আদি
অন্দর
‘পৌঁছতে হবে। চলো। সময় নষ্ট কোরো না।’
থমকে যায় তড়িৎ। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সামনের পথের দিকে।
‘সময় নষ্ট করা তোমার কাজ নয়। চলো।’
এতটা অবাক কখনও হয়নি সে। অস্ফুটে বলে, ‘কিন্তু পথই তো আমাকে নেয় না!’
অতি দীর্ঘ একটা পথ। আসলে অনেকগুলো একই রকম টুকরো জুড়ে জুড়ে তৈরি। খানিকটা করে যাওয়ার পরে একটা করে গোল চক্কর। সেখানে শাখায় আরেক পথ জুড়েছে। জুড়েও ঠিক যায় না। মাঝে খুবই ছোটো একটা করে ফাটল আছে। বিল্ট অপারেট ট্রান্সফার পদ্ধতিতে টুকরো টুকরো অংশ জুড়ে তৈরি উড়ালপুলের মতো, প্রতিটি টুকরোর মাঝে একটু ফাঁক রেখে। তেমনই এক ফাঁকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়েছে তড়িৎকে। যে টুকরোর ফাটলের মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে ফেরে সে।
‘এমন কখনও হয় না...’ বিড়বিড় করে তড়িৎ
বাহির
একটা সাদা টাইলস বসানো মেঝেয় নোংরা কার্পেটের প্যাকেট খোলা হয়। পর্যায়ক্রমে সেই কার্পেট ধোয়া হয়। প্রথমে জল দিয়ে। প্রচুর কাদা বেরিয়ে সাদা মেঝে কালো করে দেয়। সেই কাদা কাঁচিয়ে বের করা হয়। এবার কার্পেটের ওপরে তরল সাবান দেওয়া হয়। তারপরে মেসিন সেই কার্পেট ঘষে... ঘষে... ঘো... ঘোড়ার পা ভাঁজ করে চেপে ধরে বর্ধিত খুর কাটা হচ্ছে, একটা ছোটো ছুরি দিয়ে চেঁছে সমান করার পরে গরম লোহার নাল এনে সেই খুরের প্রাথমিক মাপ নিয়ে নেওয়া হয় কয়েকটা পেরেক... পেরেক... পেরেক... প... পাত্র গরম হলে একটু ঘি দিবেন। এবার গোটা মশলাগুলো দিয়ে খানিকক্ষণ নাড়তে থাকুন। এবার বাটা মশলা... বাটা... বা... বাঁ নাক দিয়ে কোনও গর্ভবতী নারী যদি প্রত্যহ এই বটপাতার রস টানতে থাকে তাহলে তার পুত্র... পু... পু... পুকুরে ইলিশ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এই মৎস্যজীবী। চিনের হুনান প্রদেশে... সে দেশের সমস্ত খবরের কাগজে পরের দিন প্রথম পাতায় শুধু স্বামীজির বক্তৃতার কথাই ছাপা হয়। শিকাগো ট্রিবিউনের প্রথম পাতায় স্বামীজির ছবি দিয়ে কেবল একটাই খবর বেরোয়... বেরিয়ে আসে যকৃৎ। এরপরে চিকিৎসকেরা যকৃতের বাইরের পর্দাটি কেটে নেন... নিয়ে যায় আরব বণিকেরা। অথচ এই সমস্ত সমীকরণ বেদে ছিল, যার থেকে আইনস্টাইন তার বিখ্যাত সমীকরণটি লেখেন। আমরা যদি বৈদিক গণিত। কঠিন থেকে কঠিনতর... কঠিন... ক... কোমোরিয়া গোলে গোলে গোলে গোলে ঘুমে রাজাজি... মায়ের মতো নাইটি পরা একজন বসে বসে যেন নাচছে। মা যেমন করে হাঁটু অবধি নাইটিটা তুলে বসে সবজি কাটে তেমন করে বসে নিজের কোলের দিকে আঙুল দেখিয়া আঙুল আর কোমর যেন কেমন করে দোলাতে থাকে। তার বুক দুলতে থাকে, দুলতে থাকে পাতলা নাইটির ভেতর গানের তালে তালে... কেমন যেন...
একটা কম ওয়াটের এলইডি লাইট জ্বলছে। সারাদিন জ্বলে। কারণ ঘরের জানলা কখনও খোলা হয় না। খোলা যায়, কিন্তু হয় না। বস্তুত খুলেও কোনও লাভ নেই কারণ পাশের ফ্ল্যাটের দেয়াল, উজানের চোখ আর মলির মোবাইল ফোনের মতো, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকে। সর্বক্ষণ। সিমবা লেজ নাড়ে। ওই বন্ধ জানলার সামনের মেঝেতে সিমবার বিছানা পাতা। মলি না করলেও সিমবা বিছানায় উঠে শুয়ে থাকে। পাশে উজান। আশ্চর্য সব উজ্জ্বল আলো উজানের নিস্পলক চোখে রঙ বদলায়। রঙ বদলাতে থাকে...
‘অ্যাই মুখে নে...’
ভাতের দলা মলির হাতে অপেক্ষা করে করে জল ঝরায় থালায়।
‘আমি কিন্তু ফোন নিয়ে নেব...’ কপট রাগ দেখায় মলি।
সিমবা নিজের বিছানা থেকে চোখ ঘুরিয়ে চায় মলির দিকে। উজানকে বকা সিমবা পছন্দ করে না। মলি বকলেও সিমবা এসে ঘুরে যায় সামনে দিয়ে। মলি তখন বলে, এই যে হয়েছে এক চামচে।
কোমরিয়া গোলে গোলে গোলে গোলে... তর্জনী ঘুরছে গোল গোল করে।
উজান চট করে বাঁহাতের বুড়ো আঙুলে সোয়াইপ করে, ঘাড় দুলিয়ে ডান হাত তুলে নিষেধমুদ্রায় বলে, ‘রুকো জরা! সবর করো!’
‘হাহাহাহাহাহা... হাহাহাহাহাহা...’ ওই হাসি একটা বিট দেওয়া মিউজিকের সঙ্গে যেন মিলে যায়। তারপর হাসি আর ইলেকট্রনিক বাজনা মিলে যায়। হাহাহাহাহাহা... উজানের চোখে আলো বদলায় ‘আয়াম আনস্টপেবল টুডে...’ সাউন্ডট্র্যাকের সঙ্গে বাইক কীভাবে বারো সেকেন্ডে শূন্য থেকে একশো কুড়ি কিলোমিটার গতিতে আনা যায় তা দেখা যাচ্ছে রাইডারের হেলমেটে লাগানো ক্যামেরায়।
বেলা পড়ে আসে। মলি যখন শুতে আসে তখন ফোন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছে উজান। সেই রকমই অভ্যাস। সিলিং ফ্যান চলছে ঘসঘস করে। পর্দার ওপারে, জানলার বন্ধ পাল্লার ওপারে রোদে ঝিকমিক করে উঠছে নিমগাছের পাতা। একা একাই। সিমবা আজ নিজের বিছানায়। সিমবা জানে মলি এসে উজানের পাশে শোবে। মাথার বালিশের পাশে ছেলের এলিয়ে পড়া হাত। পাশে পরে থাকা ফোনে একটা ছোট্ট বাচ্চা কোনও প্রবীণার বাচনভঙ্গি নকল করে বলছে ‘ঘটি বেকিয়ে দেব মনা, জানিস! তোদের মরণ হয় না কেন! ভগবান দেখে না...’ ফোন তুলে নেয় মলি। হাসে বাচ্চা মেয়ের কথা বলার ভঙ্গিতে। ‘কী পাকা বাবা বাচ্চাটা!’ বিড়বিড় করে মলি।
অন্দর
ধোঁয়া। এত ধোঁয়া কোথা থেকে এলো! চারপাশ ঘোলা হয়ে আছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অনেক আলো আর রঙ খুব মিহি গুঁড়ো করে করে যেন এই ধোঁয়া তৈরি। তার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে তীক্ষ্ণ শব্দের গুঁড়ো। উজানের চোখের চারপাশে, উজানের মুখের চারপাশে, উজানের কানের চারপাশে ধোঁয়া ধোঁয়া আলো রঙ আর শব্দের গুঁড়োর ধোঁয়া বইতে থাকে ক্রমাগত।
উজান, উজান তোমার এখন ঘুমনোর কথা। মা এসে যাবে এক্ষুনি।
ওই দূরে যে ধোঁয়া ঘন হয়ে রয়েছে তার ভিতর থেকে ক্ষীণস্বরে কে যেন বলে। কে বলে? কে? উজান কেঁপে উঠে একটু।
একটার পর একটা গোল চক্করে এসে শেষ হয় পথের একেকটা ব্লক। তার পরে তার সঙ্গে জুড়ে যায় আরেকটা ব্লকের লেজ। লম্বা সরু একটা লাইন। উজান কেন দেখতে পাচ্ছে না? এই তো একটু আগে ঘুমের দরজা ঠেলে ঢুকে এসেছে উজান। উজান পিছন ফেরে। দরজাটা কোথায় গেল! কিছুই দেখতে পায় না উজান। সামনে পিছনে সব দিকেই শুধু ধোঁয়া।
একবার ট্রেনে করে বেড়াতে যাওয়ার সময় এমন ধোঁয়া দেখেছিল উজান। মায়ের পাশে শুয়েছিল নিচের বার্থে। বাবা ঠিক ওদের ওপরে। উজান ছিল জানলার দিকে যাতে না পড়ে যায়। সাদা কম্বল ছিল এসি ট্রেনে। একবার ঘুম ভেঙে উজান বুঝতে পারেনি কোথায় আছে। করিডোরে একটা হালকা নীল আলো জ্বলছিল। পাশের জানলার পর্দা সরিয়ে দেখেছিল এই সাদা কম্বল যেন ওই জানলার বাইরে ভেসে ভেসে যাচ্ছে ওদের সঙ্গে। দুলে দুলে চলেছে ট্রেনটা।
গোলে গোলে গোলে গোলে ঘুমে রাজাজি...
ওই যে নাইটি পরে দুলছিল, সেটা দেখে কেমন যেন একটা লাগছিল। যেন কোনও একটা অপরাধ করে ফেলেছে উজান। আলোর গুঁড়ো, রঙের গুঁড়ো, শব্দের গুঁড়ো ছড়িয়ে যাচ্ছে আবার। পিছনের দরজাটা উজান দেখতে পাচ্ছে না। ঘুমের দরজা। ও তো চলে এসেছিল। তারপরে যেন কী একটা হল! ঘোড়ার নালে কে যেন পেরেক মারছিল। সাদা ধোঁয়া উঠছিল পায়ে লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে। খুব গরম ওটা। লাল হয়ে ছিল আগুন থেকে আনার সময়। ধোঁয়া। জানলার পাশ দিয়ে ধোঁয়া সরে যাচ্ছে ট্রেনের কম্বলের মতো। মিকি মাউসের জুতো। হেঁটে যাচ্ছিল। রাস্তায়। সারাগায়ে লোকটা মিকি মাউস। কেবল একটা বিরাট বড়ো মিকি মাউসের মুখ লোকটার হাতে। উজানের স্কুলের ব্যাগের থেকেও বড়ো। উজানের থেকে একটু বড়ো যে ছেলেটা ‘পুরানা কাগজ... নিউজ পেপার... খাতাবই’ কিনতে আসে রোববার সকালে তার বস্তার মতো বড়ো একটা মিকি মাউসের মাথা লোকটার কোলে। লোকটা হেঁটে যাচ্ছে। ধোঁয়া ধোঁয়া রাতের রাস্তায়। ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচ দিয়ে লোকটা কোথায় যেন হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছে। হাতে মিকি মাউসের খোলা মাথা। বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় যেমন ক্লান্ত হয়ে আসে তেমন হেঁটে যাচ্ছে লোকটা।
হাহাহাহাহাহা... হাহাহাহাহাহা... ঘটি বেঁকিয়ে দেব মনা। ভগবান দেখে না... মায়ের গলা! মায়ের গলা! মা ঘুমতে বলেছে। বিকেলে মিস আসবে। একটা লিফটের মধ্যে একজন জোম্বি সেজে দেয়ালের দিকে ফিরে দাঁড়িয়েছিল। একটা মেয়ে, মিসের মতো, সেই লিফতে ঢোকার পর দরজা বন্ধ হতেই জোম্বি ঘুরে দাঁড়ায়। সাদা মুখে জোকারের মতো দুই গাল কাটা। লাল রঙের ঠোঁট কানের দিকে চলে গেছে। লিফটে মিস ছিল? মরিস না কেন তোরা তোরা। মর! মর! ঘটি বেঁকিয়ে দেব মনা। প্র্যাঙ্ক! প্র্যাঙ্ক! হাহাহাহাহাহা...। হাহাহাহাহাহহা। প্র্যাঙ্ক... প্র্যাঙ্ক। সামনের পথের গোল চক্কর। গোল চক্কর ওকে নিচ্ছে না। এখন না ঘুমলে মিস এলে ঘুম পাবে। মা মারবে। ঘুমের দরজা তো পেরিয়ে এলো উজান। ধোঁয়া। আলোর গুঁড়োর ধোঁয়া। রঙের গুঁড়োর ধোঁয়া। শব্দের গুঁড়োর ধোঁয়া। ধোঁয়ায় জোকারের সাদা মুখ। গাল অবধি কাটা ঠোঁটের হাসি থেকে রক্ত পড়ছে। লাল। লাল। ঠোঁট ছড়িয়ে যাচ্ছে দুদিকে। ঠোঁট হাঁ হচ্ছে। লাল। ভেতরটা টকটক করছে লাল। এখানে মা খুব জাগ্রত। আপনি যদি কৌশিকী অমাবস্যায় পুজো দেন... ভিড় ভিড়। একটা বলি দেওয়া ছাগলের মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। গলার কাটা জায়গাটার ভিতর থেকে দিয়ে যেন কী একটা বেরিয়ে এসে নড়ছে। উজানের ভয় করে। নতুন রিলস। নতুন রিলস। ঘুমন্ত উজানের এলিয়ে পড়া খালি হাতের বুড়ো আঙুল সোয়াইপ করতে থাকে। ছবি সরছে না। ছবি সরছে না। জোকারের মুখে হাসি ছড়িয়ে যাচ্ছে... কাটা ছাগলের গলা থেকে নলের মতো কী একটা বেরিয়া আসছে আবার ঢুকে যাচ্ছে। তার সঙ্গে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। মা হাসছে। হাহাহাহাহাহা... হাহাহাহাহাহা... ঘটি বেঁকিয়ে দেব মনা। মা ওরকম বসে বসে নাচছে, মায়ের আঙুল ঘুরছে মায়ের কোলের দিকে দেখিয়ে, গোলে গোলে গোলে গোলে ঘুমে রাজাজি... উজান এবার অন্য হাতের তর্জনী দিয়ে না থাকা ফোন সোয়াইপ করে। ঘুমন্ত উজানের এলিয়ে পড়া আঙুল ঘুরছে। ফোনের ছবি বদলাতে হবে। কী একটা অস্বস্তি লাগছে উজানের। উজানের খালি হাতে আঙুল নড়তে থাকে...
মধ্য
বাহির
‘অঙ্ক করতে বসলেই তোমার এত জলতেষ্টা পায় টয়লেট পায় কেন?’ মিস বিরক্ত। মিস ফোন দেখে। দেখতেই থাকে। তারপরে বলে, ‘করে এসো। তাড়াতাড়ি আসবে।’
তেরোর টেবিল। তেরোর টেবিল। তেরোর টেবিল কিছুতেই মনে করতে পারছে না উজান। চার সাত নয়, চার সাত নয়, মনে করতে করতে বাথরুমে যায় উজান। চারসাতনয়। ফ্লাশ করে। মা পাশের ঘরে বসে ফোন দেখছে। উজান ঢুকতেই সোয়াইপ করে ফোন। ফোন থেকে আওয়াজ আসে মেয়েদের গলায়, ‘ছেলে বউমা দেখে না। আমি বলি...’
‘তুই উঠেছিস কেন?’
‘ফোনটা একটু দাও না...’
‘কেন?’
ফোন বলে, ‘নাতিটা আবার আমাকে ছাড়া ঘুমতে পারে নাআআ...’ পিছনে দর্শকের হাসির আওয়াজ।
হাহাহাহাহাহা ফোন হাসে...
‘দাও না’, বলে অপেক্ষা না করে প্রায় ছিনিয়ে নেয় ফোন। তেরোর টেবিল। ফোর ইনটু থার্টিন ফিফটিটু। সেভেন ইনটু থার্টিন নাইটি ওয়ান। নাইন ইনটু থার্টিন হান্ড্রেড এন্ড সেভেন্টিন। বিড়বিড় করতে থাকে উজান, ‘ফোর ইনটু থার্টিন ফিফটিটু। সেভেন ইনটু থার্টিন নাইটি ওয়ান। নাইন ইনটু থার্টিন হান্ড্রেড এন্ড সেভেন্টিন। ফোর ইনটু থার্টিন ফিফটিটু। সেভেন ইনটু থার্টিন নাইটি ওয়ান। নাইন ইনটু থার্টিন হান্ড্রেড এন্ড সেভেন্টিন।’
ফোনটা দিয়ে দেয়।
ফোর ইনটু থার্টিন ফিফটিটু। টু লেখে খাতায়, বিড়বিড় করে হাতে রইল ফাইভ। সেভেন ইনটু থার্টিন যেন কত... সেভেন ইনটু থার্টিন... সেভেন ইনটু থার্টিন... মনে করতে পারে না উজান। সেভেন ইনটু থার্টিন? শুরু থেকে বলার চেষ্টা করে মনে মনে।
মিস ফোন থেকে মুখ তুলে বলে, ‘হল?’
অন্দর
অনেকগুলো হাত। অনেক জোড়া। একটা হাতের জায়গায় অনেকগুলো হাত। ফোর ইনটু থার্টিন ফিফটি টু। অনেকগুলো হাত। আর তার থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক অনেক আঙুল। আঙুলে অনেকগুলো কর। ফোর ইনটু থার্টিন ফিফটি টু। প্রতি জোড়া হাতে চারটে আঙুল ফুলে যায়। হ্যাঁ ফোর। ইনটু থার্টিন। একহাতের চারটে আঙুল বন্ধ হয়ে দুহাত মিলিয়ে আঙুল খোলে। ফিফটি টু। আবার সাতটা আঙুল খোলে উজানের চোখের সামনে। সামনের ডান হাতে আবার পাঁচটা আর বাঁহাতে আবার দুটো। কী হল? উজান বুঝতে পারে না। আবার সেভেন কেন? ধোঁয়া ধোঁয়া পথ। উজান তাকাও, ইউনিট... টেনজ... একক... দশক... ও হ্যাঁ ফিফটি টু। হাতে রইল ফাইভ। অসংখ্য হাত উজানের চোখের সামনে পাঁচটা আঙুল খোলে। পুরো হাতের পাতা। উজানের চোখের সামনে। ফরসা লোকটা। কপালে লাল টিকা। গালে দাড়ি। গাড়ির মধ্যে বসে। উজানের চোখের সামনে বাড়িয়ে রাখা খোলা হাত। ‘রুকো জরা। সবর করো’... ‘রুকো জরা। সবর করো’...
বাহির
মিসের চোখে প্রতিফলিত সাদা আলো, ‘হল অঙ্কটা...’
‘রুকো জরা...’ বলেই উজান থেমে যায়।
মিসের চোখ থেকে সাদা আলো সরে, ‘কী! এতক্ষণ লাগছে কেন?’
‘করছি।’
মিসের চোখে আবার সাদা আলো। মিস খেয়াল করেনি।
হাতে ফাইভ। এবার যেন কি? সেভেন ইনটু থার্টিন... সেভেন ইনটু থার্টিন...
অন্দর
সেভেন ইনটু থার্টিন...
ধোঁয়ার ওপাশ থেকে কে যেন বলে ওঠে, নাইন্টি ওয়ান।
সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে ওঠে। ধোঁয়া নেই। ধোঁয়া নেই। মাথার ভিতরে কী একটা গড়াতে থাকে। এত্তবড়ো আইসক্রিমের মতো। প্রাইজ! প্রাইজ!
বাহির
হঠাৎ খুব ভালো লাগছে উজানের। নাইন্টি ওয়ান প্লাস ফাইভ। একানব্বই। কর গোনে উজান। বিরানব্বই তিরানব্বই চুরানব্বই পঁচানব্বই...
মিস খুক খুক করে হাসছে।
উজান প্রথমে খাতার দিকে দেখে। এখনও তো লেখেনি! ভুল করল কিছু? মিস হাসছে কেন! না, মিস হাসছে ফোন দেখে। পঁচানব্বই। নাইনটি ফাইভ। তাহলে নামল পাঁচ। হাতে নয়।
অন্দর
আলোটা হঠাৎ নিভে গেছে। অন্ধকার। ধোঁয়াও নেই। মিস হাসছে খুক খুক করে। কী একটা খুঁজছিল উজান। কী খুঁজছিল। হ্যাঁ। নাইন ইনটু থার্টিন হান্ড্রেড এন... হান্ড্রেড এন... খুক খুক... নাইন ইনটু থার্টিন। নাইন ইনটু থার্টিন। হান্ড্রেড এন... হান্ড্রেড এন...
হাহাহাহাহাহাহাহা... ফোন হাসছে
খুক খুক মিস হাসছে।
নাইন ইনটু থার্টিন হান্ড্রেড এন...
আসছে না। চারপাশে অন্ধকার। উজানের রাগ হতে থাকে। চারপাশে অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা মুখ বেরিয়ে আসে। সাদা। জোকারের মুখের মতো সাদা। ছুরি দিয়ে চেরা ঠোঁট ছড়িয়ে পড়েছে দুই গালে। লাল ঠোঁট। উজান প্রথমে ভয় পায়। তারপরে বুঝতে পারে ওটা ওরই মুখ। লাল রঙের হাসি ছড়িয়ে যায় উজানের মুখে। আরও চওড়া। আরও চওড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়ে উজানের ঠোঁট। চোখের পাতা কুঁচকে যায় ওই মুখে। রাগ, ঘেন্না, ব্যঙ্গ সব জুড়তে জুড়তে ছড়িয়ে যেতে থাকে উজানের ঠোঁট...
তোমাকে কিছু বলছে উজান। উজান। সাড়া দাও...
তড়িৎ যাও পরের অংশে যাও। তড়িৎ...
পথ আমাকে নিচ্ছে না...
উজান... উজান...
বাহির
‘তুমি কী করছ বল তো?’
রাগ, ঘেন্না, ব্যঙ্গ সব জুড়তে জুড়তে ছড়িয়ে যেতে থাকে উজানের ঠোঁট... ছুরি দিয়ে চেরা ঠোঁট ছড়িয়ে পড়েছে দুই গালে। লাল ঠোঁট। লাল রঙের হাসি ছড়িয়ে যায় উজানের মুখে। আরও চওড়া। আরও চওড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়ে উজানের ঠোঁট। চোখের পাতা কুঁচকে যায় ওই মুখে।
অন্ত্য
বাহির
সিমবা হঠাৎ মরে গেল। সন্ধেবেলা শুয়ে শুয়েই দুবার কেঁপে উঠে সিমবা হঠাৎ মরে গেল।
মলি কাঁদল একটু। সুকুমারকে ফোন করল। কাজ থেকে ফিরে সুকুমার বস্তায় পুরে নিয়ে গিয়ে কবর দেওয়ার কোনও জায়গা না পেয়ে সরকারি ভ্যাটে ফেলে এলো।
উজান একবার এসে দাঁড়িয়েছিল। কাঁদল না। কিছুই বলল না। সুকুমার নিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল। ‘যাবি?’
উজান যায়নি।
মলি রাতে কিছু খেল না। সুকুমার ফিরে স্নান করে খেল। উজান ফোন দেখতে দেখতে খেল।
সুকুমার বিরক্ত হয়ে বলে ফেলল, ‘ফোনটা রাখ না। সিমবা মরে গেল তোর কষ্ট হচ্ছে না!’
উজান ফোনটা নামিয়ে রাখল কিন্তু কোনও উত্তর দিল না।
অন্ধকার ঘরের কোণে একটা নীল আলো জ্বলছে। উজানের ঘুম আসে না। বাবার নাক থেকে একটা ঘড়ঘড় শব্দ আসছে। মায়ের নিশ্বাসের আওয়াজ। উজানের ঘুম আসে না। সিলিং ফ্যানের আওয়াজ আসছে। বন্ধ জানলার নিচে সিমবার বিছানা নেই। ওটাতে বমি করেছিল সিমবা। মা বস্তার মধ্যে ভরে দিয়েছিল। অন্ধকার ঘরে নীল আলো জ্বলে। বাবা আসতে আসতে কেমন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল সিমবা। ওই নীল আলোর মতো ঠান্ডা। সিলিং ফ্যান ঘুরছে ওপরে। মশারির জাল দুলছে। উজানের ঘুম আসছে না। জল তেষ্টা পাচ্ছে। বাথরুম পাচ্ছে। কী একটা যেন হচ্ছে ভিতরে। উজান বুঝতে পারে না। উজান চাদর গায় দেয়। গরম লাগছে। নীল আলো যেন অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে। উজান পাশ ফিরে শোয়। গরম লাগছে আবার। উজান চাদর সরিয়ে দেয়। মশারির ওপাশে দেয়াল। মশারি দুলছে। ধরে একটা ফিনাইলের গন্ধ। মা রাতে ঘর মুছেছিল। সিমবাকে নিয়ে যাওয়ার পর। উজান মশারি সরিয়ে নামে। মলি ঘুমের গলায় বলে ‘কোথায় যাচ্ছিস?’
‘বাথরুমে।’
মলি পাশ ফেরে। উজান নেমে বাথরুম থেকে এসে খাটের পাশের বোতল থেকে জল খায়। মলি ঘুমিয়ে পড়েছে আবার। গভীর নিঃশ্বাস নিচ্ছে। উজান মায়ের ফোন নিয়ে জানলার নিচে সিমবার বিছানার জায়গায় বসে। ফিনাইলের গন্ধ এখানে বেশি। উজাম প্যাটার্ন লক খোলে। ভলিউম কমিয়ে দেয়।
অন্দর
সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তর। দূরে যতদূর চোখ যায় সবুজ সবুজ ঢাল খেয়ে গেছে। কোথাও উঠেছে, কোথাও নেমেছে। সবুজ সবুজ। এত বড়ো মাঠ উজান দেখেনি কখনও। সবুজ টিলার ওপর থেকে অনেক কুকুর দৌড়ে আসছে। উজান ভালো করে দেখে সিমবা আছে কিনা ওর মধ্যে। কুকুরগুলো যেন ওকে ভেদ করে দৌড়ে চলে যায় ভিডিওর মতো। গিলা মনস্টার, সিসি মাছি, স্টোন ফিস, বুমসল্যাং সাপ, স্লো লরিস, পাফার ফিস, পয়জন ফ্রগ, কোন শেল, সি র্যাপ, মশা। আপনি কি জানেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দশটি প্রাণী হল এইগুলো। ছবি আসে পরপর এর মধ্যে আপনি... ক্যাপ্নোসাইটোফেগা ব্যাকটেরিয়া থাকে বিড়াল কুকুরের লালায় যা মানুষকে অসুস্থ করতে পারে। তবে সকলকে নয় যারা বিড়াল কুকুরের সঙ্গে মেশে কিন্তু যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম...
স্কুলের বারান্দার পাঁচিলের থামগুলোর গা ঘেঁষে একটা মশারি নেমে আসে। অন্ধকারের মতো নীল আলো। নীল আলোতে মশারির ঢেউ। বারান্দায় নীল আলো জ্বলছে পরপর। বাইরে অন্ধকার। অন্ধকারে ঢাকা প্রান্তর। যতদূর চোখ যায় অন্ধকার ঢাল খেয়ে গেছে। অন্ধকারের পাহাড় উঠেছে। অন্ধকারের খাদ নেমে গেছে। অন্ধকার দুলছে মশারির ঢেউয়ের মতো। অন্ধকারের মধ্যে অনেকগুলো কুকুর দৌড়ে আসছে। হাওয়ায় যেন দৌড়চ্ছে কুকুরগুলো। স্কুলের দোতলার বারান্দায় পাঁচিলের থাম থেকে ঝোলানো মশারি। বারান্দায় নীল আলো। সার সার। কুকুরগুলো শূন্যে ভেসে ভেসে এসে দোতলার বারান্দা দিয়ে ঢুকে এলো। কোথাও আটকালো না। ক্লাসের দরজা দিয়ে, ক্লাসের দেয়াল ভেদ করে, উজানের গায়ের ভিতর দিয়ে, উজানের হাতের ভিতর দিয়ে, উজানের মুখের ভিতর দিয়ে চলে গেল কুকুরগুলো। বারান্দাটা যেখানে গিয়ে ডানদিকে বেঁকেছে সেইদিকে মিলিয়ে গেল কুকুরগুলো। সিমবা নেই ওদের মধ্যে। অন্ধকারের মধ্যে ক্লাস চলছে। মিসের চোখ বিড়ালের মতো জ্বলজ্বল করছে। ওই জ্বলজ্বলে চোখের আলোর এত জোর যে মিসের মুখ আলো হয়ে গেছে। মিসের মুখের দুটো ড্রাকুলা দাঁতে ওই চোখের আলো চমকাচ্ছে। উজানের চোখে আলো এসে পড়ছে। ক্লাসের সামনের বেঞ্চগুলোতে যারা বসে আছে সকলের মুখ বিড়ালের মতো। সকলের চোখ জ্বলছে। অন্ধকার ক্লাস ঘরে অসংখ্য চোখ। সারি সারি। বারান্দার নীল আলোর মতো জ্বলে আছে। দূরের পিছনের চোখগুলোর আলো কম আসছে। তবু সবকটা চোখ জ্বলছে। উজান দাঁড়িয়ে আগে দাঁড়িয়ে ছিল নিজের জায়গায়।
‘সেভেন থার্টিনজা নাইনটি ওয়ান। নাইনটি ওয়ান প্লাস ফাইভ... উজান?’ মিসের মুখে বেড়ালের গোঁফ। সাদা সাদা, লম্বা লম্বা। মিসের ঠোঁটের পাশ দিয়ে ছড়িয়ে আছে। কার্ভ লাইনের মতো। মিসের প্রতিটা কথার সঙ্গে সেই গোঁফগুলো উঠছে নামছে। ছড়িয়ে যাচ্ছে।
‘উজান, নাইনটি ওয়ান প্লাস ফাইভ...?’
বারান্দায় কুকুরগুলো দৌড়নোর আওয়াজ। সিমেন্টের মেঝেতে নখ ঘষে যাচ্ছে কুকুরগুলোর। কুকুরগুলো আবার ফিরে আসছে।
‘উজান?’
উজান বারান্দার দিকে তাকায়। কুকুরগুলোকে দেখা যাচ্ছে না।
‘উজান দাস... বেরিয়ে এসো...’
একটা মিউজিক বিট শুনতে পায় উজান... সেই শব্দের সঙ্গে মিলে যায় হাহাহাহাহাহাহাহা হাসির আওয়াজ।
হাহাহাহাহাহাহা... হাহাহাহাহাহাহা...
‘বেরিয়ে এসে খাতাটা দেখো। নাইনটি ওয়ান প্লাস ফাইভ? কত হয়?’ মিসের গলায় নরম সুর। মেনি বিড়ালের মতো।
হাহাহাহাহাহাহা... হাহাহাহাহাহাহা...
মিস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বারান্দার সিমেন্টের মেঝেতে কুকুরের নখের ঘষার শব্দ...
‘উজান বি অ্যান্টেন্টিভ...’ হুলো বিড়ালের গলা।
উজানের ভয় লাগছে না। দুঃখ হচ্ছে না। রাগ হচ্ছে না। কেবল জলতেষ্টা পাচ্ছে...
এক থেকে বারো সেকেন্ডের মধ্যে শূন্য থেকে একশো কুড়ি কিলোমিটার স্পিড তোলা যায়...
কুকুরগুলো আবার আগের মতো দেয়াল ভেদ করে দৌড়ে যাচ্ছে। ক্লাসের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কুকুরগুলো। যেন ভেসে যাচ্ছে প্রচণ্ড গতিতে। বারান্দা পার হতেই...
‘এক মছলি। পানি মে গ্যায়ি। ছপাক।
প্রথম কুকুরটা বারান্দা ভেসে বারান্দা পার হওয়ার পরেই নিচে পড়ে গেল। তার পিছনের কুকুরটা বারান্দার পাঁচিলের ওপর দিয়ে গিয়ে পড়ল নিচে...
উজানের পিছনে গোটা ক্লাসের মুখে জোকারের হাসি। মুখের রেখা কুঁচকে গেছে সবার...
‘দো মছলি। দো মছলি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। ছপাক। ছপাক।’
সিমবা আসছে না। সিমবা নেই।
‘তিন মছলি। তিন মছলি। তিন মছলি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। ছপাক। ছপাক। ছপাক।’
চল্লিশটা গলা। চিৎকার করছে। কান যেন ফেটে যাচ্ছে উজানের...
গভীর অন্দর
‘এমন কখনও হয় না...’ বিড়বিড় করে তড়িৎ
‘কিন্তু তোমার তো সংকেত পাঠানোর কথা!’
‘আমিই তো সংকেত! কিন্তু সিনাপটিক ক্লেফটে এসে আটকে যাচ্ছি। ও আমাকে নিচ্ছে না!’
সব চুপচাপ। বিল্ট অপারেট ট্রান্সফার পদ্ধতিতে টুকরো টুকরো অংশ জুড়ে তৈরি উড়ালপুলের মতো, প্রতিটি টুকরোর মাঝে একটু ফাঁক রেখে ছড়িয়ে রয়েছে পথ। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। অজস্র তড়িৎ সংকেত অপেক্ষা করে আছে একের পর এক পথ জোড়ার ফাটলে এসে।
তড়িৎ অপেক্ষা করে... তড়িৎ অপেক্ষা করে...
একটা বিরাট তাক। সেখানে একের পর এক দৃশ্য গোছানো চলছে। একের পর এক শব্দ। একের পর এক স্মৃতি সঞ্চিত হচ্ছে... কার্পেট... ঘোড়ার নাল... ভেড়ার লোম... বটের দুধ... স্পোর্ট বাইক... প্র্যাঙ্ক... কোমরিয়া গোলে গোলে গোলে গোলে... একটার পর একটা... তাক ভরে যাচ্ছে আবার নতুন তাক আসছে। নতুন তাক। নতুন সংকেত। সেখানে দুঃখ নেই, শোক নেই, আনন্দ নেই, কেবল একটা উত্তেজনার পরে আরেকটা উত্তেজনা। একটা দৃশ্যের পরে আরেকটা দৃশ্য।
সিমবাকে বস্তায় মুড়ে নিয়ে যাচ্ছে সুকুমার। উজানের ভাবলেশহীন মুখ। ধোঁয়া ধোঁয়া ধোঁয়া। আলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাওয়া ধোঁয়া। রঙ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাওয়া ধোঁয়া। শব্দ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাওয়া ধোঁয়ায় ভরে রয়েছে।
‘সেরোটোনিন! সেরোটোনিন!’
খালি অন্ধকার রাস্তা। রোদ ঢোকে না এখানে। জড়িয়ে ধরার কেউ নেই... কেউ আসে না ডাকে সাড়া দিয়ে...
‘সেরোটোনিন! ও বিমর্ষ! ও হতাশ! বিষণ্ণ! সেরোটোনিন...’
চারিদিকে ধোঁয়া... চারিদিকে ধোঁয়া... কোনও আওয়াজ নেই। সাড়া নেই।
চল্লিশটা গলা। চিৎকার করছে। কান যেন ফেটে যাচ্ছে উজানের...
‘চালিশ মছলি। চালিশ মছলি। চালিশ মছলি। চালিশ মছলি...’
চল্লিশটা গলা চল্লিশ বার করে বলতে থাকে।
‘পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি।...’
এক একজন করে বাচ্চা বেরিয়ে আসে বেঞ্চ থেকে। ডিসিপ্লিনড। লাইন করে ক্লাসের দরজা দিয়ে বেরোয়।
‘ছপাক। ছপাক। ছপাক। ছপাক...’
একেকজন করে ঝাঁপ দেয় বারান্দা থেকে। নিচে পড়ে থেঁতলে ছিটকে যায় একেকটা বাচ্চা। মাথার যেখান দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে সেখানে থকথকে জেলির মতো কী একটা বেরিয়ে এসেছে... আলোর ধোঁয়ার মতো... রঙের ধোঁয়ার মতো... শব্দের ধোঁয়ার মতো...
‘উজান ভৌমিক...’ মিস ডাকে।
দূর থেকে আরেকটা নখ ঘষার শব্দ সিমেন্টের মেঝেতে...
‘উজান!’ চিৎকার করে মিস।
সেই নখের শব্দের সঙ্গে মিশে যায় গান,
‘আয়াম আ পোর্শে উইদ নো ব্রেক।
আয়াম ইনভিন্সেবল।
ইয়াহ, আয় উইন এভরি সিংগিল গেম...’
নখের আওয়াজ বাড়তে থাকে সিমেন্টের মেঝেতে।
‘আয় ডোন্ট নিড ব্যাটারিজ টু প্লে।
আয়াম সো কনফিডেন্ট।
ইয়াহ, আয়াম আনস্টপেবেল টু ডে...’
মিসের মুখ জোকারের মতো সাদা।
‘উজান চ্যাটার্জি... আয়াম টকিং টু ইউ...’ মিসের মুখ থেকে লালা ছিটকোচ্ছে...
দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসে সিমবা। সিমবার মুখে ওর বিছানা। সিমবার মুখ দিয়ে লালা পড়ছে।
মিস আর সিমবা দুজনের লালার মধ্যে ক্যাপ্নোসাইটোফেগা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে দেখতে পায় উজান। কিলবিল করছে...
সিমবা এসে গেছে। কোথাও যেন নিশ্চিন্ত লাগে উজানের।
কিন্তু সিমবা দাঁড়ায় না। কেবল একবা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় উজানকে। তারপর সোজা গিয়ে ঝাঁপ দেয় বারান্দা দিয়ে। উজান পিছনে দৌড়োয়। নিচে পড়ে দুবার থরথর করে কেঁপে উঠে সিমবা মরে গেল।
গোটা স্কুলে কোনও আওয়াজ নেই। একটাই নরম পেলব গলা। কেবল উজানের। ধীরে ধীরে উচ্চারণ করতে থাকে... ফাঁকা স্কুলে। বারান্দার বাইরের অন্ধকার দিগন্তে প্রতিধ্বনিত হয়...
‘চালিশ মছলি। চালিশ মছলি। চালিশ মছলি। চালিশ মছলি...
‘পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি। পানি মে গ্যায়ি...
‘ছপাক। ছপাক। ছপাক। ছপাক...
উজান লাফ দেয়। ·
লেখক পরিচিতি : গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক কনিষ্ক ভট্টাচার্যের জন্ম কলকাতায়, ১৯৭৬ সালে। পড়াশোনা হেয়ার স্কুল যাদবপুর ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তুলনামূলক সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। পেশা ভাষাসাহিত্যের শিক্ষকতা।


1 মন্তব্যসমূহ
অন্য রকম।আপাততঃ এটুকুই বলতে পারছি।এর বেশি বলার যোগ্যতা আমার নেই।
উত্তরমুছুন