সংগ্রাম, রক্তপাত ও একটি পাখি : জয়া চৌধুরী


“রাজনীতিকরা বরাবর আসেন
সেই এক মিথ্যেকথার ঝুড়ি নিয়ে
এবং ওদের অধিকাংশই মিথ্যুক আর ওরা লুটে নেয়।
তাদের প্রশংসকের কোন অভাব হয় না
আর সাপুড়েরা
তোমাদের পয়সাকড়ি নিতে নিতে
তাদের বিষের থলির ভিতরে ঢুকে পড়ে
চায়, যাতে তুমি আত্মত্যাগ করো।
সমস্ত সমস্যার বাপ ওরা
নিজেদের ভুল কখনই বুঝে উঠতে পারে না,
এমনই হবে যেহেতু অন্ধকার বিষয়ের প্রতি নিজেদের আকর্ষণ প্রসঙ্গেও
কখনই তারা ভুল করে না … ”

খোসে রুইস রোসাস (পেরু)

লিখতে বসে প্রথমেই মনে পড়ে গেল সাম্প্রতিক কালে প্রয়াত পেরুর এই কবির কটি লাইন। বিশ্বজুড়ে রাজনীতি বিষয়ে বলতে গেলে এমন কথা যুগে যুগে কত মানুষই না বলে গেছেন। কিন্তু আশ্চর্য পুনরুচ্চারণের দোষে একে দায়ী করা যায় না কোনো প্রজন্মেই। কেননা রাজনীতি বিষয়টি এক আশ্চর্য জনপ্রভাবী অথচ আদতে জনবিচ্ছিন্ন এক কার্যকলাপ বলে আধুনিক সমাজে একরকম প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গিয়েছে। লিখতে বসেছি বাংলাদেশের গত দু হাজার চব্বিশ সালের আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গ নিয়ে। যদিও বাংলাদেশের অধিবাসী নই তবুও প্রতিবেশী দেশ বিষয়ে উদ্বেগ থেকেই এই লেখাটি লিখবার উদ্যোগ।

বাংলাদেশের জন্ম যে বছরে এক কাকতালীয় মিল রেখে এই লেখক-অনুবাদকের জন্মও ওই একই সালে। পাক হানাদারের কবল থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক নতুন দেশটি স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেবার মাত্র দু মাস পরেই জন্ম হওয়াতে বাবা আমার এই নামই দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের গত দুহাজার চব্বিশ সালের গণতন্ত্র বিরোধী সন্ত্রাসের পরে দেশটির কত দিক দিয়ে অবনমন হয়েছে হচ্ছে হয়ে চলেছে সে দৃশ্য সারা দুনিয়া দেখছে। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশপন্থী জনতা, যারা আবিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে, যাদের এই ভূমিখণ্ডটির প্রতি শ্রদ্ধা তৈরিই হয়েছিল উনিশশো একাত্তরের যান কবুল যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী হবার সুবাদে, বা ইতিহাসের পাতায় পড়ে, তাদের কাছে দেশটির এমন ভয়ানক ধ্বংসের ছবি দেখে সহ্য করতে পারাও মুশকিল। এর সঙ্গে যদি যোগ করা যায় সে দেশের সেইসব মানুষ যারা নানা কারণে দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হলেও হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ, মুক্তিযুদ্ধের লড়াই মুক্তিযুদ্ধের আদত আদর্শ ভোলেন নি। যাদের কাছে মুজিবুর রহমানের উদার অল-ইনক্লুসিভ বাংলাদেশের ধারণাটি পাকাপোক্ত। তাদের কাছে এখন আর ধ্বংসের বিবরণ নয়। তারা চাইছেন এর হাত থেকে মুক্তি। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? এই বিষয়টিকে যদি ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু ঘটনা এনে দেখার চেষ্টা করি তাহলে কী কোনো পথ পাওয়া যাবে?

একথা তো অস্বীকার করবার কোনো জায়গা নেই যে পূর্ব পাকিস্থান নামক ভূমিখণ্ডের মানুষের ওপর পাক বাহিনীর ভয়ংকর অত্যাচারের দিনগুলিতে প্রায় খালি হাতে যুদ্ধের মতো অসম লড়াই করতে হয়েছে মানুষগুলিকে। নারীর প্রতি বীভৎস অত্যাচারের লিপি প্রায় কিছুই আজও লিখে ওঠা হয় নি। সেই অসম লড়াইকে সমতায় আনতেই ভারতের সরকার এগিয়ে গিয়েছিল। ভারতের সাধারণ জনতা উনিশশো সাতচল্লিশের উদ্বাস্তু সমস্যার মুখোমুখি হবার পরেও আরো একবার ওপাড়ের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল। খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছিল। সেটি অস্বীকার করার কোনো উপায়ই তো নেই। কিন্তু মুজিব পরবর্তী বাংলাদেশে ক্রমে এই ধারণাটি স্থায়ী ভাবে রোপণ করে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস বিকৃত করতে করতে এমন জায়গায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হয়েছিল যেন সেই পাকিস্থানের অধীনস্থ পূর্ব প্রদেশটির মানুষ কেবলমাত্র খালি হাতে বা সামান্য অস্ত্রের সাহায্যে বিনা যুদ্ধ প্রশিক্ষণেই ওই মারাত্মক সংগ্রামের দিন পার করে ফেলেছিল। বাস্তবে তেমনটা কী পৃথিবীর কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব? যুদ্ধে জয়ী হতে গেলে শস্ত্র প্রশিক্ষণ তো দরকারই। আরো সহজ হয়েছিল ভারতীয় সেনার অংশগ্রহণে। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলে মানুষের ব্যক্তিগত অর্জন বিনষ্ট হয়ে যায় না। বরং মানুষটির মনুষ্যত্বের জয়লাভ ঘটে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মসনদ দখলের পর থেকে বাংলাদেশের জনতার সংস্কৃতিতে বদল ঘটানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল। বিকৃত ইতিহাস নির্মাণের শুরু সেই সময় থেকেই। এর যে প্রত্যক্ষ ফল হলো সেটি দেশটির সংস্কৃতির ভিত্তি বদলে যেতে লাগল। বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশের মতোই উদার, সজল, সুফল, মায়াভরা মানসিকতা বদলে গিয়ে ঈর্ষা ও বিকৃতিতে পুষ্টি হতে লাগল। তার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল তসলিমা নাসরিনের মতো লেখককে বিরুদ্ধমতের ছুতোয় বাংলাদেশ থেকে প্রায় তাড়া করে বিদায় করবার মধ্য দিয়ে। ধর্মীয় গোঁড়ামি বাড়তে শুরু করল। অনেকটা আমাদের দেশের সুলতানি শাসনের সূত্রপাতে যেমন হয়েছিল ঠিক সেরকম অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। সরাসরি দুটো মানসিকতা দাঁড়িয়ে গেল। একটি মানসিকতা উদারতাকে হিন্দুপনা বলে ঘোষণা করতে লাগল, আরেকদল গোঁড়ামিকে খাঁটি মুসলমানত্ব বলে প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করতে লাগল।

ভারতকে শত্রু ঘোষণা করে দিয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ঘোষণার মধ্যে ঠিক কী ধরণের স্বতন্ত্র গৌরব অর্জন করা যায় সেই যুক্তিই বোধগম্য নয়। যে দেশটি বাংলাদেশের সীমানার তিন দিকে রয়েছে সে বাস্তবতাকে আপনি কীভাবে নস্যাৎ করতে পারেন? বাংলাদেশ তো নিজ গৌরবেই স্বমহিম! তাদের রয়েছে বিপুল মেধা, এক বিশাল চওড়া ছাতির সাহস। আমাদের এখানে একটা রসিকতা প্রচলিত ছিল যে জার্মানদের যেমন জাতিগত ভাবে যোদ্ধা মনোভাব, পদ্মাপাড়ের বাঙালদেরও ঠিক তেমন। এর উৎস অবশ্য উনিশশো সাতচল্লিশের পরে এ দেশে আগত বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর জীবন যন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিষ্ঠা পাবার হাজারো ইতিহাসের জন্য। কিন্তু সেই একই আবহাওয়ায় লালিত বাকি মানুষগুলির মধ্যেও তেমনটাই লক্ষণ রয়ে গিয়েছিল তো। তাহলে এই বিকৃত চিন্তা সে দেশের বুদ্ধিজীবী মহল মেনে নিল কী কারণে? তবে কী ধর্ম এখানে চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়াল? যেখানে শিক্ষিত আর অশিক্ষিতের চিন্তার চেতনার মধ্যে তফাত দেখা গেল না? যাই হোক সে বাংলাদেশের উত্থান চলন ও পতনের বিশদ ব্যাখ্যা সে দেশের নাগরিকেরা আমার চেয়ে ঢের ভালো জানবেন। আমি বরং এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে স্পেন দেশটির গত শতাব্দীর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা ফিরে দেখবার চেষ্টা করি।

বিশেষত স্পেনের গত শতকের গৃহযুদ্ধের সময়কার ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। কেননা আজকের বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের মধ্যেই রয়েছে। এ যুদ্ধ শুধু বন্দুকের মাধ্যমে হচ্ছে তা নয় সাংস্কৃতিক ভাবে বহু বছর আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে। স্পেনে গণতান্ত্রিক শাসন উৎখাত করে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর শাসনকাল শুরু হয় ১৯৩৯ সালে। এ হলো সেই বছর, যে বছর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। আধুনিক সভ্যতার পথ বদলের বাঁকে এই বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরই অঙ্গ হিসাবে স্পেনের ভিতরকার জনগণের মানসিকতা খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশে যে দ্বিতীয় রিপাবলিকের কথা জঙ্গী নেতা নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের বারবার উঠে আসছিল সেই সেকেন্ড রিপাবলিকের অভিজ্ঞতা স্পেনের পরিপ্রেক্ষিতে কেমন দেখতে গেলে চোখে পড়ে বিষয়গুলি। কেননা স্পেনেও রাজা ত্রয়োদশ আলফানসোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিপ্লব হয়েছিল, জারতন্ত্র শেষে ঘোষণা হয় সেকেন্ড রিপাবলিকের। ১৯৩১ সালে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে প্রথমবার জয়ী হয় সে দেশের বামপন্থী রিপাবলিকান দল। রাজা ত্রয়োদশ আলফোনসোর নেতৃত্বে চলা সমস্ত প্রধান শহরগুলিতে এই নির্বাচন হয়েছিল এবং রিপাবলিকানেরা প্রচুর সমর্থন পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়। ফলত আলফোনসো পলাতক হন এবং মাত্র দুইদিনের মধ্যেই সে দেশে দ্বিতীয় রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়। এপ্রিল মাসের এই নির্বাচনের পরপরই জুন মাসে হয় সাধারণ নির্বাচন। এটি হয় মূলত Las Cortes Constituyentes বা সংবিধান আদালতে। এটিই আসলে স্পেনের সংসদ। এই আদালত তথা সংসদেই স্পেনের সংবিধান সংশোধন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এটি ১৮১২ থেকে ১৮৩৬ সালের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষিত হবার পরে সে দেশে প্রচলিত সংবিধানকে সংশোধন করবার জন্যই ভোট গ্রহণ করা হয় আবার ১৯৩১ সালে। এখানেও রিপাবলিকান গোষ্ঠী তুমুল ভোটে জয়ী হয়। তাঁরা দেশ শাসন করতে শুরু করে। পাঁচ বছর পরে স্পেনে ফের সাধারণ নির্বাচন হলে সেখানেও দেখা যায় রিপাবলিকানরাই জয়ী হয়েছে। ততদিনে রিপাবলিকান জোটে স্পেনের শ্রমিক দলও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এইবারের নির্বাচনে তারা দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কান ঘেঁষে জয়লাভ করে। ঠিক এর পর থেকেই শুরু হয় এই দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে তুমুল বিরোধ। অর্থাৎ ১৯৩১ সালে রাজা ত্রয়োদশ আলফোনসোর পতন এবং সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষিত হবার পর থেকে নাগরিকদের মধ্যে যে গৃহযুদ্ধ ধিকিধিকি চলছিল তা তুঙ্গে ওঠে এই নির্বাচনের পর পরই। রিপাবলিকান সহ বাম গোষ্ঠীগুলিকে মূলত সোভিয়েত সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসবকেরা সমর্থন দিচ্ছিল। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থীদের সমর্থনে ছিল জার্মানির হিটলার সরকার সহ ইতালির মুসোলিনী সরকার ইত্যাদি মৌলবাদী স্বৈরাচারী গোষ্ঠীগুলি। অবশেষে ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে স্পেনে এক ভয়াবহ মিলিটারি অভ্যুত্থান ঘটে রিপাবলিক দল সমর্থিত নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। এই পর্যন্ত এসে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের মিল পাঠক দেখতেই পাচ্ছেন। বাংলাদেশেও সেনাধ্যক্ষ জেনারেল ওয়াকার মৌখিক ভাবে ঘোষণা না করলেও নির্বাচিত হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার পেছনে ওয়াকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার সক্রিয় সাহায্য ছাড়া নির্বাচিত হাসিনা সরকারকে এভাবে গদিচ্যুত করা একরকম অসম্ভব ছিল। স্পেনের সেই ’৩৬-’৩৯ সালের সময়েও কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাসহ আড়াই লক্ষ রিপাবলিকান সমর্থক নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীকে ফ্রাংকো সমর্থকদের হাতে হয় খুন হতে হয়েছিল অথবা তারা নির্বাসনে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন। লেখক কবিরা ছিলেন ফ্রাংকোর বিশেষ টার্গেট। এর শুরুটা তারা করেছিল লোরকাকে হত্যা করে। জেলবন্দি করে রেখেছিল কবি মিগেল এরনান্দেসকে। অনেকে আবার ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গিয়েও প্রাণ বাঁচাতে পারেননি। ফ্রাংকোর বাহিনী সেখানে গিয়েও তাদের খুন করেছিল। এঁদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন স্পেনের জনপ্রিয় কবি আন্তোনিও মাচাদো। সালভাদোর দালিসহ অসংখ্য বিশ্ববিশ্রুত কবি চিত্রকর বুদ্ধিজীবীরা পলাতক থেকে কোনক্রমে নিজেদের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। বাংলাদেশে বিগত চোদ্দ পনেরো মাসে যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চলছে, নদীতে লাশের স্তূপ পাওয়া যাচ্ছে তা সে দিনের স্পেনের নৈরাজ্যের বিভীষিকার কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। ১৯৩৯ সালে জেনারেল ফ্রাংকো ক্ষমতা দখল করলে তার পর থেকে অবিচ্ছিন্ন ভাবে পঞ্চাশ বছর স্পেন ফ্যাসিস্ট শক্তির অধীনে বন্দি ছিল।

এই পঞ্চাশটি বছরকে স্পেনের হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় বলে অভিহিত করা হয়। আবার দেখতে গেলে এই নিপীড়নের সময়েই বারবার হয়েছে বহু স্মরণীয় বিদ্রোহ, বহু বুক চেতানো লড়াই। স্পেনের নারী অধিকার আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউটি কিন্তু পঞ্চাশের দশকের স্পেনেই শুরু হয়েছিল। ফ্রাংকোর নিষ্পেষণে দেশের মানুষ বিধ্বস্ত বিমর্ষ হয়ে পড়লেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

পাঠক এই মুহূর্তের বাংলাদেশের নারীদের অবস্থা খেয়াল করে দেখুন। স্বাধীনতার পরে শেখ হাসিনার সরকারের নেতৃত্বে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছিল নারী সমাজের মধ্যে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক অবস্থানের উন্নতি আত্মবিশ্বাস এবং দেশের অর্থনীতি – সবেতেই বিস্ময়কর প্রগতি এসে গিয়েছিল সেখানে। আর আজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে চেয়ে দেখা যায় নারী শিক্ষা নারী অর্থনীতি, নারীর সামাজিক অবস্থিতির অগ্রগমন সবকটি ক্ষেত্র ভয়ানক বাধার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে লক্ষণীয় শিক্ষকদের ভূমিকা। একজন মানুষের শৈশবে চরিত্র চিন্তা চেতনা গড়ে তুলে দেবার সময় শিক্ষকের ভূমিকা মা বাবার পরেই। তাদের হাতেই জাতির চিন্তার মুক্তি মনোভাব গড়ে দেবার দায়িত্ব থাকে। বাংলাদেশের নারী শিক্ষকদের ভূমিকা ২০২৪ এর জঙ্গী উত্থানে ন্যক্কারজনক ভূমিকায় দেখা গেছে। মিথ্যা দমন পীড়নের সংবাদ ছড়িয়ে, মিথ্যা চোখের জলের মিডিয়া বাইট দিয়ে, পত্র পত্রিকায় মিথ্যা গল্প লিখে বলে শিক্ষক সমাজ যে দেশদ্রোহিতার পরিচয় দিয়েছিল সেদিন, তার ফল এখন গোটা দেশের জনগণকে ভুগতে হচ্ছে। তবে এ কাজ শুধু নারী নয় পুরুষ শিক্ষকেরাও করে গেছেন নির্বিকার চিত্তে। সেটি না হলে সে দেশের উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এমন ব্যপক হারে উগ্র ইসলামী মৌলবাদী চেতনায় অভিযোজিত হতে পারত না। শিক্ষকের চোখের সামনে মনুষ্যত্বের এই বিকৃতি গড়ে উঠলে তার দায় কেবল ছাত্রের বাবা মায়ের নয় শিক্ষকেরও দায় থাকে। যার শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে হোলি আর্টিজান বেকারি বিস্ফোরণ কাণ্ডের হাত ধরে।

স্পেনের দিকে তাকান। ১৯৩৯ সালে রিপাবলিকানদের চূর্ণ করে পাকাপাকি ভাবে শাসন ক্ষমতা দখল করে জেনারেল ফ্রাংকো। তারপর থেকে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর সে দেশে ফ্যাসিস্ট শক্তির শাসন। এই অবরুদ্ধ সময়ে ফ্যাসিস্ট সরকার ঠিক কী কী করেছিল?

প্রথমেই হলো পর্যায়ক্রমানুসারে সংস্কার- পাঠক, ২০২৪ সালের পরের বাংলাদেশে ‘সংস্কার’ শব্দটি কতবার শুনেছেন? হাসিনা সরকারের আমলে নাকি সব কালিমা মাখা ছিল তাই সংস্কার করবার নামে প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোনোরকম গণতান্ত্রিক স্বীকৃত পদ্ধতি ছাড়াই কার বা কাদের অঙ্গুলি হেলনে হাজার হাজার সরকারী কর্মচারী অধিকর্তাকে বরখাস্ত করে, চাকরি চ্যুত করে, প্রশাসনিক হেনস্থা করে বদল ঘটানো হয়েছে? স্পেনেও ঠিক এই কাজটাই করেছিল ফ্রাংকো সরকার। দ্বিতীয় কাজ ছিল নির্বাসন দণ্ড দেওয়া। সে কাজের সম্পর্কে আগেই বলেছি যে আড়াই লক্ষ স্পেনীয় বুদ্ধিজীবী, সাধারণ রিপাবলিকান সমর্থকদের বিদেশে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। স্পেনের গা ঘেঁষে একেবারে পিরিন্যেওস পাহাড় ডিঙিয়ে গেলেই ফ্রান্স। সেই ফরাসি দেশে এক বিপুল পরিমাণ স্পেনীয় পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে ছিলেন। যদিও আন্তোনিও মাচাদো ও তার ভাই মানুয়েল মাচাদোকে স্পেনে গিয়ে ফ্রাংকোর আততায়ীরা খুন করে এসেছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী লিগ সমর্থকদের এক বিপুল অংশ ভারতে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছেন বা যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য ইত্যাদি নানান ইওরোপীয় দেশ তো আছেই। এর পরে ছিল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। তখনকার স্পেনে প্রগতির কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। ফ্রাঙ্কোর সরকার ভয়াবহ সেন্সরশিপ চালু করে দিয়েছিল পত্রপত্রিকায়। যে কোনো প্রতিবাদের কণ্ঠ নিষ্ঠুর হাতে চুপ করিয়ে দেওয়া হতো। প্রগতিশীলতার যে কোনো পদক্ষেপকে বিদেশি সংস্কৃতির উস্কানি বলে দাগিয়ে দেয়া হতো। গোঁড়া ক্যাথলিক খ্রিস্টিয়ানি মূল্যবোধকে আধুনিকতার ওপরে স্থান দেয়া হতো, স্পেনের উগ্র জাতীয়তাবাদকেই দেশপ্রেম বলে চাপিয়ে দেওয়া হতো অহরহ। ফ্রাংকোরেজিম স্প্যানিশ ছাড়া আর সমস্ত ভাষার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছিল। তার ফলে দেশে কাতালান, গালিসিয়ান, বাস্কের মতো প্রাচীন ভাষায় নাগরিকদের কথা বলা একেবারে বন্ধ ছিল। এই ভাষায় লেখালেখি তো দূরস্থান কথা বললে পর্যন্ত শাস্তি পেতে হতো। আজকের গণতান্ত্রিক স্পেনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবলে দুঃস্বপ্ন মনে হয়। এখনকার স্পেনের অফিসিয়াল ভাষা একলা স্প্যানিশই নয় এই তিনটি ভাষাও সমান অধিকার পেয়েছে। সঙ্গীত, সিনেমা, শিল্পকলা সমস্ত বিভাগে কঠোর সেন্সরশিপ জারী। বহু বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, লেখক হয় নির্বাসিত, নাহলে কারাবন্দি, কিংবা জোর করিয়ে চুপ করে রাখা হয়েছিল। লোরকাকে হত্যা করেও তারা চুপ থাকে নি। লোরকার সমস্ত বই নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের আগে যথাসম্ভব কুৎসা ছড়িয়ে লোরকাকে জনমানসে নিচে নামিয়ে রাখার চেষ্টা চলেছিল। সমকামী এই অভিযোগে তাঁর লেখা নাটক মঞ্চায়ন করাও বারণকরেছিল ফ্রাংকোর ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা। মার্ক্স, ফ্রয়েড, সার্ত্রের বই নিষিদ্ধ করে রেখেছিল তারা। অর্থাৎ কোনোভাবেই যেন আধুনিকতার স্পর্শ না পেতে পারে স্পেনের জনগণ। সালভাদোর দালি, পাবলো পিকাসোরা নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের শিল্প প্রদর্শন চর্চা দমন করে রাখা হয়েছিল। আভাঁ গার্দ শিল্প রীতি কঠোর ভাবে দমন করে রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশের লেখক চিত্রশিল্পী অভিনেতাদের অবস্থা দেখুন। আসাদুজ্জামানের মতো অভিনেতা, শাহরিয়ার কবিরের মতো মানুষদের হাজার মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষত আওয়ামী লিগের যারাই দেশ থেকে পালাতে পারেননি তাদের অজস্র মামলায় ব্যস্ত রেখেছে ইউনূস পরিচালিত দখলদার বাহিনী। নদীতে নদীতে লাশ ভেসে উঠছে। বলা হচ্ছে মাছের চেয়েও বেশি লাশের সংখ্যা। এখানে কে শিল্পী কে নেতা কেই বা সাধারণ আওয়ামী সমর্থক – সকলের জীবন বিপন্ন। কোনো সুস্থ দেশে তো এমনটি হতে দেওয়া যায় না। কিন্তু এখনকার বিশ্বের রাজনীতির প্যাঁচ এমনই যে সরাসরি কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারছে না। স্পেনেও তৎকালীন সময়ে তাই হয়ে চলেছিল। সেখানে প্রাচীন রক্ষণশীল শিল্পকে উৎসাহ দিয়ে নতুন সবকিছুর আগমন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। কাতালুনিয়ার নিজস্ব ঐতিহ্যশালী সারদানা সঙ্গীত নিষেধ করা ছিল। তার কারণ স্পেনের মধ্যে অ-পর কোনো কিছুর অস্তিত্ব রক্ষায় ফ্রাংকো সরকার বিশ্বাসী ছিল না। সকলকে এক স্পেনীয় বয়ানে চলতে হবে। বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের নীতি বর্জন করলেই তবে নাকি স্প্যানিশ বিশুদ্ধতা বজায় থাকবে। এ পর্যন্ত শুনে জার্মানির হিটলার প্রচলিত আর্য রক্তের বিশুদ্ধতার ধারণার কথা মনে পড়ছে না? নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পাঠ্য বইয়ের পুনর্লিখন করে গোঁড়া ক্যাথলিক শিক্ষা, প্রাচীন শিক্ষার পুনর্জাগরণের ওপরে জোর দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকদের কাজ ছিল ফ্রাংকো রেজিমের বয়ান দিয়ে পড়ুয়াদের মগজ ধোলাই করা। … এ সমস্ত কিছু পড়তে পড়তে পাঠক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশের অবস্থার ছবি আপনাদের সামনে ভেসে উঠছে না?

এইবার দেখি সে দেশের মানুষ কীভাবে সেইসব অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন? এইখানে বলতে গেলে বিশাল ইতিহাসে হাত দিতে হয়। এখানে একটা মোটামুটি ধারণা দেবার চেষ্টা করছি। ফ্রাংকোর রেজিমের বিরুদ্ধে সমাজের নানা প্রান্ত থেকে লড়াই চলেছিল। একদিকে স্পেনীয় ‘মাকি’ গ্রুপ চালাচ্ছিল গেরিলা যুদ্ধ। দেশের আনাচে কানাচে প্রান্তিক স্থান থেকে তারা ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত সময়কালে ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে রেখেছিল, ধরে রেখেছিল এবং কাজ করে চলেছিল। অন্যদিকে ছাত্র বিক্ষোভ, শ্রমিক বিক্ষোভ এবং বুদ্ধিজীবী বিক্ষোভ চলছিল ক্রমাগত। বিশেষ করে উল্লেখ করা যায় ১৯৬২ সালের খনি শ্রমিকদের বিদ্রোহের কথা। তার আগে ১৯৫১ সালে বার্সেলোনায় ট্রাম বিদ্রোহ আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেয় গোটা দেশে। এটা শুরুই হয়েছিল ট্রামভাড়া চল্লিশ শতাংশ বাড়ানোর আদেশের বিরুদ্ধে। প্রথমে স্থানীয় যান বয়কট দেবার লিফলেট বিলি দিয়ে যা শুরু হয় ক্রমে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে ট্রামে পাথর ছোঁড়া থেকে সর্বাত্মক বয়কট অবধি। ট্রাম যাত্রীদের প্রায় নিরানব্বই শতাংশই ট্রামে যাতায়াত বয়কট করে হেঁটে কারখানা অফিসে যাওয়া শুরু করাতে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফ্রাংকোর শোষণের বিরুদ্ধে সেই প্রথমবার অত বড় ক্ষোভ দেখা যায়। দ্বিতীয় বড় আন্দোলন হয়েছিল শ্রমিক মজুরী নিয়ে। সেবার ১৯৬২ সালে শ্রমিকদের এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশের কলকারখানায়। সোশালিস্ট, কমিউনিস্ট এবং বিশেষ করে ক্যাথলিক শ্রমিক গোষ্ঠীর মধ্যে এই ক্ষোভ সমানভাবে ছড়ায়। দেশে গোপন বিদ্রোহ রীতিমত বেড়ে ওঠে। কারণ উল্লিখত প্রত্যেকটি দলই মূলত গোপনে তাদের কর্মকাণ্ড চালাত। এইসময় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে দেশের ক্যাথলিক খৃষ্টান গির্জাগুলি। ফ্রাংকো রেজিমের শুরুতে তারা মহা উৎসাহে ফ্রাংকো সরকারকে সর্বতোভাবে সমর্থন করেছিল। কারণ তাদের মূল আগ্রহ ছিল কমিউনিস্ট প্রভাব মুছে ফেলা। কিন্তু বছর যত এগোতে থাকে ফ্রাংকোর শোষণ দমন নিপীড়নও চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। একদিকে ’৬২ সালের বিপুল শ্রমিক বিক্ষোভ রেজিমকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে ৬২-৬৫ সালে দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেখানে মানবাধিকার ও সামাজিক সাম্যের ওপর জোর দেবার কথা বলা হয়েছিল। তার প্রভাব স্পেনের গির্জাগুলিতেও পড়তে শুরু করেছিল। কার্ডিনাল ভিসেন্তে এনরিকে ই তারাঙ্গনের নাম এক্ষেত্রে বিশেষ করে বলতে হয়। তিনি জোর গলায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত করছে ফ্রাংকো সরকার এমন কথা বলতে শুরু করেন। অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিক বিরুদ্ধতা নয় ধর্মীয় দিক থেকেও ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। স্পেনের বাস্কেভাষী গোষ্ঠীর বিশপেরাও বাস্কে ভাষা নিষ্পেষণ ও দমনের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে একত্র করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। এই চ্যালেঞ্জ ফ্রাঙ্কোর কাছে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬৮ সালের পরবর্তী সাতটি বছর সারা স্পেন জুড়ে ফ্রাংকোর বিরুদ্ধে অসংখ্য আন্দোলন সঙ্ঘটিত হতে থাকে। তাতে ছাত্র বিক্ষোভ ছিল যেমন, ১৯৬৯ সালে সরকারের জরুরি অবস্থা জারী আরেকটি সলতেয় আগুন ধরিয়ে দেয়। ’৭০ সালে বাস্কে প্রদেশের কয়েকজনকে বিচারে ফাঁসি দিলে আন্তর্জাতিক মহলে বিপুল সাড়া ফেলে। ফ্রাঙ্কো সরকার দারুণ চাপে পড় যায়। এরই ফল স্বরূপ ১৯৭৩ এ দেশের প্রধানমন্ত্রীকে খুন করে বাস্কেবাসী এক বিদ্রোহী। ফ্রাংকোর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ১৯৭৫ সালে দেশব্যাপী প্রতিবাদ আন্দোলন চলাকালীন অসুস্থ ফ্রাংকোর মৃত্যু হয়। শেষ পর্যন্ত অনেক পথ পাড়ি দিয়ে বহু নির্যাতন সহ্য করে পঞ্চাশ বছর পরে স্পেন গণতন্ত্রের আলোয় ফিরে আসে ১৯৭৫ সালে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল তো কোনো রাজনৈতিক পদ্ধতি মেনে হয়নি। তাদের পরিস্থিতির সঙ্গে স্পেনের সমস্ত ঘটনাবলি হুবহু একও নয়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই তো বহু মিলও আমরা দেখতে পেয়েছি। প্রথমে যা পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভ্রাতৃদ্রোহের বিষয় ছিল ক্রমে তাদের এক লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল ফ্রাংকোর পতনকে কেন্দ্র করে। তার জন্য সমাজের সব প্রান্ত থেকে আসতে হয়েছিল লড়াই। বাংলাদেশের মানুষ যদি ইউনূসের পতন চান তাহলে তাদের পক্ষে কেবলমাত্র আওয়ামী লিগের উপর নির্ভর করে থাকা সমীচীন হবে না। ইউনূস ও জামাতি-হেজবুতি-হেফাজতি-হুতি গ্যাং দেশটিকে পাকাপাকি ভাবে সন্ত্রাস অধ্যুষিত করে তোলার প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু অন্ধকারই যদি শেষ কথা বলত তাহলে মানুষের সভ্যতা ডায়নোসরের যুগ থেকে এ আই যুগে এসে পৌঁছতে পারত না। এ লড়াই আপামর বাংলাদেশীদের লড়াই। সমস্ত স্তরের মানুষ যদি না এগিয়ে আসেন তাহলে মনে হয় না এত অল্প দিনেই এই ভয়ংকর উগ্রপন্থী শক্তি হটানো যাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাদের সঙ্গে ভারতের সেনাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিল। তখনকার ভারত আর ২০২৫ সালের ভারত এক নয়। দেশের নেতাও এক নন। ইন্দিরা গান্ধী আর নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা এক নয়। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও এক বড় পরিমাণ অংশের মনে ভারতের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে গত ৫৪ বছরে। কাজেই লড়াই করবার পদ্ধতি আলাদাই হবে। লড়াই হবে দেশে থেকে, লড়াই চলবে দেশের বাইরে থেকেও। যত যোগ্য নেত্রীই হোন না কেন একথা ভুলে গেলে চলবে না শেখ হাসিনাও পঁচাত্তর বছর পার করে ফেলেছেন। নতুন নেতৃত্বকে এগিয়ে আসতেই হবে। সমাজের শিক্ষিত সুবিধাভোগী অংশটি মনে মনে সফট জামাতি মনোভাব পুষে রেখে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটালে আর যাই হোক এই ভয়ংকর দানবীয় শক্তিকে পরাজিত করা যাবে না। রাস্তায় নেমে লড়াই করতে হবে। সে যে ভাবেই লড়াই হোক না কেন ক্রমাগত দরজায় আঘাত করে যেতেই হবে। তবেই নিকষ অন্ধকারের দিন কেটে দরজা ভেঙে নতুন দিনের সূর্য উঠবে। দেখুন নিজের লড়াই নিজেকেই করতে হয়। আমার দেশ বিপন্ন কিন্তু আমি নিরাপদে ঘরে থাকব আর আমার দেশ সভ্যতার শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে যাবে- এমনটা তো হয় না। নিজেরা মরীয়া হলে আন্তর্জাতিক স্তর থেকেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেবে বহু দেশ। যেভাবে ঘটেছিল ১৯৭১ সালে। রাশিয়া ভারতসহ কয়েকটি দেশ এগিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের সাহায্যে এবারেও অনেকে আসবে। তার আগে শুরুর সলতেটায় আপনারা অগ্নিসংযোগ তো করুন!

ভালো থাকুন প্রতিবেশী। ভারত বরাবর আপনাদের বন্ধু তো!

লেখাটি শেষ করি স্পেনের প্রবাদপ্রতিম কবি রাফায়েল আলবের্তির একটি অতি বিখ্যাত কবিতা La Paloma বা রাজহাঁস থেকে রচিত গান “Se equivocó la paloma” বা রাজহাঁসটি ভুল করেছিল-র কয়েকটি লাইন দিয়ে :

"রাজহাঁসটি ভুল করেছিল।
সে ভুল করত।

উত্তর দিকে যেতে গিয়ে চলে গিয়েছিল দক্ষিণে।
গমকে ভেবেছিল জল।
সে ভুল করত।

সমুদ্রকে ভেবেছিল যেন আকাশ;
রাতকে বুঝি নিশি নয়, সকাল।
সে ভুল করত।

তারাদের ভাবত বুঝি শিশির;
গরমকে ভাবত তুষারপাত।
সে ভুল করত।

যেন তোমার স্কার্ট হলো গিয়ে ব্লাউজ ;
আর তোমার হৃদয়, যেন তার বাসা।
সে ভুল করত।

(সে ঘুমিয়ে পড়েছিল ঢেউয়ের ওপর।
তুমি, গাছের ওই উঁচু ডালটায়।)"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ