অনুবাদ : আলম খোরশেদ

এবং শেষ অবশেষটুকুও ধ্বংস করে দেয় স্মৃতি

১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ, নরউইচের কাজটা নেবার খানিক পূর্বে, একটা বাসস্থানের খোঁজে আমি ক্লারাকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে হিংহামের দিকে যাই। পঁচিশ কিলোমিটার পর্যন্ত রাস্তা এগিয়ে চলে খেতখামার আর দুপাশের সারিবদ্ধ ঝোপের মাঝখানে ডালপালা ছড়ানো ওকবৃক্ষের নিচ দিয়ে, বিক্ষিপ্ত কিছু গ্রাম পেরিয়ে; যতক্ষণ না ঘরবাড়ির অসমান ছাদ, গির্জার চূড়া আর সমতলভূমি ছাড়িয়ে ওঠা বৃক্ষশীর্ষসমেত পরিপূর্ণ হিংহাম দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া সারসার দোকানপাটের মাঝখানে খোলামেলা বাজারটাকে জনশূন্য মনে হলেও দালালদের বর্ণিত বাড়িটি খুঁজে পেতে দেরি হয় না আমাদের। ঘাসেঢাকা কবরখানা, পাইন আর ইয়ু গাছঅলা গির্জা থেকে সামান্য দূরে, একটা শান্ত পার্শ¦গলির ভেতরে অবস্থিত ছিল গ্রামের অন্যতম বৃহৎ সেই বাড়িখানি। ছ’ফুটি দেয়াল আর পর্তুগিজ লরেল ও হলি গাছের ঘন ঝোপের আড়ালে ঢাকা ছিল বাড়িটি। আমরা প্রশস্ত গাড়ি-পথের সামান্য ঢালু বেয়ে নিচে নেমে, মসৃণ পাথর-বিছানো সম্মুখ-চাতাল পেরিয়ে সামনে এগোই। ডান দিকে, আস্তাবল ও আউটহাউসের পেছনে, এক ঝাঁক বিচগাছ শরতের স্বচ্ছ আকাশের উঁচুতে মাথা তুলে আছে, তখনো বিকেল নামেনি বলে গাছের গভীরে বানানো পাখির নীড়গুলো শূন্য, পাতার শামিয়ানার মধ্যে তারা কালো কালো ছায়ার ছোপ তৈরি করে, যেগুলো মাঝেমধ্যে একটু আধটু নড়েচড়ে উঠছিল। বিশালাকার নব্যধ্রুপদী শৈলীর বাড়ির সম্মুখভাগটি ভার্জিনিয়া ক্রিপার লতায় পুরোপুরি ঢেকে গিয়েছিল। দরজাটা কালো রঙ করা আর তার ওপর মাছের আকৃতির একটি পেতলের কড়া লাগানো। আমরা কয়েকবার সেটা ধরে নাড়ি কিন্তু বাড়ির ভেতরে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। আমরা একটু পেছনে সরে দাঁড়াই। বারোটি শার্সির সমাহারে নির্মিত প্রতিটি জানালা চকচকে কালো, যেনবা সেগুলো গাঢ় আয়নাকাচ দিয়ে বানানো। বাড়িটি এমন একটি ধারণা দেয় যে, সেখানে বুঝি কেউ বাস করে না। আমার মনে পড়ে শারেন্তের সেই বাড়িটির কথা, আঙ্গুলেম থেকে যেটি দেখতে গিয়েছিলাম আমি একবার। দুই উন্মাদ ভাই, একজন সাংসদ এবং অন্যজন স্থপতি, এর সম্মুখভাগটি ভার্সাই প্রাসাদের হুবহু নকল করে তৈরি করেছিল, যা স্রেফ একটি অর্থহীন প্রবঞ্চনামাত্র ছিল, যদিও দূর থেকে তাকে দেখে বেশ একটা উঁচু ধারণার জন্ম হত। সেই বাড়িটির জানালাগুলোও আমরা এখন যেটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি তারই মতো চকচকে কালো ছিল। সন্দেহ নেই কোনোপ্রকার প্রাপ্তিযোগ ছাড়াই আমরা গাড়ি চালিয়ে সামনে এগিয়ে যেতাম, যদি না সাহস সঞ্চয় করে, আমাদের নিজস্ব এক চকিত দৃষ্টিবিনিময় শেষে, আমরা অন্তত বাগানটা একটু ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিতাম। আমরা একটু উদ্বেগ নিয়েই বাড়ির চারপাশে ঘুরে দেখি। উত্তর দিকে দেয়ালের ইটগুলো সবুজ ও স্যাঁৎসেঁতে, নানারকম আইভিলতায় অংশত ঢাকা; একটি শ্যাওলামাখা পথ ভৃত্যদের ঘরের প্রবেশমুখ পেরিয়ে, কাঠের শেডের ওপারে, ঘন ছায়ার ভেতর দিয়ে একটি চত্বরে প্রবেশ করে, যেনবা একটি মঞ্চ তা, পাথুরে পিলার ঘেরা, যেখান থেকে প্রশস্ত, চৌকো ঘাসের গালিচা দেখা যায়, যার চারপাশজুড়ে ফুলের শয্যা, ঝোপঝাড় ও বৃক্ষের সারি। পশ্চিম দিকে, লনের ওপারের জমিটা পার্কের মতো দেখতে একটা জায়গায় মিশে যায়, যার বুকজুড়ে নিঃসঙ্গ কিছু লাইম আর এল্ম ও হোম ওক জাতীয় গাছ লাগানো, আর তারও ওপারে, চাষের জমির মৃদু ঢেউখেলানো রেখা ও দিগন্তে মেঘেদের সাদা পর্বতছায়া। নীরবে এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকি আমরা, যার ওঠানামা আমাদের চোখকে ক্রমে আরও দূরে টেনে নিয়ে যায়, এবং নিজেদেরকে একলা ভেবে নিয়ে আমরা সেই দৃশ্যের দিকে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকি, যতক্ষণে না বাগানের দক্ষিণপশ্চিম কোনায়, লনের মাঝখানে উঁচু সেডার গাছের ছায়ার মধ্যে একটি স্থির শরীরকে শুয়ে থাকতে দেখি। সেটি একজন বৃদ্ধ লোকের, কনুইয়ে মাথা ভর দেওয়া, যাকে দেখে মনে হয় তিনি তাঁর সামনের টুকরো জমিটির দৃশ্যে একেবারে মগ্ন হয়ে আছেন। আমরা লন পেরিয়ে তাঁর দিকে যাই, ঘাসের ওপর আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ অতি হালকা। তাঁর একেবারে কাছে গিয়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে লক্ষ করেন না। তিনি এক ধরনের বিব্রতভাব নিয়ে উঠে দাঁড়ান। তিনি যদিও যথেষ্ট লম্বা এবং প্রশস্তস্কন্ধ মানুষ ছিলেন, কিন্তু কেন যেন তাঁকে বেশ মোটাসোটা এমনকি বেঁটেও দেখায়। এটা সম্ভবত তাঁর মাথা নিচু করে, সোনালি ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে তাকানোর জন্য মনে হচ্ছিল, যে-অভ্যাসটি তাঁর চেহারায় কোমল ও অবনতপ্রায় একটি ভাব এনে দেয়। তাঁর সাদা চুলগুলো পেছনের দিকে আঁচড়ানো, যদিও দুয়েকটি গোছা তাঁর চোখে-পড়ার মতো উঁচু কপালের ওপর এসে পড়ছিল। আমি ঘাসের শিস গুনছিলাম, তাঁর এই অন্যমনস্কতার জন্য ক্ষমা চাওয়ার ঢংয়ে তিনি বলেন। এটা আমার এক ধরনের শখ বলতে পারেন। খুবই বিরক্তিকর, আমি জানি। তিনি তাঁর একটি শাদা চুলের গোছাকে পেছনে ঠেলে দেন। তাঁর এই নড়াচড়াগুলোকে একইসঙ্গে খুবই বিদঘুটে আবার নিখুঁতভাবে মানানসই মনে হয়; এবং তিনি যেভাবে নিজেকে ড. হেনরি সেলউইন বলে পরিচয় দেন সেটার মধ্যে এমন এক দুর্লভ সৌজন্যবোধ প্রকাশ পায়, যার চল প্রায় উঠেই গেছে বলা চলে। তিনি বলে চলেন, নিশ্চয়ই আপনারা বাড়ি ভাড়ার জন্য এসেছেন। তিনি যা বললেন তাতে বোঝা গেল বাড়িটা তখনও ভাড়া হয়নি, তবে আমাদেরকে মিসেস সেলউইন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, কেননা সে-ই এবাড়ির আসল মালিক, তিনি শুধু বাগানের বাসিন্দা একজন শোভাবর্ধক সাধু। এই প্রারম্ভিক আলাপটুকুর পরবর্তী কথোপকথন চলাকালীন আমরা লোহার রেলিংয়ের পাশ ধরে হাঁটতে থাকি, যা কি না পার্ক থেকে বাগানটিকে আলাদা করেছিল। আমরা মুহূর্তের জন্য থামি। তিনটি বড়সড় ঘোড়া অলডার বৃক্ষের একটি ডাল মুখে নিয়ে ঘোঁৎঘোঁৎ শব্দ করে মুখ থেকে মাটিভরা থুথু ছিটাতে ছিটাতে এগিয়ে আসছিল। তারা একধরনের প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের কাছাকাছি এসে অবস্থান নেয়, ড. সেলউইন তাঁর প্যান্টের পকেট থেকে খাওয়া বার করে তাদেরকে খেতে দেন এবং তাদের মুখে হাত বুলিয়ে দেন। আমি ওদেরকে ঘাসের মধ্যে ছেড়ে রেখেছি। গত বছর তাদেরকে একটা নিলাম থেকে অল্প কিছু পাউন্ডের বিনিময়ে কিনেছিলাম আমি। তা না হলে সরাসরি বধ্যভূমিতে ঠাঁই হত ওদের। তাদের নাম হার্শেল, হামফ্রে ও হিপোলিটাস। আমি ওদের পূর্ব জীবন সম্পর্কে কিছুই জানি না, তবে কেনার সময় ওদের অবস্থা বেশ শোচনীয় ছিল। তাদের পশমগুলো ভরা ছিল উকুনে, চোখ ম্রিয়মাণ, আর ভেজা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাদের খুরগুলো আগাগোড়াই ফেটে গিয়েছিল। কিন্তু এখন, ড. সেলউইন বলেন, তারা একপ্রকার সেরে উঠেছে বলা যায়, এবং সম্ভবত তাদের আরও বছরখানেকের মতো আয়ু রয়েছে। এই বলে তিনি ঘোড়াদের কাছ থেকে বিদায় নেন, দৃশ্যতই যারা তাঁর খুব প্রিয় ছিল, এবং আমাদেরকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, মাঝেমধ্যে খানিক বিরতি নিয়ে, বাগানের আরও প্রত্যন্ত প্রান্তে এগিয়ে যান, কথাবার্তায় আগের চেয়ে আরও বেশি স্বচ্ছন্দ ও বর্ণনাপ্রবণ। লনের দক্ষিণ দিকের ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে রাস্তাটি হেজেল গাছের সারিতে সজ্জিত একটি হাঁটাপথের দিকে চলে যায়, যেখানে ধূসর কাঠবিড়ালিরা, মাথার ওপরে অবস্থিত ডালপালার সাম্রাজ্যে নানাবিধ দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছিল। মাটিতে প্রচুর বাদামের খোসা ছড়ানো, শরতের ক্রোকাস গাছগুলো তাদের শুকনো, মর্মরিত পাতার ভেতর দিয়ে দিনের ম্লান আলোটুকু শুষে নিচ্ছিল। হেজেল-পথটি একটি টেনিস কোর্টের দিকে নিয়ে যায় আমাদের, চারদিকে যার সাদা রঙ-করা ইটের দেয়াল। টেনিস, ড. সেলউইন বলেন, একসময় আমার খুবই নেশার মতো ছিল। কিন্তু এখন কোর্টটি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে, এখানকার অন্য সবকিছুর মতোই। শুধু এই বাগানটাই নয়, তিনি বলেন, মুখ থুবড়ে পড়া ভিক্টোরিয়ান গ্রিনহাউস ও অতিকায় এস্পালিয়ারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে, এগুলোও বহু বছরের উপেক্ষায় এখন তাদের আয়ুর শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, তাঁর ইদানীং খুব করে মনে হয় যে, প্রকৃতির ওপর আমরা যে-বোঝা চাপিয়ে দিয়েছি তার চাপে সে চিৎকার করছে এবং মুখ থুবড়ে পড়ছে ক্রমে। এটা সত্যি বাগানটি বিশাল এই বাড়ির প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী সরবরাহের জন্যই তৈরি হয়েছিল, এবং সেটি সে ঠিকই করে আসছিল এতগুলো বছর ধরে; দক্ষতা ও মেহনতের দ্বারা খাবার টেবিলের সারা বছরের ফল ও সবজির যোগান দিচ্ছিল সে এবং এখনও, সকল উপেক্ষা সত্ত্বেও, এতটাই ফসল ফলায় তা, যা তাঁদের প্রয়োজনের চাইতেও অনেক বেশি, এবং তিনি স্বীকার করেন, সেই প্রয়োজনও ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছিল। অবশ্য একসময়ের খুব যত্নে লালিত বাগানটিকে নিজের মতো করে থাকতে দেওয়ার একটা আপতিক সুবিধাও ছিল, বলেন ড. সেলউইন, এলোপাথাড়িভাবে বোনা যে-ফসলগুলো এখনও ফলছে এখানে, তার মধ্যে এমন এক স্বাদগন্ধ পাওয়া যায় যা তাঁর কাছে খুবই দুর্লভ ও বিশিষ্ট বলে মনে হয়। আমরা অ্যাসপারাগাসের বেডের ভেতর দিয়ে, যার সবুজ গোছাগুলো প্রায় আমাদের কাঁধ সমান, অগণিত আর্টিচোকের সারি পেরিয়ে ছোট এক আপেল বাগানের দিকে এগোই, যেখানে সুপ্রচুর লাল, হলুদ আপেল ধরে ছিল। ড. সেলউইন রুবাব পাতায় মুড়ে সেই রূপকথাতুল্য ডজনখানেক আপেল ক্লারাকে উপহার দেন, এমন মন্তব্যসহ যে, এটিকে যথার্থই বাথের বিউটি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, যা আসলেই স্বাদে খুব ভালো ছিল, অন্তত আমি এরপর যত আপেল খেয়েছি, সেসবের চেয়ে।

ড. সেলউইনের সঙ্গে সেই প্রথম সাক্ষাতের দ’ুদিন পর আমরা প্রায়র’স গেটে থাকতে আসি। আগের সন্ধ্যায় মিসেস সেলউইন পূর্বপাশের দোতলায় বিচিত্র কায়দায় সাজানো, বেশ প্রশস্ত ও এম্নিতে দৃষ্টিনন্দন ঘরগুলো দেখিয়েছিলেন আমাদের। আমরা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই সেখানে অন্তত কয়েকমাস থাকার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলি, কেননা উঁচু জানালার ভেতর দিয়ে বাগানের ওপারের দৃশ্য, দূরের পার্ক ও আকাশে মেঘের সমাহার ঘরের ভেতরের বিষণ্ন ভাবটুকু পুষিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। একবার বাইরে তাকালেই হল, ঘরের বিশালাকার কুৎসিত আলমারিটা অদৃশ্য হয়ে যেত, রান্নাঘরের সড়িষা-হলুদরঙা দেয়ালগুলো মিলিয়ে যেত, এবং সমূহ বিপদের আশঙ্কাযুক্ত, গ্যাসচালিত নীলাভ ফ্রিজখানিও কোনো এক অদৃশ্যলোকে হারিয়ে যেত, যেনবা অলৌকিকভাবেই। এলি সেলউইন সুইৎজারল্যান্ডের বিয়েল শহরের জনৈক ফ্যাক্টরি-মালিকের মেয়ে এবং যাঁর ব্যবসাবুদ্ধি বেশ ভালো ছিল, আমরা দ্রুতই অনুধাবন করি। তিনি আমাদের রুচি অনুযায়ী ভেতরের আসবাবপত্রের অল্পস্বল্প পরিবর্তনের অনুমতি দেন। বাথরুমটা সাদা রঙ করা হলে (যেটি ছিল লোহার কলামের ওপর অবস্থিত লাগোয়া একটি অংশে, যেখানে যাবার জন্য একটা ফুটব্রিজ মতো ছিল) তিনি এমনকি ওপরে উঠে আসেন আমাদের কাজগুলো যাচাই করার জন্য। এর অপরিচিত চেহারাটি তাঁকে এমন রহস্যভরা মন্তব্য করতে প্ররোচিত করে যে, এই বাথরুমটি, যা তাঁকে সবসময় প্রাচীন আমলের উষ্ণ স্নানাগারের কথা মনে করাতো, এখন একটি সদ্য রঙ করা কবুতরের খোপের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে তাঁেক; আমাদের জীবনচর্যার বিষয়ে এক ধ্বংসাত্মক রায় ছিল সেটি, যা আমার মনে গেঁথে আছে অদ্যাবধি, যদিও এখন পর্যন্ত আমি তাতে কোনো বদল আনতে পারিনি আদৌ। তবে সেটা অন্য বিষয়। আমাদের ঘরের প্রবেশপথ ছিল, হয় একটি লোহার সিঁড়ি দিয়ে, যেটিকেও এখন সাদা রং করা হয়েছে, যা বাড়ির উঠোন থেকে বাথরুমের সেই ফুটব্রিজটিতে উঠে গেছে, অথবা (নিচতলায়) একটা প্রশস্ত দ্বি-দরজার মধ্য দিয়ে, যেটি উন্মুক্ত হয় চওড়া এক করিডরে, যার দেয়ালগুলো, সিলিংয়ের ঠিক নিচ বরাবর, চাকরদের ডাকার জন্য নির্মিত একধরনের জটিল ঘণ্টাদড়ি দ্বারা সজ্জিত ছিল। সেই প্যাসেজ থেকে যে-কেউ চাইলে অন্ধকার রান্নাঘরের ভেতরটা দেখতে পেত, যেখানে দিনের যেকোনো সময় একজন অনির্ণেয় বয়সের নারীকে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে কাজে ব্যস্ত দেখা যেত। এলেইন নামের সেই নারীটি, কারাগারের বন্দিদের মতো তার চুলগুলো কাঁধের পেছনটায় ছোট গোছা করে বেঁধে রাখত। তার মুখের অভিব্যক্তি ও চলাফেরার ছন্দ একধরনের অস্থিরতার অনুভুতি দিত, তার ঠোঁটগুলো বরাবর ভেজা থাকত এবং সে সবসময় প্রায় গোড়ালি অব্দি লম্বা তার ছাইরঙা অ্যাপ্রনগুলোর একটি পরে থাকত। দিনের পর দিন, এলেইন রান্নাঘরে ঠিক কী কাজ করত সেটি আমার ও ক্লারার কাছে একটা রহস্যই ছিল, কেননা আমাদের জানামতে একটিমাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া সেখানে আর কোনো খাবারই তৈরি হত না। করিডরের অপর প্রান্তে, পাথুরে মেঝের ফুটখানেক ওপরে, দেয়ালের মধ্যে ছোট্ট একটা দরজা ছিল। সেটার ভেতর দিয়ে একটি অন্ধকার সিঁড়িঘরে ঢোকা যেত; এবং প্রতিটি তলাতেই গোপন শাখাপথ বের হয়ে দেয়ালের পেছনে এমনভাবে লুকানো থাকত যেন নিরন্তর কয়লার পাত্র, লাকড়ির ঝুড়ি, সাফাই উপকরণ, চায়ের পাত্রাদি, বিছানার চাদর হাতে ছুটোছুটি করা চাকরদেরকে কখনোই তাদের উত্তমর্ণদের মুখোমুখি হতে না হয়। প্রায়ই আমি কল্পনা করতে চেষ্টা করতাম, যারা এই ঘরগুলোতে থাকতেন তাঁদের মনের মধ্যে, দেয়ালের ওপাশে অনন্তকাল ধরে ছুটন্ত চাকরদের ছায়ারা ঠিক কোন ভাবনার জন্ম দিত। আমি কল্পনা করতাম, তাঁরা সেইসব ভৌতিক চরিত্রদের ভয়েই থাকতেন, যারা সামান্য বেতনের বিনিমিয়ে কঠিন কাজে বাধ্য হত। আমাদের ঘরের প্রধান প্রবেশমুখটি ছিল পেছনের এই সিঁড়িদরজা দিয়ে, যার সবচেয়ে নিচে ছিল এলেইনের ঘরখানি, যেটি ব্যতিক্রমহীনভাবে তালাবদ্ধই থাকত সবসময়। এটিও আমাদেরকে এক ধরনের অস্বস্তিতে ফেলে। একবারমাত্র আমি তার ঘরের ভেতরে একটা চোরাদৃষ্টি হানার সুযোগ পাই এবং দেখতে পাই তার ছোট্ট ঘরখানি, নিখুঁতভাবে সাজানো অগণিত পুতুলে ভরা, যাদের অধিকাংশেরই মাথায় কী একটা যেন বাঁধা; দাঁড়ানো, উপবিষ্ট কিংবা এলেইন যে-বিছানায় ঘুমাত সেখানে শায়িত -- অবশ্য, সে যদি সারারাত গুনগুন করে গান গেয়ে পুতুলের সঙ্গে খেলা না করে আদৌ ঘুমিয়ে থাকে কখনো। রবিবারে কিংবা ছুটির দিনে আমরা এলেইনকে তার সালভেশন আর্মির কোট-গায়ে বেরুতে দেখতাম কখনোসখনো। প্রায়শই একটা ছোট্ট বাচ্চা এলেইনের হাতে তার বিশ্বস্ত হাতখানি রেখে পাশেপাশে হেঁটে যেত। এলেইনের বিষয়ে অভ্যস্ত হতে আমাদের কিছুটা সময় লেগেছিল বৈকি। আমাদের কাছে বিশেষভাবে অস্বস্তিকর লাগত তার একটি বিচ্ছিরি অভ্যাস, রান্নাঘরে কাজের মধ্যে প্রায়ই এক অনিচ্ছুক, অনিয়ন্ত্রিত হাসিতে তার ফেটে পড়ার অভ্যাস, যার শব্দ আমাদের দোতলা অব্দি উঠে আসত। আরও কী, আমাদেরকে বাদ দিলে এলেইনই ছিল সেই প্রকাণ্ড বাড়িটির একমাত্র বাসিন্দা যে সেখানে সবসময় থাকত। মিসেস সেলউইন, যিনি এই শহরে এবং কাছের গ্রামে অসংখ্য বাড়ি ভাড়া দিয়ে রাখতেন, তাঁর ব্যবসার কাজে প্রায়শই ভ্রমণে থাকতেন, কখনও একনাগাড়ে কয়েক সপ্তাহের জন্য। আবহাওয়া যতদিন অনুমতি দিত, ড. সেলউইন ঘরের বাইরে থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন, বিশেষ করে বাগানের এক প্রত্যন্ত কোনায় পাথরে বানানো ছোট্ট একটি সন্ন্যাসগৃহে, যাকে তিনি তাঁর প্রাসাদ বলতেন একং যেটিকে তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। আমরা এবাড়িতে উঠে আসার সপ্তাহখানেক পরে এক সকালে তাঁকে তাঁর পশ্চিম পাশের ঘরের খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। চশমা পরা, গায়ে টার্টান ড্রেসিং গাউন, এবং গলায় একটি সাদা স্কার্ফ জড়ানো। তিনি একটি অসম্ভব লম্বা দোনলা বন্দুক আকাশের দিকে তাক করে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত যখন গুলিটা করতে সক্ষম হলেন তিনি, যেটাকে আমার প্রায় অনন্তকাল বলে মনে হয়েছিল, তখন সেই গুলির শব্দ এসে বাগানজুড়ে ভয়ানকভাবে আছড়ে পড়ে। মি. সেলউইন পরে ব্যাখ্যা করেছিলেন এই বলে যে, তিনি আসলে বহু আগে, তাঁর যৌবনে কেনা বন্দুকটি, যেটি বড় বড় প্রাণী শিকারের জন্য তৈরি করা, সেটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় তাঁর শয়নকক্ষে পড়ে থাকায় এর কার্যকারিতা আদৌ অটুট রয়েছে কি না সেটা পরখ করে দেখছিলেন। এই লম্বা সময়টাতে, তিনি যতটা মনে করতে পারেন, সেটিকে মাত্র দুবার পরীক্ষা ও পরিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি আমাকে জানান, সার্জন হিসাবে কাজ করতে প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়া যাবার সময় সেটা কিনেছিলেন তিনি। সেই সময়ে তাঁর স্বগোত্রের একজন মানুষের কাছে এরকম একটি বন্দুক থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। যদিও সেটা নিয়ে তিনি শিকারে গিয়েছিলেন মাত্র একবার, এবং সেই সময়ও এর উদ্বোধনী ব্যবহারের বিষয়টিকে তিনি উপেক্ষা করেছিলেন, যেটি করা অবশ্যই উচিত হয়নি তাঁর। সেজন্যই তিনি তখন দেখতে চাইছিলেন সেটা আদৌ কার্যক্ষম রয়েছে কি না, এবং আবিষ্কার করেন বন্দুকের পালটা অভিঘাতটুকুই একজনকে খুন করার জন্য যথেষ্ট।

আমি যেমনটি বলেছি, ড. সেলউইন কালেভদ্রে ঘরে থাকতেন। তিনি তাঁর সন্ন্যাসগৃহেই থাকতেন এবং পুরো মনোযোগটুকু, যেমনটি তিনি মাঝেমধ্যে বলেন আমাকে, এমনসব চিন্তার মধ্যে নিবদ্ধ রেখে, যা একদিকে ক্রমেই বিমূর্ত থেকে বিমূর্ততর এবং অন্যদিকে আরও সুনির্দিষ্ট ও দুর্বোধ্য হয়ে উঠছিল। আমরা সেই বাড়িতে থাকাকালীন একবার মাত্র একজন অতিথি এসেছিল তাঁর কাছে। এটা বসন্তকালের ঘটনা, আমার মনে হয়, এপ্রিলের শেষদিকে, এলি যখন সুইৎজারল্যান্ডে ছিলেন। এক সকালে ড. সেলউইন এসে আমাদের জানান যে, তিনি একজন বন্ধুকে ডিনারে আমন্ত্রণ করেছেন যার সঙ্গে তাঁর বহু বছরের ঘনিষ্ঠতা, এবং আমাদের যদি অসুবিধা না হয়, তাহলে তিনি খুশি হবেন যদি আমরা তাঁদের দুজনকে সঙ্গ দিতে রাজি হই নৈশাহারে। আমরা আটটার একটু আগেই নিচে নেমে যাই। সেই সন্ধ্যার দারুণ ঠান্ডার পটভূমিতে লকলকে আগুনের শিখা গনগন করছিল তাঁর বসার ঘরের বিশাল চুল্লীটিতে, যেটা সজ্জিত ছিল বেশ কয়েকটি চারজন-বসার উপযোগী সোফা ও জরবরজং আর্মচেয়ারে। উঁচু দেয়াল থেকে কালো ছোপঅলা কয়েকটি আয়না ঝোলানো ছিল, যা আগুনের ঝলককে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় আর যার ভেতরে প্রতিফলিত হচ্ছিল নানাবিধ ক্রমপরিবর্তনশীল ছবি। ড. সেলউইন একটা টাই ও টুইডের জ্যাকেট পরা ছিলেন, যার কনুইদুটো ছিল চামড়ায় মোড়ানো। তাঁর বন্ধু এডউইন এলিয়ট, যাঁকে তিনি আমাদের কাছে একজন সুপরিচিত উদ্ভিদ ও পতঙ্গবিদ হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, ড. সেলউইন থেকে গড়নে বেশ ছোটই ছিলেন, তবে বেশ খাড়া ও সটান, যেখানে সেলউইন ছিলেন খানিকটা কুঁজোমতো। তিনিও একটি টুইডের জ্যাকেট পরা ছিলেন। তাঁর রোগা, পলকা ঘাড়ের তুলনায় শার্টের কলারটি ছিল বেশ বেঢপ, যার ভেতর থেকে অনেকটা অ্যাকর্ডিয়নের মতো উঁচু হয়েছিল তাঁর গলাখানি, বিশেষ কিছু পাখি কিংবা কাছিমের গলার মতো; তাঁর মাথাটি ছিল বেশ ছোট, খানিকটা প্রাগৈতিহাসিক ও অতীতগন্ধী, যদিও তাঁর চোখগুলো অত্যাশ্চর্য জীবনের ছটায় জ্বলজ্বল করছিল। আমরা প্রথমে আমার নিজের কাজ ও পরবর্তী বছরগুলোর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলি, এবং ইংল্যান্ডের পর্বতাঞ্চল থেকে এসে এই নরফল্কের সমতল ভূমিতে আমাদের কী অনুভূতি তা নিয়ে আলাপ করি। সন্ধ্যা নামে। ড. সেলউইন উঠে দাঁড়ান, এবং কিছুটা আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে, আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেন পাশ্ববর্তী খাবারঘরে। ওকের টেবিলের মাঝখানে, যেখানে বিনা অসুবিধায় ত্রিশজন লোক বসতে পারত, দুটো বিশালাকার রুপালি মোমদানি ছিল। টেবিলের মাথা ও লেজের দিকটা বরাদ্দ ছিল ড. সেলউইন ও এডউইনের জন্য, তাই জানালার দিকে মুখ করা লম্বালম্বি দিকটাতে আমি ও ক্লারা বসি। ইতোমধ্যে বাড়ির ভেতরটা রীতিমতো অন্ধকার হয়ে আসে, এবং বাইরের সবুজ দৃশ্যাবলি গভীর, গাঢ় নীলাভ ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছিল ক্রমে। পশ্চিমের আলো তখনও দিগন্তে লেগে ছিল, যদিও, পাহাড়সমান মেঘেদের গায়ে, আর রাত যত ঘন হয়ে আসছিল তার তুষারোপম আকৃতি আমাকে আল্পসের সুউচ্চ পর্বতমালার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। এলেইন একটা ট্রলি নিয়ে ঢোকে যার ওপর ত্রিশ দশকের বিশেষায়িত নকশা করা কিছু হটপ্লেট রাখা ছিল। সে তার ছাইরঙা পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যাপ্রনটিই পরা ছিল এবং নীরবে তার কাজ করে যাচ্ছিল, দুয়েকবার মাত্র নিজে নিজে কিছু একটা বিড়বিড় করা ছাড়া সেই নীরবতা আগাগোড়াই অটুট থাকে। সে মোমগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই অন্তর্হিত হল, একটিমাত্র শব্দও উচ্চারণ না করে। আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে পরিবেশন করি, প্লেটগুলো টেবিলের ওপর একে অপরের দিকে ঠেলে দিয়ে। প্রথম পদটি ছিল কচি পালংশাকের জারিত পাতায় ঢাকা কয়েকটুকরো সবুজ অ্যাসপারাগাস। মূল পদ ছিল মাখন মাখানো ব্রকলির টুকরো এবং সুগন্ধী পুদিনা পাতা দিয়ে সিদ্ধ করা নতুন আলু। ড. সেলউইন জানান তিনি তাঁর এই আগাম জাতের আলুগুলো পুরনো একটি কাচঘরের বালিভরা মাটিতে চাষ করেছেন, যেগুলো মধ্যএপ্রিলেই বাদামের আকার পেয়ে যায়। আহার শেষ হয় ডেমারারার চিনি ছেটানো ননিমাখা রুবাবের ক্বাথ দিয়ে। প্রায় সবকিছুই তাঁর এই উপেক্ষিত বাগান থেকে সংগ্রহ করা। শেষ করার আগে এডউইন আমাদের আলাপটার মুখ ঘুরিয়ে দিলেন সুইৎজারল্যান্ডের দিকে, এই ভেবে যে, হয়তো আমি ও ড. সেলউইন দুজনেরই এবিষয়ে কিছু বলার থাকবে এবং ড. সেলউইন ঠিকই, কিঞ্চিৎ প্রাথমিক দ্বিধার পর, প্রথম মহাযুদ্ধের আগে আগে তাঁর বার্ন বাসের গল্প করতে শুরু করেন। ১৯১৩ সালের গ্রীষ্মে, (তিনি শুরু করেন) কেমব্রিজে তাঁর ডাক্তারি শিক্ষা শেষ হলে তিনি প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই বার্ন যাত্রা করেন, সেখানে তাঁর শিক্ষাকে আরও কিছুটা উন্নত করার আশায়। কার্যত ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়, তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় বার্নের ওম্বারল্যান্ডেই পর্বতারোহণের চর্চা করে কাটান। তিনি একটানা কয়েক সপ্তাহ কাটান মেইরিঙ্গেনে, বিশেষ করে বলা যায় ওবেরারে, যেখানে জোহানেস ন্যাগেলি নামে একজন আল্পস গাইডের সঙ্গে পরিচিত হন, তখন বয়স তাঁর পঁয়ষট্টি, যাঁর প্রতি প্রথম থেকেই তিনি বেশ অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ন্যাগেলিকে নিয়ে সবজায়গায় যান -- জিঙ্গেনস্টক, শ্যুজারহর্ন, রজেনহর্ন, লাওটেরারহর্ন, শ্রেকহর্ন, ইউয়িগশ্নিহর্ন-- এবং তাঁর জীবনে কখনোই, এর আগেও নয় পরেও নয়, তিনি এতটা আনন্দ পাননি, এই মানুষটির সাহচর্যে যতটা পেয়েছিলেন। যুদ্ধ বাঁধলে আমি ইংল্যান্ড ফিরে আসি এবং আমাকে বাহিনীতে ডাকা হয়, তখন কোনোকিছুই আমার কাছে এত কষ্টকর মনে হয়নি জোহানেস ন্যাগেলির কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার চেয়ে; এখন পেছনে তাকিয়ে আমি তা উপলব্ধি করি, ড. সেলউইন বলেন। এমনকি এলির সঙ্গে বিচ্ছেদও, যাকে আমি বার্নে ক্রিসমাসের সময় দেখি এবং পরে বিয়ে করি যুদ্ধের শেষে, ন্যাগেলির বিচ্ছেদের চেয়ে বেশি বেদনার কারণ হয়নি আমার কাছে। আমি এখনও তাঁকে দেখতে পাই মেইরিঙ্গেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত নাড়ছেন। কিংবা আমি হয়তো সেটা কল্পনা করছি, ড. সেলউইন নিচুস্বরে নিজের কাছেই বলে চলেন, কেননা দিনে দিনে এলি আমার কাছে একরকম আগন্তুকের মতো হয়ে উঠেছিল, যেখানে ন্যাগেলির কথা মনে হলেই তাঁকে আমার কী যে আপন বলে বোধ হয়, যদিও মেইরিঙ্গেনের সেই বিদায়ী সাক্ষাতের পর তাঁর সঙ্গে আমার আর কখনোই দেখা হয়নি। আমার যুদ্ধে ডাক পাবার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ন্যাগেলি হারিয়ে যান, ওবেরারের কেবিন থেকে খোদ ওবেরার শহরে ফেরার পথে। ধারণা করা হয় তিনি আরে হিমবাহের একটি খাদে পড়ে গিয়েছিলেন। সৈনিকের পোশাকে আমার ব্যারাকবাসের দিনগুলোর প্রথম দিকে পাওয়া কোনো একটা চিঠিতেই আমি এই খবরটি পাই, যা আমাকে এমন গভীর অবসাদের মধ্যে ফেলে দেয় যে, বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হবার অবস্থা হয় আমার প্রায়। মনে হয়ছিল আমি নিজেই বুঝি বরফ ও তুষারের নিচে চাপা পড়ে গেছি। তবে এটি একটি পুরনো গল্প, দীর্ঘ নীরবতার পর ড. সেলউইন বলেন। আমাদের সত্যি উচিত, তিনি এডউইনের দিকে ফিরে বলেন, গত ভ্রমণে আমরা ক্রিটে যে-ছবিগুলো তুলেছিলাম, সেগুলো আমাদের অতিথিদের দেখানো। আমরা বসার ঘরে ফিরে আসি। কাঠের টুকরোগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিল। ড. সেলউইন একটা ঘণ্টাদড়িকে ফায়ারপ্লেসের ডানদিকে টেনে আনেন এবং সঙ্গে সঙ্গে, যেনবা সে তাঁর ইশারার অপেক্ষাতে পাশের প্যাসেজেই দাঁড়ানো ছিল, একটা স্লাইড প্রজেক্টর-বসানো ট্রলি ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে এলেইন। ম্যান্টেলপিসের ওপরকার বৃহৎ অরমলু ঘড়ি ও মেইসেন পুতুলসমূহ, রাখাল-রাখালিনী ও রঙিন পোশাকপরা চোখ-ঘোরানো মুরকে একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়, এবং এলেইনের আনা কাঠের ফ্রেমঅলা পর্দাটাকে আয়নার সামনে টাঙানো হয়। প্রজেক্টরের মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়, এবং সচরাচর অদৃশ্য, ঘরের ধুলোবালিসমূহ তখন লেন্সের আলোতে চিকচিক করে নাচতে থাকে, যেনবা মূল ছবি শুরুর ভূমিকাস্বরূপ। তাঁদের ক্রিট ভ্রমণটি ঘটেছিল বসন্তকালে। আমাদের সম্মুখে বিস্তৃত দ্বীপের নিসর্গচিত্রকে মনে হয়েছিল উজ্জ্বল সবুজে ঢাকা। দুয়েকবার এডউইনকে তাঁর ফিল্ডগ্লাস ও উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহের পাত্র, অথবা ড. সেলউইনকে হাঁটু অব্দি হাফ প্যান্টপরা, কাঁধব্যাগ ও প্রজাপতি ধরার জালসহ দেখা গিয়েছিল। একটা স্লাইডের সঙ্গে, এমনকি তার বিশদরূপেও, শ্টাড পর্বতে দাঁড়ানো নবোকভের একটি ছবির ভীষণ সাদৃশ্য চোখে পড়েছিল আমার, যেটি আমি কয়েকদিন আগেই একটি সুইস ম্যাগাজিন থেকে কেটে নিয়েছিলাম।

অদ্ভুত ব্যাপার, এডউইন ও ড. সেলউইন দুজনকেই এই ছবিগুলোতে বেশ তরুণ বলে মনে হচ্ছিল, যদিও এই ভ্রমণটি যখন করেছিলেন তাঁরা, আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে, তখন দুজনেই ষাটের শেষপ্রান্তে ছিলেন। আমি টের পাই, তাঁদের দুজনের কাছেই এই অতীতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি একটা গভীর আবেগের ব্যাপার ছিল। তবে এমনও হতে পারে আমার কাছেই সেটা এমন মনে হয়েছিল, কেননা এডউইন কি সেলউইন দুজনের কেউই ছবিগুলো সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে ইচ্ছুক কিংবা সক্ষম ছিলেন না, যদিও দ্বীপের বসন্তকালীন গাছপালার ছবি দেখানোর সময় তাঁরা সেসব নিয়ে এবং পাখাঅলা কিংবা পায়েহাঁটা প্রাণীদের সম্পর্কে অনেক মন্তব্যই করছিলেন। তাঁদের ছবিগুলো যখন পর্দায় দেখা যাচ্ছিল, কিঞ্চিৎ কম্পমান, তখন সারা ঘরজুড়ে পরিপূর্ণ নীরবতা বিরাজ করত। শেষ ছবিতে আমরা লাসিথি মালভূমিকে ছড়ানো দেখি আমাদের সামনে, যা উত্তরের কোনো এক গিরিপথের ওপর থেকে তোলা হয়েছিল। ছবিটা নিশ্চয়ই দুপুরের দিকে তোলা হয়েছিল, কেননা সূর্যটা তখন ঠিক আমাদের দৃষ্টিরেখায় জ্বলজ্বল করছিল। তার দক্ষিণে স্পাথি পর্বত, দুই হাজার মিটার উঁচু প্রায়, মালভূমির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, আলোর বন্যার ওপারে এক মরীচিকার মতো। প্রশস্ত উপত্যকাভূমিজুড়ে আলু ও অন্যান্য সবজির খেত, ফলের বাগান ও বিবিধ বৃক্ষের গুচ্ছ, এবং অকর্ষিত খেত, অন্তহীন সবুজে স্নাত, তার মাঝে দণ্ডায়মান শতশত উইন্ডমিলের সাদা পাল। আমরাও অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে বসে এই ছবিটা দেখি, এতটাই দীর্ঘ সময় ধরে যে, স্লাইডের কাচটি ফেটে যায় এবং পর্দাজুড়ে একটা গভীর ফাটলচিহ্ন দেখা যায়। লাসিথি মালভূমির সেই ছবিটির এতটা সময় ধরে আমাদের চোখের সামনে স্থির থেকে এক পর্যায়ে ফেটে যাওয়াটুকু আমার ওপর গভীর রেখাপাত করে তখন, যদিও পরে তা আমার মন থেকে মুছে যায় একেবারে। এর বেশ কয়েবছর পরে সেটি আবার ফিরে আসে আমার কাছে, লন্ডনের একটি সিনেমাহলে বসে; কাসপার হাউসার ও তাঁর শিক্ষক ডাউমারের রান্নাঘরের লাগোয়া বাগানে তাঁদের একটি কথোপকথন অনুসরণ করার সময়। কাসপার, তাঁর শিক্ষককে প্রভূত আনন্দ দিয়ে, সেই প্রথমবারের মতো স্বপ্ন ও বাস্তবতার পাথর্ক্য বর্ণনা করছিলেন, যার শুরুটা ছিল এমন: আমি স্বপ্ন দেখছিলাম এবং আমার স্বপ্নে আমি ককেশাসকে দেখি। ক্যামেরা তখন ডান থেকে বাঁয়ে সরে যায়, একটা ছড়ানো জ্যা-এর মতো করে, পর্বতবেষ্টিত মালভূমির একটা পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য উপহার দিয়ে, যার আদলে স্পষ্টতই কোনো ভারতীয় মালভূমির ছাপ ছিল, সবুজ ঝোপঝাড় ও বনের মধ্যে অবস্থিত প্যাগোডাকৃতি স্তম্ভ, মন্দির এবং তাদের অদ্ভুত ত্রিভুজাকৃতির সম্মুখভাগসহ: চোখধাঁধানো আলোর ঢেউয়ের মধ্যে এইসব স্থাপনাসমূহ, আমাকে লাসিথির সেই উইন্ডমিলের পালগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল কেবল, যেগুলো বাস্তবে আমি অদ্যাবধি চোখে দেখিনি।

প্রায়র’স গেট থেকে আমরা ১৯৭১ এর মধ্য মে নাগাদ চলে যাই। এক বিকেলে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে ক্লারা একটা বাড়ি কিনে ফেলেছিল। প্রথম প্রথম আমরা দৃশ্যগুলোর অভাব বোধ করতাম, তবে তার বদলে আমাদের জানালায় দুটো উইলো বৃক্ষের সবুজ ও ছাইরঙা ডাল দেখতে পেলাম, যেগুলো বাইরে একবিন্দু বাতাস না থাকলেও সারাক্ষণই দুলত। গাছদুটো বাড়ি থেকে বড়জোর পনেরা মিটার দূরে ছিল, এবং পাতাদের নড়াচড়াকে এত কাছে মনে হত যে, বাইরে তাকালে মাঝেমধ্যে নিজেকেও তাদেরই অংশ বলে বোধ হত। ড. সেলউইন প্রায় নিয়মিত বিরতিতেই আমাদের তখন অব্দি প্রায় শূন্য বাড়িতে বেড়াতে আসতেন, হাতে করে তাঁর বাগানের সবজি ও ওষধি ইত্যাদি নিয়ে-- হলুদ ও নীলরঙা শিম, সযত্নে পরিষ্কার করা আলু, আর্টিচোক, চাইভ, সেইজ, শেরভিল ও ডিল। তাঁর এমনই কোনো বেড়াতে আসার দিনে, ক্লারা তখন শহরে ছিল, আমার কখনো বাড়ির জন্য খারাপ লাগে কি না, এমন জিজ্ঞাসার জবাবে আমরা এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় মগ্ন হই। আমি এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর ভাবতে পারছিলাম না, কিন্তু ড. হেনরি সেলউইন, কিছুটা বিরতির পর, স্বীকার করেন (অন্য কোনো শব্দ এখানে তাঁর প্রতি সুবিচার করবে না) যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বেশি করে গৃহকাতরতায় আক্রান্ত হচ্ছিলেন। আমি যখন জানতে চাই ঠিক কোন জায়গাটার প্রতি টান অনুভব করেন, তিনি জানান সাত বছর বয়সে তিনি লিথুয়ানিয়ার গ্রদ্নোর কাছাকাছি একটা গ্রাম থেকে মা-বাবার সঙ্গে চলে এসেছিলেন। ১৮৯৯ সালের এক শারদীয় অপরাহ্নে তিনি তাঁর বাবা-মা, তাঁর বোন গিতা ও রাজা, কাকা শানি ফেল্ডহ্যান্ডলার মিলে কোচোয়ান অ্যারন ওয়াল্ডের একটা গাড়িতে চেপে গ্রোদ্নো পৌঁছেছিলেন। কালের প্রবাহে সেই গৃহত্যাগের ছবিগুলো তাঁর স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি, তিনি বলেন, সেগুলো আবার ফিরে এসে তাদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে। আমি এখনও আমার সেই শিক্ষককে দেখতে পাই, যিনি চেডের স্কুলের বাচ্চাদের পড়াতেন, আমিও যেখানে দুবছর ধরে যাচ্ছিলাম, আমার মাথায় তিনি হাত রাখছেন; আমি আমাদের বাড়ির শূন্য ঘরগুলোকেও এখন দেখতে পাই। আমি গাড়ির সবচেয়ে ওপরের আসনে নিজেকে উপবিষ্ট দেখতে পাই, ঘোড়ার লাগামখানি দেখি, দেখি বিশাল বাদামি মাঠ, খামারের জলার ধারে ঘাড় উঁচু করা রাজহাঁসদের দেখি, গ্রদ্নো স্টেশনের ওয়েটিং রুমটা দেখি, একটা রেলিং ঘেরা একলা-দাঁড়ানো ফার্নেসের আগুনে অতিরিক্ত উষ্ণ, আর তার চারপাশে শুয়ে থাকা দেশত্যাগী মানুষের দঙ্গল দেখি। ট্রেনের জানালা দিয়ে টেলিগ্রাফের তারগুলোর ওঠা পড়া দেখি আমি, রিগা হাউসের সম্মুখভাগ, ডকের জাহাজগুলো, ডেকের ওপরের অন্ধকার কোণ, যেখানকার সংকীর্ণ পরিসরেই আমরা স্বচ্ছন্দ হবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম। উত্তাল সমুদ্র, ধোঁয়ার কুণ্ডলী, দূরের ধূসরতা, জাহাজর ওঠাপড়া, আমাদের সবার ভেতরকার ভীতি ও আশা, এই সবটুকু (ড. সেলউইন আমাকে বলেছিলেন) আমি আবার যাপন করতে পারি, যেনবা তা মাত্র গতকালের ঘটনা। এক সপ্তাহ পরে, যতটা ভেবেছিলাম তার অনেক আগেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাই। আমরা একটা প্রশস্ত নদীর মোহনায় প্রবেশ করি। সেখানে সর্বত্রই ছোট বড় মালবাহী নৌকোদের চলাচল। তীরের ওপারের ভূমি সমতল। অভিবাসীরা সবাই ডেকের ওপরে এসে কুয়াশা কেটে গেলে স্ট্যাচু অভ লিবার্টির আবির্ভূত হবার অপেক্ষা করতে থাকে, কেননা তারা সবাই, তাদের উচ্চারণে আমেরিকামে আসার জন্যই জাহাজের টিকেট কিনেছিল। আমরা যখন জাহাজ থেকে নামি তখনও কোনো সন্দেহ ছিল না যে, আমাদের পায়ের নিচে প্রতিশ্রুত সেই সিটি অভ নিউইয়র্ক তথা নিউ ওয়ার্ল্ডের মাটি। কিন্তু কার্যত, খানিক বাদেই প্রবল হতাশার মধ্যে জানতে পারি যে, আমরা আসলে লন্ডন শহরের সমুদ্রতীরে ভেসে এসেছি (তার অনেক আগেই জাহাজটার ফিরতি নোঙর খুলে দেয়া হয়েছিল)। অধিকাংশ অভিবাসীই, প্রয়োজনের তাগিদে এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু কেউ কেউ সমস্ত বিপরীত সাক্ষ্য সত্ত্বেও আরও অনেকক্ষণ ধরে তাদের এই বিশ্বাসে অটল ছিল যে, তারা আসলে আমেরিকাতেই এসেছে। আমি অতএব লন্ডন শহরেই বেড়ে উঠি, হোয়াইটচ্যাপেলের গুল্স্টন স্ট্রিটের একটি পাতাল প্রকোষ্ঠে। আমার বাবা, যিনি চশমার কাচ ঘষার কাজ করতেন, তাঁর সঙ্গে আনা টাকা দিয়ে টসিয়া ফেইগেলিস নামে গ্রদ্নোর এক লোকের চশমার দোকানের অংশীদারিত্ব ক্রয় করেন। আমি হোয়াইটচ্যাপেলের একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়তে যাই এবং যেন স্বপ্নের মধ্যেই ইংরেজিটা শিখে ফেলি, কেননা আমি তরুণী শিক্ষিকা লিসা ওয়েনের প্রতি ভালবাসা থেকে, তাঁর ঠোঁটে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দকে গিলে নিতাম। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমি তিনি সেদিন যা যা বলেছিলেন তার পুনরাবৃত্তি করি, বারেবারে, তাঁর কথা ভাবতে ভাবতে। সেই সুন্দরী শিক্ষিকাই, ড. সেলউইন বলেন, আমাকে মার্চেন্ট টেইলর স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, প্রতি বছর সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রদের জন্য যে বৃত্তিগুলোর ব্যবস্থা করা হয় তার একটি আমি পাব। এবং এটা প্রমাণিত হয় যে, আমি তাঁর প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হই; কাকা শানি একটা কথা প্রায়ই বলতেন সবাইকে, হোয়াইট চ্যাপেলের আমাদের দুই কামরার বাড়ির রান্নাঘরের আলো না কি কোনোদিনই নিভত না, কেননা আমার বোন ও বাবামা বিছানায় চলে যাবার পরও সেখানে আরও বহুক্ষণ ধরে পড়াশোনা করতাম আমি। আমার চোখের সামনে যা-ই পড়তো সেটাই আমি পড়তাম এবং শিখে নিতাম, এবং বড় বড় সব বাধাকেই ক্রমবর্ধমান স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে অতিক্রম করে যেতাম। আমার স্কুলের জীবন শেষ হতে হতে, আমি যেহেতু আমার ক্লাসের সেরা ছাত্র হিসাবেই বেরোই, আমার মনে হয়েছিল আমি আসলেই বহুদূর অগ্রসর হয়েছি। আমার অত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে, যেন তারই দ্বিতীয় নিশ্চয়তা প্রদানের নিমিত্তে আমি আমার প্রথম নাম হার্মকে পাল্টে হেনরি এবং শেষ নাম সেওয়েরিনকে সেলউইন করে ফেলি। আশ্চর্যের বিষয়, তারপর ডাক্তারি শিক্ষা শুরু করার পর (কেম্ব্রিজে, আবারও একটি বৃত্তির সহায়তায়) আমি লক্ষ করি আমার শেখার ক্ষমতায় যেন একটু টান পড়েছে, যদিও তখনও পরীক্ষার ফলাফলে আমি সেরাদের মধ্যেই ছিলাম। আপনি এরই মধ্যে জেনে গেছেন এরপর ঘটনা কীভাবে এগিয়েছিল, ড. সেলউইন বলেন: সুইৎজারল্যান্ডের দিনগুলো, যুদ্ধ, ইন্ডিয়ায় আমার প্রথম চাকরি, এলির সঙ্গে বিয়ে, যার কাছ থেকে আমি আমার প্রকৃত অতীতকে লুকিয়ে রেখেছিলাম অনেকদিন। বিশ ও ত্রিশের দশকে আমরা রাজকীয় জীবনযাপন করছিলাম; আপনি নিজেই দেখেছেন এখন তার কতটুকু অবশিষ্ট আছে। এসব করতে গিয়ে এলির সৌভাগ্যের অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সত্যি, শহরে আমার প্র্যাকটিস ছিল, সার্জন হিসাবে একটা হাসপাতালে কাজও করতাম, কিন্তু আমার একার উপার্জনে আমরা সেরকম জীবন কাটাতে পারতাম না। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে আমরা গাড়ি চালিয়ে গোটা ইউরোপ চষে বেড়াতাম। টেনিসের পর, ড. সেলউইন বলেন, সেই দিনগুলোতে গাড়ি চালানো ছিল আমার আরেক ভালবাসা। গাড়িগুলো এখনও আমার গ্যারাজে রয়েছে, এবং সেগুলোর মূল্যও এখন অনেক চড়া হবার কথা। কিন্তু আমি কোনোদিনই কোনো কিছু বিক্রি করার ব্যাপারে নিজেকে সম্মত করাতে পারিনি, একবারই সম্ভবত, আমার আত্মাকে বিক্রি করা ছাড়া। লোকেরা আমাকে সবসময়ই বলেছে টাকাপয়সা বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই। আমার এমনকি বৃদ্ধ বয়সের জন্য একটা পেনশন কিনে রাখার দূরদৃষ্টি পর্যন্ত ছিল না। সেজন্যই আমি এখন কার্যত একজন গরিব মানুষ। এলি, অন্যদিকে, তার সৌভাগ্যের যেটুকু বাকি ছিল তার সদ্ব্যবহার করেছে এবং এখন সম্ভবত সে বেশ বিত্তশালী একজন নারীই হবে। আমি এখনও জানি না কোন বিষয়টা আমাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, আমার অবৈষিয়কতা, আমার অতীতের উদ্ঘাটন নাকি স্রেফ ভালবাসার অবসান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বছরগুলো এবং তার পরবর্তী দশকটি আমার জন্য খুবই অন্ধকার ও খারাপ সময় ছিল, যার সম্পর্কে আমি চাইলেও কিছুই বলতে পারিনি। ১৯৬০ সালে আমি যখন আমার প্র্য্রাকটিস ও রোগীদের পরিত্যাগ করলাম, তখনই, আপনারা যাকে বলেন সত্যিকার পৃথিবী, তার সঙ্গে আমার শেষ সম্পর্কটুকু ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর থেকে আমার প্রায় একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে গাছপালা ও পশুপাখি। যেকোনো ভাবেই হোক তাদের সঙ্গে আমার বেশ ভালো বনে, বলেন ড. সেলউইন, মুখে দুর্বোধ্য এক হাসি নিয়ে, এবং দাঁড়িয়ে উঠে তিনি এমন একটা কাজ করেন যেটা তাঁর জন্য খুবই অভাবনীয় ছিল। তিনি বিদায়ের ভঙ্গিতে আমার দিকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দেন।

সেদিনের পর থেকে আমাদের বাড়িতে ড. সেলউইনের আসা অনেক কমে যায়। তাকে শেষ দেখি আমরা ফ্রান্সে ছুটি কাটাতে যাওয়ার কিছু আগে, যেদিন তিনি ক্লারার জন্য একতাড়া সাদা গোলাপ ও হানিসাকলের গোছা নিয়ে এসেছিলেন। এর কয়েকসপ্তাহ পরে, গ্রীষ্মের শেষাশেষি , তিনি তাঁর বড় বন্দুকটির গুলিতে নিজের প্রাণ হরণ করেন। তিনি বিছানার প্রান্তে বসে (আমরা ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে জানতে পারি) তাঁর পায়ের মাঝখানে বন্দুকটা নিয়ে, চিবুকে এর নল ঠেকিয়ে, ইন্ডিয়া যাবার আগে তা কেনার পর এই প্রথমবারের মতো কোনোকিছুকে হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়েই তার ট্রিগার টেপেন। খবরটা পাওয়ার পর এর প্রাথমিক আঘাতখানি কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাকে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আছে, যে-বিষয়ে আমি ক্রমেই আরও বেশি করে অবগত হচ্ছি, যা দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে আসতে পারে। ১৯৮৬ সালের শেষ জুলাইয়ে আমি কিছুদিনের জন্য সুইৎসজারল্যান্ডে ছিলাম। ২৩ তারিখের সকালে আমি জুরিখ থেকে লসান যাবার ট্রেন ধরি। বার্ন শহরে ঢোকার আগে আরে ব্রিজটা অতিক্রম করার জন্য ট্রেনটা যখন তার গতি কমায়, তখন আমি শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে ওবারল্যান্ড পর্বতের দিকে তাকাই। সেই সময়ে, আমি স্মরণ করি, কিংবা কল্পনা, অনেকদিন পরে ড. সেলউইনের স্মৃতি আমাকে গ্রাস করেছিল। পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর, লেক জেনেভার দৃশ্য দেখা থেকে নিজেকে বঞ্চিত না করার জন্য, তার অমন উদ্ভাসিত হবার দৃশ্যটি আমাকে বিস্মিত করতে ভোলে না কখনোই, জুরিখ থেকে কেনা লসানের স্থানীয় কাগজটিকে পাশে সরিয়ে রাখতে গিয়ে, আচমকা আমার চোখ চলে যায় একটা প্রতিবেদনে, যেখানে লেখা, বার্নের আল্পস গাইড জোহানেস ন্যাগেলির দেহাŸশেষ ৭২ বছর পর অবমুক্ত করে দিয়েছে ওবেরারের গ্লেসিয়ার কর্তৃপক্ষ, যিনি সেই ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মের পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন। অর্থাৎ, মৃতেরা বারবার ফিরে আসতে থাকে আমাদের কাছে। কখনো এমনকি তারা বরফের তলদেশ থেকে ফেরত আসে সত্তর বছর পরে, এবং পাথুরে হিমবাহের কিনারে পাওয়া যায় কিছু পরিষ্কার হাড়গোড় ও একজোড়া পেরেকবিদ্ধ বুট।

(মাইকেল হাল্স কৃত ইংরেজি অনুবাদ থেকে অনূদিত)

লেখক পরিচিতি : বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক উইনফ্রিড গিয়র্গ সেবাল্ড তথা ডব্লিউ. জি. সেবাল্ডের জন্ম ১৯৪৪ সালে জার্মানির বাভারিয়া অঞ্চলে। সাহিত্যের ছাত্র সেবাল্ড জার্মানি ও সুইৎজারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা শেষ করে এক পর্যায়ে ইংল্যান্ডের নরউইচ প্রদেশে থিতু হন এবং নিকটস্থ ইস্ট আংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেন। কবিতা লেখার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যচর্চার হাতে খড়ি হলেও কথাসাহিত্য ও সাহিত্যসমালোচনাতেই তাঁর সৃজনী-প্রতিভার সঠিক ও সত্যিকার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৯০ সালে প্রথম উপন্যাস Vertigo প্রকাশের পরই তাঁর ব্যতিক্রমী গদ্যশৈলীর অভিনবত্ব এবং বিষয়বস্তুর সারবত্তা ও বহুমাত্রিকতা বোদ্ধাজনের মনোযোগ আকর্ষণ করে। পরবর্তীকালে The Emigrants (1992), The Rings of Saturn (1995) এবং বিশেষ করে ২০০১ সালে তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস Austerlitz প্রকাশের পর সাহিত্যবোদ্ধা ও সমালোচকেরা তাঁকে সমকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক হিসাবে স্বীকার করে নেন। এঁদের কেউ কেউ তাঁর রচনায় বিখ্যাত আর্হেন্তিনীয় লেখক বোর্হেসের সমতুল্য ভাষিক উৎকর্ষ, বিষয়ভাবনার ব্যাপ্তি ও গভীরতা খুঁজে পান। তাঁর রচনার একটি বড় বৈশিষ্ট্য বাস্তবঘটনা, বাস্তবের বিনির্মাণ ও বিশুদ্ধ কল্পনার বুদ্ধিদীপ্ত পুনরুপস্থাপনা, যা নিজস্ব-নতুন এক সেবাল্ডীয় বাস্তবতার ইশারা দেয়। এরই অনিবার্য অনুষঙ্গস্বরূপ সেবাল্ড প্রায়শই আখ্যান বর্ণনার সঙ্গে তাঁর নিজের হাতে তোলা বর্ণিত ব্যক্তি, বস্তু ও স্থানসমূহের কিছু অস্পষ্ট কিন্তু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আলোকচিত্রও জুড়ে দেন। তিনি মূলত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ ও সীমাহীন নির্মমতার প্রভাবে মানুষের মধ্যে যে এক অনতিক্রম্য বিষাদ, নির্বেদ ও বিচ্ছিন্নতার প্রকোপ দেখতে পান, তাকেই তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য করেন। সেইসঙ্গে স্মৃতি, স্মৃতিহীনতা, প্রেম, অপ্রেম, অবক্ষয়, অবসাদ সর্বোপরি মৃত্যুর অমোঘ উপস্থিতিও জুড়ে থাকে তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম ও চিন্তায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই মৃত্যু তাঁর নিজের জীবনেও হানা দেয় খুব অসময়ে এবং অভাবনীয় চেহারায়: ২০০১ সালে তিনি ইংল্যান্ডে তাঁর বাড়ির কাছেই কন্যাকে নিয়ে গাড়ি চালানোরত অবস্থায় আকস্মিকভাবে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে করুণ মৃত্যু বরণ করেন। উপন্যাস ছাড়া তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্থগ্রন্থও রয়েছে A Place in the Country (1998) ও On the Natural History of Destruction (1999) নামে। জীবদ্দশায় তাঁর সর্বশেষ বই, For Years Now ঘড়ি শিরোনামে একটি কাব্যগ্রন্থ, যার সচিত্রকরণ করেন বিখ্যাত ব্রিটিশ শিল্পী টেস জ্যারেই।

অপরদিকে, আলম খোরশেদ মননশীল লেখক ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৬০ সালে কুমিল্লায়। পেশায় প্রকৌশলী। দীর্ঘকাল প্রবাসজীবন যাপন করে ২০০৪ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন এবং লেখালেখিকেই পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর সম্পাদিত লাতিন আমেরিকান ছোটগল্প সংকলন জাদুবাস্তবতার গাথা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সম্পাদনা, অনুবাদ ও মৌলিক রচনা মিলিয়ে তিনি ত্রিশটির অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ভার্জিনিয়া উল্ফের A Room of One's Own-এর অনুবাদ নিজের একটি কামরা; কবি ভিস্লাভা শিম্বস্কার কবিতার অনুবাদ; বাংলাদেশের নারীবাদী গল্প-সংকলন কাটা জিহ্বার কথা; মূল স্প্যানিশ থেকে অনূদিত বোর্হেস ও বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর আলাপচারিতা; হেনরি মিলারের আত্মজৈবনিক রচনা Reflections-এর অনুবাদ ভাবনাগুচ্ছ; সালমান রুশদির নিকারাগুয়ার ভ্রমণ আখ্যান The Jaguar Smile-এর অনুবাদ; কানাডীয় সেবিকা জিনি লকাব্বির মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে ইত্যাদি। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে ২০২২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে অ্যারাইজ আউট অভ দা লক: ফিফটি বাংলাদেশি উইমেন পোয়েটস ইন ইংলিশ শিরোনামে ইংরেজি গ্রন্থ। অনুবাদসাহিত্যে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২২ পেয়েছেন।