অনুবাদ : হামীম কামরুল হক
[নাগিব মাহফুজ (১৯১১-২০০৬) তাঁর প্রজন্মের আরবি সাহিত্যের জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। তিনি ত্রিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন, যার ভেতরে আছে ‘দ্য কায়রো ট্রিলজি’, ‘থিফ অ্যান্ড দ্য ডগ’, ‘মিরামার অ্যান্ড দ্যা চিলড্রেন অব দ্যা অ্যালি’। পড়াশোনা করেছিলেন দর্শন নিয়ে। পেশায় ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ১৯৮৮ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। দুটি রচনাই অ্যারন বিরনি এবং রাসেল হ্যারিসের মাহফুজের আরবি গ্রন্থ ‘দার আল মাশরিয়াহ আল লুবাইনিয়াহ’ থেকে অনূদিত ইংরেজি গ্রন্থ ‘দ্যা মিনিং অব সিভিলাইজেশান’-এর যথাক্রমে—‘রিলিজিয়ন অ্যান্ড স্কুল’ এবং ‘থটস অ্যান্ড থিংস’ রচনাটির অনুবাদ।]
১. ধর্ম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের মতো করেই ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হতো। তাদের প্রবেশদুয়ারে থাকত কোরানের আয়াত, হাদিসের উক্তি, ঈমান আনা নিয়ে কিছু কথা এবং এই বিষয়ে আত্মনিবেদনমূলক কিছু কথা। শিক্ষার্থী এগুলি মুখস্থ করত এবং এর পরীক্ষা দিত, তারপর ক্রমে ভুলে যেত, ঠিক তেমন করে, যেভাবে সে পঠিত অনেক বিষয়ই শিখে ভুলে যায়—যেগুলি জীবনের ব্যবহারিকভাবে তাদের বিশেষায়িত পাঠ দানের ভেতরে করা হয়। শিক্ষার্থীরা এই সব লেখার খুব অল্পই ধারণ করতে পারে যেমনটা তারা এর শৈলীগত বাগভঙ্গি এবং শব্দগুলির যথাযথ অর্থের মধ্যে হোঁচট খায়—তবুও তাদের বিষয়টা সামাল দিতে হয়, কারণ না দিয়ে তাদের উপায় নেই।
বিজ্ঞান ও জ্ঞানের কোনো শাখাতেই ধর্ম বিষয়টা অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং এটি এক আধ্যাত্মিক শিক্ষা যেটা নির্যাস সামাজিক মেলামেশা, আচার-আচরণ এবং কল্পদৃষ্টি (ভিশন) তৈরিতে কাজে দেয়। এটা প্রায়ই দেখা যায় সে শিক্ষার্থীরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্দান্ত হয়ে থাকে, তারা স্বভাবচরিত্র বেশ দুষ্টু বা নষ্ট স্বভাবেরও হয়ে থাকে; যে আবার ধর্মের ক্ষেত্রে সব্বোর্চ নম্বর পেলে ভাবাই যায় সে তার সব বদ স্বভাব দূর হয়ে যাবে! এভাবেই, শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ধর্ম এবং দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে কোনো সম্পর্ক নেই , এবং এটি নিয়ে কী করতে হয়—সেটি তারা আয়ত্ত করে ফেলে।
এ কারণে, আমার প্রস্তাবনা এই যে, ধর্মীয় শিক্ষাকে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের জন্যই কাজে লাগনো উচিত। শিক্ষকদের উচিত গভীর ভালোবাসা ও মমত্ব দিয়ে এদের দিকনির্দেশনা দেওয়া। এভাবে বিষয়টি তাদের সামনে হাজির করতে পারলে মুখস্থ ও সশব্দে পাঠের জন্য যে কষ্ট ও ভয় তারা পায়—সেসবের হাত থেকে তাদের রেহাই মিলবে। অভিমতটা আসলে এই যে, ধর্মীয় বিষয়টা এমন কিছু নয়-যে সেটি মুখস্থ করতে হবে, বরং সেটি যুক্ত হতে পারে একজনের আদাবকেতা এবং আচারব্যবহারের সঙ্গে, যেটি মানবিক শিষ্টতার ভিত তৈরি করে দেয়।
আমি আরো বলতে চাই যে, আমি নবী মোহাম্মাদের জীবনীতে দেখেছি শিক্ষার প্রথম খুঁটি হলো যতটা পারা যায় জীবন, আচারব্যবহার এবং কল্পদৃষ্টি (ভিশন) তৈরির জন্য সবচেয়ে মহিমান্বিত বিষয় থেকে দৃষ্টান্ত হাজির করা দরকার। হযরতের জীবনী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে এবং উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পাঠ্য হওয়া উচিত। যখন তারা কলেজের প্রথম বর্ষে পড়বে তারা এর একটি সংক্ষিপ্ত, সরলীকৃত সংস্করণ পড়তে পারে; পরবর্তীকালে, প্রতি বছর ক্রমে, কোরানের আয়াত সহযোগে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও পর্যায় অনুযায়ী এটা আরো উচ্চতর এবং আনুসঙ্গিক বিষয়াদি মিলে বিস্তারিত পাঠ হয়ে উঠতে পারে । আয়াতসমূহ সালাতের মাধ্যমে শিক্ষার্থী বিশেষ বয়স অনুসারে পরিচয় ঘটানো যেতে পারে, যেমনটা হতে পারে রমজান মাসে রোজার সময়। যে-আয়তগুলির মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে, বলে নৈতিকতা ও এর সুুউচ্চ লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা, সেগুলিকে বিশেষভাবে তাদের নজরে আনতে হবে। এছাড়াও, এ বিষয়গুলি শিক্ষার্থী মেধাগতভাবে তাদের ব্যবহারিক জীবনে কতটা আয়ত্ত করতে পারছে, সেটির যাচাই করতে হবে। কীভাবে কতটা সে তার শিক্ষকের প্রতি সাড়া দিচ্ছে, শেখার প্রতি তাদের মনোভাব কেমন—ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সামাজিক ও গোত্রীয় ন্যায়বিচারে তাদের সংযুক্ততা খতিয়ে দেখতে হবে—এখানে কোনো ধরনের গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না—সেই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রটিকেও বিবেচনা করতে হবে।
উচ্চমাধ্যমিকের তৃতীয় বর্ষে শিক্ষার্থীরা তেমন একটি পাঠ্যবই থেকে পাঠ নেবে যেটি মুসলিম প্রতিনিধিত্বশীল চিন্তাবিদদের নানান রচনা থেকে নির্বাচিত অনুচ্ছেদ দিয়ে তৈরি—একইসঙ্গে সেই সব মননশীল চিন্তকের লেখাও পড়বে—যারা অন্য ধর্মের অন্তর্গত—ইসলামের প্রতি সম্মান রেখেই, এর মানবিক মূল্যবোধ এবং আধুনিক সমাজের প্রতি আহ্বানের দিকগুলি সেখানে যুক্ত হবে।
আমি এর সফলতার সেই মাত্রাটি দেখতে পাই যেখানে শিক্ষার্থীরা আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে সার্থকতা অর্জন করবে ধর্মীয় শিক্ষার ভেতর দিয়ে অন্যসব কিছু মিলিয়ে তথা সার্বিকভাবে।
২. চিন্তা ও বস্তু প্রসঙ্গে
এ দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সময়টাতে নানান রকমের বস্তু আর চিন্তা নিয়ে একজন মানুষকে কাজকর্ম করতে হয়। এগুলির মাধ্যেেম সে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে, এগুলির ভেতর দিয়েই সে বেড়ে ওঠে, নিজেকে নির্মাণ করে। এগুলি হলো তা-ই যেবিষয়গুলি তাকে চালিত করে, যদি আমরা তার চালিত হওয়ার বিষয়গুলিকে ছেনে দেখি, বিশ্লেষণ করি এবং সেগুলিই তার লক্ষ্য ছিলÑ যদি আমরা এর মূলে থাকা কোনো একটিকে বের করতে চাই।
চিন্তাগুলির মধ্যে আছে মতাদর্শ, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান এবং শিল্পকলা, আর বস্তুজগতের ভেতরে আছে যন্ত্রপাতি এবং ভোগ্যপণ্যমিলে যা যা সব। স্বাভাবিক জীবনের জন্য চাই এই দুয়ের ভারাসম্য রক্ষা। এই ভারসাম্য চিন্তা ও বস্তুর ভেতরে, বা অধ্যাত্মিকতা এবং বস্তুবাদের ভেতরে তৈরি করা ভারসাম্য।
আগের মানুষেরা এবং আমাদের এই সময়ের মানুষজন, তারা একদম এইরকমভাবেই তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এর বাদে সব সময় ভারসাম্য ছিল না বিশেষকরে যখন চিন্তা এগিয়ে গেছে, যখন সভ্যতা গড়ে উঠেছে, আর বস্তুময় উপকরণগুলি হাতের কাছে রেখেছে যখন কোনো সভ্যতা তার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। আমরা সন্দেহাতীতভাবে মনে করতে পারি যে যখন পশ্চিমে তারুণ্যের বিপ্লব দেখা দিল সেসময় এ-বিষয়টি কীভাবে ধারণা লাভ করেছিল এবং এর ব্যাখ্যাও আছে, অথবা এর ব্যাখ্যা দিয়েছে এতে অংশগ্রহণকারীদের কিছু জন যে, এই বিপ্লব পরিচালিত হয়েছিল ভোক্তাবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে, সেই বিষয়গুলির বিরুদ্ধে যেগুলি মানুষের চেতনাকে বন্দি করে এবং চেতনার গলা টিপে ধরে। তরুণরা এই প্রত্যাখ্যান, আর তাদের এই ঘোষণা ছিল জীবনের কাছে জ্যান্তভাবে দিকে ফিরে আসার প্রতীক।
আমাদের উন্নয়নশীল বা গরিবের দুনিয়ায় অনেক বিপ্লব আর ক্যু দেতা হয়েছিল। সেগুলি পরিচালিত হয়েছিল ঔপনিবেশিকতা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, কিন্তু বিপ্লবীরা সেই পৃথিবীর স্বপ্নও দেখেছিল যা বস্তুপুঞ্জে পরিপূর্ণ সমৃদ্ধ এক পৃথিবী!
বস্তুবাদিতা দুটো জগতের একদম শাঁস দিয়ে তৈরি—জড়বস্তুর দ্রব্যাদি হাজির করে একদিকে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে, এটা ততটাই হয়ে ওঠে আরেকজনে সুখস্বপ্ন। খ্রিষ্টধর্ম বস্তুবাদকে ঘৃণা-অবজ্ঞা-উপেক্ষা করতে শেখায় এবং এর অনুসারীদের একদম বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিকতার তাগিদ দেয়, ঠিক এই জায়গাটাতেই ইসলাম কোনো মানুষের কোনো বস্তুগ্রহণে কোনো ক্ষতি আছে বলে মনে করে না, কিন্তু এটা একইসঙ্গে ওই ব্যক্তিকেই তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের দিকেই জোর দিতে তাড়িত করে।
খ্রিষ্টীয় ইউরোপ পরে এই ব্যাখ্যা হাজির করেছিল যেটি এর খপ্পর থেকে বেরিয়ে গভীরভাবে বস্তুবাদিতায় আসতে সমক্ষমতা দিয়েছিল, যার ফলে ইউরোপীয়রা বস্তুবাদের ক্ষেত্রে ইতিহাসের বিপুলতম সফলতা অর্জন করেছিল, কিন্তু এখন এর তরুণেরা আঙুলি তুলেছে এই বলে যে, বস্তুবাদ সর্বতভাবে মানুষকে বন্দি করে ফেলে, আর পরিশেষে, এটা হয়ে ওঠে প্রতিশোধের বেদনাদায়ক পরিণতি এবং তা তরুণদের সংস্কৃতি থেকে উৎখাত ক’রে বিক্ষিপ্ত করে দেয়, এমনকি এর আলোকিত দিকগুলি থেকেও তাদের সরিয়ে দেয়।
উৎপাদিত দ্রব্যাদির প্রস্তুতকারী, এবং এর ভোক্তা হওয়াটা মানুষের ক্ষমতা, আধিপত্য ও সম্পদের প্রতীক। এবং চিন্তাজগতের ক্ষেত্রে এর উদ্ভাবন এবং ভোক্তা হওয়াটা মানুষ যে প্রকৃত মানুষ—সেটি বুঝে নেওয়ার প্রতীক। বুদ্ধিবৃত্তির এই দিকটি মানুষের শিখরস্পর্শী অর্জন এবং সৃষ্টিশীলতারও প্রতীক। চিন্তা ও মতাদর্শ, বিজ্ঞান ও শিল্পকলা/আর্ট এর ভেতর থেকেই গড়ে ওঠে, যা হলো মানবতার সত্যিকারের ক্ষেত্র—যেটি মানুষকে এনে দেয় মর্যাদা, সুখ এবং অমরত্ব।
অন্যদিকে বস্তুবাদী পথে যাত্রাটি দিনের শেষ মানুষকে একটা কানাগলিতে আটকে দেয়, বস্তুদ্রব্য তৈরি ক্ষেত্রে কে কতটা দক্ষ বা হয়ত সেই মানুষটি খাদ্যদ্রব্যই উৎপাদন করে, কিন্তু সেটি ভোগে তার সাধ্যটাও সীমাবদ্ধ। মদ্যপান ও নারীর বেলায়ও এই একই ঘটনা ঘটে; খুব সামান্য জিনিসই তাকে সহজতা, স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের জোগান দেয়। কী সম্পদ অর্জনের জন্য মরিয়া হওয়া, কী এগুলি আরো বিস্তার দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হওয়া—কোনোটাই তাকে নৈতিক অধঃপতন এবং অন্যদের ক্ষতিকর অপব্যবহার থেকে রক্ষা করতে পারে না, বরং তার সামাজিক এবং জাতীয় দায়দায়িত্ব থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আপনারা হয়ত সচকিত হয়েছেন আমার এই বক্তব্যে আমি মানুষের দোষত্রুটিগুলির প্রতি অঙ্গুলিনিদের্শ করেছি—যেখানে আমাদের এই বেঁচে থাকা সময়ের ভেতর আমাদেরকে সমাজের ওপর বিপুল ভারী বোঝায় পরিণত করে, এবং বিশেষভাবে যখন থেকে মিশর বস্তুদ্রব্যাদি উৎপাদনের বিষয়টির ব্যবস্থাদিতে সামাল দিতে পারেনি, কিন্তু সে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির ভেতরে বস্তুদ্রব্য আমদানি করা বজায় রেখেছে।
আমাদের প্রতিটি পয়সা কাজে লাগানোর দরকার এই মরুময় জায়গটিকে উর্বর করার জন্য, প্রচুর কলকারখানা গড়ে তোলার জন্য এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য, আমাদের দরকার বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিল্পকলা নিয়ে বিপুল পরিমাণ বইপত্রের প্রকাশনা, এবং আমাদের নিজেদের তৈরি করতে সেইসব মানুষের দেখাশোনা পরিচর্যা করার জন্যÑ যারা এই শতাদ্বির শেষে সত্তরোর্ধ বয়সে উপনীত হবে।
আমি এই সময়ে যে জীবনের ধরনটির পক্ষে কথা বলছি, যা আদতে সবসময় বলেছি, সেটি হলো: মানুষের সেই জীবন—যেখানে একজন মানুষ তার জীবনের বস্তুগত উপকরণগুলি ঠিকমতো পাবে এবং তার মানসিক সামর্থ্যকে চিন্তার জগতে ও চৈতন্যের বিকাশে নিবিড় ও গভীরভাবে কাজ করতে পারবে। ·
১৯ জুলাই ১৯৭৬
অনুবাদক পরিচিতি : হামীম কামরুল হক কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। পেশায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।


0 মন্তব্যসমূহ