অস্কার ওয়াইল্ডের গল্প : সুখী রাজপুত্র


অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

হরের সব থেকে উঁচু যে জায়গাটি আছে, সেখানে লম্বা একটি স্তম্ভে সুখী রাজপুত্রের মূর্তি বানিয়ে রাখা আছে। সারা শরীর তার সোনার তবকে মোড়া। দুটি আঁখির জন্য উজ্জ্বল দুটি নীলকান্তমণি। আর ওর তরবারির হাতলে বিশাল একটি চুনী জ্বলজ্বল করে।

বাস্তবিকই ওর অনেক তারিফ করা হত। ‘আবহাওয়া জানিয়ে দেবার পাখির মতই ও সুন্দর,’ শহরের একজন পারিষদ মন্তব্যটি করেছিলেন। শিল্পকলা প্রভৃতির সমঝদার হিসেবে সুনাম পাওয়ার লোভে। ‘তবে জিনিসটি তেমন কিছু কাজের উপযোগী নয়।’ পাছে জনসাধারণ ওঁকে ব্যবহারিক বুদ্ধিহীন বলে ধরে নেয়। উনি তো আর সত্যি সত্যিই নির্বোধ ছিলেন না।

‘তোমরা সুখী রাজপুত্রের মত হতে পার না কেন?’ একজন বিচক্ষণ মা তাঁর শিশু পুত্রকে চাঁদের জন্য বায়না করে কান্না জুড়ে দেওয়ায় ওর কাছে জানতে চাইলেন। ‘সুখী রাজপুত্র তো কোনও কিছুর জন্য কাঁদার কথা কল্পনাতেও ভাবতে পারে না!’

‘পৃথিবীতে অন্তত এমন একজন আছে যে সর্বদাই সুখী, এই কথা ভেবে আমি খুব আনন্দ পাই,’ অপরূপ মূর্তিটির পানে তাকিয়ে হতাশ মানুষটি বিড়বিড় করে বললেন। ‘ওকে দেবদূতের মত দেখাচ্ছে,’ উজ্জ্বল লাল রঙের ক্লোক আর সাফসুতরো ঢিলে সাদা আঙরাখা পরে খয়রাতির শিশুরা গির্জা থেকে বেরিয়ে আসার সময় বলে উঠল।

‘তোমরা কী করে জানো?’ গণিতের মাস্টারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা তো এই রকম কাউকে কখনওই দেখনি।’

‘তা কেন হবে! আমরা স্বপ্নে দেখেছি,’ শিশুরা জবাব দিল। গণিতের মাস্টারমশাই ভুরু কোঁচ করে চোয়াল শক্ত করে ফেললেন। শিশুদের স্বপ্ন দেখা উনি মোটেও অনুমোদন করতেন না।

একদিন রাতে, ছোট্ট একটি দোয়েল পাখি শহরটির ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ওর বন্ধুরা ছ’সপ্তাহ আগেই মিশরে চলে গেছে। কিন্তু ও যায়নি, কারণ ও পরমাসুন্দরী একটি খাগড়ার প্রেমে পড়ে গেছিল। সেই বছর বসন্তের শুরুতে নদীর ওপর দিয়ে হলদে রঙের মোটাসোটা একটি মথের পেছন পেছন ধাওয়া করতে করতে সেই খাগড়াটির তন্বী কটিদেশ দেখে এতই আকর্ষিত হয়ে পড়ল যে ওর সঙ্গে গল্প করার জন্য যাত্রায় বিরতি নিল।

‘আমি কি তোমাকে ভালবাসতে পারি?’ ধানাই পানাই না করে সরাসরি আসল কথাটি দোয়েল পাখিটি বলেই ফেলল আর খাগড়াটিও লজ্জারুণ চোখে দোয়েল পাখির প্রেম স্বীকার করে নিল। অতএব দোয়েল পাখিটি আহ্লাদিত হয়ে খাগড়াটির চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে লাগল, ডানাজোড়াকে জলসিক্ত করে নিল আর রুপোলি তরঙ্গ তুলল। এটিই ছিল দোয়েলয়ের প্রেম নিবেদন, পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে এই প্রেম নিবেদন চলতেই থাকল।

‘কী বোকা বোকা প্রেম,’ অন্য দোয়েল পাখিরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, ‘একে তো মেয়েটির টাকাপয়সা কিছুই নেই, তার ওপর আবার ওদের রাবণের গুষ্ঠি!’ বাস্তবিকই নদী জুড়ে খাগড়াদের অরণ্য আর অরণ্য। তারপর হেমন্ত আসতে না আসতেই দোয়েল পাখিরা উড়ে চলে গেল।

ওরা চলে যাবার পর দোয়েল পাখিটির নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হতে লাগল। প্রেমিকাকে নিয়েও ও ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ‘ও তো কথাই বলতে পারে না,’ ও নিজের মনেই বলল, ‘আর ও নির্ঘাৎ ছিনাল মেয়ে, সারাক্ষণ কেবল হাওয়ার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতেই থাকে!’ বাতাস বইলে, সত্যিই তো খাগড়ারা রঙিলীদের মত তালে তালে নাচে! ‘মেনে নিচ্ছি যে মেয়েটি বেশ ঘরকুনো,’ ও ভাবতে লাগল, ;তবে আমি বেড়াতে খুব ভালবাসি, তাই আমার বউয়েরও ঘোরার নেশা থাকা দরকার।’

‘তুমি কি আমার সঙ্গে বেড়াতে যাবে?’ শেষমেশ দোয়েল প্রেমিকাকে জিজ্ঞেস করেই ফেলল। তবে খাগড়াটি এতই ঘরকুনো যে মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়েই দিল যে ও যাবে না।

‘তুমি আমার সঙ্গে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছিলে?’ রাগ করে দোয়েল বলেই ফেলল, ‘আমি পিরামিড দেখতে চললাম। বিদায়!’ তারপর রওনা হয়ে গেল।

সারাদিন ধরে উড়ে চলল। রাতে এসে পৌঁছল শহরে। ‘কোথায় কাটাই এই রাত্তিরবেলা?’ মনে মনে ভাবল। ‘আশা করি থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছে।’

আর ঠিক তখনই লম্বা স্তম্ভে বানিয়ে রাখা মূর্তিটি ওর নজরে পড়ল। ‘আমি ওখানেই থাকব,’ উল্লসিত হয়ে বলল। ‘খুবই ভাল জায়গায়, আর প্রচুর তাজা বাতাস।’ অতঃপর সুখী রাজপুত্রের দুই পায়ের ফাঁকে এসে নামল।

‘আমার শোবার ঘরটি সোনায় মোড়া,’ খুশি মনে চারদিকটি দেখতে দেখতে নিজের কাছেই বিড়বিড় করে বলল। তারপর ঘুমোনোর আয়োজন করতে লাগল। যেই পাখনায় মাথা রেখে শুয়েছে, জলের একটি বিশাল একটি ফোঁটা টপ করে ওর গায়ে এসে পড়ল। ‘তাজ্জব ব্যাপার তো!’ ও চেঁচিয়ে উঠল। ‘আকাশে তো এক বিন্দুও মেঘ নেই। তারারাও ঝকঝকে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে! তা সত্ত্বেও বৃষ্টি পড়ছে? ইউরোপের উত্তরদিকের আবহাওয়াটা রীতিমত বিচ্ছিরি! খাগড়াটি বৃষ্টি ভালবাসত বটে, কিন্তু সেটিকে স্বার্থপরতা আর কী বলে যেতে পারে!’

আর ঠিক তখনই আরেকটি বড় ফোঁটা পড়ল।

‘বৃষ্টির জল যদি আটকাতেই না পারল, তাহলে আর মূর্তির কী কাজ?’ ও বলল। ‘ভাল একটি চিমনির খোঁজ করে দেখি বরং।’ মোটামুটি উড়ে যাওয়ার জন্য ডানা খুলেই ফেলেছিল। আর তখনই তিন নম্বর ফোটাটি পড়ল। ওপরে চোখ তুলে চাইল – আর কী দৃশ্যই না দেখল!

সুখী রাজপুত্রের দু’চোখে জল টল টল করছে। আর চোখের জল সোনালি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। চাঁদের আলোয় এমন অনিন্দ্যসুন্দর লাগছে ওর মুখখানি, ছোট্ট দোয়েলয়ের মায়া হল।

‘কে তুমি?’ জানতে চাইল।

‘আমি হলেম সুখী রাজপুত্র।’

‘তাহলে তুমি কাঁদছ কেন?’ দোয়েল জিজ্ঞেস করল। তুমি তো আমায় ভিজিয়ে একসা করে দিয়েছ।’

‘আমি যখন বেঁচে ছিলাম আর মানুষের হৃদয় ছিল,’ মূর্তিটি জবাব দিল, ‘চোখের জল বলতে কী বোঝায় আমি জানতামই না। তখন যে আমি সানস-সুচি রাজপ্রাসাদে থাকতাম। সেই প্রাসাদে দুঃখ কষ্টের প্রবেশ নিষেধ ছিল। দুনের বেলা বন্ধুদের সঙ্গে আমি বাগানে খেলাধুলা করতাম। আর সন্ধ্যেবেলা বড় হলঘরে আমি সর্দার নাচিয়ে হয়ে সবার সঙ্গে নৃত্য করতাম। বাগান ঘিরে লম্বা পাঁচিল তোলা ছিল। সেই পাঁচিলের ওপারে কী রয়েছে আমি কখনও জানতে চাইনি। আমার চারপাশ খুবই সুন্দর ছিল। সভাসদরা আমাকে সুখী রাজপুত্র বলত, আর সুখ বলতে যদি আনন্দকে বোঝায়, তাহলে আমিত সত্যিই সুখী ছিলাম। এভাবেই আমি বেঁচে ছিলাম, এভাবেই আমি মরে গেলাম। মরে যাওয়ার পর ওরা আমাকে এত উঁচু জায়গায় লাগিয়ে দিল যে আমার এই শহরের যা কিছু কুৎসিত, যা কিছু দুর্দশা, আমি সব দেখতে পাই। যদিও আমার হৃদয় এখন সীসা দিয়ে তৈরি, আমি না কেঁদে থাকতেই পারি না।

তাহলে উনি সোনা দিয়ে তৈরি নন,’ দোয়েল পাখিটি মনে মনেই বলল। ও এতই ভদ্র ছিল যে যে কোনো ব্যক্তিগত মন্তব্যই উচ্চস্বরে করত না। রুক্ষ, ফোলা ছুঁচ ফুটে ফুটে লাল হয়ে ওঠা

‘অনেক দূরে, সুরেলা মৃদু কণ্ঠে মূর্তি বলে চলল, ‘অ-নে-ক দূরে, ওই ছোট্ট গলিতে ভারি গরীব একটি কুঁড়ে ঘর আছে। একটি জানলা খোলা আছে। সেই জানলা দেখতে পাচ্ছি একজন মহিলা টেবিলের পাশে বসে আছেন। রুগ্ন মুখ, শীর্ণ চেহারা। সেলাই করার সময় অনেকবার ছুঁচ ফুটে যাওয়ায় ওঁর রুক্ষ হাত ফুলে লাল হয়ে গেছে। উনি সুক্ষ্ম সীবনশিল্পী। সাটিনের একটি গাউনে উনি সূচিকর্ম করে প্রেমের ফুল তুলছেন। রানীর পরমাসুন্দরী কুমারী উচ্চসম্মানিতা সহচরী পরবর্তী সভানৃত্যে নৃত্য পরিবেশন করার সময় সেই গাউনটি পরবেন। ঘরের কোণে একটি বিছানায় ওঁর শিশুপুত্র অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে। ওর খুব জ্বর হয়ে। ও কমলালেবু খাবার বায়না ধরেছে। অথচ ওর মায়ের ওকে নদীর জল ছাড়া শিশুকে আর কিছু খাওয়ানোর সামর্থ্য নেই। দোয়েল পাখি, আমার ছোট্ট দোয়েল পাখি, আমার তরবারীর হাতল থেকে চুনিটি খুলে নিয়ে গিয়ে কি মা’কে দিয়ে আসবে না? আমার পা দুখানি তো এই স্তম্ভের পাদদেশে গাঁথা। আমি তো নড়তে পারি না।’

‘সবাই তো মিশরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে,’ দোয়েল পাখিটি বলে উঠল। ‘আমার বন্ধুরা নীল নদীর এপারে ওপারে উড়ে যাচ্ছে। বিশাল পদ্মফুলের সঙ্গে গল্প করছে। একটু পরেই তো ওরা বড় রাজার কবরে ঘুমোতে চলে যাবে। রাজা নিজেই তো ওঁর রঙ করা কবরে শুয়ে আছেন। হলদে রঙের কাপড়ে ওঁকে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। মশলা দিয়ে ওঁর শরীর সুরক্ষিত করে রাখা আছে। পান্নার কণ্ঠহার মলিন হয়ে গেছে। ওঁর হাতদুটি হলদে হয়ে যাওয়া পাতার মত শুষ্ক।’

‘দোয়েল পাখি, আমার ছোট্ট দোয়েল পাখি,’ রাজপুত্র মিনতি করে বলল, ‘তুমি কি একটি রাতের জন্য আমার সঙ্গে থেকে আমার দূত হতে পার না? শিশুটি এত তৃষ্ণার্ত আর ওর মা এত বিষণ্ণ!’

‘আমার মনে হয়না যে ছেলেদের আমি পছন্দ করি,’ দোয়ল পাখি জবাব দিল। গত
বছর, গ্রীষ্মের সময়, যখন আমি নদীর ধারে ছিলাম – দু’দুটো দুষ্টু ছেলে আসত ওখানে – জাঁতাওয়ালার ছেলে, আমাকে লক্ষ্য করে খালি ঢিল ছুঁড়ত। অবশ্য আমাকে আঘাত করতে পারেনি – আমরা, দোয়েল পাখিরা খুব ভাল উড়তে পারি। তাছাড়া আমি আবার চটপটে বংশের সন্তান। তাও অসম্মান তো বুকে লাগেই!’

কিন্তু সুখী রাজপুত্রকে বিষণ্ণ হয়ে থাকতে দেখে দোয়েলের কষ্ট হল। ‘খুব শীত পড়েছে এখানে,' ও বলল। ‘তবুও এক রাতের জন্য তোমার কাছে থাকব, তোমার দূত হব।’

‘আমি অতিশয় কৃতজ্ঞ, ছোট্ট দোয়েল আমার,’ রাজপুত্র বলল।

অতএব দোয়েল পাখিটি বিশাল চুনীটি রাজপুত্রের তরবারী থেকে খুলে নিয়ে ঠোঁটে করে শহরের ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগল।

গির্জার মিনারের পাশ দিয়ে গেল, সেখানে সাদা মর্মর দিয়ে খোদাই করা দেবদূতদের মূর্তি রয়েছে। রাজপ্রাসাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে নুপুরের রিনিঝিনি ভেসে এল। অলিন্দে সুন্দরী মেয়েটি ওর প্রেমিককে সঙ্গে করে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। ‘আকাশের তারাদের কী চমৎকারই না লাগছে,’ ছেলেটি প্রেমিকাকে বলে উঠল, ‘আর ভালবাসার শক্তি কতই না অটল!’ ‘আশা করছি, সভানৃত্য আরম্ভ হবার আগেই আমার পোশাক তৈরি হয়ে যাবে,’ মেয়েটি হেসে বলল। আমি বলে দিয়েছি পোশাকটিতে যেন সূচিকর্ম করে প্রেমের ফুল তোলা হয়। কিন্তু কী যে বলি, সীবনশিল্পী মহিলারা এতই অলস হয়!’

নদীর ওপর দিয়ে উড়ে চলল দোয়েল পাখি। দেখল, জাহাজের মাস্তুল থেকে লন্ঠন ঝোলানো। ইহুদিদের মহল্লার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে দেখল বৃদ্ধ ইহুদিরা এক অপরের সঙ্গে দর কষাকষি করছে। তামার ওলন দাড়িতে করে মূদ্রা ওজন করছে।এই ভাবে অনেক জায়গা পেরিয়ে, দরিদ্র সেই বাসস্থানে এসে পড়ল দোয়েল। বাড়ির ভেতরে উঁকি মারল। বাচ্চা ছেলেটি জ্বরের ঘোরে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে। মা এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন যে ওঁর চোখ জুড়িয়ে এসেছে। উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। লাফ দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। সেলাইয়ের জন্য অঙ্গুলিত্রানের পাশেই যে টেবিলটি, সেখানেই বড় চুনীটি রেখে দিল। তারপর নিঃশব্দে বিছানাটির ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে পাখনা দিয়ে শিশুটির মাথায় বাতাস করে দিল। ‘আহ! কী আরাম লাগছে শরীরে,’ ছেলেটি বলে উঠল। ‘মনে হচ্ছে আমার জ্বর সেরে যাচ্ছে।’ শান্ত হয়ে ও ঘুমিয়ে পড়ল।

এরপর দোয়েল পাখিটি আবার উড়তে উড়তে সুখী রাজপুত্রের কাছে ফিরে গেল। কী কী করে এল, সব রাজপুত্রকে বলল। ‘খুব তাজ্জব ব্যাপার,’ শেষে মন্তব্য করল, ‘এত শীত পড়েছে, অথচ কী উষ্ণ লাগছে আমার!’

‘তার কারণ হল, তুমি ভাল করেছে, তাই,’ রাজপুত্র বলল ওকে। কথাটি ভাবতে ভাবতে ছোট্ট দোয়েল পাখি ঘুমিয়ে পড়ল। ভাবপ্নাচিন্তা করলেই ওর চোখ ঘুমে জুড়িয়ে আসে।

তারপর যখন আলো ফুটল, সকাল হয়ে গেল, ও নদীতে গিয়ে স্নান করে নিল।

‘কি বিস্ময়কর ঘটনা!’ সেতু দিয়ে যেতে যেতে পাখি বিজ্ঞানী অধ্যাপক বলে উঠলেন। ‘শীতকালে দোয়েল পাখি!। স্থানীয় সংবাদপত্রে এটি নিয়ে বিশাল একটি চিঠি লিখে ফেললেন। সকলেই চিঠি থেকে অনেক কিছুই উদ্ধৃতি দিয়ে বলল, কারণ সেই চিঠিতে এমন সব বাক্য রয়েছে, যা অনেকের বোধগম্যই হয়নি।

‘আজ রাতে আমি মিশরে যাবই,’ দোয়েল পাখিটি যেতে পারার সম্ভাবনায় উৎসাহিত হয়ে বলে ফেলল। সর্বসাধারণের জন্য তৈরি সমস্ত স্মৃতিসৌধগুলি ঘুরে এল। গির্জার চূড়ায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। যেখানেই গেছে, চড়াই পাখিরা হইচই করে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছে, ‘অপরিচিত কিন্তু কি বিশিষ্ট একজন অতিথি!’ কথাগুলি শুনে দোয়েল পাখির বুক গর্বে ফুলে উঠল।

তারপর যখন সন্ধে হয়ে গেল, আকাশে চাঁদ উঠল, ও উড়তে উড়তে সুখী রাজপুত্রের কাছে চলে এল। ‘মিশরে তোমার কোনও কিছু করবার মত কাজ আছে?’ বড় মুখ করে ও বলল। ‘আমি আজ রওনা হচ্ছি।’

‘দোয়েল পাখি, আমার ছোট্ট দোয়েল পাখি,’ রাজপুত্র মিনতি করে বলল, ‘তুমি কি আরও একটি রাতের জন্য আমার কাছে থাকতে পারবে না?’

‘মিশরে সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে,’ দোয়েল পাখি জবাব দিল। ‘কাল আমার বন্ধুরা দ্বিতীয় ঝর্ণার কাছে পৌঁছে যাবে। সিন্ধুঘোটকরা ওখানে নলখাগড়ায় শুয়ে বিশ্রাম করে, আর মেমনন দেব গ্রানাইটের বিশাল সিংহাসনে বসে থাকেন। সমস্ত রাত ধরে উনি তারাদের দিকে নজর রাখেন। প্রভাতী নক্ষত্র যখন জ্বলে উঠে ঝকঝক করতে থাকে, উনি একবার য়াহ্লাদ ব্যক্ত করেন। তারপর মৌন অবলম্বন করেন। দুপুরবেলা হলদে সিংহরা জল খাবার জন্য নদীর ধারে চলে আসে। পান্না-সবুজ ওদের চোখগুলি। আর ওরা ঝর্ণার থেকেও বেশি শব্দ করে গর্জন করে।’

‘দোয়েল পাখি, দোয়েল পাখি, ছোট্ট দোয়েল পাখি আমার,’ রাজপুত্র বলল, ‘শহর পেরিয়ে অনেক দূরে, চিলেকোঠায় বসে থাকা এক তরুণকে দেখতে পাচ্ছি আমি। কাগজ ভর্তি একটি টেবিলে ঘাড় হেঁট করে আছে। পাশেই একটি গেলাসে শুকনো বেগনি ফুলের তোড়া রাখা। মসৃণ, বাদামি রঙের চুল ওর, ডালিমের মত টুকটুকে লাল ঠোঁট ওর, আর কি স্বপ্নমাখা চোখদুখানি! নাট্য পরিচালকের জন্য একটি নাটক লিখে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু এত শীত করছে ওর, কলম ধরে লিখতেই পারছে না। চুল্লীতে আগুন জ্বালাতে পারেনি। আর এত খিদে পেয়েছে যে অজ্ঞান হয়ে যাবে।’

‘ঠিক আছে, আরও একটি রাত আমি তোমার সঙ্গে থাকব,’ দোয়েল পাখিটির হৃদয় খুবই কোমল। ‘ওর জন্য কি আরও একটি চুনী নিয়ে যেতে হবে?’

‘হায়! আমার তো আর চুনী নেই,’ রাজপুত্র বলল। ‘আমার কেবল এক জোড়া চোখই রয়েছে। অমূল্য নীলকান্তমণি দিয়ে তৈরি। অনেক হাজার বছর আগে ভারত থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। একটি মণি খুবলে বের করে নিয়ে ছেলেটির কাছে নিয়ে যাও। মণিকারের কাছে সেটি ও বিক্রি করে দিতে পারবে। সেই টাকা দিয়ে খাবার কিনতে পারবে, আগুন জ্বালানোর কাঠ নিয়ে আসতে পারবে। তাহলে লেখাটি শেষ করতে পারবে।’

‘প্রিয় রাজপুত্র আমার,’ দোয়েল পাখি বলে উঠল, ‘এই কাজটি আমি কিছুতেই করতে পারব না!’ দোয়েল পাখি কাঁদতে আরম্ভ করল।

‘দোয়েল পাখি, দোয়েল পাখি, ছোট্ট দোয়েল পাখি,’ রাজপুত্র বলল, ‘তোমাকে যে কাজ করতে বললাম, তুমি সেটিই কর।’

অতএব দোয়েল পাখিটি রাজপুত্রের একটি চোখ খুবলে তুলে নিয়ে ছাত্রের চিলেকোঠার উদ্দেশ্যে উড়ে চলে গেল। চিলেকোঠার ছাদে বিশাল গর্ত, তাই ভেতরে যাওয়া খুবই সোজা। এই গর্ত দিয়ে ও ঘরে ঢুকে পড়ল। তরুণ ছেলেটি হাতে মাথা গুঁজে বসেছিল,। পাখির ডানার ঝাপটানি শুনতেই পায়নি। মাথা তুলে যখন তাকাল, দেখল শুকনো বেগনি ফুলের মধ্যে সুন্দর একটি নীলকান্তমণি।

‘আস্তে আস্তে অনেকেই আমার প্রশংসা করতে আরম্ভ করেছে,’ উত্তেজিত হয়ে ছেলেটি বলে উঠল। ‘আমার কোনও মহান ভক্ত নিশ্চয়ই পাঠিয়েছে! এবার আমি নাটকটি লেখা শেষ করে ফেলতে পারব।’ ওকে তখন বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছিল।

পরের দিন দোয়েল পাখি সমুদ্রবন্দরে উড়ে গেল। বিশাল একটি জাহাজের মাস্তুলে বসে নাবিকরা কীভাবে রশি বেঁধে বড় বড় সিন্দুকগুলি জাহাজের খোল থেকে বের করছে সেটিই দেখতে লাগল। এক একটি সিন্দুক বেরিয়ে আসতেই জোরে জোরে ‘হেঁইয়ো মারো সম্ভালো’ বলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হাঁক দিচ্ছে। ‘আমি মিশরে চললাম!’ দোয়েল পাখিটি উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল, কিন্তু কেউই ওর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল না। যখন চাঁদ উঠল, ও উড়তে উড়তে সুখী রাজপুত্রের কাছে চলে এল।

‘তোমার কাছে বিদায় চাইবার জন্য এলাম,’ বড় গলা করে বলল কথাটি।

‘দোয়েল পাখি, দোয়েল পাখি, ছোট্ট দোয়েল পাখি আমার,’ রাজপুত্র বলে উঠল। ‘আরও একটি মাত্র রাত তুমি আমার কাছে থাকবে না?’

‘এখন যে শীতকাল,’ দোয়েল জবাব দিল। ‘খুব শিগগিরই এখানে তুষার পড়তে শুরু করবে। মিশরে খেজুর গাছের মাথা থেকে আসা সূর্যের আলো খুব আরামের হয়। কুমীররা কাদার মধ্যে শুয়ে শুয়ে অলস চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার বন্ধুবান্ধবরা বালবেক মন্দিরে ঘর বাঁধতে লেগে পড়েছে। গোলাপি আর সাদা ঘুঘুরা ওদের দেখছে। এক অন্যের সঙ্গে বকবকম বকবকম করছে। প্রিয় রাজপুত্র আমার, তোমাকে ছেড়ে আমাকে যেতেই হবে। কিন্তু তোমাকে আমি কোনও দিনই ভুলতে পারব না। পরের বসন্তে আমি তোমার জন্য সুন্দর দুটি রত্ন নিয়ে আসব। যে দুটি মণি তুমি দিয়ে দিয়েছ, তাদের জায়গায় লাগানোর জন্য। লাল গোলাপের থেকেও অনেক বেশি লাল হবে চুনীটি। আর নীলকান্তমণিট হবে সমুদ্রের নীলের থেকেও অনেক বেশি নীল হবে।।‘

‘নীচের চত্বরে,’ সুখী রাজপুত্র বলল, ‘দেশলাইয়ের বাক্স বিক্রি করা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। ওর সবকটি বাক্সই নর্দমায় পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে না পারলে, ওর বাবা ওকে মারবে। তাই ও কাঁদছে। ওর জুতো বা মোজা কিছুই নেই, ছোট্ট মাথাটি ঢাকবার জন্য রুমালও নেই। আমার অন্য চোখটি খুবলে তুলে নিয়ে ওকে দিয়ে এস। তাহলে আর ওর বাবা ওকে মারবে না।’

‘তোমার সঙ্গে আমি আরও একটি রাত থেকে যাব,’ দোয়েল পাখি বলল, ‘তবে তোমার ওই চোখটি আমি খুবলে তুলে নিতে পারব না। তুমি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাবে।’

‘দোয়েল পাখি, দোয়েল পাখি, ছোট্ট দোয়েল পাখি আমার,’ রাজপুত্র বলে উঠল, ‘যা করতে বললাম, সেটিই কর।’

অতএব দোয়েল পাখিটি রাজপুত্রের অন্য চোখটি খুবলে তুলে নিয়ে নীচে চলে এল। দেশলাই বিক্রি করা মেয়েটির মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় মণিটি ওর হাতের তালুর ওপরে ফেলে দিল। ‘কি সুন্দর এই কাচের টুকরোটি,’ আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল ছোট্ট মেয়েটি। হাসতে হাসতে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুট লাগাল।

এর পর দোয়েল পাখিটি রাজপুত্রের কাছে ফিরে এল। ‘তুমি অন্ধ হয়ে গেছ,’ ও বলে উঠল। ‘তাই এখন থেকে আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।’

‘না গো, ছোট্ট দোয়েল পাখি আমার,’ অসহায় রাজপুত্র বলে উঠল, ‘এবার তোমার মিশরে চলে যাওয়াই উচিত।’

‘আমি সব সময় তোমার সঙ্গেই থাকব,’ দোয়েল পাখিটি বলে দিল। তারপর রাজপুত্রের পায়ের কাছেই ঘুমিয়ে পড়ল।

তারপরের দিন, সমস্ত দিন ধরে ও রাজপুত্রের কাঁধের ওপর বসে রইল আর যে সব আজব দেশে গেছিল সেই সব দেশের আজব গল্প শোনাতে থাকল। রক্তবর্ণ আইবিস পাখিদের কথা বলল, যারা সারি বেঁধে নীল নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সোনালি ঠোঁট দিয়ে সোনালি চীনে মাছ শিকার করে। স্ফিংস-এর গল্প শোনায়, যে নাকি পৃথিবীর মতই প্রাচীন, মরুভূমিতেই থাকে আর সব কিছু জানে। ব্যবসায়ীদের কথা বলে, যারা নিজের নিজের উটের পাশে পাশে আস্তে আস্তে চলে। ওদের হাতে ধরা থাকে হলদে স্ফটিকের পুতির মালা। চাঁদের পাহাড়ের রাজার কথা শোনায়, আবলুশ কাঠের মত কুচকুচে কালো যার অঙ্গ, আর যিনি বিশাল স্ফটিকের পুজো করেন। সবুজ রঙের সাপের গল্প বলে, খেজুর গাছে শুয়ে ওরা ঘুমোয়। ওর কুড়িজন পুরোহিত আছে, যারা ওকে মৌচাকের মধু খাওয়ায়। বামনদের কথা বলে যারা চেপটা পাতার ওপর বসে সাঁতার দিয়ে বড় দীঘি পার হয়ে যায়, কিন্তু প্রজাপতিদের সঙ্গে লড়াই বেঁধেই থাকে।

‘আমার সোনা ছোট্ট দোয়েল পাখি,’ রাজপুত্র বলে উঠল, ‘তুমি আমাকে কত রকম অবাক হবার মত ঘটনার কথা বললে। কিন্তু সব থেকে বেশি অবাক হবার মত ঘটনাটি হল পুরুষ এবং নারীর কষ্ট। দুঃখের চেয়ে বড় আর কোনও রহস্য নেই। আমার এই শহরের ওপর দিয়ে একবার উড়ে দেখে এস, ছোট্ট দোয়েল পাখি, আর কী কী দেখতে পেলে আমাকে এসে বল।’

অতএব বিশাল সেই শহরটি ওপর দিয়ে উড়ে এল দোয়েল পাখিটি। ধনী মানুষেরা তাদের সুন্দর সুন্দর বাড়িতে থেকে নাচ, গান আর আনন্দ করায় মেতে আছে, অথচ গরীব ভিখিরিরা সেই সব বাড়ির প্রবেশদ্বারের সামনে ভিক্ষে করার জন্য বসে আছে। অন্ধকার অলিগলিতে উড়ে উড়ে দেখল। ক্ষুধার্ত শিশুদের পাণ্ডুর মুখগুলো কালো রাস্তার দিকে উদাসনভাবে তাকিয়ে আছে। একটি সেতুর খিলানের নীচে দুটি শিশু একে অপরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। পরস্পরকে উষ্ণ রাখার তাগিদে। ‘কি খিদেটাই না লেগেছে আমাদের!’ কাতর কণ্ঠে বলল ওরা। ‘খবরদার এখানে শুয়ে থাকবি না!’ ওরা বাধ্য হয়ে বাইরে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল।

সব দেখে নেওয়ার পর দোয়েল পাখিটি রাজপুত্রকে গিয়ে সব কিছু বলল।

‘আমার শরীরটি তো সোনার তবকে মোড়া,’ রাজপুত্র বলল, ‘খুলে নাও এই সব সোনার তবক একটি একটি করে। আমার গরীব প্রজাদের কাছে বিলিয়ে দাও। যারা বেঁচে আছে তারা সর্বদা ভাবে, সোনা পেলে সুখী হওয়া যায়।’

একটি একটি করে সোনার তবক দোয়েল পাখি খুলে নিল। তারপর সুখী রাজপুত্রকে খুব মলিন আর ধূসর দেখাচ্ছিল। সোনার তবকগুলি গরীব মানুষদের কাছে নিয়ে গেল। শিশুদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উৎফুল্ল হয়ে ওরা রাস্তাতেই হাসতে হাসতে খেলাধূলা করতে লাগল। ‘এখন আমাদের খাবার জন্য রুটি আছে!’ ওরা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল।

এরপর তুষারপাত হতে লাগল, আবহাওয়া হিমশীতল হয়ে উঠল, বরফ জমতে লাগল। এত চকচক করত যে রাস্তা দেখে মনে হত যেন রুপো দিয়ে তৈরি। বাড়ির ছাদ থেকে স্ফটিকের তরবারির মত বরফ ঝুলে থাকত। সবাই পশমের পোষাক পরতে লাগল। ছোট ছেলেরা লাল টুপি পরে বরফের ওপর স্কেটিং করে।

বেচারা দোয়েল পাখির খুব ঠাণ্ডা লাগছে। দিনে দিনে আরও বেশি করে ঠাণ্ডা পড়ছে। কিন্তু রাজপুত্রকে ছেড়ে চলে যাবার কথা কল্পনাই করতে পারে না। রাজপুত্রকে ও যে খুব ভালবাসে। রুটিওয়ালা অন্যমনস্ক থাকলে ওর দরজার কাছে থেকে রুটির টুকরো তুলে নেয়। ডানা ঝাপটে ঝাপটে নিজেকে গরম রাখার চেষ্টা করে।

অবশ্য অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝে গেল যে ওর আর বেঁচে থাকার কোনও আশা নেই। যে বলটুকু তখনও অবশিষ্ট রয়েছে সেটি কাজে লাগিয়ে ও রাজপত্রের কাঁধের গিয়ে শেষবারের মত বসল। ‘প্রিয় রাজপুত্র আমার, বিদায়!; গুনগুন করে বলল। ‘একবারের জন্য তোমার হাতে চুমু খেতে দেবে?’

‘জেনে ভাল লাগল যে তুমি মিশরের জন্য রওনা হচ্ছ, ছোট্ট সোনা দোয়েল পাখি আমার!’ রাজপুত্র বলল। ‘অনেক লম্বা সময় ধরে তোমাকে থেকে যেতে হল। হাতে নয়, তুমি আমাকে ঠোঁটে চুমু খাও। আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।’

‘মিশরে যাচ্ছি না আমি,’ দোয়েল পাখি বলে উঠল। ‘মৃত্যুর দেশে চললাম আমি। মৃত্যুই তো নিদ্রার নিজের ভাই হয়, তাই না?’

সুখীর রাজপুত্রের ঠোঁটে চুমু খেয়ে, দোয়েল পাখিটি ওর পায়ের কাছে লুটিয়ে মরে পড়ল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মূর্তিটি ভেতরে ফাটল ধরার আওয়াজ শোনা গেল। কিছু একটি জিনিস ভেঙে গেল। আসলে সীসার তৈরি হৃদয়টি ঠিক মাঝখান বরাবর দুই টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। বরফ নিশ্চয়ই জমে শক্ত হয়ে গেছিল।

পরের দিন ভোর হতে না হতেই নগরপাল পারিষদদের নিয়ে নীচের চত্বরের পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলেন। স্তম্ভের কাছাকাছি আসার পরে চোখ তুলে মূর্তিটির পানে চাইলেন। ‘হে ভগবান! সুখী রাজপুত্রকে কী বাজে দেখাচ্ছে!’ উনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন।

‘সত্যি, কী বাজেই না দেখাচ্ছে!’ পারিষদরা বলে উঠলেন। নগরপাল যা বলেন, এঁরা সেও সব কথাতেই সায় দিয়ে থাকেন। ওঁরাও চোখ তুলে মূর্তিটি দিকে তাকালেন।

‘ওঁর তরবারির হাতল থেকে চুনীটি খসে পড়ে গেছে। ওঁর চোখজোড়াও খুবলে নিয়েছে কেউ। ওঁকেও আর সোনার মূর্তি বলে মনেই হচ্ছে না!’ নগরপাল বললেন। ‘সত্যি বলতে কি, ওঁকে একটি ভিখিরির থেকে সামান্য একটু ভাল দেখাচ্ছে!’

‘একটি ভিখিরির থেকে সামান্য একটু ভাল,’ পারিষদরা তাল দিলেন।

তাছাড়া, মৃত একটি পাখিও ওঁর পায়ের কাছে মরে পড়ে আছে!’ মেয়র বলে যেতে লাগলেন। ‘অবিলম্বে একটি ফতোয়া জারি করার খুব দরকার যে কোনও পাখিকে এখানে মতরে দেওয়া যাবে না!’ নগরের করণিকরা পরামর্শটি লিখে নিল।

অতএব ওরা সুখী রাজপুত্রের মূর্তিটি টেনে নামিয়ে ফেলল। ‘এখন তো মূর্তিটি আর সুন্দর নেই, তাই আর ওটির কোনও উপযোগিতা নেই।’ বললেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের অধ্যাপক।

তারপর ওরা মূর্তিটিকে চুল্লীতে ফেলে গলিয়ে ফেলল। ধাতুটি নিয়ে কী করা হবে তা নির্ধারণের জন্য নগরপাল পৌরভায় একটি সভা করেন। ‘আরেকটি মূর্তি বসানোর প্রয়োজন খুব দরকার,’ উনি বললেন। ‘আর মূর্তিটি আমারই হবে।’

‘মূর্তিটি আমারই হবে,’ প্রত্যেক পারিষদই কথাটির পুনরাবৃত্তি করলেন আর নিজদের মধ্যে ঝগড়া করতে লাগলেন। যখন শেষবারকানে এল, তখনও ওঁরাঝগড়া করেই চলছেন।

‘কী আজব ব্যাপার!’ কারখানায় শ্রমিকদের তত্ত্বাবধায়ক বলে ফেললেন। ‘ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যাওয়া সীসের হৃদয়টি চুল্লিতে ফেলেও গলানো যাচ্ছে না! ওটি টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে।’ ওরা সেটিকে আস্তাকুড়ে ছড়ে ফেলে দিল। দোয়েল পাখির মৃতদেহটিও ওখানেই পড়ে আছে।

‘শহরের সব থেকে বেশি মূল্যবান জিনিস দুটি আমার কাছে নিয়ে এস তো,’ ঈশ্বর ওঁর একজন দেবদূতকে বললেন। দেবদূত সেই সীসের হৃদয় আর মৃত পাখিটি নিয়ে এল।

‘তুমি একেবারে ঠিক জিনিস দুটি নিয়ে এসেছ,’ ঈশ্বর বললেন। ‘আমার স্বর্গোদ্দ্যানে ছোট্ট পাখিটি চিরদিন গান শোনাবে আর সোনার শহরে সুখী রাজপুত্র আমার প্রশস্তি করবে।’ ·


মূল গল্প : দ্য হ্যাপি প্রিন্স, অস্কার ওয়াইল্ড।

লেখক পরিচিতি : অস্কার ওয়াইল্ড (১৮৫৪-১৯০০) ইংরেজি-সাহিত্যের বিশ্ববন্দিত নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, এবং কবি। জন্ম আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে। ইংরেজিভাষার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের একজন তিনি। ভিক্টোরীয় যুগের লন্ডনে অন্যতম সফল নাট্যকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শ্লেষাত্মক এবং তীব্র প্রহসনের কারণে তাঁর নাটক আজও সার্বজনীন এবং চিরন্তন। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে প্যারিস শহরে মারা যান অস্কার ওয়াইল্ড।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ