মূল লেখা : হেলেনা লি
বাংলা অনুবাদ : শাহনাজ রেজা
বাংলা অনুবাদ : শাহনাজ রেজা
আদিচির জন্ম ১৯৭৭ সালে নাইজেরিয়ার এনুগু শহরে। তিনি বড় হয়েছেন নাইজেরিয়ার নসুক্কে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। জায়গাটি একসময় লেখক চিনুয়া আচেবের বাসস্থান ছিল। এই পরিবেশ তাঁর সাহিত্যিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কৈশোরে তিনি নাইজেরিয়া ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং সেখানে পড়াশোনা করেন। তাঁর লেখায় তাই আফ্রিকা ও আমেরিকা—দুটো অভিজ্ঞতাই পাশাপাশি উপস্থিত।
তাঁর প্রথম উপন্যাস Purple Hibiscus তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। এরপর Half of a Yellow Sun–এ তিনি নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা যুদ্ধকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্তরে তুলে ধরেন—এটাকে আধুনিক ঐতিহাসিক উপন্যাসের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। Americanah উপন্যাসে তিনি অভিবাসন, বর্ণবাদ, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই উপন্যাস তাঁকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়।
কল্পকাহিনির পাশাপাশি আদিচি প্রবন্ধ ও বক্তৃতার মাধ্যমেও গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তাঁর প্রবন্ধ We Should All Be Feminists এবং Dear Ijeawele, or A Feminist Manifesto in Fifteen Suggestions বিশ্বব্যাপী নারীবাদী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হিসেবে বিবেচিত। তাঁর ভাষা তাত্ত্বিক নয়; বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, গল্প এবং নৈতিক প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি জটিল বিষয়কে সহজ ও স্পষ্ট করে তুলতে পারেন।
আদিচির লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি কাউকে নিছক প্রতীক বানান না। তাঁর চরিত্ররা নৈতিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত, ভুল করে, আবার নিজের সীমাও বোঝে। ক্ষমতার সমালোচনা তিনি করেন, কিন্তু মানবিক জটিলতা বাদ দিয়ে নয়। এজন্য তাঁর সাহিত্যকে প্রায়ই ‘নৈতিকভাবে সংবেদনশীল কিন্তু ন্যারেটিভভাবে শক্ত’ বলা হয়।
দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর উপন্যাস Dream Count (২০২৫) প্রকাশ তাঁকে আবারও সমকালীন সাহিত্যের কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। এই উপন্যাসে তিনি চারজন নারীর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, শোক, নারীজীবন ও সমাজের কাঠামোকে অনুসন্ধান করেছেন। চিমামান্ডা ন্গোজি আদিচি এমন একজন লেখক, যাঁর সাহিত্য কেবল গল্প বলে না—তা পাঠককে নৈতিকভাবে ভাবতে বাধ্য করে, এবং সমসাময়িক পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়।
এক দশক ধরে আদিচির পরবর্তী উপন্যাসের অপেক্ষা করছিল দুনিয়া। অবশেষে লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং সাংস্কৃতিক প্রতীকের প্রত্যাবর্তন নিজের মতোই বিশাল স্বপ্নে ভরা একটি বই নিয়ে।
রয়্যাল অ্যাকাডেমির কালেকশন গ্যালারিতে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার-এর একটি ষোড়শ শতকের অনুলিপির সামনে এক অনন্য নৈশভোজ বসেছিল। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন স্যাম মেন্ডেস, লেখক-পরিচালক হান্না রথচাইল্ড, ক্রিস্টিন স্কট থমাস এবং টিম বার্নার্স-লি—ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জনক। তাঁরা সবাই জড়ো হয়েছিলেন একজন মানুষের প্রজ্ঞাকে উদ্যাপন করতে : চিমামান্ডা ন্গোজি আদিচি। কিছুক্ষণ আগেই তিনি তাঁর তীক্ষ্ণ, রসিক ও উজ্জ্বল বক্তৃতা ‘এক অজানা লেখকের শুরুর দিনগুলো’ উপস্থাপন করেছিলেন।
আমরা যিশুর ছবির সামনে বসে খাচ্ছিলাম—তাঁর দুই হাত প্রশস্তভাবে খোলা, রক্তমাখা করুণায় ভরা। দৃশ্যটি এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল। ডিনার টেবিলের কেন্দ্রে আদিচি, আর চারপাশে তাঁর শিষ্যরা। কিন্তু তাঁর শব্দের শক্তি এমনই। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসগুলো—পার্পল হিবিস্কাস, হাফ অব আ ইয়েলো সান, আমেরিকানাহ—পরিবার ও সমাজের সংঘাতকে বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জীবন্ত ও তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরে। আর তাঁর বক্তৃতা ও প্রবন্ধগুলো যেন আধুনিক সময়ের সত্যগুলোকে সংক্ষিপ্ত করে ধরতে পারে—সে তিনি শোক নিয়ে লিখুন, গল্প বলার পক্ষে সওয়াল করুন, কিংবা শিল্পী স্বাধীনতার ওপর সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে কথা বলুন।
তাঁর দূরদর্শী চিন্তাগুলো একবিংশ শতাব্দীর নারীবাদের ধারণাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে শুধু বেস্টসেলার বই বা টেড টকের মাধ্যমে নয়, বরং বিয়ন্সের গানের কথায় কিংবা মারিয়া গ্রাজিয়া কিউরির ডিওরের প্রথম কালেকশনেও।
আদিচি তাঁর বক্তৃতার শেষ করেছিলেন এই কথায় : ‘‘আমি সাহিত্যে আমার ধর্ম খুঁজে পাই… কল্পকাহিনি অনেক দিক থেকেই বিশ্বাসের মতো—এটা কল্পনার এক ধরনের লাফ।”
কয়েক মাস পর ফেব্রুয়ারিতে আমরা আবার কথা বলি। তিনি মেরিল্যান্ডে তাঁর উজ্জ্বল বাড়িতে, চুল বাঁধা, গায়ে কোরাল রঙের সোয়েটার; আর আমি লন্ডনে। আমি তাঁকে আগের সাক্ষাতের কথা মনে করিয়ে দিই, কীভাবে সেই পরিবেশটি গল্প আর বিশ্বাসের মিলটাকে মজারভাবে জোরালো করে তুলেছিল। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, তিনি কি এখন আগের চেয়ে বেশি বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকছেন?
তিনি বলেন, “এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ আর প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। সংক্ষেপে বললে—হ্যাঁ।” তিনি হাসেন গভীরভাবে। “তরুণরা যেমন বলে, ‘আমাকে দেখা হয়েছে’—আপনি শুধু এই প্রশ্নটা করেই আমাকে ‘দেখা হয়েছে’ অনুভব করালেন।”
তারপর তিনি যোগ করেন, “গম্ভীরভাবে বললে, বিষয়টা শুধু এই না যে আমরা—হয়তো একটু নাটকীয় শোনাবে—ভয়ংকর সময়ে বাস করছি। সত্যিই করছি। কিন্তু আমার বাবা মারা যাওয়ার পর, আর তারপর মা মারা যাওয়ার পর, আমার সবকিছু বদলে গেল। আমি বদলে গেলাম। জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব সম্পর্কে এক তীব্র সচেতনতা তৈরি হলো, আর হঠাৎ করে অর্থের জন্য এক গভীর আকাঙ্ক্ষা। এই সবকিছুই বিশ্বাসের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
আসলে গত পাঁচ বছর আদিচির জন্য ছিল ভয়াবহ। ২০২০ সালে, মহামারির সময়ে, তিনি হঠাৎ করে তাঁর বাবা অধ্যাপক জেমস ন্ওয়ে আদিচিকে কিডনি বিকল হয়ে মারা যেতে দেখেন। সেই শোকের পরেই তিনি লেখেন তাঁর প্রবন্ধ নোটস অন গ্রিফ। পরের বছর তাঁর মা গ্রেস আদিচি মারা যান—ঠিক তাঁর বাবার জন্মদিনে। সম্পর্ক ভালো ছিল, তবু সেই স্মৃতি তাঁকে এখনো আবেগে ভরিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, “অনেক আফসোস আছে। মনে হয়, আমি আরও ভালো হতে পারতাম, মায়ের সঙ্গে আরও ভালো ব্যবহার করতে পারতাম।” তিনি বলেন, “আমি এমন এক অদ্ভুত জায়গায় আছি, যেখানে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ কান্না পেয়ে যায়। যদি আমরা ভাগ্যবান হই এমন বাবা-মা পেয়ে যারা আমাদের ভালোবাসেন, তাহলে মেয়েদের মধ্যে বাবাদের প্রতি বেশি ছাড় দেওয়ার প্রবণতা থাকে—আমি নিজেও তার উদাহরণ। আমার মনে হয়, মেয়েদের বলার জন্য একটা আন্দোলন শুরু করা উচিত—আর নয়।”
তবু এই শোকের মধ্যেই আদিচি লিখেছেন ড্রিম কাউন্ট—দশ বছরে তাঁর প্রথম উপন্যাস। ২০১৫ সালে তাঁর জটিল গর্ভাবস্থার পর তিনি আর সহজে উপন্যাসের জগতে ফিরতে পারেননি। তিনি বলেন, “আমি আধা-মজা করে বলি, গর্ভাবস্থা আমার কথাসাহিত্য লেখার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল।”
তিনি বলেন, “কথাসাহিত্যই আমার জীবনের প্রেম। কথাসাহিত্যই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এক দিক থেকে আমি কৃতজ্ঞ যে আমি নন-ফিকশন লিখতে পেরেছি, কিন্তু সেটাই আমার আত্মার চাওয়া ছিল না।” তিনি মনে করেন, তিনি ভেবেছিলেন, “যদি আমি আর কখনো লিখতে না পারি?”
তিনি বলেন, “ওটা ছিল ভয়াবহ চিন্তা। গর্ভাবস্থা এক অসাধারণ আশীর্বাদ, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের জন্য এটা কখনো কখনো নির্বাসনের মতো। এটা আপনাকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য করতে পারে। শরীর আর সৃজনশীল তাড়নার মধ্যে খুব জটিল সম্পর্ক।”
আদিচির জন্য ড্রিম কাউন্ট লেখা ছিল শোক থেকে সাময়িক মুক্তি। চরিত্রগুলো ধীরে ধীরে ভেসে উঠতে থাকে। তিনি জানতেন, তিনি নাইজেরিয়ার এক নারীকে নিয়ে লিখতে চান, কিন্তু যিনি লাগোস নয়, আবুজায় থাকেন।
তিনি বলেন, “মা মারা যাওয়ার পর আমি চিন্তাই করতে পারতাম না। আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে কথাসাহিত্যে ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। তখনই আমি ড্রিম কাউন্ট লেখা শুরু করি। প্রায় শেষ করার সময় বুঝলাম—‘হে ঈশ্বর, এটা তো মাকে নিয়েই লেখা।’”
ফলাফল হলো এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী উপন্যাস, যেখানে চারজন নারীর আন্তঃসংযুক্ত গল্প উঠে আসে: চিয়ামাকা, জিকোরা, কাদিয়াতু এবং ওমেলোগর। গল্পটি সময়ের মধ্যে এদিক-ওদিক যাতায়াত করে, নারীদের ব্যক্তিগত যাত্রা উন্মোচন করে। গল্প আমাদের নিয়ে যায় ওয়াশিংটন ডিসি, লন্ডন, ফরাসি গিনি দেশের কনাক্রি এবং নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায়।
তিনি বলেন, “চিয়ামাকা আর ওমেলোগরের অংশ লেখার সময় আমার ভেতরে এক ধরনের খেলাচ্ছল্য ছিল। জীবনে কোনো আনন্দ না থাকলেও, আমি আনন্দের ছোট ছোট টুকরো খুঁজে পেয়েছি। কখনো কখনো আমি হেসে উঠতাম। আমি চাই, এই বইয়ের কিছু অংশ মানুষকে হাসাক। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, এটা অত্যন্ত জরুরি।”
ড্রিম কাউন্ট কোনো বিষণ্ণ বই নয়
গল্পটি শুরু হয় চিয়ামাকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। চিয়ামাকা একজন নাইজেরীয় নারী—“অত্যন্ত পরিশীলিত ও বহু জায়গা ঘোরা, অথচ ভেতরে একেবারেই নিষ্পাপ ও নতুন”—যিনি আমেরিকায় থাকেন। তিনি ভ্রমণ নিয়ে লেখেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন একটি উপন্যাস প্রকাশ করা। গল্পের প্রথম অধ্যায়গুলো মহামারির সময়কালে স্থাপিত-- তখন তিনি শারীরিকভাবে একা। তাঁর গল্পটি আত্মপর্যালোচনামূলক; এটি চালিত হয় “নিজেকে সত্যিকার অর্থে জানা যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা” দিয়ে। তিনি নিজের অতীতের সব প্রেমের সম্পর্কের দিকে ফিরে তাকান—যাকে তিনি বলেন তাঁর ‘ড্রিম কাউন্ট’।
প্রতিটি অংশ আলাদা চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে। জিকোরা—একজন আইনজীবী—চিয়ার বন্ধু এবং একক মা। কাদিয়াতু—চারজনের মধ্যে একমাত্র ফরাসি গিনি থেকে আসা—চিয়ার পরিবারের জন্য কাজ করেন, পাশাপাশি একটি হোটেলে পরিচারিকার চাকরি করেন। আর ওমেলোগর হল চিয়ার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও ব্যঙ্গপ্রবণ কাজিন, নাইজেরিয়ার এক ব্যাংকে তার সাফল্য তাঁকে নিজের নৈতিক দিকনির্দেশনা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বইটি ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এবং পথে চলতে গিয়ে আমরা যে বিচার আর ভুল করি, তা নিয়ে। একই সঙ্গে এটি সেই সমাজগুলোর একটি গভীর অনুসন্ধান, যেখানে এই নারীরা কাজ করে, এবং সেই পুরুষদেরও—যাঁরা এই নারীদের জীবনে ছাপ রেখে গেছে।
গল্পের গতিপথ বদলে যায় কাদিয়াতুর গুরুত্বপূর্ণ অংশে—তা অনেক দিক থেকেই বইটির কাব্যিক ও আবেগময় কেন্দ্র। তিনি সবচেয়ে কম কথা বলেন, অথচ তিনি সবচেয়ে স্থায়ী উপস্থিতি। তিনি একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পান। আদিচি বলেন, “সে দরিদ্র, সে অভিবাসী, সে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত নয়। কিন্তু এটাও দেখানো জরুরি ছিল যে মানুষে মানুষে কতটা ফাঁপা আচরণ আছে তা সে বুঝতে পারে; অহংকার সে খুব স্পষ্ট দেখতে পায়, এমনকি সে যদি সেটার নাম না-ও দেয়।”
একটি অত্যন্ত কষ্টকর দৃশ্যে, ছোটবেলায় কাদিয়াতুকে তাঁর মা নিয়ে যান নারী খৎনার জন্য যাতে সে “বিয়ের যোগ্য” হয়ে ওঠে। এই অংশের জন্য গবেষণা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদিচি গিনির বহু নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের মায়েরা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, যেন বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়। তিনি বলেন, “এই ধরনের বিষয়ে আমি খুব সিরিয়াস। আমি শিল্পের দোহাই দিয়ে ভুল কিছু দেখানোর পক্ষপাতী নই।”
তিনি আরও বলেন, “আমি সবসময়ই আগ্রহী ছিলাম এই বিষয়ে—আমরা কীভাবে এমন জিনিস মেনে নিতে সামাজিকভাবে অভ্যস্ত হয়েছি, যা আমাদের জন্য বিপজ্জনক, এবং সেটি কীভাবে এক ধরনের মানসিক টিকে থাকার কৌশল হয়ে ওঠে। কিন্তু আমার কাছে বড় প্রশ্ন হলো: সমাজ কীভাবে গঠিত? শেষ পর্যন্ত কে উপকৃত হয়?” তিনি বলেন, “এর মূল উদ্দেশ্য হলো নারীর যৌনতা দমন করা, এবং এটি নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকে আসে, যা সংস্কৃতির ভাষায় ঢেকে রাখা হয়। এটি লেখা কঠিন ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়েছে এটি প্রয়োজনীয়, কারণ পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মেয়ের জন্য এটাই বাস্তবতা। আমরা যদি আর কিছু না-ও করতে পারি, অন্তত সাক্ষী থাকতে পারি।”
কাদিয়াতু একটি উচ্চপ্রোফাইল মামলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তার ঘটনাগুলো বাস্তব জীবনের ডমিনিক স্ত্রস-কানকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। স্ত্রস-কান ছিলেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০১১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন নাফিসাতু দিয়ালো। দিয়ালো সেই হোটেলের একজন পরিচারিকা ছিলেন। সেখানে তিনি থাকতেন। মামলাটি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং আদালতে গড়ায়।
সেই সময় আদিচি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে তিনি স্ত্রস-কান ও দিয়ালোর মধ্যকার ক্ষমতার অসমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, কেন “অভিযুক্ত নারীর চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু অভিযুক্ত পুরুষের চরিত্র নয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না।” আদিচির কল্পনায় দিয়ালো রয়ে গিয়েছিলেন, এবং তিনি একটি বিকল্প আখ্যান দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি কাদিয়াতুকে করুণার পাত্র বানাতে চাইনি। সহানুভূতি, সহমর্মিতা—হ্যাঁ। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তার মর্যাদা থাকুক, এবং পাঠক তাকে সম্মান করুক। এমন অনেক নারী আছে, যারা অদৃশ্য, কিন্তু যাদের ভেতরে অনেক কিছু ঘটে।”
এই গল্পটি আমেরিকার ধারণা নিয়ে গভীরভাবে গেঁথে থাকা বিশ্বাসগুলোকে প্রশ্ন করে এবং ক্ষমতার রক্ষকদের—বিচারব্যবস্থা, সাংবাদিকদের—ব্যর্থতাগুলো উন্মোচন করে। এরা অসাবধানভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পুনর্নিয়োগের প্রেক্ষিতে আমি যখন জিজ্ঞেস করি, আদিচি কি তাঁর দত্তক দেশের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নতুন করে ভাবছেন, তিনি ঠাট্টা করে বলেন, “আমাদের তো অনেক আগেই ব্রেকআপ হয়ে গেছে...”
তিনি পরিষ্কার করেন, “আমি সাধারণভাবে আমেরিকার প্রতি নৈরাশ্যবাদী নই। আমার হৃদয় নাইজেরিয়ায়, কিন্তু সেখানে সবসময় সম্ভাবনার অনুভূতি পাই না। তবে এটা বলতেই হয়, যিনি কোনোভাবেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য নন, এমন একজন মানুষের দ্বিতীয়বার নির্বাচনে কিছু একটা আমার ভেতরে বদলে দিয়েছে।”
আদিচি যে দুটি দেশকে নিজের ঘর বলেন, তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তিনি টানেন। তাঁর চরিত্ররা আমেরিকায় আসে। আমেরিকাকে এখনো নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করার সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখা হয়—। অনেক দিক থেকেই আকাঙ্ক্ষার ধারণাটি প্রতিটি গল্পের ভিত্তি। তিনি স্বপ্ন দেখা আর নারী হিসেবে প্রত্যাশার টানাপোড়েন অনুসন্ধান করেন—স্ত্রী, প্রেমিকা, কর্মজীবী নারী, অভিবাসী হওয়ার চাপ। কাদিয়াতুকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তার স্বপ্ন কী, সে ভাবে যে প্রশ্নটি “শুধু অবসরপ্রাপ্ত মানুষেরাই ভাবতে পারে।” উপন্যাসের প্রেক্ষিতে, স্বপ্ন দেখাই হয়ে ওঠে এক ধরনের নারীবাদী কাজ। আদিচি বলেন, “আমার মনে হয়, স্বপ্ন দেখার মানে প্রায়ই নিজেকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাহস করা।”
এই প্রসঙ্গে আমি জানতে চাই, বড় হতে থাকা পরিবারের সঙ্গে লেখালেখিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে কাজ করে। আদিচি ও তাঁর স্বামী এখন যমজ ছেলের বাবা-মা। ছেলেরা সারোগেট মায়ের মাধ্যমে জন্মেছে এবং তাদের বয়স এখন দশ মাস। তাঁর একটি কন্যাও আছে। তার বয়স প্রায় দশ। শুরুতেই তিনি পরিবারকে জানিয়েছিলেন তাঁর উপন্যাস লেখার বিষয়টি। তিনি বলেন, “তারা জানে, লেখা ভালোভাবে চললে আমি আশেপাশে থাকতে ভালো মানুষ হই। উল্টোটাও সত্য।” তিনি খিটখিটে হলে মেয়েকে বলেন, “মা বাজে কিছু লিখছে।” তিনি চাননি তাঁর মেয়ে ভাবুক যে লেখালেখি তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি কাজের সময় দরজা খোলা রাখেন। “সে যে কোনো সময় ঢুকতে পারে। যদিও আমি চাই না সে এত ঘন ঘন এই সুযোগ ব্যবহার করুক!”—হেসে বলেন তিনি।
আদিচি নিজেকে ‘ভোর ছয়টায় ওঠা, অতিমাত্রায় গোছানো লেখক’ মনে করেন না। তিনি বলেন, “আমার কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো কাঠামো নেই।” তিনি তাঁর পেছনের ঘরের দিকে তাকান—ঘরে আরামদায়ক, সাদা, তাকভরা বই, একটি ডেস্ক, দেয়ালে শিল্পকর্ম রয়েছে। এটি তাঁর লেখার ঘর হওয়ার কথা, কিন্তু তিনি সেখানে খুব কমই লেখেন; বরং ওপরে একটি অটোমানে কুঁকড়ে বসে লেখেন। তাঁর শহরতলির আমেরিকান জীবন শান্ত ও সুখকর, “এটি আমার কাছ থেকে কিছু চায় না।” এখানকার স্কুলগুলো ভালো। তবে তিনি বলেন, “আমার কাছে অদ্ভুত লাগে যে আমি এখন ‘বড়দের’ দলে। আমার ভেতরে এখনো এমন এক অংশ আছে, যে বাইরে থেকে দেখে ভাবে—‘সত্যিই?’” লাগোসে, যেখানে তাঁর আরেকটি বাড়ি আছে, তিনি বেশি সামাজিক, বেশি বাইরে যান, প্রায়ই বন্ধুদের ডিনারে ডাকেন। তিনি বলেন, “আমি দুটোই ভালোবাসি, কারণ আমার কাছে দুটোই আছে।”
তাঁর আন্তর্জাতিক ও উচ্চপ্রোফাইল বন্ধুদের মধ্যে আছেন ফ্যাশন ডিজাইনার মারিয়া গ্রাজিয়া কিউরি, যার ডিওর পোশাক তিনি নিউ ইয়র্কে বাজারের শুটে পরেছিলেন। আদিচি বলেন, “তিনি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যুক্ত একজন মানুষ। তিনি সত্যিই নারীদের ভালোবাসেন। আর আমি ভালোবাসি যে তিনি এত কৌতূহলী।”
আদিচি আমাকে তাঁর বাড়ি ঘুরিয়ে দেখান। তিনি তাঁর ডেস্কের ওপর ঝোলানো একটি ছবি দেখান—নাইজেরিয়ায় তাঁর পৈতৃক শহরের ছবি, এক কোণে তাঁর বাবার মার্সিডিজ গাড়ি। তিনি দেখান একটি ছবিও, যেখানে একজন নারী পা মুড়ে বসে আছেন—গ্র্যাজুয়েট স্কুল থেকে তাঁর কাছে আছে ছবিটি। এটি ক্যারি মে উইমসের কাজ। দেয়ালে রয়েছে তরুণ নাইজেরীয় নারীদের আঁকা ছবি—ঘনিষ্ঠ, মানবিক, কাছ থেকে দেখা মুখাবয়ব। তিনি বলেন, “আমি বাড়ি ফিরে এগুলো দেখতে ভালোবাসি। তখন সবকিছু যেন ঠিক হয়ে যায়।”
তিনি চান আমি তাঁর যমজ ছেলেদের দেখি—বড় একটি ঘরে মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে তারা। আমার সঙ্গে ল্যাপটপে আলাপের শেষ দিকে, তিনি এক শিশুকে কোলে নেন; সে আগ্রহ নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। আদিচি আনন্দভরে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাঁর বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “আমার মতে, উপন্যাস মহান, আর ঔপন্যাসিক হলো সেই স্বপ্ন।” আদিচির লেখা পড়া মানে তাঁর সঙ্গে সেই স্বপ্নে বাস করা।
নোট : হারপার'স বাজার পত্রিকায় আদিচিকে নিয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয় ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে।


0 মন্তব্যসমূহ