হোরেশিও কিরোগার গল্প : মুণ্ডহীন মুরগিটা


অনুবাদ : দোলা সেন

মাৎসিনি আর বের্তা ফেরাজের চারটে ছেলে সারাদিন বারান্দায় একটা বেঞ্চিতে বসে থাকে। তাদের জিভ ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকে, দৃষ্টি ভাবলেশহীন, মাথা ঘোরাতে গেলেই তাদের মুখ হাঁ হয়ে যায়।

মাটির মেঝের বারান্দা, তার পশ্চিমে একটি ইটের দেওয়াল। সেই দেওয়ালের সমান্তরালে রাখা পাঁচফুট উঁচু বেঞ্চিটায় ওরা ছবির মতো বসেছিল। তাদের দৃষ্টি দেওয়ালের দিকে স্থির। অস্তগামী সূর্য ধীরে ধীরে দেওয়ালের ওপারে নেমে যেতেই হাঁদাগুলো উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। ঝলমলে আলো তাদের আকর্ষণ করে, ওদের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর হো হো হাসিতে কেঁপে ওঠে। ছোঁয়াচে রোগের মতো একজনের হাসি আরেকজনদের মধ্যে সংক্রামিত হয়– ব্যাপারটা চলতেই থাকে। তাদের চোখ লোভে চকচক করে। ভাব দেখে মনে হয়, লাল সূর্যটা যেন ওদের প্রিয় খাদ্য।

অন্য সময়ে তারা বেঞ্চিতে বসে থাকে, রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়ির আওয়াজ নকল করে গুনগুন করে। জোরালো আওয়াজে তাদের ঝাঁকুনি লাগে। তখন তারা বারান্দাময় ছোটাছুটি করে, জিভ কামড়ায়, বেড়ালের মতো মিউ মিউ করতে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই তারা হাঁদার মতো সারাদিন বেঞ্চিতে চুপ করে বসে থাকে। তাদের পা স্থিরভাবে ঝুলে থাকে, লালা পড়ে প্যান্ট ভিজে যায়।

সবচেয়ে বড় ছেলেটি বয়েস বারো বছর, আর সবচেয়ে ছোটটির আট। তাদের নোংরা হতশ্রী চেহারা মায়ের চূড়ান্ত যত্নহীনতার সাক্ষ্য দেয়।

এই চারটি জড়বুদ্ধি ছেলে একসময়ে ছিল তাদের বাবা-মায়ের চোখের মণি। মাৎসিনি আর বের্তা বিয়ের পরে নিজেদের নিয়েই সুখের সাগরে ভাসছিল। তিনমাসের মাথায় সন্তানসম্ভাবনার খবরে তাদের আনন্দের সীমা রইল না। বিয়ের চোদ্দ মাস পরে তাদের ছেলে জন্মাল যখন, তখন মাৎসিনি আর বের্তা ভাবল - এক প্রেমিক দম্পতির কাছে এর চেয়ে বড় সুখের কথা আর কীই বা হতে পারে? তাদের ক্ষুদ্র ভালোবাসা এবার স্বার্থপরতার গণ্ডি পেরিয়ে এক পবিত্র পরিণতি লাভ করবে। উত্তরাধিকারশূন্য প্রেমের চেয়ে বড় অভিশাপ তো আর নেই! তাই তারা ভেৱেছিল তাদের সুখের ঘড়া এবার পূর্ণ হয়েছে।

প্রথম দেড় বছর শিশুটি সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিল। কিন্তু এক রাতে তার ভয়ঙ্কর খিঁচুনি দেখা দিল। তারপর সকাল থেকে সে আর তার বাবা-মাকে চিনতে পারছিল না। ডাক্তার তাকে খুবই খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন। এমনকি অসুখের কারণ খুঁজতে তার বাবা-মায়ের অসুস্থতা এবং দুর্বলতারও খোঁজ নিলেন।

কিছুদিন পরে শিশুটি তার হাত-পায়ের সাড় ফিরে পেল ঠিকই, কিন্তু তার আত্মা, বুদ্ধিমত্তা এমনকি তার সহজাত প্রবৃত্তিও চিরকালের মতো হারিয়ে গেল। সে মায়ের কোলে জড়বৎ পড়ে থাকে, অর্থহীন কিছু আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই করে উঠতে পারে না।

‘আমার খোকা, আমার সোনা’ – হতভাগ্য মা তার প্রথম সন্তানের ভয়াবহ ধ্বংসস্তুপের ওপর চোখের জল ফেলতে থাকে।

ছেলেটির বাবা ডাক্তারের সাথে বাইরে আসে।

‘আমি আপনাকে এটাই বলতে পারি যে, এর কোনো চিকিৎসা নেই। হয়ত সময়ের সাথে সামান্য উন্নতি করতে পারে। তার জড়বুদ্ধি তাকে যেটুকু শিখতে দেবে, ততটুকুই তাকে শেখাতে পারবেন। তার বেশি কিছু নয়’।

মাৎসিনি ঘাড় নাড়ে – ‘আচ্ছা... কিন্তু ডাক্তার, আপনি কি মনে করেন যে এটা বংশগত রোগ, যা...’

‘বাবা-মায়ের বংশধারার কথা যদি বলেন, তো আমি যখন আপনার ছেলেকে পরীক্ষা করছিলাম, তখন খেয়াল করেছি যে ওর মায়ের একটা ফুসফুসের অবস্থা তেমন ভালো নয়। সেরকম কিছু নয়, তবে ওঁর নিঃশ্বাস প্রশ্বাস একটু অনিয়মিত। একবার ওঁরও চিকিৎসা করিয়ে নিন’।

বিষাদভারাক্রান্ত মাৎসিনির হৃদয় তার ছেলের উপর দ্বিগুণভাবে ভালোবাসা ঢেলে দিল। তার দাদু থাকলেও নাতিকে এর বেশি আদর দিতে পারতেন না। বের্তা তার প্রথম মাতৃত্বের ব্যর্থতায় গভীরভবে ভেঙে পড়েছিল। মাৎসিনি সবসময়েই বের্তার সহমর্মী হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিত।

একসময়ে স্বাভাবিক নিয়মেই এই দম্পতিটি তাদের সমস্ত ভালোবাসা ও আশা দিয়ে আরেকটি বাচ্চার জন্য প্রস্তুত হল। এবারের ছেলেটির সুন্দর স্বাস্থ্য ও হাসি তার বাবা-মায়ের আশার প্রদীপটি আবার উজ্জ্বল করে তুলল। কিন্তু তার দেড় বছর বয়েসে সেই খিঁচুনি আবার দেখা দিল। পরের দিন সকালে তার দাদার মতোই সেও জড়বুদ্ধি হয়ে গেল।

হতভাগ্য বাবা-মা একেবারই ভেঙে পড়ল। তাহলে অক্ষমতাটা তাদেরই! তার মানে, তাদের প্রেম, ভালোবাসা ও বংশ অভিশপ্ত! সবচেয়ে অভিশপ্ত বুঝি তাদের দাম্পত্য। মাৎসিনির আঠাশ আর বের্তার বাইশ বছর সমস্ত আবেগ ভালোবাসা দিয়ে একটি, কেবল একটি সুস্থ স্বাভাবিক প্রাণের জন্ম দিতে পারল না! তারা আর সুন্দর বা বুদ্ধিমান সন্তান চায় না। আর সবার যেমন থাকে, তেমনি একটি সুস্থ স্বাভাবিক সন্তানই তাদের একমাত্র কাম্য এখন।

দ্বিতীয় ভাগ্যবিপর্যয়ে তাদের আহত প্রেম এক তীব্র আকাঙ্ক্ষায় জ্বলে উঠল। পাগলের মত তারা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা আর স্নেহ উজাড় করে তাদের ভাগ্য ফেরাতে চাইল। যমজ ছেলে হলো তাদের। কিন্তু ধাপে ধাপে আগের দু-ভাইয়ের ইতিহাসই পুনরাবৃত্ত হলো আবার।

আশাভঙ্গের চরম তিক্ততা সত্ত্বেও মাৎসিনি আর বের্তা তাদের চার ছেলেকে পরম মমতায় বড় করছিল। ছেলেগুলোর মানবিক চেতনা তো হারিয়েই গেছে, তাই আত্মা নয়, পশুত্বের আদিম গহ্বর থেকে অন্তত তাদের প্রবৃত্তিটুকে জাগানোর জন্যই তারা চেষ্টা করছিল। কিন্তু ছেলেগুলো খাবার গিলতেও পারত না, নড়াচড়া করা দূরস্থান, বসতেও পারত না ঠিক করে। শেষ পর্যন্ত তারা হাঁটতে শিখল বটে, কিন্তু চলতে গিয়ে বারবার জিনিসপত্রের সঙ্গে ধাক্কা খেত। কারণ চলার পথে কোনো বাধা থাকলে তারা খেয়াল করতে পারত না।

যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মুখ লাল হয়ে যায়, ততক্ষণ স্নান করানোর সময় তারা বেড়ালের মতো মিউ মিউ করে, গলা দিয়ে গুড়গুড় আওয়াজ করতে থাকে। একমাত্র খাবার, উজ্জ্বল রঙ আর বাজ পড়ার মতো আওয়াজেই তাদের জান্তব প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে। তখন তারা হাসে, পশুর মত উত্তেজিত হয়, জিভ ঠেলে বেরিয়ে আসে, ফোয়ারার মতো লালা ছিটোয়।

প্রথমে মনে হয়েছিল এই ভয়াবহ বংশধারা এই যমজ ছেলেদের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তিনবছর পার হবার পরে মাৎসিনি আর বের্তা আবারও ভীষণভাবে আর একটি সন্তানের জন্য আকুল হয়ে উঠল। তাদের আশা এই সুদীর্ঘ বিরতির পর ভাগ্যদেবী তাদের উপর নিশ্চয়ই প্রসন্ন হয়েছেন।

কিন্তু তাদের মনোবাসনা পূর্ণ হলো না। তীব্র আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতায় দম্পতিটির হতাশা আর তিক্ততার সীমা রইল না। এতদিন তারা দুজনেই তাদের সন্তানদের দুর্ভাগ্যের জন্য নিজ নিজ অংশের দায় স্বীকার করে নিয়েছিল, কিন্তু নিজেদের জন্ম দেওয়া সেই চারটি জন্তুর মত সন্তানের পরিত্রাণের সমস্ত আশা যখন চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ল, তখন নীচ মানসিকতার মানুষের চিরন্তন অভ্যাসে, তাদের মনেও অন্যের ওপর দোষ চাপানোর সেই অপ্রতিরোধ্য প্রয়োজনবোধ জেগে উঠল।‎‎‎

শুরু হয়েছিল সর্বনামের পরিবর্তন দিয়ে – আমাদের বদলে ‘তোমার ছেলেরা’ ব্যবহারে।

তারা এই পারস্পরিক দোষারোপের বৃত্ত থেকে বরোতে চাইছিল না। বরং একে অন্যকে অপমান করে পরিবেশ আরও বিষিয়ে তুলছিল।

বাইরে থেকে ফিরে হাত ধুতে ধুতে মাৎসিনি বের্তাকে বলে – ‘আমার মনে হচ্ছে যে ছেলেদের আরেকটু পরিচ্ছন্ন রাখা উচিত’।

বের্তা হাতের বইটা পড়তে থাকল – কথাটা যেন ওর কানেই যায়নি। একটু পরে নিজের মনেই বলল – ‘এই প্রথম তুমি তোমার ছেলেদের ব্যাপারে মাথা ঘামালে’।

মাৎসিনি বের্তার দিকে তাকিয়ে মুখে জোর করে হাসি ফোটাল – ‘আমাদের ছেলে বোধহয়’।

বের্তা চোখ তুলে তাকাল এবার – ‘ঠিক আছে। আমাদের ছেলে – এবার খুশি?’

মাৎসিনি এবার সরাসরি আক্রমণে গেল – ‘তুমি নিশ্চয়ই আমাকে দোষী প্রমাণ করতে চাইছ না?’

বের্তা মলিনভাবে হাসল – ‘নিশ্চয় না। কিন্তু আমিও দায়ী নই। এটুকুই আমার একমাত্র চাওয়া যে...’

- ‘কি সেটা? যা নাকি তোমার একমাত্র চাওয়া?’

- ‘যদি কাউকে দায়ী করতেই হয়, সেটা আমাকে নয়, সেটুকু মনে রাখলেই চলবে। আমি এটাই বলতে চাইছি’।

তার স্বামী তাকে আঘাত করার এক জান্তব ইচ্ছা নিয়ে তার দিকে তাকাল। কিন্ত শেষ পর্যন্ত হাত মুছতে মুছতে বলল – ‘ছাড়ো এবার’।

‘ ঠিক আছে, কিন্তু যদি তুমি ভাবো যে..’

‘বের্তা!’

‘ যেমন তোমার মর্জি!’

এটা প্রথম সংঘাত। তার অনুসরণে এল আরও অনেক। কিন্তু প্রতি ঝগড়ার পরেই অবধারিতভাবে মিটমাট হয়ে যেত। আর তারা দ্বিগুণ আবেগে পুরোনো ক্ষত নিরাময়ের জন্য একটি সুস্থ বাচ্চার কামনায় মিলিত হত।

এইবারে তাদের একটি মেয়ে জন্মাল। তার প্রথম দুটি বছরে মাৎসিনি আর বের্তার সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে থাকল ভয় আর উদ্বেগ । কিন্তু এবার কোন দুর্ঘটনা ঘটল না। বরং কৃতজ্ঞ বাবা-মায়ের সবটুকু প্রশ্রয়েরর কেন্দ্রে থেকে মেয়েটি দিন দিন উদ্ধত ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠছিল।

যদিও এত বছর বের্তা যত্ন নিয়ে তার চার ছেলের দেখাশোনা করত, বেরিতার জন্মের পরে সে যেন ছেলেদের কথা ভুলেই গেল। এখন ওদের কথা তার কাছে এক বিভীষিকাময় অতীতের আতঙ্কের স্মৃতি – যা তাকে বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়েছিল। মাৎসিনির মনোভাবও একই ধরণের, তবে তার অনুভূতির তীব্রতা কিছুটা কম।

অবশ্য তারা শান্তি পায়নি। মেয়েকে হারাবার ভয় তাদের এতই তীব্র ছিল যে, তার সামান্যতম অসুবিধাও তাদের দুর্বল বংশধারার তিক্ততাকে লাগামছাড়াভাবে প্রকাশিত করত। দীর্ঘদিনের লালিত ক্ষোভ সামান্যতম প্ররোচনাতেই বিষ ঝরাত। এই বিষাক্ত কলহের সূত্রপাতেই তারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলল। একে অপরকে সম্পূর্ণরূপে অপমান ও হেয় করে তারা এক নিষ্ঠুর তৃপ্তিলালাভ করত। যৌথ ব্যর্থতার দায় এতদিন তাদের সংযত রেখেছিল। কিন্তু আজকের সাফল্যের কৃতিত্ব তারা দুজনেই একান্ত নিজের বলে ভাবতে শুরু করল। অবশেষে তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে গেল যে, অপরজনের জন্যেই সে এই অভিশপ্ত অস্বাভাবিক সন্তানদের জন্মের অসম্মান সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে।

এই মানসিকতার ফলে চার ছেলের জন্যে তাদের আর কোন স্নেহ থাকার সম্ভাবনা রইল না। পরিচারিকাটি ছেলেগুলোকে চূড়ান্ত অবহেলা ও অযত্নের সাথে খাওয়াত, পরাত এবং শোওয়াত। স্নান তো প্রায়দিনই করাত না। বেশিরভাগ সময়েই ছেলেগুলো দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে থাকত। তাদের চেহারায় আদরযত্নের কোন ছাপ ছিল না।

তার চার বছরের জন্মদিনের রাতে, বেরিটা অনেক মিষ্টি খেয়ে ফেলে। তাকে নিষেধ করার ক্ষমতা তার বাবা-মায়ের ছিল না। রাতে শীত করে তার হালকা জ্বর এল। আবার একটি জড়বুদ্ধি শিশুর আগমনের আতঙ্ক বেচারিদের গ্রাস করল।

তিন ঘণ্টা তারা একে অন্যের সাথে কথা বলে নি। মাৎসিনির দ্রুত পায়চারি বের্তাকে সেই সুযোগ এনে দিল।

‘ঈশ্বরের দোহাই, তুমি আস্তে হাঁটতে পার না? কতবার বলেছি...’

‘আচ্ছা বাপু। আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আর পায়চারি করব না। আসলে আমি ইচ্ছে করে করি নি’।

বের্তা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল – ‘না না, অবশ্যই না। তোমার সম্বন্ধে এটা তো ভাবাই যায় না!’

‘আমিও কি কোনদিন ভেবেছি যে তুমি... তুমি একটা যক্ষারোগী?’

‘কী? কী বললে তুমি?’

‘কিচ্ছু না’।

‘নিশ্চয়ই বলেছ। আমি শুনেছি তুমি কিছু বললে। দেখ, আমি জানি না তুমি কী বলেছ, কিন্তু দিব্বি গেলে বলতে পারি যে আমি তোমার চেয়ে অন্য যে কাউকেই বাচ্ছার বাবা হিসেবে পছন্দ করব’।

মাৎসিনি সাদা হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত ঘষে জবাব দিল - ‘অবশেষে! শেষ পর্যন্ত নাগিনী, তোমার মনের কথাটা সামনে এল!’

‘আমিই সাপ, তাই না? কিন্তু মনে রেখ আমার বাবা-মা সুস্থ ছিলেন। তোমার বাবার মতো উন্মাদের প্রলাপ বকতে বকতে মারা যাননি। আমি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম ছিলাম। ওই চারজন তোমার, হ্যাঁ তোমারই ছেলে!’

‘বিষাক্ত যক্ষারোগী কোথাকার! এটাই তোমার নাম। আমি তোমাকে এটাই বলতে চাই। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে দেখগে যাও, তোমার ছেলেদের মেনিনজাইটিসের জন্য দায়ী কে? আমার বাবা না তোমার ওই পচাগলা ফুসফুস? বুঝেছ সাপিনী?’

তাদের ঝগড়ার হিংস্রতা ক্রমশঃ বাড়ছিল। এমন সময় বেরিতার গোঙানির আওয়াজ তাদের হঠাৎই চুপ করিয়ে দিল। রাত একটা নাগাদ, মেয়েটির সামান্য বদহজম সেরে গেল। তারপর স্বাভাবিকভাবেই একদা প্রেমিক দম্পতিটির মিটমাটও হয়ে গেল। বরং তারা একে অপরকে যে খারাপভাবে আঘাত করেছিল, তা ভুলতেই যেন তাদের মিলন আরও আবেগ ও উচ্ছাসে ভরে উঠল।

সুন্দর সকালে বের্তার ঘুম ভাঙতেই তার মুখ দিয়ে কিছুটা রক্ত বেরিয়ে এল। রাত্রের ভয়ানক আবেগ ও দুশ্চিন্তাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। মাৎসিনি তাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল অনেকক্ষণ। দুজনের কেউই কোন কথা বলতে পারছিল না।

দশটা নাগাদ তার ঠিক করল যে দুপুরের খাবারের পরে তারা বাইরে ঘুরতে যাবে। হাতে সময় কম, তাই তারা পরিচারিকাটিকে একটা মুরগি কাটতে বলল।

ঝলমলে উজ্জ্বল দিনটি চার জড়বুদ্ধি ছেলেকে তাদের চিরচারিত বেঞ্চের আসন থেকে বাইরে টেনে এনেছিল। রান্নাঘরে তখন পরিচারিকা একটি মুরগির গলা এমনভাবে কাটছিল, যাতে রক্ত খুব বেশি বের না হয়। মাংস টাটকা রাখার এই কৌশল বের্তা তার মায়ের কাছ থেকে শিখেছিল। এমন সময় পরিচারিকাটি যেন তার ঘাড়ের পিছনে কারও নিশ্বাস অনুভব করল।।

ঘুরে তাকিয়ে সে দেখে, ছেলে চারটি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। তাদের দৃষ্টি স্থির—মন্ত্রমুগ্ধের মতো তারা দৃশ্যটি দেখছে।

লাল... লাল...

‘মালকিন! দেখুন ছেলেরা রান্নাঘরে চলে এসেছে!’

বের্তা সঙ্গে সঙ্গে সেখানে হাজির হল। সে কোনদিনই চায়নি তার রান্নাঘরে এই ছেলেগুলোর পা পড়ুক। এমনকি আজকের এই পুনর্মিলনের দিনে, যখন তারা একে অপরকে ক্ষমা করেছে এবং আবার সুখী হয়েছে – তখন এই বীভৎস দৃশ্যে সে চরম বিরক্ত হল। স্বামী ও কন্যার প্রতি তার ভালোবাসা যতই তীব্র হয়ে উঠল, এই দানবগুলোর প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা ততই বেড়ে গেল। এমনটাই হয়, এটাই স্বাভাবিক।

‘এদের এখান থেকে সরাও মারিয়া! আমি বলছি, দূর করে দাও এগুলোকে’।

বেচারা জন্তু চারটি, ঘাড়ধাক্কা খেয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবার তাদের বেঞ্চিতে ফিরে গেল।

খাওয়াদাওয়ার পরে সকলেই বেড়াতে বেরোল। পরিচারিকাটি গেল বুয়েনস এয়ারসে। আর দম্পতিটি তাদের মেয়েকে নিয়ে গ্রামের পড়শীদের বাড়িতে দেখা করতে গেল। সূর্যাস্তের সময় তারা ফিরে আসছিল, কিন্তু বের্তা পথে এক পড়শির সাথে কথা বলার জন্যে দাঁড়াল। মেয়েটি এক দৌড়ে বাড়ি ঢুকে গেল।

সারাদিন হাঁদা ছেলেগুলো বেঞ্চিতেই বসেছিল। সূর্য তখন দেওয়ালের পিছনে ডুবে যাচ্ছিল। অন্যদিনের চেয়েও জড়োসড়ো হয়ে হাঁদাগুলো সেই দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ করেই তাদের দৃষ্টি আর দেওয়ালের মাঝখানে কিছু এসে দাঁড়াল। তাদের বোন। সে পাঁচঘণ্টা বড়দের সঙ্গে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে কিছুটা সময় নিজের মত করে ঘুরতে চাইছিল। সে দেওয়ালের নিচে এসে – কিভাবে এটার ওপর চড়া যায় ভাবছিল। সব দ্বিধা সরিয়ে সে ওপরে ওঠার বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নিল। ভেবেচিন্তে সে একটা আসনভাঙা চেয়ার জোগাড় করল, কিন্তু সেটা দিয়ে ওপরে ওঠা গেল না। তখন সে একটা কেরোসিনের টিন এনে চেয়ারের ওপর সঠিকভাবে বসিয়ে ফেলল। উচ্চতা আর স্থান সম্বন্ধে তার ধারণা একেবারে নিখুঁত। সে এবার সফল হল।

হাঁদা ছেলেগুলো তাদের অর্থহীন দৃষ্টি মেলে দেখছিল তাদের বোন কিভাবে ধীরে ধীরে তার ভারসাম্য বজায় রেখে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে, হাত দিয়ে দেওয়াল ধরে তার ওপর গলা রাখল। তারা দেখছিল কিভাবে সে ওপরে ওঠার জন্য দেওয়ালে একটু পা রাখার জায়গা খুঁজছে।

নির্বোধ চার ছেলের চোখ হঠাৎই প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। এক একরোখা জেদ তাদের সকলের চোখে জ্বলে উঠল। বোনের ওপর এখন তাদের দৃষ্টি স্থির। জান্তব খিদে ও লোভের অনুভূতি বাড়তে বাড়তে তাদের মুখের প্রতিটি রেখাকে বদলে দিচ্ছিল।

ধীরে ধীরে তারা দেয়ালের দিকে এগিয়ে এল।

ছোট্ট মেয়েটি তখন কোনো রকমে পা রাখার জায়গা খুঁজে পেয়েছে এবং দেয়ালের ওপর চড়ে বসতে যাচ্ছে। প্রায় নিশ্চিতভাবেই ওপাশে পড়বে এমন অবস্থায় সে অনুভব করল, কেউ তার একটি পা শক্ত করে ধরে ফেলেছে।

নিচের দিকে তাকিয়ে সে দেখল, আটটি চোখ তার দিকে স্থির হয়ে চেয়ে রয়েছে।

সেই দৃষ্টি তাকে আতঙ্কে জমিয়ে দিল।

সে প্রাণপণে পা ঝাঁকাতে লাগল - ‘ছাড় বলছি! আমাকে যেতে দাও’। কিন্তু সে তখন বন্দী!

‘মা. ও মা, মাগো! ও বাবা’ – সে আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল, প্রাণপণে দেওয়াল আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইল, কিন্তু প্রবল টান তাকে নীচে নামিয়ে আনল।

‘মাআআআআ’ – সে আর চেঁচাতে পারল না। ছেলেদের একজন তার গলাটা মুচড়ে ধরেছে। তার কোঁকড়ানো চুলগুলোকে এমনভাবে সরিয়েছে, যেন সেগুলি চুল নয় পালক! বাকি তিনজন তার একটা পা ধরে টানতে টানতে রান্নাঘরে নিয়ে চলল। সেই রান্নাঘর, যেখানে সকালে মুরগি কাটা হয়েছে। তারা তাকে শক্ত করে ধরে ঠিক সেভাবেই ধীরে ধীরে রক্ত বের করে কেটে ফেলছিল।

রাস্তার ওপারে এক বাড়িতে মাৎসিনি তার মেয়ের আওয়াজ শুনতে পায়। সে বের্তাকে বলল – ‘আমার মনে হয় বেরিতা তোমায় ডাকছে’।

তারা কান করে শুনল। কিন্তু আর কিছু শুনতে পেল না। তাদের অস্বস্তি হচ্ছিল। তারা তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকে গেল। বের্তা যখন তার টুপি খুলে রাখছিল, মাৎসিনি বারান্দায় উঠে এল – ‘বেরিতা!’

কেউ উত্তর দিল না। ‘বেরিতা!’ – তার স্বর আশঙ্কায় তীক্ষ্ণ হল।

তার সদা আতঙ্কিত মন এই শ্মশানের নীরবতায়, এক ভয়ঙ্কর অমঙ্গলের পূর্বাভাস পেয়ে শিউরে উঠল। তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।

‘মেয়ে, আমার মেয়ে’ – সে পাগলের মতো বাড়ির পিছনদিকে দৌড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার চোখে পড়ল - মেঝের ওপর রক্তের এক লাল সমুদ্র ছড়িয়ে রয়েছে। সে ভীষণ জোরে ধাক্কা দিয়ে ভেজানো দরজা খুলেই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। বের্তা, মাৎসিনির আর্তনাদ শুনে, নিজেও চিৎকার করে দৌড়ে আসছিল। রান্নাঘরের দিকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু মাৎসিনি—মৃতদেহের মতো বিবর্ণ তার মুখ—তার সামনে এসে দাঁড়াল এবং তাকে জোর করে ধরে রাখল।

‘যেও না... ভেতরে যেও না...’

কিন্তু ততক্ষণে বের্তা রক্তে ভেসে যাওয়া মেঝে দেখে ফেলেছে। তার গলা দিয়ে শুধু একটি ভাঙা আর্তনাদ বের হল। দু'হাত মাথার ওপর তুলে দিয়ে স্বামীর বুকে লুটিয়ে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে মেঝেতে পড়ে গেল।


লেখক পরিচিতি : হোরাশিও কিরোগা (জন্ম ১৮৭৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর এবং মৃত্যু ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭) উরুগুয়ের নাট্যকার, কবি ও ছোটগল্পকার। তাঁর বেশির ভাগ গল্প জঙ্গলের পটভূমিতে লেখা। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি মূলত ফুটিয়ে তুলেছেন বেঁচে থাকার সুতীব্র লড়াই। মানসিক অসুস্থতা বা হ্যালুসিনেশনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভা অনবদ্য। কিরোগার সাহিত্যকর্ম দিয়ে প্রভাবিত হয়েছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এবং হোলিও কোর্তাসারের মতো বিশ্ববিখ্যাত লেখক। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে, দি ফিদার পিলো, স্টোরিস অব লাভ, ম্যাডনেস, অ্যান্ড ডেথ, জাঙ্গল টেলস, আনাকোন্ডা, দি ডিক্যাপিটেটেড চিকেন অ্যান্ড আদার স্টোরিস।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ