অনুবাদ : শুভশ্রী বিন্তু
আমার মনে হয়, আমি একবার পাগলদের এক আড্ডায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে বেশিরভাগ মানুষই শ্রুতিভ্রমে ভুগছিল। এক লোক এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটা কথা বলতে পারবে কি না।
আমরা আরেকটা ঘরে গেলাম। লোকটা বলল, তার ওষুধ তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
সে বলল, “প্রতিদিন আমি আরও নার্ভাস হয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে মাথায় অদ্ভুত চিন্তাও আসে।”
আমি বললাম, “এ রকম প্রায়ই হয়।”
লোকটা বলল, “আমার জীবনে এই প্রথম এমন হচ্ছে।”
তারপর সে সোয়েটারের হাতা গুটিয়ে নাভি চুলকাতে লাগল। তার প্যান্টের কোমরের ভেতর একটা পিস্তল গোঁজা ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ওটা কী?”
লোকটা বলল, “এটা আমার শালার নাভি। সারাক্ষণ চুলকায়। আমি কী করব? সারাদিন চুলকাই।”
দেখলাম সত্যিই নাভির চারপাশের চামড়া লাল হয়ে ক্ষত হয়ে গেছে। আমি বললাম, “আমি আপনার নাভির কথা বলিনি। নিচে যেটা আছে, সেটা কী? ওটা কি পিস্তল?”
লোকটা বলল, “হ্যাঁ, পিস্তল।”
তারপর সে পিস্তল বের করে ঘরের একমাত্র জানালার দিকে তাক করল। আমি ভাবলাম জিজ্ঞেস করি, এটা নকল কি না। কিন্তু করলাম না। আমার কাছে আসল বলেই মনে হচ্ছিল। আমি বললাম, “একটু দেখতে পারি?”
লোকটা বলল, “অস্ত্র কাউকে ধার দেওয়া যায় না।”
তারপর বলল, “গাড়ি আর মেয়েদের ব্যাপার আলাদা। গাড়ি চুরি করলে সেটা কাউকে ধার দিতে পারো। আমি সেটা করতে বলছি না, কিন্তু পারো। পতিতার ক্ষেত্রেও তাই। আমি নিজে কোনো মেয়েকে কাউকে দিতাম না, কিন্তু মানুষ দেয়। কিন্তু অস্ত্রের ব্যাপারে—কখনো না।”
আমি বললাম, “যদি চুরি করা হয়? বা নকল হয়?”
লোকটা বলল, “তবুও না। একবার কোনো অস্ত্রে তোমার আঙুলের ছাপ পড়ে গেলে, সেটা আর কাউকে দেওয়া যায় না। বুঝতে পারছ?”
আমি বললাম, “মোটামুটি।”
সে বলল, “তোমার সঙ্গে অস্ত্রের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।”
আমি বললাম, “মানে সারা জীবন তোমাকে এর দেখাশোনা করতে হবে?”
সে বলল, “ঠিক তাই। তুমি যেন বিয়ে করে ফেলেছ। তোমার ছাপ দিয়ে তুমি ওটাকে গর্ভবতী করে ফেলেছ। এখন দায়িত্ব তোমার।”
তারপর সে হাত তুলল এবং পিস্তলটা সোজা আমার মাথার দিকে তাক করল।
আমি জানি না তখনই, না পরে, আমার মনে পড়েছিলশিল্পী গুস্তাফ মোরোর–এর belle inertie–এর কথা। হয়তো আরও আগেই জ্বরের ঘোরের মতো কোনো সময়ে আমি সেটা ভেবেছিলাম।
সুন্দর স্থিরতা। এমন এক শিল্পকৌশল, যার মাধ্যমে মোরো তার ছবিতে সবচেয়ে অস্থির দৃশ্যকেও জমাট বেঁধে থাকা, স্থির ও থেমে থাকা অবস্থায় ধরে রাখতে পারতেন।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
সে জিজ্ঞেস করল, “চোখ বন্ধ করলে কেন?”
কিছু সমালোচক এটাকে বলেন “মোরোর প্রশান্তি।” অন্যরা বলেন “মোরোর ভয়।”
রত্নখচিত আতঙ্ক।
আমার মনে পড়ল তার স্বচ্ছ ছবিগুলোর কথা, তার “অসমাপ্ত” ছবিগুলোর কথা, তার বিশাল ছায়াময় পুরুষ চরিত্রগুলোর কথা, আর সেই নারীদের কথা—যারা পুরুষদের তুলনায় ছোট, কিন্তু অবর্ণনীয় সুন্দর।
জে. কে. হুইসমাঁস তার ছবি সম্পর্কে লিখেছিলেন : “এই ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যগুলো একই অনুভূতি তৈরি করে—পবিত্র শরীরের ভেতরে এক ধরনের আত্মিক হস্তমৈথুন।”
আত্মিক হস্তমৈথুন?
না, শুধু হস্তমৈথুন।
মোরোর সব দৈত্যাকৃতি পুরুষ, সব নারী, সব রত্ন, সব জ্যামিতিক স্থিরতা আর জৌলুস যেন প্যারাট্রুপারের মতো নেমে আসে পবিত্রতা বা দায়িত্ববোধের অঞ্চলে।
এক রাতে, যখন আমার বয়স কুড়ি এবং আমি অতিসংবেদনশীল এক তরুণ, তখন গুয়াতেমালার এক বোর্ডিং হাউসে পাশের ঘরে দুজন মানুষের কথা শুনেছিলাম।
একজনের কণ্ঠ গভীর। অন্যজনের কর্কশ। প্রথমে আমি তাদের কথায় মন দিইনি। তাদের দুজনই মধ্য আমেরিকার মানুষ ছিল। যদিও উচ্চারণ আর কথাবার্তার ভঙ্গি শুনে মনে হয়েছিল, তারা একই দেশের নয়। কর্কশ গলার লোকটা এক মহিলার কথা বলতে শুরু করল।
সে মহিলার সৌন্দর্য, পোশাক পরার ভঙ্গি, হাঁটাচলা, রান্নার দক্ষতা—সবকিছু নিয়ে কথা বলছিল। গভীর গলার লোকটা তার প্রতিটি কথার সঙ্গে একমত হচ্ছিল।
আমি কল্পনা করলাম, সে বিছানায় শুয়ে ধূমপান করছে। আর কর্কশ গলার লোকটা হয়তো অন্য বিছানার পায়ের দিকে বসে আছে, কিংবা মাঝখানে, জুতা খুলে, কিন্তু এখনও শার্ট-প্যান্ট পরে। আমার মনে হয়নি তারা বন্ধু। হয়তো বাধ্য হয়ে তারা একই ঘরে উঠেছে। কিংবা টাকা বাঁচানোর জন্য। সম্ভবত তারা একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছে, কিছু মদও পান করেছে। সম্পর্ক সম্ভবত সেখানেই শেষ। কিন্তু তখনকার মধ্য আমেরিকায় সেটাই অনেক কিছু ছিল।
তাদের কথা শুনতে শুনতে আমি কয়েকবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু পুরো রাত ঘুমিয়ে সকাল পর্যন্ত টানা ঘুমালাম না কেন? আমি জানি না। হয়তো আমি খুব অস্থির ছিলাম। হয়তো পাশের ঘর থেকে মাঝেমধ্যে গলার শব্দ একটু জোরে আসছিল, আর তাতেই আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল।
একসময় গভীর গলার লোকটা হেসে উঠল।
কর্কশ গলার লোকটা বলল—অথবা আবার বলল—সে তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে।
আমি ধরে নিলাম, সেই মহিলার কথাই সে বলছিল, যাকে নিয়ে এত প্রশংসা করছিল আমি ঘুমিয়ে পড়ার আগে।
সে বলল, “আমি তাকে মেরেছি।”
তারপর সে অন্য লোকটার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করল।
সে বলল, “এতে আমার মন হালকা হয়েছে। আমি ঠিক কাজটাই করেছি। কেউ আমাকে নিয়ে হাসবে না।”
গভীর গলার লোকটা বিছানায় নড়েচড়ে বসল, কিন্তু কিছু বলল না।
আমি তাকে কল্পনা করলাম গাঢ় চামড়ার মানুষ হিসেবে। তার শরীরে আদিবাসী আর আফ্রিকান—দুই রক্তই আছে। আফ্রিকান রক্তই বেশি। হয়তো পানামার লোক। বাড়ি ফিরছে। কিংবা উত্তরে মেক্সিকো আর আমেরিকার সীমান্তের দিকে যাচ্ছে।
দীর্ঘ নীরবতার পর—যার মধ্যে আমি শুধু অদ্ভুত কিছু শব্দ শুনছিলাম—সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সত্যি বলছ? সত্যিই কি তাকে মেরেছ?”
কর্কশ গলার লোকটা কিছু বলল না। হয়তো মাথা নেড়েছিল।
তারপর কালো মানুষটা জিজ্ঞেস করল, “সিগারেট খাবে?”
কর্কশ গলার লোকটা বলল, “খাই। ঘুমানোর আগে আর একটা।”
তারপর আর কোনো শব্দ শুনিনি।
হয়তো কর্কশ গলার লোকটা উঠে গিয়ে বাতি নিভিয়ে দিয়েছিল। আর কালো মানুষটা বিছানা থেকে তাকিয়ে দেখছিল।
আমি একটা ছোট টেবিল কল্পনা করলাম। তার ওপর অ্যাশট্রে। আমার ঘরের মতোই অন্ধকার একটা ঘর। সেখানে ছোট্ট একটা জানালা, যা কাঁচা রাস্তার দিকে খোলে। কর্কশ গলার লোকটা নিশ্চয়ই রোগা আর শ্বেতাঙ্গ ছিল। খুব স্নায়বিক প্রকৃতির মানুষ। অন্য লোকটা ছিল কালো, বড়সড়, শক্তপোক্ত শরীরের। সহজে মাথা গরম করে না, এমন মানুষ।
আমি অনেকক্ষণ জেগে রইলাম। যখন মনে হলো তারা ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি খুব আস্তে উঠে বাতি জ্বালালাম। একটা সিগারেট ধরালাম। তারপর পড়তে শুরু করলাম। ভোর তখনও অসীম দূরে।
অনেক পরে আবার যখন ঘুম পেল, আমি বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তখন পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ শুনলাম। একজন নারীর কণ্ঠ। মনে হচ্ছিল, সে দেয়ালে ঠোঁট ঠেকিয়ে কথা বলছে।
সে বলল, “শুভরাত্রি।”
আমি আমার ঘরের দিকে তাকালাম। পাশের ঘরের মতো এখানেও তিনটা বিছানা।
তারপর আমি ভয় পেলাম। আমার গলা থেকে একটা চিৎকার উঠে আসছিল। কিন্তু আমি সেটা চেপে রাখলাম। কারণ আমি জানতাম, আমাকে সেটা করতেই হবে। ·
লেখক পরিচিতি : রোবের্তো বোলানিও (১৯৫৩-২০০৩) ছিলেন ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের এক কালজয়ী চিলিয়ান ঔপন্যাসিক, কবি ও ছোটগল্পকার। তাঁর রচনাশৈলী আধুনিক কথাসাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছে। বোলানিওর জন্ম চিলির সান্তিয়াগোতে। তিনি তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ মেক্সিকো ও স্পেনে কাটিয়েছেন। ৫০ বছর বয়সে অকাল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সমসাময়িক সাহিত্যে বহু অবিস্মরণীয় কাজ উপহার দেন।


0 মন্তব্যসমূহ