অনুবাদ : শুভশ্রী বিন্তু
দোতলার বুড়ি মানুষটি যখন থেকেই মরণ দশায় ছিল, তখন থেকেই হেলেন তাকে মনে করতে পারে। হেলেন যখন ছোট, তখন সে তার মায়ের সঙ্গে করে ফল আর সবজি নিয়ে আসত এই মরতে থাকা মানুষটির জন্য। তখন থেকেই বুড়িটি চাদরের ভেতর মোমের পুতুলের মতো শুয়ে থাকতেন। আর এখন হেলেন নিজেই বড় হয়ে গেছে—তার এপ্রন আর ছাপা ফ্রক পরা শরীরের ভেতর একজন পূর্ণবয়স্ক নারী। তার ফ্যাকাসে চুল পেছনে জড়ো করে বাঁধা।
প্রতিদিন সকালে সে সূর্যের সঙ্গে উঠে পড়ত। আগুন জ্বালাত, লালচোখের বিড়ালটাকে ভেতরে ঢুকতে দিত। সে চা বানাত। তারপর কুটিরের পেছনের দিকের শোবার ঘরে উঠে সেই বুড়ি মানুষের ওপর ঝুঁকে পড়ত, যার না-দেখা চোখ দুটো কখনো বন্ধ হতো না। প্রতিদিন সকালে সে চোখের গহ্বরের দিকে তাকাত আর নিজের হাত বুলিয়ে দিত। কিন্তু চোখের পাতা নড়ত না, আর বুড়ি মানুষটি শ্বাস নিচ্ছেন কি না, তা সে বুঝতে পারত না।
‘আটটা বাজে, এখন আটটা,’ সে বলত।
আর সঙ্গে সঙ্গেই চোখ দুটো যেন হাসত।
চাদরের ভেতর থেকে একখানা ছেঁড়া হাত বেরিয়ে আসত। হাতটা সেখানেই থাকত, যতক্ষণ না হেলেন তার মোটা হাত দিয়ে সেটাকে ধরে কাপের চারপাশে বন্ধ করে দিত। কাপ খালি হলে হেলেন আবার ভরে দিত। পাত্র শুকিয়ে গেলে সে বিছানা থেকে সাদা চাদরগুলো সরিয়ে দিত। তখন বুড়ি মানুষটি সেখানে পড়ে থাকতেন—নাইটড্রেস পরা, পুরো শরীর সোজা করা। তার চামড়ার রং ছিল ধূসর, ঠিক তার চুলের মতোই। হেলেন চাদরগুলো গুছিয়ে দিত আর বুড়ি মানুষের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করত। তারপর সে চায়ের পাত্রটা নিয়ে চলে যেত।
প্রতিদিন সকালে সে বাগানে কাজ করা ছেলেটির জন্য নাশতা বানাত। সে পেছনের দরজায় যেত, দরজা খুলত, আর দূরে কোদাল হাতে ছেলেটাকে দেখতে পেত।
‘এখন সাড়ে আটটা,’ সে বলত।
ছেলেটা কুৎসিত ছিল। তার চোখ ছিল বিড়ালের চোখের থেকেও বেশি লাল—তার মাথার ভেতর যেন দুটো ধূর্ত কাটাছেঁড়া, সারাক্ষণ তার বুকের প্রথম ছায়ার দিকে নজর রাখত। হেলেন তার সামনে খাবার রাখত। ছেলেটা উঠে দাঁড়ালে সব সময় বলত, ‘তোমার কি আমার দিয়ে কিছু করানোর আছে?’
হেলেন কোনো দিনই বলেনি, ‘হ্যাঁ।’
ছেলেটা আবার ফিরে যেত আলুর ক্ষেতে খুঁড়তে, অথবা মুরগির ডিম গুনতে। যদি বাগানের ঝোপে বেরি থাকত, তবে দুপুরের আগে হেলেন তার সঙ্গে যোগ দিত। লাল কারেন্ট ফলগুলো যখন তার হাতের তালুতে জমতে থাকত, তখন তার মনে পড়ত বুড়ি মানুষের গদির নিচে রাখা টাকার দাগের কথা। যদি মুরগি মারতে হতো, তবে সে ছেলেটার চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে গলা কাটতে পারত। ছেলেটা ছুরিটা ক্ষতের ভেতর আটকে রাখত আর হাতার ওপর রক্ত মুছত। হেলেন একটা মুরগি ধরত, সেটাকে মারত, তার উষ্ণ রক্ত অনুভব করত, আর দেখত—মাথাহীন দেহটা পথ ধরে দৌড়ে যাচ্ছে। তারপর সে ভেতরে ঢুকে হাত ধুত।
বসন্তের প্রথম কয়েক সপ্তাহে সে ঠিক করল—উপরতলার বুড়ি মানুষটিকে সে মেরে ফেলবে। তখন তার বয়স বিশ বছর। তার অনেক কিছু চাওয়া ছিল। তার নিজের একজন পুরুষ চাই। রবিবারের জন্য একটা কালো জামা চাই। ফুল লাগানো একটা টুপি চাই। কিন্তু তার একটুও টাকা ছিল না।
যেদিন ছেলেটা ডিম আর সবজি বাজারে নিয়ে যেত, সেদিন সে বুড়ি মানুষটির দেওয়া ছয় পেন্স ছেলেটাকে দিত। আর বাজার থেকে ছেলেটা যে টাকা রুমালে বেঁধে আনত, সে টাকা সে বুড়ি মানুষের হাতে তুলে দিত। সে যেমন খাবার আর থাকার জায়গার জন্য কাজ করত, ছেলেটাও তেমনই করত। শুধু তফাত এই—হেলেন উপরের ঘরে ঘুমাত, আর ছেলেটা খালি গোয়ালের ওপর খড়ের বিছানায় ঘুমাত।
এক বাজারের সকালে সে বাগানে হাঁটতে বেরোল, যাতে মাথার ভেতরের পরিকল্পনাটা ঠান্ডা হয়। মে মাসের একটা সুন্দর দিন ছিল। আকাশে মাত্র দুটো মেঘ—দুটো বিশ্রী হাতের মতো, সূর্যের মাথাটা চেপে ধরেছে।
‘যদি আমি উড়তে পারতাম,’ সে ভাবল, ‘আমি খোলা জানালা দিয়ে উড়ে ঢুকে তার গলায় দাঁত বসিয়ে দিতাম।’
কিন্তু ঠান্ডা বাতাস সেই ভাবনাটা উড়িয়ে দিল।
সে জানত—সে কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। কারণ শীতের সন্ধ্যাগুলোতে সে বই পড়েছে—যখন ছেলেটা খড়ের ওপর স্বপ্ন দেখত আর বুড়ি মানুষটি অন্ধকারে একা পড়ে থাকতেন। সে পড়েছে এমন এক ঈশ্বরের কথা, যে টাকার মতো নেমে এসেছিল। সে পড়েছে মানুষের কণ্ঠস্বরওয়ালা সাপের কথা। সে পড়েছে এমন এক মানুষের কথা, যে আগুনের একটা টুকরো হাতে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
বাগানের শেষ প্রান্তে, যেখানে বেড়া বুনো সবুজ মাঠগুলোকে আটকে রেখেছে, সেখানে সে একটা মাটির ঢিবির কাছে পৌঁছাল। সেখানে সে সেই কুকুরটাকে কবর দিয়েছিল, যাকে সে মেরেছিল—কারণ কুকুরটা মুরগি ধরত আর মারত। একটা রুক্ষ কাঠের ক্রুশে মৃত্যুর তারিখটা উল্টো করে লেখা ছিল, যেন কুকুরটা এখনও মরেনি।
‘আমি ওকেও এখানে কবর দিতে পারি,’ হেলেন নিজেকে বলল। ‘এই কবরটার পাশেই, যাতে কেউ তাকে খুঁজে না পায়।’
সে নিজের হাত দুটো চেপে ধরল। তারপর দুটো মেঘ সূর্যের চারপাশে জড়ো হওয়ার আগেই সে কুটিরের পেছনের দরজায় পৌঁছে গেল।
ভেতরে ঢুকে তার মনে পড়ল—উপরতলার বুড়ি মানুষের জন্য খাবার বানাতে হবে, চায়ের ভেতর আলু চটকে দিতে হবে। হাতে ছুরি, কোলে আলুর খোসা—এই অবস্থাতেই সে যে খুনটা করতে চলেছে, তার কথা সে ভাবতে লাগল। ছুরিটাই শুধু শব্দ করছিল। হাওয়া থেমে গিয়েছিল। তার হৃদয় এমন নিস্তব্ধ ছিল, যেন সে সেটাকে মুড়ে রেখেছে। কুটিরের ভেতরে কিছুই নড়ছিল না। তার হাত কোলে নিথর হয়ে পড়ে রইল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না—চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উঠছে আর নিস্তব্ধ আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। তার মন—এই পৃথিবীতে একা—টিকটিক করে চলছিল।
তারপর, যখন সবকিছু মৃতের মতো হয়ে গেল, তখন একটি মোরগ ডেকে উঠল। তখন তার মনে পড়ল ছেলেটার কথা—সে শিগগিরই বাজার থেকে ফিরে আসবে। সে ঠিক করেছিল, ছেলেটা ফেরার আগেই সে খুনটা করবে। কিন্তু কবর খুঁড়তে হবে, আর গর্তটা আবার ভরাট করতে হবে। হেলেন আবার অনুভব করল—তার হাত কোলে নিথর হয়ে গেল।
আর মৃত্যুর মাঝখানেই সে শুনল—ছেলেটার হাত খিলটা তুলছে।
ছেলেটা রান্নাঘরে ঢুকল। সে দেখল—হেলেন আলু পরিষ্কার করছে। সে টেবিলের ওপর নিজের রুমালটা নামিয়ে রাখল। টাকার ঝনঝন শব্দ শুনে হেলেন তার দিকে তাকাল আর হাসল। ছেলেটা তাকে কোনো দিন হাসতে দেখেনি।
কিছুক্ষণ পর সে তার খাবার সামনে দিল, আর নিজে আগুনের পাশে কাত হয়ে বসল। ছেলেটা যখন ছুরিটা মুখের দিকে তুলল, তখন সে অনুভব করল—হেলেনের চোখের পূর্ণ দৃষ্টি তার চোখের পাশ দিয়ে পড়ছে।
‘তুমি কি তার খাবার তুলে দিয়েছ?’ সে জিজ্ঞেস করল।
হেলেন কোনো উত্তর দিল না।
ছেলেটা খাওয়া শেষ করলে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল আর হাজারবারের মতো আবার জিজ্ঞেস করল,
‘তোমার কি আমার দিয়ে কিছু করানোর আছে?’
‘হ্যাঁ,’ হেলেন বলল।
সে আগে কখনো তাকে ‘হ্যাঁ’ বলেনি। সে আগে কখনো কোনো নারীকে এমনভাবে কথা বলতে শোনেনি। তার বুকের প্রথম ছায়া আগে কখনো এত গাঢ় হয়নি। সে হোঁচট খেতে খেতে রান্নাঘরের ভেতর দিয়ে তার কাছে এল। হেলেন তার কাঁধের ওপর নিজের হাত তুলল।
‘তুমি আমার জন্য কী করবে?’ সে বলল, আর নিজের ফ্রকের ফিতা ঢিলা করে দিল, যাতে কাপড়টা তার গায়ে ঢলে পড়ল আর তার বুক অনাবৃত হয়ে গেল।
সে ছেলেটার হাত ধরল আর নিজের শরীরের ওপর রেখে দিল। ছেলেটা তার নগ্নতার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে তার নাম বলল আর তাকে জাপটে ধরল। হেলেন তাকে শক্ত করে ধরে রাখল।
‘তুমি আমার জন্য কী করবে?’
সে তার ফ্রকটা মেঝেতে পড়তে দিল, আর বাকি কাপড়গুলো ছিঁড়ে ফেলে দিল।
‘তুমি তাই করবে, যা আমি চাই,’ সে বলল, যখন তার হাত তার শরীরের ওপর নেমে এল।
এক মিনিট পরে সে তার বাহু থেকে ছুটে বেরিয়ে এল, আর নীরবে ঘরের ভেতর দিয়ে দৌড়ে গেল। উপরের দিকে যাওয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, নগ্ন পিঠটা দরজার দিকে রেখে, সে তাকে ইশারা করল আর বলল—তার কী করতে হবে।
‘তুমি আমাকে সাহায্য করবে, আমরা ধনী হয়ে যাব,’ সে বলল।
ছেলেটা হাসল আর মাথা নাড়ল। সে আবার তার দিকে হাত বাড়াতে গেল, কিন্তু হেলেন তার আঙুল ধরে ফেলল। সে দরজাটা খুলল আর তাকে নিয়ে উপরে উঠল।
‘তুমি এখানে চুপ করে থাকবে,’ সে বলল।
বুড়ি মানুষের ঘরে ঢুকে সে চারপাশে তাকাল—যেন শেষবারের মতো। ফাটা কলসিটার দিকে, আধখোলা জানালার দিকে, বিছানার দিকে, আর দেওয়ালে টাঙানো লেখার দিকে।
‘এখন একটা বাজে,’ সে বুড়ি মানুষের কানে বলল। আর অন্ধ চোখ দুটো হাসল।
হেলেন বুড়ি মানুষের গলার চারপাশে নিজের আঙুল জড়িয়ে ধরল।
‘এখন একটা বাজে,’ সে আবার বলল।
তারপর হঠাৎ করে সে বুড়ি মানুষের মাথাটা দেওয়ালে আছড়ে দিল। মাত্র তিনটা ছোট ধাক্কাই যথেষ্ট ছিল। মাথাটা ডিমের মতো ফেটে গেল।
‘তুমি কী করেছ?’ ছেলেটা চিৎকার করে উঠল।
হেলেন তাকে ভেতরে আসতে ডাকল। ছেলেটা তাকিয়ে রইল—নগ্ন নারীটির দিকে, যে বিছানায় হাত মুছছে, আর দেওয়ালে গোল, লাল দাগ করা রক্তের দিকে। সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
‘চুপ করো,’ হেলেন বলল।
কিন্তু তার শান্ত কণ্ঠস্বর শুনেই ছেলেটা আবার চিৎকার করল আর নিচে দৌড়ে পালাল।
‘তাহলে হেলেনকে উড়তেই হবে,’ সে নিজেকে বলল। ‘বুড়ি মানুষের ঘর থেকে উড়ে যেতে হবে।’
সে জানালাটা আরও খুলল আর বাইরে পা রাখল।
‘আমি উড়ছি,’ সে বলল।
কিন্তু সে উড়ছিল না। ·
লেখক পরিচিতি : ডিলান থমাসের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৭ অক্টোবর, ওয়েলসের সমুদ্রঘেঁষা শহর সোয়ানসিতে। ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওয়েলশ কবি ও গদ্যকার। তিনি ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন, কিন্তু তার সাহিত্যজগৎ গভীরভাবে ওয়েলসের গ্রামজীবন, লোককথা, বাইবেলীয় চিত্রকল্প, শৈশবস্মৃতি ও ভাষার সংগীতধর্মী শক্তির সঙ্গে যুক্ত।
ডিলান থমাস মূলত কবি হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেলেও, তার ছোটগল্পগুলো আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের এক অনন্য অধ্যায়। কবিতার মতোই তার গল্পে ভাষা ঘন, ছন্দময়, স্বপ্নালু—কিন্তু সেখানে রয়েছে নির্মম বাস্তবতা, কালো রসিকতা ও মানবিক অস্বস্তির তীব্র উপস্থিতি। তার গল্পের জগৎ গড়ে উঠেছে ছোট শহরের মানুষ, গোপন বাসনা, যৌনতা, মৃত্যু, অপরাধবোধ ও স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ দিয়ে। চরিত্ররা প্রায়ই সাধারণ—গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক, বৃদ্ধা, শিশু—কিন্তু তাদের ভেতরে জমে থাকা অন্ধকার থমাস ধীরে ধীরে উন্মোচন করেন। গল্পে নৈতিকতা স্পষ্ট নয়; বরং কাজ করে এক ধরনের অস্বস্তিকর সত্যবোধ, যেখানে নিষ্কলুষতা ও সহিংসতা পাশাপাশি বাস করে। “The True Story”, “The Peaches”, “A Child’s Christmas in Wales”—এই গল্পগুলোতে দেখা যায় থমাসের বিশেষ কৌশল: দৈনন্দিন ঘটনার ভেতর হঠাৎ করে ভয়াবহ বা বিস্ময়কর সত্যের আবির্ভাব। তিনি খুন, কামনা বা মৃত্যুকে নাটকীয় না করে প্রায় স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন—এতেই তার গল্পগুলো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ডিলান থমাসের গল্পে প্লটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভাষার গতি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। সংলাপ কম, ভেতরের স্বর বেশি। অনেক গল্পেই শেষ নেই—আছে শুধু থেমে যাওয়ার এক ভয়ংকর মুহূর্ত।
মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলেও, The Collected Stories-এ সংকলিত গল্পগুলো আজও প্রমাণ করে—ডিলান থমাস শুধু কবিতার নন, ছোটগল্পেরও এক শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র কারিগর।


0 মন্তব্যসমূহ