অনুবাদ : রুখসানা কাজল
এখানে তাঁরা থাকে, আলিঙ্গনবদ্ধ যুগল জীবিতরা এখানেই বসবাস করে। স্যাম রিব ওর প্রেমময় রূপচিত্র, যা একটি সমুদ্রাচ্ছন্ন বর্গীয় দ্বীপ, যার প্রতিটি প্রান্ত ঘন কালো জঙ্গলে পূর্ণ এক অপরূপ প্রাকৃতিক ভুমি, সেদিকে ইঙ্গিত করে কথাগুলো বলছিল। বিষুবরেখার উপর ছিল সেই আলিঙ্গনবদ্ধ যুগল দ্বীপ, তাঁর স্পর্শে লজ্জিত ভিতু ত্বকের মতো আরক্তিম হয়ে গেছিল আর রক্তের সাগরে জলের ঘূর্ণিতে এক নতুন প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিল। এখানে জোয়ারের টানে উষ্ণ তপ্ত উপকূলে বীজ এসে ভেঙ্গে পড়ে, বালুকণাগুলো নানাভাবে তাকে গড়ে তোলে, ঋতু পেরিয়ে গ্রীষ্ম আসে পিতৃত্বের উষ্ণতা নিয়ে। শরৎ শেষে শীত প্রথম বিদ্ধ করে, আর দ্বীপটি ছেড়ে যাওয়ার আগে এর অতল গভীর থেকে চারটি বিপ্রতীপ আবর্ত বের করে আনে।
ছোট্ট দ্বীপটির পাহাড়ি চূড়ায় আঙ্গুল খুঁড়ে স্যাম রিব জানায়, এখানে প্রথম ভালোবাসার প্রাণশক্তি বেঁচে আছে। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শের প্রাপ্তি এখানেই ঘটে। যেনো তিনি জানেন, সেই প্রেম ঘাসের সাথে মিশে তাদের সবুজ উত্থানকে তৈলাক্ত দীপ্তিতে ভরিয়ে তুলেছিলো, তাদের আন্দোলিত শ্বাস এবং প্রাণরস দিয়ে তারা তাদের প্রথম প্রেমের তীব্রতাকে লালন করেছিল, যা বসন্তকাল না আসা পর্যন্ত পাশাপাশি বেড়ে ওঠা ফলকের ভেতর স্নায়ুর প্রতিসাড়া খুঁজে পায়নি।
বেথ রিব এবং রুবেন দ্বীপটিকে ঘিরে থাকা সবুজ সমুদ্রকে লক্ষ্য করে। এটি ভূ-ফাটলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে যেভাবে একজন তরুণ তার অতল গহবরের গভীরে প্রথমবারের মতো বয়ে যায়। সমুদ্রের নীচে তারা অনেকগুলো প্রণালী দেখতে পেলো যেগুলোর শিরাউপশিরা নানা রঙে রঞ্জিত ছিল। এগুলো সেই প্রথম প্রেমিকদের দ্বীপটির সঙ্গে স্যাঁতসেঁতে তরল এই জলজ ভূমিকে যুক্ত করে নিয়েছিল। জলজ ভূমিতে গজিয়ে ওঠা আধা সরস গুল্মরাজি, ঘাসের বুকে কলমে আঁকা ফেনিয়ে ওঠা মধুর গরল আর পরে ভেজা মাটিতে সংঘটিত সঙ্গম দেখে তরুণ ছেলেমেয়েরা লজ্জা পেয়ে গেলো।
স্যাম রিব বলছিলেন, এখানে দু ধরণের আবহাওয়া ঘুরে বেড়ায়। তিনি তাঁর আঙ্গুল দিয়ে হালকা করে দুটি আবহের জন্য ত্রিভুজ এবং দুটি পাখাযুক্ত দেবশিশুর ছবি আঁকলেন। আবহাওয়া অন্য একটি দিকে নিজেদের সৃষ্ট বৃষ্টি আর তুষারপাতের ছায়ায় জলাভূমির বুকের উপর অশ্লীল দীর্ঘ শ্বাসের শব্দ তুলে সবুজ আনন্দে হিল্লোলিত হয়ে ধীরে ধীরে একাকী বয়ে গেল। একটি ছেলে এবং মেয়ের মতো দোলায়মান পৃথিবীর ভেতর দিয়ে চলে গেছে আবহাওয়া। সমুদ্রের ঢেউ তাদের কখনও নিচে টেনে নিচ্ছে আবার মেঘগুলো নানা বিভঙ্গে বিভক্ত হয়ে তীব্র লালসায় বাতাসের কচি ত্বকের দিকে তাকিয়ে আছে।
তিনি স্থান পরিবর্তনসহ গভীর সমুদ্রের উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া আলাদা আবহাওয়ার রূপরেখা এবং প্রেমিকদের জগতকে ভিন্নভাবে ভেদ করে যাওয়ার দিকে ইশারা করলেন। দেবশিশুরা তীব্র জোরে বাতাস বইয়ে দিল; দুটি দোলায়মান আবহাওয়ার উত্তাল বাতাসে সমন্বিত সমুদ্রের ভেজা বর্ষণ চলতে থাকে; চলতে চলতে দুটি যুগল দেশের এক তীরভূমির দিকে হাওয়া স্থির দাঁড়িয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ বালুরাশির উপর দুটি প্রেমিক মন দুটি নগ্ন টাওয়ারের মতো ছিল যারা, মানচিত্রের তিরগুলো বলছে, এখন তারা এক নিমিষে এককশক্তিতে মিলেমিশে গেছে। যদিও তারা দ্রুত আবার ফিরে এসেছিল। ভালোবাসায় সিক্ত দুটি অপরিচিত দুর্গ প্রথমবার মিলনের আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল আর দুটি ফ্যাকাশে পাণ্ডুর ছায়া ভুমির উপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল।
বেথ রিব ও রুবেন সেই পাহাড়ে উঠে পড়ল। যেখান থেকে পাহাড় তার পাথরের চোখ মেলে ডোরা কাটা উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দেখত। ওরা হাতে হাত বেন্ধে পাহাড় বেয়ে দৌঁড়ে নেমে এলো। গান গেয়ে এগিয়ে গেলো; আর কুড়িটি মাঠের প্রথম মাঠের ভেজা ঘাসের বুকে পৌঁছে তাদের গোড়ালি ঢাকা নরম কাপড় খুলে ফেলল। এই উপত্যকার একটি সাহসী আত্মা আছে। যা পুরো পাহাড় ও গাছপালা, সমস্ত পাথর ও প্রবাহিত জলের ধারা অস্তগামী পশ্চিমা মৃত্যুর নীচে চাপা পড়লেও গড়িয়ে পড়ত। সেই প্রথম মাঠটি এখানেই আছে, যেখানে পাগলা জার্ভিস, শত বছর আগে একটি চুলহীন টেকো মাথার মেয়ের গর্ভে বীজ ঢেলে দিয়েছিল; যে মেয়েটি প্রেমকাতর হয়ে দূরের কোনো প্রদেশ থেকে এখানে এসে তার আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছিল।
এখানে ছিল চতুর্থ মাঠ, সে এক আশ্চর্য স্থান, যেখানে তৃষিত কবর থেকে সমস্ত মৃতরা মত্তপায়ে বেরিয়ে এসে ঘুরতে পারে অথবা ভ্রষ্ট পতিত দেবদূতরা স্রোতস্বিনী জলের উপর যুদ্ধ করতে পারে। উপত্যকার মাটির প্রচুর গভীরে বৃক্ষলতা রোপিত হয়েছিল যে শিকড়ের আড়ালে, তাদের সঙ্গীরা আত্মগোপনের জন্য আশ্রয় নিতে পারত; চতুর্থ মাঠে সাহসী আত্মা অন্ধকার থেকে জেগে উঠত। আর যারা পাহাড়ি দেশের সীমানা পেরিয়ে উপত্যকা থেকে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে গেছে তাদের হৃদয় থেকে উৎসারিত দীর্ঘ গাঢ় অন্ধকারকে সরিয়ে ফেলত।
দশম মাঠে অর্থাৎ একেবারে কেন্দ্রীয় মাঠে বেথ রিব এবং রুবেন একটি বাংলোবাড়ির দরোজায় করাঘাত করে। ওরা প্রেমময় ভালোবাসার পাহাড়ে ঘেরা প্রথম দ্বীপটির অবস্থান জানতে চেয়েছিল। ওরা বাংলোবাড়ির পেছনের দরোজায় করাঘাত করেছিল বলে একটি ভৌতিক সতর্কবাণী শুনতে পেয়েছিল।
এরপর খালি পায়ে হাতে হাত ধরে ওরা অন্য দশটি মাঠ পেরিয়ে ইদ্রিসের জলের ধারে ছুটে গিয়েছিল। সেখানে বাতাস জুড়ে সামুদ্রিক শৈবালের গন্ধ ছিল আর উপত্যকার আত্মা ছিল সামুদ্রিক বৃষ্টির জলে স্নাত। কিন্তু রাত নেমে এলে ওরা উরুতে হাত রেখে দেখল, কুয়াশাচ্ছন্ন নদীর যে ছবি তাদের সামনে ছিল তা এখন নতুন রূপে নতুন আকৃতির ছবি আঁকছে। নদী থেকে আধা মাইল দূরে একটি দ্বীপের আকৃতি অন্ধকারের দেওয়ালে ছেয়ে গেছে। বেথ এবং রুবেন গোপনে খুব সন্তর্পন সতর্কতায় জলের দিকে এগিয়ে গেল। ওরা দেখছিল, আকৃতিটি বড় হচ্ছে। ওরা আঙুলের ফাঁস খুলে ওদের গ্রীষ্মের পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে জলের দিকে ছুটে গেল।
"উজানে এসো, উজানে।" নারী কণ্ঠটিফিসফিস করে বলছিল।
"হুম উজানে।" পুরুষ কন্ঠটিও এবার বলে ওঠে।
ওরা নদীর জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু স্রোত ওদের পা টেনে জলের নীচে নিয়ে যাচ্ছিল। স্রোতের সাথে লড়াই করে ওরা ক্রমে বেড়ে ওঠা সেই দ্বীপের দিকে সাঁতরে যাচ্ছিল। তখুনি নদীর তলদেশ থেকে উঠে আসা কাদায় বেথের পা জড়িয়ে গেল।
“ভাটিতে চলো, ভাটিতে,” নারীটি চেঁচিয়ে ডাকছে আর নরম কাদা থেকে নিজেকে বাঁচাতে লড়াই করছে।
আগাছায় আবদ্ধ রুবেন। হাত দিয়ে আগাছার ধূসর শীষগুলোর সাথে লড়াই করতে করতে বেথকে অনুসরণ করে ওর পেছন পেছনে সমুদ্রলগ্ন উপত্যকার দিকে সাঁতরে যাচ্ছিল। কিন্তু বেথ যখন সাঁতার কাটছিল তখন জল সুড়সুড়ি দিয়ে ওর সাথে খুনসুটি করছিল আর পাশ দিয়ে বয়ে যেতে যেতে আলতো স্পর্শে চেপে ধরছিল। “আমার ভালোবাসা” জলের রোমাঞ্চকর সুড়সুড়ি আর আগাছার শাখা প্রশাখার মোহন স্পর্শে উত্তেজিত হয়ে রুবেন চেঁচিয়ে উঠেছিল।
এরপর, কুড়িতম মাঠে তারা নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, “আমার ভালোবাসা”, বেথ ফিসফিস করে বলেছিল। প্রথমে ভয় পেয়ে ওরা কুন্ঠিত হয়ে পড়েছিল। আর এই ভয় ওদের পেছনে ফিরিয়ে দিয়েছিল। পোশাকগুলো ভেজা হলেও ওরা দ্রুত সেগুলো পরে শরীর ঢেকে নিয়েছিল।
বেথ বলেছিল, “মাঠের উপর দিয়ে এসো।”
মাঠের উপর দিয়ে ওরা পাহাড়ের দিকে স্যাম রিবের পাহাড়ি বাড়ির দিকে ছুটে গেল। নাজুক শিশুদের মতো ওরা দৌঁড়ে গেছিল। সে সময় ওরা আর সংযুক্ত ছিল না বরং কাদার আর দ্বীপের রহস্যময়ী জলের প্রথম স্পর্শে ওরা ছিল অভিভূত, শিহরিত লজ্জিত।
এখানে তারা বাস করত, স্যাম রিব তাদের বলেছিল, প্রথম প্রেমময় জীবিতরা এখানেই বসবাস করত। ছেলেমেয়েরা একটি শান্ত স্নিগ্ধ হিম ছড়ানো নতুন ভোরে কথাগুলো শুনছিল। ভয়ে ওরা নিজেদের হাত ধরতেও সংকুচিত ছিল। তিনি দ্বীপের উপর ঝুলে পড়া পাহাড়টিকে আবার স্পর্শ করলেন। নির্দেশ দিলেন, মূল কাঠামো থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রণালীগুলো কাদা থেকে কাদার সাথে জুড়ে গেছে, পান্না সবুজ সমুদ্র হয়ে গেছে কত বেশী ঘোর কালো এবং সমস্ত প্রেমপাহাড় আর দ্বীপগুলো কিভাবে একটি ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এখানে ঘাস মিলিত হয় সবুজ ঘাস আর শস্যের সাথে, বিভক্ত জলধারা সঙ্গম করে সঙ্গীদের সঙ্গে। সুর্য ঘাস এবং সবুজের সঙ্গে, বালুরাশি জলধারার সঙ্গে, আর জল সবুজ ঘাসসহ প্রত্যহ মিলিত হচ্ছে এই পৃথিবীর নব নব জন্ম এবং লালনপালনের জন্য। স্যাম রিব একজন সবুজ নারীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, যেমন মহান আঙ্কল জার্ভিস সঙ্গম করেছিলেন একজন চুলহীন টেকো নারীর সঙ্গে; সন্তানদের জন্ম এবং তাদের সযত্নে লালন-পালনের জন্য একজন নারীবাদী নারীর সঙ্গেও মিলিত হয়েছিলেন যে কিনা তার সঙ্গে সঙ্গমে করে শিহরিত হয়েছিল। তিনি নির্দেশনা দিয়ে দেখাচ্ছিলেন, কিভাবে জলজভূমিগুলো প্রথম জীবিত দিত্ব সত্ত্বার একদম কাছাকাছি রয়ে গেছে। সেই দিত্ব সত্ত্বার বৃত্তটি মহান আঙ্কলের পাহাড়ের মতো উঁচু পাহাড়ের নীচে রয়ে গেছে। যে উঁচু পাহাড়টি গেল রাতে ভ্রুকুটি করেছিল আর নিজেকে পাথরের চাদরে মুড়ে ফেলেছিল। মহান আঙ্কলের পাহাড়টি ছেলেমেয়েদের পা ছেঁটে দিয়েছিল কারণ ওরা ওদের ঘূর্ণি নাচের নরম জুতো আর পায়ের আবরণগুলো প্রথম মাঠের ঘাসের অরণ্যে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছিল।
পাহাড়ের কথা ভেবে বেথ আর রুবেন শান্ত হয়ে বসেছিল। কিছু পর ওরা শুনতে পেল স্যাম বলছে, বেড়ে ওঠার সময় প্রথম পাহাড়টি অবতরণের জন্য খুব নরম একেবারে উলের মতো কোমল মৃদুগামী ছিল। অথবা স্লেজগাড়ি যাওয়ার মতো মসৃন বরফের মতো ছিল। স্যামের কথা শুনে তাদের গেলো রাতের কোমল নিয়ন্ত্রিত অবতরণের কথা মনে পড়ে গেছিল ।
স্যাম রিব জানায়, শান্ত নম্র পাহাড়ও আরোহনের জন্য বন্য হয়ে ওঠে। তবে অনভিজ্ঞ কমবয়েসীদের কাছে পাহাড় ছিল সাদা পাথরের রাস্তা আর দাগ চিহ্নিত বরফের গায়ে পিছলে পরা পায়ের ছাপ কিম্বা শিশুদের নীচে নামার স্লেজগাড়ির পথ। অন্য আরেকটি পথ হচ্ছে, একদম নীচে, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উপরে ওঠার জন্য একটি লাল পাথরের লাইন আর উপরে ওঠার জন্য চড়নদার ছেলেমেয়েদের রক্ত চিহ্নিত রেখাপথ। নীচে নামার পথ ছিল উলের মটো নরম কোমল। প্রথম দ্বীপের ব্যর্থতার জন্য আরোহী পাহাড় শানিত পাথরের কোনোকিছুর আড়ালে নিজেকে মুড়িয়ে নিয়েছিল।
বেথ রিব আর রুবেন, ওরা কখনও কুঁজের মতো উঁচু পাথর আর ঘাসের বুকে লুকিয়ে থাকা চকমকি পাথরের কথা ভুলে যায়নি। সেদিন প্রথমবারের মতো তারা একে অপরের দিকে ঘুরে তাকিয়েছিল। স্যাম রিব বেথকে তৈরি করেছিল যাতে রুবেনকে ছাঁচে ফেলে তৈরি করতে পারে। তিনি ছেলে এবং মেয়েটিকে একত্র করে দিত্ব পর্বতারোহী বানাতে চেয়েছেন, যারা দ্বীপটিকে খুঁজে বের করে সেখানে অনন্য শক্তিতে গলেমিশে বিলীন হয়ে যাবে। তিনি ওদেরকে আরেকবার কাদার কথা মনে করিয়ে দিলেন। কিন্তু ভয় দেখালেন না। আগাছার ধূসর মাথা ভেঙ্গে গেল, আর সাঁতারুদের হাত আর কখনও ফুলে উঠল না। আরোহনের দিন শেষ হয়ে গেলেও প্রথম অবতরণ বাকি ছিল, ভালোবাসার মানচিত্রে একটি পাহাড়, দুটি পাথরের শাখা এবং শিশুদের হাতে জলপাই পাতার সুন্দরতা।
সেই রাতে অদ্ভুত উড়নচণ্ডীরা পাহাড়ের ঘরে ফিরে এসেছিল। তারা গুহা দিয়ে ঢুকে রুমের ভেতর দিয়ে তারা ভরা ছাদে ছুটে গেছিল আর তাদের আলিঙ্গনাবদ্ধ দেখে খুব সুখী হয়েছিল। তাদের সামনে ডোরাকাটা বিস্তীর্ণ উপত্যকা ছিল, আর ছিল গবাদিপশুদের খাওয়ানোর জন্য কুড়িটি মাঠের ঘাস; রাত্তিরে গবাদি পশুরা সুরক্ষিত বেড়ার ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল , কেউ কেউ ইদ্রিসের জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বেথ এবং রুবেন পাহাড়ের উপর থেকে দৌঁড়ে নীচে নামতে গেলে নরম পাথরগুলো ওঁদের পায়ের নীচে পড়েছিল। দ্রুত, খুব দ্রুত তারা নীচে জার্ভিস ফ্ল্যাংকের কাছে ছুটে গেছিল। ছুটন্ত বাতাসে তাদের চুল উড়ছিল, যেখানে সমুদ্র ছিল না সেখানে ওদের কম্পিত শিহরিত নাক উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে ভেসে আসা সমুদ্রের সুগন্ধ পাচ্ছিল। ছোটার গতি কমিয়ে ওরা প্রথম মাঠে পৌঁছে গেল। উপত্যকার ধারে ঘাসের ভেতর গোরুর ক্ষুরের দাগপূর্ণ একটি স্থানে ওরা দেখতে পেল , ওদের নরম জুতো ও গোড়ালি ঢাকার আবরণ পরিপাটি করে সুন্দরভাবে রাখা আছে।
ওরা গোড়ালির আবরণের বোতাম ভালো করে লাগিয়ে নিলো আর স্খলিত তপ্ত ফলকের মধ্য দিয়ে দৌঁড়ে গেল।
এটাই হচ্ছে সেই প্রথম মাঠ, বেথ রিব রুবেনকে বলেছিল। ছেলেমেয়েরা থমকে গেল, উদ্ভাসিত চাঁদের আলোর বন্যা চলছে, এরমধ্যে বেড়ার ধারের অন্ধকার থেকে একটি কন্ঠস্বর শোনা গেল। সেই কন্ঠস্বর ওদের বললো, তোমরা ভালোবাসার সন্তান।
কে তুমি?
আমি জার্ভিস।
তুমি কোথায় আছ?
এখানে, প্রিয় সন্তানরা আমি এখানে একজন বিচক্ষণ জ্ঞানী মহিলার সঙ্গে এই বেড়ার ধারের অন্ধকারে মিশে আছি। কিন্তু অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা কন্ঠস্বর শুনে ছেলেমেয়েরা ভয়ে পালিয়ে গেল।
এখানে আছে সেই দ্বিতীয় মাঠ। ওরা এবার নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য থামল, একটি বেজি শব্দ করে ওদের পায়ের উপর দিয়ে ছুটে গেল।
শোনো, আরও শক্ত করে ধরে থাকো।
আমি তোমাকে শক্ত করে, আরও কঠিন বাঁধনে ধরে রাখব।
আচানক একটি কন্ঠ বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ আরও কঠিন করে ধরে রাখো আমার ভালোবাসার সন্তানরা।
কে বলছ? তুমি কে?
আমি জার্ভিস।
কোথায় আছ তুমি?
এই তো এখানেই আছি আমি। ডলগেলি থেকে আসা একজন স্বপ্নবাজ কুমারী মেয়ের সঙ্গে এখানে শুয়ে আছি।
তৃতীয় মাঠে জার্ভিস একজন সবুজ মেয়েকে ভালোবেসেছিল। যখন তিনি ছেলেমেয়ে দুটিকে ভালোবাসার সন্তান বলে ডাকতেন, তখন অই নারীর আত্মাকেও ভালোবাসতেন। অই নারীর নিঃশ্বাস থেকে টকটক দুধের গন্ধ ভেসে আসত। চতুর্থ মাঠে, তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীকে ভালোবেসেছিলেন আর অই নারীটির বাঁকানো অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জন্য তাদের প্রেম দীর্ঘদিন টিকে গিয়েছিল। পঞ্চম মাঠে, তিনি সমাজের সেই সব সোজা ছেলেমেয়েদের অভিশাপ দিয়েছিলেন। কারণ তারা তাকে একজন সুস্থ অঙ্গ প্রত্যঙ্গধারী প্রেমিক নারীর সঙ্গে ভালোবাসা ভাগাভাগি করতে সরাসরি দেখে ফেলেছিল।
টাইগার বে থেকে আসা এক নারী জার্ভিসকে শক্ত করে কাছে টেনে নিয়েছিল। তার লাল ঠোঁট জার্ভিসের গলার ওপর ভাঙা হৃদয়ের ছবি এঁকে দিয়েছিল। এটা ঘটেছিল ষষ্ঠ মাঠে—যেখানে রোদবৃষ্টির আবহাওয়া খেলে যায় সেই মাঠে। নারীটির হাতের চাপ থেকে মুখ ফিরিয়ে জার্ভিস তাদের সরলতা দেখতে পেয়েছি— যেন শূকরের কানে বেখাপ্পা দুলতে থাকা দুটি ফুল।
“আমার প্রিয় গোলাপ,” বলেছিল জার্ভিস; কিন্তু সপ্তম প্রেমের গন্ধ এখনও তার হাতে লেগে ছিল, আর অষ্টম প্রেমের ক্ষত তার আঙুলে। নবমবার বেথেল হার্টের কনভেন্ট থেকে আসা এক পুণ্যপবিত্র নারী তাকে সেবা দিয়েছিল।
মধ্য মাঠের ছেলেমেয়ারা চেঁচিয়ে উঠল—দশ কণ্ঠ মিলেই একটিমাত্র স্বর হয়ে উঠে এলো, আবার আধা-রাতের দশ ফাঁক আর ঘেরাটোপের পৃথিবীর ভেতর দিয়ে নেমে গেল। পূর্ণ রাতের অন্ধকারে তারা উত্তর দিল—একটিমাত্র স্বরের বহু কণ্ঠ করুণায় ভরে দ্বিত্বকণ্ঠের সেই প্রশ্নের জবাব দিল, যা ব ঊর্ধ্ব-নিম্ন বাতাসের অভিঘাতে তালে তালে বাজছিল।
তারা জানাল, আমরা, আমরাই জার্ভিস, বেড়ার নীচে, একজন নারীর বাহুবন্ধনে, একজন সবুজ নারী , একজন অসুখী টেকো নারী, একজন প্রেমময়ী সন্ন্যাসিনীর উরুর উপর আমরাই জার্ভিস।
এরপর ছেলেমেয়েদের কান এড়িয়ে ওরা ওদের ভালোবাসাগুলোকে গুনতে শুরু করে দেয়। বেথ রিব আর রুবেন দশটি দৈব বাণী শুনতে পেয়েছিল। লজ্জা পেয়ে তারা আত্মসমর্পণ করেছিল। অবশিষ্ট মাঠগুলো পেরিয়ে শেষ দশটি প্রেমের গুনগুনানী, বৃদ্ধ জার্ভিসের কন্ঠস্বর । ছায়ার ভেতরে থাকা ধূসর চূল চূড়ান্ত। তারা ইদ্রিসের দিকে দ্রুত বেগে চলে গিয়েছিল।
দ্বীপটি জ্বলজ্বল করছিল, জলের কলধ্বনি কচকচ করে উঠছিল, আর প্রবাহিত বাতাসের প্রতিটি আন্দোলন সমতল নদীতে দেহজ ভঙ্গিমার হিল্লোল তুলছিল। পুরুষটি নারীর গ্রীষ্মের পোশাক খুলে দিলে তীব্র অনুরাগে নারীটি তার হাত রাজহংসীর মতো বাঁকিয়ে ধরল। নগ্ন পুরুষটি ঘনিষ্ঠ আশ্লেষে কাঁধ ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছিল; নারীটি ঘুরল এবং দেখল, তার জেগে ওঠা জলতরঙ্গে পুরুষটি ঝাঁপ দিয়ে নেমে গেল। তাদের পেছনে নারীটির পিতার কণ্ঠস্বর স্খলিত হয়ে হয়ে ধীরে ধীরে শব্দহীন সরে যাচ্ছিল।
“নদীর উজানে চলো”, বেথ অস্ফুটে বলেছিল।
তাড়িত কন্ঠে পুরুষটিও উত্তর দিয়েছিল, “হু, উজানে চলো।”
সেই রাতে কেবলই উষ্ণতা ছিল। চিত্রিত নদীর জল প্রথম জীবিতদের দ্বীপের কিনার ছাপিয়ে ছুটে গিয়েছিল—নতুন চাঁদের শুভ্র আলোকের মতো। ·
লেখক পরিচিতি : ডিলান টমাসের পূর্ণ নাম ডিলান মারলিয়াস টমাস। তিনি ওয়েলস প্রদেশীয় কবি ও লেখক। ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবি যুক্তরাষ্ট্রেও ছিলেন জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কবিতার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন। ডিলান টমাসের জন্ম ১৯১৪ সালে লন্ডনের সোয়ানলি অঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল জীবন শেষ করে এবং খুব অল্প সময়ে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। ডিলান টমাস ১৯৫৩ সালের ৯ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন।


0 মন্তব্যসমূহ