তসলিমা নাসরিনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : স্বকৃত নোমান

প্রশ্নহীন সমাজ মৃত সমাজ। তা সেই কুয়ার মতো, যে কুয়ার জল বদ্ধ, যার জল পচা ও দুর্গন্ধ। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রশ্ন করতে হয়, প্রশ্ন করার চর্চা জারি রাখতে হয়। উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজে বেগম রোকেয়া এবং বিশ শতকে শিখাগোষ্ঠীর লেখকগণ প্রশ্ন উত্থাপনের যে চর্চা শুরু করেছিলেন, পরবর্তীকালে তা আরও বিস্তার লাভ করে। জন্ম নেন আরও বিস্তর লেখকের, যাঁরা ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাঁদেরই ধারাবাহিকতায় এলেন আরেক লেখক―তসলিম নাসরিন―যিনি একইসঙ্গে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট ও মানবাধিকার কর্মী। কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি উত্থাপন করলেন প্রশ্নের পর প্রশ্ন। নারীমুক্তির জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে করলেন চ্যালেঞ্জ। নিয়মিত লিখেছেন কলাম, লিখেছেন কবিতা, গল্প আর উপন্যাস। 

যে কোনো সমাজে দুটি শ্রেণি ক্রিয়াশীল থাকে―একটি চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর, অন্যটি অনগ্রসর। দ্বিতীয় শ্রেণিটি প্রথম শ্রেণিটিকে টেনে ধরে রাখতে চায়, তাদের স্থানে রেখে দিতে চায়। কেননা অগ্রগামিতাকে তাদের ভয়। অথচ পৃথিবীর ইতিহাস এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। চিন্তা-চেতনায় মানুষ কেবলই এগিয়েছে। তারা অন্ধকারে পড়ে থাকেনি, মশাল হাতে এগিয়ে গেছে তিমির বিনাশ করে। কেউ দীর্ঘকাল গভীর অন্ধকারে থাকলে, হঠাৎ আলোর প্রকাশকে সে সইতে পারে না। তার দৃষ্টি ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তা-চেতনায় বাংলাদেশের অনগ্রসর মানুষেরা, যারা ভিন্নমতকে সইতে পারে না, ভিন্ন চিন্তাকে গ্রহণ করতে পারে না―সেই অসহিষ্ণু গোষ্ঠীটি শুরু করল অগ্রবর্তী লেখক তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। লেখার মোকাবিলা লেখা দিয়ে না করে তারা হাতে তুলে নিল হিংসার তরবারি। ফলশ্রুতিতে ১৯৯৪ সালে দেশত্যাগে বাধ্য হলেন নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল তাঁর নাম। নিজ দেশের একটা শ্রেণির কাছে তিনি ‘বিতর্কিত’ হলেও বিশ্বব্যাপী বিস্তর পাঠকের কাছে তিনি হলেন প্রশংসিত।

তসলিমা নাসরিনের জন্ম ১৯৬২ খিষ্টাব্দের ২৫ শে আগস্ট, বাংলাদেশের মংমনসিংহ শহরে। দুই ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। মা ঈদুল ওয়ারা গৃহিণী এবং বাবা রজব আলী পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। ১৯৭৬ সালে তসলিমা নাসরিন এসএসসি এবং ১৯৭৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে থেকে ১৯৮৪ সালে পাস করেন এমবিবিএস। কয়েক বছর সরকারি গ্রামীন হাসপাতালে চাকরি করার পর পরবর্তীকালে তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগে এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৩ বছর বয়স থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন তসলিমা নাসরিন। কলেজে পড়ার সময় ‘সেঁজুতি’ নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৯৭৫ সাল থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে। এর পর থেকে নিয়মিতই প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর কবিতা, গল্প, কলাম ও উপন্যাস। তাঁর গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে দুঃখবতী মেয়ে এবং মিনু। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে : অপরপক্ষ, শোধ, নিমন্ত্রণ, ফেরা, লজ্জা, ভ্রমর কইও গিয়া, ফরাসি প্রেমিক, শরম প্রভৃতি।

গল্পপাঠ কথাসাহিত্যের ওয়েবজিন। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে কথাসাহিত্যিক তসলিমা নাসরিনের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সানন্দে রাজি হন। এ বছরের জানুয়ারি মাসে প্রশ্নগুলো লিখে তাঁকে পাঠানো হয় মেসেঞ্জারে। প্রায় এক মাস সময় নিয়ে তিনি উত্তরগুলো লিখে পাঠান। পরবর্তী সময়ে এই সাক্ষাৎকারে যুক্ত হন জ্যোতির্বিদ, অধ্যাপক ও কথাসাহিত্যিক দীপেন ভট্টাচার্য এবং প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রিটন খান। তাঁরা আরও কিছু প্রশ্ন করেন তসলিম নাসরিনকে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরও এই সাক্ষাৎকারে ‍যুক্ত হয়েছে। 

তসলিমা নাসরিন এই সাক্ষাৎকারে প্রধানত বলেছেন তাঁর গল্প, উপন্যাস তথা কথাসাহিত্যি নিয়ে। আর বলেছেন তাঁর উপন্যাস-ভাবনা, কবিতা-ভাবনা, শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, বিশ্বসাহিত্য, নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতাসহ নানা বিষয়ে। বলা যেতে পারে এটি তাঁর দীর্ঘ এবং পূর্ণাঙ্গ একটি সাক্ষাৎকার।

স্বকৃত নোমান : 
আপনি দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। শব্দটা কি ‘যাপন’ বলব, নাকি ‘কাটানো’ বলব? বলতে চাইছি নির্বাসিত জীবনে আপনি কি জীবনটাকে সত্যিকারার্থে উদযাপন করছেন, নাকি কোনোরকমে কাটিয়ে দিচ্ছেন? কীভাবে বলবেন আপনি?

তসলিমা নাসরিন :
দু’রকমই ঘটেছে। কখনও শুধুই নিঃশ্বাস নিয়েছি, কখনও নিঃশ্বাসে প্রাণ খুঁজে পেয়েছি। বেদনায় ন্যুব্জ হয়েছি, হতাশা আমাকে দিনের পর দিন গ্রাস করেছে, তারপর আবারও উঠে দাঁড়িয়েছি, জীবন উপভোগ করেছি, জীবনকে অর্থপূর্ণ করেছি। নির্বাসন একেবারেই সহজ নয়। আমার মতো ব্রাত্য না হলে, হাতে -পায়ে শিকল না থাকলে, আমার জীবনকে কল্পনা করাও অসম্ভব। সেই যে কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটতে শুরু করেছি ৩১ বছর আগে। আজও সেই পথেই হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে হায়েনার কবলে পড়েছি, হাঁটতে হাঁটতে ফুলের সুগন্ধও পেয়েছি কম নয়।

স্বকৃত নোমান : 
জন্মভূমি থেকে নির্বাসনের বেদনা অত্যন্ত গভীর। আমার ধারণা লেখালেখি এক ধরনের বেদনারই বহিঃপ্রকাশ। নির্বাসিত জীবনের যে বেদনা, সেই বেদনা কি আপনার লেখালেখিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে? নাকি নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে?

তসলিমা নাসরিন : 
নির্বাসনের যন্ত্রণাকে সরিয়ে রেখে আমি গদ্য-পদ্য লিখেছি। যন্ত্রণায় ডুবে থাকলে লেখা-পড়া করা যায় না। নির্বাসিত জীবনে আমার প্রথম বইটি ছিল একটি কবিতার বই, নাম ছিল ‘নির্বাসিত নারীর কবিতা’। বেরিয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এরপর যে কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, নির্বাসন আমার মানসিক দৃঢ়তাকে সামান্যও কুঞ্চিত করতে পারেনি।

স্বকৃত নোমান : 
আপনি কবিতা লিখতেন। কবিতা দিয়েই শুরু করেছিলেন লেখালেখি। তারপর প্রবন্ধ লিখলেন, ছোটগল্প এবং উপন্যাসও লিখলেন। কবি তসলিমা নাসরিনের নয়, আমি সাক্ষাৎকার নিচ্ছি কথাসাহিত্যিক তসলিমা নাসরিনের। আমরা মূলত আপনার কথাসাহিত্য নিয়েই কথা বলতে চাই। আমি জানতে চাইছি, কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লেখার জন্য কীভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন? কেন মনে হয়েছিল সবই লেখা দরকার?

তসলিমা নাসরিন : 
১৯৭৩ সাল থেকে কবিতা লিখি, ১৯৭৫ সাল থেকে লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা ছাপা হয়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত লিটল ম্যাগাজিন ‘সেঁজুতি’ সম্পাদনা করি, প্রকাশও করি। ১৯৮৬ সালে প্রথম কবিতার বই ছাপা হয়। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত আমার দ্বিতীয় কবিতার বই, ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’ বেশ জনপ্রিয় হয়। তখন থেকেই বিভিন্ন দৈনিক এবং সাপ্তাহিক থেকে অনুরোধ আসে কলাম লেখার। কলামগুলোয় আমি মূলত মেয়েদের কথাই লিখি, নিজের নানা রকম অভিজ্ঞতার কথাও লিখি। সেসব কলাম প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়। একটা কলামের জন্য তখন ৫০০ টাকা পেতাম। ওই টাকাটার খুব দরকার ছিল আমার। আমি তখন মিটফোর্ড হাসপাতালের ডাক্তার, মাসিক বেতন ২৫০০ টাকা। আমি যে মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে আরমানিটোলায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলাম, সেটার ভাড়াই ছিল ৩০০০ টাকা। বেতনের টাকায় ভাড়াই হতো না, সে কারণে কলাম লিখে বাড়িভাড়া আর খাওয়াদাওয়ার খরচ তুলতে হতো। 

কলাম জনপ্রিয় হওয়ার কারণে উপন্যাস লেখার জন্য প্রকাশকদের অনুরোধ পেতে থাকি । প্রকাশকেরা বাড়িতে এসে ১০ লাখ, ২০ লাখ টাকা অগ্রীম রয়্যালটি রেখে যেতেন যেন উপন্যাস দিই তাঁদের। বলতাম টাকা ফেরত নিয়ে যেতে, বলতাম আমি উপন্যাস লিখতে জানি না। তাঁরা শুনতেনই না। এক সময় টাকার দরকার পড়লো আমার। তখন চারদিকে উগ্রবাদীদের মিছিল শুরু হয়েছে আমার বিরুদ্ধে। আমার কলামে নারীর সমানাধিকারের পক্ষে আপোসহীন মত প্রকাশ করতাম, এতে নারীবিরোধী ধর্মীয় আইনের সমালোচনাও থাকতো। মিছিল এসে আবার বাড়ির ক্ষতি না করে, বাড়িওয়ালা আমাকে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিতেন। আমাকে তখন বাধ্য হয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনতে হয়, এবং আমাকে বাধ্য হয়ে উপন্যাস লিখতে হয়। সেগুলো আদৌ উপন্যাস হয়েছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশে এমনই পাঁচ/ছ ফর্মার উপন্যাস পড়ে পাঠক অভ্যস্ত। সে কারণে হয়তো প্রকাশকরা খুশি ছিলেন। আমি উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলাম শান্তিবাগের একটি ভাড়া-বাড়িতে বসে। শান্তিনগরে নিজের কেনা ফ্ল্যাটে ওঠার পরও কিছুদিন উপন্যাস লিখতে হয়েছে। ছোট গল্পও কিছু লিখেছি, সেও প্রকাশকদের অনুরোধে এবং অগ্রীম রয়্যাল্টির বোঝা কাঁধ থেকে নামাতে। নিজে শখ করে তখন কবিতা ছাড়া অন্য কিছু লিখিনি।

স্বকৃত নোমান : 
বুঝতে পেরেছি আপনি আর্থিক কারণে উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখানে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে। লেখক কি টাকার জন্য লেখেছেন, নাকি অন্তর্গত তাড়না থেকে লেখেন? শুধুই কি টাকার জন্য আসলে লেখা যায়, নাকি অন্তর্গত তাড়নাও থাকতে হয়? আপনি কীভাবে দেখেন এ বিষয়টাকে?

তসলিমা নাসরিন
 আমি কলাম লিখে যে টাকা পেতাম, তা দিয়ে আমার সংসার চলতো। এর মানে কিন্তু এই নয় যে আমি টাকা ছাড়া লিখিনি, বা আমি কোথাও গোঁ ধরেছি যে টাকা ছাড়া লিখবো না। প্রকাশকরা যখন অগ্রিম রয়্যালটি দিয়ে যেতেন, আমি তাঁদের বলিনি দিতে—তাঁরাই দিতেন। সেই টাকা পরে জীবন বাঁচাতে আমার কাজে লেগেছিল। সত্যি বলতে, এ পর্যন্ত যত লেখার জন্য টাকা পেয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি লেখার জন্য টাকা পাইনি। হাতে গোনা দু-একটি প্রকাশনী ছাড়া আজকাল প্রায় কোনো প্রকাশনীই লেখকদের রয়্যালটি দিতে চায় না। তা ছাড়া আমার বইয়ের এত বেশি পাইরেট এডিশন বের হয় যে, সেসবের রয়্যালটি তো আমি পাই না। বাংলাদেশে আমার যত বই আছে, সবই এখন পাইরেট মুদ্রণ। ভারতে প্রচুর পাইরেট এডিশন চলে, নেপালে তো সবই পাইরেট।

টাকার প্রয়োজনে অনেক অভাবগ্রস্ত বা ঋণগ্রস্ত লেখক বই লিখেছেন। আমাদের শরৎচন্দ্রই তো লিখতেন অভাবের তাড়নায়। দারিদ্র্য ঘোচাতে চার্লস ডিকেন্স লিখতেন; এ যুগে জে. কে. রাউলিং লিখেছেন। জুয়োর ঋণ শোধ করতে দস্তয়েভস্কি লিখতেন, পাওনাদারের টাকা শোধ করতে মার্ক টোয়েন লিখতেন। তবে আমি টাকা পেয়েছি বলে যা লিখলে জনপ্রিয় হওয়া যায় বা বাহবা পাওয়া যায়—তা লিখিনি। আমি তো অন্য জনপ্রিয় লেখকদের মতো শুধু প্রেমের গল্পই লিখতে পারতাম। কিন্তু আমি লিখেছি সমাজে নারীর ওপর অত্যাচারের কাহিনি; নারীবিদ্বেষীরা আমাকে ছিঁড়ে খাবে কি না—তা নিয়ে ভাবিনি। সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচারের কাহিনি লিখলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আমাকে লাঞ্ছিত করতে পারে—তা নিয়েও কখনও ভাবিনি। যে যাই বলুক, আমি সবসময় চিন্তার খোরাক জোগায় এমন লেখাই লিখেছি।

স্বকৃত নোমান
১৯৯০ সালে আপনার ‘নির্বাচিত কলাম’ প্রকাশিত হয়। এই কলাম বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকায় প্রকাশের পর প্রতিক্রিয়া কেমন পেতেন? বইটি প্রকাশের পর পাঠকমহলে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? আপনার স্মৃতি থেকে যদি বলেন...।

তসলিমা নাসরিন
আমি তো প্রচুর প্রশংসা পেতাম। পত্রিকায় প্রচুর চিঠিও বের হতো। কলামগুলোয় মেয়েদের বিরুদ্ধে হাজার রকম বৈষম্য যে আছে, হাজার রকম নির্যাতন আছে, সেসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকতো। মেয়ে বলে ঘরে বাইরে কীভাবে হেনস্থার শিকার হতাম, লিখতাম। মেয়েরা চিঠি লিখে জানাতো, তারাও এমন হেনস্থার শিকার। বলতো, আমার লেখা তাদের শক্তি দেয়, সাহস জোগায়। আমি মেয়েদের অত্যাচার না সওয়ার পরামর্শ দিতাম, রুখে দাঁড়াবার কথা বলতাম। মেয়েরা জেগে উঠছে দেখে দেশের মৌলবাদী অপশক্তি, এবং নারীবিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আমার বিরুদ্ধে তখন যুদ্ধ ঘোষণা করে।

স্বকৃত নোমান :
বাংলাদেশে সামাজিকভাবে নারীরা এখন অনেক অগ্রসর। নারীরা চাকরি-বাকরি করছে, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। কোথাও নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদে সমাজ উত্তাল হচ্ছে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে এটা আশাজাগানিয়া মনে হয় আমার কাছে। ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এমনটা চিন্তাও করা যেত না। এই যে সামান্য হলেও নারীর অগ্রগতি, এই অগ্রগতির পেছনে আপনি কি মনে করেন আপনারও ভূমিকা রয়েছে? আপনার ব্যক্তিগত অভিমত জানতে আগ্রহী।

তসলিমা নাসরিন
অনেকে বলেন আমার নারীবাদী লেখা পড়ে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে নারীরা সচেতন হয়েছিল বলেই তারা আজ ঘরের বাইরে বেরিয়েছে, শিক্ষিত হচ্ছে, স্বনির্ভর হচ্ছে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। হতে পারে। ইতিহাস তো এভাবেই এগোয়। কাউকে না কাউকে তো অন্ধকারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথম আলোটা জ্বালাতেই হয়। আমি যখন প্রতিকূল পরিবেশে একাই সাহস করে নতুন পথের দিশা দিয়েছিলাম, তখন চারপাশ থেকে আক্রমণ এসেছিল। অথচ লক্ষ্য করছি, চার যুগ আগে যে কথাগুলো লিখে আমি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে নিন্দিত এবং অপদস্থ হয়েছিলাম, এখনকার নারীবাদীরা সেই একই কথা বলে প্রচুর হাততালি আর প্রশংসা পাচ্ছেন। এটিই হয়তো সময়ের পরিহাস, কিংবা বলা যায় আমার লড়াইয়ের এক ধরণের নীরব জয়।

স্বকৃত নোমান
প্রবন্ধের বই ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট’ গল্প বেরিয়েছে ১৯৯২ সালে। এই প্রজন্মের কোনো পাঠক, যে আপনার এ বই পড়েনি, সে যদি জানতে চায় ‘নষ্ট মেয়ে’ বলতে আপনি কাকে বা কাদের বুঝিয়েছেন, সেক্ষেত্রে আপনি কী উত্তর দেবেন?

তসলিমা নাসরিন :
নির্বাচিত কলামের মতো ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ বইটিও কলামের বই। পত্রিকায় লেখা কলামগুলো জড়ো করে বই হিসেবে বের করেছেন প্রকাশক। আমি বিশ্বাস করি সমাজ তাদের নষ্ট মেয়ে বলে ডাকে, যারা প্রতিভাময়ী, যারা সৎ এবং সাহসী, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, যারা বৈষম্য মানে না, যারা নিজেকে ক্ষুদ্র তুচ্ছ যৌনবস্তু ভাবে না, পুরুষের দাসি ভাবে না, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ভাবে না, যারা শিক্ষিত, স্বনির্ভর, যারা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে জানে। আমি সেই মেয়েদের সুস্থ এবং শুদ্ধ মেয়ে বলি না, যে মেয়েদের নষ্ট পচা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ‘’নষ্ট মেয়ে’বলে আখ্যা দেয়নি। আমি সমাজের চোখে নষ্ট, যেহেতু আমি ধর্ম এবং পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। বিষাক্ত পৌরুষ বা টক্সিক মাসকিউলিনিটি দ্বারা আক্রান্ত আমাদের সমাজকে বদলাতে পারে একমাত্র এই ‘নষ্ট মেয়ে’রাই।

স্বকৃত নোমান
প্রবন্ধের বই ‘নারীর কোনো দেশ নেই’ ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ে কিংবা বইয়ের নাম দেখে যে কোনো পাঠক বলবে বইটি নারীবাদের জায়গা থেকে লেখা। নারীর ওপর চলা নির্যাতন নিপীড়নকে কেন্দ্র করে লেখা। বইটি লিখতে আপনি কীভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন?

তসলিমা নাসরিন
এটিও কলামের বই। কলকাতায় থাকাকালীন ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ পত্রিকার জন্য প্রতি সপ্তাহে কলাম লিখতাম। নারীর সমানাধিকারের পক্ষেই ছিল সেইসব কলাম। নারীবিদ্বেষ এবং পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখা আমার কলাম পড়ে শুনেছি তখন স্টেটসম্যান পত্রিকার অফিসের কিছু লোক ক্ষুব্ধ হয়েছিল। সম্পাদক এক সময় আমার কলাম ছাপানো বন্ধ করে দেন।

স্বকৃত নোমান :
তার মানে কলকাতাতেও অসহিষ্ণু মানুষ আছে, যাদের তোপের মুখে পড়েছিলেন আপনি। আপনি দীর্ঘদিন কলকাতায় থেকেছেন। সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।

তসলিমা নাসরিন
সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আমি দুহাত ভরে পেয়েছি, সমস্যাটা ছিল তথাকথিত ‘অসাধারণ’ ও ক্ষমতাবান মানুষদের নিয়ে। অবাক লাগে ভাবলে, ২৫ জন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী মিলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়ে আমার 'দ্বিখণ্ডিত' নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীও কালক্ষেপণ না করে বইটি নিষিদ্ধ করলেন। আসলে পশ্চিমবঙ্গের কিছু লেখক ও বুদ্ধিজীবী আমার তুমুল জনপ্রিয়তা এবং বইয়ের কাটতি সহজভাবে নিতে পারতেন না। তাঁদের সেই ঈর্ষা আর রাজনৈতিক সংকীর্ণতা আমাকে কলকাতা থেকে তাড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তাঁরা সহনশীলতার কথা বললেও আদতে ভিন্নমতের প্রতি কতটা অসহিষ্ণু ছিলেন, আমার ঘটনাই তার বড় প্রমাণ।

স্বকৃত নোমান
১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় ‘অপরপক্ষ’ উপন্যাস। একজন নবীন পাঠক যদি জানতে চায়, এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু কী, আপনি কি বিস্তারিত উত্তর দেবেন? কবিতা, প্রবন্ধের পাশাপাশি হঠাৎ কেন মনে হলো উপন্যাস লিখতে হবে? আপনি কি কবিতা ও প্রবন্ধে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না? নাকি আপনার মনে হয়েছিল সাহিত্যের এই শাখাটিরও চর্চা করতে হবে?

তসলিমা নাসরিন
আগের একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছি কেন উপন্যাস লিখতে হয়েছে আমাকে। প্রকাশকের অনুরোধে লিখতে হয়েছে, অগ্রীম টাকা দিয়ে উপন্যাস লিখতে বাধ্য করতেন। তাছাড়া সংসার চালাবার জন্য টাকার প্রয়োজনও ছিল। তবে কলাম শুরু করার আগে ৮০র দশকের শুরুতে আমার কিছু গল্প ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদ এবং আরও কিছু দৈনিক পত্রিকায়। সেই গল্পগুলো আর আমার সংগ্রহে নেই। কত যে গল্প, কত যে কবিতা হারিয়ে গেছে! ‘অপরপক্ষ’ আমার প্রথম উপন্যাস। দুটো বোন পরস্পরকে চিঠি লেখে। চিঠিতেই দুই জীবনের গল্প বলা হয়ে গেছে। এটি একটি নারীবাদী উপন্যাস। আমি অবশ্য উপন্যাস বলবো না একে, বলবো উপন্যাসিকা, বা নভেলা। ছোট গল্প থেকে বড়, কিন্তু আবার বড় গল্পও নয়, বড় গল্পের চেয়েও বড়, কিন্তু উপন্যাসের চেয়েও ছোট। পৃথিবীতে বিখ্যাত সব উপন্যাস আছে, একেবারেই ছোট, কাফকার মেটামরফোসিস মাত্র ৫০/৬০ পৃষ্ঠার, জন স্টাইনবেকের ‘দ্য পার্ল’ মাত্র ৯০ পৃষ্ঠার উপন্যাস, হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী’ তো মাত্র ১২৭ পৃষ্ঠার। এই তালিকায় অরওয়েলের ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’, কাম্যুর ‘আউটসাইডার’ও আছে।

স্বকৃত নোমান
আপনার দৃষ্টিতে উপন্যাস আসলে কী? উপন্যাস কি জীবনের সমগ্রতাকে ধারণ করে, নাকি জীবনের ছোট কোনও বিষয় নিয়েও উপন্যাস হতে পারে?

তসলিমা নাসরিন :
ক্ষদ্র তুচ্ছ বিষয় নিয়েও উপন্যাস হতে পারে। বিশাল প্রেক্ষাপট নিয়ে তো হতেই পারে। উপন্যাসের কোনও সংজ্ঞা হয় বলে আমি মরে করি না। আসলে জীবনের কোনো এক টুকরো অভিজ্ঞতা যখন লেখকের কলমে শৈল্পিক রূপ পায়, তখন তা উপন্যাসের মর্যাদা পেতে পারে। জীবন তো কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা নয়, তাই তাকে ধারণ করা সাহিত্যের আঙ্গিকও ছকবাঁধা হতে পারে না। কখনো এটি একটি নির্দিষ্ট সময় বা ঘটনার ব্যবচ্ছেদ করে, আবার কখনো সমগ্রতাকে ছুঁতে চায়। মূল কথা হলো, সেটি জীবনের সত্যকে কতটা বিশ্বস্তভাবে ফুটিয়ে তুলছে। আমার কাছে উপন্যাসের সার্থকতা এর বিশালতায় নয়, বরং এর ভেতরের সততায়।

স্বকৃত নোমান
‘অপরপক্ষ’ লিখতে কতদিন লেগেছিল? লেখার পর কি এডিট করেছিলেন, নাকি একটানা লেখা? বইটি প্রকাশের পর কেমন সাড়া পেয়েছিলেন? আপনাকে কি পাঠক ঔপন্যাসিক হিসেবে গ্রহণ করেছিল? নাকি তেমন কোনো সাড়া মেলেনি?

তসলিমা নাসরিন
আমি যখন কলাম বা উপন্যাসগুলো লিখেছি , তখন আমি হাসপাতালের ব্যস্ত ডাক্তার, আমার দিন-রাত ডিউটি। কোনও সময় নেই লেখার পেছনে ব্যয় করার। ১৯৯০ সালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে আমার পোস্টিং হয়েছিল। কিন্তু ওই ডিপার্টমেন্টে কাজ নেই বলে আমি গাইনি বিভাগে শুধু কাজ করার জন্য ঢুকি। তখন ডাক্তারিটাই আমার কাজ, লেখা আমার শখ। লেখার পেছনে সময় একেবারেই দিইনি। রোগির চাপ কম থাকলে ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে দ্রুত কলাম লেখা শেষ করেছি । একসময় লেখার চাপ এমন বাড়ে যে গাইনি বিভাগ থেকে অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগে চলে যাই। মিটফোর্ড থেকেও ঢাকা মেডিক্যালে বদলি হই। মনে আছে ‘লজ্জা’ বইটি আমি ঢাকা মেডিক্যালের অপারেশান থিয়েটারে বসে লিখেছি, রোগিকে অজ্ঞান করা আর জ্ঞান ফেরানোর ফাঁকে ফাঁকে। না, আমার লেখার কারণে কোনও রোগির কোনও ক্ষতি হয়নি। লেখক হিসেবে যেমনই হই, ডাক্তার হিসেবে ভালই ছিলাম।

স্বকৃত নোমান
রোগি দেখার ফাঁকে ফাঁকে কিংবা অপারেশন থিয়েটারে বসে আপনি লিখেছেন—এটা বিস্ময়কর। পৃথিবীর অনেক বড় লেখক নির্জনতা ছাড়া লিখতে পারতেন না, এখনো অনেকে পারেন না। অর্থাৎ তার মাথায় অন্য কোনো কাজের চাপ নিয়ে লিখতে পারতেন না। আপনি কি এখনও আগের মতোই লিখতে পারেন? অর্থাৎ মাথায় অন্য কাজের চাপ নিয়েও লিখতে পারেন? নাকি এখন আপনার নির্জনতা পছন্দ? নির্জনতায় লিখতে ভালোবাসেন?

তসলিমা নাসরিন
একটা সময় ছিল যখন প্রচণ্ড কোলাহলের মধ্যেও আমি লিখতে পারতাম। বাংলাদেশে থাকাকালীন সরকারি চাকরির ব্যস্ততা ছিল, বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের ভিড় ছিল—তারই ফাঁকে ফাঁকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে বসে বা অপারেশন থিয়েটারে বসে আমি লিখেছি। কিন্তু এখন আমার নির্জনতাই বেশি পছন্দ। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে একা থেকে থেকে এই নিঃসঙ্গতা বা নির্জনতাই এখন আমার অভ্যেস এবং আশ্রয় হয়ে গেছে।

স্বকৃত নোমান
যে বছর অপরপক্ষ প্রকাশিত হয়, ১৯৯২ সালে, একই বছর প্রকাশিত হয়েছিল উপন্যাস ‘শোধ’। কোনটি আগে লিখেছিলেন, ‘অপরপক্ষ’, নাকি ‘শোধ’? এই উপন্যাস পাঠক কীভাবে গ্রহণ করেছিল? পঠিত হয়েছিল, নাকি অপঠিত থেকে গিয়েছিল? অর্থাৎ তেমন বিক্রি হয়নি...

তসলিমা নাসরিন
‘অপরপক্ষ’ আমার প্রথম উপন্যাস। ‘শোধ’ যদি ১৯৯২ সালে বের হয়ে থাকে, তাহলে ‘শোধ’ দ্বিতীয় উপন্যাস । ‘অপরপক্ষে’র মতো ‘শোধ’ও নারীবাদী উপন্যাস। তখন নারীবাদী উপন্যাস বাংলাদেশে কেউ লিখতেন না। লেখকরা মূলত ছিলেন পুরুষ। তাঁদের উপন্যাসে নারীরা ছিল লক্ষ্মী মেয়ে, ভালো ঘরনী, ভালো রাঁধে, স্বামীর কথা শোনে, সন্তান লালন পালন করে। অথবা অবিবাহিত হলে তারা প্রেমিককে নিজের চেয়ে বেশি ভালবাসে, প্রেমের জন্য জীবন বাজি রাখে, এমনকী আত্মহত্যাও করে। আমার উপন্যাসের মেয়েরা অন্যরকম। তাদের জীবনের মূল্য আছে। তারা মস্তিস্কহীন নয়, তারা চিন্তাশীল, তারা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ।

আমার সব বইই জনপ্রিয় ছিল। বইমেলায় বেশ কয়েকটি মুদ্রণের দরকার পড়তো। ২০০৫ সালে ‘শোধ’ বইটি অবলম্বনে কলকাতার আকাশ আট চ্যানেলে এক মাসের সিরিজ নাটক দেখানো হয়েছিল। সে বছর সাহিত্য থেকে যত নাটক হয়েছিল, শোধের টিয়ারপি ছিল সবচেয়ে বেশি। ‘শোধ’ শেষ হওয়ার পর সে কারণে শোধের প্রযোজকরা আমাকে দিয়ে একটি মেগাসিরিয়ালের গল্প লিখিয়েছিলেন। ‘শোধ’ উপন্যাস অবলম্বনে দিল্লির যাপনচিত্র নামের একটি নাট্যগোষ্ঠী সম্প্রতি একটি মঞ্চনাটক করেছে।


স্বকৃত নোমান
’৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তিনটি উপন্যাস : নিমন্ত্রণ, ফেরা, লজ্জা। এ তিনটির মধ্যে ‘লজ্জা’ সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল। কেন এমন আলোড়ন তুলেছিল? ঠিক কী কারণে বলে আপনার মনে হয়? একটু বিস্তারিত যদি বলতেন…

তসলিমা নাসরিন
‘লজ্জা’ নিতান্তই একটি তথ্যভিত্তিক উপন্যাস। খুব অল্পদিনে লিখেছিলাম উপন্যাসটি। হিন্দু মৌলবাদিরা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদিরা নিরীহ হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালায়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে হিন্দু-নির্যাতন শুরু হয়েছিল। আমার উপন্যাসটি বেরিয়েছিল ১৯৯৩ সালে ফেব্রুয়ারির বইমেলায়। সেবার বইমেলায় আমার স্টলে আক্রমন করেছিল উগ্র মুসলিমরা। বাংলা একাডেমি আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে আমকে বইমেলায় নিষিদ্ধ করে। জুলাই মাসে খালেদা জিয়ার সরকার সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে এই অভিযোগ করে ‘লজ্জা’ ব্যান করে। অথচ ‘লজ্জা’ সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে একটি বই। ব্যান করার আসল কারণ হলো, ‘লজ্জা’য় আমি সরকারকে দোষ দিয়েছি, সরকার কেন হিন্দুদের নিরাপত্তা দেয়নি! কেন হিন্দুদের ওপর নির্বিঘ্নে হামলা করতে পারল মৌলবাদিরা! বাংলাদেশের হিন্দুদের দোষ কী ছিল? তারা তো ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙেনি! ব্যানের পর দেশের অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীরা ব্যানের বিরুদ্ধে কলাম লিখেছেন। এই লেখাগুলো নিয়ে ‘লজ্জা এবং অন্যান্য’ নামে পরে অংকুর থেকে একটি বইও বের হয়।

স্বকৃত নোমান
লজ্জাকে আপনি বলছেন তথ্যভিত্তিক উপন্যাস। উপন্যাস কি পাঠককে সরাসরি কোনো তথ্য দেয়? নাকি ঈশারাই বা আভাসই উপন্যাসের কৌশল? আপনি কীভাবে দেখেন?

তসলিমা নাসরিন :
উপন্যাস ইশারায় অনেক কিছু বলতে পারে, আবার সরাসরি রূঢ় সত্যকেও সামনে আনতে পারে। উপন্যাসের কোনো বাঁধাধরা ব্যাকরণ থাকতে হবে—এমন তত্ত্বে আমি বিশ্বাস করি না। 'লজ্জা' যখন লিখেছিলাম, তখন তথ্যের চেয়েও বেশি জরুরি ছিল সেই সময়ের ভয়াবহতাকে মানুষের সামনে আনা। উপন্যাস নানা আঙ্গিকের হতে পারে; মূল বিষয় হলো সেটি পাঠককে ভাবাচ্ছে কি না, তাকে নাড়া দিচ্ছে কি না। সময়ের সাথে সবকিছুর সংজ্ঞা বদলায়, উপন্যাসের তথাকথিত অলিখিত নিয়মগুলোও সময়ের দাবিতে বদলে যেতে বাধ্য। শিল্প যদি জীবনের কথা বলে, তবে জীবন যে ভাষায় কথা বলে, শিল্পকেও সেই ভাষাই রপ্ত করতে হয়।

স্বকৃত নোমান :
তিনটি উপন্যাসের মধ্যে আপনি কোনটি আগে লিখেছিলেন? কোনটা লিখতে কতদিন লেগেছিল? কোনটি আপনার দৃষ্টিতে সেরা সাহিত্যকর্ম?

তসলিমা নাসরিন
আমি সময় দিইনি উপন্যাসগুলোর পেছনে। আসলে কবিতা লিখলে উপন্যাস লেখার ধৈর্য থাকে না। কবিতা আকারে ছোট। একদিনেই লিখে ফেলা যায়। উপন্যাস লিখতে মাসের পর মাস যায়। একেবারেই সহজ কাজ নয়। সত্যি বলতে, উপন্যাস লেখার ধৈর্য আমার নেই। যারা গুছিয়ে ভাল গল্প করতে পারে, তারা হয়তো গুছিয়ে ভাল উপন্যাস লিখতে পারে। আমি উপন্যাস পড়তে পছন্দ করি। কৈশোরে আমি উপন্যাসের পোকা ছিলাম। স্কুল কলেজ কেটেছে শুধু বই পড়েই। পাঠ্য বইয়ের বাইরের বইই বেশি পড়েছি।

তবে আমার উপন্যাসের প্রেক্ষাপট তত বিস্তৃত না হলেও খাঁটি নারীবাদী উপন্যাস সেসব। ‘নিমন্ত্রণ’ একটি সরল সহজ মেয়ের প্রতারিত হওয়ার কাহিনি। এরপর সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটে দেশে। সেই হামলার কাহিনি লিখেছি ‘লজ্জা’য়। অবশ্য তথ্যই বেশি ঢুকিয়েছি। আর শেষে লিখেছি ‘ফেরা’। ‘ফেরা’ও ফরমায়েশি লেখা। কলকাতার একটি শারদীয়াতে ছাপার জন্য একটি উপন্যাস চেয়েছিল অনুরোধ এসেছিল। তখনই ‘ফেরা’ লিখেছি। সেই শারদীয়ায় লেখাটি ছাপা হয়েছিল। আমি অবশ্য ওটিকে বড় গল্প হিসেবে দিয়েছিলাম, কিন্তু ওরা ওটিকে উপন্যাস হিসেবে ছাপিয়েছে। আমার দৃষ্টিতে কোনও উপন্যাসই সেরা নয়। সেরা উপন্যাসটি আজও লিখিনি। হয়তো এ জীবনে সেটি লেখা হবে না। সবাইকে দিয়ে তো সবকিছু হয় না।

স্বকৃত নোমান :
উপন্যাসের বিশ্বব্যাপী যে সংজ্ঞা, আপনি কি মনে করেন সেই অর্থে ‘লজ্জা’ ঠিক উপন্যাস হয়ে উঠেছে? নাকি উপন্যাসের কোনো সংজ্ঞা নেই, যার যা ইচ্ছে সেভাবে উপন্যাস লিখবে? আপনি কি লজ্জা লিখে তৃপ্ত? এত বছর পর এসে কি মনে হয় উপন্যাসটি অন্যভাবেও লেখা যেত?

তসলিমা নাসরিন
আমি কোনও সংজ্ঞা না মেনেই কবিতা গল্প উপন্যাস লিখেছি। লজ্জা ২৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ডাচ, সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান, ফিনিশ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ, আইসল্যান্ডিক, আরবি, উর্দু, হিন্দি, গুজরাটি, মালায়ালাম, মারাঠী ইত্যাদি। না, আমি কাউকে বলিনি ‘লজ্জা’ ছাপাতে। আমার কোনও লিটারেরি এজেন্টও কোনওদিন ছিল না। আমিই চাইনি থাকুক। ইউরোপে ‘লজ্জা’ ছাপানোর জন্য প্রকাশকেরা উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। আমি চেয়েছিলাম অন্য বই ছাপুক ওরা। ‘লজ্জা’ হয়তো বিদেশিদের ভাল লাগবে না। কিন্তু ওরা শোনেনি আমার পরামর্শ। আসলে আমার ওপর ফতোয়া জারি হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী খুব লেখালেখি হয়েছিল। সাংবাদিকরা খবর পেয়েছে আমার একটি বই নিষিদ্ধ করেছে আমার দেশের সরকার। তারা ভেবে নিয়েছিল, ফতোয়া ওই নিষিদ্ধ বইটির জন্য জারি হয়েছিল। সেজন্য বিদেশে ‘লজ্জা’ ছাপানোর জন্য হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছিল। ওরা ভেবেছিল ‘লজ্জা’য় বোধহয় ইসলামের বিরুদ্ধে লেখা আছে। লজ্জা বোধহয় বাংলার ‘স্যাটানিক ভার্সেস’। পরে লজ্জা পড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে কোনও বাক্য পায়নি কেউ। মানুষ বুঝে পায়নি তাহলে ফতোয়া কেন জারি হয়েছিল। মৌলবাদিরা আমার মুণ্ডু চেয়ে মিছিল করেছে, আমার মাথার মূল্য ধার্য করেছে, সে তো ‘লজ্জা’র জন্য নয়, সে তো বিভিন্ন কলামে ইসলামের নারীবিরোধিতার বিরুদ্ধে আমার সমালোচনার কারণে, সে তো বিভিন্ন কলামে ধর্মীয় আইনের বদলে সমানাধিকারের ভিত্তিতে পারিবারিক আইন দাবি করার কারণে। তা আর কজনকে বলে বোঝাতে পেরেছি!

হ্যাঁ উপন্যাসটি অন্যভাবে লেখা যেত, এ কথা আগেও আমার মনে হয়েছে, এখনও মনে হয়। আমি আজ লিখলে পাতার পর পাতা তথ্য ঢোকাতাম না। বরং পরিবারের গল্পটাকেই বড় করতাম। টানাপোড়েন বাড়াতাম। সমাজের চেহারাটা আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরতাম। ‘লজ্জা’ সম্পূর্ণ একটি মনস্তাত্বিক উপন্যাস হতে পারতো। অথবা চমৎকার একটি রাজনৈতিক উপন্যাস হতে পারতো। উপন্যাস হিসেবে ‘লজ্জা’ হয়তো ব্যর্থ। কিন্তু কন্টেন্টের কারণে এটি সফল। সাদামাটা ভাষায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তার ওপর সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদ এসেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একজনের কাছ থেকে। এর গুরুত্বও কম নয়। আগে প্রতিবাদ যেটুকু হতো, মূলত হিন্দুরাই করতো। হিন্দু না হয়ে এতকাল ধরে হওয়া হিন্দুদের ওপর নির্যাতনকে নিয়ে গোটা একটা বই লেখা! অন্য কেউ তখন করেনি।

স্বকৃত নোমান
‘ভ্রমর কইও গিয়া’ উপন্যাসটির নাম দেখেই বোঝা যায় এটি একটি প্রেমের উপন্যাস। বিখ্যাত লোকশিল্পী রাধারমণ দত্তের সেই বিখ্যাত গান থেকে আপনি নামটি নিয়েছেন। তার মানে এই নাম আপনার সৃষ্ট নয়, মৌলিক নয়। উপন্যাসের নাম তো মৌলিক হওয়া চাই। দুর্বল লেখকরাই অন্যের কাছ থেকে উপন্যাসের নাম ধার করে থাকে। আপনি কেন করলেন? এখন কি মনে হয় অন্য কোনো নাম দিলে ভালো হতো?

তসলিমা নাসরিন
আমি মনে করি না দুর্বল লেখকরা নাম ধার নেন। আমার কবিতার বই ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’রবীন্দ্রনাথের গান থেকে নেওয়া। আরও একটি বইয়ের নাম ‘উতল হাওয়া’, আরেকটির নাম ‘দুঃখরাতের গান’। এ দুটোও নামও নিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান থেকে। আমার কখনও মনে হয়নি, এখনও মনে হয় না যে, বইগুলোর নাম অন্য কিছু দিলে ভাল হতো।

স্বকৃত নোমান
‘ফরাসি প্রেমিক’ কি আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা? অভিজ্ঞতা থেকে উপন্যাস লেখা হয়, নাকি অভিজ্ঞান থেকে?

তসলিমা নাসরিন
‘ফরাসি প্রেমিক’ সম্পূর্ণই একটি উপন্যাস। এটি আমার নিজের জীবনের কাহিনি নয়। আমার জীবন নিয়ে আমি সাত খণ্ডে আত্মজীবনী লিখেছি। উপন্যাসের আড়ালে নিজের জীবনের কাহিনি বলার প্রয়োজন আমার কখনও হয়নি। উপন্যাস বা যেকোনো সৃজনশীল সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞান—দুটোরই প্রয়োজন হয়।

স্বকৃত নোমান
গল্প-উপন্যাস রচনায় স্মৃতি কতটা ভূমিকা রাখে? স্মৃতিই কি লেখকের লেখালেখির মূল সম্পদ? আপনার কী মনে হয়?

তসলিমা নাসরিন :
স্মৃতির ভূমিকা খুব বড়, বিশেষ করে আত্মজীবনী লিখতে গেলে। আমি তো আবার ডায়রি লিখি না। যখন আত্মজীবনীর সাতটি গ্রন্থ লিখেছি, তখন কিন্তু আমার বয়স এখনকার চেয়ে অনেক কম । ৩৫ বছর বয়সে আত্মজীবনী লিখতে শুরু করি, শেষ খণ্ডটি লিখি ৪৮ বছর বয়সে। রবীন্দ্রনাথের মতো শেষ বয়সে লিখতে বসলে তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’র মতো পাতলা একটি বই লিখতে হতো । ডিটেইলে সব লেখা সম্ভব হতো না। বেশি বয়সে বেশির ভাগ মানুষের স্মৃতি ভাল কাজ করে না। আমি ঠিক সময়ে আত্মজীবনী লিখেছি, আমার জীবনে কম উথাল-পাথাল ঘটনা তো ঘটেনি! শুধু নিজের জীবনের কথাই নয়, আত্মজীবনীতে সমাজের কথাও বেশ এসেছে।

গল্প উপন্যাস লেখার সময় স্মৃতি কিছুটা তো ভূমিকা রাখেই। কিছু উপন্যাস পড়েছি, পাতায় পাতায় চরিত্রদের নাম বদলে যাচ্ছে, কাজ বদলে যাচ্ছে। লেখক হয়তো মনে রাখতে পারেননি কার কী নাম, কে কোন কাজ করে। স্মৃতির দরকার পড়ে অবশ্যই, তবে আত্মজীবনীতে যতটা দরকার পড়ে, গল্প উপন্যাসে ততটা পড়ে না।

স্বকৃত নোমান 
’৯৪ সালে প্রকাশিত হলো আপনার ছোটগল্পের বই ‘দুঃখবতী মেয়ে’। সাহিত্যের এই শাখাটিকেও আপনি স্পর্শ করলেন। বইটির গল্পগুলো কি পূর্বপ্রকাশিত ছিল? মানে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল? বইটি প্রকাশের পর কেমন ছিল অভিজ্ঞতা? পাঠক এই বই কীভাবে গ্রহণ করেছিল?

তসলিমা নাসরিন
খুব ভালভাবেই গ্রহণ করেছিল পাঠক। এখন না হয় ব্রাত্য করা হয়েছে আমাকে। আমার কোনও লেখা বাংলাদেশের কোথাও প্রকাশ করা যায় না, কোনও প্রকাশক আমার বই ছাপায় না, ছাপাতে ভয় পায়। কিন্তু তখন তো বেস্ট সেলার লিস্টে ছিল আমার বই।

স্বকৃত নোমান
আপনি কি সেই সময় ছোটগল্প পড়তেন? কাদের গল্প পড়তেন? কার গল্পটি আপনাকে গল্প লেখার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছিল? নাকি কোনো গল্প নয়, কোনো ঘটনা বা কোনো ব্যক্তি আপনাকে গল্প লেখায় অনুপ্রাণিত করেছিল?

তসলিমা নাসরিন
আমি কৈশোরে বইপোকা ছিলাম। প্রচুর গল্প উপন্যাস পড়েছি। তবে গল্প লেখার ক্ষেত্রে কারও লেখা আমাকে প্রেরণা দেয়নি। সমাজের সাধারণ মানুষই ছিল আমার প্রেরণা। তাদের সাধারণ গল্পই আমি করেছি।

স্বকৃত নোমান
৩৭ বছর বয়সে আত্মজীবনী লিখে ফেললেন, ‘আমার মেয়ে বেলা’ নামে প্রকাশিত হলো। লেখকরা সাধারণ আত্মজীবনী লেখেন শেষ বয়সে। আপনি এত কম বয়সে লিখে ফেললেন। কেন মনে হলো তখন আত্মজীবনী লেখা দরকার?

তসলিমা নাসরিন
আসলে ৩৫ বছর বয়সে শুরু করেছিলাম আত্মজীবনী লেখা। ‘আমার মেয়েবেলা’ বইটি প্রথম ফরাসি ভাষায় বেরিয়েছে, তারপর দুতিন বছর পর বেরিয়েছে বাংলায়। আমার মেয়েবেলা লেখা শুরু করেছিলাম সুইডেনে। মা আমাকে দেখতে গেছেন। আমরা বসে ছোটবেলার গল্প করেছি প্রচুর। ওই গল্প করতে করতেই মনে হয়েছে আমি তো এসব লিখে রাখতে পারি। ভেবেছিলাম একটা বইই হবে আমার আত্মজীবনীর। কিন্তু ছোটবেলার কাহিনি লিখতে গিয়েই দেখি ২০০ পৃষ্ঠা হয়ে গেছে। ‘আমার মেয়েবেলা’ আমার শৈশব-কৈশোরের কাহিনি। বইটি ভয়াবহ রকম জনপ্রিয় হয়েছিল। পরে তো আনন্দ পুরস্কারও পেলো। এরপর পাঠকের আবদারে লিখতে শুরু করেছি আত্মজীবনীর আরও খণ্ড। যৌবনের গল্প নিয়ে লিখেছি ‘উতল হাওয়া’, তৃতীয় খণ্ড ‘দ্বিখণ্ডি’তে বর্ণনা করেছি মৌলবাদিদের উত্থান, এবং আমাদের প্রতিবাদের কাহিনি। চতুর্থ খণ্ড ‘সেইসব অন্ধকারে’ আছে আমার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর আমি যে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেটির গল্প । পঞ্চম খণ্ড ‘আমি ভাল নেই, তুমি ভাল থেক প্রিয় দেশ’। এটি নির্বাসন দণ্ড পাওয়ার পর ইউরোপের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা। ষষ্ঠ খণ্ডটি ‘নেই কিছু নেই’। এটি আমার মায়ের মৃত্যুর পর মাকে লেখা একখানা দীর্ঘ চিঠি। সপ্তম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাকে যে বিতাড়িত করা হয়েছে সেই গল্প।

স্বকৃত নোমান
মেয়েবেলার সব কথা কি আপনি বইটিতে লিখতে পেরেছেন, নাকি অনেক কিছু এড়িয়ে গেছেন? পরিবার, সমাজ, প্রিয়জন...এসব কিছুর কথা ভেবে তো সব কথা লেখা যায় না আসলে। নাকি আপনি এসব কিছুর পরোয়া না করে অকপটে সব লিখেছেন?

তসলিমা নাসরিন
না, কিছুই এড়িয়ে যাইনি। আমি সব লিখেছি। এতে আমারে বাবা মা খুব কষ্ট পেয়েছেন । কিন্তু আমার করার কিছু ছিল না। আমি ভেবেই নিয়েছলাম, আত্মজীবনী লিখছি, কিছুই লুকোবো না। অন্য লেখকদের মতো হবো না, যারা পুরো জীবন নয়, অর্ধেক জীবন লেখে। অথবা যা কিছু ভালো, সেটিই বের করে দেখায়, আর মন্দগুলো কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখে।

স্বকৃত নোমান
আপনি ব্রহ্মপুত্রের মানুষ। আপনার শহর ময়মনসিংহ একটি ব্যতিক্রমধর্মী পুরনো শহর। এ শহরের অদ্ভুত সুন্দর নামের গলি-- বাত্তির কল, নাটিক ঘর লেন, গাঙিনার পাড়, অথবা শতবর্ষী গাছগুলো, শশী লজ, তাজমহল রেস্তোরা, যতীন সরকার, গোলাম সামদানী কোরায়শী, বীক্ষণ, এসকে হাসপাতাল, ডা: রজব আলী সাহেবের বাড়ি-- এর মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে কীভাবে আবিষ্কার করলেন আপনার ভেতর একজন লেখকের জন্ম হচ্ছে? এগুলো বা এরাই কীভাবে আপনার লেখায় প্রভাব বিস্তার করছে?

তসলিমা নাসরিন
ছোটবেলায় দেখেছি আমার দাদা তার বন্ধুদের সঙ্গে ‘পাতা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতো। দাদাই মূলত ‘পাতা’র সব কাজ করতো। লেখা জোগাড় করা, প্রেসে যাওয়া, প্রেস থেকে ম্যাটার নিয়ে আসা। প্রুফ দেখা। দাদা ছিল ‘পাতা’র যুগ্ম সম্পাদক। পত্রিকাটির বাঁধাই আমাদের টি এন রায় রোডের বাড়ি ‘অবকাশ’এ হতো। দাদা কবিতা লিখতো। দাদার অনুপস্থিতিতে দাদার টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার কবিতার খাতা বের করে কবিতাগুলো পড়ে ফেলা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দপূর্ণ কাজ। এসবের মধ্যে বড় হয়ে নিজেই একসময় কবিতা লিখতে শুরু করি। আমার কবিতাও দাদাদের ‘পাতা’য় ছাপা হতো। এক সময় দাদাদের ‘পাতা’ বন্ধ হয়ে গেল। আমার সেঁজুতি শুরু হলো। দাদা সেঁজুতি ছাপাতে টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করতো। ছোটবেলায় শহর চষে বেড়াতে পারতাম না। বড় হওয়ার পরও মেয়ে বলে পায়ে অদৃশ্য শিকল পরানো হয়েছিল। বুদ্ধি হওয়ার পর সেই শিকল ছিঁড়ে বেরিয়েছি, দেখেছি শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা। নৌকোয় চড়ে ব্রহ্মপুত্র পার হয়েছি। ইচ্ছে ছিল সাঁতরে পার হওয়ার।

স্বকৃত নোমান
এ যাবৎ যত গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন, আপনার কি মনে হয়েছে সেগুলো সত্যিকারের সাহিত্য হয়ে উঠেছে? কখনো কি মনে হয়েছে, নাহ্, আরও ভালো হতে পারত। যা লিখতে চেয়েছেন তা হয়নি। অর্থাৎ বলতে চাইছি এগুলো নিয়ে আপনার কোনো অতৃপ্তি আছে কিনা? নাকি আপনি সম্পূর্ণ তৃপ্ত?

তসলিমা নাসরিন
নিশ্চয়ই মনে হয়েছে । সব বই নিয়েই অতৃপ্তি আছে। সব বইয়ের ব্যাপারে মনে হয়েছে আরও ভাল হতে পারতো। এ কারণে আমি আমার বইয়ের কোনও নতুন মুদ্রণের প্রুফ দেখতে পারি না। প্রায় প্রতিটি বাক্যকেই মনে হয় বাক্যটি অন্যভাবে লিখলে ভালো হতো। মনে হয় নতুন বাক্য জুড়ে দিই, নতুন প্যারাগ্রাফ জুড়ে দিই, নতুন পৃষ্ঠা জুড়ে দিই।

স্বকৃত নোমান
সাহিত্যিক কি আসলে তৃপ্ত হতে পারেন? নাকি যতই ভালো লিখুন না কেন, তার একটা অতৃপ্তি থেকেই যায়? আপনার কী মনে হয়?

তসলিমা নাসরিন
অনেক বড় মাপের লেখকই মনে করেন, তাঁরা যা বলতে চেয়েছিলেন তা বলা সম্ভব হয়নি। এই অতৃপ্তিই তাঁদের বারবার লিখতে বাধ্য করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অজস্র কালজয়ী সৃষ্টির পরও শেষ জীবনে এসে আক্ষেপ করে তাঁর ‘ঐকতান’কবিতায় লিখেছিলেন, "ভরিবে না চিত্ত মোর কৃপন সে মন্থর গমনে।" এই অতৃপ্তিই তাঁকে আমৃত্যু সৃজনশীল রেখেছে। লিও তলস্তয় তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'ওয়ার অ্যান্ড পিস' লেখার সময় অসংখ্যবার খসড়া পরিবর্তন করেছেন। এত বড় মাপের লেখক হওয়া সত্ত্বেও প্রায়ই নিজের লেখা নিয়ে দ্বিধায় ভুগতেন। কিছু লেখক একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা দর্শনের ওপর ভিত্তি করে লেখেন। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলে তাঁরা প্রশান্তি লাভ করেন। দান্তে আলিগিয়েরি তাঁর 'ডিভাইন কমেডি' লেখার পর এক ধরণের শৈল্পিক পূর্ণতা অনুভব করেছিলেন। তাঁর মহাকাব্যে অতৃপ্তির জায়গা খুব কম ছিল। অনেক লেখক একটি নির্দিষ্ট 'মাস্টারপিস' সৃষ্টি করার পর লেখা বন্ধ দেন বা খুব কম লেখেন, কারণ তাঁরা মনে করেন যা বলার ছিল তা তাঁরা বলে ফেলেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা জীবনানন্দ দাশের লেখায় অতৃপ্তি এবং সংশয় বারবার ফিরে এসেছে। জীবনানন্দ তো নিভৃতে লিখে গেছেন, নিজেকে কোনোদিনই পূর্ণ মনে করেননি। যাঁরা কেবল তথ্যের জন্য লেখেন, তাঁরা হয়তো দ্রুত তৃপ্ত হন। কিন্তু যাঁরা সত্য বা সুন্দরের অন্তহীন তল খুঁজতে চান, তাঁদের কাছে কোনো লেখাই চূড়ান্ত মনে হয় না। এই অতৃপ্তিই সাহিত্যকে স্থবির হতে দেয় না।

স্বকৃত নোমান
আপনার কবিতায় কি আপনি রুদ্রের প্রভাব দেখতে পান?

তসলিমা নাসরিন
রুদ্র আমার থেকে পাঁচ/ছয় বছরের বড় হলেও রুদ্র আর আমি দুজনই সত্তর দশকেই কবিতা লিখতে শুরু করি। আমি ১৯৭৮ সাল থেকে কবিতা পত্রিকা ‘সেঁজুতি’ প্রকাশ করি, রুদ্র সেঁজুতির জন্য কবিতা পাঠাতো। সেই প্রথম আমি রুদ্রকে চিনি। তার বানান সংশোধন করে আমি তার কবিতা ছাপাতাম আমার পত্রিকায়। ‘সকাল কবিতা পরিষদ’ নামে আমার একটি বৃন্দ আবৃত্তির দল ছিল। অনেকের কবিতাই আমরা আবৃত্তি করতাম, রুদ্রর কবিতাও। রুদ্র খুব স্লোগানধর্মী রাজনৈতিক কবিতা লিখতো। আমি তখন কিছু রাজনৈতিক কবিতা লিখেছিলাম। আমার প্রথম কবিতার বই ‘শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা’য় সেই কবিতাগুলো আছে। রুদ্রর প্রভাব ওতে ছিল। কিন্তু আমার কবিতা দ্রুত ফিরে যায় নারীবাদে, প্রেমে এবং দংশনে। আমার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’ এবং পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোয় স্লোগানসর্বস্ব রাজনৈতিক কবিতার দেখা পাওয়া যায়না।

এই যে প্রশ্নটি করা হলো আমার কবিতায় রুদ্র’র প্রভাব আছে কি না, সে আমি নারী বলেই। রুদ্র’র কবিতায় কার প্রভাব আছে, তা কি রুদ্রকে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়েছে? রুদ্রর সমসাময়িক পুরুষ কবিবন্ধুদের কাউকে কি জিজ্ঞেস করা হয়েছে ওদের কবিতায় রুদ্রর প্রভাব আছে কি না? আসলে আমাদের নারীবিদ্বেষী সমাজ নারীদের ঠিক সাহিত্যিক বলে ভাবতে চায় না। তারা মনে করতে চায়, কোনও পুরুষ লেখা শিখিয়ে দিয়েছে, তাই নারী লিখতে পেরেছে, পুরুষ কবি-লেখকদের প্রভাব খোঁজার চেষ্টা চলেছে নারীদের লেখায়, প্রভাব না পেলেও ভাবতে তাদের ভাল লাগে যে মেয়েমানুষটা নিশ্চয়ই কোথাও থেকে চুরি ডাকাতি করে বই লিখেছে। মেয়েদের যে অসামান্য প্রতিভা থাকতে পারে, তারা যে অসাধারণ সাহিত্যিক হতে পারে, শিল্পী হতে পারে, তার শত শত প্রমাণ পেয়েও তাদের ক্ষুদ্র মন ক্ষুদ্রই থেকে যায়।

আমার বই লক্ষ কপি বিক্রি হলেও নারীবিদ্বেষীদের, এমনকী ঈর্ষাকাতর পুরুষ-লেখকদের বলতে শুনেছি, ও তো সাহিত্যিক নয়, ওকে তো বিখ্যাত বানিয়েছে মোল্লারা। ফতোয়া জারি না হলে ওকে কেউ চিনতো না। ফতোয়া জারির আগেই যে আমার বইয়ের কয়েকটি মুদ্রণ হতো এক বইমেলায়, তা কিন্তু বলবে না। মোল্লারা আমার ফাঁসি চেয়ে পথে নামার আগে যে আমি আনন্দ পুরস্কার পেয়েছিলাম, তাও বলবে না। আমি আনন্দ পুরস্কার পেলে তখন কিন্তু ইতর লেখকগোষ্ঠী বলেছে হিন্দুত্ববাদিরা পুরস্কার দিয়েছে। সেই একই পুরস্কার যখন পরে কবি শামসুর রাহমান পেয়েছেন, তখন মুখে তারা কুলুপ এঁটেছিল। লেখালেখির শুরুতেই আমি এই বাঙালি হিপোক্রেট পুরুষ-লেখকদের দেখেছি, এদের জন্য করুণাও হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও আমার বই নিষিদ্ধ করা আর আমাকে রাজ্য থেকে চিরজীবনের জন্য বিতাড়িত করার পেছনে ছিল হিপোক্রেট কিছু পুরুষ-লেখক।

স্বকৃত নোমান
কিন্তু স্যাটানিক ভার্সেসও তো ইসলাম বিরোধী বই নয়? সেক্ষেত্রে? আপনাকে কি পশ্চিম মিডিয়া ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে কোন এজেন্ডা হাসিল করতে চেয়েছিল বলে মনে করেন আপনি?

তসলিমা নাসরিন
এই অভিযোগটা জিহাদি জঙ্গিরা করে। পাশ্চাত্যের সম্পর্কে কিছু না জেনেই করে। পশ্চিমা মিডিয়ার কি তৃতীয় বিশ্বের এক বাঙালি লেখককে দরকার ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য? তাদের নিজেদের কি যথেষ্ট রসদ নেই ইসলামের বিপক্ষে দাঁড়াবার? সন্ত্রাসী মুসলমানরাই তো তাদের সেই রসদ যোগান দিচ্ছে। তারা কি সালমান রুশদিকে ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে নিজেদের তথাকথিত ‘’এজেন্ডা’’ হাসিল করতে পেরেছে না কখনও করতে চেয়েছে? তারা লেখকের বাকস্বাধীনতার পক্ষে থেকেছে মাত্র। পাশ্চাত্যের যে লেখক -বুদ্ধিজীবী সমাজে আমার বিচরণ ছিল, তাঁদের দেখেছি কিছুটা বামপন্থী, কিছুটা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, অনেকটাই লিবারেল, অনেকটাই নাস্তিক,পুরোটাই সেক্যুলার, পুরোটাই মানবতাবাদী, মুসলিম অভিবাসীদের অধিকারকে পূর্ণ সমর্থন দেয়, এবং ইসলামের নিন্দে পারতপক্ষে করে না। আমার লেখা কোনও বইয়ের মূল বিষয় ইসলাম নয় বা অন্য কোনও ধর্ম নয়। আমার বইয়ের বিষয় নারীবাদ, মানববাদ, মানবাধিকার, সমতা, সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাকস্বাধীনতা, বিজ্ঞানমনস্কতা। এসবের সঙ্গে ধর্মের সংঘর্ষ অনিবার্য। ইসলামের সমালোচনা যে মুসলিম সমাজকে সভ্য করার জন্য দরকার,তা আমি জোর দিয়েই বলি, ঠিক যেমন তাঁরাও এককালে রাষ্ট্র এবং সমাজকে সভ্য করার জন্য রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করেছিলেন। ইসলামের এখন মধ্যযুগ চলছে, অনেকটা তাঁদের সমাজেও মধ্যযুগে যেমন ইনকুইজিশান ছিল, তেমন। পাশ্চাত্যের লিবারেল গোষ্ঠীর সঙ্গে চলাফেরা করার চেয়ে র‍্যাডিকাল ফেমিনিস্টদের সঙ্গে মিশে, এবং সেক্যুলার হিউম্যানিস্ট বা এথিস্ট সংগঠনে যুক্ত হয়ে আমি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেছি।

স্যাটানিক ভার্সেস অবশ্যই ইসলাম-বিরোধী বই। ইসলাম নিয়ে বিস্তর তামাশা করেছেন রুশদি। তামাশা করার অধিকার নিশ্চয়ই তাঁর আছে। কিন্তু কারও অধিকার নেই তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করার, অথবা তাঁকে ছুরিকাঘাত করার।

স্বকৃত নোমান :
লেখক হিসেবে আপনার প্রস্তুতিকালে, অর্থাৎ কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলোতে আপনি কী ধরনের বই পড়তেন? বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি নিশ্চয়ই বিদেশি সাহিত্যও পড়তেন? কোন বইটি আপনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল?

তসলিমা নাসরিন
প্রচুর বাংলা সাহিত্য পড়েছি। গোগ্রাসে পড়েছি বললে ঠিক বলা হয়। বাবার ভয়ে পাঠ্য বইয়ের আড়ালে গল্প উপন্যাস রেখে পড়েছি। স্কুলের লাইব্রেরির প্রায় সব বইই পড়া হয়ে গিয়েছিল। বিকেলে ছাদে বসে বই পড়তে পড়তে সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেও টের পেতাম না। বিদেশি সাহিত্যের মধ্যে কৈশোরে আমি সবচেয়ে বেশি পড়েছি রাশান সাহিত্য। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘আমার ছেলেবেলা’বইটি আমাকে অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। বড় হয়ে আমি মস্কো গিয়েছিলাম শুধু ম্যাক্সিম গোর্কি, লিও তলস্তয়, আলেক্সান্ডার পুশকিন, বরিস পাস্তেরনাক, ফিওদর দস্তয়েভস্কির বাড়ি বা মিউজিয়াম দেখার জন্য। কোথায় বসে তাঁরা লিখতেন, দেখার জন্য। তাঁদের স্মৃতিগুলো স্পর্শ করার জন্য, হৃদয়ে তাঁদের উপস্থিতি অনুভব করার জন্য।

স্বকৃত নোমান :
একজন লেখকের জন্য পাঠ কতটা জরুরি? পাঠ ছাড়া কি লেখক হওয়া যায় না? লালন সাঁই তো এত বেশি পড়েননি, অথচ কী চমৎকার সব গান লিখেছেন। রাধারমণ বা হাছন রাজাও তো বিশ্বসাহিত্য বা বাংলা সাহিত্য পড়েছেন বলে মনে হয় না। অথচ কী চমৎকার সব গান লিখেছেন তাঁর! এ বিষয়ে যদি বিস্তারিত বলতেন...

তসলিমা নাসরিন
আমরা সাধারণত 'পাঠ' বলতে বই পড়াকে বুঝি। কিন্তু একজন লেখকের জন্য পাঠ কেবল বইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। জগৎ, জীবন এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব পাঠ করাও এক ধরনের গভীর অধ্যয়ন। লালন বা হাছন রাজা প্রচলিত অর্থে 'বিশ্বসাহিত্য' না পড়লেও তারা 'জীবন-সাহিত্য' পড়েছিলেন। লালন শাহ মানুষের দেহ এবং আত্মার যে জটিল রসায়ন বুঝতে পেরেছিলেন, তা কোনো সাধারণ বই পড়ে সম্ভব নয়। তাঁর পাঠ ছিল 'নিজেকে চেনা'। হাছন রাজার পাঠ ছিল তাঁর চারপাশের প্রকৃতি, ঐশ্বর্য আর নশ্বরতা।

সৃজনশীলতা দুইভাবে আসে—একটি হলো নিরন্তর চর্চা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান, অন্যটি হলো সহজাত প্রতিভা বা ইনটুইশন। লোককবিরা মূলত তাঁদের ভেতরের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছেন। তাদের কাছে জগতটাই ছিল একটা খোলা বই। তাঁরা অক্ষরজ্ঞানহীন হলেও তাঁদের সমসাময়িক ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং লোকজ জীবন সম্পর্কে প্রবল 'শ্রুতজ্ঞান' ছিল।

লালন বা হাছন রাজা যখন গান লিখেছেন, তখন তাঁদের লক্ষ্য ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা বা সহজ সরল অনুভূতির প্রকাশ। কিন্তু আজকের আধুনিক সাহিত্যে কেবল 'অনুভূতি' যথেষ্ট নয়। বিশ্বসাহিত্য পাঠ একজন লেখকের চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করে।

পাঠ ছাড়াও লেখক হওয়া যায়, কিন্তু লেখকের সীমাবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাঠ ছাড়া একজন লেখক তাঁর নিজের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার বৃত্তে আটকে থাকতে পারেন। লালন বা হাছন রাজারা 'ব্যতিক্রম'। তাঁরা যা লিখেছেন তা তাঁদের দীর্ঘ সাধনা আর মরমী চেতনার ফসল। তবে একজন আধুনিক লেখকের জন্য পাঠ হলো খাদ্যের মতো। শরীর যেমন খাবার ছাড়া বাঁচে না, লেখকের মনও অন্য লেখকের চিন্তা ও দর্শন ছাড়া পুষ্ট হয় না। সৃজনশীলতা যদি হয় বীজ, তবে পাঠ হলো সেই জল আর সার যা বীজটিকে একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত করে।

স্বকৃত নোমান
বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার সমকালীন লেখকদের লেখাজোখা কি আপনার পড়া হয়? কোথায় ভালো সাহিত্যচর্চা হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন? ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ, নাকি বাংলাদেশে?

তসলিমা নাসরিন :
আজকাল আমি ফিকশানের চেয়ে নন ফিকশান পড়তে পছন্দ করি। তবে বাংলার সব অঞ্চলের মধ্যে আমার কাছে মনে হয় পশ্চিমবঙ্গেই ভালো সাহিত্যচর্চা হচ্ছে। বাংলাদেশের কেউ কেউ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা নিশ্চয়ই করছেন।

স্বকৃত নোমান :
বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী?

তসলিমা নাসরিন
নতুন প্রজন্ম বাংলা শিখতে, বাংলা পড়তে খুব আগ্রহী নয়। বিশেষ করে নাগরিক সভ্যতায় যারা বড় হচ্ছে। সে কারণে আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ খুব অন্ধকার। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইংরেজি ভাষা শেখার, ইংরেজি ভাষায় কথা বলার প্রবণতা দুই বাংলায় বেড়েছে। অন্য ভাষা শেখা, সেই ভাষায় বই পড়া, কথা বলা অন্যায় নয়। তবে নিজের ভাষাকে না ভালবাসলে সেই ভাষা টেকে না। বাঙালিকে আমি নিজের ভাষা নিয়ে, নিজের বাঙালি পরিচয় নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে দেখেছি।

স্বকৃত নোমান :
আপনি সাধারণ কোন সময়টায় লেখেন? একটানা কতক্ষণ লেখেন? এখন কি আর হাতে লেখেন, নাকি কম্পিউটারে?

তসলিমা নাসরিন
আমি যে কোনও সময় লিখে। রাত দুটোর সময় উঠেও লিখি। আবার এমনও হয় মাসের পর মাস চলে যায়, আমি লিখি না। আমি ১৯৯০ সাল থেকে কম্পিউটারে লিখি। ৫০টি বই লিখেছি। প্রথম তিনটি বই ছাড়া সব বইই আমার কম্পোজ করা।

স্বকৃত নোমান
সালমান রুশদির মতো বড় মাপের ঔপন্যাসিক তো আপনিও হতে পারতেন। সেই সম্ভাবনা, লেখার সেই ক্ষমতা এবং সেই পরিচিত আপনার ছিল বা আছে। আপনি কেন উপন্যাসে বা ছোটগল্পে আরও বেশি মনোযোগী হলেন না?

তসলিমা নাসরিন :
ইংরেজি একটি প্রভাবশালী ভাষা। ইংরেজিতে লিখলে লেখা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছোয়। আমার ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করার ক্ষমতা নেই। আমি বাঙালি। বাংলাই আমার ভাষা। অন্য ভাষায় লেখার চেষ্টা করিনি। আসলে শখ করে পদ্য লিখতাম। পরিস্থিতি আমাকে গদ্য লিখিয়েছে। সেই সব গদ্যে আমি সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেছি। নীতি আর আদর্শের কথা বলেছি। সে কারণে আমার লেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক পাঠকই নারীর অধিকারে, মানবাধিকারে, বাক স্বাধীনতায় এবং মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী হয়েছেন, এবং ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, নারীবিদ্বেষীরা আমার চরম শত্রু হয়েছেন।

ইউরোপে যখন আমাকে সেলেব্রিটি হিসেবে ট্রিট করা হতো, তখনই আমি ইউরোপে ছেড়ে কলকাতায় বসবাস করতে এসেছি। বাংলা ভাষার মধ্যে বাস করতে চেয়েছিলাম, যেহেতু বাংলায় লিখি। যেহেতু বাংলাদেশে আমাকে প্রবেশ করতে দেয়নি দেশের কোনও সরকারই, সেহেতু বাস করার জন্য কলকাতাকে বেছে নিয়েছিলাম। সেই কলকাতা থেকেও আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা মানুষের পায়ের তলায় যদি মাটি না থাকে, তার যদি জীবন যাপন করার টাকা কড়ি যথেষ্ট না থাকে, তাকে যদি কেবল তাড়ানোই হয়, ব্যানিং আর সেন্সরশিপের শিকার যদি তাকে সর্বত্র হতেই হয়, তবে সে লিখবে নাকি বেঁচে থাকার সংগ্রাম করবে? আজ ৩১ বছর পার হচ্ছে, এখনও আমি উদবাস্তুর মতো, যাযাবরের মতো বেঁচে আছি। সালমান রুশদি তাঁর দেশ ইংলেন্ডে ছিলেন, সে দেশে তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয়নি, তাঁকে তাঁর লেখার কারণে কোনও দেশ থেকে নির্বাসিত হতে হয়নি, তাঁর পায়ের তলা থেকে কেউ মাটি কেড়ে নেয়নি, তিনি ইংলেণ্ড থেকে আমেরিকায় গিয়ে বাস করছেন, তাঁকে কেউ আমেরিকা থেকে তাড়ায়নি। তিনি নির্বিঘ্নে তাঁর বাড়িতে বসে সাহিত্য রচনা করতে পেরেছেন। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে আমার তো মাথ গোঁজারও ঠাঁই নেই।

উপন্যাস আর ছোটগল্প অনেকেই লেখে। আমি এসব খুব কমই লিখেছি। আসলে বিখ্যাত হওয়ার বাসনায় আমি এ পর্যন্ত কিছুই লিখিনি। যা কিছুই লিখেছি, তা সভ্য রাষ্ট্র এবং সভ্য সমাজ গড়ার জন্য প্রয়োজন ছিল বলে লিখেছি, এবং হৃদয়ে তাড়না অনুভব করেছি বলেই লিখেছি। ইদানীং অবশ্য আমি ছোটগল্প লিখছি। কলকাতার পারুল প্রকাশনী থেকে মুহূর্তকথা সিরিজে ৪০টি গল্প নিয়ে আমার একটি হৃষ্টপুষ্ট গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে।

স্বকৃত নোমান :
আপনি বাংলাদেশে যত বছর ছিলেন তার চেয়ে বেশি সময় নির্বাসনে কাটিয়েছেন। অনেক নির্বাসিত লেখকরা এই অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে বিভিন্ন পথ বেছেছেন—মিলান কুন্ডেরা চেক ভাষার বদলে ফরাসিতে লিখতে শুরু করেন, নিজেকে নতুন করে তৈরি করতে চেয়েছেন। ইসাবেল আয়েন্দে নির্বাসিত আর অভিবাসীর মধ্যে তফাৎ করেছেন—নির্বাসিত মানুষটি তার জীবনের অর্ধেক হারিয়েছে, কিন্তু যে অভিবাসী তার জীবন সামনে পড়ে আছে ভাবে। এত বছর পরে, আপনি কি নিজেকে একজন নির্বাসিত বলেই মনে করছেন। মানে যা হারিয়েছেন তা দিয়েই আপনাকে চেনা হবে, নাকি কোনোভাবে সেই পরিচয় ছাড়িয়ে গেছেন?

তসলিমা নাসরিন :
আর কিছুদিন পর নির্বাসনের সময়ই হবে আমার দেশে যাপন করা সময়ের চেয়ে বেশি। স্বদেশের জীবনের চেয়ে আমার পরবাসের জীবনই দীর্ঘ। আমার জীবন ভয়ংকরভাবেই নির্বসিত জীবন। তাই কোথাও থিতু হয়ে অভিবাসী হওয়ার নিশ্চিন্তিটুকু পাইনি। গত ৩১ বছরে বাস করেছি স্টকহোম, উপ্লাণ্ডস ভিয়েসবি, বার্লিন, ফেল্ডাফিং, প্যারিস, মুলা দন্দ (নরমাণ্ডি), কেমব্রিজ (ম্যাসাচুসেটস), নিউইয়র্ক, কলকাতা, দিল্লি। কোথাও মনে হয়নি আমি এই শহরের বাসিন্দা, বা বাকি জীবন এখানেই কাটাব। কেবলই প্রাণে বেজেছে "হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।" কেবলই দেশে ফিরতে চেয়েছি, কেবলই ঘরে ফিরতে চেয়েছি, কেবলই মনে হয়েছে, আমার শিকড় রয়ে গেছে বাংলার মাটিতে।

বাংলার টানে, প্রাণের টানে একসময় পাকাপাকিভাবে ইউরোপ ছেড়ে কলকাতায় বাস করতে গিয়েছিলাম। যেহেতু বাংলাদেশের কোনও সরকারই আমাকে দেশে প্রবেশ করতে দেয় না, পশ্চিমবঙ্গেকে ভেবেছিলাম দেশ, কিন্তু সেই পশ্চিমবঙ্গও আমাকে তাড়িয়ে দিল। এখন এদেশে ওদেশে যাযাবরের মতো জীবন কাটাই। পায়ের তলায় মাটি নেই। সবখানেই উদবাস্ত, শরণার্থী।

বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় সাহিত্য রচনা করার কথা আমি ভাবতেই পারিনি। মিলান কুন্ডেরা সাহসী কাজটি করেছেন। ভ্লাদিমির নবোকভও করেছেন, লোলিতা উপন্যাসটি তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন। জোসেফ কোনরাড পোলিশ হয়েও ইংরেজিতে লিখেছেন। স্যামুয়েল বেকেট আইরিশ হয়েও ফরাসি ভাষায় লিখেছেন। ওঁরা নমস্য, ওঁরা প্রতিভাবান। ইংরেজিতে ছোটখাটো স্পিচ লিখতে পারি হয়তো, কিন্তু গল্প উপন্যাস বা কবিতা লেখার সাহস কোনওদিনই করিনি। সবার সব ক্ষমতা থাকে না। সবার মস্তিস্কে ভাষা শেখার কোষগুলো খুব শক্তপোক্ত হয় না। বড় হওয়ার পর মাতৃভাষার বাইরে নতুন একটি ভাষা কেউ দ্রুত শিখতে পারে, কারও দীর্ঘদিন লাগে। মাতৃভাষা ছাড়া নতুন কোনও ভাষা আসলে আমি ভালো ভাবে শেখার চেষ্টাও করিনি। নির্বাসিত জীবনে ভাষাটিই যেহেতু আমার দেশ, তাই এই ভাষাটিকে একা রেখে অন্য কোথাও যেতে চাইনি। নির্বাসিত জীবনে মানুষ যখন সব হারায়, তখন তার ভাষাই হয় তার একমাত্র সার্বভৌম ভূমি। সেই ভূমি ছেড়ে যাওয়ার মানে হলো নিজের অস্তিত্বকে চিরতরে বিসর্জন দেওয়া।

স্বকৃত নোমান :
আপনার গল্পটা এখন শুধু আপনার নিজের নয়, এটা একটা প্রতীক হয়ে গেছে। কেউ কেউ আপনাকে দেখেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতীক হিসেবে, আবার অন্যরা হয়তো দেখেন নির্বাসনের বেদনার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু প্রতীক হয়ে যাওয়া মানে হলো আপনার ব্যক্তিগত যন্ত্রণাটা প্রায়ই হারিয়ে যায়। আপনি কি এই প্রতীকী ভূমিকার সাথে শান্তিতে আছেন, নাকি মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ আসল তসলিমা নাসরিনকে দেখতে পাচ্ছে না—শুধু একটা আইকন দেখছে? আর আপনি যদি বেছে নিতে পারতেন, তাহলে কি আপনি প্রতীক হওয়ার বদলে নিজের জীবনটা ফিরে পেতে চাইতেন?

তসলিমা নাসরিন :
যাঁরা আমাকে ‘মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতীক’ বা ‘নির্বাসনের বেদনার প্রতীক প্রতীক’ হিসেবে দেখেন, তাঁরা যে অসম্মান করেন আমাকে, তা আমি মনে করি না। আমি তো জিহাদিদের কাছে ‘ঘৃণার প্রতীক’, নারীর স্বাধীনতা আর অধিকার দাবি করি বলে তাদের চোখে আমি ‘নারীজাতির কলঙ্কের প্রতীক।’ ‘মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতীক’ হওয়া তো অন্তত ঘৃণা আর কলঙ্কের প্রতীক হওয়ার চেয়ে ভাল।

জানি মানুষ যখন কাউকে ‘প্রতীক’ বানিয়ে দেয়, তখন সেই রক্ত-মাংসের মানুষের কষ্টগুলো আর কারো চোখে পড়ে না। তার বিশাল পরিচয়ের আড়ালে যে একাকী মানুষটি প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে, আশ্রয়হীনতার অনিশ্চয়তায় ভুগছে, তাকে দেখার লোক খুব কম। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা আমকে একাই সইতে হয়। শুধু যন্ত্রণা নয়, নির্বাসনে একশো রকম সমস্যা পোহাতে হয় প্রতিদিন। যদি বর্ণনা করি সেইসব সমস্যা, তাহলে কেউই বিশ্বাসই করতে চাইবে না কী ভয়াবহ দুরবস্থার ভেতর বাস করতে হয় আমাকে! যদি বেছে নিতে পারতাম, তবে হয়তো কোনো প্রতীক না হয়ে নিজ দেশে নিজের ঘরে সাধারণ একটা জীবনই ফিরে পেতে চাইতাম।

স্বকৃত নোমান
অতীতে অনেক নির্বাসিত লেখকের সময়ে সামাজিক মাধ্যম ছিল না। তারা চিঠি লিখতেন, বই ছাপাতেন, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠস্বর তাঁদের কাঙ্খিত পাঠকের কাছে পৌঁছতে সময় লাগত। আপনি প্রতিদিন ফেসবুকে লিখছেন এবং তৎক্ষণাৎ বাংলাভাষী লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। এটা কি নির্বাসনের অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে—আপনি শারীরিকভাবে নির্বাসিত কিন্তু ডিজিটালি সংযুক্ত? নাকি সামাজিক মাধ্যম একটা ভ্রম তৈরি করে, মনে হয় আপনি সংযুক্ত আছেন কিন্তু আসলে আরো একা? আর ফেসবুকে যে প্রতিক্রিয়া আপনি পান—ভালোবাসা, ঘৃণা, তর্ক—এটা কি সান্ত্বনা দেয়, নাকি ক্ষত আরো গভীর করে?

তসলিমা নাসরিন :
ফেসবুক তো আলাদা জগত নয়। এই সমাজকেই আমরা দেখতে পাই ফেসবুকে বা অন্য কোনও সামাজিক মাধ্যমে। কট্টরপন্থী উদারপন্থী, নাস্তিক আস্তিক, নারীবাদী নারীবিদ্বেষী, প্রগতিশীল প্রতিক্রিয়াশীল সকলেই উপস্থিত ফেসবুকে। জিহাদিদের রিপোর্টের কারণে ফেসবুক আমার পোস্টের রিচ একেবারে তলানিতে রেখেছে, তারপরও তো কিছু লোক পড়ছে, কিছু লোক তাদের মত জানাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম আমার জন্য খুব জরুরি। কারণ দুই বাংলাতেই আমি ব্যানিং এবং সেন্সরশিপের শিকার। কিছু বই সরকার নিষিদ্ধ করেছে বলে, এবং গোটা আমিটাকেই দুই বাংলা নিষিদ্ধ করেছে বলে অনেক পাঠকই মনে করে আমার বই পড়াই বোধহয় আইনত নিষেধ, এবং প্রকাশকরা ভাবেন আমার বই প্রকাশ করাই হয়তো আইনত নিষেধ, এবং বই বিক্রেতারাও ভাবেন আমার বই বিক্রি করাটাও হয়তো আইনত নিষেধ।

বাঙালি সাহসী, আবার ভীতুও। তারা ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায়। যেহেতু আমার বই বাংলাদেশে প্রকাশ হয় না, তাই আমি ফেসবুকে আমার ভাবনাগুলি লিখে রাখে, বিভিন্ন বিষয়ে মত প্রকাশ করি, সে মত অধিকাংশ মতের চেয়ে ভিন্ন হলেও প্রকাশ করি। ফেসবুক বলেই করতে পারি। কিন্তু ফেসবুকও আজকাল বাকস্বাধীনতাবিরোধী সরকারের মতো, সেন্সর করতে বা ব্যান করতে শিখেছে। তারপরও কিছু তো প্রকাশ করতে পারছি অন্তত। মানুষকে বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ার জন্য প্রেরণা দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য। অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় উৎসাহ দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য। মানুষের নীতিবোধ, বিবেকবোধ এবং মনুষত্ব জাগ্রত করাই আমার উদ্দেশ্য।

স্বকৃত নোমান :
আপনার কবিতায় নির্বাসন এবং প্রেম দুটোই উপস্থিত। আপনার কবিতা যখন আপনার নিজের কণ্ঠে শুনি, তখন সেগুলো আরো শক্তিশালী মনে হয়। আপনার ‘মুক্তি’ কবিতায় লিখছেন–
“যদি ভুলে যাবার হয়, ভুলে যাও।
দূরে বসে বসে মোবাইলে, ইমেইলে হঠাৎ হঠাৎ জ্বালিয়ো না,
দূরে বসে বসে নীরবতার বরফ ছুড়ে ছুড়ে এভাবে বিরক্তও করো না।
ভুলে গেলে এইটুকু অন্তত বুঝবো ভুলে গেছো,
ভুলে গেলে পা কামড়ে রাখা জুতোগুলো খুলে একটু খালি পায়ে হাঁটবো,
ভুলে গেলে অপেক্ষার কাপড়চোপড় খুলে একটু স্নান করবো,
ভুলে গেলে পুরোনো গানগুলো আবার বাজাবো
ভুলে গেলে সবগুলো জানালা খুলে একটু এলোমেলো শোবো।
রোদ বা জোৎস্না এসে শরীরময় লুকোচুরি খেলে খেলুক, আমি না হয় ঘুমোবো...”

এটা একটা ইন্টারেস্টিং ধারণা—মুক্তি আসে বিস্মরণ থেকে, স্মরণ থেকে নয়। এটা কি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে, নাকি এটা আরো বড় কিছু—হয়তো আপনার নির্বাসনও? আপনি কি চান যে বাংলাদেশ আপনাকে ভুলে যাক যাতে আপনি মুক্ত হতে পারেন? নাকি এই ভুলে যাওয়ার জন্য আকুতি একটা অসম্ভব আকাঙ্খা—কারণ ভোলা আর ভুলিয়ে দেওয়া দুটো আলাদা জিনিস? আর আপনি কি এখনও কবিতা লিখছেন?

তসলিমা নাসরিন :
হ্যাঁ এখনও কবিতা লিখছি। ইউটিউবে যখন দেখি দুই বাংলার হাজারো মানুষ আমার কবিতা ভালবেসে আবৃত্তি করে, আমি উৎসাহ পাই আরও কবিতা লেখার। মুক্তি কবিতাটির যে অংশ আপনি উদ্ধৃত করেছেন, সেটি পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী এক পুরুষের নাগপাশ থেকে এক নারীর মুক্তি চাওয়াত্র আর্তি।

বাংলাদেশ আমাকে ভুলে যাক এ আমি নিশ্চয়ই চাই না। বাংলাদেশের অনেক মানুষই আমার বই পড়তে চায়। আমি চাই প্রকাশকরা আমার বই ছাপাক। আমি চাই বাংলাদেশের যে সরকারই নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসুক, বাক স্বাধীনতাকে যেন তারা সম্মান করে, এবং আমাকে আমার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বাধা না দেয়।

সত্যি বলতে, বাংলাদেশ আমাকে আদৌ মনে রাখেনি। আমাকে যতভাবে উপেক্ষা, অবজ্ঞা, নিগ্রহ, নির্যাতন করা যায়, করেছে। নির্বাসিত লেখকেরা সরকার পরিবর্তন হলে স্বদেশে ফিরতে পেরেছেন। সলঝেনিৎসিন নির্বাসন থেকে ফিরে গেছেন রাশিয়ায়, পাবলো নেরুদা ফিরে গেছেন চিলিতে, বার্টল্ট ব্রেশট ফিরে গেছেন জার্মানিতে। যে সরকার আমাকে বিতাড়িত করেছিল, সেই সরকার পরিবর্তনের পরও আমাকে না ফিরতে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে, না পশ্চিমবঙ্গে। শাসকের বদল হলেও আমার দেশের বা পশ্চিমবঙ্গের দরজা আমার জন্য খোলেনি। বিস্মরণ নয়, আমি বরং স্বীকৃতির মাধ্যমে মুক্তি চেয়েছিলাম। কিন্তু দেশ আমাকে যেভাবে উপেক্ষা, অবজ্ঞা, নিগ্রহ ও নির্যাতন করেছে, তাতে মনে হয় আমি যেন জীবন্ত থেকেও এক অদৃশ্য মানুষ। তবুও শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমি ফেরার স্বপ্নটাই দেখে যাবো।

স্বকৃত নোমান
এখন কী লিখছেন? ভবিষ্যতে কী লেখার ইচ্ছে?

তসলিমা নাসরিন
ছোটগল্প লিখবো আরও। কবিতা খুব কম লিখি, অথচ কবিতা দিয়েই সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল আমার। প্রচুর মানুষ আমার কবিতা পছন্দ করে। ইউটিউবে শত শত ছেলে মেয়ে আমার কবিতা পড়ে ভিডিও করেছে। দেখে ইচ্ছে হয় কবিতা লিখতে। কিন্তু কবিতা আসতে হয়। জোর করে আনা যায় না। জোর করে পত্র পত্রিকার জন্য কলাম আনা যায়, কবিতা নয়। জীবনভর তো ফরমায়েশি লেখাই লিখলাম।

স্বকৃত নোমান
সম্প্রতি পড়েছেন, এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে যদি বলতেন। আপনার পাঠঅভিজ্ঞতা শুনে অন্যরাও পড়তে অনুপ্রাণিত হবে।

তসলিমা নাসরিন
হারারির বইগুলো পড়ছি।

স্বকৃত নোমান
হঠাৎ হারারির বই কেন? যদি একটু বলতেন?

তসলিমা নাসরিন
 হারারি কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসকে মাত্র কয়েকশ পৃষ্ঠায় নিয়ে এসেছেন। আগামী দিনের প্রযুক্তি—যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বায়োটেকনোলজি সম্পর্কে আমাদের এখনই সতর্ক করেছেন। অনেক জটিল বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক তথ্যকে তিনি সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী করে লেখেন।

স্বকৃত নোমান :
১৯৬২ সালে আপনার জন্ম। জীবনের স্বর্ণালী অধ্যায়গুলো অতিক্রম করে এখন আরেকটি অধ্যায়ে উপনীত হয়েছেন। এই জীবন আপনার কেমন লাগছে? এখন কি আগের চেয়ে ভালো লিখতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে? সামগ্রিকভাবে আপনি কি জীবন নিয়ে তৃপ্ত, সুখী?

তসলিমা নাসরিন :
তৃপ্ত আর সুখী নই। দেশের জিহাদি উত্থান নিয়ে আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যে দেশে আমি আর ফিরতে পারবো না কোনওদিন, সে দেশ নিয়ে কেন এত ভাবি, এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারি না। হয়তো দেশকে ভালবাসি বলেই চাই দেশের মানুষ ভাল থাকুক। দেশ ভাল থাকুক। আসলে রাজনীতিকরা খুব বদ লোক। তারা ক্ষমতায় বসে একটি সম্ভাবনাময় সেক্যুলার দেশকে মৌলবাদি দেশ বানিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আস্ত একটা জিহাদিস্থান।

স্বকৃত নোমান
এই প্রশ্ন দিয়ে শেষ করতে চাই। আপনার মৃত্যুভাবনা কী? মৃত্যুভয় আপনাকে তাড়িত করে কিনা? আপনি চান কিনা মৃত্যুর পরও আপনার সাহিত্যকর্ম পঠিত হোক কালে কালে? নাকি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সব শেষ হোক, তা চান?

তসলিমা নাসরিন
আমি অমরত্বে বিশ্বাস করি না। মৃত্যুর পর আমার লেখা কেউ পড়লে পড়বে, না পড়লে না পড়বে। এ নিয়ে আমার কোনও আবেগ নেই। আমি বেঁচে থাকা কালীনই দেখে গিয়েছি আমার লেখার সার্থকতা এবং ব্যর্থতা। ডাক্তারি পড়েছি। বাংলা সাহিত্য পড়ে আমি সাহিত্যিক হইনি। শখের সাহিত্য রচনা করে নিজের ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা, সভ্যতা, সততার আদর্শ যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি অনেক মানুষের মধ্যে, সেটাই কি যথেষ্ট নয়? কী করতে পারতাম অথচ করিনি এই ভেবে দুঃখ করার চেয়ে যতটুকুই করেছি যথেষ্ট করেছি বলে আনন্দ করা ভালো। আমি ব্রাত্য, আমি নিষিদ্ধ, এটাও যোগ্যতা বটে।

স্বকৃত নোমান
আপনার প্রতি আমার অতল শ্রদ্ধা। আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তসলিমা নাসরিন
আপনাকেও ধন্যবাদ আমাকে স্মরণ করার জন্য।
··············


সাক্ষাৎকার গ্রহীতার পরিচিতি : স্বকৃত নোমান কথাসাহিত্যিক। ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রকাশিত উপন্যাস : রাজনটী, বেগানা, হীরকডানা, কালকেউটের সুখ, শেষ জাহাজের আদমেরা, মায়ামুকুট, উজানবাঁশি, মহুয়ার ঘ্রাণ, ইহযৌবন, আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি। গল্পগ্রন্থ : নিশিরঙ্গিনী, বালিহাঁসের ডাক, ইবিকাসের বংশধর, বানিয়াশান্তার মেয়ে, কয়েকজন দেহ। দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস সংগ্রহ এবং এক খণ্ডে গল্পসংগ্রহ।বসবাস করছেন ঢাকায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

6 মন্তব্যসমূহ

  1. তসলিমা নাসরিনের জন্য পৃথিবীর তাবত নারীরা যেমন আলোর মুখ দেখেছে!কেমন সমাজ সংস্কার ও হয়েছে !

    উত্তরমুছুন
  2. স্কৃকৃত নোমান কতৃক তসলিমা নাসরিনের সাক্ষাতকারের আদলে তাঁর কথাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করছি।
    লেখাটি আবারো পড়তে হবে। কারণ, বয়োজ্যেষ্ঠতার কারণে আমার উপলব্ধির নার্ভগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। তবে হালকাভাবে যে টুকুন বোঝেছি তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। আমার বিশ্বাস তসলিমা নাসরিন অচিরেই সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত হবেন।

    উত্তরমুছুন
  3. একটা সময় আর সমাজ বদলে দেয়া মানুষ, আমাদের তসলিমা নাসরিন ।

    উত্তরমুছুন
  4. তাসলিমা নাসরিনের লেখা আমার পছন্দ। তাঁর নির্বাসিত জীবনের সংগ্রামের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। সংহতিও আছে।
    তবে তসলিমা নাসরিন বলেছেন যে অনেকে বলে তার নারীবাদী লেখা পড়ে এদেশে নারীরা সচেতন হয়েছে। ঘর থেকে বের হয়েছে। বিষয়টি এত সহজ সহজ নয়। তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়ে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এগোয়নি। তাঁর লেখা পড়ে নারীরা ঘর থেকে বের হয়নি। নারীর ঘর থেকে বের হওয়ার ইতিহাসে তসলিমা নাসরিনের লেখার সংশ্লিষ্টতা নেই। যেমন : পোশাক শিল্পে কাজ করা মেয়েটি তসলিমার লেখা পড়ে গ্রাম থেকে শহরে আসেনি।

    উত্তরমুছুন
  5. বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছে আছে নাকি?

    উত্তরমুছুন
  6. নামহীন কেন?? নামে মন্তব্য লিখা যায় না কেন??

    উত্তরমুছুন