অনুবাদ : দিলশাদ চৌধুরী
মাসে দুবার ভদ্র ছেলের মতো আমি ইনুগুতে আমার বাবা-মাকে দেখতে যেতাম তাদের আসবাবে উপচে পড়া ফ্ল্যাটে, যেটায় বিকেল না হতেই আলো কমে আসতে শুরু করত। চাকরি থেকে অবসর তাদের বদলে দিয়ে ক্রমশ জবুথবু করে তুলেছিল। তাদের বয়স ছিল আশির প্রায় শেষ দিকে, বারবার ঝুঁকে ঝুঁকে পড়া ছোট্ট মেহগনিরঙা শরীরদুটো দেখতে প্রায় একই রকম হয়ে উঠেছিল। মনে হতো যেন এতগুলো দিন একসাথে থাকার ফলে তাদের চেহারায় মিলেমিশে এক জ্ঞাতিভাব ফুটে উঠেছে। তাদের শরীরের ঘ্রাণও ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছিল। ভিক্স ভেপোরাবের মেনথলের ঘ্রাণটা সবুজ কৌটো থেকে সাবধানে দুজনে বিনিময় করত, একটুখানি নাকের ফুটোয় আর বাকিটা গাঁটের ব্যথার জায়গাগুলোতে। আমি যখনই যেতাম হয় তাদের দেখতাম বারান্দায় বসে রাস্তা দেখছে, নয়তো সোফায় বসে অ্যানিমেল প্ল্যানেট। তাদের একটা সরলতা মাখা নতুন ধরনের বিস্ময়বোধ ছিল। নেকড়ের শঠতা দেখে তারা আশ্চর্য হতো, উলুøকের চালাকি দেখে হাসত আর একজন আরেকজনকে বলত, ‘ইফুকওয়া? দেখলে কী করল!’
তাদের আরও একটা ব্যাপার ছিল একদম নতুন। আজগুবি গল্পের ব্যাপারে অবিশ্বাস্য ধৈর্য। একবার আমার মা আমাকে বলল যে আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটার কোনো এক প্রতিবেশীর বমির সাথে একটা জ্যান্ত ঘাসফড়িং বেরিয়ে এসেছে। যেটা তার মতে, ছিল একটা প্রমাণ যে ওই লোকটির দুষ্ট আত্মীয়রাই তাকে বিষ দিয়ে মারার চেষ্টা করেছিল।
‘আমাকে একজন ঘাসফড়িংটার একটা ছবিও পাঠিয়েছে’, সায় দিয়ে বাবা বলেছিল। তারা সব সময় দুজন দুজনের গল্পে সায় দিত। একবার যখন বাবা আমাকে বলল যে শেফ ওকিকির ছোট্ট কাজের ছেলেটা রহস্যজনকভাবে মারা গেছে, আর শহরের কোণে কোণে কাহিনি ছড়িয়ে গিয়েছে যে শেফ তাড়াতাড়ি ধনী হয়ে ওঠার জন্য ছেলেটিকে খুন করে তার কলিজাটা ব্যবহার করেছে শয়তানের পূজায়, আমার মা সাথে সাথে সায় দিয়ে বলে ওঠে, ‘শুনেছি ওর হৃৎপিণ্ডটাও ব্যবহার করেছে।’
বেশি নয়, আর বছর পনেরো আগে হলেও আমার মা বাবা এসব গল্প শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসত। আমার মা, যে কিনা ছিল একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, তার চিরাচরিত সতেজ কায়দায় বলে উঠত, ‘ফালতু কথা।’ আর আমার বাবা, যে ছিল একজন শিক্ষা গবেষণার অধ্যাপক, শুধু একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করেই থেমে যেত কারণ এসব গল্পের পেছনে মন্তব্য করে সময় নষ্ট করাটা তার মতে কোনো কাজের মধ্যেই পড়েনা। আমি ধন্দে পড়ে যাই! আমার সেই বাবা-মা এখন ওই সব নাইজেরিয়ানের মতো হয়ে গেছে, যারা পানিপড়া খেয়ে ডায়বেটিস সেরে যাওয়ার অলৌকিক গল্প শুনিয়ে বেড়ায়।
সুতরাং আমি ঠাট্টা করতাম আর তাদের এসব গল্প কখনোই পুরোটা শুনতাম না। অন্য রকম একটা সরলতা মিশে থাকত তাদের এই বুড়ো বয়সের শৈশবে। সময়ের সাথে সাথে তাদের গতি কমে আসছিল ঠিকই কিন্তু আমাকে দেখলে তাদের মুখ সব সময় একই রকমভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। সাথে যোগ হতো তাদের চিরাচরিত প্রশ্ন, ‘আমাদের নাতি নাতনির মুখ দেখাবি কবে?’ কিংবা ‘কিরে, কোনো মেয়েকে নিয়ে আয়, পরিচয় করিয়ে দে, দিবি না?’ প্রশ্নগুলো আমাকে আর আগের মতো ভাবাত না। রোববার দুপুরের ঝোলভাতের পর যখন আমি নিজের কর্মস্থলে ফিরে আসার জন্য রওনা দিই, নিজের মনেই ভাবি, এবারই শেষ দেখা নয়ত! কী হবে যদি সামনের সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি আসার আগেই দুজনের কেউ ফোন দিয়ে তক্ষুনি যেতে বলে। এই চিন্তা আমাকে পোর্ট হারকোর্ট পর্যন্ত মুষড়ে রাখে। আমি জানি, যদি আমার নিজের পরিবার হতো, বাবা-মায়ের অন্য বন্ধুদের সন্তানদের মতো যদি আমিও বাচ্চাদের বাড়তে থাকা স্কুল ফি নিয়ে চিন্তিত থাকতাম, তাহলে আর সপ্তাহান্তে নিয়মিত এভাবে তাদের কাছে যেতে পারতাম না। তাই আমি এমন কিছুই করতে চাই না, যার জন্য আমায় পরে পস্তাতে হয়।
নভেম্বরে যখন তাদের দেখতে গেলাম, মা বলল শহরের পূর্ব দিকে সশস্ত্র ডাকাতির পরিমাণ খুব বেড়েছে। আর চোরদেরও যেন উৎসব লেগে গিয়েছে। মা আরও বলল, কীভাবে ওনিতশায় কয়েকটা ডাকাতকে সতর্ক জনতা মেরেধরে জামাকাপড় ছিঁড়ে গলায় হারের মতো করে পুরোনো টায়ার ঝুলিয়ে দিয়েছিল। তারপর যখন তারা পেট্রল আর দেশলাই আনার জন্য চিৎকার করছিল তার মধ্যেই পুলিশ চলে আসে আর শূন্যে গুলি ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়, তারপর ডাকাতগুলোকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। মা থামল আর আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম একটা অতিপ্রাকৃত সমাপ্তির জন্য, যা গল্পটিকে পূর্ণতা দেবে। হয়তো এমন হলো যে, ডাকাতগুলোকে পুলিশ স্টেশনে আনার সঙ্গে সঙ্গে তারা বাদুড় হয়ে উড়ে গেল।
মা আবার বলতে শুরু করল, ‘তুমি জানো, ওই ডাকাত দলের একজন, না না, ওই দলটার নেতা, রাফায়েল ছিল। সেই যে আমাদের বাসায় কাজ করত অনেক বছর আগে, তোমার হয়তো মনে নেই।’ আমি মায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালাম, ‘রাফায়েল?’ বাবা বলল, ‘আমি তত অবাক হইনি যে ও এমন হয়ে গেছে, আগেও যে ওকে খুব একটা ভালো মনে হতো এমন তো নয়।’
আমার বাবা-মায়ের হাস্যকর গল্প শুনে মাথাটা এতই গোলমাল হয়ে গিয়েছিল যে স্মৃতির অতল হাতড়ে দেখতে বেশ বেগ পেতে হলো। মা আবারও বলল, ‘তোমার হয়তো মনে নেই, কাজের লোক তো পাল্টেছি অনেকবার আর তুমিও বেশ ছোট ছিলে।’
কিন্তু আমার মনে ছিল। হ্যাঁ! আমার রাফায়েলকে মনে ছিল।
রাফায়েল যখন প্রথমবার আমাদের সাথে থাকতে এসেছিল, বিশেষ কিছু মনে হয়নি। অন্য সবার মতোই ছিল, কাছের কোনো এক গ্রাম থেকে তুলে আনা খুব সাধারণ একটা কিশোর। ওর আগের হাইজিনাস নামের ছেলেটিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল মায়ের সাথে বেয়াদবি করেছিল বলে। হাইজিনাসের আগে ছিল জন, তবে ওকে আমরা তাড়িয়ে দিইনি। ধুতে গিয়ে একটা কাচের প্লেট ভেঙে ফেলেছিল ও, তারপর মা কাজ থেকে ফেরার আগেই মায়ের ভয়ে বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। প্রত্যেক কাজের ছেলেই আমাকে অবজ্ঞা করত, কারণ তারা কেউই মাকে পছন্দ করত না। ‘এসে খেয়ে উদ্ধার করো, নইলে তো আবার ম্যাডাম আমাকে কথা শোনাবে’, তারা বলত। আমার মা প্রায় প্রতিদিনই ওদের ওপর চিৎকার করত, কখনো ওদের আলসেমির জন্য, কখনো বোকামো বা কানে না শোনার জন্য। এমনকি মায়ের বেল বাজানো, দরজার লাল নবে রাখা হাত কিংবা ইতস্তত চলাফেরার শব্দও ধমকানোর মতো শোনাত। ডিমগুলোকে আলাদা ভাজা, বাবারটা পোচ আর মায়েরটা পেঁয়াজ দিয়ে অথবা মোছা শেষে রাশিয়ান পুতুলগুলোকে আবার একই শেলফে পেছনের দিকে তুলে রাখা বা আমার স্কুল ইউনিফর্ম ঠিকভাবে আয়রন করা...এগুলো মনে রাখা কি খুব কঠিন!
আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, তা-ও শেষ বয়সের। মা বলত, ‘আমি যখন প্রেগন্যান্ট হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো মেনোপজ।’
আমার বয়স আটের কাছাকাছি ছিল তখন, আর আমি ‘মেনোপজ’ শব্দটির মানেই বুঝতাম না। মায়ের স্বভাবটা ছিল সোজাসাপটা, সাথে বাবারও। তারা সেই ধরনের লোক ছিল যারা মুখের ওপর জবাব দিয়ে অন্যদের উড়িয়ে দিতে পছন্দ করত। বাবা-মায়ের প্রথম দেখা ইবাদান ইউনিভার্সিটিতে, তাদের বিয়েটা হয় দু-পক্ষের অমতে। বাবার পরিবারের কাছে মাকে মনে হয়েছিল অতি শিক্ষিত, আর মায়ের পরিবার বাবার চেয়েও ধনী কাউকে চাইছিল। ফলে তারা এক আলাদা জীবন বেছে নিল, যেখানে দুজনের কে কার চেয়ে বেশি লেখা ছাপাল, কে ব্যাডমিন্টন খেলায় জিতল অথবা কে কার কাছে তর্কে হারল, এই বিষয়গুলোই মুখ্য হয়ে ওঠে। তারা প্রায়ই খবরের কাগজ বা জার্নাল থেকে একে অপরকে জোরে জোরে লেখা পড়ে শোনাত, বৈঠকখানায় দাঁড়িয়ে, কখনোবা হাঁটতে হাঁটতে, যেন এখনই নতুন কিছু আবিষ্কার করে ফেলবে। তারা ম্যাটো রোজ থেকে মদ্যপান করত, বোতলটা সব সময় তাদের কাছের কোনো এক টেবিলের ওপর রাখা থাকত, পাশেই থাকত লালচে মদের দাগধরা গ্লাস। শৈশবে তাদের কথা দ্রুততম সময়ে ধরতে না পারার কারণে আমি প্রায়ই চিন্তিত থাকতাম।
আমি আরও চিন্তিত থাকতাম বইপত্রের প্রতি যথেষ্ট ভালোবাসা না থাকার কারণে। বই পড়া ব্যাপারটা আমার বাবা-মায়ের কাছে যেমন ছিল, আমার কাছে তেমনটা হয়ে উঠতে পারেনি। তারা বইকে যেভাবে উপভোগ করত, যেভাবে পড়ার সময়টাতে কালের গতি আটকে দিত, খেয়ালই করত না যে আমি এলাম নাকি গেলাম, আমার কাছে বইপড়া তেমন কিছুই হয়ে ওঠেনি। আমি বই পড়তাম তাদের মন রাখতে আর খাবার টেবিলের অযাচিত প্রশ্নগুলোর ঠিকঠাক উত্তর দিতে। যেমন বীজ বলতে আমি কী বুঝি অথবা ইজেউলো ঠিক করেছিল কি না। আমার প্রায়ই নিজেকে ‘নিজ গৃহে পরবাসী’ মনে হতো। যেসব বইয়ের পড়ার ঘর কিংবা করিডরে জায়গা হতো না, সেগুলো আমার শোবার ঘরের তাকে উপচে পড়ত। আমার অস্তিত্ব ক্রমশ অস্থায়ী হয়ে উঠছিল, আমি যেন যেখানে থাকার কথা সেখানে ছিলাম না। আমি যখন কোনো বই নিয়ে কথা বলতাম, তখন বাবা-মায়ের মুখের ভাব দেখে বুঝতে পারতাম যে আমি যা বলছি তা হয়তো ভুল নয়, কিন্তু জ্ঞানী বাবা-মায়ের সন্তান তুলনায় খুবই সাধারণ। তাদের সাথে শিক্ষক ক্লাবে যাওয়াটা ছিল আরেক শাস্তির মতো ব্যাপার। ব্যাডমিন্টন আমার বিরক্তিকর লাগত, শাটলককটাকে অদ্ভুত অসম্পূর্ণ মনে হতো। মনে হতো, খেলাটা কেউ আবিষ্কার করতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেছে।
তবে আমার সত্যিকারের ভালোবাসা ছিল কুংফু। ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ আমি এতবার দেখেছি যে লাইনগুলো হুবহু বলে যেতে পারতাম। মনে খুব আশা ছিল যে কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখব আমি ব্রুস লি হয়ে গেছি।
হাওয়ায় লাথি ছুড়তাম রোজ, আমার সেই সব কল্পনার শত্রুদের উদ্দেশে যারা আমার কাল্পনিক বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে। বিছানার তোষক মাটিতে নামিয়ে তার ওপর ‘ব্ল্যাক বিউটি’ কিংবা ‘দ্য ওয়াটার বেবিস’-এর মতো বইয়ের ঢাউস হার্ডকপি ফেলে তার ওপর দাঁড়িয়ে ‘হাআহ!’ বলে চিৎকার করে লাফিয়ে পড়তাম। এসবের মাঝে একদিন আমি রাফায়েলকে দরজায় দেখতে পেলাম আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। একটা ছোট্ট ধমক আশা করেছিলাম, কারণ রাফায়েল সকালেই আমার ঘর গুছিয়ে দিয়েছিল, আর এখন ঘরের অবস্থা চোখ চেয়ে দেখার মতো নয়। ধমকের বদলে রাফায়েল হেসে ওর বুকে হাত রাখল, তারপর আঙুলগুলো জিবে ছোঁয়াল, ঠিক যেন নিজের রক্ত চেখে দেখছে। এটা ছিল আমার দেখা একটা পছন্দের দৃশ্যের অংশ। আমি হতভম্ব হয়ে এক অপ্রত্যাশিত আনন্দের সাথে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
‘আমি আগে যে বাড়িতে কাজ করেছি, সেখানে ছবিটা দেখেছি’, ও বলল, ‘এই দেখ।’
একটু পেছনে গিয়ে লাফ দিয়ে হাওয়ায় লাথি ছুড়ল রাফায়েল, ওর পাগুলো সোজা হয়ে উঠে গেল অনেক উঁচুতে। ওর শরীরে টানটান পারদর্শিতা ফুটে উঠছিল। আমার বয়স ছিল বারো, আর আমি, অন্তত সেদিনের আগে কারও মধ্যে নিজের ছায়া এভাবে ফুটে উঠতে দেখিনি।
রাফায়েল আর আমি প্রতিদিন পেছনের উঠোনে অনুশীলন করতে লাগলাম। কংক্রিটের স্লাবের ওপর থেকে লাফ দিয়ে ঘাসে অবতরণ করার খেলা চলতে লাগল। রাফায়েল আমাকে বলত পেট ভেতরে নিয়ে, পা সোজা আর আঙুলগুলো ঠিকঠাক ভঙ্গিতে রাখতে। ও আমাকে সঠিকভাবে নিশ্বাস নিতেও শেখাচ্ছিল। আমার আগের চার দেয়ালের মধ্যে করা প্রচেষ্টাগুলো আমার কাছে প্রাণহীন মনে হতে লাগল। এখন রাফায়েলের সাথে বাইরে বেরিয়ে, মুক্ত বাতাসকে নিজের হাতে টুকরো করতে পেরে, মাথার ওপরে খোলা আকাশ, পায়ের নিচে নরম ঘাস, আর আমার মনের সীমাহীন উদ্যম নিয়ে আমার অনুশীলনে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হচ্ছিল, সত্যিই এমন লাগছিল। এবার আমি আসলেই অনুশীলনের মতো অনুশীলন করছিলাম আর ভাবছিলাম, কে বলতে পারে, আমিও হয়তো একদিন ব্ল্যাকবেল্ট হতে পারব। রান্নাঘরের দরজার বাইরের দিকে একটা উঁচু খোলা বারান্দা ছিল আর আমি ছয় সিঁড়ির ওপর ওই বারান্দা থেকে একটা ‘ফ্লাইং কিক’ দেওয়ার চেষ্টায় ছিলাম। কিন্তু বারান্দাটা অনেক উঁচু বলে রাফায়েল আমাকে নিষেধ করে দিল।
ছুটির দিনগুলোতে বাবা-মা যখন আমাকে রেখেই শিক্ষক ক্লাবে যেত, আমি আর রাফায়েল বসে ব্রুস লির ভিডিও টেপ দেখতাম।
‘ওই ওই, দেখো,’ রাফায়েল বলত। রাফায়েলের চোখ দিয়ে ছবিগুলো যেন নতুন করে দেখতাম। কিছু দৃশ্য যা আমার কাছে এত দিন খুবই সাধারণ ছিল, রাফায়েলের ‘ওই দেখো’ বলার সাথে সাথে যেন এক নতুন আবেদন তৈরি করত। রাফায়েল জানত, আসল জিনিস কোনগুলো। ওর জ্ঞান ওর চোখেমুখে ফুটে উঠত।
ব্রুস লি যেসব দৃশ্যে ‘নানচাকু’ ব্যবহার করত, সেই দৃশ্যগুলো ও টেনে টেনে বারবার দেখত। কাঠ আর ধাতুর তৈরি ওই অস্ত্রটার আক্রমণ দেখে ওর চোখের পলক পড়ত না।
‘আমার যদি একটা নানচাকু থাকত!’ আমি বলতাম।
‘ওটা চালানো বেশ কষ্টকর’, রাফায়েল আস্তে করে বলল। ওর কথাটায় এমন কিছু ছিল যে আমার জিনিসটা পেতে চেয়েছি ভেবেই নিজেকে অপরাধী লাগল।
তার কিছুদিন পর একদিন স্কুল থেকে ফিরতেই রাফায়েল বলল, ‘দেখবে এসো।’ বাসনের আলমারির ভেতর থেকে ও একটা নানচাকু বের করল, পুরোনো কোনো ঝাড়ুর হাতল থেকে দু-টুকরো কাঠ ধাতব তারের একটা টুকরো দিয়ে জোড়া দেওয়া। ঘরের সব কাজ শেষ করে এটা বানাতে ওর কমসে কম এক সপ্তাহ তো লেগেছেই। ও আমাকে দেখিয়ে দিল কী করে ওটা চালাতে হবে। ওর পদ্ধতি আনাড়ির মতো ছিল, ব্রুস লির মতো তো একদমই নয়। আমি ওর হাত থেকে নিয়ে নিজে মাতব্বরি দেখাতে গিয়ে বুকে এক ঘা খেয়ে গেলাম। রাফায়েল হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি কি ভেবেছিলে একবারেই পেরে যাবে? অনেক চেষ্টা করতে হবে।’
স্কুলে আমি ক্লাসগুলো কাটিয়ে দিচ্ছিলাম হাতের তালুতে ওই কাঠের টুকরোটার স্পর্শের আমেজে। আমার আসল জীবন শুরু হতো স্কুলের শেষে, রাফায়েলের সাথে। বাবা-মা লক্ষই করেনি যে আমি আর রাফায়েল এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছি। তারা শুধু এইটুকুই দেখছিল যে আমি বাইরে খেলতে শুরু করেছিলাম, আর রাফায়েল ছিল সেই দৃশ্যের একটা ক্ষুদ্র অংশ যে কিনা বাগান পরিষ্কার কিংবা কলতলায় বাসন মাজায় ব্যস্ত থাকত।
এক বিকেলে রাফায়েল একটা মুরগি ছেলা শেষ করে উঠোনে এসে আমার একার অনুশীলনে বাধা দিল। ‘ফাইট!’ ও বলল। অগত্যা একটা দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হলো। ওর খালি হাত আর আমার নতুন পাওয়া অস্ত্র। ও আমায় জোরে ধাক্কা দিল। আমার অস্ত্রের একধার ওর হাতে আঘাত করল। মার খেয়ে ওকে প্রথমে বিস্মিত আর পরে মুগ্ধ হতে দেখলাম, ও আমার থেকে এতটা আশা করেনি। আমি বারবার আঘাত করতে লাগলাম, ও কখনো শুয়ে, কখনো কৌশলে, কখনোবা পাল্ট আঘাত করে প্রতিহত করতে লাগল। সময় পেরিয়ে গেল। শেষমেশ আমরা দুজনেই হাঁপাতে আর হাসতে লাগলাম। আমার এখনো সেই বিকেলে ওর পরা হাফপ্যান্টের দৈর্ঘ্য মনে আছে, সাথে এ-ও যে কীভাবে ওর পা বেয়ে পেশিগুলো শক্ত রশির মতো নেমে যেত।
সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে আমি মা বাবার সাথেই দুপুরের খাবার খেতাম। বেশ তাড়াতাড়িই খাওয়ার চেষ্টা করতাম, যাতে তাদের পরীক্ষামূলক প্রশ্নের মুখোমুখি না হতে হয়। এক দুপুরের খাবার টেবিলে রাফায়েল সবুজ সবজির ওপর রাঙা আলুর সাদা চাকতি, পেপে আর আনারসের টুকরো এনে দিল।
‘সবজিগুলো অনেক শক্ত ছিল’, মা বলল। ‘আমরা কি ঘাস খাওয়া ছাগল?’ বলে ওর মুখের দিকে তাকাল। ‘একি! তোমার চোখে কী হয়েছে?’
আমার বুঝতে সময় লাগল যে শেষের কথাটা মায়ের কটাক্ষ নয়। মা সাধারণত এভাবেই বলে। যদি রান্নাঘরে কোনো গন্ধ সে পায়, আর অন্য কেউ না পায়, তবে বলে ওঠে, ‘তোমার নাকের ডগায় কী ওটা যেটা ঘ্রাণ আটকে রেখেছে?’ কিন্তু না, এবার সত্যিই রাফায়েলের চোখের সাদা অংশ সম্পূর্ণ লাল হয়ে ছিল। একটা কষ্টকর, অস্বাভাবিক লালভাব। রাফায়েল আমতা আমতা করে বলল, ‘চোখে পোকা পড়েছে কোনো একটা।’
‘অ্যাপোলো মনে হচ্ছে’, বাবা বলল।
আমার মা চেয়ারটা সামান্য পেছনে নিয়ে রাফায়েলের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলল, ‘হ্যাঁ, অ্যাপোলোই বটে। যাও, নিজের ঘরে যাও আর বাইরে এসো না।’
রাফায়েল একটু ইতস্তত করছিল, হয়তো ভাবছিল যে এখনি যাবে নাকি প্লেটগুলো পরিষ্কার করে যাবে।
‘যাও’, বাবা চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমাদের সবাইকে আক্রান্ত করার আগেই ভাগো।’
রাফায়েল বিষণ্ন হয়ে টেবিল থেকে একটু দূরে সরে গেল। মা ওকে আবার ডেকে আনল। ‘তোমার কি এগুলো আগেও হয়েছিল?’
‘না ম্যাডাম।’
‘শোনো, এটা কনজাংটিভা, মানে যে ঝিল্লিটা মূল চোখটাকে ঢেকে রাখে, সেটার একধরনের সংক্রমণ’, মা বলল। তার ইগবু উচ্চারণে ‘কনজাংটিভা’ শব্দটি খুব তীব্র আর বিপজ্জনক শোনাচ্ছিল।
‘আমরা তোমার জন্য ওষুধ কিনে আনছি, দিনে তিনবার লাগাবে আর ঘরেই থাকবে, সুস্থ না হওয়া অব্দি রান্না করার প্রয়োজন নেই।’ তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, ‘ওকেনওয়া, দেখো তুমি আবার ওর কাছে যেয়ো না যেন। অ্যাপোলো খুব ছোঁয়াচে রোগ।’ তার কথার ভাসাভাসা ভাবে মনে হচ্ছিল যে সে স্বপ্নেও ভাবেনি আমার রাফায়েলের কাছে যাওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে।
কিছু সময় পরে মা-বাবা শহরের ওষুধের দোকানে গিয়ে এক শিশি আইড্রপ নিয়ে ফিরে এলো। রাফায়েল থাকত বাড়ির পেছনে কাজের লোকদের কোয়ার্টারে, বাবা যুদ্ধে যাচ্ছে এমন ভাব নিয়ে সেখানে ওকে ওষুধটা দিতে গেল। সেদিন সন্ধ্যায় আমি রাতের খাবারের জন্য বাবা-মায়ের সাথে ওবোলো রোডে আকারা কিনতে গিয়েছিলাম। একটু অন্য রকম লাগছিল, রাফায়েল দরজা খুলে দিল না, বসার ঘরের পর্দাও টেনে দেয়নি, আলোগুলোও জ্বালেনি। রান্নাঘরের নিস্তব্ধতায় পুরো বাড়িটাকে মৃত মনে হচ্ছিল। যেই না বাবা-মা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেল, আমি পেছনের কোয়ার্টারে গিয়ে রাফায়েলের দরজায় কড়া নাড়লাম। দরজাটা আধখোলা ছিল, দেয়ালের সাথে লাগানো সরু বিছানায় রাফায়েল পেছন ফিরে শুয়ে ছিল। আমার ঢোকার শব্দে চমকে পেছনে ফিরে ওঠার ভঙ্গি করল। আমি ওর ঘরে আগে কখনো আসিনি। ছাদ থেকে ঝুলতে থাকা খোলা বাল্বের আলো মলিন ছায়া তৈরি করছিল।
‘কী হয়েছে?’
‘কিছু না। দেখতে এলাম তুমি কেমন আছ।’
ও একদম জবুথবু হয়ে আবার শুয়ে পড়ল। ‘জানি না কী করে হলো এটা, কাছে এসো না।’
কিন্তু আমি কাছে গেলাম।
‘ক্লাস থ্রিতে আমার একবার অ্যাপোলো হয়েছিল’, আমি বললাম, ‘তাড়াতাড়িই সেরে যাবে, চিন্তা নেই। চোখে ওষুধটা দিয়েছিল তো?’
ও আরও গুটিয়ে গেল, কিছু বলল না। টেবিলের ওপর চোখের ওষুধের না খোলা বোতলটা পড়ে ছিল।
‘তুমি ওটা এখনো খোলোইনি?’
‘নাহ।’
‘কেন?’
ও আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘আমি পারছিলাম না।’
রাফায়েল, যে কিনা পুরো একটা টার্কির নাড়িভুঁড়ি বের করে নিতে পারত, চালে ভরা বস্তা তুলতে পারত, সে কিনা চোখে তরল ওষুধ ঢালতে পারছে না। প্রথমে অবাক হলাম, তারপর হাসি পেল। চারদিকে ঘুরে দেখলাম, খুবই সামান্য একটা ঘর। দেয়ালের সাথে লাগানো সরু একটা বিছানা, একটা ঢ্যাঙা টেবিল আর ঘরের কোণে একটা ছাইরঙা ধাতব বাক্স, ওটাতেই মনে হয় সবকিছু রাখে।
‘এসো, আমি ওষুধটা ঢেলে দিচ্ছি’, বলে আমি হাতে নিয়ে ওষুধের শিশির মুখটা খুললাম।
‘কাছে এসো না’, ও আবার বলল।
আমি ততক্ষণে কাছে চলে গেছি। ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লাম আর ও দ্রুতগতিতে চোখের পাতা ফেলতে লাগল।
‘কুংফুতে যেমন হয়, সেভাবে নিশ্বাস নাও।’
আমি ওর চোখের নিচের পাতা হালকা টেনে এক ফোঁটা ওষুধ দিয়ে দিলাম। অন্য চোখের পাতাটা আরও আস্তে টান দিলাম, কারণ ততক্ষণে ও চোখটা শক্ত করে বন্ধ করে ফেলেছে।
‘হয়ে গেছে। ব্যথা দেওয়ার জন্য দুঃখিত’, আমি বললাম।
রাফায়েল চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল। ওর মুখ এক অন্য রকম বিস্ময়ে চকচক করছিল। আমি নিজেকে কখনোই প্রশংসা পাওয়ার মতো ভাবিনি। আমার বিজ্ঞান ক্লাসের কথা মনে হলো, নিজেকে মনে হলো একটা ছোট্ট শস্যের বীজ, মাটি ফুঁড়ে সবুজ হয়ে বেড়ে উঠছে আলোর মুখ দেখতে। ও আমার হাত ধরল, আমি যাওয়ার জন্য উঠলাম।
‘কাল সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে আগে আবার আসব’, আমি বললাম।
সকালে চুপটি করে আমি ওর ঘরে গেলাম, চোখে ওষুধ দিয়ে আবার চুপচাপ বেরিয়ে বাবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম স্কুলে যাওয়ার জন্য।
তিন দিনের মাথায় রাফায়েলের আসবাবের বাহুল্যহীন ঘরটা আমার বেশ পরিচিত হয়ে উঠল। ওষুধ দিতে দিতে আমি ওর কিছু বিষয় কাছ থেকে লক্ষ করলাম। ওর ওপরের ঠোঁটের ওপর নতুন গজানো গোঁফের রেখা, হনু আর ঘাড়ের মধ্যের অংশে দাদের একটা দাগ। আমি ওর বিছানার ধার ঘেঁষে বসতাম আর ‘স্নেক ইন দ্য মাংকিস শ্যাডো’ ছবিটা নিয়ে কথা বলতাম। আমরা এই ছবিটা নিয়ে অনেকবার আলোচনা করেছি, যে কথাগুলো তখন বলেছি তা আগেও বলেছি, কিন্তু ওই ঘরটার নিস্তব্ধতা কথাগুলোতে এক গোপনীয় ভাব যোগ করত। আমরা অনেক আস্তে কথা বলতাম, অনেকটা ফিসফিস করে। ওর গায়ের তাপ আমাকে উষ্ণ রাখত।
সাপের ভঙ্গি দেখাতে ও উঠে দাঁড়াত, আর তারপর আমরা হাসতে শুরু করতাম। হাসতে হাসতে ও আমার হাত চেপে ধরত, পরক্ষণেই ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে সরে যেত।
‘অ্যাপোলো চলে গিয়েছে’, ও একদিন বলল।
আমি তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখ একদম পরিষ্কার। আমার মনে হচ্ছিল, ও এত জলদি সেরে না উঠলেই বরং ভালো হতো।
সেদিন আমি স্বপ্ন দেখলাম রাফায়েল আর ব্রুস লির সাথে একটা খোলা মাঠে, কুংফুর প্রস্তুতি নিচ্ছি।
যখন জেগে উঠলাম, চোখ খুলতে পারছিলাম না। টেনে চোখের পাতা আলাদা করলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখ জ্বালা আর চুলকানি শুরু হয়ে গেল। যতবার চোখের পাতা এক করছিলাম, বিশ্রী ঘন আঠালো তরল আমার পলকগুলো আটকে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন উত্তপ্ত বালুর দানা আমার চোখের ঢাকনার নিচে জমে আছে। ভয় হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমার মধ্যে এমন কিছু গলে যাচ্ছে, যা গলার কথা নয়।
মা রাফায়েলের ওপর প্রচণ্ড চিৎকার করল। ‘কেন? কেন তুমি এই জিনিস আমার ঘরে আনলে?’ মনে হচ্ছিল যেন রাফায়েল অ্যাপোলোর সাথে ষড়যন্ত্র করে আমাকে আক্রান্ত করিয়েছে। রাফায়েল চুপ করে ছিল, মা চিৎকার করলে ও সব সময়ই চুপ করে থাকত। ও দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ির নিচে আর মা সিড়ির সবচেয়ে উঁচু তাকটাতে।
‘ও তোমাকে ওর ঘর থেকে কিভাবে সংক্রমিত করল?’, বাবা জিজ্ঞেস করল।
‘রাফায়েল না, বোধ হয় আমার ক্লাসের কারও থেকে সংক্রমণ হয়েছে’, আমি বললাম।
‘কে?’, মা জিজ্ঞেস করল। আমার বোঝা উচিত ছিল, কারণ মা জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার সমস্ত বন্ধুর নাম ভুলে গেলাম।
‘কে?’, মা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘ছিডি ওবি’, আমি বললাম শেষ অব্দি, এই নামটাই মনে এলো। ছেলেটা ক্লাসে আমার সামনে বসত আর পুরোনো বাসি কাপড়ের গন্ধ ছড়াত।
মা জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার মাথাব্যথা আছে?’
‘হ্যাঁ।’
বাবা আমায় প্যারাসিটামল এনে দিল। মা ডা. ইগবোকউইকে ফোন দিল। তারা ভালোই চটপটে ছিল, দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে বাবার বানিয়ে দেওয়া মিলো খেতে দেখছিল। আমি তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করলাম। প্রার্থনা করছিলাম তারা যেন চেয়ার টেনে আমার ঘরে বসে না পড়ে যেমনটা তারা আমার যেবার ম্যালেরিয়া হয়েছিল, তখন করেছিল। যতবার আমি জ্বর থেকে তেতো মুখ নিয়ে জেগে উঠতাম, কয়েক ইঞ্চি দূরেই বাবা-মায়ের কাউকে না কাউকে চেয়ারে বই নিয়ে বসে পড়তে দেখতাম। আমি তখন আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে চাইতাম তাদের মুক্তি দিতে।
ডা. ইগবোকউই এসে আমার চোখে ছোট্ট একটা টর্চ দিয়ে আলো ফেলল। তার গায়ের সুগন্ধি বেশ কড়া, সে চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরও সুগন্ধির ঘ্রাণ রয়ে যায়। ঘ্রাণটা অ্যালকোহলের কাছাকাছি, ভাবলেই বমি পেয়ে যায়। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর বাবা-মা আমার বিছানার পাশে একটা ‘রোগীর পথ্য’ ধরনের সাজাল। একটা টেবিল কাপড় দিয়ে ঢেকে তার ওপর একটা কমলার স্বাদের গ্লুকোজেড, একটা নীল টিনের কৌটায় গ্লুকোজ আর সদ্য খোলা কমলার কোয়া প্লাস্টিকের ট্রেতে করে রেখে দিল। তারা চেয়ার টেনে ঘরে বসে থাকল না, কিন্তু পুরো সপ্তাহ পালা বদলে কেউ না কেউ সারা দিন বাসায় থাকত, যত দিন অ্যাপোলো ছিল আরকি। তারা পালা করে আমার চোখে তরল ওষুধ দিয়ে দিত, মায়ের চেয়ে বাবার হাত কাঁপত বেশি। যার ফলে আমার গাল বেয়ে আঠালো তরল নেমে আসত মাঝেমধ্যেই। তারা জানতই না যে আমি কত নিখুঁতভাবে নিজেই চোখে ওষুধ দিতে জানি। যতবার তারা ওষুধের বোতল চোখের ওপর তুলে ধরত, আমার প্রথম দিন সন্ধ্যার রাফায়েলের মুখটা মনে পড়ে যেত, আর একটা আনন্দের ঢেউ বুকে আছড়ে পড়ত।
বাবা-মা জানালার পর্দা টেনে আমার ঘর অন্ধকার রাখত। আমি বিছানায় শুয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার রাফায়েলকে দেখতে ইচ্ছে করত, কিন্তু মা ওকে আমার রুমে ঢুকতে একেবারে নিষেধ করে দিয়েছে এমনভাবে যেন ও আমার অবস্থা আরও খারাপ করে দেবে। আমি চাইতাম ও এসে আমার সাথে দেখা করুক। ও বিছানার চাদর পাল্টানো কিংবা বাথরুমে বালতি আনার বাহানায় এই ঘরে আসতেই পারে। আসছে না কেন? ও আমার কাছে ক্ষমাও চাইল না। আমি ওর গলা শুনতে চাইতাম, কিন্তু রান্নাঘর ছিল অনেক দূরে, আর ও মায়ের সাথে কথা বলত খুব আস্তে।
একদিন আমি বাথরুম যাওয়ার পর রান্নাঘরে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় বাবার কাছে ধরা পড়ে গেলাম।
‘কেডু? তুমি ঠিক আছ?’, বাবা জিজ্ঞেস করল।
‘পানি খাব’, আমি বললাম।
‘তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো, আমি নিয়ে আসছি, যাও।’
শেষে একদিন আমার বাবা-মা একত্রে বাইরে গেল। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, কিন্তু ঘরের নিস্তব্ধতা টের পেয়ে উঠে দৌড়ে নিচে রান্নাঘরে গেলাম। রান্নাঘর খালি ছিল। ভাবলাম রাফায়েল ওর ঘরে কিনা, যদিও দিনের বেলা সাধারণত ও সেখানে যায় না। কিন্তু বাবা-মা বাসায় নেই, তাই যেতেও পারে। আমি খোলা বারান্দাটায় গেলাম। রাফায়েলকে দেখার আগেই আমি ওর গলা শুনলাম, পানির ট্যাংকের পাশে দাঁড়িয়ে পা বালুতে গেঁথে প্রফেসর নওসুর কাজের মেয়ে জোসেফাইনের সাথে কথা বলছে। প্রফেসর নওসু মাঝেমধ্যেই তার পোল্ট্রি থেকে আমাদের ডিম পাঠায় আর আমার বাবা-মাকে কখনোই তার দাম দিতে দেয় না। জোসেফাইন কি ডিম নিয়ে এলো? মেয়েটা লম্বা আর পুষ্ট, দেখে মনে হচ্ছে এরা বিদায় নেওয়ার পর এখন শুধু শুধুই কথা দীর্ঘায়িত করছে। রাফায়েলকে মেয়েটার সামনে অন্য রকম লাগছে, অবনমিত পিঠ, অধীর পা, লজ্জাও পাচ্ছে দেখলাম। মেয়েটা ওর সাথে একটা কৌতুকপূর্ণ ঢঙে কথা বলছিল, যেন ওর মধ্যে থাকা যা কিছু ওকে মুগ্ধ করে, সব দেখতে পাচ্ছিল। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
‘রাফায়েল’, আমি ডাকলাম।
ও ঘুরে তাকাল। ‘ওহ ওকেনওয়া, নিচে আসার অনুমতি আছে তোমার?’
ও কথাটা এমনভাবে বলল যেন আমি কোনো বাচ্চা, যেন ওর ফ্যাকাশে ঘরটায় আমি ওর সাথে কখনোই বসে সময় কাটাইনি।
‘আমার খিদে পেয়েছে। খাবার কোথায়?’, আমার মাথায় এই কথাটাই সবার আগে এলো, কিন্তু একটু মেজাজি গলা শোনানোর চেষ্টায় কথাটা খুবই উগ্র শোনাল।
জোসেফাইন মুখ ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরল, যেন অনেক কষ্টে দমকা হাসি আটকে রেখেছে। রাফায়েল এমন কিছু বলেছে যা হয়তো আমি শুনতে পাইনি, কিন্তু আমার মন বিশ্বাসঘাতকতার আভাস ঠিকই পেয়ে গিয়েছিল। মা-বাবা ঠিক সে সময়েই ফিরে এলো, গাড়ির আওয়াজে রাফায়েল আর জোসেফাইন দুজনেই সতর্ক হলো। জোসেফাইন উঠোনের বাইরের দিকে চলে গেল, আর রাফায়েল আমার দিকে চলে এলো। ওর শার্টের সামনের দিকে দাগ লেগে ছিল, কিছুটা কমলা রঙের, সুগন্ধি সাবানে পাম তেলের মতো। যদি মা-বাবা না ফিরত, তবে ও ওখানেই থাকত, পানির ট্যাংকের পাশে, কথায় বিভোর। আমার উপস্থিতি কোনো বদল ঘটাত না।
‘কী খেতে চাও?’ ও জিজ্ঞেস করল।
‘তুমি আমায় দেখতে এলে না?’
‘তুমি তো জানো, ম্যাডাম বলেছে তোমার কাছে না যেতে।’
ও সবকিছু এত সাধারণভাবে কীভাবে নিচ্ছিল? মা আমাকেও নিষেধ করেছিল, কিন্তু আমি তো ওর কাছে গিয়েছি। রোজ ওর চোখে ওষুধ দিয়ে দিয়েছি।
‘যাহোক, আমাকে অ্যাপোলো তো তুমিই দিয়েছিলে,’ আমি বললাম।
‘দুঃখিত,’ খুব হালকাভাবে বলল ও, নিশ্চিতভাবে ওর মন ছিল অন্য কোথাও।
আমি মায়ের গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। তারা ফিরে আসায় মেজাজ খারাপ লাগছিল। রাফায়েলের সাথে থাকার মতো আমার সময় কমে গেল, মনে হলো বুকের কোথাও ফাটল ধরেছে।
‘কলা খাবে নাকি মিষ্টি আলু?’
রাফায়েল জিজ্ঞেস করল, কিন্তু আমাকে শান্ত করতে না, এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেন কিছুই হয়নি। আমার চোখ জ্বালা করতে শুরু করল। ও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলো। আমি ওর থেকে দূরে সরতে গেলাম তাড়াহুড়ো করে, বারান্দার কিনারায় কখন চলে গেছি খেয়ালই করলাম না। আমার পায়ের রাবারের চটি হঠাৎ পিছলে গেল। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম। হাঁটু গেড়ে হাতের ওপর উপুড় হয়ে পড়লাম, নিজের ভার সহ্য করতে পারলাম না, আটকানোর কোনোরকম চেষ্টা করার আগেই চোখের পানি গাল বেয়ে নেমে এলো। অপমানে কাঠ হয়ে যাওয়া আমি একটুও নড়লাম না।
বাবা-মা চলে এলো।
‘ওকেনওয়া,’ বাবা চিৎকার করে উঠল।
আমি মাটিতেই উপুড় হয়ে রইলাম, হাঁটুতে একটা কাঁকর ঢুকে গিয়েছিল। ‘রাফায়েল আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।’
‘হোয়াট?’ আমার মা-বাবা দুজনে একই সাথে ইংরেজিতে চিৎকার করে উঠল।
আমার হাতে সময় ছিল। আমার বাবা রাফায়েলের দিকে তাকানোর আগে, আমার মা ওর দিকে মারার ভঙ্গিতে তেড়ে যাওয়ার আগে, তারপর ওকে সব জিনিসপত্র নিয়ে দ্রুত বিদায় হতে বলার আগে, আমার হাতে সময় ছিল। আমি বলতে পারতাম, আমার মুখ খুলতে পারতাম। বলতে পারতাম যে, এটা একটা দুর্ঘটনা ছিল। আমি পারতাম বাবা-মাকে চমকে দিয়ে আমার মিথ্যেটা ফিরিয়ে নিতে, আমি পারতাম। ·
লেখক পরিচিতি : চিমামান্ডা নগোজি আদিচে। মাত্র বিয়াল্লিশ বছরের এই লেখিকার বিস্তার ছড়িয়ে আছে উপন্যাস, ছোটগল্প থেকে শুরু করে নন-ফিকশন অব্দি। দ্য টাইমস লিটারেরি সাপ্লিমেন্টের মতে, ‘সমালোচক দ্বারা বহুল প্রশংসিত তরুণ অ্যাংলোফোনিক সাহিত্যিক যারা নতুন প্রজন্মকে আফ্রিকান সাহিত্যের দিকে আকর্ষণ করছে, তাদের মধ্যে চিমামান্ডা বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।’ একজন আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখক এবং বিখ্যাত আন্তর্জাতিক নারীবাদী মুখ হিসেবে তার জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বর্তমানে তাকে জীবিত আফ্রিকান মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করা হয়। ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়ে তার বই এখন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু দিন শেষে সে সবাইকে শুধু একটি কথাই বলে যায় বারবার, ‘আমি শুধু একজন লেখিকা, আর নিজেকে তাই ভাবতে পছন্দ করি।’ তার অ্যাপোলো গল্পটি ২০১৫ সালে দ্য নিউইয়র্কার পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।


0 মন্তব্যসমূহ