স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ : আনিসুজ জামান

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিঠিটা পাচ্ছিল সে। ভুল করে আসা অন্য কোনো চিঠি নয়। একই চিঠি। যে চিঠিটা সে বারবার ডাকঘরে ফিরিয়ে দিয়েছে, কয়েক দিন পর সেটাই আবার তার ডাকবাক্সে ফিরে এসেছে। বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের বিলের পাশে যত্ম করে রাখা।

হাভিয়ের চিঠিটা দেখেই চিনতে পারত, কারণ প্রথমবার ফেরত পাঠানোর সময় সে খামের ওপর নীল কালি দিয়ে লিখেছিল, “প্রাপক অজ্ঞাত”। এতদিন কম্পিউটারে টাইপ করতে করতে নিজের হাতের লেখা তার কাছে অচেনা হয়ে গেছে। তাছাড়া, চিঠিটা যার নামে পাঠানো, সেই নামও সে কখনো শোনেনি। বার বার করে পড়ে দেখার পর নামটা তার বানানো বলেই মনে হয়েছে।

তামাউ লিপো।

এরকম নাম কি কারো হয় নাকি?

প্রেরকের নামটাও তার চেনা ছিল না। তবে এতবার পড়তে পড়তে মনে হত লাগল, কোথাও যেন শুনেছে নামটা। কিন্তু কোথায় মনে করতে পারল না। ঠিকানাটা অবশ্য তার নিজের।

তাই তার মনে হতে লাগল, চিঠিটা হয়তো বাড়ির পূর্বের কোনো ভাড়াটিয়ার নামে এসেছে। বাড়িটা তো ভাড়ার। সে এসেছে মাত্র কয়েক মাস হলো।

বাড়িতে একটিমাত্র শোবার ঘর। তার সঙ্গে ছোট্ট একটা বারান্দা। সেখান থেকে দেখা যায় আঁকাবাঁকা পাথর-বিছানো একটা গলি। বসার ঘরের বড় বারান্দা থেকে সামনের বাড়িগুলোর ছাদের ফাঁক গলে শীতের ধূসর আকাশের নিচে সমুদ্রের একটা বিবর্ণ নীল রেখা চোখে পড়ে।

সিঁড়ির দরজার পাশে লাগানো ডাকবাক্সটা। প্রথম বারান্দা থেকেই সহজে দেখা যায়। তাই ডাকপিয়নকে হাতেনাতে ধরে একই চিঠি বারবার দিয়ে যাওয়ার কারণটা সে জেনে নেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যতই চেষ্টা করুক, বারান্দায় বসে কাঁপতে কাঁপতে অপেক্ষা করুক, সে কখনো পিয়নকে দেখতে পায়নি।


তবে চিঠিটা ঠিকই আসতে থাকল। তিন-চার দিন পরপর আবার তার ডাকবাক্সে হাজির হতো, যেন মাটি ফুঁড়ে নিজে থেকেই বেরিয়ে এসেছে।

একাধিকবার পাথরের রাস্তার ওপর ঠেলাগাড়ির চাকার শব্দ শুনে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠেছে। কখনো কাজ ফেলে ছুটে গেছে দেখতে। কিন্তু দেখেছে বাজার থেকে ফেরা কোনো বৃদ্ধা নিজের কেনাকাটার গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে, কিংবা কোনো তরুণ দম্পতি শিশুর গাড়ি ঠেলে রাস্তা পার হচ্ছে।

একদিন দুপুরে কাজ সেরে ফেরার পথে দেখা হয়ে গেল ডাকপিয়নের সঙ্গে। লোকটা তখন তার বাড়ির সামনে নয়, ডাকবাক্সেও কিছু দিচ্ছিল না। তবু নিজের গলি থেকে তাকে বেরোতে দেখে হাভিয়ের এগিয়ে গেল। কোনো সম্ভাষণ না করেই জানতে চাইল, ফেরত পাঠানো একটা চিঠি বারবার তার কাছে ফিরে আসে কিভাবে।

লোকটা ঠেলাগাড়িটা পাশে রেখে সিগারেট বানানে লাগল। আগুন ধরিয়ে এক টান ধোঁয়া ছেড়ে সে বলল, ডাকঘরে গিয়ে অভিযোগ করুন।

অদ্ভুতভাবে, সেদিন আর চিঠিটা পেল না সে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে করল, সমস্যাটা তাহলে গেছে।

ভোররাতে পাথর-বিছানো রাস্তার ওপর চাকার কাঁপা কাঁপা শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। মনে হলো, হয়তো স্বপ্নে শুনেছে। কিন্তু সকালে নিচে নেমে ডাকবাক্সটা খুলতেই সেই চিঠিটা পেল েস। এক মুহূর্তও দেরি করল না। সোজা ডাকঘরের দিকে রওনা দিল। কিন্তু গলির মাঝখানে এসে থেমে গেল। তখনই খেয়াল করল, পায়জামাটা ছাড়তে করতে ভুলে গেছে। পায়ে শুধু মোজা আর স্যান্ডেল। বাড়ি ফিরে পোশাক বদলাতে বদলাতে ভাবল, এর একটা বিহিত করা দরকার।

রান্নাঘর থেকে ছুরি এনে অদক্ষ হাতে খামটা ছিঁড়ে ফেলল।

চিঠিতে লেখা ছিল:
প্রিয় তামাউ লিপো,
একজন মানুষের নামই তার সবকিছু। নামই বলে দেয় আমরা কে, পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান কোথায়। নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের ইতিহাস। নাম না থাকলে আমরা জানতাম না, হাতে পাওয়া চিঠিটা আমাদের জন্য, নাকি অন্য কারও উদ্দেশে লেখা।

তুমি চিঠিটা খুলে পড়েছ। তার মানে তুমি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছ, এই নাম এখন তোমার। তোমার নামেই গেছে চিঠিটা। আমরা ধরে নিচ্ছি, তুমিও নিজেকে সেই পরিচয়ে মেনে নেবে। সেই সঙ্গে মেনে নেবে তোমার অপরাধও—রিফ অঞ্চলে এক ব্যক্তির শিরশ্ছেদ করার অপরাধ। মানুষটি ছিল আমার বাবা। বহু বছর ধরে আমরা তার হত্যাকারীকে খুঁজে বেড়িয়েছি। আমরা শুধু তার নামটা পেয়েছিলাম। হত্যাকারী নিজেই স্বাক্ষরের মতো করে তার নামটি পাথরের ওপর লিখে রেখে গিয়েছিল। এই চিঠি পড়ে তুমি সেই নামটা নিজের করে নিয়েছ।

এখন হয়তো সেই ঘটনার কথা তোমার মনে পড়বে। হয়তো তুমি জানতে না, অথবা ভুলে গিয়েছিলে। যুদ্ধের সময় তুমি যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলে। পরে তোমার বাবা-মা বাপ্টাইজের সময় তোমার নাম বদলে সেই অপরাধ আড়াল করতে চেয়েছিল।

আমাদের অনুসন্ধান অবশেষে শেষ হয়েছে। আমরা আশা করি, তামাউ লিপো, যখন আমরা তোমার গলা কেটে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেব, তখন অন্তত আমাদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস তোমার থাকবে।

চিঠিটা পড়ে হাভিয়ের স্তব্ধ হয়ে বসে রইল হাভিয়ের।

রিফের সেই ঘটনার তারিখটা ঠিক মনে পড়ছিল না। ১৯১০? নাকি ১৯২০? তার বাবা-মারই তো তখন জন্ম হয়নি! সে পুরো ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু একধরনের অস্বস্তি এসে বুকে বসে গেল। যেন বহু পুরোনো কোনো অপরাধবোধ। নিজের চেয়েও পুরোনো।

হঠাৎ স্মৃতির গভীরে ক্ষণিকের জন্য একটা দৃশ্য ভেসে উঠল :
একটি সামরিক পোশাক। পাহাড়ি প্রান্তর। এক বৃদ্ধ বেরবার মানুষের রক্তাক্ত ঠোঁট। মৃত্যুর আগে মানুষটা প্রার্থনা করছিল।
—তামাউ লিপো! বাইরে থেকে কেউ একজন চিৎকার করে উঠল। একই সঙ্গে দরজায় ধাক্কা।
—আমরা জানি তুমি ভেতরে আছ, তামাউ লিপো!
—অন্তত আমাদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস রেখো, আমরা যখন তোমার গলা কাটব!

প্রতিটি চিৎকারের সঙ্গে হাভিয়েরের মনে হতে লাগল, সে যেন একটু একটু করে তামাউ লিপো হয়ে উঠছে। খাম খোলার ছুরিটা সে আবার হাতে তুলে নিল। আরো শক্ত করে ধরল। ধীরে ধীরে সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।

সে জানত, শেষ ধাপে পৌঁছে দরজা খুললে রিফে শিরশ্ছেদ হওয়া সেই লোকের সন্তানরা যে মুখটি দেখবে, সেটি আর হাভিয়েরের না। দেখবে তামাউ লিপোর মুখ। ·

লেখক পরিচিতি : রদোলফো লারা (১৯৭৩) কলম্বীয়-ক্যারিবিয়ান কবি ও গল্পকার। তিনি গল্প ও কবিতায় একাধিক পুরস্কার পান। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি অ্যান্থলজিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি কলোম্বিয়ার সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে থাকেন। তিনি কলম্বিয়া ও চিলিতে বসবাস করেছেন। বর্তমানে আছেন দক্ষিণ স্পেনে।