অনুবাদ : তানভীর আহমেদ সিডনী
বাগদাদের লোকগল্প
জাদুর সারস
এককালে বাগদাদের সকলের কাছে জনপ্রিয় একজন খলিফা ছিলেন। যদিও একটি বিষয়ে সংশয় ছিল তাদের আর তা হলো তাঁর অস্বাভাবিক ক্ষমতা। যারা তাঁর কাছে আসতেন তাদের ব্যক্তিগত গোপন জীবনের সবকিছুই খলিফা বলে দিতে পারতেন। যেন সবই তার নখদর্পণে। কেউ কেউ বলতেন, “খলিফার হাজার চোখ আছে”। বলেই পেছনে তাকিয়ে গুপ্তচরের সন্ধান করতেন, তার কথা আবার কেউ শুনে নিচ্ছে না তো। খলিফার আসল গোপনীয়তা হলো: প্রত্যেক বিকেলে তিনি এবং তাঁর বিশ্বস্ত উজির আলি বিন মানজার বণিকের ছদ্মবেশে প্রাসাদের গোপন দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতেন। তারা শহরের বাজারে ঘুরে ঘুরে লোকজনের গল্প গুজব শুনতেন।
এক বিকেলে খলিফা আর তাঁর উজির বাজারের ধারে হাঁটছিলেন। এক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা একটি রূপার নির্মিত কারুকার্যময় বাক্স খলিফার সামনে ধরেন।
খলিফা এর কারুকার্য দেখে বলেন, “কি চমৎকার নস্যির বাক্স! এর জন্য তোমাকে কি দিতে হবে?”
“একটি স্বর্ণমুদ্রা দিলেই হবে।”
খলিফা তাকে দুটি স্বর্নমুদ্রা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনে চলে আসেন।
নগরের প্রান্তে এক উদ্যানের ভেতর প্রবেশ করে সেখানে তারা দুজন বিশ্রাম নেন।
খলিফা বলে, “এখানে নস্যি পেলে আমি খুবই খুশি হবো।”
খলিফা বাক্স খুলতেই তীব্র গন্ধযুক্ত পাউডার পায়। আর সেখানে হাতে লেখা পশুর চামড়া নিয়ে দেখতে দেখতে বলেন, “কিন্তু এটা কী?”
উজির আরও কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “মহামান্য এতে কী লেখা আছে?”
খলিফা পাঠ করতে থাকেন—
নস্যির ঘ্রাণ পাখায় পাখায় ছড়িয়ে যায়
কাসালাভিয়ার হাতে হাতে।
খলিফা বলেন, “কেন আমি এই নস্যিকে জাদু মনে করবো!” আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমি আকাশ থেকে আমার নগরকে সব সময় দেখতে চাই।”
উজির বলেন, “আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। যদি এটা আমাদের জন্য কোনো বিপদ নিয়ে আসে।”
খলিফা বলেন, “মনে হয় এখানে লেখা জাদুর শব্দগুলি কাজ করবে। এসো আমাদের ভাগ্য পরীক্ষা করি।”
তারা দুজনে বাক্স থেকে একটু একটু করে নস্যি নিয়ে মন্ত্র পাঠ করতে থাকেন।
তাদের শরীরে পালকের পাখা তৈরি হয়। খলিফা এবং তাঁর উজির সারসের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন।
ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখে খলিফা বলেন, “বিস্ময়কর!”
তিনি সারসের ভাষায় কথা বললেও তার উজির আলী বিন মানজার সারস পাখি হওয়ার তার ভাষা বুঝতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের কাছে তা কালাপ! কালাপ! শব্দমাত্র।
উজির জবাবে বলে, কালাপ! কালাপ! [সত্যি বিস্ময়কর!]
খলিফা জবাব দেন কালাপ! কালাপ! [এসো আমাদের উড়ার ক্ষমতা পরীক্ষা করি!]
দুটো সারস আকাশে উড়তে থাকে, চক্রাকারে আরো উপরে যায়। সেখান থেকে দেখতে পায় কারুকার্যময় বাগান, ফলের বাগান, ফসলের খেত। টাইগ্রিস নদী বয়ে চলেছে, তার জলে খাল ভরে উঠেছে। আর নদীর তীরে ইসলামের রাজধানী, শান্তির শহর বাগদাদ।
খলিফা বলেন, “থামবে না নিশ্চয়ই? চলো নগরের উপর উড়ে বেড়াই।”
তারা রাস্তা, খাল, সেতু, মাটির ইটে তৈরি ভবনের উপর উড়ে যায়। উঠোন এবং বাজারে লোকেরা কেনা-বেচা, কাজকর্ম--বিশ্রাম, মারামারি কিংবা প্রার্থনা, আবার চুরি করে কেউ ধরা পরে, আদর-সোহাগ, লড়াই এবং হাসি-কান্নায় ভরে তোলে চারদিক।
এসব দেখে খলিফা বলেন, “সত্যি খলিফার চেয়ে এই শহর বিষয়ে একটি সারস বেশি জানে।”
সন্ধ্যে নামতেই উজির বলে, “মহামান্য প্রভু আমাদের প্রাসাদে ফেরার সময় হয়েছে।”
তারা হৃদের ধারে উড়ে এসে জাদুর বাক্সের সামনে নামে। খলিফা চামড়ায় লেখা পাঠ করতে থাকে। চিৎকার করে বলে “কাসালাভিয়ার!”
তখনও সেখানে সারস দুটি দাঁড়িয়ে।
খলিফা আবার বলেন, “কাসালাভিয়ার!” এরপর বলেন, “কাসালাভিয়ার! কাসালাভিয়ার!”
তখনও সারস বদলে যায় না।
ভীত খলিফা উজিরকে বলেন, “আলী বিন মানজার, তুমি চেষ্টা করে দেখ।”
মুহূর্তমাত্র দেরি না করে উজির চিৎকার করে, “কাসালাভিয়ার! কাসালাভিয়ার!”
তাঁরা যেভাবেই বলে না কেন কিংবা চেষ্টা করে, কোনো কিছুই বদলে যায় না।
ক্লান্ত হয়ে তাঁরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। উজির বলে, “বোধহয় কোনো শত্রু প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের এই মায়ায় নিয়ে এসেছে।”
খলিফা জানতে চায়, “এবার আমরা কি করতে পারি?”
উজির জবাব দেয়, “আমি কিছুই জানি না। এই ধাধা ভাঙার ঠিক শব্দ জানতে না পারলে আমরা আগের রূপে যেতে পারবো না।”
হৃদের জলে ডুবে যায় সূর্য আর দুই সারস নিজেদের চিন্তায় ডুবে থাকে। শেষ পর্যন্ত কথা বলেন খলিফা, “সারস হই আর যাই হই ক্ষুধায় আমার পেট চোঁ চোঁ করছে। কী খেতে পারি?”
উজির জবাব দেয়, “মহামান্য প্রভু অন্য সারসেরা যা খায় আমরা তাই খাব। মাছ, ইঁদুর, ব্যাঙ, সাপ, পোকা মাকড় এসব আর কি।”
এরপর সারস দুটো হৃদের ধারে পেট পুরে খেয়ে এক পায়ের উপর দাঁড়িয়ে ঘুমায়।
পরদিন সকালে তারা নস্যির বাক্সটি লুকিয়ে উড়ে যায় প্রাসাদ প্রাঙ্গণে। অনেক উঁচু থেকে তারা প্রাসাদের দেয়াল মুগ্ধ চোখে দেখে। সৈন্য, সভাসদ আর চাকররা তখন খলিফা আর উজিরকে খুঁজছেন-- তারা জানে এই খোঁজাখুঁজিই সার।
তখনই পেছনে একটি সুসজ্জিত বহর আসতে দেখে উজির বলে, “প্রভু দেখুন একটি বহর আসছে!”
বাগদাদের পথে তখন রাজকীয় ঘোড় সাওয়ার, উট সাওয়ার আর চাকরদের পায়ে হাঁটা মিছিল দেখা যায়। আর সবার সামনে একজন ঘোড়সওয়ারীর পরনে রাজকীয় পোশাক।
চিৎকার করে বলে খলিফা, “মহানবীর কসম, এটা আমার ভাই ওমর! আমার সিংহাসনের প্রতি তার অনেক দিনের লোভ।”
বহর এসে থামে প্রাসাদের দরজার সামনে। দলের নেতা চিৎকার করে প্রহরীদের বলে, “আমি ওমর, খলিফার ভাই। আমি অনুচরদের মাধ্যমে খবর পেয়েছি যে খলিফা হারিয়ে গেছেন আর ফিরবেন ন। আমাদের পথ প্রদর্শক মহানবী মোহাম্মদের প্রকৃত অনুসারী হিসেবে আমি ইসলামের শাসক হিসেবে ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে চাই।”
খলিফা তখন বলেন, “দরজা খুলবে না!”
কিন্তু লোকের কাছে তার শব্দ যায় কালাপ! কালাপ! হিসেবে। তারা আকাশের দিকে তাকাতেই দেখে দুটো সারস-- তার একটি পাগলের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে, ডানা ঝাপটাচ্ছে আর ঠোঁট দিয়ে ঠনঠন শব্দ করছে।
ওমর তখন বলে, “তোমরা দেখলে তো, সারসও আমায় স্বাগত জানাচ্ছে, দরজা খুলে দাও!”
দরজা খুলে যায়, সানাই বাজিয়ে স্বাগত জানানো হয় ওমরকে।
রাগে আর শোকে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকে খলিফা।
উজির মৃদুস্বরে বলে, “মহামান্য প্রভু, এখানে থেকে আমরা কিছুই করতে পারবো না। চলুন আমরা শহর থেকে দূরে চলে যাই। আমরা সেখান থেকে ভাগ্য বদলের সুযোগও পেতে পারি।”
তারা দুজনেই শহর ছেড়ে বিশাল পাহাড়ের পাদদেশে এক নির্জন জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে তারা নতুন জীবন শুরু করে। তারা এখানে গুবরে পোকা আর মাছ খায়। বাগদাদ কিংবা রাজ্যশাসন নিয়ে কোনো কথা চলে না তাদের মাঝে।
এক বিকেলে বনের অন্য প্রান্তে গিয়ে তারা বিস্মিত হয়। উজির বলে, “এই দিকটা কেমন নিরব এবং নিস্তব্দ, পাতা ঝরার শব্দও নেই।”
ঠিক তখনই ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ শব্দে তারা চমকে যায়। ঘুরে তাকিয়ে দেখে কাঠঠোকরা গাছের কাণ্ড থেকে পোকা ঠুকরে খাচ্ছে। তারা অবাক হয়ে দেখে যে কাঠঠোকরার চোখে জল।
খলিফা প্রশ্ন করে, “কাঠঠোকরা তুমি কাঁদছ কেন?”
কাঠঠোকরা জবাব দেয়, “কেন কাঁদবো না। তুমি পাখি হিসেবে জন্ম নিয়েছ, তোমার আর কোনো জীবন নেই। কিন্তু আমি রাজকন্যা। দুষ্ট জাদুকর খাদুরকে বিয়ে করতে চাইনি বলে আমাকে মন্ত্র পড়ে এমন করে দিয়েছে। আমাকে পাখি হিসেবে থাকতে হবে যে পর্যন্ত কোনো মানুষ আমাকে বিয়ের প্রস্তাব না দেবে।”
তাঁর কান্নার বেগ আরও বাড়তে থাকে, “ভেবে দেখ একজন মানুষ পাখিকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে! এবার বুঝলে তো কেন আমি কাঁদছি?”
চিন্তিতভাবে খলিফা বলে, “বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এই বনে তুমি কেমন করে এলে? জাদুকর কি এটা জানে?”
পাখি তার ঠোঁট দিয়ে দেখায়, “এখানে কাছেই একটা জায়গা আছে যেখানে জাদুকর তার বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়।”
খলিফা তার উজিরকে বলে, “এসো আলি বেন মানজার। আমাদের ছোট্ট বন্ধুকে সাহায্য করার পথ পেয়ে যাব-- সেই সঙ্গে হয়তো আমাদেরও।”
গহীন বনের ভেতর দিয়ে খলিফা আর তার উজির একটি প্রশস্ত আর পাথুরে জায়গায় চলে আসে যেখানে কোনো গাছ জন্মে নাই। তারা সেখানে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অন্ধকার হবার অপেক্ষায়।
আকাশে চাঁদ উঠতেই বিভিন্ন পথ দিয়ে বৃত্তাকার স্থানে আলখেল্লা পরা লোকেরা আসতে থাকে। তারা মাঝে আগুন জ্বালিয়ে চারধারে পা মুড়িয়ে বসে যায়। আগুনের শিখা উঁচুতে উঠতেই আলখেল্লা জড়ানো একজন তাদের সামনে আসে।
জাদুকরেরা মাথা মাটিতে ঠেকিয়ে চিৎকার করতে থাকে, “মহান জাদুকর খাদুর!”
ঢোক গিলে খলিফা বলে, “মহান নবীর কসম এই সেই বৃদ্ধ যে আমাদের কাছে বাক্স বিক্রি করেছিল।”
তাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই সেখানে ঘোড়ায় চড়ে আসে আসে খলিফার ভাই, বাগদাদের বর্তমান শাসক ওমর।
আগুনের সামনে নিয়ে আসতেই ওমর বলে, “কৃতজ্ঞতা জানাই হে মহান জাদুকর।”
জাদুকর বলে, “স্বাগত হে শাসক, আপনি কেমন করে বাগদাদের লোকদের ভয় দেখাচ্ছেন?”
ওমর বললেন, “দারুণভাবে, জনগণ তাদের পুরনো শাসককে মনে রেখেছে কিন্তু তারা আমাকে ভয় এবং মান্য করতে শিখে গেছে। আর এই নিন আপনার পুরস্কার।” সে খাদুরের দিকে একটি ভরা থলে ছুড়ে দিয়ে বলে, “কিন্তু এখনও বলেননি--কিভাবে আপনি আমার ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলেন।”
খাদুর অট্টহাসি দিয়ে বলে, “কোনো কাজই সহজ নয় হে মহান শাসক। আমি ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে তাদের কাছে যাই। তারপর জাদুর বাক্স তাদের কাছে বিক্রি করি। আপনার ভাই আর তার বোকা উজির সারসে পরিণত হয়ে যায়! আমি শুধু একটি শব্দ বদলে দেই মন্ত্রে তাতেই এসব ঘটে যায়।”
ওমর জিজ্ঞাসা করে, “মানে?”
খাদুর বলে, “আমি দুটো বর্ণ বদলে কালাসাভির-এর বদলে কাসালাভির করেছি।” বলেই হাসতে থাকে খাদুর।
ওমর বলে, “সত্যিকারের দক্ষ লোক। আপনাকে আবার আমার প্রয়োজন হতে পারে।”
ওমর তার ঘোড়া চালিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।
খাদুর তার জাদুকরদের বলে, “এখনই কাজ শুরু করতে হবে! আমরা মন্ত্র পাঠ করবো।”
খলিফা চিৎকার করে বলে, “আজ আর কোনো মন্ত্রপাঠ হবে না।”
সবাই তখন শুনতে পায় কালাপ! কালাপ!-- ঠিক তখনই দুটো সারস তাদের শক্ত পাখা দিয়ে ঝাপটা দেয়, শক্ত চঞ্চু দিয়ে ঠোকরায়।
খাদুর তখন বলে, “এটা খলিফা আর তার উজির!” সে ফাঁকা পথ দিয়ে পালায়, জাদুকররা তার পিছু নেয়।
উজির জিজ্ঞাসা করে, “হে প্রভু ওদের অনুসরণ করবো না?”
খলিফা জবাব দেয়, “না, আলি বিন মানজার। আমাদের মন্ত্রপাঠ করতে হবে আগের রূপে ফিরে আসার প্রয়োজনে।”
তার কথা বলার সময় কাঠঠোকরা কাছে এসে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “এতো কোলাহল কেন?”
খলিফা তখন বলে, “এখনই বুঝতে পারবে প্রিয় রাজকন্যা।” এরপর সে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে, “ কালাসাভির!”
তার পাখা, পালক আর ঠোট খসে যায়-- দুটো সারসের বদলে সেখানে খলিফা আর তার উজির দাঁড়িয়ে থাকে।
বিস্মিত কাঠঠোকরার দিকে ঘুরে খলিফা বলে, “রাজকন্যা, তুমি কি আমার জীবনসঙ্গিনী হবে?”
খলিফা আর তার উজির দেখে একই ভাবে পাখা আর ঠোট সরে গিয়ে এক সুন্দরী আর অসাধারণ চোখের নারী দাঁড়িয়ে আছে।
সে লাজুক মুখে হাত বাড়িয়ে বলে, “এ আমার পরম সৌভাগ্য।”
পরদিন তারা কাছের গ্রাম থেকে ঘোড়া ধার করে বাগদাদের পথে রওনা দেয়। তারা প্রাসাদের কাছাকাছি আসতেই একটি উৎফুল্ল মিছিল তাদের পিছু নেয়।
খলিফা বলে, “দরজা খোল!”
দরজা খুলতেই দেখা যায় ওমর তখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। খলিফাকে দেখে তার মুখের রঙ বদলে যায়।
খলিফা নির্দেশ দেয়, “ওকে বন্দি করো!”
ওমর অনুনয় করে, “ভাই আমার জীবন ভিক্ষা দিন!”
খলিফা বলেন, “তোমার কৃতকর্মের শাস্তি একটাই তা হলো তোমার মস্তকচ্ছেদন। কিন্তু তোমাকে হত্যা করার বদলে পাঠিয়ে দিব পৃথিবীর দূরবর্তী প্রান্তে। আমাদের মহান নবীর দোহাই এই যাবার পথে তোমার একমাত্র খাবার হবে শামুক ও পোকা মাকড়।”
এরপর খলিফা সিংহাসনে বসেন আর তার সঙ্গী হয় এক অসামান্য প্রেমময়ী স্ত্রী। এখন সে বাগদাদের লোকদের সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি জানে। কেন তা কেউ ধারনা করতে পারে না-- যদিও কেউ কেউ বিকাল বেলায় বাগদাদের আকাশে দুটো সারসকে উড়ে যেতে দেখে।
ইয়েমেনের লোকগল্প
নেকড়ে বাঘ ও রাখাল
একসময় ভেড়া চড়ানো এক রাখাল বাস করতো। সে তার বন্ধুদের সাথে মজা করতে চাইলো। তাই সে মাঠে ভেড়া নিয়ে গিয়েই চিৎকার করতে আরম্ভ করলো, “বাঁচাও বাঁচাও বাঁ..চা..ও, নেকড়ে বাঘ এসেছে।”
এটা শুনেই তার বন্ধুরা দ্রুত ছুটে আসে। এসে দেখে রাখাল খিল খিল করে হাসছে।
তখন তারা জিজ্ঞাসা করে, “কী হয়েছে?”
জবাবে রাখাল বলে, ”না আমি মজা করছিলাম।”
এরকম ঘটনা সে আরও দুবার ঘটায়। একদিন সত্যি সত্যি নেকড়ে বাঘ আসে। তার উদ্দেশ্য ভেড়া খাওয়া।
এ সময়ে লোকটি সবাইকে ডাকতে থাকে, “বাঁচাও বাঁচাও দয়া করে কেউ আমাকে আর আমার ভেড়াগুলোকে রক্ষা করো।”
বন্ধুরা ভাবলো সে দুষ্টমি করছে। তাই কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। নেকড়ে বাঘ সবগুলো ভেড়া সাবাড় করে রাখালকে অসহায় অবস্থায় রেখে চলে যায়।
জর্ডানের লোকগল্প
আব্বাস বিন ফারনাস
অনেক বছর আগে আব্বাস নামে এক লোক ছিলেন। আকাশে ওড়ার স্বপ্ন ছিল তার। তিনি ওড়ার পথ খুঁজতেন। তিনি ঠিক করেছিলেন যে উড়বেন। তিনি সময় পেলেই ভাবতেন যে, পাখি এতো দীর্ঘ সময় কেমন করে আকাশে উড়ে বেড়ায়। ভাবতে ভাবতে দেখলেন যে পাখির পাখা আর লেজ তাকে আকাশে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
আব্বাস ঠিক করলেন যে তিনি একটা বিশাল পাখা বানাবেন যেটা তাকে উড়তে সাহায্য করবে। শেষ পর্যন্ত বিশাল আকৃতির পাখির পালক দিয়ে তিনি পাখা বানালেন। তারপর উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে হাতে সে পাখা বাঁধলেন। জোরে শ্বাস টেনে শূন্যে ঝাঁপ দিলেন আব্বাস। তিনি আকাশে উড়তে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পাখা তাকে ভাসিয়ে রাখতে পারে না। তিনি সজোরে মাটিতে পড়লেন। মৃত্যু হলো পাখি হওয়ার স্বপ্ন দেখা একজনের।
আসলে এটা ছিল পৃথিবীর মানুষের প্রথম আকাশে ওড়ার চেষ্টা। এটা সফল হয়নি কারণ তিনি লেজ লাগাতে ভুলে গিয়েছিলেন। এই সাহসী মানুষটিকে জর্ডানের লোক ঠিকই মনে রেখেছে।
লেবাননের লোকগল্প
যুবরাজ এবং রাজকন্যা
অনেক অনেক কাল আগে খুবই সাহসী এবং হৃদয়বান এক যুবরাজ ছিল। সেখানে খুবই সুন্দরী এবং মমতাময়ী এক রাজকন্যা ছিল। তারা রাজপ্রাসাদে সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল। একদিন এক ডাইনি সে প্রাসাদে আসে তারপর তাদের বলে, “আমি তোমাদের ও তোমাদের ভালোবাসাকে ঘৃণা করি, আমি অবশ্যই তোমাদের খুন করবো।”
রাজপুত্র সাহসের সঙ্গে বলে, “আমি তোমাকে এবং তোমার সঙ্গে যে নষ্ট আত্মা আছে তাকে হত্যা করবো।”
এরপর রাজপুত্র ডাইনিকে হত্যা করতে চায়। কিন্তু পারে না, তখন ডাইনি বলে “রাজপুত্র, তুমি শেয়ালে পরিনত হও।” সে তখুনি শেয়ালে পরিণত হয়।
শেয়ালরূপী রাজপুত্রকে সে সময় রাজকন্যা সাহায্য করতে চাইলে ডাইনি তাকে ব্যাঙে রূপান্তরিত করে। তারপর ডাইনি তাদের এক উঁচু টাওয়ারে বন্দি করে রাখে।
কিছুদিন বাদে এক ড্রাগন যায় ডাইনির কাছে। তার উদ্দেশ্য ছিল বন্দিদের সাহায্য করা। ডাইনির কাছে গিয়ে ড্রাগন তার মুখের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে ডাইনিকে। ডাইনি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রাজপুত্র আর রাজকন্যা আগের রূপে ফিরে আসে। এরপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।
সিরিয়ার লোকগল্প
তিনজন সূতাকাটানি
অনেক অনেক কাল আগে তিন গরিব বোন বাস করতো। তাদের বাবা-মা ছোট্ট একটা বাড়ি রেখে মারা যায়। এই ছোট বাড়িতেই তারা বাস করে। টাকা আয়ের জন্যে তারা উলের সুতা কেটে বাজারে বিক্রি করে।
একদিন বড়ো বোন বলে, “ইস! আমি যদি মসলামাখা ভাত আর কাঠবাদামের সঙ্গে ভেড়ার রোস্ট খেতে পারতাম।”
মেজ বোন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আহা! ভেড়ার রোস্টের সঙ্গে সবুজ পেঁয়াজ হলে কত না স্বাদ হতো।”
ছোটো বোন খুব আগ্রহ নিয়ে যোগ করে, “লাল মুলোর সঙ্গে এর স্বাদের তুলনা হয় না।”
তিন বোন হাসতে শুরু করে। তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেয় টাকা জমিয়ে একটা ভেড়া কিনবে। এই ভেড়াকে পোলাও এবং কাঠবাদাম দিয়ে রান্না করবে।
সময় যায় আর তিন বোন কঠোর পরিশ্রম করে সুতা কাটে আর তাদের রোস্ট করা ভেড়ার স্বপ্ন দেখে। সূতা কাটার সময় আনন্দের সঙ্গে গান করে:
আহা কী স্বাদ আর মজা
রোস্ট করা ভেড়া সাথে পোলাও আর কাঠবাদাম!
সবুজ পেঁয়াজ আর মূলা হলে কথাই নাই
ভেড়া পোড়ানো কাঠবাদাম আর পোলাও চাই!
শেষপর্যন্ত তিনবোন অনেক টাকা জমিয়ে নিজেদের স্বপ্ন পুরণ করে। তারা বাজারে গিয়ে ভেড়া কিনে আনে। তারপর পোলাও ও কাঠবাদাম দিয়ে সে ভেড়া রান্না করে। তারা ভেড়ার রোস্ট একটি বড়ো ট্রেতে কাঠবাদাম এবং পেস্তা দিয়ে সাজিয়ে রাখে।
তিন বোন খেতে বসে। হঠাৎ বড়ো বোন বলে, “হায় খোদা, আমরা সবুজ পেঁয়াজ আনতে ভুলে গেছি।”
তখন ছোটো বোন বলে, “আমরা লাল মুলো আনতেও ভুলে গেছি।”
তিনবোন বাড়ি থেকে দৌড়ে কাছের জমিনে আসে। তাড়াহুড়োয় তারা ঘরের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল। তারা দৌড়াতে দৌড়াতে আনন্দের সঙ্গে গান করতে থাকেÑ
আহা কী স্বাদ আর মজা
রোস্ট করা ভেড়া সাথে পোলাও আর কাঠবাদাম!
সবুজ পেয়াজ আর মূলা হলে কথাই নাই
ভেড়া পোড়ানো কাঠবাদাম আর পোলাও চাই!
তারা প্রতিবেশির বাড়ির সামনে দিয়ে জমিনে যাচ্ছিল। তখন মেথর তাদের দেখেছিল। ওদের বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছিল। তারপর বাড়িতে প্রবেশ করে ভেড়ার রোস্টের ট্রে নিয়ে তার গরিব মায়ের কাছে নিয়ে যায়।
তারা দুজনেই অনেক দিন ধরে গোশতের স্বাদ পায় নি, তাই ট্রেতে রাখা সবটুকু খেয়ে ফেলে।
তিনবোন বাড়ি ফিরে তাদের খারাপ ভাগ্যের জন্যে বিস্মিত হয়। তারা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সবুজ পেঁয়াজ আর লাল মুলো একজন আরেকজনের দিকে ছুড়ে দেয়।
রোস্ট করা ভেড়া চুরি হওয়ার কিছুদিন পরে এর দুঃখে তারা তিন বোন মারা যায়।
ব্রুনেইয়ের লোকগল্প
স্বর্ণ পর্বত এবং ক্রন্দনরত চাল
অনেক অনেক বছর আগে বিশাল এক পর্বত ঢাকা ছিল উজ্জ্বল বন আর স্বর্ণ সম্পদ দিয়ে। এই স্বর্ণ পর্বত নিয়ে প্রবীনেরা ফিস ফিস করে বলে যদি এটি সমভূমিতে পরিণত হয় তাহলে তা সম্পদশালী এক সভ্যতার জন্ম দেবে। এর সভ্যতা হবে ক্ষমতাবান, ধনী এবং জ্ঞানবান। তবে এটা তখনই ঘটবে যখন যোগ্যতম ব্যক্তি এই সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। যদি অবস্থা খারাপ হয়ে যায় তবে এটা চলে যাবে। আর কখনই ফিরে আসবে না, পূর্বসুরীদের রাখবে বিপদে। তাই প্রাচীন সাগরে গর্জন ওঠে এ জাতীয় লোকের সন্ধানে।
স্বর্ণ পর্বত সাগরের গহীন চলে সাঁতরে সাঁতরে ব্রুনেইয়ের ছোট্ট গায়ে এসে থামে। এটি দেখতে পায় চলমান জীবনকে, মানুষ তৈরি করছে বাণিজ্যিক বন্দর, মা তার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। সাম্পানে করে বৃদ্ধরা বিক্রি করছে কৃষিজাত পণ্য।
এসব দেখে পর্বত মুগ্ধ হয়। অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করে যে সে তার স্বর্ণ এই সভ্যতাকে দান করবে।
সিদ্ধান্তে আসা মাত্র কাছেই উচ্চকণ্ঠে কান্না শুনতে পায়। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে জলে ডুবন্ত একটি ছোট্ট ধান আকুল হয়ে কাঁদছে।
স্বর্ণ পর্বত জিজ্ঞেস করে, “আমার ছোট্ট বন্ধু কেন তুমি কাঁদছ?”
“আমাকে কেউ ভক্ষণ করেনি। গ্রামবাসী আমাকে ছুড়ে ফেলেছে। হে ক্ষমতাবান পাহাড় এখনও আমাকে খাওয়া সম্ভব!” ধান বলতে থাকে, “হায়, আমায় জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাই কাঁদছি আর অপচয়ের স্বীকার হচ্ছি।”
এটা শুনে স্বর্ন পর্বত বিস্মিত হয়, “কেন, এটা খুবই খারাপ! যে সভ্যতা ছোটো সম্পদকে গ্রহণ করতে পারে না তার ভাগ্যে বড়ো সম্পদ আসবে না।”
তখনই প্রবল বাতাস, মেঘ জমতে থাকে, প্রবল শব্দে বজ্রপাত শুরু হয়। বৃষ্টি নামতেই গ্রামবাসী নিজেদের ঘরে প্রবেশ করে। গ্রামে আরেকটি ঝড়ো দিন আসে।
এরপর স্বর্ণ পর্বত ধানকে আলিঙ্গন করে জলমাখা গ্রাম থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। তার কথা আর কখনও শোনা যায়নি।
ফিলিস্তিনের লোকগল্প
শিকারি
অনেককাল আগে এক দেশে একজন বসবাস করতো যিনি শিকার করতেন, তাকে সবাই শিকারি নামে চিনতো। একদিন সে শিকারে গিয়ে একটি হরিণ পেল। সে হরিণটিকে লক্ষভেদ করতে পারল না। সে চারপাশে তাকিয়ে হরিণকে নতুন এক জায়গায় পেল। সে আবার বন্দুক তাক করতেই হরিণটি মানুষে পরিণত হলো। শিকারি ভয়ে কাঠ হয়ে যায়।
লোকটি শিকারির আরো কাছে এসে বলে, কেন তুমি সব সময় হরিণ আর পাখি শিকার করো? তুমি কি জানো না তাদের মালিক আছে?”
শিকারি জবাব দেয়, “আমার পরিবারের ভরন পোষণ করতে হয়, আর এটাই আমার আয়ের একমাত্র পথ।”
লোকটি জিজ্ঞেস করে, “তোমার পরিবার কতজনের?”
শিকারি বলে, “দুই পুত্র, এক কন্যা, আমার স্ত্রী এবং আমি এই নিয়ে আমার পরিবার।”
“আচ্ছা, যদি আমি তোমাকে টাকা-পয়সা দেই তো তুমি এটা বন্ধ করবে?”
শিকারি তখন বলে, “অবশ্যই, আমার কাছে যতদিন টাকা থাকবে আমি ততদিন কিছুই শিকার করবো না।”
লোকটি তখন তাকে পঞ্চাশ দিনার দেয়। তারপর শিকারিকে জিজ্ঞেস করে, “যাবার আগে অন্তত নিজের নাম বলে যাও।”
শিকারি জবাবে বলে, “আমার নাম শিকারি, আর তুমি?”
লোকটি বলে, “আমাকে আবদেল্লাহ বলতে পার। তোমার মতো আমারও পরিবার আছে।”
শিকারি বাড়ি গিয়ে বন্দুক পরিষ্কার করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে। সে তার স্ত্রীকে বলে যে ঈশ্বরের কৃপায় পথ খুঁজে পেয়েছে আর শিকার করবে না। অল্প কিছুদিনের মাঝেই তার টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেল। তাই আবার বন্দুক নিয়ে শিকারের জন্যে বেরিয়ে পরলো। যখন সে তার আগের শিকারের জায়গায় পৌছালো সেখানে হরিণ দেখতে পেল। সে তার দিকে বন্দুক তাক করতেই হরিণটি আবদেল্লাহ হয়ে গেল।
আবদেল্লাহ জিজ্ঞেস করলো, “আমাদের মাঝে না একটা চুক্তি হয়েছিল?”
শিকারি বলে,“কিন্তু সব টাকা শেষ, আমরা না খেয়ে মরছি।”
আবদেল্লাহ তাকে বলে, “তুমি কি পাহাড় দেখছ? যখনই আমাকে দরকার হবে এখানে এসে বলবে, ও আবদেল্লাহ ভাই, আমি তখুনি চলে আসবো।”
তারপর সে শিকারিকে আরো পঞ্চাশটি দিনার দেয়।
খুশি হয়ে বাড়ি চলে যায় শিকারি। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে টাকা দিতেই সে জানতে চায়, এই টাকা কোথায় পেল। স্ত্রীকে সে বলে যে তার এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বন্ধু তার কাছে প্রতীজ্ঞা করেছে যে যখনই তার অর্থ লাগবে তখনই সে সাহায্য করবে। শিকারিকে শুধু পাহাড়ে গিয়ে তাকে ডাকতে হবে।
শিকারির স্ত্রী তাকে বলে, “তুমি খুবই কৃপণ! তুমি তাকে আমাদের বাড়িতে দাওয়াত দিতে পারতে, আমরা একসঙ্গে খেয়ে আমাদের বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারি।”
তখন শিকারি পাহাড়ে গিয়ে আবদেল্লাহকে ডাকে, সে আসলে তার কাছে ক্ষমা চায় দাওয়াত না করার জন্যে। আবদেল্লাহ অবশ্য শিকারি আর তার পরিবারকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণের জন্যে বলে। তারা রাজি হলে সকালে শিকারি বাড়ি গিয়ে খবরটি স্ত্রীকে জানায়।
শিকারি আর তার স্ত্রী উপহার আর নিজেদের সন্তানদের সহ পাহাড়ে যায়। সেখানে গিয়ে আবদেল্লাহ আর তার পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষমান দেখতে পায়। আবদেল্লাহ পরিবারের প্রত্যেক সদস্য শিকারির পরিবারকে স্বাগত জানায়। তারা পরস্পরের হাত ধরতেই চোখের পলকে শিকারি পরিবারের লোকেরা নিজেদের ভিন্ন জায়গায় পায়। আবদেল্লাহর পরিবার ভোজের আয়োজন করে আর প্রতিবেশিদের আমন্ত্রণ জানায়। তারা শিকারি আর তার পরিবারের জন্যে উপহার আর অর্থ নিয়ে আসে। এখানে কিছু সময় থাকার পর শিকারি আর তার পরিবার উপহার আর অর্থ জড়ো করে বাড়ি নিয়ে যায়। সুন্দর একটি বাড়ি বানানোর মতো টাকা এখন তাদের আছে। কয়েকমাস পরে এক বন্ধের দিনে শিকারি তার বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যায়। আবদেল্লাহর সঙ্গে দেখা হতেই সে শিকারির হাত ধরে এবং চোখের পলকে ভিন্ন জায়গায় চলে যায়। আবদেল্লাহ শিকারিকে এক হাজার দিনার দেয়।
শিকারি টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরে। তার স্ত্রী বলে যে বড়ো ছেলেটিকে বিয়ে করানোর মতো যথেষ্ট টাকা তাদের আছে। তারা এক চমৎকার মেয়েকে পায় ছেলের জন্যে এবং বিয়ের তারিখ ঠিক করে। অবশ্য শিকারি আবদেল্লাহ ও তাঁর পরিবারকে বিয়েতে আমন্ত্রণ জানায়। আবদেল্লাহ শিকারিকে অনুরোধ করে যেন তার এবং আরও কুড়িজন লোকের জন্যে আলাদা ঘর প্রস্তুত করে রাখা হয়, অন্য কেউ যেন সেখানে না আসে। বিয়ের দিন শহরের সব লোককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আবদেল্লাহর অনুরোধে শিকারি এই কাজটি করে। লোকজন দেখেছিল শিকারি ঘরে ভরা থালা নিয়ে প্রবেশ করে আর খালি থালা নিয়ে বের হয়। কিন্তু তারা ঘরের ভেতর কাউকে দেখতে পায় না। সবাই চলে যাবার পর আবদেল্লাহ জিজ্ঞাসা করে শিকারিকে যে তারা বর বধুকে উপহার দিতে পারবে কি না। তারা একজনের পর আরেকজন আসে, বরবধু রকমারি অলংকার পেয়ে মুগ্ধ হয়। যাবার আগে আবদেল্লাহ শিকারিকে বলে যে তারা সবাই তার ওখানে এক সপ্তাহের জন্যে নিমন্ত্রিত।
শহরের একদল চোর জানতো নববধুর অলংকারের কৌটা কোথায় রাখা হয়েছে। তাই শিকারি যখন সপরিবারে আবদেল্লাহর বাড়িতে তখন তারা বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অলংকারের কৌটা চুরি করে। শিকারি বাড়ি ফিরে দেখতে পায় যে সব গহনা চুরি হয়ে গেছে। শিকারি তার বন্ধু আবদেল্লাহর কাছে যায়। বন্ধু তাকে পরামর্শ দেয় চিন্তা করো না। তুমি বাড়ি ফিরে কৌটা খুললেই হবে। শিকারি বাড়িতে এসে কৌটা খুলতেই দ্বিগুণ গহনা পায়। শিকারির কাছে এসে আবদেল্লাহ বলে, “প্রিয় ভাই আমার পরে যখন আমাদের ওখানে বেড়াতে আসবে, আমরাই তোমার বাড়ি রক্ষা করবো।”
ইরানের লোকগল্প
চল্লিশ ভাগ্য
ইস্পাহানের রাজকীয় নগরে আহমেদ নামে এক যুবক বসবাস করতেন। তার স্ত্রীর নাম জামেল। সে কোনো বিশেষ ব্যবসা বা কুটির শিল্প তৈরি করতে জানতো না। তার একটা ছেনি আর কোদাল ছিল। সে মাঝে মাঝে তার স্ত্রীকে বলতো, “তুমি যদি একটা গর্ত করতে পারো, বেঁচে থাকার জন্য তুমি যথেষ্ট টাকা আয় করতে পারবে।” এ থেকে আহমেদের হলেও জামিলের জন্য যথেষ্ট নয়।
একদিন জামেল হাম্মামখানায় স্নান ও অন্য নারীদের সঙ্গে গল্প করতে গেছে।
ঢোকার মুহূর্তে হাম্মামখানার তত্ত্বাবধায়ক নারী তাকে বলে, “তুমি এখন প্রবেশ করতে পারবে না। রাজার গণকের স্ত্রী পুরো জায়গাটি নিজের ব্যবহারের জন্য রেখেছেন।”
জামিল প্রতিবাদ করে বলেন, “সে নিজেকে কি মনে করে? তার স্বামী ভাগ্য গণনা করে বলেই তার এতো দেমাগ!” সে কিছুই করতে পারে না। রাগে গজর গজর করতে করতে বাড়ি ফিরে আসে।
বিকেল বেলা যখন আহমেদ তার সারাদিনের আয় স্ত্রীর হাতে তুলে দিতেই জামেল বলে, “এই কয়েকটা কয়েনে আমার হবে না। আগামীকাল তুমি বাজারে বসবে সেখানে গুটি ফেলে লোকের হাত গণনা করবে।”
আহমেদ বলে, “জামেল তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি হাত গণনার কি জানি?”
জামেল বলে, “তোমাকে কিছুই জানতে হবে না। যখন তোমার কাছে কেউ কিছু জানতে চাইবে তখন তুমি বুদ্ধিমানের মতো একটা উত্তর দিয়ে দিবে। হয় এটা করবে অথবা আমি বাবার বাড়ি চলে যাব।”
পরদিন আহমেদ তার কোদাল আর ছেনি বিক্রি করে গুটি, বোর্ড আর গণকের পোশাক নিয়ে আসে। তারপর সে বাজারে হাম্মামখানার সামনে বসে। তার আয়োজন শেষ হতেই রাজমন্ত্রীর স্ত্রী সেখানে এসে বলে, “গণক, আমাকে সাহায্য করুন। আজ স্নানের সময়ে আমি আমার সবচেয়ে দামি আংটি পরেছিলাম। কিন্তু সেটা হারিয়ে গেছে। দয়া করে বলুন ওটা কোথায়?”
আহমেদ ঢোক গিলে তার গুটি ছুড়ে মারে। আর ভাবতে থাকে বুদ্ধিদীপ্ত একটা কিছু বলার জন্য, এমন সময় নারীর আলখেল্লায় সে একটা ছিদ্র দেখতে পায়। যেখানে তার নগ্ন হাত দেখা যায়। একজন সম্মানীয় নারীর জন্য এটি অসম্মানজনক। তাই সে আরও নিকটে গিয়ে নারীকে বলে, “আমি একটা ছিদ্র দেখতে পাচ্ছি।”
মন্ত্রীর স্ত্রী আরও কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে, “একটি কী?”
“একটি গর্ত! একটি গর্ত!”
নারীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়, “অবশ্যই একটি গর্ত!”
সে স্নানঘরে গিয়ে দেয়ালে গর্ত দেখতে পায় যেখানে সে নিরাপত্তার জন্য আংটিটি রেখেছিল। পরে অবশ্য সে ভুলে গিয়েছিল। এরপর সে আহমেদের কাছে ফিরে আসে।
মন্ত্রীর স্ত্রী বলে, “খোদা তোমার মঙ্গল করুন। তুমিই জানতে যে এটা কোথায় ছিল!” আহমেদকে বিস্মিত করে একটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে চলে যায়।
বিকেল বেলা জামিল স্বর্ণমুদ্রা দেখে এবং গল্পটি শোনে তখন সে বলে,“ দেখলে তো? এর ভেতরে কিছুই নেই!”
আহমেদ বলে, “এদিন খোদা মেহেরবান ছিলেন। তাকে পরীক্ষা করার আর সাহস আমার নেই।”
জামিল বলে, “বোকা, যদি তোমার স্ত্রীকে রাখতে চাও তো আগামীকালই বাজারে গিয়ে বসবে।”
সেদিন রাতেই রাজার খাজাঞ্চিখানা থেকে চুরি হয়। চল্লিশ জোড়া হাত চল্লিশটি সিন্দুক ভর্তি স্বর্ণ এবং অলংকার চুরি করেছে।
পরদিন সকালে রাজার কাছে এ সংবাদ গেলে রাজা নির্দেশ দেন, “রাজকীয় গণক এবং তার সহকারীদের ডেকে পাঠাও।”
কিন্তু গণকেরা তাদের গুটি ফেলে চোর কিংবা মালামালের কোনো খবর দিতে পারে না।
রাজা চিৎকার করে বলেন, “ভন্ড! ওদের জেলে পুরে দাও!”
এবার রাজা সে গণকের কথা জানে সে মন্ত্রীর স্ত্রীর আংটি খুঁজে দিয়েছিল। তাই সে দুজন প্রহরীকে বাজারে পাঠায় আহমেদকে খুঁজে আনার জন্য। যারা তাকে রাজার সামনে নিয়ে আসে। আহমেদ তখন কাঁপছিল।
রাজা বলে, “গণক আমার রাজকোষের চল্লিশটি সিন্দুক চুরি হয়ে গেছে। এই চোরদের বিষয়ে তুমি কী বলতে পারো?”
আহমেদ ভাবে দ্রুত এই চল্লিশ সিন্দুক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই বলে, “মহারাজ, আপনাকে জানাতে চাই যে সেখানে, উম.. চল্লিশজন চোর ছিল।”
“বিস্ময়কর!” বলে উঠলেন রাজা। “আমার নিজের কোনো গণক এতটা জানতো না! তোমাকে অবশ্যই চোর আর সম্পদ উদ্ধার করে দিতে হবে।”
আহমেদের অজ্ঞান হবার দশা। সে বলে, “আমার.. সর্বচ্চো চেষ্টা থাকবে মহারাজ, কিন্তু..কিন্তু এর জন্য কিছু সময় দরকার।
রাজা জানতে চান, “কতটা সময়?”
“আহ..চল্লিশ দিন। প্রতিটি চোরের জন্য একদিন করে প্রয়োজন।” ভেবে নেয় এর চেয়ে বেশি সময় রাজার কাছে পাওয়া যাবে না।
“অনেক সময়! ঠিক আছে তোমাকে মঞ্জুর করা হলো। যদি সফল হও ভাবতেও পারবে না তোমাকে কতটা ধনী করে দেব। আর না পারলে অন্যদের মতো তোমাকেও জেলে পচতে হবে।”
বাড়ি ফিরে জামিলকে বলে আহমেদ, “দেখলে তো কতবড়ো বিপদ ডেকে আনলে? চল্লিশদিন পর রাজা আমাকে বন্দি করবে।”
“মুর্খ, আংটির মতো করেই সিন্দুকগুলি খুঁজে বের করো।”
“তোমাকে সত্যি করে বলছি জামিল, আমি কিছুই পাইনি! সেটা খোদার রহমত ছিল। কিন্তু এখন কোনো আশা নেই।”
আহমেদ চল্লিশটি শুকনো খেজুর নিয়ে একটি বোতলে ভরে রাখে। নিজে নিজে বলে, “প্রতিদিন বিকেলে আমি একটা করে খেজুর খাব-- এমনি করেই বোঝা যাবে আমার চল্লিশ দিন চলে যাওয়া।”
রাজার নিজের চাকরদের মধ্যে একজন চোর ছিল। সে রাজার সঙ্গে আহমেদকে কথা বলতে দেখেছিল। একই দিন বিকেল সে চোরদের সঙ্গে তাদের সর্দারের কাছে যায়। নেতাকে বলে, “একজন গণক বলেছে যে সে মালামাল আর চোরদের চল্লিশ দিনের মধ্যে রাজার সমানে হাজির করবে।”
সর্দার বলে, “সে ধাপ্পা দিচ্ছে, কিন্তু আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। যাও তার বাড়ি গিয়ে খবর নিয়ে আসো।”
তাই চাকর আহমেদের বাড়ির ছাদ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ঠিক তখনই আহমেদ প্রথম খেজুরটি জার থেকে খায় আর জামিলকে বলে, “এই একটা।”
চোরটি এতটা চমকে যায় তার সিড়ি থেকে পড়ার দশা হয়। সে তখুনি সর্দারের কাছে গিয়ে বলে, “গণকের বিস্ময়কর ক্ষমতা। আমাকে না দেখেই বুঝতে পারে যে আমি ছাদে! পষ্ট শুনতে পাই ‘এই একটা’।”
সর্দার বলে, “এটা নিশ্চয়ই তোমার কল্পনা, আগামীকাল রাতে তোমরা দুজন যাবে।”
তাই পরদিন রাতে চাকর আরেকজন চোরকে নিয়ে আহমেদের ছাদে যায়। তারা যখন শুনছিল তখন আহমেদ দ্বিতীয় খেজুর খেয়ে বলে, “এই যে আজ দ্বিতীয়।”
চোরেরা একজন আরেকজনের গায়ে পড়তে নেয়। তারা ছাদ দিয়ে পালিয়ে সর্দারের কাছে যায়। চাকরটি বলে, “সে জানতো আজ আমরা দুজন আছি! আমরা শুনেছি সে বলেছে, ‘এই যে আজ দ্বিতীয়’।”
সর্দার বলে, “হতেই পারে না।”
তাই পরের রাতে সে তিনজন চোরকে পাঠায়, তারপরের রাতে চার, এরপর পাঁচ এবং তারও পর ছয়।
চল্লিশতম রাত পর্যন্ত এটা ঘটতেই থাকে। সে রাতে সর্দার বলে, “আজ রাতে আমি নিজেই যাব।” তাই চল্লিশ চোরের সবাই আহমেদের ছাদে চড়ে শুনতে থাকে।
ভেতরে আহমেদ বোতল থেকে শেষ খেজুরটি বের করে দুঃখিত মনে তুলে নিয়ে খায়। “এই যে চল্লিশ নাম্বার। সব শেষ”
জামিল তার পাশে বসে তার হাত নিজের হাতে নিয়ে বলে, “আহমেদ এই চল্লিশ দিনে আমি ভেবেছি। তোমাকে গণক বানানোর চেষ্টা ভুল ছিল। তুমি যা তাই ঠিক আছে। তোমাকে অন্য কিছু বানাতে চেয়েছিলাম। তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারো?”
“জামিল আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব। কিন্তু একই সঙ্গে আমি দোষী। আমার এই কাজটি করা ঠিক হয়নি। এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখন কেউ আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।”
এমন সময় দরজায় সজোরে করাঘাতের শব্দ শোনা যায়।
আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “রাজার লোকেরা এরই মধ্যে চলে এসেছে!” সে দরজা খুলতে খুলতে বলে, “ঠিক ঠিক আছে, আমি জানি কেন তোমরা এখানে এসেছ।”
সে দরজা খুলে বিস্মিত হয়ে দেখে চল্লিশজন লোক হাটু গেড়ে মাটিতে মাথা বার বার ঠেকাচ্ছে।
সর্দার বলে, “হে মহান গণক! আপনার কাছ থেকে কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখা যায় না। আপনি আমাদের রক্ষা করুন।”
আহমেদ বুঝতে পারে যে এরাই সে চোর। দ্রুত ভেবে নিয়ে বলে, “ঠিক আছে তোমাদের জেলে যেতে হবে না। কিন্তু পুরো সম্পদ রাজকোষে ফেরত দিতে হবে।”
সর্দার জবাব দেয়, “এখুনিই করছি! এখুনি!”
রাত শেষ হবার আগেই চল্লিশ জোড়া হাত চল্লিশটি সিন্দুক ভর্তি স্বর্ণ আর অলংকার রাজকোষে জমা দেয়।
পরদিন সকালে রাজার সামনে হাতজোড় করে আহমেদ বলে, “মহামান্য রাজা আমার যাদুবিদ্যা হয় মালামাল নয় চোরদের খুঁজে পাবে। আপনি কোনটা চান?”
রাজা জবাব দেয়, “আমার মনে হয় সম্পদ। চোরদের না পাওয়া খুবই খারাপ হবে। কেননা তাদের জন্য ফুটন্ত তেল প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। যাই হোক বলো কোথায় রাজসম্পদ, আমার লোকদের এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
আহমেদ বলে, “তার আর দরকার নেই মহারাজ।” হাত আকাশে তুলে মন্ত্র পাঠের ভান করে, “পিস পস উইশ অশ, মিস মস”। তারপর সে বলে, “আমার জাদুর গুণে আপনার সিন্দুক যথাস্থানে চলে এসেছে।”
রাজা তার কথামত খাজাঞ্চিখানায় গিয়ে সম্পদ দেখতে পায়। তারপর ঘোষণা করে, “সত্যি তুমি এ যুগের সেরাদের সেরা গণক। আজ থেকে তুমি রাজকীয় গণক হলে।”
আহমেদ মাথা নত করে, “অনেক ধন্যবাদ মহামান্য রাজা। কিন্তু এটা আর সম্ভব নয়। আপনার সম্পদ খুঁজে পাওয়া ছিল অসম্ভব। আমি আমার পুরো ক্ষমতা ব্যবহার করেছি। আর কখনো আমি গণক হতে পারবো না।”
রাজা চিৎকার করে বলেন, “আহা! কত বড়ো ক্ষতি করে ফেললাম! তাহলে তোমাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিতে হবে। এই নাও দুই সিন্দুক ভর্তি অলংকার আর স্বর্ণমুদ্রা তোমাকে দিলাম।”
তারপর ধনী এবং জ্ঞানী আহমেদ নিরাপদে ফিরে আসে জামিলের কাছে। এরপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস শুরু করে।
সৌদি আরবের লোকগল্প
তিন রাজপুত্র
অনেক অনেক বছর আগে আরব ভূমির বাণিজ্য পথের ধারে বিকশিত হয়েছিল বেশ কয়েকটি নগর। এ বাণিজ্য পথে মসলা, বাদাম এবং খেজুর নিয়ে যেত ব্যবসায়ীরা। এই পথের ধারে নগরের রাজকন্যা বিবাহযোগ্য হয়।
কাছের তিন নগরের যুবরাজগণ তাকে বিয়ে করতে আসে। রাজকন্যা তাদের পছন্দ করেন না। প্রথমজন কর্তৃত্বপরায়ণ, দ্বিতীয়জন অপরিষ্কার আর তৃতীয়জন কোনো কাজেরই না।
রাজকন্যা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “পিতা দয়া করে ওদের সঙ্গে আমার বিয়ে দিও না।”
রাজা তার কন্যাকে খুব ভালোবাসতেন কিন্তু তিনি পার্শ্ববর্তী নগর রাজ্যের শাসকদের খেপিয়ে তুলতে চাইলেন না।
রাজা তিন রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেশ ভালো কথা তোমাদের আজ দেখলাম। কাল সব ঠিক করবো।”
পরদিন তিনি নিজের কন্যা ও রাজপুত্রদের নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন।
তিনি বললেন, “তোমরা প্রত্যেকেই আমার কন্যার জামাই হবার যোগ্য। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তোমাদের প্রত্যেককে আগামী এক বছর একদিনের মধ্যে সারা পৃথিবী ঘুরে অত্যাশ্চর্য কিছু সংগ্রহ করতে হবে। যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস আনতে পারবে তার হাতে আমার মেয়েকে তুলে দিব।”
এক বছর সময় হাতে পেয়ে রাজকন্যা খুশি হলেন। বিষয়টিকে আপাতত থামাতে পেরে রাজাও খুশি হলেন। তিন রাজপুত্র একই সঙ্গে প্রাসাদ থেকে বের হলেন অত্যাশ্চর্যজনক জিনিসের সন্ধানে। তারা পথ চলতে চলতে এক সপ্তাহ পর তিন রাস্তার মোড়ে এক কুয়ার ধারে এলেন।
প্রথম রাজপুত্র বলে, “এখানে থেকেই আমরা ভাগ হয়ে যাব।”
দ্বিতীয়জন তার নোংরা হাত আলখেল্লায় মুছতে মুছতে বলে, “তোমার কি মনে হয় না যে আমরা তা জানি।”
প্রথমজন বলতে থাকে, “আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। প্রাসাদে ফেরার এক সপ্তাহ আগে এই কুয়ার ধারে এসে আমাদের পাওয়া জিনিসগুলোর তুলনা করবো।”
তৃতীয় যুবরাজ নিজের প্রতিজ্ঞায় স্থির থাকার জন্যে বলে, “কোনো অবিবাহিত তরুনীর প্রেম যেন আমার গতিকে কমিয়ে না দেয়। এটাই হবে সবচেয়ে বিরক্তিকর।”
এখান থেকেই তিন রাজপুত্র ভিন্ন পথে রওনা দেয়।
এক বছর পর কুয়ার কাছে আসার সময় হলে তারা তিনজন তিন ভিন্নপথে কুয়ার কাছে চলে আসে।
প্রথম রাজপুত্র দ্বিতীয়জনকে বলে, “তোমার পোশাক কেন নোংরা লাগছে।”
নাক পরিষ্কার করতে করতে দ্বিতীয়জন জবাব দেয়, “আমি ঠিকই আছি তা তুমি কি পেলে?”
প্রথম যুবরাজ কণ্ঠস্বরকে বেশ ভারী করে বলে, “একটি ক্রিস্টাল বল। যা তোমাকে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় ঘটা ঘটনা দেখাবে।”
তার কথায় অন্য দুই যুবরাজ মুগ্ধ হলেও এ বিস্ময়কর জিনিসের কারনে চিন্তিত হয়।
প্রথমজন এবার দ্বিতীয়জনকে বলে, “কি বিস্ময়কর জিনিস তুমি পেলে?”
দ্বিতীয় যুবরাজ তার আলখেল্লার ভেতর থেকে কার্পেট বের করে বলে, “উড়ন্ত কার্পেট! এতে বসে মুহূর্তে যে কেউ পৃথিবীর যে কোনো স্থানে যেতে পারবে।”
অন্য যুবরাজ দ্বিতীয়জনের গায়ের বাজে গন্ধ থেকে রক্ষা পেতে নাক বন্ধ করে বলে, “অবশ্য তোমার বসে যেতে কারও আপত্তি না থাকলে।”
এবার জিনিস দেখানোর জন্য তৃতীয় রাজপুত্রের পালা।
তৃতীয় রাজপুত্র বলে, “এটা একটা শিশি। এতে আছে জাদু-মালিশ। যে কেউ মাখলেই তার শরীর সুস্থ্য হয়ে যাবে। আর যদি কেউ গভীর ভালোবাসায় কোনো বৃদ্ধকে মাখে তাহলে সে যৌবন ফিরে পাবে।
দ্বিতীয় যুবরাজ এবার প্রথম জনকে বলে, “তোমার কাছে যেহেতু ক্রিস্টাল বল আছে, চলো এটাতে করে আমাদের রাজকন্যাকে দেখি সে কেমন আছে।”
প্রথম যুবরাজ ক্রিস্টাল বলের চারপাশে হাত বোলায়; এর গায়ে মেঘাচ্ছন্নতা ছিল, সেটা কেটে যেতে থাকে। রাজকন্যার ছবি ভেসে আসে, সে মৃতের মতো বিছানায় শুয়ে আছে। তার বাবা আর রাজকীয় চিকিৎসক সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজা চিকিৎসককে বলেন, “আপনি কি কিছুই করতে পারবেন না?”
রাজকীয় চিকিৎসক জবাব দেয়, “আমাদের পক্ষে যা করা সম্ভব তার সবটুকই করেছি। আমি দুঃখিত, রাজকন্যা আর বেশিদিন বাঁচবেন না।”
তিন রাজপুত্রই হতাশায় ভেঙে পড়ে।
তৃতীয় রাজপুত্র বলে, “আমার মালিশের তেল রাজকন্যাকে সুস্থ্য করে তুলতো। কিন্তু আমরা প্রাসাদ থেকে বহুদূরে-- সেখানে যথাসময়ে পৌছুতে পারবো না।”
দ্বিতীয় যুবরাজ এবার বলে,“ দ্রুত তোমরা আমার কার্পেটে উঠে বসো। মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে যাব।”
কয়েক মিনিটে তারা রাজকন্যার শোবার ঘরে চলে আসে। সবাই শোকে মূহ্যমান ছিল তাই যুবরাজদের অকস্মাৎ উপস্থিতি টের পায়নি। কোনো কথা না বলে তৃতীয় যুবরাজ মালিশ নিয়ে রাজকন্যার কপালে মেখে দেয়। তার খাটের একপাশে মালিশের শিশি রেখে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরেই চোখ খোলে রাজকন্যা, উঠে বসে বিছানায়। সে বলে, “এখন একটু ভালো লাগছে।”
বাবা বলেন, “এ সত্যিই আজব!” বলেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন।
সে রাতে যুবরাজগণ রাজার সামনে আসে। প্রথম যুবরাজ বলে, “মহামান্য রাজা, আমরা প্রত্যেকই জাদুর সামগ্রী পেয়েছি। সন্দেহ নেই যে আমার ক্রিস্টাল বল এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর। এটা ছাড়া আমরা জানতেই পারতাম না যে রাজকন্যা অসুস্থ। আমি এটাকে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘোষণা দিয়ে রাজকন্যাকে বিয়ে করতে চাই।”
এবার দ্বিতীয় রাজপুত্র সামনে পা ফেলে বলে, “রাজকন্যা অসুস্থ হবার সংবাদ পেয়ে এক সপ্তাহের পথ চোখের পলকে আমরা উড়ন্ত কার্পেটে চলে আসি। অসুস্থতার খবর পাওয়ার পর এটা না থাকলে আমরা কিছুই করতে পারতাম না। তাই আমার কার্পেটকে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘোষণা দিয়ে রাজকন্যাকে প্রার্থনা করছি।”
তৃতীয় যুবরাজ এবার তীক্ষè স্বরে বলে, “ভাল কথা, রাজকন্যার অসুখের খবর এবং দ্রুত এখানে চলে আসায় কোনো উপকারই হতো না যদি আমার মালিশ না থাকতো। সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যেত। তাই এই মালিশকে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘোষণা দিয়ে রাজকন্যার জীবনসঙ্গিনী হতে চাই।”
রাজা ধাধায় পড়ে যান। প্রত্যেক যুবরাজের কথায় যুক্তি আছে। সবাই সমান বিস্ময়কর জিনিস এনেছে। যাকেই জামাই হিসেবে নির্বাচিত করেন অন্য দুই প্রতিবেশি আর তাদের সঙ্গীরা ক্রুদ্ধ হবে।
রাজা বলেন, “তোমরা বরং কাল এসো, আমি ভেবে দেখবো।”
সে রাতে রাজা তার উজিরকে ডেকে পাঠালেন পরামর্শের জন্য। উজির বললেন, “মহারাজ আমাদের দেশ থেকে অনেক দূরে এক জ্ঞানী বৃদ্ধ বাস করেন। তিনি লোকজনকে ভালো পরামর্শ দেন। আমরা যদি তার কাছ থেকে পরামর্শ নেই তবে বাদ পরা যুবরাজ আর তাদের সঙ্গীরা দূর রাজ্যের উপর ক্রুদ্ধ হবেন আর আমরা বেঁচে যাব।”
রাজা খুশি হয়ে বললেন, “দারুণ বলেছ। কালই তাকে দরবারে ডেকে পাঠাও।”
পরদিন দরবারে এসে রাজপুত্রেরা জানতে পারলেন যে, এক বৃদ্ধ লোক তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচিত করবেন। এই বৃদ্ধ লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাটে এবং ফ্যাসফ্যাসে গলায় কথা বলেন। তিন যুবরাজ তার কাছে জানায়, কেন তারা স্বামী হিসেবে যোগ্য।
রাজা এবার বলেন, “আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি, প্রত্যেক যুবরাজই আমার কন্যাকে বিয়ের উপযুক্ত।” এবার বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে পরামর্শ চেয়ে বলেন, “আপনি বেশ দূর থেকে এসেছেন। আপনার পরামর্শ কী?”
খাকাড়ি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বৃদ্ধ বলেন, “মহারাজ প্রথমেই বলি, আপনার দরবারে কিছু বলা সম্মানের।” কাঁপা কাঁপা হাত যুবরাজদের দিকে তুলে বলেন, “কোনো সন্দেহ নেই যে আপনারা প্রত্যেকে বিস্ময়কর জিনিস এনেছেন। একই সঙ্গে রাজকন্যার জীবন রক্ষা করেছেন। কিন্তু আমার দেশে বিয়ের জন্য মেয়ের মত নেওয়া হয়। কেননা এর সঙ্গে তার জীবন ও সুখের বিষয়টি জড়িত। তাই আমি প্রথমেই রাজকন্যার সিদ্ধান্ত জানতে চাই।” এবার তিনি রাজকন্যাকে জিজ্ঞেস করেন, “রাজকন্যা কাকে আপনি বিয়ে করবেন?”
রাজকন্যা খানিকটা সময় নিশ্চুপ থেকে তিন রাজপুত্রের দিকে তাকায়। তিনি বলেন, “আপনারা প্রত্যেকে আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। এজন্য সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই বৃদ্ধ লোকটিই একমাত্র..।” এই বলে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বলেন, “যে বুঝতে পেরেছে যে বিয়ের জন্য আমার সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাবা আপনি যদি অনুমতি দেন..।” এবার বৃদ্ধের দিকে এক পা বাড়িয়ে বলেন, “আমি তাকে আমার বর হিসেবে পছন্দ করলাম।”
পুরো দরবারের সবাই এমন সিদ্ধান্তে চমকে যায়।
বৃদ্ধকে বিয়ে করার কথা শুনে কয়েকজন নারী সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যায়। তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাজা চিৎকার করে বলেন, “তুমি এটা করতে পার না!”
রাজকন্যার জাদুর মালিশ নিয়ে বৃদ্ধের হাতে মেখে দেন। তখুনি তার চারপাশে কুয়াশা তৈরি হয়। যখন রাজকন্যা হাত সরিয়ে নেন বৃদ্ধ লোকটি সুদর্শন ও লম্বা তরুণে পরিণত হয়েছেন। রাজকন্যার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে নতুন যুবক।
রাজা এবার রাজপুত্রদের দিকে তাকিয়ে বলেন, “তোমরা প্রত্যেকেই এ ভূমি শাসনের যোগ্যতা রাখ। আমাদের এ রাজকীয় পরিবারের জন্য তোমরা যা করলে তা আমি ভুলবো না।”
নিজেদের বিস্ময়কর জিনিসগুলো নিয়ে চলে যায় যুবরাজগণ। শুধু তাই নয় তারা চারপাশের রাজ্যের সুন্দরী রাজকন্যাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখান থেকে বধু নির্বাচনের মাধ্যমে বিয়ে করেন যুবরাজগণ।
আর রাজ্যসমূহের সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। ·
অনুবাদকের পরিচিতি : তানভীর আহমেদ সিডনি শাহজাদপুরের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তাঁর বইসমূহের মধ্যে রয়েছে : মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস মুন্সিগঞ্জ জেলা, নৃনাট্য ত্রয়ী, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি চেতনা, তেনালিরামের মজার গল্প, বঙ্গবন্ধুর সংস্কৃতি-চেতনা ইত্যাদি। বসবাস করছেন শাহজাদপুরে।


0 মন্তব্যসমূহ