তায়েব সালিহ'র গল্প : এক মুঠো খেজুর


অনুবাদ : তুতুন বিশ্বাস

মি তখন নিশ্চয়ই খুব ছোট ছিলাম। ঠিক কত বছর বয়স ছিল তা আমি মনে করতে পারি না। কিন্তু যখন লোকজন আমাকে আমার দাদার সঙ্গে দেখত, তারা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত এবং গালে আলতো করে চিমটি কাটত—যা তারা আমার দাদার সঙ্গে করত না—এগুলো আমি মনে করতে পারি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমি কখনো বাবার সঙ্গে বাইরে যেতাম না, বরং দাদাই আমাকে সর্বত্র সঙ্গে নিয়ে যেত। শুধু সকালগুলো ছাড়া। কারণ সকালে আমি মসজিদে যেতাম কোরান শেখার জন্য।

মসজিদ, নদী এবং ক্ষেত—এই ছিল আমাদের জীবনের চিহ্নস্বরূপ জায়গা। আমার বয়সী অন্য বাচ্চারা মসজিদে গিয়ে কোরান শেখা নিয়ে অভিযোগ করত। কিন্তু আমি তা ভীষণ পছন্দ করতাম। নিশ্চয়ই এর কারণ ছিল—আমি মুখস্থ করতে খুব দ্রুত পারতাম, আর শেখ সাহেব অতিথি এলে আমাকে দাঁড় করিয়ে “আর-রহমান” সূরা আবৃত্তি করতে বলতেন। অতিথিরা তখন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং গালে চিমটি কাটতেন—যেমন লোকেরা আমাকে দাদার সঙ্গে দেখলে করত।

হ্যাঁ, আমি মসজিদকে ভালোবাসতাম, আর নদীকে-ও ভালোবাসতাম। সকালে কোরান পড়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি কাঠের তক্তাটি ফেলে দিতাম এবং দৌড়ে যেতাম মায়ের কাছে। তাড়াহুড়ো করে নাস্তা খেয়ে আমি নদীতে সাঁতার কাটতে চলে যেতাম। সাঁতার কেটে ক্লান্ত হয়ে গেলে আমি নদীর পাড়ে বসতাম এবং সেই সরু জলধারাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। জলধারাটি পূর্ব দিকে গাঢ় কাসিয়ার জঙ্গলের পেছনে মিলিয়ে যেত।

আমি কল্পনা করতে ভালোবাসতাম—ওই জঙ্গলের পেছনে বিশালদেহী মানুষের একটি গোত্র বাস করে। তারা একেবারে আমার দাদার মতো লম্বা ও সরু, সাদা দাড়ি আর ধারালো নাকের মানুষ। দাদা আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে সবসময় আঙুলের ডগা দিয়ে নাকের ডগায় ঘষতেন। তার দাড়ি ছিল নরম, ঘন, আর তুলোর মতো সাদা—আমার জীবনে আমি কখনো এত সাদা কিংবা এত সুন্দর কিছু দেখিনি। দাদা নিশ্চয়ই খুব লম্বা ছিলেন, কারণ আমি কখনো কাউকে দেখিনি তাকে কথা বলতে গিয়ে নিচের দিকে তাকাতে হয়েছে। আর যখন তিনি কোনো ঘরে ঢুকতেন, তাকে ঝুঁকতে হতো এমনভাবে —যা আমাকে সেই নদীর কথা মনে করিয়ে দিত, যে নদী কাসিয়া-জঙ্গলের পেছনে বাঁক নিয়ে মিলিয়ে যায়।

আমি দাদাকে খুব ভালোবাসতাম, এবং ভাবতাম—আমি বড় হয়ে তার মতোই লম্বা আর সরু হব, এবং তার মতো বড় বড় পা ফেলে হাঁটব।

আমি বিশ্বাস করি, আমি দাদার সবচেয়ে প্রিয় নাতি ছিলাম। আশ্চর্যের কিছু নেই—কারণ আমার চাচাতো ভাইরা ছিল একেবারে বোকার দল, আর আমি—মানুষ বলত—চটপটে আর বুদ্ধিমান ছিলাম। দাদা কখন চান আমি হাসি, আর কখন চুপ থাকি সেটা আমি বুঝতে পারতাম । আমি তার নামাজের সময় মনে রাখতাম এবং তিনি বলার আগেই তার জন্য জায়নামাজ নিয়ে যেতাম এবং ওজুর জন্য কলস ভরে দিতাম। যখন তার কোনো কাজ না থাকত, তিনি আমার কাছ থেকে সুন্দর সুরে কোরান পড়া শুনতে ভালোবাসতেন। আমি তা তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারতাম।

একদিন আমি তাকে আমাদের প্রতিবেশী মাসউদকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
আমি বললাম, “দাদা, আমার মনে হয় আপনি আমাদের প্রতিবেশী মাসউদকে পছন্দ করেন না?”

দাদা নাকের ডগায় আঙুল বুলিয়ে বললেন, “সে অলস মানুষ। এমন মানুষকে আমি পছন্দ করি না।”

আমি বললাম, “অলস মানুষ বলতে কী?”

দাদা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর সামনে বিস্তৃত ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখো—ওখানে মরুভূমির কিনারা থেকে নীলনদের তীর পর্যন্ত যতটা বিস্তৃত জমি—ওটা একশ ফেদ্দান জমি। ওই সব খেজুর গাছগুলো দেখছ? আর ওই সান্ত, কাসিয়া আর সায়াল গাছগুলো? এগুলো সব মাসউদের বাপের থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার।”

আমি দাদার কথার দাগ অনুসরণ করে সেই বিস্তৃত জমির দিকে তাকালাম। আমি ভেবেছিলাম—কে জমির মালিক তা আমার কোনো ব্যাপার নয়। ওই মাটি, ওই গাছ, ওই খেজুর—সেগুলোই আমার কল্পনার মাঠ এবং খেলার জায়গা।

দাদা আবার বললেন, “হ্যাঁ, আমার ছেলে—চল্লিশ বছর আগে সবই মাসউদের ছিল। এখন তার দুই-তৃতীয়াংশ আমার।”

এটা আমার জন্য নতুন সংবাদ ছিল। আমি ভাবতাম যে জমিগুলো প্রাচীনকাল থেকে দাদারই।

তিনি বললেন, “আমি যখন প্রথম এই গ্রামে এসেছিলাম, তখন আমার এক ফেদ্দানও জমি ছিল না। সবই ছিল মাসউদের। কিন্তু এখন অবস্থা বদলে গেছে। আর আল্লাহ আমাকে ডাকার আগে আমি বাকি এক-তৃতীয়াংশটাও কিনে নেব।”

আমি জানি না কেন, কিন্তু দাদার এই কথায় আমার হঠাৎ ভয় হলো। আর মাসউদের জন্য হলো গভীর দুঃখ। আমি চাইছিলাম দাদা যেন এমন না করেন। আমি মাসউদের গান মনে করলাম—তার সুন্দর কণ্ঠস্বর, জলের কলকল শব্দের মতো তিনি হাসতেন। দাদা কখনো হাসতেন না।

আমি দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “মাসউদ তার জমি কেন বিক্রি করলেন?”

দাদা বললেন, “মহিলারা।” তিনি এই শব্দটি উচ্চারণ করলেন এমনভাবে যে মনে হলো—‘মহিলা’ শব্দটি ভয়ের কোনো ব্যাপার। “মাসউদ অনেকবার বিয়ে করেছে। যখনই সে বিয়ে করেছে, সে আমাকে এক-দুই ফেদ্দান জমি বিক্রি করেছে।”

আমি মাথায় হিসেব করলাম—তাহলে মাসউদ তো নব্বইটা বিয়ে করেছেন! তারপর মনে পড়ল—তার তিনজন স্ত্রী আছে, আর আছে তার ছেঁড়া জামা, পঙ্গু গাধা আর ভাঙা জিন।

এর মধ্যে আমরা দেখলাম মাসউদ আমাদের দিকে আসছে।
তিনি বললেন, “আজ আমরা খেজুর কাটব। তোমরা আসবে না?”

আমার মনে হলো—সে আসলে চায় না দাদা আসুক। কিন্তু দাদা তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখে সামান্য জ্বলে উঠল। তিনি আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে গেলেন।

দাদার জন্য কেউ একটি গরুর চামড়া ঢাকা পিঁড়ি এনে দিল, আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে অনেক লোক ছিল, কিন্তু আমি তাদের চিনতাম। তবুও, আমার চোখ বারবার মাসউদের দিকে যাচ্ছিল। লোকজনের ভিড় থেকে আলাদা দাঁড়িয়ে ছিল তিনি। —যেন খেজুর কাটার কাজে তার কোনো আগ্রহ নেই—যদিও খেজুর গাছগুলো তারই।

কখনো কখনো ওপর থেকে পতিত বড় বড় খেজুরের থোকা পড়ার শব্দে তিনি তাকাতেন। খুব উঁচু খেজুর গাছের মাথায় বসে লম্বা ধারালো দা দিয়ে খেজুর কাটছিল একটি ছেলে। তাকে একবার তিনি ডাক দিয়ে বললেন,

“সাবধানে কাটো! খেজুর গাছের হৃদয় যেন না কেটে যায়।”

কেউ তার কথায় গুরুত্ব দিল না।
গাছের চূড়ায় বসা ছেলেটি আগের মতো দ্রুততার সঙ্গে দা চালাতে লাগল। এক সময় থোকাটা আকাশ থেকে নেমে আসা কিছু একটা’র মতো ভেঙে পড়ে নিচে এল।

আমি তখন “খেজুর গাছের হৃদয়” কথাটাই ভাবছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল—খেজুর গাছও হয়তো মানুষের মতো অনুভব করে, কাঁদে, কষ্ট পায়। মনে পড়ল—একবার আমি ছোট খেজুর গাছের কোমল পাতায় হাত দিচ্ছিলাম, তখন মাসউদ আমাকে বলেছিলেন—
“খেজুর গাছ, বুঝলে ছেলে, মানুষের মতোই আনন্দ আর দুঃখ অনুভব করে।”
আমি তখন অকারণে লজ্জা পেয়েছিলাম।

আমি মাঠের দিকে তাকালাম। আমার বয়সী ছেলেরা খেজুর গাছের গোড়ায় পিঁপড়ের মতো ভিড় করছে, তারা খেজুর কুড়িয়ে খাচ্ছে, আর কিছু জমা করছে। খেজুরগুলোকে পরে বড় ঢিপির মতো স্তূপ করে রাখা হলো।

লোকজন এল এবং খেজুরগুলো মাপে মাপে দণ্ডায়মান দাঁড়িপাল্লায় ওজন করল। তারপর সেগুলো বস্তায় ভরা হলো। আমি ত্রিশটা বস্তা গণনা করলাম।

ধীরে ধীরে লোকজন সরে গেল। শুধু রইল— হোসেইন। সে একজন খেজুর ব্যবসায়ী।
আমাদের ক্ষেতের পূবদিকের প্রতিবেশী—মুসা। আর দুইজন অপরিচিত লোক — তাদেরকে আমি আগে কখনো দেখি নি।

আমি হালকা শিসের শব্দ শুনলাম এবং দেখলাম দাদা ঘুমিয়ে পড়েছেন।মাসউদও প্রায় একইভাবে দাঁড়িয়ে আ ছে। তিনি এখন গাছের একটি শুকনো ডাল মুখে চিবুচ্ছেন শুধু এমনভাবে যেন কেউ পেট ভরে খেয়ে কী করবে বুঝতে পারছে না।

হঠাৎ দাদা জেগে উঠলেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং খেজুরের বস্তাগুলোর দিকে এগোলেন। হোসেইন, মুসা এবং সেই দুই অপরিচিত লোক তাকে অনুসরণ করল। মাসউদও খুব ধীরে ধীরে এগোতে লাগলেন—যেন তার মন চায় তিনি ফিরে যান, কিন্তু শরীর তাকে এগোতে বাধ্য করছে।

তারা বস্তাগুলোর চারপাশে একটি বৃত্ত তৈরি করল। কেউ কেউ বস্তা থেকে খেজুর নিয়ে চিবাতে লাগল। দাদা আমাকে এক মুঠো খেজুর দিলেন। আমি খেতে শুরু করলাম।

আমি দেখলাম—মাসউদ দুই হাত ভর্তি করে খেজুর নিলেন, নাকে তুলে গন্ধ নিলেন, তারপর আস্তে করে সেগুলো ফিরিয়ে রাখলেন।

এরপর তারা বস্তাগুলো ভাগ করা শুরু করল—
হোসেইন ব্যবসায়ী নিল দশটা।দুই অপরিচিত লোক নিল প্রতি জন পাঁচটা। মুসা নিল পাঁচটা। আর দাদা নিলেন পাঁচটা।

আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমি মাসউদের দিকে তাকালাম—তার চোখ এদিক-ওদিক ছুটছে—যেন দুইটি ইঁদুর বাড়ি ফেরার পথ খুঁজছে।

দাদা তখন মাসউদকে বললেন:
“তোমার এখনো আমার কাছে পঞ্চাশ পাউন্ড ধার বাকি আছে। পরে কথা বলব।”

হোসেইনের লোকজন গাধা আনল। দুই অপরিচিত লোক উট আনল। বস্তাগুলো গাধা ও উটের ওপরে তোলা হলো। গাধাদের একজন জোরে ডেকে উঠল। উটগুলো গলায় ফেনা তুলে চিৎকার করতে লাগল।

আমি অনুভব করলাম—আমি মাসউদের দিকে এগোচ্ছি। আমার হাত যেন তার জামার কিনারা স্পর্শ করতে চাইছে। আমি তার গলা থেকে এক ধরনের শব্দ শুনলাম—যেন জবাই হতে থাকা ভেড়া কষ্টে শ্বাস নিচ্ছে।

অকারণেই আমার বুকের মধ্যে তীক্ষ্ণ ব্যথা উঠল। আমি দৌড়ে পালালাম। দাদা আমাকে ডাকলেন—
আমি থামতে চেয়েছিলাম, কিন্তু থামলাম না। দৌড়ে চললাম।

সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম— আমি দাদাকে ঘৃণা করছি। দৌড়াতে দৌড়াতে আমার মনে হলো— আমি যেন এমন একটি গোপন ভার বয়ে নিয়ে যাচ্ছি যা ফেলে দিতে হবে।

যেখানে নদী কাসিয়ার জঙ্গলের পেছনে বাঁক নেয় সেই নদীর মোড়টিতে আমি পৌঁছালাম। এবং আমি না বুঝেই— আমার আঙুল গলায় ঢুকিয়ে আমি সবে খাওয়া খেজুরগুলো বমি করে ফেললাম। ·


লেখক পরিচিতি : আরবি ভাষার লেখক, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও সাংবাদিক তায়েব সালিহর জন্ম ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে, সুদানের আল-শামালিয়াহ প্রদেশ। তাঁর রচনা আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক জীবনের ছেদ অন্বেষণ করে। তাঁকে বিশ শতকের অন্যতম বিশিষ্ট আরব লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক সমালোচকের কাছে তিনি আরবি উপন্যাসের প্রতিভা’ উপাধি অর্জন করেছিলেন। ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে ৮০ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ