আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : লেখালেখির সৌন্দর্য

ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী আরাফাত করিম

১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান এবং কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদুজ্জামান। কবি এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত লিরিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে দেজ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত উৎপলকুমার বসু সম্পাদিত ‘কথায় কথায়’ বইয়ে সাক্ষাৎকারটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই বই থেকে নেওয়া হয়েছে এই সাক্ষাৎকার। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। উল্লেখ্য, ওই সাক্ষাৎকারটির কোনো শিরোনাম ছিল না। ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : লেখালেখির সৌন্দর্য’ শিরোনামটি গল্পপাঠ সম্পাদক কর্তৃক দেওয়া।

ছেলেবেলা, পরিবার, সাহিত্য- অনুরাগ এবং প্রথম লেখালেখি

প্র : প্রথমে আপনার ছেলেবেলার কথা কিছু বলুন। বাবা-মা, পরিবার সম্বন্ধেও বলবেন।
: ও, সেই সব? এসবের কি খুব দরকার আছে?

প্র : খুব আছে, বলুন।
: আমার জন্ম ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। আমাদের বাড়ি বগুড়ায়। কিন্তু আমার জন্ম আমার নানাবাড়িতে, তখনকার রংপুর ও এখনকার গাইবান্ধা জেলার একটি গ্রামে। গ্রামের নাম গোটিয়া। তখনকার দিনে অন্তঃসত্ত্বা হলে মেয়েদের বাপের বাড়ি যাবার নিয়ম ছিল, মায়ের কাছে একটু আদর যত্নে থাকবে। প্রথম সন্তান পেটে এলে 'মায়ের রন্ধনে খাব ভাত'এই বাসনায় আমার মা তাঁর বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন। ওই বাড়িতে কারো জন্ম হলে আমার নানা বাঁধা জ্যোতিষ দিয়ে নবজাতকের কুষ্ঠি করিয়ে নিতেন। কুষ্ঠিতে আমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভালো ভালো কথা লেখা ছিল, তার কোনোটাই ফলেনি। ১২/১৩ বছর বয়সেই আমি ওসবের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলি, কারণ ওই জ্যোতিষমশায়ের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে ওই বাড়ির বেশিরভাগ লোকের মহাপুরুষ হওয়ার কথা। আর তাছাড়া, জন্মের সময় আকাশে গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে কী করে? তবে আকাশে যাই থাকুক, আমার জন্মের সময় পৃথিবী কিন্তু দারুণ ঘটনাবহুল। তখন মহাযুদ্ধ চলছে, মহাযুদ্ধের পটভূমিতে আমাদের দেশের প্রধান ঘটনা তখন দুর্ভিক্ষ: ১৯৪৩-এর মন্বন্তর। আমার বাবার ১৯৪৩ সালের ডায়েরিতে ১২ ফেব্রুয়ারির পাতায় ট্রেনে জলপাইগুড়ি যাবার প্রসঙ্গ পাই, এর নীচে পেন্সিলে লেখা রয়েছে: A male child born at 11 p.m. আগের কয়েকটি পৃষ্ঠায় বগুড়ার গ্রামে দুর্ভিক্ষের রিলিফ দেওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে।

প্র : আপনি বাবা-মার প্রথম সন্তান? আপনার আব্বা তখন কোন পেশায় ছিলেন?
: আব্বা তখন সারিয়াকান্দি হাই স্কুলের হেডমাস্টার, সারিয়াকান্দি হল বগুড়া জেলায় একটি থানা, যমুনা নদীর তীরে। তখন তিনি জেলা মুসলিম লিগের সেক্রেটারি। দুটো দায়িত্বই তিনি সমান যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছেন। জলপাইগুড়ি যাচ্ছিলেন পার্টির কিংবা পার্টির স্টুডেন্ট অরগানাইজেশনের কোনো কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে।

প্র : আপনার আব্বা তাহলে তখন পুরোপুরি পলিটিক্যাল?
: হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ইন ফ্যাক্ট, অনেক আগে থেকেই। আমার জন্মের ১৩/১৪ বছর আগে বাংলার মুসলমান ছাত্রদের রাজনীতি সংগঠনের কাজে তাঁর বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিরিশের দশকের মাঝামাঝি তিনি ছিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের ভাইস-প্রেসিডেন্ট, আনডিভাইডেড বেঙ্গলে মুসলমান রাজনীতিতে এই কলেজের প্রভাবের কথা তো সবাই জানে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন গঠনেও আব্বার রোল বেশ ইম্পর্ট্যান্ট। চল্লিশের দশকের প্রথমে বগুড়া জেলায় মুসলিম লিগকে নিম্ন মধ্যবিত্তের সংগঠনে রূপ দিতে তাঁর ভূমিকাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সেই সময়কার দেশের দুই প্রধান সম্প্রদায়ের কমিউন্যাল পলিটিক্স থেকে তাঁরা মুক্ত ছিলেন না, তবে এখনকার ফান্ডামেন্টালিজমের সঙ্গে তাঁদের মনোভাব গুলিয়ে ফেলা যায় না। আমার বাবা ছিলেন সম্পূর্ণ লিবারেল ডেমোক্র্যাট। তবে তাঁর সমসাময়িক শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের মতো তিনিও চাইতেন যে মুসলমান ছেলেমেয়েরা হিন্দু ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলুক, তাদের সমান মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করুক। কিন্তু একটা কথা, এই মুসলমান ছেলেমেয়েরা বিলং টু এ পার্টিকুলার ক্লাস, মুসলমান মধ্যবিত্তের, হ্যাঁ শুধু মধ্যবিত্তের বিকাশই ছিল তাদের বাসনা। এই বাসনা পূরণ করতে গিয়ে তাঁরা যে আন্দোলন করলেন তাকে কিছুতেই অ্যাপ্রুভ করা যায় না। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ যে কত মর্মান্তিক, কত শোচনীয় হয়েছে, কত অর্থহীন হয়েছে তা দিনে দিনে হাড়ে হাড়ে বোঝা যাচ্ছে।

প্র : আচ্ছা পলিটিক্স পরে আসতে পারে। এবার বলুন আপনার ছেলেবেলা কোথায় কাটল?
: চার বছর বয়স পর্যন্ত কাটে আমার দাদারবাড়িতে, ওটাই তখন আমাদের বাড়ি। করতোয়া নদীর তীরে বগুড়া শহর, নদীর ঠিক ওপারেই নারুলি গ্রাম, আমার জন্মের অনেক অনেক আগে দাদা তাঁর পূর্বপুরুষের গ্রাম চন্দনবাইসা থেকে এসে এই গ্রামে বাড়ি করেন। তো এই বাড়িতে বাস করার স্মৃতি আমার তেমন স্পষ্ট নয়। তবে ওই সময়টা নিয়ে ভাবতে আমার এখনও সবচেয়ে ভালো লাগে। জীবনের প্রথম চারটে বছর দাদাবাড়িতে দাদা এবং চাচাদের সঙ্গে ও ফুফুদের সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারে বাস করার সুযোগ আমার কেবল তখনই হয়েছিল। বাড়ির বড়োছেলের প্রথম সন্তান, আমার দিকে সবার একটু বিশেষ দৃষ্টি তো থাকবেই। কিন্তু আমার সবচেয়ে কাম্য ছিল আমার দাদার সঙ্গ। কিন্তু নাতিপোতা নিয়ে রঙ্গরস করার মানুষ তিনি নন। পুলিশ অফিসার ছিলেন, রিটায়ার করেন আমরা জন্মের ৫ বছর আগে। জন্ম থেকেই দেখে এসেছি বড্ড রাশভারী মানুষ। কথা বলতেন খুব গুছিয়ে, তবে সবই বড়োদের সঙ্গে এবং বিষয়ও একটু ভারী। ধর্ম নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসতেন, ইসলাম ধর্মে ছিল তাঁর নিরঙ্কুশ আনুগত্য। ঘরের দেওয়াল, আলমারির শেলফে সাজানো ছিলো ইসলামিক রিভিউ পত্রিকার বাঁধানো সেট, লন্ডন থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকাটির গ্রাহক ছিলেন তিনি প্রায় পঁচিশ-তিরিশ বছর। তবে অন্যান্য ধর্ম, বিশেষ করে সেমেটিক ধর্মগুলোর ওপর তাঁর পড়াশোনা ছিল বেশ ভালো। এখন মনে হয় যথেষ্ট ভালো। দাদাবাড়ির কাছেই রেললাইন, সেখানে একটি রেলগেট, রেলগেট খোলা ও বন্ধ করার জন্য গুমটিঘর, গুমটিঘর পাহারা দেওয়ার লোকটির নাম ছিলো ঈশান। সবাই তাকে বলত গুমটিওয়ালা। দাদা ডাকতেন নাম ধরে। প্রায় অশিক্ষিত কিংবা একেবারেই অল্প শিক্ষিত গরিব এই খ্রিস্টান ভদ্রলোক তখনই বেশ বুড়ো। তা এই ঈশানের অদ্ভুত আগ্রহ ছিল ধর্ম নিয়ে আলোচনায়। কোত্থেকে কোত্থেকে পুরোনো, জীর্ণ সব ছাপা কিংবা হাতের লেখা কাগজপত্রের পুঁটলি নিয়ে তিনি প্রায়ই আসতেন দাদার কাছে। মনে হয়, ওইসব কাগজপত্র পড়ে বোঝা ছিল তাঁর আয়ত্তের বাইরে, দাদার কাছে আসতেন সেসব বুঝতে। দাদা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে এবং তাঁর নিজের পড়াশোনা থেকে ঈশানের ধর্মজ্ঞানপিপাসা মেটাতে চেষ্টা করতেন। ঈশানের একবার ইহুদি হওয়ার ঝোঁক চেপেছিল। ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হওয়া যায় নাদাদার কাছে এটা জেনে ঈশানের মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, ইহুদি ধর্মের প্রতি তাঁর ঝোঁক তখন আরও বেড়ে যায়। তারপর কী হল আমার মনে নেই। তবে ঈশানকে আমার দারুণ ভালো লাগত। লম্বা দাড়ি, বাবরি চুল, কালো রোগা লম্বা শরীর, একটু ময়লা ধুতি এবং নীচু স্বরে কথা বলাএই কথা শোনার জন্যে আমার বোধহয় প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি কোনোদিন হয়তো এসেছেন বেলা তিনটে সাড়ে তিনটের দিকে। দাদা তখন ঘুমিয়ে থাকলে ঈশান বাইরের খানকা ঘরের উঁচু বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। ওই সময়টায় আমি তাঁর পাশে ঘুরঘুর করতাম। দীর্ঘ দিবানিদ্রা সেরে, হাতমুখ ধুয়ে, অজু করে, নামাজ পড়ে, কয়েকটা পাকা আম অথবা পেঁপে এবং মস্ত এক বাটি ঘন দুধ খেয়ে বাড়ির মূল দালান থেকে খানকা ঘরে আসতে দাদার বেশ সময় লাগত। ঈশান কিন্তু দাঁড়িয়েই থাকতেন, বসতে বললেও বসতেন না, চেয়ারে বসা বোধহয় তাঁর অধিকারের বাইরে ছিল। বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে নীচু স্বরে আমার কাছে মুসা ও ঈশার গল্প করতেন। কথা ছিল অস্পষ্ট, তাঁর জিভের আড়ষ্টতার জন্যেও হতে পারে, আবার আধ্যাত্মিক জটিলতার কারণেও হতে পারে। মুসা ও ঈশার গল্প তিনি বেশ আকর্ষণীয় করে বলতে পারতেন, এঁদের ছবিও আমি প্রথম দেখি তাঁর কাছেই, সাদাকালো না রঙিন মনে নেই। দাদা চলে এলে ঈশান চুপ করতেন, যেটুকু বলতেন তা খুব নীচু স্বরে, শোনাই যেত না, তখন দাদার ভারী স্বর গমগম করত।

প্র : আপনার সাহিত্যচর্চায় কি আপনার দাদার কোনো প্রভাব আছে?
: সরাসরি বলা মুশকিল। দাদার বলার ভঙ্গি আমার খুব ভালো লাগত। আমার চার বছর বয়সে আমরা ঢাকা আসি, এরপর ফের বগুড়া যাই কয়েক বছর পর, তখন শহরে অন্য একটি জায়গায়, জলেশ্বরীতলায়, নতুন বাড়িতে থাকি। কিন্তু ওই পুরোনো বাড়িতে যেতাম প্রধানত তাঁর আকর্ষণে। তাঁর কাছে অনেক গল্প শুনেছি। তাঁর ছাত্রজীবনের কথা, যখন পুলিশ ছিলেন সেই সময়কার কথা, রাজনীতির কথাসব বলতেন। অহংকারী মানুষ ছিলেন, নিজের অসাধারণ মেধা সম্বন্ধে প্রখর সচেতনতা ছিল, কিন্তু নিজের পরিবারের কথা বলতে পারতেন বেশ অবজেক্টিভলি। নিজের কৃতিত্বের কথাও এমনভাবে বলতেন যে মনে হত হি ওয়াজ় স্পিকিং অ্যাবাউট সামবডি এলস। তাঁর প্রথম স্ত্রী, মানে আমার বাবার মা, খুব অল্প বয়সে মারা যান, ইন হার মিড টুয়েনটিজ়। মহিলা দেখতে খুব সুন্দরী ছিলেন। তো দাদা তাঁর এই স্ত্রী সম্বন্ধে যখন বলতেন, সবার সামনেই, ছেলেমেয়ে, ছেলের বউ, তারপর জামাই কিংবা ভাগ্নে সবার সামনেই গতায়ু স্ত্রীর রূপের কথা খুব বলতেন। কিন্তু আবেগ ছাড়া। মনে হত একজন সুন্দরী মহিলার রূপের বিবরণ দিচ্ছেন। কিন্তু বর্ণনা ড্রাই নয়। খুব আকর্ষণীয়। হিউমার খুব একটা করতেন না, তবে হিউমার অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারতেন চমৎকার। এরকম তরল-আবেগ-বর্জিত ঋজু স্বভাবের মানুষ আমি আর দেখিনি বললে চলে। তাঁর ছেলেদের কেউই এরকম হননি।

প্র : আপনার আব্বা তো পলিটিক্সে ছিলেন। আবেগ ছাড়া পলিটিক্স করবেন কী করে? পলিটিক্সকে কি তিনি কেরিয়ার হিসেবে নিয়েছিলেন?
: না। তখন অন্তত তা করা সম্ভব ছিল না। পেশার ব্যাপারে আব্বা খুব ইনডিসিশনে ভুগতেন। বি.এ. পাস করে ল পড়েছিলেন, কমপ্লিট না করেই ছেড়ে দেন। ফরিদপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলার কয়েকটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন প্রায় তিন-চার বছর। এরপর বগুড়া রেডক্রসের সেক্রেটারি হন, তখন এই পদে বেতন দেওয়া হত। ৪৩ বছর বয়সে ব্যাবসা করতে শুরু করেন, এ-ইন্ডাস্ট্রি সে-ইন্ডাস্ট্রি করলেও ব্যাবসায় একেবারেই ভালো করতে পারেনি। অনেক ঋণ করে গেছেন। আমার মনে হয় পেশা হিসাবে শিক্ষকতাই ছিল তাঁর স্বভাবের অনুকূল। তাঁর ১৯৪৩-৪৪ সালের কয়েকজন মেধাবী ছাত্র, এখন তাঁদের বয়স ষাটের ওপর, তাঁর পড়ানো নিয়ে উচ্ছ্বসিত ভাষায় কথা বলেন।

প্র : আপনার পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি কতটা সাহায্য করেছেন?
: প্রচুর। প্রতি মাসে আমাদের বই কিনে দিতেন, এই কাজটি সবসময় নিজে করতেন। তাঁর নিজের বই সংগ্রহ ছিল মোটামুটি ভালো। সেখান থেকেও আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। তবে ছেলেদের স্কুল কলেজের পড়াশোনার ব্যাপারে আব্বা তেমন খেয়াল কখনোই করেননি।

প্র : আপনার স্কুলে পড়াশোনার শুরু কোথায়?
: আমার প্রথম স্কুল লক্ষ্মীবাজারে সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুল, তখন নীচের ক্লাসে সেখানে ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গে পড়ত। আমার বাবা তখন পূর্ব বাংলা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, পলিটিক্স নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে পারিবারিক ব্যাপারে মন দেওয়ার সময়ই পেতেন না। আবার রাজনীতির কারণেই আমাদের সঙ্গে তখন অনেক লোক থাকতেন, তাঁদের সবাইকে আমরা বলতাম চাচা। এরকম একজন সিদ্দিকচাচাকে ধরে আমার মা আমাদের দুই ভাইকে স্কুলে ভর্তি করাবার ব্যবস্থা করেন। ভর্তি করিয়ে দিয়ে সিদ্দিকচাচা খালাস, পরদিন আমাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ভার পড়ল আর একজন চাচার ওপর। তিনি আবার ভালো করে জানেন না আমরা কোন স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ওই এলাকায় তখন মেলা স্কুল, এক নওয়াবপুর প্রিয়নাথ স্কুল ছাড়া ঢাকার সব স্কুল তখন লক্ষ্মীবাজার সদরঘাটেই। সেই চাচা ভদ্রলোক আমাকে আর আমার ভাই শহীদুজ্জামানকে নিয়ে রিকশা করে একটির পর একটি স্কুলে টু মারতে লাগলেন। কোনো কোনো স্কুলে ওইটুকু ছেলেদের ক্লাসই নেই। বাংলাবাজার মেয়েদের স্কুলে ঢুকতে গিয়ে বোধহয় গলাধাক্কাও খেতে হল। শেষ পর্যন্ত সেন্ট ফ্রান্সিসের মেমসায়েবরা খাতাপত্র দেখে আমাদের নাম খুঁজে পেলেন। স্কুলের সামনে যিশু খ্রিস্টের মূর্তি দেখে আমারও ভারি পছন্দ হল। তো ওই স্কুলে দুই ভাই আমরা ভালোই করছিলাম। কিন্তু বছর দেড়েক পর আব্বার একজন রাজনৈতিক সহকর্মীর উদ্যোগে ওই স্কুল থেকে আমাদের ছাড়িয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হল কলেজিয়েট স্কুলে। এখানে দু-বছর পড়লাম, তারপর আমাদের দুই ভাইকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হল বগুড়া জিলা স্কুলে। ওখান থেকেই আমি ম্যাট্রিক পাশ করি।

প্র : ইউনিভার্সিটিতে বাংলা পড়লেন কি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়?
: হান্ড্রেড পার্সেন্ট। আমার বাবা আমার যাবতীয় ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমার সাহিত্য বোধ, আমার রাজনীতি বিশ্বাস, ধর্ম সম্বন্ধে আমার দৃষ্টিভঙ্গিকোনো ব্যাপারেই আব্বা আমার বা আমার ভাইদের ওপর কখনোই কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। স্কুলে, এমনকী বলতে গেলে নীচের ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই আমি আব্বার সঙ্গে নানা ব্যাপারে তর্ক করতাম, বেয়াদবের মতো তর্ক করতাম। বেয়াদবিটা তিনি অনুমোদন করতেন না, কিন্তু মতের অমিল দেখে কক্ষনো রাগ করেননি। একবার পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে বলতে আমি তাঁদের একজন পরম শ্রদ্ধেয় নেতা সম্বন্ধে কুকুর বলে ফেলেছিলাম। শীতল ও গম্ভীর কণ্ঠে আব্বা শুধু বললেন, তর্ক করার সময় এসব টার্ম ইউজ করা ঠিক না। পরমতসহিষ্ণুতা নামে বুর্জোয়াসুলভ গুণ তাঁর অসাধারণ। বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বরাবরই ভালো ছিল, বেশ ভালো। আমার চাচা ইদ্রিস সাহেব ডাক্তারি পড়ার সময়, পঞ্চাশের দশকের শুরুতে, বাম রাজনীতির খুব সমর্থক ছিলেন। আব্বার সঙ্গে তিনি তর্কও করতেন খুব, আব্বা কক্ষনো রাগ করেননি, বরং রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে তাঁকে বরাবরই প্রেরণা দিয়ে এসেছেন।

প্র : সাহিত্যে আগ্রহ সৃষ্টিতে আপনার বাবা তাহলে নিশ্চয়ই সাহায্য করেছেন?
: সচেতনভাবে নয়। তবে প্রচুর বই পড়ার সুযোগ করে দিয়ে, মতামত গড়ে ওঠায় বাধা না দিয়ে, ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে না দিয়ে এবং ধর্মের আচারগুলো মেনে চলতে কোনোদিন কিছুমাত্র চাপ না দিয়ে আব্বা আমাকে স্বাধীন হবার সুযোগ দিয়েছেন। মনে হয় ওই জেনারেশনের অনেকেই ছেলেদের সঙ্গে এরকম করেছিলেন। এখনকার বাবারা ছেলেমেয়েদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে দারুণ নজর রাখেন, কিন্তু স্বাধীনতা দিতে চান না। ১১ বছর বয়সে আমি আর আমার ভাই, ওর তখন সাড়ে নয়, আমরা দু-জনে ট্রেনে বগুড়া থেকে ঢাকা এসেছি, স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমাদের বইপত্র, খাতাপেন্সিল, ম্যাপ- ট্যাপ সব আমরা নিজেরাই কিনতাম। যাক, এই স্বাধীনতা না পেলে লেখা-টেখার কাজ করা হত কি না সন্দেহ।

প্র : আপনার মা কি সাহায্য করেছেন?
: আমার মা গল্পের বই পড়তেন খুব। শুনেছি আমি তাঁর পেটে থাকতে তিনি দিনরাত খালি ভূতের গল্প পড়তেন। তাই ছেলেবেলায় আমি একটু ভূতের ভয়ে জড়সড় হলেই আব্বা আম্মাকে একটু কৌতুক করে বলতেন, 'ও পেটে থাকতে তুমি যে হারে ভূতের গল্প পড়তে তাতেই ও এরকম ভীতু হয়েছে।' তা ভাই, ভূতের ভয় আমার একটু ছিল, গুন্ডাপাণ্ডা, পুলিশ, মিলিটারি, মস্তানএদের ভয় একেবারে নেই বললেই চলে, কিন্তু অনেক রাত্রে ঘুম ভেঙে গেলে একা ঘরে গা ছমছম করত বেশ অনেক দিন। আম্মাকে আমরা অবশ্য ভূতের গল্প পড়তে দেখিনি, ওসব বোধহয় তিনি আমাকে পেটে নিয়েই সব শেষ করে ফেলেছিলেন। শরৎচন্দ্রের একেকটা বই তাঁকে যে কতবার পড়তে দেখেছি তার লেখাজোকা নেই। আবার আমার ১২/১৩ বছর বয়সে আম্মা আমাকে রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' প্রায় সবটাই পড়ে শোনান। আব্বা তো প্রায়ই বাইরে থাকতেন, ঘরে ফিরলেও অনেক রাত হয়ে যেত। আম্মা নিজের নিঃসঙ্গতা কিংবা ভয় কাটাবার জন্যে আমাদের চার ভাইকে নিয়ে জোরে জোরে বই পড়তেন। ছোটো দুটো ভাই তখন বেশি ছোটো বলে ঘুমিয়ে পড়ত, আমি আর শহীদুজ্জামান কান খাড়া করে শুনতাম। রবীন্দ্রনাথের 'চয়নিকা' ছিল তাঁর কাব্য সংকলন, 'সঞ্চয়িতা'র আগে এই বইতেই রবীন্দ্রনাথের সব বই থেকে কবিতা সংকলিত হয়। তা এখান থেকে আম্মা সেই সব কবিতা পড়ে শোনাতেন যেখানে একেকটা কাহিনির কাঠামো পাওয়া যায় আর কাহিনিটিও খুব দুঃখের। যেমন ধরো 'বিনুর বয়স তেইশ যখন', 'মা কেঁদে কয়, "মঞ্জুলী, মোর ওই তো কচি মেয়ে..." কিংবা 'দুই বিঘা জমি' 'পুরাতন ভৃত্য'। আম্মার খুব প্রিয় কবিতা ছিল 'দেবতার গ্রাস'। এই কবিতা আম্মাকে এমন পেয়ে বসেছিল যে, আমি একদিন আমার সবচেয়ে ছোটোভাই খালিকুজ্জামানকে একটুখানি ধমক দিয়ে বলেছিলাম, 'চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে', তখন আমার বয়স বছর দশেক, ওর তিন, আম্মা ভয়ে কাতর হয়ে গেলেন, কারণ কবিতাটিতে এই কথা বলার পরিণতি হয়েছিল শোচনীয়। যাই হোক, আম্মা ইংরেজি জানেন না, তবে বাংলা অনুবাদে পার্ল বাকের 'গুড আর্থ', গোর্কির 'মাদার', এসব আমাদের যখন পড়ে শোনান তখন ঠিক এসব পড়বার বয়স আমাদের হয়নি। কিন্তু তাঁর পড়া শুনেই আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এসব নিজে নিজেই পড়তে শুরু করি। তবে আমার মনে হয়, পঞ্চাশের দশকে যেসব বাড়িতে একটু আধটু লেখাপড়ার চর্চা ছিল সব জায়গাতেই মহিলাদের পড়ার অভ্যাসটা ছিল। তবে নিঃসঙ্গতার কারণে হোক কিংবা অন্য কোনো কারণে হোক, আম্মা তাঁর সাহিত্যপাঠের সঙ্গী করেছিলেন আমাকে।

প্র : এর পর সাহিত্যের রুচি যে বহুমুখী হল সেটা কীভাবে?
: সাহিত্যের রুচি বহুমুখী হতে বই সাহায্য তো করেই। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলেই বরং দৃষ্টি গভীর হয়। পড়তে এখনও আমার খুবই ভালো লাগে, কিন্তু সাহিত্যের রুচি শুধু পড়ে হয় না। কিছু কিছু মানুষের সঙ্গও মনকে গড়ে তুলতে কিংবা মনের গড়ে ওঠায় প্রভাব ফেলে। বগুড়া জিলা স্কুলে পড়তে আমাদের শিক্ষক তাজমিলুর রহমান সাহেব কৌতুকের দৃষ্টি দিয়ে সব দেখার ভঙ্গি শিখিয়েছিলেন। আফসার সাহেব ঠাট্টা করতে করতে সিরিয়াস কথা বলতে পারতেন, পাঠ্য বই মানেই যে সত্যবাদী নয় এটাও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই। আমার বন্ধু ছিল ফারুক, বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি নিয়ে লিখত স্কুলে, এখন বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, চমৎকার ইংরেজি আর চমৎকার বাংলায় দেশবিদেশের বিজ্ঞানীদের কাছে চিঠি লেখে, তা বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রথম পাই ওর কাছে। আমাদের নানাবাড়িতে কাজ করত ভিখু পাগলা, এলোমেলা ভাষায় ওর ব্যর্থ প্রেমের গল্প শোনাত। আমাদের বাড়িতে চুল কাটতে আসত যতীন নাপিত, চুল কাটার কাজে ওর অসাধারণ দক্ষতার যেসব কাহিনি শোনাত বাস্তবের সঙ্গে তার কিছুমাত্র মিল না থাকলেও কি হয়, লোকটার কল্পনাশক্তি, ইচ্ছাপূরণের ক্ষমতা এবং সর্বোপরি গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার শিল্পীসুলভ শক্তি দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছি। বই পড়া বেশি সাহায্য করল, না এইসব অনেকের সাহচর্য? বই হয়তো মনটাকে অর্গানাইজ় করতে হেল্প করে।

প্র : না, ধরুন কোনো সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সাহায্য?
: কলেজে ভর্তি হলে আমার কয়েকটি আড্ডার একটি ছিল কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে, যাদের কেউ কেউ লেখক। তাঁদের কয়েকজন লেখা অব্যাহত রাখে। শহিদুর রহমান কয়েকদিন আগে মারা গেছে, গল্প নিয়ে মৌলিক ভাবনা ছিল ওর। ওর সঙ্গে লেখা নিয়ে আলাপ হত খুব। তবে ঢাকা কলেজের দুটো বছর গল্প লেখা নিয়ে আমার সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে মান্নানের সঙ্গে। আবদুল মান্নান সৈয়দ। নতুন ধরনের গল্প লেখার ঝোঁক আমাদের দু-জনেরই তখন প্রবল। কী করে লিখলে ঠিকভাবে নিজেকে প্রকাশ করা যায়, গল্পে কীভাবে ভাষাকে ব্যবহার করবএ নিয়ে দিনের পর দিন আলাপ করেছি, নিউ মার্কেটের ভেতরে এখন যেখানে মসজিদ হয়েছে সেখানে পার্ক ছিল, সেখানে বসে কথা বলতে বলতে চারপাশের দোকানগুলো বন্ধ হতে দেখেছি, আমাদের কথা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। পত্রিকা বের করার ঝোঁক চেপেছিল, আমিনুল ইসলাম বেদু হল সম্পাদক, 'ময়ুখ' নামে সেই পত্রিকার প্রচ্ছদপট পর্যন্ত ব্লক করা হল, আমাদের সঙ্গে আরও ছিল মফিজুল আলম, সিকান্দার দারাশিকো। বেদুর মেলা ছোটাছুটি সত্ত্বেও 'ময়ুখ' আর জ্বলল না। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে বন্ধুর সংখ্যা অনেক বাড়ল, ক্লাসের পড়া করা হত না একেবারেই, কিন্তু পড়াশোনার সুযোগও বাড়ল অনেক। তখনকার দিনে পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়ার পরিবেশ ছিল চমৎকার। সাত্রের 'ন্যসিয়া'র ইংরেজি অনুবাদ, 'ডায়েরি অফ অ্যান্তনি রকেনতিন' ওই লাইব্রেরিতে বসে বসেই পড়েছিলাম। অমিয়ভূষণ মজুমদারের 'গড় শ্রীখণ্ড'ও আমার ওখানে বসেই পড়া। মাঝে মাঝে পাশের চেয়ারে ঢাকা কলেজে আমাদের শিক্ষক শওকত ওসমান সাহেবকে দেখতাম, একটু ঝুঁকে মনোযোগ দিয়ে ইকনমিকসের বই পড়ছেন। পাবলিক লাইব্রেরিতে আর ছিল শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন, অল্প দামে সেখানে পটে চা মিলত, আরও পরে আট আনায় হাফ প্লেট তেহারি। এখানে নতুন আড্ডা গড়ে উঠল। আস্তে আস্তে লাইব্রেরির রিডিং রুমের চেয়ে বাইরের আড্ডাই পরিণত হল প্রধান আকর্ষণে। আর ছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল, সাম্প্রতিকতম ইংরেজি বই ও পত্রিকা পেতাম ওখানে। টাইমস লিটারেরি সাপ্লিমেন্ট থেকে যেসব বইয়ের নাম জানতাম, মাসখানেকের মধ্যেই সেই বইগুলো ওখানে এসে যেত।  স্টিফেন স্পেনডারের 'এনকাউন্টার' পত্রিকার কল্যাণে জর্জ লুই বোর্জেসের গল্পের ইংরেজি অনুবাদ পড়ি, পড়ে এত ভালো লেগেছিল যে, নিউ মার্কেটের নলেজ হোম থেকে পত্রিকাটি এরপর নিয়মিত কিনতে শুরু করি। ১৯৬২ (না ৬৩?) সালে বোর্জেসের (উচ্চারণটা যৈ ভুল জানতাম না) ওপর 'এনকাউন্টার' একটি বিশেষ সংখ্যা বের করে। ওই লেখকের ততদিনে খুব ভক্ত হয়ে গেছে আমার বন্ধু জ্যাক, ভালো নাম জাকারিয়া সিরাজী। জ্যাক তাঁর দুটো গল্পের বাংলা অনুবাদ করেও কোনো পত্রিকায় ছাপতে পারল না, সম্পাদকরা বোর্জেসের নাম জানেন না, অতএব কে পড়তে যাবে তাঁর লেখা? সায়েব হলেই কি ভালো লেখক হতে হবে? ব্রিটিশ কাউন্সিলে আড্ডা হত না, পড়ার জায়গা ছিল নিরিবিলি, ভেতরে পরিবেশ এমন ছিল যে কথা বলার ইচ্ছাও হত না, বই ছাড়াও এত এত পত্রিকা থাকত যে নাড়াচাড়া করেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। উঁচুমানের সাহিত্য পত্রিকা ছিল 'লন্ডন ম্যাগাজিন'। বিবিসির ‘লিসনার’ পত্রিকায় প্রধান আকর্ষণ ছিল ওদের থার্ড প্রোগ্রামে পঠিত লেখাগুলো। কলকাতার 'নতুন সাহিত্য' আর 'চতুরঙ্গ' তখন সবচেয়ে ভালো সাহিত্য পত্রিকা। এসব পত্রিকা এবং বাংলা-ইংরেজি উপন্যাস, গল্প, কবিতা আমার সমকালীন আর সবার মতো আমাকেও একটু একটু করে তৈরি করেছে। সব বইয়ের নাম কি আর বলা যায়? তার দরকারই বা কি? ইউনিভার্সিটিতে এসে পত্রিকা বের করার ইচ্ছা ফের চাগিয়ে উঠেছিল। লিটল ম্যাগাজিন 'স্বাক্ষর'-এর সঙ্গে আমি প্রথম থেকে জড়িত ছিলাম। মান্নান, রফিক আজাদ, রণজিৎ পাল চৌধুরী, মুস্তফা আনোয়ার, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক এরা সবাই ছিল। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদপরে সবাইকে অর্গানাইজ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি 'সাম্প্রতিক ধারার গল্প' সম্পাদনা করলেন, যাঁদের গল্প নিয়েছিলেন তাঁদের বেশির ভাগের কোনো বই বেরোয়নি তখন পর্যন্ত, তেমনি পরিচিতিও ছিল না তাঁদের কারো কারো। সেই সময় এরকম বই সম্পাদনা করে প্রকাশ করা কম সাহসের কাজ নয়। কিছুদিন পর, এই ষাটের দশকের প্রথমার্ধেই আমি ফের নতুন আড্ডার সদস্য হই। এখানে প্রধান আকর্ষণ বুড়োভাই, ভালো নাম মুশাররফ রসুল। ফিজিক্স ও ফিলজ়ফি, সাহিত্য ও চিত্রকলাসব বিষয়ে তাঁর পড়াশোনা, আগ্রহ বেশ গভীর, অ্যাপ্রিশিয়েট করার শক্তি আরও বেশি। জীবনযাপন একেবারেই আলাদা রকমের, কোনো নিয়মের মধ্যেই ফেলা মুশকিল। কঠিন কিছু শুনলেই সেখানে হাত দেওয়ার ইচ্ছা তাঁর প্রবল। 'ফিনেগান্স ওয়েক' পড়েছেন আস্তে আস্তে, এর ওপর লেখা বইপত্র জোগাড় জোগ করে গোটা বইটা মোটামুটি রপ্ত করেছেন, আমাদেরও পড়তে সাহায্য করেছেন। আয়ারল্যান্ডের লোকসাহিত্য পর্যন্ত এই বইটার নামকরণ থেকে শুরু করে কাহিনি পরিবেশনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে জেনে আমরা দারুণ ধাক্কা খেয়েছিলাম। নাগরিক সাহিত্য, নাগরিক রুচির বড়াইতে যাঁদের মাটিতে পা পড়ে না, আমার মনে হয় আধুনিক পাশ্চাত্য লেখকদের শিকড় খুঁজতে গেলে তাঁরা একটু বিচলিতই হবেন। ওই আড্ডায় ছিল আমাদের জিনু, ভালো নাম মাহবুবুল আলম। একটু-আধটু বুক রিভিউ করা ছাড়া ও আর কিছুই লিখল না, অথচ এরকম গভীর সাহিত্যবোধ খুব কম লোকের মধ্যেই পাওয়া যায়। পাঠক হিসাবে ওর তুলনা নেই। এখনও আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধু তেমন ভালো কিংবা ভালো বলে পরিচিত কোনো বই পড়লে ওর মতামত শোনার জন্যে অপেক্ষা করি। আমাদের আরজু আর রেক্স days-এ...

প্র : মানে যখন আপনারা আরজু হোটেল আর রেক্সে অড্ডা দিতেন? 
: রাইট। মিড সিক্সটিজ থেকে আরলি সেভেনটি ওয়ান, ক্র্যাক ডাউনের আগে পর্যন্ত। রেক্সে আড্ডা চলত রাত দশটা সাড়ে দশটা পর্যন্ত, এরপর রাত একটা হয়ে যেত আরজুতে। আরজু থেকে বুড়োভাই, জিনু মানে মাহবুবুল আলম, বিপ্লব মানে বিপ্লব দাশ, রণজিৎ, আমি চলে যেতাম নবাবপুর ধরে পুরোনো শহরের দিকে। হ্যাঁ, আমাদের সঙ্গে থাকতেন খালেদ চৌধুরী, কিংবা বলা যায় আমরাই থাকতাম তাঁর সঙ্গে। তিনি একাই কথা বলতেন। একটুখানি ভেতরে একটা পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আরও ঘণ্টাখানেক তাঁর তৎসম শব্দ-খচিত বাক্যবাণে বিদ্ধ করতেন চাণক্য প্রস্তাবিত রাজ্য পরিচালনা নীতি কিংবা মধ্যযুগে স্লাভদের সামাজিক বিবর্তনকে। ঘরে পৌঁছতে রাত্রি আড়াইটে তিনটে তো হতই। রেক্স আর আরজুতে আড্ডার প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিল শহীদ। শহীদ কাদরী এখনও আমার প্রিয় কবি, যদিও রোগা তিনটে বই ছাপা হওয়ার পর ও ওই যে দেশ ছাড়ল এরপর ওর সঙ্গে যোগাযোগ তো দূরের কথা, কোন দেশে কীভাবে আছে কিছুই জানি না। যে-কোনো কিছু পড়ে শহীদ তাই নিয়ে বলতে পারত খুব গুছিয়ে, নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা ছিল ওর অসাধারণ। কবিতা সম্বন্ধে খুব সিরিয়াস কথাও হালকা ভঙ্গিতে বলতে পারত, তাতে ব্যাপারটা হত আকর্ষণীয় কিন্তু বিষয়ের গুরুত্ব এতটুকু কমত না। কোনো আপাত গম্ভীর বিষয়কে ফালতু করে দেখাতে ওর জুড়ি আমি এখনও পর্যন্ত পাইনি। মানুষকে ঠাট্টা করা ওর স্বভাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ফলে অনেকেই খুব ভুল বুঝত। কিন্তু শুধু ফান করা ছাড়া এইসব ঠাট্টা ঠিক কাউকে আঘাত করার জন্যে ও করত না।

প্র : ওই ম্যারাথন আড্ডাগুলো আপনার জন্য নিশ্চয়ই খুব helpful হয়েছিল?
: সে তো বটেই। তবে সাহিত্য করে না, শিল্পে-টিল্পে একটু আধটু আগ্রহ ছিল কিংবা একেবারেই নেইএমন বন্ধু প্রচুর। গ্যান্ডারিয়ায় ইসমাইলভাইয়ের আড্ডা লা-জওয়াব। কলকাতার উর্দুভাষী, লেখাপড়া জানেন না বললেই চলে, উর্দুতে এবং উর্দু ইনটোনেশনে বাংলায় গল্প করতে ওস্তাদ পুরুষ। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি ছিল প্রশ্নোত্তরের সাহায্যে কাহিনি পরিবেশন। গল্প করতে করতে হঠাৎ হয়তো জিগ্যেস করলেন, 'আভি বোলো, রুপিয়া দওলত বড়া আওর কিয়া আপনা লড়কা বড়া?' এই প্রশ্নের জবাবের ওপর কাহিনির পরবর্তী বিস্তার নির্ভর করছে, কিন্তু তিনি প্রশ্ন করেই যাবেন করেই যাবেন, জবাব দিতে গেলেই চটে যাবে, 'আঃ। আপ বহত বাখোয়াজি কর রাহা।' মানে জবাবটা দেওয়ার অধিকার কেবল তাঁরই আছে। ওই আড্ডাতেই ছিলেন নিতাইবাবু, গ্যান্ডারিয়ার বনেদি বাড়ির ছেলে, সকাল থেকে রাত কেবল খাওয়ার সময়টটা বাদ দিয়ে খালি আড্ডা, খালি আড্ডা। ফিরোজের বাড়িতে আড্ডা বসত, কিন্তু কথা সবচেয়ে কম বলত ফিরোজই। ফিরোজের ভাই, সিরাজভাই ইতিহাস, বিশেষ করে পুরাতত্ত্ব নিয়ে একেবারে গল্পের মতো কথা বলেন, কথা বলার সময় একাই মাত করে রাখতে পারেন। ফিরোজের সঙ্গে আবার একাই কথা বলে সিরাজভাইয়ের এই প্রতিপত্তির শোধ নিতাম আমি। তখন গল্প লেখার ভাবনা এলেই ফিরোজ, কায়েস আর মজহারকে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতাম।

প্র : আচ্ছা, এবার বলুন, আপনার লেখার ব্যাপারটা শুরু হল কখন থেকে?
: সে তো একেবারে ছেলেবেলা থেকেই। যখন শব্দ লিখতে শিখি বলতে গেলে তখন থেকেই কবিতা লিখেছি। পাকিস্তান, ইসলাম, হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্ব, সিরাজুদ্দৌলা, বুড়িগঙ্গা নদী, করতোয়া নদীহেন বিষয় নেই যা নিয়ে আমার দু-চারটে লাইন না লেখা হয়েছে। তবে প্রথম আস্ত একটা গল্প লিখি ৮ বছর বয়সে, গল্পের নাম দিয়েছিলাম "খালেক ও তাহার মাতা"। মহা বিয়োগান্তক কাহিনি।

প্র : প্রথমদিকের লেখা কি ছাপা হয়েছে?
: ক্লাস টেনে উঠে একটা গল্প লিখি, নাম 'বংশধর'। ছাপা হয়েছিলো 'সওগাত' পত্রিকায়। মেলা জটিল কাহিনি, বাঙালি খ্রিস্টান তরুণ-তরুণীকে নিয়ে লেখা, কিন্তু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জীবনযাপন সেখানে নেই। ছেলেটি নদীতে (না পুকুরে?) ডুবে মারা গেলে মেয়েটি ভাবে যে তার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েই ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু ওই মেয়ে না জানলেও লেখক জানত যে, আসলে এমনিতেই সাঁতার না জানার কারণেই ওর সলিল সমাধি হয়েছে। সেই সময় জেমস জয়েসের 'পোট্রেট অব দি আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং ম্যান' পড়ে খুব অভিভূত হই, আমার ওই গল্পে তার অনুচিত প্রভাব ছিল। এই কারণে গল্পটা কোনো বইয়ে দিইনি। 'ইউলিসিস' পড়ে খুব ভালো লেগেছিল, কিন্তু প্রথম উপন্যাসের মতো মুগ্ধ হইনি। পরে আমার বন্ধু মুশাররফ রসুলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় 'ফিনেগান্স ওয়েক' পড়ার চেষ্টা করি, এটুকু বুঝতে পারি যে স্ট্রিম অফ কনশাসনেস দিয়ে কেবল একজন ব্যক্তির দুঃখ আর নিঃসঙ্গতা আর বেদনা আর গ্লানি ধরার চেষ্টা করা জয়েসের লক্ষ্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়কে বিশাল কালের প্রেক্ষিতে এবং একটা জাতির স্বস্খলন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সুপ্তি ও জাগরণকে মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে অনুভব করার সশ্রম প্রচেষ্টা সাধনা সেখানে প্রধান কাজ। জয়েসের সম্বন্ধে মুগ্ধতা তখন কেটে যায়, মুগ্ধতা আর ভক্তি দিয়ে লেখককে চেনা যায় না। তিনি যখন প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন এবং তাঁকেও যখন প্রশ্ন করতে উশখুশ করব তখন সেই লেখককে যাচাই করে দেখতে চাই তখন সেই লেখককে চেনা সম্ভব। মুগ্ধতা কেটে গেলে তাঁকে অনুকরণের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করা যায়।

প্র : রবীন্দ্রনাথ কি প্রথম থেকে আপনার সঙ্গে আছেন?
: রবীন্দ্রনাথ কার সঙ্গে নেই? রবীন্দ্রনাথকে অ্যাভয়েড করা কোনো বাঙালির পক্ষে ইম্পসিবল। দরকারই বা কি? আমাদের সংস্কৃতি এবং দেশের সামগ্রিক চিন্তাভাবনার গঠনে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত শক্তিশালী উপাদান। কিন্তু আমার লেখায় রবীন্দ্রনাথের আলাদা করে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে রবীন্দ্রনাথ বহুদিন থেকেই আমার প্রিয় কবি তো বটেই। আর রবীন্দ্রনাথের যে বইটা আমি যখন-তখন পড়তে পারি তা হল 'ছিন্নপত্র'। আর একজনের কবিতা আমি যে কোনো সময় পড়তে পারি, তিনি হলেন সুকুমার রায়। একেবারে ছেলেবেলা থেকেই আমি সুকুমার রায় পড়ে আসছি। আমার ৮ বছর বয়সের জন্মদিনে আমার বাবা আমাকে 'আবোল তাবোল' দিয়েছিলেন, ওইদিনেই আমার ভাই শহীদুজ্জমানকে দেন 'খাই খাই'। এই দুটো বই-ই আমার দারুণ ভালো লাগে, দু-তিন বছরের মধ্যেই তাঁর আর বইগুলো পেয়ে যাই। ওই তখন থেকে সুকুমার রায় আমার একবারের জন্যেও ক্লান্তিকর মনে হয়নি। গত চল্লিশ বছর ধরে সুকুমার রায় আমাকে সমানভাবে নাড়া দিয়ে আসছেন। এই কবি কখনো মুগ্ধ করেন না, হাসতে হাসতে সচেতন করে তোলেন। এঁর প্রতি ভক্তিতে গদগদ হওয়ার চান্স তিনি নিজেই দেন না। এই স্যাঁতসেঁতে তরল আবেগতাড়িত জাতের ভেতর তিনি জন্মালেন কী করে? আর একজনের গল্প প্রায় রোজই পড়ি, অন্তত গত কয়েক বছর ধরে রোজই পড়ি, তিনি হলেন শিবরাম চক্রবর্তী। তবে শোনো, সুকুমার রায় আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়বাঙালির ভেতর এই দু-জনই কিন্তু কাকের বাসায় কোকিলের ডিম থেকে বেরিয়েছে।

প্র : আপনি তো কবিতাও লিখতেন। কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন কেন?
: ছাড়ব কেন? কবিতা তো এখনও লিখি। ছাপার মতো হয় না, তবু লিখি। বলতে পারো ডায়েরির মতো লিখি। ভাইয়ের বাচ্চাদের, বন্ধুদের বাচ্চাদের জন্মদিনে তাদের জন্যে ছড়া লিখে খুব ভালো লাগে।

প্র : আপনার ছড়ার নমুনা অবশ্য 'চিলেকোঠার সেপাই'তে বেশ আছে। ওই যে ওসমানের পাগল হবার পর বন্ধ কপাট, ওই ছড়াটা চমৎকার। সুন্দর কিছু উপমাও আছে। আপনার প্রথম বইয়ের রেসপন্স কেমন পেয়েছিলেন?
: খুব ভালো। নন্দলাল দত্ত লেনে আমার এক বন্ধু ছিল, আমার পুরোনো বন্ধু ইকবালের থু-তে আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, পরে আমারও খুব বন্ধু হয়ে যায়। ওর নাম কামরুদ্দিন ইলিয়াস বলে আমাকে মিতাভাই বলে ডাকত। সকালে সন্ধ্যায় তন্দুরিতে রুটি বাকেরখানি বানাত, পনির-দেওয়া বাকেরখানিতে ও ছিল লা-জওয়াব। রাত্রে ও বসত বাংলা মদের বোতল নিয়ে। বেশি পড়াশোনা জানত না, অনেক কষ্টে আমার গল্পগুলো পড়ে মহা খুশি। একটু লেখাপড়া জানা লোক পেলেই বইটা তাদের পড়তে দিত। আমার বই পড়ে ওর কোনো খদ্দের একটু তারিফ করলে তার কাছ থেকে বাকেরখানির দাম নিত না। কিছুদিনের মধ্যেই কামরুদ্দিন মারা গেল, নইলে আমার বইয়ের কল্যাণে বেচারা ফতুর হয়ে যেত। সূত্রাপুরের একজন বনেদি মস্তান ছিলেন, এই আজকালকার মতো ছ্যাঁচড়া হাইজ্যাকার নয়, একেবারে পাকা গুন্ডা, তখন অবশ্য রিটায়ার করেছে, ঘটনাচক্রে তার নামও ডামলালু, কার কাছে শোনে যে তাকে নিয়ে আমি বই লিখেছি। 'ফেরারি' গল্পে ওই নামে একটি মস্তান চরিত্র আছে। আমার বইটা জোগাড় করে কাউকে দিয়ে পড়িয়ে সে মহা উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং ফিরোজের দোকানে আমার খোঁজে বেশ কয়েকবার আসেও। কলকাতা থেকে আমার বন্ধু দিলীপ লম্বা চিঠি লেখে বইটা পড়ে, ওর চিঠি অবশ্য আমার লেখার তুলনায় অনেক বেশি সাহিত্য গুণসম্পন্ন। তবে কলকাতার রাইটারদের মধ্যে বইটা প্রচারের চেষ্টা করে দিলীপ ব্যর্থ হয়। আমার আরেক বন্ধু, মুশফিক, ফিজিক্স পড়ায় রাজশাহিতে, খুব পণ্ডিত লোক, বাংলা ভালো লিখতে পারে না বলে তার অপূর্ব ইংরেজিতে ওই বইটার একটি আলোচনা লেখে। কিন্তু দারুণ অগোছালো ছেলে। সমালোচনা লিখেছে ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো কাগজে, এমনকী সিগ্রেটের ছেঁড়া প্যাকেটও ছিলতাই ওর লেখাটা আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।

প্র : লেখকদের মধ্যে কেমন সাড়া তুলেছিল?
: তখন সৈয়দ শামসুল হক আমাদের প্রধান লেখকদের একজন। তিনি টিভিতে নিয়মিত একটি প্রোগ্রাম করতেন। সেখানে আমার বইটার খুব প্রশংসা করেছিলেন। প্রোগ্রামটা আমি মিস করেছি, তবে যারা দেখেছে তারা বলেছে যে, তিনি শ্রোতাদের বলেছিলেন যে লেখক একেবারে অপরিচিত হলেও এই বইটা কিনে পড়া উচিত। শ্রোতারা তাঁর বক্তব্য বিশ্বাস করেছিলেন কি না জানি না, তবে তাঁর অনুরোধে সাড়া দেননি। হাসান আজিজুল হক পর্যন্ত রাজশাহির একটি স্বল্পায়ু লিটল ম্যাগাজিন 'বৃত্তায়ন'-এ বইটার একটি দীর্ঘ সমালোচনা লেখেন, 'আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিষবৃক্ষ'। পরে হাসানভাইয়ের বিখ্যাত বই, 'কথাসাহিত্যের কথকতা'য় লেখাটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গল্প লেখক আবুল হাসানাৎ সমালোচনা করেন 'সমকাল' পত্রিকায়। সুকান্ত চট্টোপাধা্যয় এবং মাজহারুল ইসলাম সমালোচনা লেখেন 'সংবাদ' ও 'দৈনিক বাংলা'য়। দু-জনেই গল্প লেখায় দারুণ সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন। সুকান্ত কলকাতা চলে যাওয়ার পর যদ্দুর মনে হয় লেখা ছেড়ে দিয়েছে, আর লেখা ছাড়ার জন্যে মাজহারকে কষ্ট করে কলকাতা যেতে হয়নি, তার খুঁতখুঁতে স্বভাব এবং আলস্যই তাকে সাহিত্যচর্চা থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট। মাহবুবুল আলম সমালোচনা লিখেছিল 'গণসাহিত্য' পত্রিকায়। আল মাহমুদ তাঁর গল্পগ্রন্থ 'পানকৌড়ির রক্ত' উৎসর্গ করেন মাহমুদুল হক ও আমাকে, তা মাহমুদুল হকের সঙ্গে আমার নামটাও তিনি হয়তো যোগ করেছিলেন আমার এই বই পড়েই। এই বইটার জন্যে বাংলাদেশ লেখক শিবির ১৯৭৬ সালে আমাকে 'হুমায়ুন কবির সাহিত্য পুরস্কার' প্রদান করে।

গল্পের উৎস, লেখার প্রক্রিয়া

প্র : এবার অন্য আলাপে আসি। গল্প যে লেখেন, গল্প লিখতে আপনাকে ইনস্পায়ার করে কি কোনো বিশেষ ক্যারেকটার? ইমেজ, না থিম?
: এভাবে তো বলা মুশকিল। একজন লোকের সঙ্গে পরিচয় হল, লোকটি আমাকে অ্যাট্র্যাক্ট করল আর তাকে নিয়ে গল্প লিখলামনা, এরকম আমার লাইফে কখনো হয়নি। ঠিক যাকে বলে চরিত্র সৃষ্টি তা কখনোই আমার উদ্দেশ্য নয়। নেভার। চেনাজানা লোকজন তো গল্পে আসবেই, আমার লেখাতেও নিশ্চয়ই এসেছে। তবে তা পরোক্ষভাবে এবং অনেক পরিবর্তিত হয়ে। এমন তো হয়ই যে, কারো কোনো সংকট কি ক্রাইসস কি বৈশিষ্ট্য করোটিতে খামচাতে শুরু করলে গল্পের একটা শেপ তৈরি হয়। কিন্তু গল্পে, আই মিন গল্প লিখতে লিখতে আমি যখন লোকটাকে দেখি তখন সে একেবারে আমারই প্রোডাক্ট এবং লেখাটা হয়ে গেলে দেখি যে, একে আমি আগে কখনো চিনতাম না। গল্পের থিম তো থাকেই, আইডিয়া থাকে। কিন্তু যত স্কিম করাই থাক না, আমি বেশ স্কিম করেই লিখি, কিন্তু গল্পটা যে শেষ পর্যন্ত আমার পরিকল্পনা অনুসারে চলবে তা কখনো বলা যায় না। আর গল্পের ক্যারেকটারস আর মোস্টলি আনপ্রেডিক্টেবল। চরিত্র সম্বন্ধে ধারণা নিয়ে কিংবা মনে মনে চরিত্র তৈরি করে নিয়েই তো লিখতে শুরু করি। কিন্তু লিখতে লিখতেও চরিত্রদের নতুন নতুন পরিচয় একটু একটু করে উদ্‌ঘাটিত হয়। লিখতে লিখতেও তাদের চিনতে পারি। 'চিলেকোঠার সেপাই' লেখার সময় এই ব্যাপারটা হাসান আজিজুল হককে জানিয়েছিলাম। তো হাসানভাই খুব মজা করে লিখেছিলেন, হ্যাঁ, লিখতে লিখতে দেখা যায় চরিত্ররা খুব বাহাদুর হয়ে উঠছে, তখন এদের সামলানো দায়।

প্র : আপনি কি খুব সময় নিয়ে লেখেন? না কি একটানা লিখে একটা গল্প শেষ করেন?
: নারে ভাই, মেলা সময় নিই। আই অ্যাম অলওয়েজ স্লো বাট নেভার স্টেডি। এক 'তারাবিবির মরদপোলা' গল্পটাই একটানা দু-দিনে শেষ করেছি। তাছাড়া সব গল্প লিখতেই আমার অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ে। ফুলস্কেপ কাগজে লিখলে প্রথম পৃষ্ঠাটাই কয়েকবার লিখি। কাটি আর লিখি। এটা জাহির করার মতো কোনো কৃতিত্বের কথা নয়, কনফিডেন্সের অভাব। এমন হয় যে, ধরো অনেক চেষ্টা-টেস্টা করে নয় পৃষ্ঠা পর্যন্ত লিখলাম। টেন পেজে গিয়ে মনে হল, নাঃ কিচ্ছু হচ্ছে না। তখন ফের শুরু। ফের টেনথ্ পেজে এসে দেখলাম, নাঃ তেমন বড়ো কোনো পরিবর্তন তো হল না, এজন্য শুরু থেকে না লিখলেও তো চলত। তবে লাভখানিকটা হয় বই কী। দ্বিতীয়বার লিখতে লিখতে পরের অংশটা স্পষ্ট হতে থাকে। আর লেখা আমি মেলা বদলাই। অন্তত তিন বারের কম কোনো গল্প এপর্যন্ত লিখিনি। আর একটা মুশকিল আছে। একেবারে ফ্রেশ করার পর যদি ফের পড়ি তো আর একবার পালটাবার দরকার হয়। তাই ছাপতে দেওয়ার ঠিক আগে যে-কপিটা তৈরি করি সেটা আর পড়ি না, পাছে আর একবার সংশোধন করার বাই ওঠে।

সাহিত্যে ঔচিত্য বোধ, নীতিবোধ, আদর্শ

প্র : এবার একটি ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আমার একটা ধারণা অনেক লেখকই, যাদের আমরা প্রগতিশীল বলি, তারা একধরনের ঔচিত্যবোধ দ্বারা তাড়িত। লেখবার সময় তাদের মনে যেন কাজ করে মানুষকে positively দেখাতে হবে, গণমানুষের বিজয়কে emphasis দিতে হবে বা শেষে একটি আশাবাদ থাকা উচিতএসব। আপনাকে এসব ঔচিত্যবোধ মুক্ত মনে হয়। মানুষকে আপনি তার সবরকম contradiction, confusion, বিকার, যাবতীয় বৈপরীত্য সহই উপস্থিত করেন। তথাকথিত প্রগতিশীলতার নীতিবোধ আপনাকে খুব একটা তাড়িত করে না। এটাকেই আমি আপনার লেখার শক্তি মনে করি। এ-ব্যাপারটাই আমাকে attract করে বেশি।
: কেবল সাহিত্য নয় এমনিতে সব ব্যাপারেই, শুধু সাহিত্য না, যাকে বলে নীতিবোধ, তাতে আমার কোনো আস্থা নেই। নীতিবোধের যে-ব্যাপার সেটা আমার মনে হয় ব্রাহ্ম সমাজের টাইপের, সেটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। আমি ধরো ন্যায়বোধ বা সত্য যেটা, সেটাকে একদম matter of fact দেখতে চাই। আমি যদি বলি সাধারণ মানুষের ভালোভাবে বাঁচা এটা কিন্তু কোনো নীতিবোধ থেকে বলি না, এটা হচ্ছে absolutly কাণ্ডজ্ঞান থেকে। এটা খুব common sense আমি যে ভাতটা খাচ্ছি, সেটা যে উৎপাদন করছে, সে এর দামটা পাচ্ছে না, এতে আমি guilty feel করছি, এটা কোনো নীতিবোধের ব্যাপার কিন্তু না। হ্যাঁ, কমিউনিস্টদের মধ্যে একধরনের লোক আছে যারা নীতিবাগীশ। কিন্তু নীতিবাগীশ ব্যাপারটা মনে করি Marxism-এর সঙ্গে খাপ খায় না। বুর্জোয়া সমাজ কিন্তু এই নীতিবোধ দিয়েই শোষণের কাজটা চালিয়েছে।

প্র : কিন্তু Communist Morality বলেও তো এটা কথা আছে?
: Communsit Morality বলে যে কথাটা আছে সেটা সম্পূর্ণ anti-Marxist। আমার মনে হয় না এমন কিছু থাকতে পারে। ধরো প্রলেতারিয়েতদের যে morality এটা কিন্তু একেক society-তে একেক রকম। একটা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের কোনো প্রলেতারিয়েতের কাছে তুমি উঁচু মানসম্পন্ন মানসিকতা আশা করতে পারো না। একটা বুর্জোয়া state-এর শ্রমিক যদি কমিউনিস্ট হয় তাহলে সে শুধু শোষিত শ্রমিক এবং কমিউনিস্ট বলে মহা সাধু হবে এটা আশা করতে পারো না। কারণ সে তো এ সমাজেরই product, সুতরাং কমিউনিস্টদের জন্য আলাদা কোনো নৈতিকতা থাকতে পারে আমি তা মনে করি না। কমিউনিস্টদের যেটা আছে সেটা হচ্ছে তাদের definite social commitment। তাদের programme আছে। definite philosophy আছে। কিন্তু philosophy আর morality তো এক ব্যাপার নয়। অনেক কমিউনিস্ট লেখক আছে মানুষের যৌনজীবনকে দেখাতে চায় না, কৃষককে মহান সংগ্রামী হিসাবে দেখাতে চায়। কেন, তার ভেতর কি ফাঁকিবাজির ভাঁওতা থাকতে পারে না? এগুলোকে avoid করা এক ধরনের শুচিবায়ুতা।

প্র : সে-কথাই বলছিলাম, তাদের ভয় মানুষকে positively না দেখিয়ে তার নেতির ব্যাপারগুলো আনলে লেখাটা হয়তো reactionary হয়ে যাবে।
: আমি মনে করি মানুষের বাঁচা basically positive, মানুষ যে হাজার কষ্টের পরও বেঁচে আছে এটাই positive। তাকে আলাদাভাবে positive করে তোলার চেষ্টা করার কোনো মানে নেই।

প্র : ব্যাপারটা আর একটু clear করেন। আপনি বলছেন বেঁচে থাকাটই positive, আমি যদি অন্যভাবে বলি, বেঁচে আছে কারণ আর কোনো alternative নেই। তারই alternative হচ্ছে suicide করা।
: শত কষ্টের পরও বেঁচে থাকা, মরে যাওয়ার চেয়ে ভালো এবং মানুষ তাই করে। মানুষ তার ভালো তার মন্দ সব নিয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে, সেটাই তার স্বাভাবিক প্রবণতা, মরে যাওয়াটা নয়। আর suicideশোপেনহাওয়ারে এধরনের কথা আছে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, যে-লোকটা suicide করে না, সে নিশ্চয়ই life থেকে কোনো-না-কোনো একটা inspiration পাচ্ছে। সেই inspiration-এর মধ্যে সবই যে ভালো ব্যাপার আছে তা তো না, সেখানে অসাধুতা আছে, বিকার আছে। এ থেকে শুধু তার ভালোগুলিই positive আর খারাপগুলো negative এটা তো ঠিক না, সব নিয়ে তার বাঁচার ইচ্ছাটাই positive। আর suicide যে করে, সাত্র বলেছেন এটা কিন্তু not a matter of decision। এটা তার নিয়তি। সে-লোকটা দীর্ঘদিন ধরে ক্রমশ suicide-এর দিকেই এগোয়। তার স্বভাবের মধ্যেই এ প্রবণতা থাকে। এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা নয়। তার expectation আসলে আরও বেশি, কিন্তু এই expectation-এর সঙ্গে inspiration, intution এক সঙ্গে চলতে পারে না। তখন suicide-এর দিকে এগোয়।

প্র : আপনার এ-কথায় একটা line মনে পড়ে গেল, একজন suicide করার আগে একটা note রেখে গিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল "My suicide is inevitable like tomorrow's sunrise"। যাক আমরা আগের প্রসঙ্গে আসি। কমিউনিস্ট নৈতিকতা নিয়ে আলাপ করছিলাম।
: আত্মহত্যার ব্যাপারটা ঠিক এরকমই। তো যাই হোক, নীতিবোধের যে কথা হচ্ছিল। এখন সাম্যবাদ তো আমার কাছে একটা কাণ্ডজ্ঞানের, একটা common sense-এর ব্যাপার বলে মনে হয়, এতে নীতিবোধের কি আছে? এটা একটা common sense, এই common sense-কেই আমি commitment-এ নিয়ে আসতে বাধ্য। পৃথিবীর যে সম্পদ, যে সুযোগ-সুবিধা আছে এটা সবাই সমানভাবে ভোগ করবে, এর পাল্টা যুক্তি কী থাকতে পারে?

প্র : যারা এর বিরোধিতা করে তাদের কথা হচ্ছে, মানুষের মেধা, যোগ্যতা সমান নয়, সমান হবারও নয়, মানুষের nature-এর মধ্যেই রয়েছে প্রতিযোগিতার প্রবণতা, অসাধুতা, crime, এগুলো কোনো system দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব না।
: এ-ব্যাপারটা আমি ঠিক মানতে পারি না, সত্যি কথা বলছি আমার বিশ্বাস from my deep inside বলে যে, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে আমার মনে হয়েছে সীমাহীন সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষকে সুযোগ দিলে সে অসাধারণ কিছু করার ক্ষমতা রাখে। এটা কোনো নীতির কথা না।

প্র : মানুষের উপর অগাধ বিশ্বাস রাখছেন, রবীন্দ্রনাথের মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপের মতো?
: না, বিশ্বাস হারানো পাপ তবুও বলি না, তাহলে তো হিটলারকেও বিশ্বাস করতে হয়। ইয়াহিয়া খান, গোলাম আজম এদের ওপর আস্থা রাখব কেন?

প্র : তাহলে অবিশ্বাসও করেন?
: অবিশ্বাস করি মানে, মানুষকে আমি খারাপ বলি কিন্তু সে মানুষটার পিছনে আমি system-কে দেখি, আমি বলি একটা system মানুষকে ওই পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্র : তাহলে যারা বলেন, কোনো system-এর পক্ষে মানুষের nature-এর মধ্যে যে black ব্যাপারগুলো রয়েছে তা totally change করা সম্ভব নয়। তাদের কী বলবেন?
: হ্যাঁ, human nature-এর যে কালো অংশগুলো একটা system-এ ফেলে দিলেই সেগুলো মুছে যাবে কি না, সেটা অবশ্যই একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমি মনে করি ওই balck ব্যাপারগুলোও শত শত বছর ধরে কতগুলো system-এর মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে grow করেছে। কিন্তু এটা যে মানুষের একটা খারাপ দিক সেটা তো আমরা মানুষেরাই বুঝতে পারছি। আমি যে ঘুষ খাব না এটা তো কোনো নীতিবাগীশতার ব্যাপার না। এটা আমার শিক্ষা, আমার জানার মধ্য দিয়ে যে রুচি তৈরি হয়েছে, সে রুচিতে বাধবে। এখন আমরা যারা এটাকে খারাপ বলে জানছি তারা যদি মানুষকে এ থেকে মুক্ত করতে ইচ্ছাপোষণ করি, তাহলে ভুলটা কোথায়? সেটা কোন system-এ হবে তা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু মানুষ তার যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পাক, আমার কাণ্ডজ্ঞান থেকেই আমি তা প্রত্যাশা করি।

প্র : আপনি কাণ্ডজ্ঞানের উপর জোর দিচ্ছেন, আপনার এই কাণ্ডজ্ঞান কি কোনো নির্দিষ্ট philosophy দিয়ে guided না? এটাকে কি মার্কসীয় কাণ্ডজ্ঞান বলা যাবে?
: ব্যাপার হচ্ছে, আমি নির্দিষ্ট কোনো philosophy মাথায় রেখে reality দেখি না। reality-কে আমি ভেতর থেকে দেখতে চাই। কিন্তু আমি তো journalist না। reality মানে যা দেখতে পাচ্ছি কেবল তাই নয়। এর ভেতরকার স্বপ্ন, সাধ, সংকল্প, সংস্কার, কুসংস্কার সবই reality-র ভেতরকার reality। এভাবে দেখলে বোঝা যায় যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজেই মানুষের ন্যূনতম বিকাশের একটা সুযোগ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু তার মানে ওই সমাজই সর্বরোগের মহৌষধ এমন ভাবার তো কোনো কারণ নেই। আজকে socialist world-এর ভাঙন দেখে কেউ খুব উৎফুল্ল, কারো মন খারাপ, দুটোই হাস্যকর। একটা society গড়তে গিয়ে হাজারও রকম গোলমাল তো থাকতেই পারে, প্রয়োগে অনেক ত্রুটি থাকতে পারে। তাতে সবকিছু মিথ্যা হয়ে গেল।

প্র : Socialist world-এর ভাঙন প্রসঙ্গে আমরা পরে আসব। এখানে একটা প্রশ্ন হতে পারে, আপনি মানুষের জন্য সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রত্যাশা করছেন। তাহলে socialist realism বা marxist aesthetics আপনার কাছে দাবি করবে আপনি আপনার লেখায়, জগৎ যে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন এবং বাস্তবতায় যে সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনার উপাদান রয়েছে সেটা আপনি দেখান। কিন্তু আপনার লেখায় কি তার ইঙ্গিত আছে, আপনার গল্পের যে বাস্তবতা, যে চরিত্র, এদের মধ্যে থেকে কি ওই সম্ভাবনা আবিষ্কার করা সম্ভব?
: এ-প্রশ্নের উত্তরে আগের কথাটাই আবার বলব, আমি reality-র ভেতরটা দেখতে চাই। আমি আমার কোনো idea এর উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। সেটা হবে wishful thinking, আর wishful thinking is a thing I am the last person to go with. এতকাল আমাদের কমিউনিস্ট writer-রা এই wishful thinking-ই করে এসেছে। তারা শ্রমিককে মহৎ মানুষ হিসেবে দেখিয়েছে। তার মানে যে আসল শ্রমিককে disown করল, refuse করল। মনগড়া একজন শ্রমিক তৈরি করল। কমিউনিস্ট লেখকরা জোতদারের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়, তিনি তো আগুন লাগিয়েই খালাস, তার গল্প তো শেষ। তারপর ওই লোকগুলোর কী হল, যারা আগুন লাগাল? জোতদারের বাড়িতে আগুন লাগানো কি চাট্টিখানি কথা? এটা হচ্ছে reality-কে betray করা। চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। আমি একটা ইচ্ছাকে বাস্তবতার উপর চাপিয়ে দিতে পারি না। বাস্তবতায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্ভাবনা দেখানোর জন্য প্রথম এবং শেষ যেটা দরকার সেটা হল বাস্তবে যথার্থ কোনো সমাজতান্ত্রিক পার্টির সক্রিয় কার্যকলাপ এবং মানুষের মধ্যে সমাজতন্ত্র চেতনার চর্চা। সেটা না থাকলে আমি জোর করে কীভাবে তা দেখাব। আমার ধারণা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংকটটায় পড়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা তিনি দেখতে পেয়েছিলেন সমাজের মধ্যে।

প্র : আপনার 'উপন্যাসে সমাজবাস্তবতা' প্রবন্ধে এ-নিয়ে আলাপ আছে।
: হ্যাঁ, এটা কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পর্যায়ের লেখার চেয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের লেখার আবেদন কম। এর কারণটা আমি মনে করি প্রথমে তিনি যা লিখেছেন society-তে exist করেছে, সমাজের প্রতি তার যে অসন্তোষ সেটার একটা ground আছে। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি যা দিয়ে inspired হতে চান সেজন্য political situation দরকার that was missing, কিন্তু যেহেতু তিনি একজন খুব বড়ো লোক তার পক্ষে কিছু আরোপ করা সম্ভব না। তিনি যা তীব্রভাবে চাইছেন সমাজে তার কোনো সম্ভাবনাও নেই। ফলে লেখাগুলো দাঁড়াচ্ছে না। কথা হচ্ছে একজন মানুষ যদি ক্রমাগত মানুষের ভেতর বোনা নানা dimension থেকে দেখতে থাকে, দেখতে দেখতে সে ফেডআপ হতে বাধ্য। তখন তার একটা নিরাময় তো দরকার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মার্কসবাদকে নিরাময় হিসাবে গ্রহণ করলেন। সেটা খুবই সঠিক ও স্বাভাবিক। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মার্কসিস্ট হয়েই ক্ষান্ত হলেন না তিনি সেই society-র জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন। কিন্তু ওই society-র প্রধান শর্ত হল একটি কমিউনিস্ট পার্টি এবং society-তে সেটা তো তখন ছিল না।

প্র : কমিউনিস্ট পার্টি তো ছিল?
উ : কিন্তু সে-পার্টির influence, people-এর উপর কি কংগ্রেসের চেয়ে বেশি ছিল, মুসলিম লিগের চেয়ে বেশি ছিল?

প্র : তাহলে কি বলব মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় people-এর pulse ধরতে পারেননি?
: না, তানা। ব্যাপার হচ্ছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় people-এর pulse-টা ধরতে গিয়ে দেখছেন তিনি যে pulse-টা চাইছেন সেটা পাচ্ছেন না। কিন্তু সেই pulse-টা তার খুব দরকার। যেমন ধরো, একজন ডাক্তার তার রোগীকে যে প্রাণপণে বাঁচাতে চাইছে কিন্তু পারছে না, তখন সে নানা জায়গায় pulse হাতড়ে বেড়াচ্ছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষের লেখাগুলো এই হাতড়ে বেড়ানো। কিন্তু সেগুলো মোটেও wishful thinking নয়। Unlike most of the communist writers কোথাও wishful thinking নেই। তিনি মানুষের মধ্যে ব্যাকুল হয়ে প্রাণ খুঁজেেেছন। সেই প্রাণটা organised।

প্র : 'পুতুল নাচের ইতিকথা' মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ নির্বিকার চোখে লেখা। কিন্তু পরের দিকে তিনি আর তা ছিলেন না। এই নির্বিকার দৃষ্টিকে তখনও অনেকেই reactionary বলেছেন এখনও নিশ্চয়ই বলবেন। কিন্তু আমি বলতে চাইছিলাম সাহিত্যিকের political commitment-এর যদি লাগাম না থাকে তবে সেটা তার জন্য fatal হতে পারে?
: হ্যাঁ, খুবই fatal হতে পারে। এ-ব্যাপারটা শুধু সাহিত্যিকের বেলায় নয়, আমার কিন্তু মনে হয়, একজন খাঁটি politician-কেও অনেকটা নির্বিকার হওয়া দরকার।

প্র : কী রকম?
: যে লোকটা পাকিস্তান politics করেছে বা যে বাংলাদেশ আন্দোলন করেছে, বাংলাদেশ হলেই যার goal achieve হয়ে যায়, যার দৌড় ইলেকশন পর্যন্ত তার জন্য নির্বিকার হওয়ার দরকার নেই, হলে চলবেও না। কিন্তু যে একজন যথার্থ কমিউনিস্ট যে মানুষের আমূল পরিবর্তন চায় তাকে নির্বিকার হতে হবে।অনেক দিক থেকে total-টা দেখতে হবে। আমাদের অধিকাংশ কমিউনিস্টের কাছে যেমন কৃষক একজন স্রেফ গরিব মানুষ, আর কিছুই না, nothing but a poor man। কিন্তু ওই কৃষককে পুরোটা জানা হবে যদি না তার পারিবারিক সংস্কৃতি, সংস্কার এমনকী তার যৌনজীবনের ধরনও সব না জানি। তাকে না জানলে তার জীবনযাপন পরিবর্তন করব কী করে। আমাদের কমিউনিস্টরা এগুলো avoid করতে চায়। রবীন্দ্রনাথের মতো অনেক লোক society-র যত change চেয়েছিলেন অনেক কমিউনিস্টও তা চায় না। রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন কারণ তার দেখার মধ্যে কোনো কিছুর সঙ্গে মাখামাখি ভাব ছিল না। রবীন্দ্রনাথ সেই 19th century-র শেষের দিকে লিখেছেন, 'আমাদের দেশের যেসব শিক্ষিত ছেলেরা লেখাপড়া শেষে গ্রামে ফিরে যায় তারা যেন দেখে আমাদের দেশে রোজ রোজ একেকটি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে ধর্মকে কেন্দ্র করে, বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে।' এসব খেয়াল করা উচিত। Society-তে, সংস্কৃতিতে এসবের একটা influence আছে। তুমি কি মনে করো না আটরশি-র একটি influence আছে। প্রতি সপ্তাহে ওখানে যে হাজার হাজার মানুষ যাচ্ছে তারা যত খচ্চর হোক, চোর হোক, তুমি কি মনে করো না ওদের একটা আলাদা culture গড়ে উঠছে? এমন শত শত আটরশি ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। Society-র খুব গভীরে এগুলোর কি প্রভাব নাই? কিন্তু এই প্রভাব শোষণের ভিত্তিকে শক্ত করে, এই প্রভাবের ভেতরটা দেখতে চাইলেই কিন্তু মানুষের স্বপ্ন, স্বপ্নের ব্যবহার, স্বপ্নকে ব্ল্যাকমেইল করা সব দেখা যায় বটেই, বৃহৎ অর্থে রাজনীতিকেও।

পুরোনো ঢাকার সংস্কৃতি

প্র : ঢাকার আদি বাসিন্দাদের কোন বৈশিষ্ট্যের কথা বিশেষভাবে বলা চলে?
: এরা হল এদেশের জেনুইন urban লোক। শহরের লোক বলতে এদেশের কাউকে যদি mean করো তো তারা হল এই ঢাকার আদি মানুষ। ওরা জানে না কবে গ্রাম থেকে এসেছে। Urbanisation নিয়ে ওরা কনশাস নয়। যা শহুরে বলে কখনো আলাদাভাবে ফিট করে না। শহর ব্যাপারটা ওদের স্বভাবের মধ্যে চলে এসেছে, আলাদা করে সতর্ক থাকতে হয় না। অনেক generation ধরে ওদের স্বভাবে কতগুলো ব্যাপার তৈরি হয়েছে। যেমন এদের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে পরচর্চার প্রবণতা অত্যন্ত কম। এরা ঝেড়ে গল্প করবে কিন্তু প্রায় nothing personal। আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রখর। এই গুণগুলি কিন্তু তুমি আমাদের middle class, যারা নানাভাবে টাকা-পয়সার জোরে শহরে এসে থাকছে এবং নিজেদের urban ভাবছে তাদের মধ্যে পাবে না।

প্র : আচ্ছা, ঢাকাইয়াদের এই urbanisation-এর সাথে বুর্জোয়া urbanisation-এর নিশ্চয়ই একটা পার্থক্য আছে, আবার ঢাকা তো pure feudal শহর হিসেবেও গড়ে উঠেনি?
: Exactly, ঢাকা শহরের culture-টা শুরু হয়েছে মোগলদের সময়। ঢাকা যখন রাজধানী হল তখন থেকে। কিন্তু মোগলদের যারা সম্ভ্রান্ত এবং উচ্চপদস্থ তারা কেউ এখানে permanently বসবাস করলেন না। যেমন বড়ো কাটরা যিনি বানালেন, শাহ সুজা, তিনি কখনো সেখানে থাকলেন না। কিংবা শায়েস্তা খান, যিনি লালবাগের কেল্লার মূল অংশটা বানালেন তিনি কিন্তু কখনোই লালবাগের কেল্লায় থাকলেন না। তিনি থাকতেন তাঁবুতে। তাঁবুতে থাকা মানে সব সময় একটা উড়ু উড়ু ভাব। ফলে তখনকার রাজধানী শহরে বসবাসের জন্য যারা ক্রমাগত থাকল, বংশানুক্রমে বাস করল, তারা হল মোগলদের সঙ্গে আসা নিম্নপদস্থ লোকজন, তাদের সৈন্য এরা; সেই সাথে এই নতুন পত্তন করা শহরে আশেপাশের গ্রাম থেকে আসা কিছু মানুষজন। শেষভাগের লোকেরা হল কুট্টি। পুরানো ঢাকার মানুষ মাত্রই কিন্তু কুট্টি না। আদি ঢাকায় দুটো ভাগ রয়েছে। সুখভাষ এবং কুট্টি। কুট্টি যারা ওই কুট্টিদের বংশধর আর সুখভাষ যারা মোগলদের সঙ্গে এসেছিল তাদের বংশধর বলে দাবি করে। সুখভাষরা নিজেদের কুট্টিদের চেয়ে মর্যাদাবান মনে করত। তো যেটা বলছিলাম, পুরানো ঢাকার culture গড়ে ওঠে সেই গ্রাম থেকে আসা এবং মোগলদের কর্মচারীদের একসঙ্গে বসবাস এবং তাদের নানাবিধ interaction-এর মধ্য দিয়ে। ঢাকাইয়া culture-টা তৈরি হয়েছে পুরোপুরি নিম্নবিত্তদের দিয়েই। এর ভেতর অভিজাত, সামন্ত, ব্যাপার সেরকম আছে কি না সন্দেহ। যেটা লাখনউতে আছে। লাখনউর সাথে পুরানো ঢাকার বোধহয় অনেকটা মিল রয়েছে। তবে লাখনউর ব্যাপারটা different। ওটা একটা feudal শহর। কারণ ওখানে সম্ভ্রান্ত fedual-রা বসবাস করেছে। কিন্তু ঢাকার culture গড়ে তুলেছে সম্ভ্রান্ত fedual-দের সংস্পর্শে আসা নিম্নবিত্ত মানুষ মিলে। ফলে এর character ভিন্ন। Urbanisation-এর কারণে একটা সপ্রতিভ ভাব এসেছে এদের মধ্যে আর স্বভাবের মধ্যে fedual-দের selfishness, cruelty আসেনি। সব মিলিয়ে culture-টার মধ্যে যা এসেছে একে আর বুর্জোয়া urbanisation বলা যাবে না, কারণ ঢাকায় তো বুর্জোয়া class গড়ে ওঠেনি। বণিকরা পুরানো ঢাকাকে dominate করেনি। ব্যবসায়ী বলতে তখন ছিল তাঁতিরা, মানে হিন্দু বসাকরা। যারা মসলিন কাপড় তৈরি করত। মুসলমানরা কিন্তু মসলিন বানাত না। মুসলমানরা petronise করেছে। আর পরে ইংরেজদের তৈরি কামজি নবাবরা এসে তো মাড়োয়ারিদের ঢাকায় ঢুকতেই দিল না। পুরানো ঢাকায় কোনো মাড়োয়ারির দোকান দেখতে পাবে না। সুতরাং, পুরানো ঢাকায় ব্যবসায়ী culture-এর ভূমিকা ছিল না। ঢাকাইয়া culture হচ্ছে মোগলদের ছোটোখাটো কর্মচারী আর ওই কুট্টিদের দিয়েই তৈরি।

সংখ্যালঘু, বাঙালি সংস্কৃতি

প্র : আপনার দুটো গল্পে হিন্দু minority-র ব্যাপারটা এসেছে। 'অন্যঘরে অন্যস্বর' আর 'খোঁয়ারি'তে। প্রসঙ্গটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
: এখানে হিন্দুরা suppressed আমি সেটাই বলতে চেয়েছি।

প্র : Minority suppression-টা তো একটা universal problem.
: তা ঠিক। যেদেশে Jew suppression আছে সেখানকার লেখকরা তাই লিখবেন।

প্র : এখানে হিন্দু suppression-এর ধরনটা কেমন বলে আপনি মনে করেন?
: তুমি যে-মুহূর্তে দেশকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা করেছ সে-মুহূর্তে হিন্দুরা 2nd class citizen হয়ে যাচ্ছে।

প্র : সাম্প্রদায়িকতা তো ভারতেও খুব আছে।
: ভারতে আরও বেশি আছে কিন্তু সেখানে আবার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়বার শক্তিও প্রচুর আছে।

প্র : সে-শক্তিটা এখানকার হিন্দুদের তো নেই।
: না থাকার প্রধান কারণ এখানকার হিন্দুদের অর্থনীতির উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

প্র : এখানে মুসলমান এবং হিন্দুর বাঙালিত্ব বিষয়ে কিছু বলবেন?
: Basically এতে কোনো প্রভেদ নাই। হাজার বছরের সংস্কৃতি এটা। তবু ধরো ৪০ বছরের আলাদা দুটো state, তাছাড়া মুসলমানদের বিভিন্ন পারিবারিক পরিমণ্ডলে যে পরিবেশ, জীবনযাত্রায় যে প্রাত্যহিকতা সেখানেও একটা দীর্ঘদিনের প্রভেদ আছে। সংস্কৃতির উপর এসব খুঁটিনাটিরও তো প্রভাব আছে। তাতে করে বাঙালি সংস্কৃতি হলেও সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য বোধহয় আছেই। তবে এজন্য দুটো দেশ থাকার কোনো মানে হয় না। দেশভাগ এদেশের জন্য একটা চরম ট্র্যাজেডি।

প্র : বাঙালি আর বাংলাদেশি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তাহলে কি বলবেন?
: এটাও একটা অহেতুক তর্ক। জাতি হিসেবে আমরা নিঃসন্দেহে বাঙালি, বাংলাদেশিটা একটা ভৌগোলিক রাষ্ট্রীয় পরিচয়। বাংলাদেশি সংস্কৃতি বলে তো কিছু নাই। যেমন ইরাক, কুয়েত ইত্যাদি এদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিন্তু এরা সবাই তো আরব culture-এর অংশীদার। আলাদা কুয়েতি culture বা ইরাকি culture বলে কিছুই নেই।

গল্প নিয়ে আরও কিছু

প্র : আপনার গল্পগ্রন্থগুলো সব মুক্তিযুদ্ধের পরেই বেরুল। অথচ মুক্তিযুদ্ধ আপনার গল্পে কিন্তু তেমনভাবে উপস্থিত না। যেসব গল্পে কিছুটা এসেছে সেখানেও মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়টাই এসেছে। শুধু 'অপঘাত' গল্পটাকে ব্যতিক্রম বলা যায়।
: তা ঠিক, মুক্তিযুদ্ধ খুব ইতিবাচকভাবে আসেনি। আসলে মুক্তিযুদ্ধের পরের সময়টা তো চরম frustrating; মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দারুণ স্বপ্ন ছিল। সে কী সীমাহীন স্বপ্ন। এত স্বপ্ন দেখার তো কোনো মানে হয় না। মুক্তিযুদ্ধ তো তেমন organised কিছু ছিল না, তাছাড়া এর definite কোনো goal-ও ছিল না। সাধারণ মানুষ বা কৃষকরা যে যুদ্ধ করেছিল তা তো কোনো আদর্শ থেকে করেনি। করেছে কারণ না করলে তারা মারা পড়ত। আর মুক্তিযুদ্ধের পরের সময়টা তো চরম স্বপ্নভঙ্গের কাল।

প্র : মুক্তিযুদ্ধের ভেতর তাহলে positive কোনো ব্যাপারটা ছিল মনে করেন?
: Positive হল মানুষের প্রতিরোধ করার সংকল্প, মানুষের সাহস। সে এক তুলনাহীন সাহস। মুক্তিযুদ্ধ আমার গল্পে কম কেন জিজ্ঞাসা করছিলেন, আসলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি অনেকদিন থেকে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকে negative ভাবেও দেখাব না glorify-ও করব না, মোটামুটি objective ভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে দেখাবার চেষ্টা করব।

'চিলেকোঠার সেপাই'

প্র : উপন্যাসটা কবে লেখা শুরু করলেন?
: লেখা শুরু করেছিলাম '৬৯-এই। কিছুটা লিখে রেখে দিয়েছিলাম। তারপর ধরো '৭৫-এ এসে একটানা অনেকদূর লিখলাম। তখন 'সংবাদ' ধারাবাহিকভাবে ওটা ছাপছিল। তারপর হঠাৎ ওরা বন্ধ করে দিল।

প্র : বন্ধ করল কেন?
: বন্ধ করল, কারণ '৭৬-এ তো Govt. change হল। তখন 'সংবাদে'র অদ্ভুত ধারণা হল যে সেই Govt. highly pro-Pakistani। সুতরাং পাকিস্তান নিয়ে কোনো ঠাট্টা করা যাবে না। আমার উপন্যাসে তো পাকিস্তান নিয়ে প্রচুর ঠাট্টা ছিল। একটা character আছে না? basic democrat, রহমতুল্লাহ, যে ডাঁট মারতে মাঝে মাঝে জিন্নাহ টুপি পড়ে। ওরা ছাপাল basic democrat, পাকিস্তান, জিন্নাহ শব্দগুলো বাদ দিয়ে। ওদের ধারণা এতে তখনকার Govt. খেপে যাবে। আমি ভীষণভাবে protest করলাম। কিন্তু কিছু change করতে চাইল না, এর পর আর এক কিস্তি ছাপিয়ে বন্ধ করে দিল। আমি তখন বললাম পাঠকরা এটাকে লেখকের দায়িত্বহীনতা ভাবতে পারে, বললাম আপনারা যে ছাপতে পারছেন না সেটা লিখে দিন। ওরা লিখে দিয়েছিল। তারপর লেখাটা নিয়ে বেশ upset ছিলাম। কোথায় ছাপাব? অনেকদিন বসে থাকলাম। তারপর 'রোববার' পত্রিকার তাপস আমার কাছে লেখাটা চাইল, 'রোববারে' ছাপাবে বলল। ওখানে রফিক আজাদও ছিল, ও খুব help করল। পরে 'রোববার' দীর্ঘদিন উপন্যাসটা ছাপাল। এ-ব্যাপারে আমি তাপসের কাছে কৃতজ্ঞ। তারপর ধরো আবার বই হিসেবে প্রকাশেও নানা অসুবিধা। এতবড়ো বই কেউ প্রকাশ করতে চায় না। শেষে, ইউনিভার্সিটি প্রেসে নয়ীম হাসান ছিল, সে-ই এটা প্রকাশের প্রথম উদ্যোগ নেয়। বইটা যে শেষ পর্যন্ত বেরুবে এর সিংহভাগ কৃতিত্ব নয়ীমের। বই হিসেবে প্রকাশের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাটার অনেক পরিবর্তন করলাম।

রাজনীতিসেদিনের, আজকের

প্র : আপনার উপন্যাসটিতে '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আওয়ামি লিগের ভূমিকা নেতিবাচকভাবেই উপস্থিত করেছেন, আওয়ামি লিগ শ্রেণির প্রশ্নটা উপেক্ষা করেছিল বলেই কি?
: হ্যাঁ, '৬৯-এ জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদের ব্যাপারটা থাকলেও শ্রেণির ব্যাপারটা কিন্তু ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠছিল। আওয়ামি লিগ এই শ্রেণির ব্যাপারটাকে চাপা দিল বাঙালিত্বের ধুয়ো তুলে। মুজিব জেল থেকে এসে প্রথমেই বললেন আপনারা শান্ত হোন। বললেন, আমরা সবাই বাঙালি। People যেভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল তাতে ভয় পেয়েছিলেন তাঁরা। আমার মনে আছে রেক্সে একদিন আড্ডা দিচ্ছিলাম, আমাদের পাশের টেবিলে এসে বসলেন খন্দকার মোস্তাক। বাইরে তখন প্রচণ্ড মিছিল, মিটিং। মোস্তাক খুব খেপে গিয়ে বলছিলেন, এত wild হওয়ার কোনো মানে হয়? এই wild horse-কে এখন কে সামলাবে? এটাই হলো typical বুর্জোয়া politics-এর কথা। তারপর ধরো, শেখ মুজিব যেদিন ৭ মার্চের বক্তৃতা দিয়ে ফিরছেন। আমি ওই শাহবাগের মোড়ে ভিড়ের ঠেলাঠেলিতে কীভাবে যেন মুজিবের গাড়ির একেবারে কাছে গিয়ে পৌঁছেছিলাম, একেবারে মুজিবের গাড়ির জানালার পাশে। মুজিব জানালা দিয়ে people-কে দেখছেন। সেদিন তাঁর চোখে আমি দেখেছিলাম ভয়, nothing but feari ভাবছেন বোধ হয় এই লোকগুলোকে তিনি কোথায় নিয়ে যাবেন? কোনো plan তো তাঁর ছিল না। আর মানুষ তো তখন শুধু পাকিস্তান থেকেই মুক্ত হতে চায়নি আরও অনেক কিছু চেয়েছিল।

প্র : এখানে শেখ মুজিবের মূল্যায়ন সম্পর্কে কিছু না হয় বলুন।
: মুজিব সম্পর্কে যাই বলি না কেন, তাঁকে hero-ও তো বলতে হবে। তাঁকে দোষ দিয়ে কী লাভ? তিনি যে politics-এ বেড়ে উঠেছেন সেটা পার্লামেন্টারি politics, তিনি election করেছেন, opposition-এ ছিলেন তাঁর পক্ষে এর চেয়ে বেশি আর কী করা সম্ভব? উনি কি আর বিপ্লবী নেতা? মানুষের ওই বিশাল অভ্যুত্থানকে উনি আর কতদূরই বা নিয়ে যেতে পারতেন? উনি তো সমাজ বিপ্লবী নেতা নন। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত নেতাদের মধ্যে বুর্জোয়া রাজনীতিতে তিনিই সবচেয়ে successful.

প্র : আরেকটু সামনে এগিয়ে আসি। ধরুন '৯০-এর যে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন। একেও তো গণঅভ্যুত্থান বলা হচ্ছে। '৬৯-এর সাথে তুলনা করলে কি দাঁড়ায়?
: না, না, '৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সাথে '৬৯-কে তুলনাই করা যায় না। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন তো পুরোটাই শহরকেন্দ্রিক। '৬৯-এর সেটা অনেক rooted ছিল। ওই আন্দোলনের ব্যাপকতা, গভীরতা, তীব্রতা অনেক বেশি ছিল।

প্র : সেই '৬৯ থেকে এই '৯০-এর আন্দোলনে বহু উত্থানপতন হল এদেশের। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে মানুষ কি খুব developed হচ্ছে বলে মনে হয়, conscious-ness-এর দিক থেকে?
: আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো চিত্র অবশ্যই নাই। তবে develop যে করেনি তা বলা যাবে না। আজকে জাতীয়তাবাদের নাম করে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না কেউ। People-কে attract করতে হলে আজকে আরও basic point-এ যেতে হবে।

প্র : সারা বিশ্বেই তো left politics-এর খুব নাজুক অবস্থা। তো সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের এই ভাঙন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন শোনা যাক।
: প্রথম কথা, সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো socialist culture তৈরি করতে পারেনি, ফলে বুর্জোয়ারা সুযোগটা পুরো নিয়েছে। তারপর ধরো, বুর্জোয়া প্রযুক্তি ইতিমধ্যে অনেক develop, এর মিডিয়া develop করেছে। ওদিকে socialist সমাজে তাদের গোটা people-এর minimum requirement-এর দিকে নজর রাখতে গিয়ে প্রযুক্তিতে develop করতে পারেনি। ওদিকে socialist-দের মধ্যে বুরোক্র্যাসিও দারুণভাবে grow করেছিলো। মার্কস কিন্তু state সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেননি, মার্কসিস্ট কোনো state-ও তখন ছিল না। state-এর খুঁটিনাটি বিষয়ে মার্কসের কোনো guide line ছিল না। ফলে এরা যখন socialist economy-টা apply করল এর সাথে state-কে খুব clearly relate করতে পারল না। state-কে নিজেদের সুবিধা মতোই সাজাতে লাগল। এভাবেই বুরোক্র্যাসিটা তৈরি হল। শ্রমিক শ্রেণির সত্যিকার প্রতিনিধি state-এ রইল না। তবে আমার কিন্তু মনে হয় না Marxism fail করে গেল। এখন বরং সুযোগ এসেছে theory-টাকে যথাযথভাবে বিচার করা। কারণ এখন সবকিছু তো exposed.

প্র : কিন্তু বুর্জোয়ারা তো উত্তরোত্তর শক্তিশালীই হচ্ছে। আপনি আপনার প্রবন্ধে যে লিখেছিলেন বুর্জোয়াদের অনিবার্য পতন আসন্ন, তেমনটা কি মনে হচ্ছে?
: বুর্জোয়ারা কি সত্যিই শক্তিশালী হচ্ছে?

প্র : আজকে আমেরিকার position-কে কী বলবেন?
: আমেরিকা আসলে শক্তিশালী হচ্ছে super power হিসেবে। কিন্তু বুর্জোয়া society বলতে যা বোঝায় সেটা কি develop করতে পারছে? বুর্জোয়াদের যে achievement অর্থাৎ education, art, philosophy, এগুলোর কি পতন হচ্ছে না। বুর্জোয়াদের development পুরোটাই তো ব্যয় হচ্ছে যুদ্ধে, ইরাককে ধ্বংস করতে, তেলগুলো capture করতে। বরং এদের ভিতর থেকে যারা বেরিয়ে আসছে যেমন মার্কেসরা, আফ্রিকার সাহিত্য বা মিলান কুন্দেরা এরা তো ঠিক বুর্জোয়া development-এর ফসল না।

প্র : কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমেরিকানরা, আমেরিকান culture-এর নামে একটা ব্যাপার দিয়ে সারা বিশ্বের mass people-এর মধ্যে একটা অদ্ভুত craze তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
: এগুলো কিন্তু বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা না, বুর্জোয়া হ্যাংলামো। বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা যেটা ছিল সেটা তো বড়ো ব্যাপার, রেনেসাঁ, industrial revolution, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকার কোকাকোলার জন্য সব পাগল। এটা তো অনেক নীচু স্তরের ব্যাপার। আজকের বুশের সাথে একজন আব্রাহাম লিঙ্কন বা একজন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের তুলনা হয়?

প্র : তাহলে কি বলব সারা বিশ্বেই সাধারণ মানুষের aspiration-এর মান এবং মাত্রা অনেক নীচু হয়ে গেছে আগের মানুষের তুলনায়?
: এটা বলা মুশকিল। তবে মানটা নিশ্চয়ই অনেক স্থূল হয়ে গেছে। হয়তো প্রতি যুগে যুগেই এমন একটা সময় আসে।

প্র : তাহলে কি বলব সভ্যতা এখন আবার একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে?
: আমার তো তাই মনে হয়। তবে আমাদের দেশের জন্য এসময়টা কিন্তু একটা ভালো সময় বলে মনে হয়। কারণ এসময়টায় তুমি একটা better society-র জন্য নানাভাবে prepared হতে পার।

প্র : কিন্তু better society-র মডেল তো আপনি দাঁড় করাতে পারছেন না।
: হ্যাঁ, মডেল হয়তো দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু বুর্জোয়া society যে কিছুতেই acceptable না এটা তো দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, এর চেয়ে better একটা society নিশ্চয়ই আছে।

প্র : যে-কোনো মূল্যে optimist থাকতে চাইছেন?
: না, আমি মোটেও optimism-এর কথা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছি না। আশাবাদী হবার মতো কী-ই বা আছে? কিন্তু আমি বলছি যে অবস্থাটা আছে সেটা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। এভাবে তো একটা human civilisation চলতে পারে না। মালিবাগের বস্তি আর গুলশানের বাড়ি একই শহরে শত শত বছর ধরে co-exist করতেই থাকবে? আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো 3rd World War-এ মানুষ কোন অস্ত্র ব্যবহার করবে বলে আপনার ধারণা। তো উনি বললেন, '3rd Worl War-এ কী দিয়ে যুদ্ধ করবে জানি না তবে 4th World War পাথর দিয়ে করবে এটুকু বলতে পারি।' অর্থাৎ 3rd World War-এ পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, নতুন করে মানুষকে সভ্যতা শুরু করতে হবে। যাহোক, আসলে সভ্যতা তো আর নিশ্চিহ্ন হয় না। মানুষ নিজেকে এই জটিলতা থেকে উদ্ধারের পথ বের করবেই।

প্র : তো বিশ্ব রাজনীতির আজকের এই পরিস্থিতি আপনার লেখালেখির ভাবনায় কি কোনো প্রভাব ফেলছে না?
: তা তো ফেলেছেই। state কি এখন আর শুধু state আছে। state is now guided by some extra territorial force আমি একটি সন্তান নেব না দুটি সন্তান নেব এটা এখন শুধু বাংলাদেশ বলে দিচ্ছে না, World Bank বলে দিচ্ছে। আমি আজকে ইলিশ মাছ খাব না ট্যাংরা মাছ খাব সেটা বলে দিচ্ছে World Bank। শুধু লেখালেখি কেন আমার দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুই controlled হচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি দিয়ে। আমার এখানে আমি industry করতে পারব কি না সেটা তো আমি জানি না, আমার প্রধানমন্ত্রীও জানেন না, সেটা জানে World Bank। সুতরাং আমি তো আষ্টেপৃষ্ঠেই বাঁধা। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ