জুন'ইচিরো তানিজাকির গল্প : চোর


অনুবাদ : হারুনুজজামান

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমি টোকিও ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি। ছাত্রাবাসের যে বড় শয়নকক্ষে আমরা থাকতাম, সেখানে রুমেটদের সাথে প্রায়ই আমাদের আড্ডা জমতো। পড়াশোনার নাম করে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসতাম বলে আমরা এর নাম দিয়েছিলাম ‘ক্যান্ডেললাইট স্টাডি’—যদিও পড়াশোনার সাথে এর দূরতম সম্পর্কও ছিল না। এমনই এক রাতে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর, আমরা চারজন একটা মোমবাতিকে ঘিরে গল্পে মেতে উঠলাম। মনে আছে, সেদিন আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল প্রেম-ভালোবাসার নানা জটিলতা। সেই বয়সে আমাদের মাথায় এর চেয়ে বড় কোনো চিন্তা বা সমস্যা ছিল না। কিন্তু কথা বলতে বলতে একসময় গল্পের মোড় ঘুরে গেল অপরাধের দিকে। আমরা জালিয়াতি, চুরি ও খুনের মতো রোমাঞ্চকর বিষয়ে মজে গেলাম।

“সব অপরাধের মধ্যে মনে হয় খুনখারাবিই আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি ঘটে,” বেশ গর্বের সাথে বলল হিগুচি। ও এক বিখ্যাত অধ্যাপকের ছেলে, বেশ ধনী। “আমি ভাবতেই পারি না যে কখনো চুরি করব। মানে, চুরি করা আমার ধাতে নেই। চোর ছাড়া যেকোনো ধরণের মানুষের সাথে আমি বন্ধুত্ব করতে পারি। আমার মনে হয়, চোরেরা অন্য কোনো গ্রহের জীব, মানুষের থেকে আলাদা এক প্রজাতি।” 

কথাগুলো বলার সময় হিগুচির সুন্দর মুখটা ঘৃণায় কুঁচকে গেল। তার চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি যেন সেই আভিজাত্যের অহংকারকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। “আমিও শুনছি যে ইদানিং আমাদের হোস্টেলে চুরির হিড়িক পড়েছে,” একই সুরে কথা বাড়িয়ে দিল হিরাতা। 

তারপর নিজের কথার সমর্থনে আমাদের আরেক রুমমেট নাকামুরার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “তাই না রে নাকামুরা?” 

নাকামুরা গলা নামিয়ে বেশ রহস্য ছড়ানোর ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ, সবাই বলাবলি করছে এটা বাইরের কেউ নয়, ভেতরেরই কোনো ছাত্রের কাজ।” 
“ওরা জানল কীভাবে?” আমি কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম।”
“আমি বিস্তারিত জানি না,” নাকামুরা বলল, “তবে যেভাবে ঘন ঘন চুরি হচ্ছে, তাতে ভেতরের কারও হাত থাকাটাই স্বাভাবিক।”

হিগুচি আবার বলতে শুরু করল, “শুধু তা-ই নয়, এই তো সেদিন উত্তর ব্লকের এক ছেলে নিজের রুমে ঢুকতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে কেউ দরজাটা ধাক্কা দিয়ে খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। ছেলেটি তাকে ধরে ফেলতেই চোরটা তার গালে কষে এক থাপ্পড় মেরে বারান্দা দিয়ে দৌড়ে পালায়। ছেলেটি তার পিছু ধাওয়া করেছিল, কিন্তু চোরটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে যায়। রুমে ফিরে সে দেখে, তার বইয়ের আলমারি আর ট্রাঙ্ক ওলটপালট করা। এ থেকেই প্রমাণ হয় যে ওটাই চোর ছিল।”

“সে কি চোরের মুখ দেখতে পেয়েছিল?” 
“না, সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে দেখার সুযোগ পায়নি। তবে ছেলেটি বলছিল, চোরের পোশাক-আশাক আমাদের মতোই ছিল। পালানোর সময় সে তার কোটের কলারটা মাথার ওপর টেনে দিয়েছিল। তবে একটা জিনিস ছেলেটি নিশ্চিত দেখেছে—কোটে উইসটেরিয়া ফুলের সিলমোহর (Wisteria Seal) আঁকা ছিল।”

“উইসটেরিয়া সিলমোহর?” হিরাতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। সে সময় আমার মনে হলো, হিরাতা যেন এক অদ্ভুত সন্দেহ নিয়ে আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। হতে পারে এটা আমার মনের ভুল, কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজের অজান্তেই আমার মুখটা শুকিয়ে গেল। কারণ, আমাদের পারিবারিক সিলমোহরটি ছিল উইসটেরিয়া ফুলের। ভাগ্যিস, সেদিন রাতে ওই সিলমোহরওয়ালা কোটটি আমার গায়ে ছিল না। 

নিজের ভেতরের এই অস্বস্তি আর ভয় লুকাতে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “যদি চোরটা আমাদের মাঝেরই কেউ হয়, তবে তাকে ধরা কিন্তু অত সহজ হবে না। কারণ, আমাদের মধ্যে কেউ চোর হতে পারে—এটা সহজে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না।”

“না রে, আর বড়জোর দু-চার দিন। এর মধ্যেই ও ধরা পড়বে,” হিগুচি বেশ জোর দিয়ে বলল। কথা বলার সময় ওর চোখ দুটো চকচক করছিল, “ব্যাপারটা খুব গোপন রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে যে চোরটা সাধারণত কমন বাথরুমের ড্রেসিংরুম থেকে জিনিসপত্র সরায়। তাই গত দু-তিন দিন ধরে গার্ডরা ওখানে কড়া নজর রাখছে। ওপরের একটা গোপন ফুটো দিয়ে ওরা নিচের দিকে চব্বিশ ঘণ্টা লক্ষ রাখছে।”

“তাই নাকি? তোকে কে বলল?” নাকামুরা জিজ্ঞেস করল। 
“একজন গার্ড আমাকে বিশ্বাস করে বলেছে। খবরদার, এটা যেন আবার পাঁচকান করিস না!” 
“তুই যখন এত কিছু জেনে গেছিস, তখন চোরটাও নিশ্চয়ই এই ফাঁদের কথা জেনে গেছে,” হিরাতা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল।

এখানে একটা বিষয় বলা দরকার—হিরাতার সাথে আমার সম্পর্ক মোটেও ভালো ছিল না। সত্যি বলতে, আমরা একে অপরকে সহ্যই করতে পারতাম না। অবশ্য ‘আমরা’ বলাটা ভুল হবে, মূলত হিরাতাই আমাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করত। আমার এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, হিরাতা নাকি আমার আড়ালে মন্তব্য করেছে যে, আমি বাইরে যেমন দেখাই, ভেতরে আসলে তেমন মানুষ নই। সে নাকি আমাকে খুব ভালো করেই চিনেছে। ও বলেছিল, “ওর কথা ভাবলেই আমার গা ঘিনঘিন করে। ও কখনো আমার বন্ধু হতে পারে না। ওর সাথে যদি কখনো ভালো ব্যবহার করিও, তবে তা স্রেফ দয়া করে করব।”

এই ধরণের কটু কথা হিরাতা সবসময় আমার পেছনেই বলত, সামনাসামনি কখনো বলেনি। কিন্তু ওর চোখ-মুখের ভাব দেখলেই ঘৃণাটা পরিষ্কার বোঝা যেত। আমার স্বভাব আবার এমন ছিল না যে যেচে গিয়ে এর কোনো কৈফিয়ত চাইব। আমি মনে মনে নিজেকে বোঝাতাম, “আমার মধ্যে যদি বড় কোনো খুঁত থাকে, তবে ও সেটা সামনাসামনি বললেই পারে। কিন্তু সে যদি না বলে মনে করে যে আমার সাথে কথা বলাই বৃথা, তবে তাকে বন্ধু ভাবার কোনো মানে হয় না।”

হিরাতা আমাকে এতটা ঘৃণা করে ভেবে মাঝে মাঝে নিজেকে খুব একা লাগত। তবে এটা নিয়ে আমি খুব একটা ভেঙে পড়িনি। হিরাতা ছিল সুঠাম দেহের অধিকারী, আর ওঁর মধ্যে এমন এক পৌরুষদীপ্ত ভাব ছিল যা নিয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গর্ব করত। আর আমি ছিলাম রোগা-পাতলা, বিষণ্ণ ও অন্তর্মুখী এক মানুষ। আমাদের দুজনের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, আর এই সত্যটা আমি মেনে দিকেছিলাম। তাছাড়া হিরাতা ছিল জুডোর ওস্তাদ। ও যখন ওঁর শক্ত পেশী প্রদর্শন করত, তখন মনে হতো ও যেন বলতে চাইছে, “সাবধান! বেশি বাড়াবাড়ি করলে এক আছাড়ে সোজা করে দেব।”

শারীরিক শক্তির ভয় পাওয়ায় আমাকে হয়তো অনেকে কাপুরুষ ভাবতে পারেন, কিন্তু আমি এই ধরণের ঠুনকো অহংকার বা মান-মর্যাদা নিয়ে কখনো মাথা ঘামাতাম না। আমি নিজের মনকে শান্ত রাখতাম এই ভেবে যে, “ও আমাকে কতখানি অবজ্ঞা করে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যতক্ষণ আমি নিজের কাছে সৎ আছি, ততক্ষণ ওর প্রতি ক্ষোভ রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।”

এই উদার মানসিকতা নিয়েই আমি হিরাতার উগ্র মেজাজের মুখোমুখি হতাম। এমনকি অন্য ছেলেদের কাছে আমি ওঁর প্রশংসাই করতাম, বলতাম, “হিরাতা আমাকে পছন্দ না করতেই পারে, তবে মানুষ হিসেবে ওর অনেক ভালো গুণ আছে।”

আমি সত্যি সত্যিই তা বিশ্বাস করতাম। নিজেকে আমি কখনো দুর্বল ভাবিনি, বরং কিছুটা অহংকারীই ছিলাম। আমি মনে মনে চাইতাম হিরাতা বুঝুক যে, আমি ওর চেয়েও অনেক বড় মনের মানুষ, যে কিনা ওঁর ঘৃণার বিপরীতেও ওঁর প্রশংসা করতে পারে। কিন্তু সেই রাতে, “উইসটেরিয়া সিলমোহর?”—এই কথাটি শোনার পর হিরাতা যখন আমার দিকে তাকাল, ওঁর সেই বিদ্বেষী চাহনি আমার স্নায়ুতে কাঁপন ধরিয়ে দিল। ও কি জানত যে উইসটেরিয়া আমাদের পারিবারিক সিলমোহর? নাকি এটা কেবলই আমার মনের দুর্বলতা? হিরাতা যদি সত্যিই আমাকে চোর বলে সন্দেহ করে, তবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা আমি কীভাবে করব? আমার কি তখন হাসিমুখে স্বাভাবিকভাবে বলা উচিত ছিল, “আরে, তাহলে তো সন্দেহের তীর আমার দিকেও আসছে! কারণ আমার কোটেও একই সিলমোহর আছে?” এটা শুনে বাকিরা যদি হাসাহাসি করত, তাতে আমার কিছু যেত আসত না। কিন্তু যদি হিরাতার মুখটা আরও কঠোর ও নির্মম হয়ে উঠত—তখন কী হতো? এই দৃশ্যটা কল্পনা করতেই আমার বুক কেঁপে উঠল, মুখ দিয়ে কথা আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। হয়তো সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এত বিচলিত হওয়া বোকামি, কিন্তু ওই অল্প সময়ের নীরবতায় আমার মাথায় হাজারটা চিন্তা খেলে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, এমন এক পরিস্থিতিতে একজন নির্দোষ মানুষ আর একজন অপরাধীর মানসিক অবস্থার মধ্যে আসলে কোনো তফাত থাকে না। আমি একজন অপরাধীর তীব্র একাকীত্ব ও উৎকন্ঠা নিজের ভেতরে টের পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ আগেও আমি এই নামী প্রতিষ্ঠানের একজন সম্মানিত ছাত্র এবং বন্ধুদের প্রিয় মুখ ছিলাম। কিন্তু এক মুহূর্তেই মনে হলো, আমি এই দুনিয়ায় একদম একা। এই অদ্ভুত ভাবনার কারণে বন্ধুদের কাছে নিজের মনের কথা খুলে বলতে না পেরে আমি এক চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে লাগলাম। হিরাতার সামান্য বাঁকা চাহনিই আমাকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। “চোরেরা মনে হয় একদম আলাদা প্রজাতির মানুষ...” হিগুচির এই সাধারণ মন্তব্যটি আমার মনের ভেতরে এক অশুভ ঘণ্টার মতো বাজতে লাগল। চোর! কী ভীষণ অপমানজনক আর ঘৃণ্য একটা শব্দ!

আমার মনে হয়, একজন চোর আর সাধারণ মানুষের মধ্যে মূল তফাতটা ওঁর চুরির অপরাধে নয়, বরং ওঁর সেই অপরাধ ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। নিজের ভেতরের অপরাধবোধকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার যে ক্লান্তি, আর অনবরত ধরা পড়ার যে ভয়—তা চোরকে প্রতি মুহূর্তে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। এই ভয়টা এতটাই গোপন যে তা কাউকে বলাও যায় না। এখন সেই একই রকম এক অন্ধকার ভয় আমাকে গিলে খাচ্ছিল। আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে কেউ আমাকে সন্দেহ করছে না, কিন্তু মনের ভেতরের সেই তীব্র আতঙ্ক আমি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকেও বলতে পারছিলাম না। হিগুচি গার্ডের কাছ থেকে শোনা গোপন তথ্যটি আমাদের বিশ্বাস করে বলেছিল বলেই আমার এই দশা।

সে বলেছিল, “কথাটা পাঁচকান করিস না,” আর আমি তখন খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু আমার এত খুশি হওয়ার কী ছিল? হিগুচি তো আমাকে সন্দেহ করেনি। আমি ভাবলাম, হিগুচি কেন আমাদের এই কথাগুলো বলতে গেল? মানুষের অবচেতন মনে তো অপরাধের প্রতি একটা আকর্ষণ বা কৌতূহল থাকেই। হয়তো ও যখন এই রহস্যের কথা বলছিল, তখন ওঁর নিজের ভেতরেও এক ধরণের রোমাঞ্চ কাজ করছিল। যেহেতু গার্ড ওকে আলাদা করে ডেকে এই গোপন তথ্যটি দিয়েছিল, তাই হিগুচি হয়তো আমাদের চারজনের মধ্যে নিজেকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ও ‘বিশেষ কেউ’ বলে মনে করছিল। হিগুচি ধনী পরিবারের সন্তান, নামী অধ্যাপকের ছেলে, তাই কর্তৃপক্ষের আস্থা ওঁর ওপর থাকাটাই স্বাভাবিক। ওঁর এই সামাজিক অবস্থানকে আমি কিছুটা হিংসাই করতাম। ওঁর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ওঁর চরিত্রকে একধরণের বাড়তি সুরক্ষা দিয়েছিল। অন্যদিকে আমি ছিলাম এক দরিদ্র কৃষকের ছেলে, যে কিনা বৃত্তির টাকায় পড়াশোনা করছে। আমার এই পরিচয়টাই যেন আমার অবচেতনে একধরণের হীনম্মন্যতা তৈরি করেছিল। ওঁর সামনে গেলেই আমি একধরণের অস্বস্তি বোধ করতাম, যা চুরির অপবাদের চেয়েও গভীর ছিল। আমরা সত্যিই যেন ‘ভিন্ন দুই প্রজাতির’ মানুষ ছিলাম।

আমাদের চারজনের আড্ডা, হাসাহাসি, গল্পগাছা ওপর থেকে যতই আন্তরিক দেখাক না কেন, আমি বুঝতে পারলাম আমাদের ভেতরের দূরত্বটা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। আর এই দূরত্ব মেটানোর কোনো উপায় আমার জানা ছিল না। এর পর থেকে আমি ওই উইসটেরিয়া সিলমোহরওয়ালা কোটটি পরব কি না, তা নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। যদি সাধারণভাবেই কোটটি এক-দুবার পরি, তবে কি কেউ আলাদা করে লক্ষ করবে? যদি কেউ অন্য বন্ধুদের ইশারা করে বলে, “দেখ, দেখ, ওই কোটটাই ও পরেছে!” তবে কী হবে? অনেকে হয়তো আমাকে সন্দেহ করলেও মুখে কিছু বলবে না, কিংবা আমার জন্য করুণা বোধ করবে। কিন্তু শুধু হিরাতা বা হিগুচির ভয়ে যদি আমি কোটটি আলমারিতে লুকিয়ে রাখি, তবে তা তো নিজের দোষ স্বীকার করে নেওয়ার মতোই শোনাত। আমি যে সবসময় ভয়ে কাঁপতাম তা নয়, তবে বন্ধুদের মাঝে গেলে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতো। বন্ধুদের সাথে আমার এই মানসিক দূরত্ব আমি নিজে তৈরি করতে চাইনি। আমার মনে হতো, চুরির চেয়েও চুরির এই নোংরা সন্দেহ অনেক বেশি ক্ষতিকর। যতক্ষণ না কোনো প্রমাণ মিলছে, ততক্ষণ তো কেউ আমাকে সরাসরি চোর বলতে পারছে না। এবং সেই পর্যন্ত তারা আমার সাথে আগের মতোই মিশবে।

কিন্তু বন্ধুত্বের আসল মানে কী? আমি চোর হই আর না-ই হই, বন্ধুদের সাথে এই যে একটা অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হলো, তা যেকোনো বড় অপরাধের চেয়েও ভয়ানক। নিজের মনে সন্দেহের এই বীজ বুনে দেওয়াটা চুরির চেয়েও বড় পাপ। আমি যদি একজন চতুর চোর হতাম—না, এভাবে বলাটা ঠিক হচ্ছে না—আমি যদি এমন একজন চোর হতাম যে বন্ধুদের অনুভূতিকে সম্মান করে, তবে আমি কখনো আমাদের সম্পর্কে এই সন্দেহের দাগ লাগতে দিতাম না। আমি বাইরে তাদের সাথে অত্যন্ত আন্তরিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতাম, আর ভেতরে গোপনে আমার চুরির কাজ চালিয়ে যেতাম। লোকে হয়তো একে ‘নির্লজ্জ চোর’ বলবে, কিন্তু একজন চোরের দৃষ্টিকোন থেকে এটাই সবচেয়ে সৎ অবস্থান।

“আমি চুরি করি এটা যেমন সত্যি, তেমনি বন্ধুদের আমি মনে-প্রাণে ভালোবাসিও এটাও সত্যি”—এভাবে ভাবাই একজন আদর্শ চোরের লক্ষণ, আর এ কারণেই তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। কিন্তু যখনই আমি এই লাইনে চিন্তা করতে শুরু করলাম, তখন আমি বুঝতে পারলাম কেন বন্ধুদের থেকে আমি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। নিজের অজান্তেই আমি মানসিক দিক থেকে একজন পুরাদস্তুর চোর হয়ে উঠছিলাম। একদিন অনেক সাহস সঞ্চয় করে আমি সেই উইসটেরিয়া সিলমোহরের কোটটি পরেই ক্যাম্পাসে গেলাম। মাঠে নাকামুরার সাথে দেখা হতেই আমরা একসাথে হাঁটতে লাগলাম। কথা প্রসঙ্গে আমি বেশ সহজভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, চোরটাকে কি এখনো ধরতে পারেনি?”
 
নাকামুরা অন্যদিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বলল, “না, পারেনি।”
“কেন? বাথরুমে ফাঁদ পেতেও কাজ হলো না?” 
“চোরটা নাকি আর ওমুখো হচ্ছে না। তবে হোস্টেলের অন্য জায়গা থেকে এখনো জিনিসপত্র চুরি যাচ্ছে। শুনলাম, প্ররক্ষকদের এই গোপন প্ল্যানটা আমাদের কাছে ফাঁস করে দেওয়ার জন্য নাকি কর্তৃপক্ষ হিগুচিকে ডেকে খুব বকাঝকা করেছে।”
“হিগুচিকে?” শুনতে শুনতে আমার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“হ্যাঁ...” নাকামুরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। ওঁর চোখ দুটো হঠাৎ ভিজে উঠল।
“আমাকে মাফ করিস বন্ধু! এত দিন তোকে একটা সত্যি কথা জানাইনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোর জানা দরকার। জানি শুনলে তোর খুব খারাপ লাগবে, কিন্তু তোকে সাবধান করার জন্যই বলছি। হোস্টেলের গার্ডরা তোকেই চোর বলে সন্দেহ করছে। কথাটা বলতে আমার নিজেরই ঘেন্না লাগছে। তবে আমি তোকে এক মুহূর্তের জন্যও সন্দেহ করিনি। আমি তোকে বিশ্বাস করি, আর বিশ্বাস করি বলেই তোকে সবটা জানালাম। দয়া করে আমার ওপর রাগ করিস না।”
“ধন্যবাদ তোকে সত্যিটা বলার জন্য। আমি তোর কাছে কৃতজ্ঞ।” 

আমার নিজের চোখও তখন পানিতে ভরে এসেছে। তবে মনের এক কোণে একধরণের স্বস্তিও কাজ করছিল—যাক, শেষ পর্যন্ত ফোঁড়াটা গলল! যে ভয়ের মধ্যে আমি দিন কাটাচ্ছিলাম, তার একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার ছিল।

নাকামুরা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “চল, এগুলো নিয়ে আর না ভাবি। তোকে কথাটা বলতে পেরে আমার নিজের মনটাও হালকা লাগছে।”
“কিন্তু মুখে না বললেই কি মন থেকে সন্দেহ দূর হয়ে যায়?” আমি বিষণ্ণ সুরে বললাম।
“তোর এই সহানুভূতির জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এতে শুধু আমার অপমান হয়নি, আমার বন্ধু হিসেবে তোদেরও মাথা হেট হয়েছে। যেহেতু আমাকে চোর ভাবা হচ্ছে, তাই তোদের মতো ভালো ছেলেদের বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। এই অপবাদ আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তোরা এখন আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমি কিছু মনে করব না।”
“ঈশ্বরের দোহাই, এমন কথা বলিস না! আমি কখনো তোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব না,” নাকামুরা প্রায় আঁতকে উঠে বলল।
“হিগুচিও কিন্তু তোর পাশেই আছে। ও নাকি গার্ডদের সামনে তোর পক্ষে অনেক কথা বলেছে। ও বলেছে, নিশ্চিত কোনো প্রমাণ ছাড়া তোকে এভাবে সন্দেহ করা একদম অন্যায়।”
“কিন্তু ওরা তো তাও আমাকেই সন্দেহ করছে, তাই না? আমাকে দয়া করার দরকার নেই নাকামুরা, তুই যা জানিস পরিষ্কার বল। আমি সত্যিটা মেনে নিতে প্রস্তুত।”

নাকামুরা তখন ইতস্তত করে বলল, “আসলে গার্ডরা সব হিসাব মেলাচ্ছে। হিগুচি যেদিন রাতে আমাদের ওই বাথরুমের ফাঁদের কথা বলল, তারপর থেকেই বাথরুমে চুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই ওদের ধারণা, আমাদের চারজনের মধ্যেই কেউ একজন চোর, যে কিনা খবর পেয়ে ওমুখো হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর ওদের সন্দেহের তির তোর দিকেই।”
“কিন্তু ওই রাতে হিগুচির কথা তো শুধু আমি একাই শুনিনি!”—কথাটা আমার ঠোঁটের আগায় চলে এলেও আমি চেপে গেলাম। এই চিন্তাটা আমাকে আরও বেশি হতাশ করে তুলল।
“কিন্তু গার্ডরা জানল কী করে যে হিগুচি আমাদের কাছে এই গোপন কথা ফাঁস করেছে? ওই রাতে তো শুধু আমরা চারজনই রুমে ছিলাম। হিগুচি আর তুই যদি আমাকে বিশ্বাস করিস, তবে কি বাকি একজন...”
“তুই তো বুঝতেই পারছিস কার কথা বলছি,” নাকামুরা মিনতিভরা চোখে তাকাল। “সে তোকে ভুল বুঝেছে, কিন্তু আমি ওঁর নামে তোকে কোনো নালিশ করতে চাই না।” আমার শরীরটা যেন বরফের মতো জমে গেল। হিরাতার সেই তীক্ষ্ণ, ক্রূর চাউনি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ও আমার সব তছনছ করে দিতে চায়।
“তুই কি আমার ব্যাপারে ওর সাথে কথা বলেছিস?”
“হ্যাঁ... কিন্তু বিশ্বাস কর, কাজটা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। আমি যেমন তোর বন্ধু, তেমনি ওঁরও বন্ধু। কাল রাতে এটা নিয়ে হিগুচি আর আমার সাথে হিরাতার প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছে। ও রেগে গিয়ে বলেছে ও হোস্টেল ছেড়ে চলে যাবে। ভাব তো, একজন বন্ধুর জন্য আমাকে আরেকজন বন্ধুকে হারাতে হচ্ছে।”

আমি আবেগ সামলাতে না পেরে নাকামুরার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলাম। “তোর আর হিগুচির মতো বন্ধু পেয়ে আমি ধন্য,” বলতে বলতে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। নাকামুরাও কাঁদছিল।

জীবনে প্রথমবার আমি এক অদ্ভুত মানবিক উষ্ণতা আর ভালোবাসার স্বাদ পেলাম। এত দিন ধরে এই তীব্র একাকীত্বের মাঝে আমি ঠিক এই জিনিসটাই খুঁজছিলাম। আমি যতই পাপী বা চোর হই না কেন, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম—নাকামুরার কোনো জিনিসে আমি কখনো হাত দেব না। 

কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “দেখ নাকামুরা, আমার মতো একটা ছেলের জন্য তোরা নিজেদের এত ভালো একজন বন্ধুকে হারাবি, এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। ও আমাকে যতই ঘৃণা করুক, আমি ওকে শ্রদ্ধা করি। ও আমার চেয়ে অনেক গুণ ভালো ছেলে। হোস্টেলের সবাই ওকে পছন্দ করে। ও চলে যাওয়ার চেয়ে বরং আমিই হোস্টেল ছেড়ে চলে যাই না কেন? তোরা তিনজন আবার আগের মতো সুখে থাকবি। আমার কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু তোদের ভালো দেখলে আমার মন শান্ত হবে।”
“না, তুই কেন যাবি?” নাকামুরা আবেগ জড়ানো কণ্ঠে প্রতিবাদ করল।
“হিরাতার অনেক ভালো গুণ আছে জানি, কিন্তু এ ক্ষেত্রে ও সম্পূর্ণ ভুল করছে। ও অন্যায় করছে জেনেও আমি ওঁর পক্ষ নিতে পারি না। তুই যদি হোস্টেল ছাড়িস, তবে আমি আর হিগুচিও এই হোস্টেল ছেড়ে চলে যাব। তুই তো জানিস ও কতখানি একগুঁয়ে—একবার যা ধরবে, তা-ই করবে। ও যদি নিজের জেদ নিয়ে থাকতে চায়, থাকুক। আমরা কটা দিন দেখি ওঁর রাগ কমে কি না। ভুল বুঝতে পারলে ও নিজে থেকেই এসে ক্ষমা চাইবে।”
“ও কখনো ক্ষমা চাইতে আসবে না। ও আমাকে চিরকাল ঘৃণাই করে যাবে,” আমি বললাম।
“না, তুই ভুল ভাবছিস,” নাকামুরা তড়িঘড়ি করে বলল। “জেদটাই ওঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কিন্তু ও যখন বুঝতে পারবে ও ভুল ছিল, ও ঠিকই নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেবে। ওঁর এই সততাটুকুই তো আমাদের সবচেয়ে প্রিয়।”
“যদি ও সত্যি এমন করে, তবে তো খুব ভালোই হতো,” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম। “ও হয়তো তোদের কাছে ফিরবে, কিন্তু আমার সাথে আর কখনো বন্ধুত্ব করবে না। তবে তুই ঠিকই বলেছিস, ও মানুষটা খুব চমৎকার। আমার শুধু একটাই আক্ষেপ—ও যদি আমাকে একটু পছন্দ করত!”

আমরা দুজনে ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটছিলাম। নাকামুরা ওঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখল, যেন এক পরম বন্ধু ওঁর অসহায় সঙ্গীকে আগলে রাখছে। তখন গোধূলি ফুরিয়ে হালকা কুয়াশা নামছে। মনে হচ্ছিল, আমরা ধূসর সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট এক দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছি। দু-চারজন ছাত্র পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, ওরা সবাই সত্যিটা জেনে গেছে এবং আমাকে সমাজচ্যুত করেছে। এক চরম একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করে নিল। পরের কয়েক দিনে দেখা গেল, হিরাতা ওঁর সিদ্ধান্ত বদলেছে। হোস্টেল ছাড়ার কোনো লক্ষণ ওঁর মধ্যে দেখা গেল না। কিন্তু সে আমাদের সাথে—এমনকি হিগুচি ও নাকামুরার সাথেও—কথাবার্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। এই পরিস্থিতিতে আমার পক্ষেও হোস্টেল ছেড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ এখন চলে যাওয়া মানে নিজের অপরাধ মেনে নেওয়া এবং বন্ধুদের এই ভালোবাসার অপমান করা। তাই আমি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। “তুই একদম চিন্তা করিস না,” হিগুচি আর নাকামুরা আমাকে বারবার আশ্বস্ত করত।
“আসল চোরটা ধরা পড়লেই সব ধোঁয়াশা কেটে যাবে।” কিন্তু এক সপ্তাহ কেটে গেলেও চোর ধরা পড়ল না, উল্টো চুরির ঘটনা চলতেই থাকল। শেষমেশ এক রাতে খোদ নাকামুরা আর হিগুচির কিছু টাকা আর দামি বই চুরি হয়ে গেল।
“যাক, শেষ পর্যন্ত তোদের কপালেও জুটল! তবে আশা করি এবার বাকিদের ওপর থেকে সন্দেহের আঙুল উঠবে,” ডাইনিং রুমে রাতের খাবারের সময় হিরাতা এই বাঁকা মন্তব্যটি করল এবং বরাবরের মতোই ওঁর চাউনি ছিল আমার দিকে।

খাওয়ার পর নাকামুরা আর হিগুচি নিয়মমতো লাইব্রেরিতে চলে গেল। ডাইনিং টেবিলে তখন শুধু আমি আর হিরাতা। ওঁর মুখোমুখি বসে থাকাটা আমার জন্য এতটাই অস্বস্তিকর ছিল যে আমি প্রায়ই রাতের বেলা হোস্টেলের বাইরে কাটিয়ে ফিরতাম—হয় লাইব্রেরিতে, নয়তো দূরে কোথাও একা একা হাঁটতাম। সেদিন রাত সাড়ে নটা নাগাদ আমি যখন হাঁটাহাঁটি শেষ করে আমাদের স্টাডি রুমে ফিরে এলাম, দেখলাম সেখানে কেউ নেই। হিরাতাও বাইরে গেছে, বাকিরাও ফেরেনি। আমি আমাদের শোবার ঘরে গিয়েও কাউকে দেখতে পেলাম না। আবার স্টাডি রুমে ফিরে এসে কেন জানি না আমার চোখ গেল হিরাতার ডেস্কটার দিকে। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে আমি নিঃশব্দে ওঁর ড্রয়ারটা খুললাম। ভেতরে একটা রেজিস্ট্রি করা চিঠি ছিল, যা কয়েক দিন আগে ওঁর বাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিটার ভাঁজ খুলতেই ভেতরে দশ ইয়েনের তিনটি চকচকে মানি-অর্ডার দেখতে পেলাম। আমি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, ধীরে ধীরে ওখান থেকে একটি মানি-অর্ডার বের করে নিজের পকেটে পুরলাম। তারপর ড্রয়ারটা আগের মতো আটকে দিয়ে অলস পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। করিডোর পার হয়ে আমি নিচে নামলাম, টেনিস কোর্টটা কোনাকুনি পার হয়ে পেছনের সেই অন্ধকার, ঝোপঝাড়ে ঘেরা ফাঁকা জায়গাটার দিকে এগোলাম—যেখানে আমি এত দিন ধরে আমার চুরি করা সব জিনিসপত্র মাটিতে গর্ত করে লুকিয়ে রাখতাম। ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে এক বিকট চিৎকার শোনা গেল—“চোর!” পরমুহূর্তেই পেছন থেকে কেউ একজন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওঁর ভারী ঘুষি আমার মাথায় লাগতেই আমি মাটিতে আছড়ে পড়লাম। উঠে তাকিয়ে দেখি—হিরাতা!

“কী রে ব্যাটা! দেখি তোর পকেটে কী লুকাচ্ছিস?” হিরাতা গর্জে উঠল। 
আমি মাটিতে শুয়েই ওঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। আমার মাথা তখন একদম পরিষ্কার, কোনো ভয় নেই। শান্ত গলায় বললাম, “আরে এত চিল্লাচ্ছিস কেন? আমি তো স্বীকারই করছি যে তোর মানি-অর্ডারটা আমিই নিয়েছি। তুই চাইলে ওটা তোকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আর তুই আমাকে যেখানে যেতে বলবি, আমি সেখানেই যাব। চল। তাহলে এ থেকে বোঝা গেল যে আমরা একে অপরকে খুব ভালো করেই চিনি, তাই না? এর চেয়ে বেশি তুই আর কী চাস?”

হিরাতা মনে হয় আমার এই ঠান্ডা আচরণ দেখে কিছুটা ভড়কে গেল, কিন্তু ওঁর ভেতরের রাগটা দপ করে জ্বলে উঠল। ও হিংস্র পশুর মতো আমার মুখে, পিঠে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে শুরু করল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মার বা ব্যথা আমার কাছে একটুও খারাপ লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এত দিন ধরে মনের ভেতরে যে অবিশ্বাসের ভারী বোঝা আমি বয়ে বেড়াচ্ছিলাম, এই মারের চোটেই যেন তার থেকে মুক্তি পেলাম। 

আমি বললাম, “আমাকে এত মারার দরকার নেই হিরাতা। তুই যে ফাঁদ পেতেছিলি, আমি তো ওতেই পা দিয়েছি। তুই নিজের ব্যাপারে বড্ড বেশি নিশ্চিত ছিলি, তাই আমার মনে হলো—দেখা যাক না, ওর ওখান থেকেও চুরি করা যায় কি না! এখন তো তুই আমাকে পুরোটা জেনে গেলি, ব্যস, এটুকুই। পরে না হয় দুজনে এটা নিয়ে হাসাহাসি করা যাবে।”

আমি সত্যি মন থেকে হিরাতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ও ঘৃণায় মুখ কুঁচকে আমার কোটের কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে আমাদের রুমের দিকে নিয়ে চলল। ওঁর চোখে তখন আমার জন্য কেবলই তীব্র ঘৃণা আর অবজ্ঞা।

“এই দ্যাখ তোরা! আমি চোরটাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছি! এবার বল, আমাকে ও ফাঁকি দিতে পেরেছে কি না?” হিরাতা বীরদর্পে আমাদের রুমে ঢুকে হিগুচি আর নাকামুরার সামনে আমাকে মেঝেতে আছাড় মেরে ফেলে দিল। ওরা দুজনে তখন লাইব্রেরি থেকে মাত্রই ফিরেছে। এই হট্টগোল শুনে হোস্টেলের বাকি ছেলেরাও স্রোতের মতো এসে আমাদের দরজার সামনে ভিড় জমাল। আমি মেঝে থেকে উঠে জামাটা ঝাড়তে ঝাড়তে আমার দুই বন্ধুর দিকে তাকালাম। বললাম, “হিরাতা ঠিকই বলেছে। আমিই চোর।” আমার গলা কাঁপছিল না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম আমার মুখটা চুন হয়ে গেছে।

“আমি জানি তোরা এখন আমাকে তীব্র ঘৃণা করছিস, আমার মতো বন্ধুর জন্য তোদের লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। তোরা দুজনেই বড্ড সরল, মানুষকে বড্ড বেশি বিশ্বাস করিস। আমি কি তোদের বারবার বলিনি যে তোরা আমাকে যেমন ভাবিস, আমি আসলে তেমন নই? আমি তোদের বলেছিলাম, হিরাতাই আসল মানুষ, যাকে কখনো ধোঁকা দেওয়া যায় না। কিন্তু তোরা আমার ইশারা বুঝিসনি। আমি তোদের এও বলেছিলাম যে, তোদের সাথে ওঁর সম্পর্ক ঠিক হলেও ও আমার সাথে আর কখনো মিশবে না। মানুষ হিসেবে হিরাতা যে কতখানি খাঁটি, তা আমি তোদের কাছে সবসময় স্বীকার করেছি। করেছি না? আমি তোদের কাছে কখনো মিথ্যা বলিনি। তোরা হয়তো ভাবছিস আমি তোদের প্রতারণা করেছি, আড়ালে থেকে নাটক করেছি। কিন্তু তোদের একটা কথা বুঝতে হবে—চুরি করাটা আমার একটা নেশা, এক ধরণের রোগ, যা আমি শত চেষ্টা করেও ছাড়তে পারি না। কিন্তু তোদের আমি মনে-প্রাণে ভালোবাসতাম, তাই তোদের ঠকাতে না চেয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তোদেরকে আসল সত্যিটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এর চেয়ে বেশি সৎ হওয়া একজন চোরের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তোরা আমার ইঙ্গিতগুলো বুঝতে পারিসনি, এটা তোদের ব্যর্থতা। তোরা হয়তো ভাবছিস আমি তোদের বোকা বানিয়ে মজা নিয়েছি, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি কখনো এতখানি আন্তরিক ছিলাম না। তোরা বলতেই পারিস, যদি সততা নিয়েই আমার এত চিন্তা, তবে আমি চুরি করা ছেড়ে দিলাম না কেন? কিন্তু এই প্রশ্নটা তোলা অন্যায়। কারণ, আমি জন্মগতভাবেই একজন চোর। এই চোর শরীরটা নিয়েই আমি তোদের সাথে যতটা সম্ভব খাঁটি থাকার চেষ্টা করেছি। এর চেয়ে বেশি কিছু করার সাধ্য আমার ছিল না। আমার বিবেকও আমাকে কম দংশন করেনি—সে কারণেই তো হিরাতার বদলে আমি নিজে হোস্টেল ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলাম। আমি তোদের ক্ষতি করতে চাইনি নাকামুরা। তোদের টাকা আমি চুরি করেছি ঠিকই, কিন্তু তোদের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, তাও কিন্তু মিথ্যে ছিল না। তোদের এই বন্ধুত্বের কাছে আমার শেষ আকুতি—অন্তত এটুকু বিশ্বাস কর যে, একজন চোরের বুকেও একটা নাজুক মন থাকে, ওঁরও অনুভূতি বলে কিছু আছে।”

নাকামুরা আর হিগুচি পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওরা একে অপরের দিকে বোবা চোখে তাকাল, ওদের মুখে কোনো কথা ছিল না।

“আমি জানি তোরা ভাবছিস আমার কী চরম ধৃষ্টতা! আসলে তোরা আমাকে কোনোদিন বুঝবি না, কারণ তোরা ভালো মানুষ—অন্য প্রজাতির জীব।” আমি নিজের ভেতরের তেতো ভাবটা লুকাতে একটা ম্লান হাসি হাসলাম। “কিন্তু যেহেতু তোরা আমার বন্ধু ছিলি, তাই তোদের সাবধান করে দিচ্ছি—এই চুরির ঘটনাই শেষ নয়, ভবিষ্যতে যে এমন আর হবে না, তা ভেবে নিশ্চিন্ত থাকিস না। তাই সবসময় সতর্ক থাকিস। তোরা বড্ড সহজে মানুষকে বিশ্বাস করিস, তাই জীবনে তোরা পদে পদে ঠকবি। পড়াশোনায় তোরা ভালো হতে পারিস, কিন্তু মানুষ হিসেবে হিরাতাই তোদের চেয়ে অনেক বেশি চতুর এবং বাস্তববাদী।”

আমি যখন হিরাতার এই প্রশংসা করছিলাম, ও তখন মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। সেই মুহূর্তে ওঁর মতো শক্ত মানুষকেও কেমন যেন ভীষণ অপ্রস্তুত আর বিচলিত দেখাচ্ছিল।

এর পর অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। আমি এখন একজন দাগি, পেশাদার চোর। জীবনের একটা বড় অংশ জেলেই কেটে যায়। কিন্তু হোস্টেল জীবনের সেই দিনগুলোর কথা, বিশেষ করে হিরাতার সেই মুখটা আমি কখনো ভুলতে পারি না। যখনই আমি কোনো বড় চুরি বা অপরাধ করতে যাই, হিরাতার সেই উদ্ধত, অহংকারী মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ও যেন ওঁর সেই চেনা বিদ্রূপের হাসি হেসে আমাকে বলছে, “কী রে, ঠিক বলেছিলাম না?”

হিরাতা নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত কঠোর এবং আদর্শবাদী একজন মানুষ ছিল। কিন্তু এই পৃথিবী বড় অদ্ভুত নিয়মে চলে। সরল-সোজা হিগুচিকে নিয়ে আমার যে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে ও জীবনে ঠকবে, তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাবার প্রতিপত্তি আর নিজের মেধার জোরে ও শিক্ষাজীবনে দারুণ সাফল্য পেয়েছে—বিদেশ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে এসে এখন ও রেল মন্ত্রনালয়ের এক উচ্চপদে আসীন। অন্যদিকে, সেই প্রখর ব্যক্তিত্বের হিরাতা আজ কোথায় আছে, কেমন আছে, তার খোঁজ কেউ জানে না। জীবন সত্যিই বড় অনিশ্চিত।

আমি আমার পাঠকদের বুক ঠুকে বলতে পারি, এই গল্পের প্রতিটি শব্দ নির্মমভাবে সত্যি। এখানে আমি নিজের অপরাধ হালকা করতে কোনো মিথ্যার আশ্রয় নিইনি, কোনো কিছু বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলিনি। আমার কেবল একটাই আশা—নাকামুরা আর হিগুচি না করলেও, অন্তত আপনারা বিশ্বাস করবেন যে, একজন চোরের হৃদয়েও একধরণের नाজুক অনুভূতি আর নৈতিক বিবেকের সংকট থাকতে পারে।

অবশ্য, আপনারা হয়তো আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর সেটা খুবই স্বাভাবিক—যতক্ষণ না আপনারা কোনো এক দৈবচক্রে আমার মত “একই প্রজাতির” মানুষ হয়ে উঠছেন। ·


লেখক ও অনুবাদকের পরিচিতি : অনেক সাহিত্য-সমালোচক জুনই’চিরো তানাজাকিকে (১৮৮৮-১৯৬৫) এডগার এলেন পো’-এর জাপানি প্রতিমূর্তি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তানাজাকি এলেন পো’কে বেশ ভালোভাবে পাঠ করেছিলেন এবং তিনি পো’র খুব প্রশংসা করতেন। তানাজাকি জাপানের সবচেয়ে মহৎ গল্পকার। বলা হয়ে থাকে যে তিনি নাকি জীবনভর সুন্দরী এবং ক্ষমতাবান নারীদের পেছনে বেশ সময ব্যায় করেন, যার মধ্যে তিনজনকে তিনি বিয়েও করেন। তানাজাকির বিচিত্র চরিত্র যেমন ‘The Thief’ (চোর) গল্পের বর্ননাকারী একজন অসংযত, আত্মবিনাশী এবং নিজস্ব আবেগের শিকার।

অপরদিকে হারুনুজজামান মূলত অনুবাদক (বাংলা থেকে ইংরেজি) হলেও ইংরেজি ও বাংলা উপন্যাস লিখেছেন এবং লিখছেন। তাছাড়া লিখেছেন প্রবন্ধ, ইংরেজি ও বাংলা কবিতা। সদ্য অবসরে যাওয়া ইংরেজির এই অধ্যাপক বাংলাদেশের আদিবাসীদের বিলীনপ্রায় ভাষা, সাহিত্য এবং নৃতাত্বিক পরিচয় নিয়ে প্রচুর গবেষণা প্রবন্ধ রচনা করেছেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ