বানু মুস্তাকের গল্প : হৃদয়ের আলো


ইংরেজি থেকে অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

র্ধেক ভেজানো দরজাটা ঠেলে মেহরুন সবে একটা পা ঘরের ভেতর রেখেছে। বৈঠকখানার ডিভানে শুয়ে ওর বড়দা’র সঙ্গে কোনও একটা ব্যাপার নিয়ে নিচু গলায় আলাপ করছেন। আলাপ বন্ধ করে ওঁরা দুজনেই ওর দিকে তাকালেন। ঠিক তখনই রাবেয়া, ওর ভাইঝি, ছুটে ভেতরের ঘর থেকে দৌড়ে এসে বলতে লাগল, ‘মেহরুন ফুপ্পু এসেছে—মেহরুন ফুপ্পু এসেছে।’ 

আমান, মেহরুনের মেজদা আর রাবেয়ার বাবা, নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। দাড়ি কামাবার সাবানের ফেনা ওঁর থুতনিতে লাগানো আর সাবান লাগানোর ব্রাশটা তখনও হাতে ধরা। বৈঠকখানায় দাঁড়িয়ে উনি বোনের দিকেই তাকিয়ে রইলেন, যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। ওর বড়দি আতিগে, যিনি সুর করে বাচ্চাদের কোরান পড়াচ্ছিলেন, ওকে দেখার জন্যই বসার ঘরে চলে এলেন। খেয়ালই করেননি যে শাড়ির আঁচলটা মাথা থেকে খসে পড়ার মত হয়ে গেছে। রোগা হাতে প্রার্থনা করার তসবিহর মালা ধরে ওর মা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন জানতে চাইছেন, ‘এটা কি সত্যিই দেখছি? সত্যিই দেখছি?’ 

ওর দুজন ছোট বোন—রেহানা আর সাবিহা—বসার ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে লাগল। রান্নাঘরে ওরা যে চাপাতি সেঁকছিল সেগুলো যে তাওয়ার ওপরেই পুড়ে যাচ্ছিল সেটা খেয়ালই করল না। ভাগ্য ভাল যে ওর ছোট ভাই আতিফ বাড়িতে নেই।

মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়ি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। ব্যাপারটা ভীষণ অচেনা লাগল ওর। যে মা ওকে ন’মাস গর্ভে ধারণ করেছেন, ওকে বড় করে তুলেছেন, একবারের জন্যও বলে উঠলেন না, ‘আরে, তুই এসেছিস? আয় ভেতরে আয়, সোনা।’ আর ওর বাবা—ছোট্ট মেয়েটা ওঁর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে এত খুশি হতেন— তিনি সামান্য একটু হেসেও ওকে সাদর অভ্যর্থনা করলেন না। ওর বড়দাও কিছু বললেন না, অথচ আগে কত গর্বের সঙ্গেই বলতেন, ‘আমার পরি, আমার ফেরেস্তা’। আমানও কিছু বলল না, যে কিনা ওকে কলেজে ভর্তি করার জন্য জোরাজুরি করত। ওঁদের বিবিরাও ওর দিকে এমন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল যেন ও ভিনগ্রহের প্রাণী।

মেহরুনের খুব কষ্ট হচ্ছিল। ওর ন’মাসের মেয়েটা যখন ওর কোল থেকেই তীক্ষ্ণ গলায় কেঁদে উঠল, তখনই সবাই নড়েচড়ে উঠল। ওর বড়দা জিগ্যেস করল, ‘ইনায়াত কোথায়?’
মেহরুন মাথা নিচু করে ফেলল, যেন ও বিশাল কোনও গুনাহ করে ফেলেছে। বলল, ‘ও শহরে নেই।’
‘তাহলে কার সাথে এলি তুই?’
‘একাই এসেছি আমি।’
‘একা?’ সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন। ও তখনও চৌকাঠের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।

‘ফারুক, ওকে ভেতরে নিয়ে যা।’ বড়দা ওই ফতোয়াটা জারি করে দেবার পর মেহরুন ভেতরে ঢুকল। পা দুটোই খুবই ভারি আর অস্থির লাগছে ওর। বাড়িটাকে আদালত বলে মনে হচ্ছে। বাচ্চাটা চিলচিৎকার জুড়ে দিল। বোরখা না খুলে ও নকাবটা একটু ওপরে তুলে দিল। বাবার বিছানায় কোণ ঘেঁষে বসে মাইটা বাচ্চার মুখে গুঁজে দিল। ওর হাতমুখ ধোয়া হয়নি। বাচ্চাটা্র দুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর পেটটা জ্বলতে শুরু করল। গতকাল রাত্তির থেকে ওর কিছুই খাওয়া হয়নি। কথা বলার সময় একমাত্র মা ছাড়া আর কোনও মহিলাই থাকতে পারবে না।
‘মেহের, এখানে আসার আগে বাড়ির কাউকে জানিয়েছিলি কি?’
‘না।’
‘কেন? চলে আসার আগে ওদের জানালি না কেন? তুই কি ঠিকই করে নিয়েছিস যে আমাদের মুখ পুড়িয়ে ছাড়বি?’
‘কাকেই বা জানাতাম? কে ছিল ওখানে? শেষবার যখন ও বাড়ি এসেছিল, সেটা এক সপ্তাহ হয়ে গেছে। ও কোথায় যাচ্ছে আমাকে কিছুই জানায়নি। তোমাদের সবাইকেই চিঠি লিখেছিলাম। তোমরা তো জবাবই দাওনি। আমি বেঁচে থাকব নাকি মরে যাব, তোমরা তো কোনও পরোয়া করনি।’
‘তুই লিখেছিলি তোর বর নাকি কে একজন নার্সের সঙ্গে চলে গেছিল। আর তুই ভেবে নিলি যে কথাটা আমরা বিশ্বাস করব?’
‘বিশ্বাসই যদি না করে থাকো, তোমাদের তো এসে খোঁজ নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। অনেকেই তো ওদের দুজনকে একসাথে থাকতে দেখেছিল।’
‘তা আমরা গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করে কী করতাম? ওকে পাকড়াও করে ব্যাপারটা নিয়ে জিগ্যেস করতাম? ধর যে ও বলত কথাটা সত্যি—আমরা তাহলে কী করতে পারতাম? মসজিদের গিয়ে দরখাস্ত করে আসতাম? ও হয়ত বলত, আমার গোস্তাকি হয়ে গেছে। আমি ওকে মুসলিম করে তারপর নিকাহ্‌ করব। তাহলে ও তোর সতীন হয়ে যেত। ধর, আমরা ওকে আরও কড়া করে কিছু বলে দিতাম! তখন যদি ও বলত যে আমি মেহরুন নামের এই মেয়েটাকে চাই না। আমি ওকে তালাক দিচ্ছি—তাহলে আমরা কী বলতে পারতাম?’

ততক্ষণে মেহরুন হাপুসনয়নে কাঁদতে আরম্ভ করেছে। অন্য মাইয়ে বাচ্চার মুখটা গুঁজে দিয়ে ওকে খাওয়াতে লাগল। বোরখার তলা থেকে আঁচলটা টেনে বের করে চোখের আর নাকের জল মুছতে লাগল। সবাই কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল।

‘তার মানে তোমরা বলতে চাইছ যে তোমরা কেউই কিছু করতে পারবে না, তাই তো?’ কেউ কিছু বলল না। মেহরুন আগের কথার রেশ ধরে বলতে লাগল, ‘আমি তোমাদের পায়ের ওপর পড়েছিলাম। বলেছিলাম আমি বিয়ে করতে চাই না। আমার মিনতি শুনেছিলে তোমরা? বলেছিলাম আমি বোরখা পরে কলেজে যাব। মিনতি করে কতবার বলেছিলাম যে আমার পড়াশোনা বন্ধ কোরো না। তোমরা কেউ আমার কথা কানেই তোলনি। আমার বেশিরভাগ সহপাঠিনীরদের বিয়েই হয়নি। অথচ আমাকে এত তাড়াতাড়ি বুড়ি হয়ে যেতে হলো! পাঁচ পাঁচটা বাচ্চার দায়িত্ব আমার ওপরে! ওদের বাপ ইচ্ছে হলেই ঘুরতে চলে যায়, আমারই কোনও শখ আহ্লাদ নেই। কোনও পুরুষমানুষ যদি কোনও হারাম কাজ করে, তোমাদের এমন একজনও নেই যে তার কৈফিয়ত তলব করতে পারে?’

‘যথেষ্ট বলে ফেলেছিস, মেহের, যথেষ্ট বলে ফেলেছিস!’ চোখ বুজে ওর মা মাথা ঝাঁকালেন।
‘ঠিকই বলেছ, আম্মা। আমিও অনেক কিছুই সহ্য করে এসেছি। প্রথম প্রথম মানুষ ফিসফাস করত। তারপর যখন ওদের দুজনকে একসঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেক্ষাগৃহে বা হোটেলে যেতে দেখে ফেলত, তখন মানুষ আমার কাছে ছুটে এসে সোজাসুজি বলে দিত। তারপর ওর সাহস বেড়ে গেল। মেয়েটার বাড়িতে পর্যন্ত চলে যেত। এরপর সবাই যখন ওকে বকাবকি করল, বেঙ্গালুরু চলে গেল, হাজার হাজার টাকা খরচ করল আর ওই মেয়েটাকেও ওখানে বদলি করিয়ে নিল। গত আট দিন ধরে ও ওই মেয়েটার সঙ্গেই থাকতে আরম্ভ করেছে। আর কতদিন এটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব? কীভাবে এই জীবনটা টিকিয়ে রাখব?

‘ধৈর্য ধরে থাক, বাছা। ভালবাসা দিয়ে ওকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর।’
‘আচ্ছা আম্মা, আমার কি হৃদয় বলে কোনও বস্তু নেই? কোনও অনুভূতি নেই আমার? ও এই ভাবে আমাকে ছেড়ে চলে গেল, আমি ওকে স্বামী হিসেবে সম্মান করতেই পারব না! ওকে দেখলেই আমার ঘেন্না করে। ওকে ভালবাসা—সে তো সম্ভবই নয় আমার পক্ষে। ও আমাকে তালাক দেবার কে—আমিই ওর কাছ থেকে তালাক আদায় করে ছাড়ব। আমি ওই বাড়িতে আর ফিরে যাচ্ছি না।’
‘কী সব কথা বলছিস, মেহের? বড় বাড়াবাড়ি করছিস। ও একজন পুরুষমানুষ। পায়ে কাদা লাগিয়ে ফেলেছে। জল পেয়ে গেলেই ময়লা ধুয়ে ফেলবে, আবার ফিরেও আসবে। কোনও নোংরাই ওর গায়ে লেগে থাকতে পারবে না।’

মেহরুন জবাব দেবার আগেই আমান কথা বলে উঠলেন। ‘আমাদের সবার সামনেই কী অসভ্যতাই যে করছে, সেটা একটু খেয়াল করে দেখ। ওর সঙ্গেও নিশ্চয়ই এই রকম অসভ্য আচরণই করেছে! সেই জন্যই হয়ত ও রেগে গেছে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।’ একটু বিরতি নিয়ে গলার স্বর মোলায়েম করে বলতে লাগলেন। ‘এই বাড়ির বউয়েরাও যদি এই রকম অসভ্যতামো শিখে ফেলে, তাহলে তো একেবারে সোনায় সোহাগা, ঠিক কিনা?’ মেহরুনের বেদনাক্লিষ্ট চেহারাটা নিমেষের মধ্যেই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল, আর তারপরেই হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল।

‘যুক্তিটা বেশ ভালই ফেঁদে ফেললে, আন্না। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। ঠিকই বলেছ – আমিই তো খারাপ লোক। আমি কী ধরণের খারাপ লোক সেটা তো আমি বুঝেই গেছি। আমি তো বোরখা না পরে বাড়ির বাইরে যেতে চাইনি। ও’ই তো আমাকে বোরখা পরা ছাড়তে বলেছিল। শাড়ি পরতে বলেছিল, তাও আবার নাভির নিচে পরতে বলেছিল। বলেছিল এইভাবে শাড়ি পরে হাত ধরাধরি করে ওর সঙ্গে ঘুরতে। কিন্তু তোমরা আমাকে বোরখায় ঢেকে রাখতে চেয়েছ। এমন অভ্যেস করিয়ে দিয়েছিলে যে শাড়ির আঁচল যেন খসে না পড়ে। কী বলনি? এখন যদি সরাতে হয়, নিজেকে উলঙ্গ বলে মনে হয়। আল্লাহকে ভয় করতে তোমরাই শিখিয়েছিলে আমায়। ও আমাকে যেসব কাজ করতে বলত আমি রাজি হতে পারতাম না, তাই যে ওর কথা মত নাচবে, সেরকমই একটা মেয়েতে মজে গেল। আর এখন তোমাদের ভয় হচ্ছে যে ও আমাকে ছেড়ে দিলে আমি তোমাদের বোঝা হয়ে যাব! সেই জন্যই তোমরা আমাকে ওর অন্যায় আচরণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বলছ! কিন্তু সেটা এখন আর সম্ভব নয়। এই ভয়ানক নরকের আগুনে তিলে তিলে পুড়ে মরার থেকে আমি বরং বাচ্চাদের নিয়ে বেরিয়ে যাব আর কোথাও না কোথাও মুটের কাজ জোগাড় করে নেব। আমি কিছুতেই তোমাদের বোঝা হয়ে থাকব না – কখনওই তোমাদের ওপর বোঝা হব না!’

‘ফল ধরলে কি লতানে গাছ সেই ফলকে বোঝা বলে মনে করে, মেহের? বোকার মত কথা বলিস না,’ আপত্তির সুরে ওর মা বলে উঠলেন।
‘আম্মা, ওকে ভেতরে নিয়ে যাও আর ওকে কিছু খেতে দিও,’ ওর বড় দাদা খুব গম্ভীর গলায় বললেন। ‘দশ মিনিটের মধ্যে আমরা চিকমাগালুরে যাবার জন্য বেরিয়ে পড়ব। বাস পেয়ে গেলে, বাসেই যাব। আর যদি বাস না পাই, আমরা ট্যাক্সি করেই রওনা দেব। আমরাও তো আর ওর কথা মত নাচতে পারি না!’
‘তোমাদের বাড়িতে আমি এক বিন্দু জলও স্পর্শ করব না। আর চিকমাগালুরও আমি যাচ্ছি না। তোমরা যদি জবরদস্তি আমাকে ওখানে নিয়ে যাও, আমি কিন্তু নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেব!’
‘বড় বাড়াবাড়ি করছিস, মেহের। যারা মরে যাওয়ার কথা ভাবে, তারা সবাইকে ডেকে ডেকে সেই কথাটা জানিয়ে দেবার চেষ্টাই করে না। তোর যদি এই পরিবারের মানসম্মান নিয়ে একটুও বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা থাকত, তাহলে এখানে না এসে সেই কাজটাই করে ফেলতিস! বিয়ের পরে মেয়েরা বাপের বাড়ি ছেড়ে বরের সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েই থাকে। এটাই ভাল মেয়েদের জীবন হওয়া উচিত। তোর এক মেয়ে বড় স্কুলে পড়ছে। তোর বিবাহযোগ্যা ছোট দুজন বোন আছে। তুই যদি একটাও ভুল কাজ করিস, তাহলে ওদের ভবিষ্যতও অন্ধকার হয়ে যাবে। তুই চাইছিস যে তোর ছেলেমানুষি বায়না শুনে গিয়ে তোর বরের সঙ্গে লড়াই করি। কিন্তু আমাদের সকলেরও তো বউ আছে, ছেলেমেয়ে আছে। যা ভেতরে যা, কিছু খেয়ে নে।’ চকিতে একবার ওঁর ভাইয়ের দিকে তাকালেন, তারপর আবার মেহরুনের মুখোমুখি হলেন। ‘আমান, দৌড়ে যা, একটা ট্যাক্সি নিয়ে আয়। আর মেহের, তোর ছেলেমেয়েরা কিংবা পড়শিরা কেউ যদি জানতে চায়, বলিস যে বাচ্চাটা দেখাতে হাসপাতালে এসেছিলিস, বা ওই রকমই কিছু একটা। এখানে আসবার জন্য ক’টার সময় বেরিয়েছিলি?’

ও কোনও কথা বলল না।
‘এখন সাড়ে ন’টা বাজে,’ আমান বললেন। ‘ও এসেছে ন’টার সময়। ঘন্টা তিনেক লেগেই যায় আসতে। তার মানে সকাল ছ’টা নাগাদ বেরিয়েছে। আমরা যদি এখুনি বেরিয়ে পড়তে পারি, মোটামুটি সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছে যাব।’

যেখানে বসে ছিল, মেহরুন সেখান থেকে নড়চড় করল না। ওর মা ওকে খেয়ে নিতে বললেন, ছোট বোন দুজনও ওকে খেয়ে নেবার জন্য মিনতি করতে লাগল। ও এক দানা খাবারও মুখে তুলল না। এক বিন্দু জলও খেল না। ট্যাক্সি চলে আসার পর, ও কারোর সঙ্গে কথা বলল না। বাচ্চাকে বুকে আঁকড়ে ধরে ও বেরিয়ে এল। দাদারাও ওর সাথে সাথেই বেরিয়ে এলেন। কিন্তু ও কারোর কাছ থেকেই বিদায় চাইল না। তবে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য শেষ কয়েক ধাপ পা ফেলার সময় ও পেছন ফিরে যে বাড়িতে ওর জন্ম হয়েছিল, যেখানে ও ছোট থেকে বড় হয়েছে, সেই বাড়িটা দেখে নিল একবার। দু’চোখ জলে টলটল করে উঠল। ওর বাবা বুক চেপে ধরে কাশতে লাগলেন। ওর মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন, প্রথমে মেয়ের পানে চেয়ে, তারপর নিজের স্বামীর দিকে চেয়ে। ওঁকে শুইয়ে দিয়ে হাওয়া করতে লাগলেন, চোখে মুখে জল ছিটিয়ে দিতে লাগলেন, আর বিড়বিড় করে নিজেকেই বলতে লাগলেন, ‘হে আল্লাহ, যদি আমি সারা জীবনে সামান্য পুণ্যও যদি করে থাকি, সামান্য ভাল একটা কাজও যদি আমার নামে লেখা থাকে, তাহলে আমার মেয়ের জীবনেও শান্তি আসুক।’

আমান গাড়ির দরজা খুলে চোখের ইশারা করে মেহেরকে ভেতরে গিয়ে বসতে বললেন। বিড়বিড় করে গজগজ করছিলেন। মেহের খুব গর্ব করত। ওর বড়দাদের নিয়ে খুব গর্ব ছিল ওর। ওর বর ইনায়েত-এর ওপর রাগ হলেই বলত, ‘মনে রেখো আমাকে রক্ষা করার জন্য দাদারা আমার পেছনে সিংহের মত দাঁড়িয়ে আছেন! আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করথে থাকলে, ওঁরা একদিন না একদিন তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেবেন! খুব সাবধান!’ এই গর্বটা পুরোপুরি মাটি হয়ে গেল। দাদাদের কথাগুলো কানে বিঁধছে, ‘তোর যদি এই পরিবারের মানসম্মান নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা থাকত, তাহলে এখানে না এসে গায়ে আগুন লাগিয়ে মরে যেতিস! এখানে চলে আসতিস না!’

গাড়িতে চড়ার সময় একবারের জন্যও বাড়ির দিকে চাইল না। মায়ের দিকেও তাকাল না। উনি হয়ত গানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছেন। পর্দার আড়াল থেকে লুকিয়ে থাকা বোনদের কিংবা ভাবীর দিকেও তাকাল না। ওরা হয়ত উপায়ান্তর না দেখে দৈনন্দিত কাজে লেগে পড়েছে। কিন্তু নকাবের আড়াল থেকে চোখের জল ঝরে পড়তে লাগল। ঠোঁট দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ফোঁপানোর আওয়াজ লুকোতে লাগল।

বেশ জোরে চলছে গাড়িটা। কেউ কোনও কথা বলছে না। আমান বাড়ির সামনে বসেছে, মোহল্লার ড্রাইভারের পাশেই। পারিবারিক গোপন কথাবার্তা কি ওর সামনে আলোচনা করা যায়? সফরের সময়টা নীরবেই কাটল। ইনায়েতের ভালবাসাবাসির আর লালসার খেলনায় ষোলোটা বছর ধরে গুঁটি হয়ে আছে। আর ষোলো বছর পর ইনায়েত ওর নারীত্বকে অপমান করল! ‘তুমি তো মড়ার মত পড়ে থাক। কী তৃপ্তি পাই তোমার কাছ থেকে?’ কটাক্ষ করে বলেছে। ‘কী আমি দিইনি তোমাকে—জামাকাপড়, খাবার? কে আমাকে বাধা দিতে পারে? আমাকে তৃপ্তি করতে পারে এরকম একটা মেয়ের সঙ্গে থাকি।’

গাছপালা, বাইরের দৃশ্য, রাস্তা, কিছুই ওর নজরে পড়ল না। আচমকা যখন গাড়িটা থামল, অনিচ্ছাকৃতভাবে বাইরে তাকাল। যে বাড়িটা ওরা সবাই ওর বাড়ি বলে, সেই বাড়িটা দেখতে পেল। দরজার সামনে থেকে একটা কমবয়সী মেয়ে শুকনো মুখে গাড়ির দিকে ছুটে এল। বলল, ‘আম্মি, শেষমেশ তুমি ফিরে এসেছ! আমার এত চিন্তা হচ্ছিল!’ মায়ের কোল থেকে বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে নিজের বুকের ওপর ধরে ভেতরে চলে গেল।

শ্লথ পদক্ষেপে মেহরুন ঘরে ঢুকল। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। বাদবাকি বাচ্চারা ইস্কুলে গেছে। ওর ষোলো বছরের মেয়ে সালমা—যে ওর মায়ের কষ্টটা অনুভব করে—বাড়িতে আজ ওই সব চেয়ে বড়। সালমা ওর ভাইবোনদের পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে দিয়ে দুশ্চিন্তা নিয়ে মায়ের ফেরার অপেক্ষা করছে। মায়ের সঙ্গে মামাদের দেখে ও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। মামাদের দেখে নিশ্চিন্তও হল। ওঁরা ঠিক অন্য মহিলাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। মনে মনে ভাবল। হরিণীর মত ছটফট করতে করতে ও মামাদের জন্য জলখাবার নিয়ে এল, গরম চা বানিয়ে নিয়ে এল।

মেহরুন ওর ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সালমা এসে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিল। কিছু খাবার মায়ের মুখে তুলে দিল। খাওয়া শেষ হবার পর এঁটো থালা নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় খুব চেনাশোনা একটা গলা শুনতে পেল।

একছুটে শোবার ঘরে গিয়ে বলল, ‘আম্মি, আম্মি, আব্বা এসেছে।’ মেহরুন ভাব করল যেন কথাটা ওর কানে যায়নি। কম্বলটা আরও ভাল করে মুড়ে শুয়ে পড়ল। বসার ঘরে যাবার সময় সালমার মাথাটা দপ দপ করছে। মামারা সব বাড়ির বাইরে চলে এসেছে। পুরুষমানুষদের মুউউঅধ্যে কথাবার্তা চলছে, সালমা টের পেল। কথাবার্তাও চলছে, হাসাহাসিও হচ্ছে, আর সৌজন্য বিনিময়ও চলছে।

‘আরে ভাইয়া! কখন এলেন আপনারা?’ ইনায়েত জিগ্যেস করছিল।
‘এই তো, এখুনি। কেমন আছ তুমি?’
‘আমি? ভালই আছি—আল্লাহ্‌র শুকুর গুজ়ার হুঁ—আর আপনাদের সবার দুয়াতেও!’
আমানের গলা শোনা গেল। ‘তুমি কোথায় গেছিলে, ইনায়েত ভাই?’
‘এই তো, কাছাকাছিই গেছিলাম। একাজে—সেকাজে—জানেনই তো—কতরকম কাজে ফেঁসে থাকতে হয়! সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে তো আর চুওচাপ বাড়িতে বসে থাকা যায় না! সালমা,’ ডাক লাগালো। ‘সালমা, আম্মি কোথায়? দেখ, কারা এসেছেন! আম্মিকে বাইরে আসতে বল।'

বাড়ির ভেতর থেকে কোনও শব্দ আসছে না। ‘আশ্চর্যের ব্যাপার তো! কোথায় গেল ও?’ ইনায়েত বলে উঠল। মনে হয় বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরেই আছে। একটু অপেক্ষা করুন, আমিই ডেকে আনছি।’ ঘরে এসে সালমাকে দেখতে পেল। চাপা গলায় জিগ্যেস করল, ‘এরা সব এলেন কখন? তোমার আম্মি কোথায়?’ মনে মনে একটা সন্দেহ চাগাড় দিয়ে উঠল।

‘মামারা একটু আগেই এলেন। আম্মি এখনও ঘুমোচ্ছেন,’ সালমা বুদ্ধি করে জবাব দিল।
ইনায়েত হাঁপ ছেড়ে শ্বাস নিল।
‘তাহলে এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি? কী হয়েছে ওর?’ শোয়ার ঘরের দরজার কাছে এল। মেহরুনকে গুটিসুটি মেরে ঘুমোতে দেখে বিরক্ত হল। সন্তানদের মা হতে পারাটাই নিজের গুরুত্বের একমাত্র দাবী বলে মনে করে ও! ভেতরে যাবার ইচ্ছে হলেও, ওর পা সরল না।

ইনায়েত কীভাবে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেটা কল্পনা করে নিল। ওর পোশাক পরিচ্ছদ, সিগারেটের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, বয়স্ক শরীর, ড্যাবড্যাবে চোখ। যে লোকটা ওর শরীরে মনে ছাপ রেখে গেছে, সে আজ ওর কাছে অচেনা এক মানুষ। লোকটার গলা শুনে আপাদমস্তক কম্বলে শক্ত করে জড়িয়ে রাখল।

‘সালমা, এদিকে এসো। তোমার মাকে এই সব নাটক করা বন্ধ করতে বল। আমাকে জ্ঞান দেবার জন্যই যদি ওর ভাইয়েদের ডেকে এনে থাকে, নিজেই নিজের পায়ে কুড়ুল মারচে! এক নিঃশ্বাসে—এক, দুই, তিনবার কথাটা উচ্চারণ করব—কথাটা বলে দেব আর শাদির সম্পর্ক চুকিয়ে দেব। বলে দিও ওকে। আরও বলে দিও, তালাকের পর, ছোটবোনদের আর ওর মেয়েদের শাদি করাতে পারবে কিনা ভেবে দেখতে বোলো! মেহমানদের সামনেই ও খানদানের বেইজ্জত করাচ্ছে। বল ওকে—তোমার আম্মিকে। ভাইদের তফরিহ করতে বল—মুর্গা লাগবে না গোস্ত লাগবে, ওর কাছ থেকে জেনে নাও। প্রায় দুপুর হতে চলল, তাই খানা বানানো আরমভ করতে আর বেশি দেরি যেন না করে!’ সালমা ওখানে ছিলই না, কিন্তু ওখানেই আছে মনে করে যা কিছু বলবে মনে করেছিল, সব উগরে দিল।

ইনায়েত আর ওর শালারা এমনভাবে কথা বলতে লাগল যেন সব কছুই স্বাভাবিক। করির দাম নিয়ে কথা বলল। কাশ্মিরের ভোট নিয়ে আলোচনা করল। পাড়ারই বয়স্ক দম্পতীর খুন নিয়ে তদন্ত নিয়ে কথা বলল। মুসলিম একটি মেয়ে একটি হিন্দু ছেলের সঙ্গে সিভিল ম্যারেজ করে নিয়েছে সেটা নিয়ে আলোচনা। এবং আরও অনেক এই ধরণের কেচ্ছা। প্রেশার কুকারে সিটি পড়ার সময়ও কথাবার্তায় ব্যাঘাত ঘটল না। তারপর প্রেশার কুকার থেকে মসলাদার গন্ধ বের হল, রান্না করা মুর্গা নিয়ে আসা হল,খাবার একেবারে তৈরি, কারণ মেহরুন নিজে হাতে রান্না করেছে। সালমা ছোটাছুটি করে সবার খাবার পরিবেশন করে দিল। ক্ষণিকের জন্যই মেহরুনকে রান্নাঘর থেকে বের হতে দেখা গেল।

ভরপেট খানাদানা করে, মুখে তাম্বুল চিবোতে চিবোতে, মেহরুনের দাদারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবার জন্য তৈরি। বেরোনোর আগে আমান রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ‘একটু বুদ্ধি খরচ করে ঝামেলাগুলো সামলে নেবার চেষ্টা করিস,‘ মেহরুনকে পরামর্শ ্দিলেন। ‘পরের সপ্তাহে আমি এসে ঘুরে যাবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই সব করতে থাকবে, তারপর ঠিক আবার নিজেকে শুধরে নেবে। তোরই সব দায়িত্ব। মাতাল বরের দায়িত্ব তোকেই সামলাতে হবে। শাশুড়ি বউকে পেটালেও বউকেই মানিয়ে নিতে হয়! আল্লাহ্‌র সুকর গুজ়ার যে তুই তো অনেক ভাল আছিস। ওর দায়িত্বকজ্ঞানের অভাব, এটাই যা ওর বুরি আদত। ব্যাপারটা তোকেই একটু মানিয়ে নিতে অবে।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর দাদাদের নিয়ে ওঁদের গাড়ি চলে গেল। ইনায়েতও সময় নষ্ট না করে বাড়ি ছেড়ে হাওয়া হয়ে গেল।

সালমা ওর মায়ের দিকে তাকাল। ওর মামারা মা’কে সান্ত্বনা দেননি, কোনও সাহায্যও করে্ননি। মায়ের দুঃখে ওর মনও কেমন কেমন করছে। যখন ওর আব্বু বেরিয়ে গেল, তখন ওর দু’চোখে জল ভরে উঠল। বিষণ্ণতায় ঘরটা ম্লান হয়ে উঠল। সালমার ভাই-বোন ইস্কুল থেকে ফিরে আসার পরেও বিষণ্ণতা একটুও কাটল না। সকলেই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল। ওদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব চাপ ছিল।

সন্ধ্যে হতে না হতেই আলো কমে এল। বাড়িতে জায়গায় জায়গায় বাতি জ্বালানো হল। তবে মেহরুনের হৃদয়ের আলো অনেকদিন আগেই নিভে গেছে। কার জন্যই বা ও বেঁচে থাকবে? কীই বা লাভ? দেওয়াল, ছাদ, রেকাবী, কাটোরা, চুলহা, বিছানা, বর্তনচ, বাড়ির সামনের আঙনের গোলাপ গাছটা—কেউই এর জবাব দিতে পারবে না। ম্লান যে চোখদুটো সর্বক্ষণ ওর দিকে নজর রাখছে, ওর খেয়াল রাখছে সেটা মেহরুনের নজরে পড়ল না। সালমা পড়ার বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকতে চাইছিল। এস-এস-এল-সি পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়ার কথা এখন ওর। অজানা কী একটা দুশ্চিন্তায় ও মা’কে কোনোভাবেই নজর থেকে সরাতে পারছিল না।

রাতের নিস্তব্ধতায় মেহরুন অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। অন্ধকারটা ওর জীবনের মতই আঁধার। বাচ্চার সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। একমাত্র সালমাই জেগে আছে। বৈঠকখানায় বসে পড়াশোনা করছে, তবে মনটা মায়ের ঘরেই পড়ে আছে।

মেহরুনের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেল। অবাক হয়ে ভাবছে—খানদানি বাড়িতে কি ওর লড়াইটা একটুও সহজ হল? দ্বিতীয় বছরের বি কম পরীক্ষার একমাস আগেই ওর সঙ্গে ইনায়েতের শাদি হল। কেঁদেছিল খুব। ওকে পরীক্ষায় বসতে দেবার জন্য অনেক অনুনয়বিনয়য় করেছিল। কিন্তু সবাই কালা হয়ে গেছিল। বিয়ের এক সপ্তাহ বা কাছাকাছি, বরের সঙ্গে এই ব্যাপারে দ্বিধার সঙ্গে কথাও বলেছিল। ও হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। ‘প্যার’, মেরি পেয়ারি’, মেরি জ়িন্দগী’ এই সব কথা বলে আদিখ্যেতা করেছিল। ‘তুমি যদি আমার কাছে না থাকো,’ বলেছিল, ‘আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারব? মেহরুন বিশ্বাস করে ফেলেছিল ও কাছে না থাকলে বরের হয়ত সত্যিই দমবন্ধ হয়ে যাবে। ওর মন ভালবাসায় ভরে গেছিল। বরের সমস্ত ইচ্ছে পূরণ করতে সচেষ্ট থাকত। নিজেকে বরের হৃদয়ের আলো বলেই মনে হত।

বছর খানেক আগে শ্বশুর-শাশুড়ির ইন্তেকালের পরেই মেহরুন বরকে শেষপর্যন্ত পুরোপুরি নিজের করে পেল। ওর ননদরা ওদের শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। ভাসুর-দেবররাও নিজের নিজের বাড়ি চলে গেল। নিজের একটা বাড়ি থাকবে সেই স্বপ্নটা সেই কবে থেকে দেখত, এখন বাড়িটা ওর হয়ে যাওয়ায় স্বপ্নটা পূরণ হয়ে গেল। কিন্তু যতদিনে স্বপ্নটা পূরণ হল, ততদিনে ওর মুখে বলিরেখা দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চোখের তলায় কালি পড়েছে। গোড়ালি ফেটে ময়লা জমেছে আর আঙুলগুলো বন্ধুর হয়ে উঠেছে। মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে। তবে এত কিছু ও খেয়ালই করেনি। ইনায়েতও হয়ত এত কিছু লক্ষ্যই করত না, যদি না ওর নিজের অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন না হত। যদি না বেসরকারি হাসপাতালের নার্সটা—একরাশ স্বপ্নভরা চোখ নিয়ে আর অকিঞ্চিৎকর খরচে ওর সেবা করবার জন্য চলে আসত, বরং বলা যায় হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলে আসত! উজ্জ্বল মসৃণ ত্বক আর কোমল মৃগসুলভ চাহনি। বয়সটাও বিপজ্জনকভাবে তিরিশ বছরের অনেক নীচে। নিজের ভবিষ্যৎ মজবুত করার জন্য এবং স্বপ্ন পূরণ করার জন্য সীমাহীন যত্ন নেবার জন্য প্রস্তুত।

রেওয়াজ অনুযায়ী নার্সটিকে ইনায়েত কখনওই ‘সিস্টার’ নামে সম্বোধন করেনি। বরং হাসপাতালে থাকার প্রথম দিন থেকেই মেয়েটিকে ওর নাম ধরেই ডাকত।

তারপর একদিন, যে গর্ভাশয়টি ওকে এতগুলি সন্তান উপহার দিয়েছে, সেটিকেই বেইজ্জত করে ছাড়ল। ওর শিথিল জঠর আর ঝুলে পড়া স্তন নিয়ে নিন্দা করল, বলল সেই জন্যই আর ওর সন্তান পাবার ইচ্ছে হয় না। ইনায়েত মেহরুনের রুহকে পর্যন্ত নাঙ্গা করে ছেড়ে দিল। একদিন বলে দিল, ‘তুমি আমার আম্মির মত হয়ে গিয়েছ’ আর এই সব কথা বলে ওকে জাহান্নামের দিকে পাঠিয়ে দিল। এই সব কথা শোনার অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই মেহরুন ওই বাড়িতে খাবার জন্য মুখে যা কিছু তুলত, সব গুনাহ বলে মনে হত। সব সময় নিজেকে নিজের বাড়িতেই আজনবি বলে মনে হত। গালি শুনতে শুনতে ও মাটির সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। এই জন্যই তো বাপের বাড়ির কাছ থেকে সাহায্যের আশা করেছিল।

রাত আরও ঘনিয়ে এল। মেহরুনের অশান্ত মন আরও কঠিন হয়ে উঠল। এর আগে নিজেকে কখনও এত একাকী লাগেনি। ওর মনে ইচ্ছে, অনিচ্ছে, চাহিদা কিছুই নেই। বিছানায় উঠে বসল। প্রশ্ন করবার মত কেউ নেই। নেই ওকে পেছনে লাগার মত কেউ। জড়িয়ে ধরার, চুমু খাবার মত কেউ। যে মানুষটা এই সব করত, সে এখন অন্য একজনের হয়ে গেছে। বেঁচে থাকাটা যেন ফুরিয়ে যাবার নয়। অথচ পেছন থেকে জোরে আওয়াজ শুনলেও ও অস্থির হয়ে পড়ে না। জানে ও, বাঁধাই করা ছবিটা খুলে পড়ে গেছে , কাচটা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে, আর কাঠের ফ্রেমটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। ফোটোটাও খুলে বেরিয়ে পেছে। কেমন যেন উদ্বিগ্ন মেহরুনের মনে এসে বাসা বেঁধেছে, কিন্তু এই বিশৃঙ্খল অবস্থা কেটে বেরিয়ে আসার কোনও উৎসাহই পাচ্ছে না। বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নামল। বাচ্চার মুখের পানে অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘর থেকে বেরোলো। নাবালক বাচ্চারা যে যার মত নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

শব্দ না করে পায়ে পায়ে বৈঠকখানায় এসে সালমাকে দেখতে পেল। পড়াশোনার জন্য বসেছিল, কিন্তু ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা টেবিলের ওপর এলিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল। মনে মনে ভেবেছিল, ওর অনুভব করার ক্ষমতাটা মরেই গেছে। সহসা অনুভূতি ঢেউয়ের তীব্রতা নিয়ে ওর মধ্যে জেগে উঠল। সালমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল ও বোধহয় পড়েই যাবে। মেয়েকে স্পর্শ করার প্রবল ইচ্ছে কোনও রকমে দমন করল। মনে মনে নিজেকেই প্রবোধ দিয়ে বলল, ‘এই সব শিশুদের – তুমিই হলে ওদের জননী, হে প্রিয়!’

খুব আস্তে আস্তে পাদুটো ওকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলল। দরজা খুলল। সামনের উঠোনে নেমে দাঁড়াল। যে কয়েকটা গাছ ও লাগিয়েছিল, মনে হচ্ছিল যেন কাঁদছে। মনে হল ওর নেওয়া সিদ্ধান্তে ওদের সমর্থন আছে। পেছন ফিরে ও ভেতরে চলে এল। দরজাটা বন্ধ করল। রান্নাঘরে এল। কেরোসিনের বোতলটা তুলে নিল। পুরো বাড়ি্তে একটা চক্কর লাগালো। কেরোসিনের তেলটা কোনখানে চাড়িয়ে নিজের ওপর ঢালবে, কিঞ্চুতেই মন ঠিক করে উঠতে পারছিল না। বৈঠকখানায় ফিরে আসার আগে ঘুমন্ত বাচ্চাদের দিকে আবার চেয়ে রইল।

সালমার দিকে আর ফিরে তাকাল না।

দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে এল। দেশলাইয়ের বাক্সটা তুলে নিল। ডান হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরে আছে বাক্সটা। সামনের দরজার ছিটকিনিটা নিঃশব্দে খুলে আবার উঠোনে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। গায়ে কেরোসিন ঢালবার আগে নিশ্চিত হয়ে নিল, কেউ ওর নেই, কেউ ওকে চায় না। নিজের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ আর নেই। চারধার থেকে কোনও আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। কোনও স্পর্শ অনুভব করছে না। কোনও স্মৃতিই আর মনে পড়ছে না। কোনও অন্তরঙ্গতাই ওকে বাধা দিচ্ছে না। সমগ্র চেতনাকেই ও পেছনে ফেলে এসেছে।

কিন্তু বাড়ির ভেতরে সব কিছুই ঘটে চলেছে। খিদের জ্বালায় বাচ্চাটা জেগে উঠে চেঁচাচ্ছে। এক ঝটকায় সালমার ঘুম ভেঙে গেল। বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেবার জন্য ছুটে গেল। ভাইওবোনরা যেখানে শুয়ে ঘুমোচ্ছে সেই ঘর পার হয়ে ‘আম্মি আম্মি’ বলতে বলতে মায়ের খোঁজে সারা বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করল। খোলা দরজাটা নজরে পড়ার আগেই এসব করল। দরজাটা খোলা দেখেই ও ছুটে উঠোনে বেরিয়ে এস। আবছা অন্ধকারেও মায়ের আকারটা দেখতে পেল। কেরোসিনের গন্ধ বেরোচ্ছে। কোনও ভাবনাচিন্তা না করেই ও এগিয়ে গেল। বাচ্চাটা কোলে। মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দেশলাই হাতে, মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখল মেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছে। হয়ত অন্য কারোর কথাই ভেবেছে। সালমা বাচ্চাটাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল, ‘আম্মি! আম্মি! আমাদের ফেলে রেখে তুমি চলে যেও না!’ মায়ের পা জড়িয়ে ধরল।

সালমা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বাচ্চাটা মাটিতে শুয়েই গলা ছেড়ে কাঁদছে। মেহরুন দুজনকেই চেয়ে দেখল। যে শক্তি ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, তার থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করতে লাগল। দেখলাইয়ের বাক্সটা হাত থেকে খসে পড়ল। সালমা এখনও ওর মায়ের পা ছাড়েনি। ‘আম্মি,’ ও বলে চলেছে, ‘মাত্র একজন লোককে তুমি হারিয়ে ফেলেছ বলে, তুমি আমাদের সবাইকে ওই মেয়েছেলেটার কৃপায় ফেলে যাবে? তুমি আব্বার জন্য মরে যেতে চাও, অথচ আমাদের সবার জন্য বাঁচবার ইচ্ছেটাই নেই? তুমি কেমন করে আমাদের সবাইকে অনাথ করে রেখে চলে যাবে, আম্মি? আমরা সবাই তোমাকে চাই!’ সালমার কথার থেকেও ওর স্পর্শই মেহরুনের অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে গেল।

ফোঁপাতে থাকা বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল মেহরুন। সালমাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল। মনে হচ্ছিল বুকটা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে, স্পর্শটা ভাল লাগছে, যেন ওর বন্ধু ওর কষ্টটা বুঝতে পেরেছে। মেহরুনের দুই চোখ জলে টল টল করে উঠল। বেশি কিছু বলতে পারল না। কেবল বলল, ‘আমাকে মাফ করে দে রে, মা।’ রাতের অন্ধকার হালকা হচ্ছে ধীরে ধীরে। ·



লেখক পরিচিতি : বানু মুশতাক বা বানু মুস্তাক (জন্ম: ৩ এপ্রিল ১৯৪৮) ভারতের কর্নাটক রাজ্যের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি জীবিকাসূত্রে একজন আইনজীবী, এছাড়া সমাজকর্মী হিসেবে বিখ্যাত। তিনি কন্নড় ভাষায় লেখেন। তিনি ২০২৫ সালে তার ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্প-এর জন্য আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লাভ করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ