অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
পর্ব-৪৪
মার্চের সেই বিকেলে হাওয়া চলছিল খুব, আর দিনটা ছিল বেশ হাড় কাঁপানো। স্কারলেট যাচ্ছিল ডিক্যাটুর রোড ধরে জনি গ্যালাঘারের মিলের উদ্দেশ্যে। কোলের ওপর পড়ে থাকা গরম ঢাকাটা কাঁধ পর্যন্ত তুলে দিয়েছে। একা একা গাড়ি চালিয়ে যাওয়াটা আগেকার মত মোটেই নিরাপদ নয়। কথাটা স্কারলেটের অজানা নয়। কারণ আজকাল নিগ্রোদের বাগ মানানো খুবই কঠিন। আইনসভা সংশোধনীতে সীলমোহর দিতে অস্বীকার করায়, সমস্যা যে হাতের বাইরে চলে যাবে, অ্যাশলে অনেক আগেই বলেছিল। মুখের ওপর না করে দেওয়ায় উত্তরের প্রশাসন যারপরনাই ক্ষেপে গেল, যেন ওদের গালে কেউ সপাটে থাপ্পড় মেরেছে, প্রত্যাঘাত আসতেও দেরি হল না। রাজ্যের ওপর নিগ্রো ভোট চাপিয়ে দেওয়ার জন্য উত্তরদিক ধনুর্ভাঙা পণ করে ফেলল। জর্জিয়াকে বিদ্রোহী রাজ্য ঘোষণা করে কড়া সামরিক আইন লাগিয়ে দেওয়া হল। রাজ্য হিসেবে জর্জিয়ার মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হল। ফ্লোরিডা আর অ্যালাবামার সঙ্গে জর্জিয়াও ফেডারেল জেনারালের শাসনাধীন ‘তিন নম্বর সামরিক জেলা’তে পরিণত হল।
অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা বহুদিন থেকেই ভয়াবহ আর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু এখন তার মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে গেল। যেসব সামরিক আইনকে কিছুদিন আগেও কঠোর বলে মনে হত, জেনারাল পোপের ফতোয়া জারি হওয়ার পর আগের আইনকেই তুলনামূলকভাবে সহনীয় মনে হল। নিগ্রো শাসনের সম্ভাবনার কথা ভেবে প্রত্যেকেই তমসাচ্ছন্ন আর নিরাশাময় একটা ভবিষ্যতের আশঙ্কায় অধীর হয়ে পড়ল। সমগ্র রাজ্য তীব্র হতাশা আর নিষ্ফল ক্রোধে ছটফট করছে। আর নিগ্রোরা তো আস্কারা পেয়ে একেবারে ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে। ওরা বুঝে গেছে ইয়াঙ্কি সৈন্যরা ওদের পেছনে আছে, তাই একেবারে হাতে মাথা কাটতে শুরু করেছে।
ওদের হাতে পড়লে কারোর রক্ষে নেই।
এমন এক ভয়াবহ বন্য পরিস্থিতিতে, স্কারলেট রীতিমত ভীত, সন্ত্রস্ত – ভয় পেলেও লক্ষ্যে কিন্তু অবিচল, তাই ঘোরাঘুরিটা একা একাই করে চলেছে। জুড়িগাড়ির গদির ফাঁকে ফ্র্যাঙ্কের রিভলভারটা গোঁজা থাকে। এরকম একটা বিপর্যয় ডেকে আনার জন্য মনে মনে আইনসভাকে গালাগালি করে। এরকম একটা দুঃসাহস দেখিয়ে কোন চতুর্বর্গ লাভ হল! আর সবাই কিনা এই দুঃসাহসকে বলছে বীরত্বের পরিচয়! অথচ এর জন্যই পরিস্থিতিটা একেবারে হাতে বাইরে চলে গেছে!
খাড়ির ধারে যেখানে বস্তিটা গজিয়ে উঠেছে সেদিকে যাবার পথটা আসতেই স্কারলেট ঘোড়াকে হ্যাট হ্যাট করে গতি বাড়াতে বলল। সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত নোংরা আর দূষিত তাঁবুগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রত্যেকবারই অস্বস্তিবোধ করে। ওই সব তাঁবু এখন সমাজচ্যুত নিগ্রো, কৃষ্ণাঙ্গ বেশ্যা আর অত্যন্ত নিম্নশ্রেণির অশিক্ষিত শ্বেতাঙ্গদের ডেরা। শোনা যায় জায়গাটা নাকি নিগ্রো আর শ্বেতাঙ্গ দুষ্কৃতিদের আড্ডা। কোনও দাগী অপরাধির হদিশ করতে ইয়াঙ্কিরা সেনারাও নাকি প্রথমে এখানেই হানা দেয়। মারামারি, খুনোখুনি এদের অধ্যে নিত্যই লেগে থাকে, তাই প্রশাসনও এখানে কিছু ঘটলে তদন্ত করার দায়ও নেয় না, নিজেদের মধ্যেই বোঝাপড়া করে নেওয়ার জন্য ছেড়ে দেয় বস্তির বাসিন্দাদের। জঙ্গলের ভেতরে এখনও একটা ভাটিখানা আছে, যেখানে নিম্নমানের কর্ন হুইস্কি তৈরি করা হয়। রাত বাড়লেই খাড়ির ধারের ক্যাবিনগুলোর থেকে মাতলামি করে চীৎকার আর অশ্লীল গালিগালাজের আওয়াজ ভাসতে থাকে।
এমনকি ইয়াঙ্কিরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে ওটা একটা উপদ্রবের জায়গা, ওটার উচ্ছেদ করা দরকার, তা সত্ত্বেও ওরা কোনও পদক্ষেপই নেয়নি।
অ্যাটলান্টা আর ডিক্যাটুরের বাসিন্দারা – যারা এই দুই শহরে যাতায়াতের জন্য ওই রাস্তাটা ব্যবহার করতে বাধ্য হত – তারা খুবই সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। ওই বস্তির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় পুরুষমানুষেরা কোমরে খোলা পিস্তল নিয়ে যেতেন, ভদ্রমহিলারা পারতপক্ষে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে্ন না, এমনকি সঙ্গে তাঁদের পুরুষ আত্মিয়স্বজনদের ভরসাতেও নয়। কারণ মাতাল নিগ্রো বেশ্যারা রাস্তার ধার ঘেঁষে বসে অপমানজনক কথাবার্তা বলত বা অশ্রাব্য গালিগালাজ করত।
যতদিন আর্চি ওর সঙ্গে থেকেছে, স্কারলেট এই বস্তি নিয়ে একদম দুশ্চিন্তা করেনি, কারণ অত্যনত বেয়াদব কোনও নিগ্রো মেয়েমানুষ ওর দিকে তাকিয়ে হাসবার সাহসও পেত না। এখন ওকে নিজেই গাড়ি চালাতে হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু উৎপাত আর মাথা খারাপ করে দেবার মত ঘটনা ঘটে গেছে। নিগ্রো বেশ্যারা ওকে দেখলেই টিটকিরি দিতে শুরু করে। ওদের অগ্রাহ্য করা ছাড়া স্কারলেটের কিছুই করার থাকে না। রাগে ওর গা জ্বলে যায়। বাড়িতে বা পড়শিদের কাছে মন খুলে এই সব কথা বলে একটু হাল্কা হওয়া যাবে তারও উপায় নেই। পড়শিরা সবজান্তা ভাব দেখিয়ে বলবে, “তা তুমি কেমন ব্যবহার আশা করেছিলে শুনি?” আর বাড়ির লোকেরা ভয় পেয়ে হট্টগোল ফেলে দেবে আর ওর বাইরে বেরনো বন্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লাগবে। আর সেরকম কিছু হতে দেওয়ার বিন্দুমাত্র বাসনা ওর নেই।
কী ভাগ্য আজ রাস্তার ধারে ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরা একটাও মেয়েমানুষ বসে নেই! যে রাস্তাটা বস্তির দিকে গেছে, সেদিক দিয়ে যাবার সময় দেখল বিকেলের চড়া রোদ খাপরার বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে। বিতৃষ্ণার দৃষ্টি নিয়ে একবার তাকাল। মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া চলছে। কাঠকয়লার ধুঁয়ো, পোর্ক ভাজা আর খাটা পায়খানার গন্ধ মিলেমিশে ওর নাকে এসে লাগল। নাক বন্ধ করে, ঘোড়ার পিঠের ওপর কষে চাবুক চালিয়ে বাঁকটা পার করে নিল।
যেই একটু হাঁপ ছেড়ে নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করেছে, আকস্মিক আতঙ্কে ওর বুকে হাতুড়ি পেটা শুরু হয়ে গেল। বিশালাকায় একটা নিগ্রো বিরাট একটা ওকে গাছের আড়াল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। ভয় পেলেও স্কারলেটের বুদ্ধিভ্রংশ হল না। মুহুর্তের মধ্যে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে ফ্র্যাঙ্কের পিস্তলটা হাতে তুলে নিল।
“কী চাও তুমি?” স্কারলেট গলাটা যথাসম্ভব কড়া করে জিগ্যেস করল। বিশালাকায় নিগ্রোটা ওক গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। যে গলায় জবাব দিল সেটা রীতিমত আতঙ্কিত।
“হে ভগবান, মিস স্কারলেট, বিগ স্যামকে দয়া করে গুলি করবেন না!”
বিগ স্যাম! পলকের জন্য স্কারলেটের মাথাটা গুলিয়ে গেল। বিগ স্যাম, মানে টারার সেই ফোরম্যান, অবরোধের সময় ওর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা কিরকম –
“বেরিয়ে এস আড়াল থেকে। আমাকে দেখতে দাও যে তুমি সত্যি সত্যিই স্যাম!”
খুব অনিচ্ছাসহকারে লোকটা আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। দৈত্যাকার চেহারা, পরনে ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক, পায়ে জুতো নেই। ডেনিমের যে পাজামা আর ইউনিয়নের ইউনিফর্মের যে নীল জ্যাকেটটা পরে আছে দুটোই ওর চেহারার তুলনায় এত ছোট যে গায়ে এঁটে বসেছে। যখন বুঝতে পারল লোকটা বাস্তবিকই স্যাম, স্কারলেট পিস্তলটা বগির গদির মধ্যে গুঁজে দিল। উৎফুল্ল হয়ে উঠল।
“ওহ্ স্যাম, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে কী ভালই না লাগছে!”
স্যাম এক লাফে বগির কাছে চলে এল। আনন্দে ওর চোখ জ্বলজ্বল করছে। মুখের ভেতর থেকে ঝকঝকে সাদা দাঁত উঁকি মারছে। স্কারলেটের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ওর হ্যামের স্লাইসের মত বড় বড় দুটো কালো হাতে তুলে নিল। তরমুজের মত গোলাপি জিভ বেরিয়ে এল। আনন্দের উচ্ছ্বাসে ওর শরীরটা দুলে দুলে উঠছে, ঠিক একটা ম্যস্টিফের তিড়িং বিড়িং লাফানির মত।
“হে ভগবান, অনেকদিন বাদে পরিবারের একজনকে দেখতে পেয়ে খুব ভাল লাগছে!” ও কেঁদে কেঁদে বলল। স্কারলেটের হাতের ওপর ওর হাতের চাপ এত বেড়ে চলেছিল যে স্কারলেটের মনে হচ্ছিল হাড় বুঝি ভেঙে যাবে। “কী ব্যাপার, মিস স্কারলেট, আপনি আজকাল এত বেপরোয়া হয়ে গেছেন, যে বন্দুক তাক করেন?”
“চারদিক এমন বদ লোকে ছেয়ে গেছে আজকাল, স্যাম, যে তাক না করে উপায় নেই। কিন্তু একজন মর্যাদাবান ডার্কি হয়েও, তুমি এই নোংরা শ্যান্টিটাউনে কী করছ? শহরে গিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করলে না কেন?”
“বিশ্বাস করুন, মিস স্কারলেট, শ্যান্টিটাউনে আমি থাকি না। অল্প কয়েকদিনের জন্য এখানে সময় কাটাচ্ছিলাম। কারণ ছাড়া কেউ আমাকে এখানে থাকাতে পারবে না। জীবনে আমি এরকম অসভ্য নিগার দেখিনি। আপনি যে ‘ল্যান্টায় আছেন, সেটাও জানতাম না। ভেবেছিলাম আপনি টারায় থাকবেন। খুব শীগগিরই টারায় ফিরে যেতাম, একটু সুযোগ করে উঠতে পারলেই”।
“শহর ঘেরাওয়ের সময় থেকেই অ্যাটলান্টায় আছ তুমি?”
“না, ম্যাম! ঘোরাঘুরি করছিলাম!” স্যাম স্কারলেটের হাতটা ছেড়ে দিল। বেদনাদায়কভাবে স্কারলেট হাতটা নাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করল হাড়গুলো ঠিকঠাক আছে কী নেই। “মনে আছে, আমার সঙ্গে কবে শেষবার দেখা হল আপনার?”
প্রচণ্ড গরমের সেই দিনটা স্কারলেটের মনে পড়ে গেল। তখনও অবরোধ শুরু হয়নি। রেটের সঙ্গে ওঁর গাড়িতে বসে, একদল নিগ্রো, বিগ স্যাম ওদের মাথা, ধুলো উড়িয়ে মার্চ করতে করতে পরিখার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ‘গো ডাউন মোজ়েস’ গাইতে গাইতে। স্কারলেট ঘাড় হেলালো।
“দেখুন, আমি কুকুরের মত পরিশ্রম করতাম। খাই কাটতাম, বালির বস্তা ফেলতাম, যতদিন না কনফেডারেটরা অ্যাটলান্টা ছেড়ে গেল। যে ক্যাপ্টেন ভদ্রলোক আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি লড়াইতে মরে গেলেন। তখন বিগ স্যামকে কী করতে হবে বলে দেওয়ার কেউ রইল না। ঝোপের আড়ালে কিছুদিন লুকিয়ে থাকলাম। টারায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করব বলে ভাবছিলাম। কিন্তু শুনতে পেলাম টারার চারপাশের পুরো কাউন্টিটাই নাকি ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া আমার ফিরে যাবার কোনও উপায়ও ছিল না। ভয় হচ্ছিল যারা চৌকি দিচ্ছিল, ওরা আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। আমার কোনও পাস (অনুমতি পত্র) ছিল না। তারপর একজন ইয়াঙ্কি ভদ্রলোক এলেন, কর্নেল, আমাকে ওঁর পছন্দ হল, উনি আমাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। ওখানে আমি ওঁর ঘোড়ার দেখভাল করতাম আর জুতো পালিশ করেও দিতাম।
“হ্যাঁ, ম্যাম! নিজেকে আমার বড় বলে মনে হত, ঠিক পোকের মত আমি মালিকের সেবা করতাম। আগে তো আমি খেতমজুরের বেশি কিছু ছিলাম না। আমি কর্নেলকে বলেছিলাম যে আমি একজন খেতমজুর, আর উনি – কী বলব, মিস স্কারলেট, ইয়াঙ্কিরা এত অজ্ঞ হয় না! দুটোর মধ্যে তফাৎ কী, সেটাই ওঁর জানা ছিল না! তো আমি ওঁর সঙ্গে থাকতাম, তারপর ওঁর সঙ্গে স্যাভান্নায় চলে গেলাম, জেনারাল শেরম্যান যখন ওখানে গেলেন! তবে কী বলব, মিস স্কারলেট, স্যাভান্না যাওয়ার সময়টা কিছুতেই ভুলতে পারব না! শুধু লুটপাট আর আগুন লাগিয়ে দেওয়া – ওরা কি টারাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, মিস স্কারলেট?”
“আগুন লাগিয়েছিল ওরা। তবে আমরা নেভাতে পেরেছিলাম।”
“জেনে খুব ভাল লাগছে, ম্যাম। টারা আমার বাড়ি। ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছি। লড়াই যখন খতম হয়ে গেল, কর্নেল আমাকে বললেন, ‘স্যাম, শোনো! তুমি আমার সঙ্গে উত্তরে চল। আমি তোমাকে ভাল মাইনে দেব।’ হ্যাঁ, ম্যাম, অন্য নিগারদের মত আমারও ইচ্ছে করছিল মুক্তির স্বাদ পেতে। তাই কর্নেলের সঙ্গে উত্তরে চলে গেলাম। হ্যাঁ, ম্যাম, ওয়াশিঙ্গটনে গেলাম, নিউ ইয়র্কে গেলাম, তারপরে বোস্টনে, ওখানেই কর্নেলের বাড়ি। জানেন, ম্যাম, আমি হলাম গিয়ে ঘোরাঘুরি করা একজন নিগার! মিস স্কারলেট, রাস্তাঘাটে কত ঘোড়া আর ঘোড়ার গাড়ি আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। সারাক্ষণ কী ভয় পেতাম, এই বুঝি চাপা পড়ে গেলাম!”
“উত্তর তোমার ভাল লেগেছিল, স্যাম?”
স্যাম জট পাকানো চুলে হাত বোলালো।
“লেগেছে – আবার লাগেওনি। কর্নেল – উনি খুবই ভাল লোক, নিগ্রোদের বুঝতেন। কিন্তু ওঁর স্ত্রী – উনি একেবারে অন্য রকম ছিলেন। ওঁর স্ত্রী – প্রথম যখন আমাকে দেখলেন – আমাকে ‘মিস্টার’ বলে ডাকলেন। হ্যাঁ ম্যা’ম, উনি ওই নামে ডাকলে ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। কর্নেল সাহেব একদিন বলে দিলেন আমাকে ‘স্যাম’ বলে ডাকতেন। তারপর থেকে উনি তাই করতেন। সব ইয়াঙ্কি লোকরাই – প্রথম দেখা হলেই ‘মিস্টার ও’হারা বলে ডাকত। ওরা আমাকে ওদের সঙ্গে বসতে বলত, যেন আমিও ওদেরই দলের একজন। যাই হোক আমি ওই সাদা লোকদের সঙ্গে একসাথে একদিনও বসিনি, আর আমি এত বুড়ো হয়ে গেছি, নতুন করে কিছু শেখাই সম্ভব নয়। ওরা ভাবখানা এমন করত যেন আমি ওদেরই একজন, কিন্তু, মিস স্কারলেট, মনে মনে কেউ আমাকে পছন্দ করত না – কোনও নিগ্রোকেই ওরা পছন্দ করত না। ওরা আমাকে দেখে ভয় পেত, কারণ আমার চেহারা এত বড়। আর কী বলব, ওরা আমার কাছে জানতে চাইত, শিকারি কুকুর আমার পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হত কিনা, আর কী ভাবে আমাকে পেটানো হত! ভগবান জানেন, মিস স্কারলেট, আমাকে কখনও পেটানো হয়নি! আপনি তো জানেন, মিস স্কারলেট, আমার মত কাজের নিগারকে মিস্টার ও’হারা কখনওই সেটা হতে দিতেন না!
“আমি যখন সেই কথা ওদের বলতাম, বলতাম মিস এলেন কত ভাল ছিলেন, আমার যখন নিউমোনি হল, গোটা একটা সপ্তাহ ধরে আমার সেবা করেছিলেন, ওরা আমার কথা বিশ্বাসই করতে চাইত না। মিস স্কারলেট, আমার মিস এলেনের জন্য মন কেমন করত, টারার জন্য মন কেমন করত। মনে হত আর আমি সহ্য করতে পারব না। তাই এক রাতে বাড়ি ফিরে আসার জন্য আমি বেরিয়ে পড়লাম। মালগাড়িতে চেপে ‘ল্যান্টা চলে এলাম। আপনি যদি আমাকে টারার একটা টিকিট কিনে দেন, তাহলে আমি বাড়ি ফিরে যেতে পারি। মিস এলেন আর মিস্টার জেরাল্ডের সঙ্গে আবার দেখা হবে, কী ভাল লাগবে! অনেকদিন মুক্তির আস্বাদ নেওয়া হয়ে গেছে। এখন আমি চাই কেউ আমাকে আগের মত পুষ্টিকর খাবার খেতে দিক, আমাকে বলুক কী করতে হবে, আর কী করতে হবে না। শরীর খারাপ হয়ে গেলে, কেউ আমার পাশে থাকবে। ধরুন আবার যদি আমার নিউমোনি হয়, তখন? ওই ইয়াঙ্কি লেডি কি আমার সেবাযত্ন করবেন? না, ম্যা’ম! উনি আমাকে মিস্টার ও’হারা বলে ডাকবেন, কিন্তু দেখাশোনা করবেন না। কিন্তু মিস এলেন করবেন, আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে – কী হল, মিস স্কারলেট?”
“বাপি আর মা – দুজনের কেউই আর নেই, স্যাম।”
“নেই! আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন, মিস স্কারলেট? এটা আপনি আমার সঙ্গে করতে পারেন না!”
“মজা করছি না। এটাই সত্যি। মা মারা গেলেন, শেরম্যানের লোকেরা যখন টারার ওপর হামলা করল আর বাপি – জুন মাসে চলে গেলেন। ওহ্ স্যাম, কেঁদো না। কেঁদো না প্লিজ়! তাহলে আমিও কেঁদে ফেলব। না স্যাম, কেঁদো না! আমি সহ্য করতে পারব না। আমরা এসব নিয়ে এখন আর কথা বলব না। পরে কখনও তোমাকে সব খুলে বলব … মিস স্যুয়েলেন টারাতেই আছে – খুব ভাল একজন মানুষের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছে – মিস্টার উইল বেনটীন। আর মিস ক্যারীন – ও এখন – ”, স্কারলেট থেমে গেল। কেঁদে আকুল এই দৈত্যাকৃতি মানুষটাকে কিছুতেই কনভেন্টের ব্যাপারটা বোঝাতে পারবে না। “ও আজকাল চার্লসটনে থাকে। তবে পোর্ক আর প্রিসি টারাতেই আছে … এই স্যাম – নাকটা মুছে নাও। তুমি কি সত্যি সত্যি বাড়ি যেতে চাও?”
“হ্যাঁ ম্যা’ম। তবে আগের মত আর থাকবে না, মিস এলেন আর – ”
“আচ্ছা স্যাম, ধর তুমি অ্যাটলান্টাতেই থেকে যাও আর আমার কাছে কাজ কর? একজন ড্রাইভার খুব দরকার আমার – ভীষণ দরকার – চারদিকে আজকাল এত বদমাইশ লোকজন ঘোরাঘুরি করছে।”
“হ্যাঁ ম্যা’ম। সত্যিই আপনার একজন ড্রাইভারের খুব দরকার। আমিই আপনাকে বলব বলে ভাবছিলাম এই রকম একা একা গাড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরি করা আপনার একদম উচিত হচ্ছে না, মিস স্কারলেট। কিছু নিগার আছে, যারা কতটা বদমাইশ, আপনার ধারণাই নেই। বিশেষ করে এই শ্যান্টিটাউনে যারা থাকে। আপনার জন্য একটুও নিরাপদ নয়। মাত্র দুদিন হল আমি শ্যান্টিটাউনে এসেছি। ওদের আপনার কথা বলাবলি করতে শুনেছি। গতকাল যখন এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, একটা কালো নষ্ট মেয়ে আপনাকে দেখে টিটিকিরি দিল। আপনাকে চিনতে পেরেছিলাম, কিন্তু আপনি এত দ্রুত বেরিয়ে গেলেন, আপনাকে ধরতে পারলাম না। কিন্তু আমি ওই নিগারগুলোকে শায়েস্তা করে দিয়েছি! পিটিয়ে শায়েস্তা করে দিয়েছি। দেখলেন না আজ একটাও এমুখো হয়নি?”
“ঠিক কথা, খেয়াল করেছি তো! ধন্যবাদ, স্যাম। এখন বল আমার গাড়ির চালক হতে কেমন লাগবে তোমার?”
“ধন্যবাদ, মিস স্কারলেট। অনেক ধন্যবাদ, ম্যা’ম। তবে আমার মনে হয় আমার টারাতে চলে যেতেই ভাল লাগবে।”
বিগ স্যাম চোখ নামিয়ে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল। হাবেভাবে কেমন যেন একটা চোরা অস্বস্তি।
“কেন স্যাম? ভাল মাইনে দেব। তুমি আমার কাছেই থাক।”
চওড়া কালো মুখটা তুলে স্কারলেটের দিকে তাকাল। শিশুর সারল্যে ভরা মুখ, সহজেই পড়ে ফেলা যায়। মুখে আতঙ্কের ছাপ। কাছে এসে, বগির পাশে ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘মিস স্কারলেট, আমাকে যে করেই হোক ’লান্টা ছেড়ে চলে যেতে হবে। টারায় চলে গেলে ওরা আমাকে খুঁজে পাবে না। আমি – আমি একটা লোককে খুন করেছি!”
“কোনও ডার্কিকে?”
“না, ম্যা’ম। একজন সাদা মানুষকে। একটা ইয়াঙ্কি সৈন্য – ওরা আমাকে খোঁজাখুঁজি করছে। সেই জন্যই আমি শ্যান্টিটাউনে এসে লুকিয়েছি।”
“হল কেমন করে?”
“লোকটা মাতাল ছিল – এমন একটা গালি দিল, আমার মাথা গরম হয়ে গেল। হাত দিয়ে ওর গলা চেপে ধরলাম – আমি ওকে মেরে ফেলতে চাইনি, মিস স্কারলেট। কিন্তু আমার হাতের এমন জোর – আমি বুঝতেই পারিনি যে লোকটা মরে গেল। এত ভয় পেয়ে গেলাম, কী করব কিছুই মাথায় আসছিল না! তাই এখানে চলে এলাম ঘাপটি মেরে থাকব বলে। কাল যখন আপনাকে যেতে দেখলাম মনে মনে বললাম, ‘হে ভগবান! ওই তো মিস স্কারলেট! উনি ঠিক আমার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। উনি আমাকে ইয়াঙ্কিদের হাতে ধরিয়ে দেবেন না, আমাকে টারা ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবেন।”
“কী করে বুঝলে, ওরা তোমাকে খুঁজছে? তুমিই যে করেছ, সেটা জানে ওরা?”
“হ্যাঁ, ম্যা’ম। আমি এত বড়সড়, ওদের ভুল হবে না। মনে হয় ’ল্যান্টাতে আমিই সব থেকে বড় চেহারার নিগার। কাল রাতেই ওরা আমার খোঁজে চলে এসেছিল। একটা নিগার মেয়ে – আমাকে জঙ্গলে একটা গুহাতে লুকিয়ে রেখেছিল, বলল ওরা চলে গেছে।”
ভুরু কোঁচ করে স্কারলেট অল্প একটু ভেবে নিল। স্যামের খুন করা নিয়ে একটুও উদ্বিগ্ন বা ক্ষুব্ধ হল না। তবে হতাশ হল। স্যামকে ড্রাইভার হিসেবে পাওয়া যাবে না বলে। স্যাম সঙ্গে থাকলে ওকে আর্চির মতই ভরসা করা যেত।
হ্যাঁ, যে করেই হোক ওকে নিরাপদে টারাতে পৌঁছে দিতেই হবে। কর্তাব্যক্তিদের নজর ওর ওপর পড়লে চলবে না। এমন বিশ্বস্ত একজন ডার্কিকে কিছুতেই ফাঁসিতে ঝুলতে দেওয়াই যায় না। টারার ইতিহাসে ওই ছিল সব থেকে বিশ্বাসযোগ্য ফোরম্যান! একথাটা অবশ্য স্কারলেটের মনে পড়ল না যে এখন ও স্বাধীন। এখনও যেন ও ওরই লোক, যেমন পোর্ক, যেমন ম্যামি, যেমন পিটার, যেমন কুকি আর প্রিসি। এখনও ও ‘আমাদের পরিবারেরই একজন’, তাই ওকে রক্ষা করতেই হবে।
“আজ রাত্রেই আমি তোমাকে টারা পাঠিয়ে দেব,” অবশেষে স্কারলেট বলে উঠল। “এখন মন দিয়ে শোন, আমাকে এখন এই রাস্তা ধরে গাড়ি নিয়ে যেতে হবে, তবে সূর্য ডোবার আগেই আবার ফিরে আসার চেষ্টা করব। তুমি এখানেই আমার জন্য অপেক্ষা করবে। কাউকে বোলো না তুমি কোথায় যাচ্ছ, আর টুপি থাকলে নিয়ে এসো, যাতে মুখটা আড়াল করা যায়।”
“আমার কোনও টুপি নেই।”
“বেশ, এই সিকিটা রাখ। শ্যান্টির কোনও ডার্কির কাছে থেকে একটা টুপি কিনে নেবে। আমার জন্য এখানেই অপেক্ষা করবে।”
“ঠিক আছে, ম্যা’ম।” স্যামের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ওকে কী করতে হবে বলে দেওয়ার মত আবার একজন কেউ হল।
চিন্তা করতে করতে স্কারলেট গাড়ি চালিয়ে চলল। টারাতে একজন ভাল খেত মজুর পেয়ে উইল নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। পোর্ক খেত মজুর হিসেবে মোটেও ভাল ছিল না, ভাল হতেও পারবে না। স্যাম ওর জায়গায় গেলে, পোর্ক অ্যাটলান্টায় ডিলসির কাছে চলে আসতে পারবে। জেরাল্ড মারা যাওয়ার পরে স্কারলেট কথা দিয়েছিল।
মিলে যখন পৌঁছল তখন বেলা পড়ে এসেছে। বাড়ির বাইরে যতক্ষণ পর্যন্ত থাকবে বলে ভেবে রাখে, তার থেকে বেশ পরে। যে খুপরির দরজার সামনে জন্য গ্যালাঘার দাঁড়িয়ে আছে তার করুণ দশা। ওটা ছোট্ট লাম্বার ক্যাম্পের রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যে পাঁচজন কয়েদিকে স্কারলেট গ্যালাঘারের মিলে লাগিয়েছে, তাদের চারজন যে খুপরিটা ওরা শোবার জন্য ব্যবহার করে, তার সামনে একটা গুঁড়ির ওপর বসে আছে। পরনের কয়েদি ইউনিফর্ম নোংরা হয়ে গেছে, ঘামের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ক্লান্তভাবে নড়াচড়ার সময় ওদের গোড়ালিতে বাঁধা শেকল থেকে ঝনঝন আওয়াজ হচ্ছে। ওদের চোখেমুখে অনীহা আর হতাশার ছায়া। রুগ্ন, অপুষ্ট চেহারা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে স্কারলেট মনে মনে ভাবল। অথচ যখন লীজ নিল, তখনও ওদের ভাবভঙ্গিতে একটা চনমনে ভাব ছিল। বগি থেকে নামার সময় ওরা কেউ চোখ তুলে পর্যন্ত তাকাল না, তবে জনি অবহেলাভরে টুপিটা খুলে ওর দিকে তাকাল। ভাবলেশহীন কঠিন বাদামি মুখে স্কারলেটকে সম্ভাষণ জানাল।
“লোকগুলোর চেহারা আমার সুবিধের ঠেকছে না,” স্কারলেট আচমকা বলে উঠল। “ওদের চেহারা ভাল লাগছে না। অন্যজন কোথায়?”
“বলছে শরীর নাকি ভাল নেই,” কাটা কাটা ভাবে জনি জবাব দিল। “পাটাতন লাগানো খুপরিতে শুয়ে আছে।”
“কী হয়েছে ওর?”
“তেমন কিছু না, ফাঁকি মারার তাল।”
“যাই, একবার ওকে দেখতে চাই আমি।”
“যাবেন না। খুব সম্ভব ও কিছু পরে নেই। আমিই খেয়াল রাখব। কাল ঠিক কাজে লেগে যাবে।”
স্কারলেট একটু ইতস্তত করল। দেখল একটা কয়েদি ক্লান্ত ঘাড় তুলে জনির দিকে তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিল।
“লোকগুলোর ওপরে আপনি কি চাবুক চালাচ্ছেন?”
“দেখুন মিসেজ় কেনেডি, কিছু মনে করবেন না! মিলটা কে চালাচ্ছে? আমাকে দায়িত্ব দিয়ে আপনি মিলটা চালাতে বলেছিলেন। বলেছিলেন মিল চালানোর ব্যাপারে আমার পুরো স্বাধীনতা থাকবে। আমাকে নিয়ে আপনার অভিযোগ করার কারণও নেই আপনার, বলুন আছে কিছু? মিস্টার এলসিং যত টাকা কামাই করতেন, আমি তার দ্বিগুণ কামাই করছি কিনা?”
“হ্যাঁ, সেটা আপনি করছেন, স্কারলেট বলল। কিন্তু ওর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল, যেন ভীতসন্ত্রস্ত একটা রাজহাঁস ওর কবরের ওপর দিয়ে দৌড়ে গেল।
ক্যাম্পটার নোংরা ঘুপচি খুপরিগুলোতে কেমন যেন একটা অলক্ষণের আভাস। হিউ এলসিংয়ের সময় এরকম ছিল না। নির্জন পরিবেশ, বিচ্ছিন্নতা – স্কারলেট শিরশিরিয়ে উঠল। কয়েদিগুলো সুস্থ পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন, জনি গ্যালাঘারের মর্জির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ও যদি ওদের ওপর অত্যাচার করে, চাবকায়, স্কারলেট জানতেও পারবে না। কয়েদিরা ওর কাছে অভিযোগ জানানোর সাহসই করবে না। তাহলে ও ফিরে গেলেই আরও নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হবে ওদের।
“লোকগুলোকে এত রুগ্ন দেখাচ্ছে। আপনি ওদের খাবার-টাবার ঠিক মত দিচ্ছেন তো? ঈশ্বর জানেন, ওদের খাবারের জন্য আমি এত খরচ করি, যে ওরা শুয়োরের মত মোটা হয়ে যাবে। কেবল ময়দা আর হ্যামের জন্যই গত মাসে আমার তিরিশ ডলার খরচা হয়েছে। সাপারে ওদের কী খেতে দেন?”
রান্না করার খুপরিতে ঢুকে পড়ে স্কারলেট নজর ঘোরাল। মোটা দোআঁশলা মেয়েমানুষ একজন, জং ধরা একটা স্টোভের ওপর ঝুঁকে আছে। স্কারলেটকে দেখে সৌজন্য দেখিয়ে ঘাড়টা তুলল। তারপর কড়াইতে রান্না হতে থাকা কালো মটরশুঁটি নাড়তে লাগল। স্কারলেট বুঝল জনি গ্যালাঘার এর সঙ্গেই থাকে। তবে এ নিয়ে শোরগোল না করাই ঠিক মনে হল। দেখল ওই মটরশুঁটি আর এক কড়াই ভুট্টা সেদ্ধ ছাড়া আর কোনও খাবারই তৈরি হচ্ছে না।
“আর কিছু নেই এই সব লোকদের জন্য?”
“না, ম্যা’ম।”
“এই মটরশুঁটির সঙ্গে মাংসের কোনও ডিশ নেই?”
“না, ম্যা’ম।”
“মটরশুঁটির সঙ্গে সেদ্ধ করা বেকন নেই? কালো মটরশুঁটির সঙ্গে বেকন না থাকলে তো লাভই নেই। এদের মধ্যে তো কোনও পুষ্টিগুণ নেই। বেকন নেই কেন?”
“মিস্টার জনি – উনি বলেন – এর সাথে মাংসের ডিশ দেওয়ার দরকার নেই।”
“তুমি এর মধ্যে বেকন দিয়ে দাও। কোথায় রাখ তোমরা জিনিসপত্র?”
নিগ্রো মহিলার চোখ, ছোট একটা কুঠুরি – যেটাকে প্যান্ট্রি হিসেবে ব্যবহার করা হয় – সেদিকে তাকিয়ে, ভয়ে গোল গোল হয়ে উঠল। স্কারলেট টান মেরে দরজাটা খুলে ফেলল।
মেঝের ওপর দানাদার ময়দার একটা ব্যারেল খুলে রাখা। ময়দার ছোট একটা বস্তা, এক পাউন্ড কফি, অল্প একটু চিনি, জগের মধ্যে এক গ্যালন জোয়ার আর দুটো হ্যামের খণ্ড। শেলফের ওপর রাখা এক খণ্ড হ্যাম হালফিল রান্না করা হয়েছে। ওর থেকে একটা কি দুটো টুকরো কেটে নেওয়া। স্কারলেট জনি গ্যালাঘারের দিকে রক্তচক্ষু করে তাকাল। পরিবর্তে জনি গ্যালাঘারও ক্রুদ্ধ শীতল দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল।
“সাদা ময়দার যে পাঁচটা বস্তা গত সপ্তাহে পাঠিয়েছিলাম, সেগুলো গেল কোথায়? এছাড়া চিনির বস্তা আর কফি? পাঁচ খণ্ড হ্যাম পাঠিয়েছিলাম, আর দশ পাউন্ড মাংস। ভগবান জানেন কত বস্তা রাঙা আলু আর আইরিশ আলু পাঠিয়েছিলাম! সেসব গেল কোথায়,বলুন? এক সপ্তাহে নিশ্চয়ই সব শেষ করে ফেলেননি? যদি ওদের প্রতিদিন পাঁচবার করেও খাবার খাইয়ে থাকেন, তাহলেও! আপনি বিক্রি করে দিয়েছেন! তাহলে এটাই আপনি করেছেন, চোর কোথাকার! আমার জিনিসপত্র বেচে দিয়ে টাকাটা নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন! আর এই লোকগুলোকে শুকনো মটরশুঁটি আর ভুট্টা সেদ্ধ খাইয়ে রেখেছেন! এরা যে এত রুগ্ন দেখাবে, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে! সরে যান আমার সামনে থেকে!”
ঝড়ের বেগে স্কারলেট গ্যালাঘারের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এল।
“অ্যাই তুমি – কোণের দিকে দাঁড়িয়ে আছ – হ্যাঁ তুমি – এদিকে এসো!”
লোকটা উঠে দাঁড়াল, তারপর ভীরু পায়ে ওর দিকে এগিয়ে এল। শেকলগুলো ঝনঝন করে বাজতে লাগল। স্কারলেট দেখল ওর গোড়ালিতে দগদগে ঘা, লোহার ঘষা লেগে লেগে।
“শেষ কবে হ্যাম খেয়েছ?”
লোকটা মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল।
“কথা বল!”
লোকটা তবুও কিছু বলল না। শোচনীয়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। শেষমেশ চোখ তুলে স্কারলেটের দিকে তাকাল। করুণ মিনতির দৃষ্টি। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিল।
“ভয় করছে কথা বলতে, কী? বেশ, প্যান্ট্রিতে যাও আর শেলফের ওপর রাখা হ্যামটা নিয়ে এস। রেবেকা, তোমার ছুরিটা ওকে দাও। বাইরে নিয়ে এসে তোমরা সবাই ভাগ করে নাও। রেবেকা, এদের জন্য কিছু বিস্কুট আর কফি বানাও। বেশ অনেকটা করে জোয়ার এদের দাও, রেবেকা। এখুনি শুরু কর, যাতে আমি দেখে যেতে পারি।”
“ওটা মিস্টার জনির নিজের ময়দা, নিজের কফি,” রেবেকা ভয়ে ভয়ে বলল।
“ছাড় তো, মিস্টার জনির কথা! এরপর বলবে ওই হ্যামটাও ওর নিজের। যা বলছি কর। যাও লেগে পড়। হ্যাঁ, জনি গ্যালাঘার, বেরিয়ে আমার সঙ্গে বগির কাছে চলুন।”
উঠোনের আবর্জনা ডিঙিয়ে স্কারলেট বগিতে উঠে বসল। লক্ষ্য করল লোকগুলো হাভাতের মত হ্যামটার থেকে টুকরো ছিঁড়ে ছিঁড়ে তাড়াতাড়ি করে মুখে পুরছে। মনে মনে একটু পরিতোষ লাভ করল। ওদের মনে ভয় পাছে কেউ সরিয়ে নিয়ে যায়।
“আপনার মত পাজী বদমাশ খুব কমই দেখা যায়!” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। জনি চাকার কাছে দাঁড়িয়ে। টুপিটা ভুরুর কাছ থেকে তুলে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। “জিনিসপত্রের দামটা আপনি আমাকে ফেরত দেবেন। ভবিষ্যতে, আমি জিনিসপত্র মাসের বদলে প্রতিদিন পাঠাব। তাহলে আপনি জোচ্চুরি করতে পারবেন না।”
“ভবিষ্যতে আমি এখানে থাকছি না,” জনি গ্যালাঘার বলল।
“তার মানে আপনি কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন?”
পলকের জন্য স্কারলেটের মনে হয়েছিল মুখের ওপর বলে দেয়, “খুব ভাল কথা, আপদ বিদায় হওয়াই ভাল!” কিন্তু কঠোর বাস্তবের শীতল হাতছানিতে কথাটা বলে উঠতে পারল না। জনি কাজ ছেড়ে দিলে, ও কী করবে? চেরাই কাঠ বিক্রি থেকে আমদানি হিউয়ের থেকে ও দ্বিগুণ করে দিয়েছে। হাতে একটা বড় অর্ডারও রয়েছে। চেরাই কাঠ আটলান্টায় পৌঁছনো দরকার। জনি কাজ ছেড়ে দিলে কার ওপর মিলের দায়িত্ব দেবে?
“ঠিকই, আমি কাজ ছেড়ে দিচ্ছি। মিলের পূর্ণ দায়িত্ব আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে আপনি আমায় বলেছিলেন, আপনার দরকার কেবল যত বেশি পরিমাণে সম্ভব চেরাই কাঠের জোগান। সেই সময়, কারবার কী ভাবে চালাতে হবে সেটা আপনি বলে দেননি। আর আমি চাই না আপনি এখন থেকে সেটা বলে দিতে শুরু করুন। আমি কী ভাবে চেরাই কাঠের জোগান দিই সেটা আপনার দেখার কথা নয়। আমি চুক্তি লঙ্ঘন করেছি এরকম অভিযোগ আপনি করতে পারেন না। আমি আপনাকে টাকা কামিয়ে দিয়েছি। বিনিময়ে আমি মাইনে পেয়েছি, আর যেটুকু পেরেছি কিছু উপরি কামাইও করেছি। আর এখন আপনি এখন নাক গলাতে এসেছেন। একগাদা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন। আমার লোকদের সামনে আমাকেই অপমান করছেন। এরপর আমি কী ভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখব, একবার ভাবুন তো? কী এসে যায় মাঝে মধ্যে ওদের একটু চাবকালে? ওই অলস খচ্চরগুলোকে না হলে শায়েস্তা করাই যাবে না। হয় আপনি নিজের চরকায় তেল দিন আর আমি আমার চরকায়, আর নয়ত আজ রাত্রেই আমি কাজ ছেড়ে চললাম!”
লোকটার কঠিন মুখ আরও নির্মম হয়ে উঠল। স্কারলেট রীতিমত ফাঁপরে পড়ে গেল। যদি লোকটা আজ রাত্রেই কাজ ছেড়ে চলে যায়, কী করবে ও? সারা রাত ধরে তো কয়েদিগুলোকে পাহারা দেবার জন্য বসে থাকতে পারে না!
স্কারলেটের চোখে মনের মধ্যে চলা তোলপাড়ের কিছুটা ফুটে উঠেছিল, কারণ জনির চোখেমুখে ধীরে ধীরে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা গেল, মুখ থেকে কাঠিন্যের আবরণ সরে গেল। যখন কথা বলল, তখন গলার স্বরে সহজ সমঝোতার একটা আভাস।
“রাত হয়ে যাচ্ছে, মিসেজ় কেনেডি, আপনার বাড়ি ফিরে যাওয়াই উচিত এখন। এই সব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে আমাদের ঝগড়া করা কি পোষায়, তাই না? আপনি নাহয় সামনের মাসের মাইনে থেকে দশ ডলার কেটে নেবেন, ব্যাস, মিটে যাবে ব্যাপারটা।”
অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্কারলেটের চোখ দুর্ভাগা ওই দলটার ওপর পড়ল। হামলে পড়ে হ্যাম গলাধঃকরণ করছে। অসুস্থ যে লোকটা শীতল বাতাসের ঝাপটা খেতে খেতে খুপরিঘরে শুয়ে আছে তার কথা মনে পড়ল। জনি গ্যালাঘারকে ছাড়াতেই হবে। একে চোর, তায় নির্দয়। ওর অনুপস্থিতিতে লোকটা কয়েদিগুলোর সঙ্গে কী করে তা কহতব্য নয়। কিন্তু অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে লোকটা বেশ চালাক চতুর, আর ঈশ্বর জানেন, একজন চালাক চতুর লোকই ওর দরকার। এই মুহুর্তে কিছুতেই ওকে সরানো যাবে না। টাকা তো কামাই করে দিচ্ছে! তবে খেয়াল রাখতে হবে কয়েদিগুলো যেন খাবারদাবার ঠিক মত পায়।
“আপনার মাইনে থেকে কুড়ি ডলার কেটে নেব আমি,” গম্ভীর গলায় বলল, “সকালে আসছি ব্যাপারটা নিয়ে আরও আলোচনা করতে।”
স্কারলেট হাতে লাগাম তুলে নিল। মনে মনে জানে আর কোনও আলোচনা হবার নয়। ব্যাপারটার এখানেই ইতি। আর জনিরও যে সেটা ভালমতোই জানা আছে, সেটাও বোঝে।
ডিক্যাটুর রোডের দিকে এগোতে এগোতে ওর মনে বিবেক আর অর্থ উপার্জনের ইচ্ছের মধ্যে প্রবল দ্বন্দ্ব চলতে লাগল। বেঁটেখাটো নিষ্ঠুর একটার লোকের দয়ার ওপর কতগুলো মানুষের জীবন ছেড়ে দেওয়ার কোনও অধিকারই ওর নেই, সেটা ও জানে। যদি লোকটা কারোর মৃত্যুর কারণ হয়, তাহলে ও নিজেও একই রকম অপরাধী হবে, কারণ লোকটার নিষ্ঠুরতার কথা জানার পরেও ওকে সরিয়ে দেয়নি। আবার অন্য দিকে – হ্যাঁ, অন্য দিক থেকে দেখতে গেলে, লোকগুলোর কয়েদি হওয়ারই বা কী দরকার ছিল? আইন ভেঙে যদি ধরা পড়ে থাকে, তাহলে এটা তো ওদের প্রাপ্য! কথাটা মনে হওয়ায় ওর বিবেকদংশন খানিকটা কমল। কিন্তু যেতে যেতে ওর মনের মধ্যে কয়েদিদের করুণ মুখগুলো বারবার ভেসে উঠতে লাগল।
“ওফ, পরে ভাবব ওদের নিয়ে,” স্কারলেট ঠিক করে নিল। তারপর ভাবনাটাকে মনের চেরাই কাঠের গুদামে পাঠিয়ে গুদামের দরজা বন্ধ করে দিল।
***
শ্যান্টিটাউনের বাঁকে পৌঁছতে পৌঁছতে সূর্য পুরোপুরি অস্ত গিয়েছে। দুপাশের জঙ্গলে আঁধার নেমে এসেছে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই গোধূলি পৃথিবীতে অস্বস্তিকর শীতলতা নেমে এসেছে। অন্ধকার বনের ওপর দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। গাছের শুকনো ডালে লেগে সরসর শব্দ হচ্ছে, ঝরা পাতা মচমচ করছে। আগে কখনও একা একা এত দেরি করেনি, অস্বস্তি হচ্ছে, বাড়ি ফেরার জন্য মনে মনে উতলা হয়ে পড়ল।
কাছেপিঠে কোথাও বিগ স্যামের টিকির দেখাও পাওয়া গেল না। স্কারলেট লাগাম টেনে ধরল, অপেক্ষা করতে হবে ওর জন্য। মনে মনে উদ্বিগ্ন হয় উঠল, কে জানে ইয়াঙ্কিরা হয়ত আগেই ওর নাগাল পেয়ে গেছে। এমন সময় বস্তির দিক থেকে পায়ের শব্দ এল। স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল ওর। ওকে অপেক্ষায় রাখবার জন্য ঝেড়ে কাপড় পরাতে হবে স্যামকে।
বাঁকের মুখ থেকে যে বেরিয়েএল সে কিন্তু স্যাম নয়।
ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরা একজন শ্বেতাঙ্গ আর বেঁটেমোটা একজন নিগ্রো, বুকের ছাতি একেবারে গরিলার মত চিতানো। স্কারলেট ক্ষিপ্রবেগে ঘোড়ার পিঠে লাগাম দিয়ে ঝাপটা মেরে পিস্তলটা আঁকড়ে ধরল। ঘোড়াটা চলতে শুরু করেও সাদা লোকটা ওপরে হাত ছুঁড়ে দেওয়ায় ভয় পেয়ে গেল।
“লেডি,” লোকটা বলল, “একটা সিকি দিতে পারেন? আমার খুব খিদে পেয়েছে।”
“সরে যাও আমার রাস্তা থেকে,” গলাটা যথাযম্ভব স্থির রেখে স্কারলেট জবাব দিল। “আমার কাছে টাকাপয়সা কিছুই নেই। সরে যাও বলছি!”
লোকটা ক্ষিপ্রগতিতে ঘোড়ার লাগামটা ধরে ফেলল।
“জাপটে ধর ওকে!” নিগ্রোটাকে চেঁচিয়ে বলল লোকটা। “টাকাকড়ি দেখ বোধহয় ওর বুকের মধ্যে লুকোনো আছে!”
এরপর যা ঘটল, স্কারলেটের কাছে সেটা একটা দুঃস্বপ্নের মত। ঘটলও দ্রুতগতিতে। পিস্তলটা তুলে ধরল। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি বলল শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে গুলি না করতে, ঘোড়ার গায়ে লেগে যেতে পারে। নিগ্রোটা গাড়ির দিকে ছুটে এল। কালো মুখে লালসা উথলে পড়ছে। স্কারলেট একেবারে কাছ থেকে ওর দিকে গুলি চালিয়ে দিল। গুলিটা লাগল কি লাগল না, স্কারলেট বুঝতে পারল না। কিন্তু পরমুহুর্তেই পিস্তলটা কেউ ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল, কবজিটা প্রায় ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। নিগ্রোটা একেবারে ওর কাছে, এত কাছে যে শরীরের দুর্গন্ধে ওর গা গুলিয়ে উঠল। একটা হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে বগির একদিকে নিয়ে গেল। স্কারলেট অন্য হাতটা দিয়ে প্রাণপণে লড়াই চালিয়ে গেল, লোকটা মুখ খিমচে দিল। তারপর বিশাল কালো হাতটা ওর গলার ওপর চেপে বসল। ফ্যাঁস করে কাপড় ছেড়ার শব্দ। দেখতে দেখতে ওর পোশাকটা গলার কাছে থেকে কোমর অবধি ছিঁড়ে ফেলল লোকটা। তারপর বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে লাগল। আগে কখনও সারা শরীর এমন করে গুলিয়ে ওঠেনি ওর। উন্মাদের মত চেঁচিয়ে উঠল স্কারলেট।
“মুখ বন্ধ কর ওর, টেনে বের কর ওকে!” সাদা লোকটা চেঁচিয়ে বলল। নিগ্রোটা হাতটা মুখের কাছে নিয়ে আসতেই স্কারলেট হিংস্রভাবে কামড়ে দিল। তারপর আবার চেঁচিয়ে উঠল। চেঁচানোর সময়েই সাদা লোকটার গালি শুনতে পেল। মনে হল তৃতীয় কোনও ব্যক্তিও এসে উপস্থিত হয়েছে ওই অন্ধকার রাস্তার ওপর। কালো হাতটা ওর মুখের ওপর থেকে খসে পড়ল। বিগ স্যাম আক্রমণ করতেই লোকটা পালানোর চেষ্টা করল।
“পালান, মিস স্কারলেট, পালান!” স্যাম চিৎকার করে বলল, নিগ্রোটাকে জাপটে ধরে। ভয়ে আর্তনাদ করতে করতে, কাঁপতে কাঁপতে, স্কারলেট লাগাম আর চাবুক দুটোই তুলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠের ওপর আছড়ে মারল। ঘোড়াটা লাফ মেরে দৌড় লাগাল। স্কারলেটের মনে হল নরম মত কিছু একটার ওপর দিয়ে চাকাগুলো চলে গেল, একটু যেন গতিতে বাধা এল। সাদা লোকটা রাস্তার ওপর পড়ে আছে। যেখানে স্যাম ওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল।
আতঙ্কে উন্মত্ত হয়ে স্কারলেট ঘোড়ার পিঠের ওপর বারবার চাবুক চালাতে লাগল। ঘোড়াটা হোঁচট খেতে খেতে দৌড়তে লাগল আর বগিটা টালমাটাল হয়ে দোল খেতে খেতে চলল। ভয়ে কাঁটা হয়ে গেলেও ওর বগির পেছনে কেউ দৌড়ে আসছে সেটা টের পেল। ফলে আর্তনাদ করে ঘোড়ার গতি আরও বাড়ানোর চেষ্টা করল। ওই কালো বনমানুষটা আবার যদি ওর নাগাল পায়, তাহলে স্পর্শ করার আগেই ও মরে যাবে।
পেছন থেকে একটা চিৎকার শুনল – “মিস স্কারলেট, একটু দাঁড়ান!”
রাশ ঢিলে না করেই, কাঁপতে কাঁপতে পেছনে তাকাল স্কারলেট। দেখল বিগ স্যাম লম্বা লম্বা পা ফেলে রাস্তা ধরে ছুটে আসছে। লাগামের রাশ টেনে ধরল স্কারলেট। স্যাম এসে বগির ওপর লাফিয়ে উঠে পড়ল। ওর বিশাল শরীর স্কারলেটকে এক পাশে ঠেলে দিল। মুখ থেকে ঘাম আর রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে জিগ্যেস করল –
“আপনার লেগেছে? ওরা কি আপনাকে আঘাত করেছে?”
স্কারলেট কথা বলতে পারল না। যেভাবে স্যাম ওর দিকে তাকিয়েই চোখ ঘুরিয়ে নিল, খেয়াল হল যে ওর পোশাক কোমর পর্যন্ত ছেঁড়া, আর ওর বক্ষ নিরাবরণ, ওর কাঁচুলি দেখা যাচ্ছে। কাঁপা হাতে পোশাকের দুই প্রান্ত একসাথে টেনে এনে মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
“লাগামটা আমার হাতে দিন,” বলে স্যাম ওটা স্কারলেটের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। “চল্ ঘোড়া চল্!”
চাবুকটা ঘোড়ার পিঠে পড়তেই ওটা চমকে উঠে বিশাল লাফ দিল, মনে হল বগিটা উলটে খালে পড়ে যাবে।
“মনে হয় ওই কালো বনমানুষটাকে আমি খতম করে দিয়েছি। তবে পরখ করার জন্য আর দাঁড়াইনি,” স্যাম হাঁপাতে লাগল। “কিন্তু জানোয়ারটা যদি আপনাকে আঘাত করে থাকে, তাহলে যাই গিয়ে দেখে আসি।”
“না – না, তুমি জোরে গাড়ি চালাও!” স্কারলেট ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল।


0 মন্তব্যসমূহ