে যেতে হবে।“ বলেই গাড়ির দরজা লক করে দিল।
নেনে এবার গাড়িটা স্টার্ট দিল চালাবার জন্য আর সেই শব্দটা শুনে লোকটা ফিরে তাকাল ওদের দিকে।
নতুন মহিলাটি চেঁচিয়ে বলে উঠল, “যাও।“
বৃদ্ধা মহিলাটি তো অস্থিরতায় হাততালি দিয়ে উঠল আর ফেলিসিটির একটা হাত নিয়ে চাপতে লাগল। ফেলিসিটি তখন দৃষ্টি দিল লোকটার দিকে। গাড়ির এক চাকা রাস্তায় উঠে গেল আর আরেক পাশের চাকা জোরে ঘষা খেল কাদার মধ্যে। খুব জোরে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একটা টান দিল নেনে আর গাড়ির হেডলাইটের আলো মাঠের উপরে এসে পড়ল। কিন্তু তারা যা দেখল তা কেবল মাঠ নয়; আলোটা রাত্রির অন্ধকারের বিশালতায় ভেসে গেল। কিন্তু অন্ধকারে সেই এক দঙ্গল আর্তনাদরত মহিলাকে আলাদা করে দেখবার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তারা গাড়ির দিকে এগিয় আসছিল, আরো স্পষ্ট করে বললে বলা যায় ওরা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকেই ছুটে আসছিল, যাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে তাদের জন্য নিশ্চল অপেক্ষমান, এক অর্থে মৃত্যুর অপেক্ষায় যেন।
নবাগত মহিলাটি ওর নিজের পা নেনের পায়ের উপরে চেপে এক্সেলেটরে জোরে চাপ দিয়ে ধরল। রিয়ারভিউ আয়নায় ওরা দেখতে পেল ওই মহিলাগুলো সবাই লোকটার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নেনে গাড়িটিকে রাস্তার উপরে সম্পূর্ণ আনতে সমর্থ হলো এবার। মোটরের শব্দ ওদের আর্তনাদের শব্দকে চাপা দিতে পারল, এখন শুধুই নৈঃশব্দ আর অন্ধকার।
নবাগত মহিলাটি এবার ওর আসন বদলে বসল।
“কখনোই আমি ওকে ভালোবাসিনি।“ সে বলল। “ও গাড়ি থেকে নামা মাত্রই আমার মনে হয়েছিল আমি ওকে রাস্তার ধারে রেখে গাড়ি চালিয়ে চলে যাই। হঠাৎ কেন জানি না, আমার মধ্যে কেমন মাতৃভাব... “
গাড়ির ভেতরের অন্য নারীরা কেউই শুনছিল না। এবং সেই মুহূর্তে সবাই সামনের দিকে হাইওয়েতে তাকিয়ে ছিল। সব নীরব। ওই সময়টায় এক ঘটনা ঘটল।
“না, এটা হতে পারে না।“ নেনে বলে উঠল।
ঠিক তাদের সামনে দেখা গেল দিগন্ত বরাবর একজোড়া সাদা আলো।
“কী ব্যাপার? কী হচ্ছে” বলল বৃদ্ধা।
সামনের যাত্রী-আসনে বসা নবাগত মহিলাটি নেনের চোখের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন কোনো একটা ব্যাখ্যা চাইছে সে এই ঘটনার। আলো দুটো আরো কাছে চলে এলো, আরো উজ্জ্বল হয়ে। ফেলিসিটি পেছন থেকে সামনের দুই আসনের মাঝখান দিয়ে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
“ওরা ফিরে আসছে।“ ফেলিসিটি নেনের দিকে তাকিয়ে হাসল আর বলল।
হাইওয়ের মধ্যে আলো দুটো গাড়ির হেডলাইটের, এক্কেবারে তাদের গাড়ির উপরে উঠে এলো, এবং তীব্রগতিতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
“ওরা ওদের মনের ভাবনা বদলেছে। ফেলিসিটি বলল, “হ্যাঁ, ওরাই। ওরা আমাদের কাছে ফিরে এসেছে।“
“না।“ নেনের গলা শোনা গেল।
সে সিগারেট ধরাল একটা। ধোয়া উড়িয়ে আবারও বলল, “ঠিকই। ওরাই এসেছে। হ্যাঁ, কিন্তু ওরা ফেরত এসেছে ওই লোকটার জন্য।” ·
লেখক পরিচিতি : সামান্তা শয়েবলিন আর্জেন্টাইন লেখক। জন্ম ১৯৭৮। বর্তমানে জার্মািনির বার্লিনে বসবাস করছেন। তিনি এ পর্যন্ত তিনটি ছোটগল্পসংগ্রহ, একটি নভেলা ও একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছেন। তার লেখা গল্প বিভিন্ন সংকলনে এবং দ্য নিউ ইয়র্কার, দ্য প্যারিস রিভিউ, গ্রান্টা, দ্য ড্রব্রিজ, হার্পার’স ম্যাগাজিন এবং ম্যাক্সউইনিস-এর মতো সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহু পুরস্কার অর্জন করেছেন। তার বই চল্লিশেরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে।


0 মন্তব্যসমূহ