অনিন্দ্য অন্তর

১৯৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর। কায়রোর আগুজায় নিজের বাড়ির সামনে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন নাগিব মাহফুজ। বয়স বিরাশি। বহু বছর ধরে তাঁর জীবন চলত প্রায় একই নিয়মে। সকালে লেখা, নির্দিষ্ট সময়ে হাঁটা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিচিত কফির দোকানে বসা। ১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর নাম পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে গেছে, কিন্তু নিজের জীবনযাপন খুব বেশি বদলাননি। তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। তবু মাহফুজের মনে হতো, যে শহরে তিনি সারা জীবন হেঁটেছেন, শেষ বয়সে সেখানে পাহারা নিয়ে চলতে হবে কেন?

সেদিন এক তরুণ তাঁর কাছে এগিয়ে এল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ঘাড়ে ছুরি চালাল। আঘাত ছিল ভয়ংকর। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলো। বড় রক্তনালি অল্পের জন্য রক্ষা পেল। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো তাঁকে। কয়েক ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পর প্রাণে বেঁচে গেলেন, কিন্তু ঘাড়ের আঘাতে ডান হাত ও বাহু নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলো। যে হাত দিয়ে এত বছর ধরে উপন্যাস, গল্প, চিত্রনাট্য লিখেছেন, সেই হাত আর আগের মতো চলল না।

কিন্তু ঘটনার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি শুধু ছুরিকাঘাত নয়। পরে জানা গেল, যে তরুণ মাহফুজকে হত্যা করতে গিয়েছিল, সে সেই উপন্যাসটিই পড়েনি, যে উপন্যাসের জন্য মাহফুজকে ধর্মদ্রোহী বলা হচ্ছিল। শুধু সেই বই নয়, মাহফুজের অন্য কোনো বইও তার পড়া ছিল না। তবু সে জানত, মানুষটিকে হত্যা করতে হবে। কারণ তাকে বলা হয়েছিল, নাগিব মাহফুজ ধর্মের শত্রু।

একজন লেখককে পড়ার আগেই তাঁর বিচার হয়ে গেছে। তাঁর লেখার অর্থ অন্য কেউ ঠিক করে দিয়েছে। তারপর তাঁর বেঁচে থাকার অধিকারও অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখানেই ঘটনাটি একজন বিখ্যাত লেখকের ওপর হত্যাচেষ্টার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। প্রশ্ন আসে, একটি সমাজে কী ঘটলে একজন তরুণ এমন একজন বৃদ্ধ লেখককে হত্যা করতে যায়, যার একটি বইও সে পড়েনি?

নাগিব মাহফুজের জন্ম ১৯১১ সালে কায়রোর পুরোনো গামালিয়া এলাকায়। তাঁর সাহিত্য বুঝতে হলে কায়রোকে মনে রাখতে হয়। এই শহর শুধু তাঁর জন্মস্থান নয়, তাঁর লেখারও প্রাণ। পুরোনো গলি, মসজিদের পাশের রাস্তা, বাজার, দোকান, কফির দোকান, ছোট ছোট বাড়ি, মধ্যবিত্ত পরিবার, দরিদ্র মানুষ, সরকারি কর্মচারী, বেকার যুবক, ধর্মভীরু বৃদ্ধ, রাজনৈতিক কর্মী, পতিতা, দোকানি, গুন্ডা, স্বপ্নবাজ, ব্যর্থ মানুষ, সবাই তাঁর উপন্যাসে জায়গা পেয়েছে। তিনি মিশরকে দূর থেকে দেখেননি। মানুষের ঘরের ভেতর দিয়ে দেখেছেন। বাবার সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর টানাপোড়েন, চাকরির চেষ্টা, অর্থকষ্ট, প্রেম, যৌনতা, ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক মর্যাদা, ভয়, ঈর্ষা, আশা, অপমান, এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই তাঁর মিশর তৈরি হয়েছে।

প্রথম দিকের কয়েকটি উপন্যাসে তিনি প্রাচীন মিশরের ইতিহাস নিয়ে লিখেছিলেন। পরে ফিরে এলেন নিজের সময়ের কায়রোয়। Midaq Alley–তে একটি গলির কয়েকজন মানুষের জীবন দিয়ে বড় একটি সমাজকে দেখালেন। এরপর এল তাঁর বিখ্যাত Cairo Trilogy: Palace Walk, Palace of Desire এবং Sugar Street। একটি পরিবারের কয়েক প্রজন্মের জীবন ধরে মিশরের সমাজ ও রাজনীতির বদল সেখানে ধরা পড়েছে।

১৯৫২ সালে মিশরে রাজতন্ত্রের পতন হলো। সামরিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে নতুন শাসন এল। গামাল আবদেল নাসের ধীরে ধীরে দেশের প্রধান নেতা হয়ে উঠলেন। প্রথম দিকে এই পরিবর্তন অনেক মানুষের মতো মাহফুজকেও আশাবাদী করেছিল। পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে গেছে, এবার হয়তো আরও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরি হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি দেখলেন, বিপ্লব ক্ষমতার পুরোনো সমস্যা সব সময় শেষ করতে পারে না। পুরোনো শাসকের জায়গায় নতুন শাসক আসে। মুক্তির নামে তৈরি নতুন ব্যবস্থাও মানুষের স্বাধীনতা কমিয়ে দিতে পারে।

তাঁর লেখার ধরনও এই সময় বদলে গেল। সরাসরি সামাজিক বাস্তবতার পাশাপাশি রূপক, প্রতীক, স্বপ্ন, মনস্তত্ত্ব ও রাজনৈতিক ইঙ্গিত তাঁর লেখায় আরও বেশি জায়গা নিল। The Thief and the Dogs, Chitchat on the Nile, Miramar এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

কিন্তু যে বইটি তাঁকে সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে ফেলল, সেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। আরবি নাম Awlad Haratina। বাংলায় কাছাকাছি অর্থ হতে পারে ‘আমাদের মহল্লার সন্তানরা’। ইংরেজিতে বইটি Children of Gebelawi এবং পরে Children of the Alley নামে পরিচিত হয়েছে।

গল্পটি কায়রোর একটি গলির। সেখানে সাধারণ মানুষ থাকে। তাদের ওপর দাপট চালায় শক্তিশালী লোকেরা। গলির জমিজমা, সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণ। সাধারণ মানুষ ভয় ও অভাবের মধ্যে দিন কাটায়। তারা মুক্তি চায়, ন্যায় চায়, এমন একজন মানুষের অপেক্ষা করে যে এসে অত্যাচার থামাবে। গলিটির কাছে একটি বিশাল বাড়িতে থাকেন গেবেলাউই। সাধারণ মানুষ তাঁকে প্রায় দেখতে পায় না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি সর্বত্র। তাঁর সম্পত্তি, কর্তৃত্ব আর সন্তানদের ইতিহাস থেকেই গলিটির কাহিনি শুরু।

গেবেলাউইয়ের পরিবারে প্রথম বিরোধ দেখা দেয় আদহাম ও ইদরিসকে ঘিরে। পড়তে পড়তে আদম ও ইবলিসের কাহিনি মনে পড়ে। পরে আসে গাবাল, যার মধ্যে মুসার ছায়া আছে। এরপর রিফা'আ, যার জীবন যিশুর কথা মনে করিয়ে দেয়। তারপর কাসেম, যার জীবনে মহানবী মুহাম্মদের কাহিনির ছায়া স্পষ্ট। সবশেষে আসে আরাফা। সে কোনো নবীর প্রতিরূপ নয়। সে জ্ঞান, অনুসন্ধান ও বিজ্ঞানের মানুষ।

এই চরিত্রগুলোর কারণেই বইটি প্রকাশের পর তীব্র আপত্তি ওঠে। গেবেলাউইকে ঈশ্বরের রূপক হিসেবে দেখা হলো। নবীদের জীবনকে কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠল। আল-আজহারের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বইটির বিরোধিতা করল। ১৯৫৯ সালে আল-আহরাম পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের পর দীর্ঘদিন উপন্যাসটি মিশরে স্বাভাবিকভাবে বই আকারে প্রকাশ করা যায়নি। প্রথম পূর্ণ বই সংস্করণ বের হয় বৈরুতে, ১৯৬৭ সালে।

কিন্তু কাহিনিটিকে শুধু ধর্মবিরোধী লেখা বলে পড়লে অনেক কিছুই চোখ এড়িয়ে যায়। উপন্যাসে বারবার দেখা যায়, মানুষ মুক্তি চায়, একজন মানুষ অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কিছুদিনের জন্য আশা জাগে, তারপর আবার কয়েকজন শক্তিশালী মানুষের হাতে ক্ষমতা জমা হয়। আবার ভয় ফিরে আসে, আবার অন্যায়, আবার নতুন মুক্তিদাতার অপেক্ষা।

গাবাল আসে, মানুষকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। তার পরেও পুরোনো সমস্যা ফিরে আসে। রিফা'আ ভালোবাসা ও শান্তির পথ দেখায়, কিন্তু অন্যায় শেষ হয় না। কাসেম মানুষকে একত্র করে, নতুন সমাজের আশা তৈরি হয়, অথচ সেই সমাজেও পরে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। কাহিনি ধর্মের ব্যর্থতার কোনো সহজ ঘোষণা দেয় না। বরং প্রশ্ন তোলে, একজন মুক্তিদাতা যে কথা বলে যান, তাঁর চলে যাওয়ার পর মানুষ সেই কথার কী করে? ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি ব্যবস্থা কেন একসময় নিজেই অন্যায় করতে শুরু করে? মুক্তির জন্য গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান কেন পরে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে চায়?

একই প্রশ্ন রাজনীতির ক্ষেত্রেও ওঠে। একটি বিপ্লব মানুষের মুক্তির কথা বলে। পুরোনো শাসক চলে যায়, নতুন শাসক আসে। কিন্তু নতুন শাসক যদি ধীরে ধীরে পুরোনো শাসকের মতো আচরণ করতে শুরু করে, তাহলে বিপ্লবের অর্থ কী থাকে?

১৯৯৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জে. এম. কোয়েটজি মাহফুজের সাহিত্য নিয়ে Fabulous Fabulist নামে একটি দীর্ঘ আলোচনা প্রকাশ করেন। সেখানে Children of Gebelawi–এর ধর্মীয় রূপকের পাশাপাশি রাজনৈতিক দিকটিও তিনি দেখেছিলেন। গলিতে যারা শক্তির জোরে শাসন করে, তাদের মধ্যে নাসেরের সামরিক শাসনের ছায়াও আছে। মাহফুজ নিজেও একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, দেশ সত্যিই সমাজতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে, নাকি আরেক ধরনের সামন্ততন্ত্র তৈরি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ পরেই তাঁর ঘাড়ে ছুরি বসে।

উপন্যাসটির শেষ চরিত্র আরাফা প্রশ্নটিকে আরও দূরে নিয়ে যায়। আগের চরিত্রগুলোর মধ্যে নবীদের ছায়া ছিল। আরাফা নিজের বুদ্ধি, পরীক্ষা ও জ্ঞানের ওপর ভরসা করে। সে আধুনিক বিজ্ঞানের মানুষ। এখান থেকে সহজেই মনে হতে পারে, পুরোনো ধর্মীয় পথের বদলে এবার বিজ্ঞান মানুষকে মুক্ত করবে। কিন্তু কাহিনি সেই নিশ্চয়তাও দেয় না। আরাফার জ্ঞানও নিরাপদ থাকে না। জ্ঞান মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, আবার ক্ষমতাবানের হাতে গেলে দমন করার অস্ত্রও হতে পারে। ফলে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, জ্ঞান কার হাতে? বিজ্ঞান ব্যবহার করছে কে? মানুষের মুক্তির জন্য তৈরি শক্তি যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানের হাতে চলে যায়, তাহলে সেই শক্তির পরিণতিই বা কী হবে?

১৯৮৮ সালে মাহফুজ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন। আরবি ভাষায় সাহিত্য লিখে নোবেল পাওয়া প্রথম লেখক তিনি। এরপর তাঁর বই সারা পৃথিবীতে নতুন করে পড়া শুরু হলো। সেই সঙ্গে পুরোনো বিতর্কও ফিরে এল।

পরের বছর সালমান রুশদির The Satanic Verses নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হলো। আয়াতুল্লাহ খোমেইনি রুশদিকে হত্যার আহ্বান জানালেন। সেই ঘটনার আলোতে মাহফুজের Awlad Haratina আবার সামনে চলে এল। মাহফুজ রুশদির বইয়ের সবকিছুকে সমর্থন করেননি। বইটির কিছু অংশ তাঁর কাছে ইসলামের প্রতি অপমানজনকও মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই কারণে লেখককে হত্যা করার ঘোষণা তিনি মেনে নেননি। মতের জবাব মত দিয়েই দিতে হবে, হত্যার হুমকি দিয়ে নয়, এই জায়গায় তাঁর অবস্থান পরিষ্কার ছিল।

এই সময় মিশরের উগ্র ধর্মীয় নেতা শেখ ওমর আবদেল-রহমানের একটি বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কথার মর্ম ছিল, Children of Gebelawi লেখার জন্য মাহফুজকে যদি শাস্তি দেওয়া হতো, তাহলে রুশদি হয়তো The Satanic Verses লেখার সাহস করতেন না। পরে আবদেল-রহমান বলেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ফতোয়া ছিল না, একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে নিজের মত জানিয়েছিলেন। তাঁকে সরাসরি মাহফুজ হত্যার নির্দেশদাতা বলা ঠিক হবে না।

তবে এ ধরনের কথা যে কেমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তা বোঝা কঠিন নয়। একজন লেখকের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ বারবার উচ্চারিত হতে থাকলে একসময় তাঁর নামের জায়গায় ‘কাফের’, ‘ধর্মত্যাগী’ বা ‘ধর্মের শত্রু’ ধরনের পরিচয় বসে যায়। মানুষটি তখন তাঁর নিজের লেখা, জীবন, বিশ্বাস ও দ্বিধা নিয়ে সামনে থাকেন না। কয়েকটি শব্দ তাঁর জায়গা নিয়ে নেয়। ১৯৯৪ সালের ছুরিটি সেই পরিবেশের মধ্যেই এসে পড়ে।

পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের বিবরণ অনুযায়ী, সরাসরি হামলাকারী ছিল মোহাম্মদ নাগি মুস্তাফা নামে এক তরুণ। তার সঙ্গে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী সংগঠন আল-গামা'আ আল-ইসলামিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলা হয়। সামরিক আদালতে বিচার হয়। মুস্তাফা ও আরেকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়। পরে দুই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তবে বিচারটি নিয়েও প্রশ্ন ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সামরিক আদালতের বিচার, স্বীকারোক্তি আদায়ের পদ্ধতি ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে হামলাকারীর পরিবারও তার স্বীকারোক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রেমন্ড স্টকের বর্ণনায়, মুস্তাফা পরে দাবি করেছিল, নির্যাতনের মাধ্যমে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় সহিংসতা ভয়ংকর, কিন্তু সেই সহিংসতা দমনের নামে রাষ্ট্র কী করছে, সেটিও প্রশ্নের বাইরে রাখা যায় না।

হামলাকারী সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনা আছে, যা ঘটনাটিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। মাহফুজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদ সালমাউই পরে কারাগারে গিয়ে তরুণটির সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সালমাউইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তাকে জানিয়েছিলেন, মাহফুজ ব্যক্তিগতভাবে তাকে ক্ষমা করেছেন। তরুণটি তাতে বিচলিত হয়নি। বরং তার আফসোস ছিল, মাহফুজকে হত্যা করতে পারেনি। সুযোগ পেলে আবার চেষ্টা করত।

সালমাউই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মাহফুজের Awlad Haratina পড়েছে কি না। উত্তর ছিল, না। মাহফুজের অন্য কোনো লেখা? তাও না। তাহলে কী করে জানল মাহফুজ ধর্মদ্রোহী? তার উত্তর ছিল, তাদের দলের আমির তাকে তাই বলেছিল।

এই কথোপকথন আমরা সালমাউইয়ের বর্ণনা থেকে জানি, তাই সেই সূত্রের বয়ান হিসেবেই দেখা ভালো। কিন্তু ঘটনাটি সত্যি হয়ে থাকলে বোঝা যায়, তরুণটির হয়ে অন্য কেউ বইয়ের অর্থ ঠিক করে দিয়েছিল, লেখকের পরিচয় ঠিক করেছিল, অপরাধও ঠিক করেছিল। তার নিজের পড়া বা বিচার করার দরকার পড়েনি।

মাহফুজের প্রতিক্রিয়া ছিল অন্যরকম। হাসপাতালে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কাকে দায়ী করেন। তিনি শুধু সেই তরুণটির দিকে আঙুল তোলেননি। তাঁর কথায় বারবার ফিরে এসেছে সেই সমাজ ও ব্যবস্থার কথা, যার মধ্যে এমন তরুণ তৈরি হয়।

তিনি নিজের যৌবনের কথা বলেছিলেন। তাঁদের সময়ে তরুণেরা কফির দোকানে বসে রাত পর্যন্ত রাজনীতি, সাহিত্য, সমাজ নিয়ে কথা বলত। রাজনৈতিক মত বেছে নেওয়ার কিছু জায়গা ছিল। সামনে ভবিষ্যৎ আছে বলে মনে হতো। পরের প্রজন্মের বহু তরুণের সামনে কাজ ও জীবনের নিশ্চয়তা কমে গেছে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথও সংকুচিত হয়েছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা হারিয়েছে অনেকে। সমাজ যেন তাদের একটা বড় অংশকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

মাহফুজ তাই মৌলবাদকে কেবল ধর্মের সমস্যা হিসেবে দেখেননি। হতাশা, কাজের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বন্ধ দরজা আর ভবিষ্যৎহীনতার সঙ্গেও তার যোগ দেখেছিলেন। যে তরুণ নিজের জীবনের কোনো পথ দেখতে পাচ্ছে না, তাকে একটি সংগঠন খুব সহজ উত্তর দিতে পারে। বলতে পারে, তোমার দুর্দশার কারণ এই মানুষ, তোমার শত্রু ওই লেখক। তখন জটিল পৃথিবী হঠাৎ খুব সহজ হয়ে যায়। নিজের হয়ে ভাবার কাজটুকুও অন্য কেউ করে দেয়।

সালমাউইয়ের স্মৃতিতে, মাহফুজ পরে হামলাকারীকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আইনের বিচার বন্ধ করার কথা বলেননি। ব্যক্তিগত ক্ষমা আর রাষ্ট্রের বিচার তাঁর কাছে এক জিনিস ছিল না। বিচার চলার সময় অভিযুক্তদের পক্ষে হস্তক্ষেপও তিনি করেননি। তাঁর অবস্থানকে তাই একটি মাত্র শব্দে, ‘ক্ষমা’, দিয়ে শেষ করা ঠিক হবে না। যে তরুণ তাঁকে হত্যা করতে গিয়েছিল, তার অপরাধ সম্পর্কে মাহফুজের কোনো বিভ্রান্তি ছিল না। তবু তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এমন একজন তরুণ তৈরি হয় কীভাবে।

হামলার পর মিশরের লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। হাসপাতালে ভিড় করেন বন্ধু ও সহলেখকেরা। সাধারণ মানুষ রক্ত দিতে আসে। সরকারের মন্ত্রীরাও তাঁকে দেখতে যান। একজন সমালোচক বলেছিলেন, ছুরিটি শুধু মাহফুজের ঘাড়ে লাগেনি, আরব চিন্তার ঘাড়েও লেগেছে। ভয়টা তখন খুব বাস্তব ছিল। এর মাত্র দুই বছর আগে মিশরীয় লেখক ও চিন্তাবিদ ফারাগ ফোদাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। লেখকেরা জানতেন, ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ সব সময় কথায় শেষ হয় না।

ধর্মীয় মহলের প্রতিক্রিয়াও এক ছিল না। কেউ হামলার নিন্দা করেছেন, আবার একই সঙ্গে Awlad Haratina–র বিরোধিতা চালিয়ে গেছেন। তাঁদের অবস্থান ছিল, বইটি ধর্মীয়ভাবে ভুল হতে পারে, কিন্তু লেখককে হত্যা করা যাবে না। মাহফুজও ধর্ম আর ধর্মের নামে সহিংসতাকে এক করে দেখেননি। একটি বিশ্বাসের সমালোচনা, একটি বইয়ের বিরোধিতা এবং একজন মানুষকে হত্যা করা তাঁর কাছে একই কাজ ছিল না।

এডওয়ার্ড সাঈদ মাহফুজকে আরেকটি বড় পরিসরে দেখেছিলেন। রাজনৈতিকভাবে তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ ছিল, বিশেষ করে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের প্রশ্নে। কিন্তু সেই মতভেদ মাহফুজের সাহিত্য সম্পর্কে সাঈদের আগ্রহ কমায়নি।

সাঈদ লিখেছেন, বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়ার পর মাহফুজকে কেউ বালজাক, গলসওয়ার্দি ও জোলার ধারার সামাজিক বাস্তববাদী হিসেবে দেখেছেন, কেউ Arabian Nights–এর উত্তরসূরি গল্পকার হিসেবে। সাঈদের কাছে এই দুই পরিচয়ের কোনো একটিতে মাহফুজকে আটকে রাখা যায় না। তাঁর চোখে মাহফুজ এমন লেখক, যিনি মিশরের দীর্ঘ ইতিহাস, সমাজ, পরিবার, রাজনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে এক বিশাল দৃষ্টির মধ্যে ধরতে পারেন। সেই ব্যাপ্তির কথা বলতে গিয়ে তিনি দান্তের কথা মনে করেছিলেন। মাহফুজের গদ্যের শক্তিও তাঁর কাছে ছিল আলাদা: শক্তিশালী, সরাসরি, অথচ সূক্ষ্ম।

নোবেল পাওয়ার অনেক আগে, ১৯৮০ সালে, সাঈদ নিউইয়র্কের এক প্রকাশককে মাহফুজের কয়েকটি বই ভালো অনুবাদে প্রকাশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে তাঁকে বলা হয়েছিল, আরবি একটি ‘বিতর্কিত ভাষা’। অর্থাৎ পশ্চিমেও মাহফুজকে শুধু সাহিত্য দিয়ে দেখা হয়নি। তাঁর ভাষা, অঞ্চল ও রাজনীতি তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর এত বড় বড় প্রশ্নের পাশাপাশি মাহফুজের সামনে খুব ছোট অথচ কঠিন একটি সমস্যা দাঁড়াল। তিনি লিখবেন কীভাবে?

সারা জীবন নিজের হাতে লিখেছেন। টাইপ করে লেখার অভ্যাস ছিল না। এখন কলম ধরে রাখা কঠিন। অল্প লিখলেই হাত ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আঙুল আগের মতো সাড়া দেয় না। দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপি চলল। হাতের ব্যায়াম করতে হলো। ধীরে ধীরে লেখাও সেই ব্যায়ামের অংশ হয়ে উঠল।

বন্ধুরা তাঁকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। সাহিত্য মুখে বলে দিলে অন্য কেউ লিখে রাখবে, এমন প্রস্তাবও উঠেছিল। কিন্তু সৃজনশীল লেখা তাঁর কাছে এত ব্যক্তিগত কাজ ছিল যে শুরুতে তিনি তাতে রাজি হননি। কথোপকথন, সাক্ষাৎকার ও সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য অবশ্য মোহাম্মদ সালমাউইয়ের সাহায্য নিতেন। মাহফুজ বলতেন, সালমাউই লিখে রাখতেন। কিন্তু নিজের সাহিত্যিক লেখা তিনি আবার নিজের হাতেই লিখতে চেয়েছিলেন।

দীর্ঘ চিকিৎসার পর একটু একটু করে সেই ক্ষমতা ফিরে এল। কয়েক বছর পরে তিনি আবার নিজের হাতে লিখতে শুরু করলেন। আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর সম্ভব ছিল না। শেষ জীবনের এক পর্যায়ে দিনে প্রায় আধঘণ্টার বেশি লিখতে পারতেন না। তার বেশি হলে হাত সায় দিত না।

এই সময় তাঁর শেষ জীবনের আশ্চর্য কাজগুলোর একটি তৈরি হলো, Dreams of Convalescence। ছোট ছোট স্বপ্নের মতো লেখা। কোনোটি কয়েকটি বাক্যের, কোনোটি একটি অনুচ্ছেদের। কোথাও একজন মানুষ আসে, আবার মিলিয়ে যায়। কোথাও পুরোনো কায়রো ফিরে আসে। কোথাও মৃত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। কোথাও প্রেম, ভয়, অপরাধবোধ বা মৃত্যুর অস্পষ্ট অনুভূতি। কখনো ছোট একটি ঘটনা, কখনো শুধু একটি ছবি।

এই ছোট রচনার ধরন অবশ্য আঘাতের পরে একেবারে শূন্য থেকে জন্মায়নি। Echoes of an Autobiography–এর ক্ষুদ্র রচনাগুলোয় তার আভাস আগেই ছিল। Dreams–কে মাহফুজ সেই আগের কাজের স্বাভাবিক বিকাশ হিসেবেও দেখেছেন। কিন্তু আহত হাতের সীমাবদ্ধতা ছোট আকারটিকে তাঁর জন্য আরও জরুরি করে তুলেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে কলম চালানো যখন সম্ভব নয়, কয়েকটি বাক্য বা একটি ছোট অনুচ্ছেদের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা ধরে ফেলা তাঁর শরীরের সঙ্গে মানিয়ে গেল। সীমাবদ্ধতা তাঁর লেখা থামায়নি; বরং আগে থেকেই যে সংক্ষিপ্ত রূপের দিকে তাঁর আগ্রহ ছিল, সেখানে তাঁকে আরও গভীরভাবে নিয়ে গেছে।

হামলার পরে তাঁর দৈনন্দিন জীবনও বদলে যায়। নিরাপত্তারক্ষী সঙ্গে থাকত, চলাফেরার স্বাধীনতা কমে গিয়েছিল, পরিচিত কফির দোকানের আড্ডাও আর পুরোপুরি আগের মতো ছিল না। এত বড় আক্রমণের পর তাঁর কোনো ভয়ই ছিল না, এমন রোমান্টিক কথা বলার কারণ নেই। বিরাশি বছর বয়সে একজন তাঁর গলায় ছুরি চালিয়েছে, অল্পের জন্য প্রাণ বেঁচেছে, লেখার হাত প্রায় অচল হয়ে গেছে। ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় তাঁর চিন্তা বা লেখার ইচ্ছাকে শেষ করতে পারেনি।

Awlad Haratina নিয়েও তাঁর অবস্থান সরল ছিল না। তিনি বইটি মুছে ফেলেননি বা বলেননি যে উপন্যাসটি লেখা উচিত হয়নি। আবার ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষকে তিনি নিজের জীবনের প্রধান কাজও বানাননি। আগেই আল-আজহারের সঙ্গে সরাসরি লড়াই এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কখনো বইটি নিয়ে দূরত্ব তৈরি করে কথাও বলেছেন। রুশদির বইয়ের কিছু অংশের সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু লেখকের মতপ্রকাশের অধিকার এবং মতের কারণে মানুষ হত্যার বিরোধিতার জায়গা থেকে সরে যাননি।

এই দ্বিধা ও আপসগুলো মাহফুজকে দুর্বল করে না। বরং মানুষটিকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি কোনো ধর্মবিরোধী প্রচারক ছিলেন না, আবার ধর্মের নামে হত্যাকে ধর্মীয় অধিকার বলেও মানেননি। তাঁর কাছে বিশ্বাস থাকতে পারে, আপত্তি থাকতে পারে, তর্ক থাকতে পারে। কিন্তু হত্যার জায়গায় পৌঁছালে অন্য কিছু শুরু হয়।

মাহফুজের ওপর হামলার ইতিহাসে তাই ছুরি চালানোর মুহূর্তটির আগের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখকের লেখা থেকে কিছু কথা আলাদা করা হয়। বলা হয়, এই লেখা ধর্মবিরোধী। তারপর লেখকের নামের পাশে একটি পরিচয় বসিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর হাজার হাজার পৃষ্ঠার লেখা, তাঁর বিশ্বাস, দ্বিধা, প্রশ্ন, সবকিছু সরিয়ে একটি শব্দ দিয়ে তাঁকে চেনানো হয়। এরপর যে মানুষ কখনো তাঁর বই খোলেনি, সেও মনে করতে পারে তাকে যথেষ্ট জানে।

বই পড়ার একটি ঝামেলা আছে। পড়লে ব্যাপারগুলো আর অত সহজ থাকে না। পাঠক দেখতে পায়, একটি চরিত্রের কথা আর লেখকের কথা এক নয়। ধর্মের সমালোচনা আর ধর্মের নামে ক্ষমতার সমালোচনা একই জিনিস নয়। একজন লেখক একই সঙ্গে বিশ্বাস করতে পারেন, সন্দেহ করতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন, নিজের আগের কথাও পরে অন্যভাবে দেখতে পারেন। সাহিত্য এই জটিলতাই সামনে আনে। আর সেই জটিলতা মেনে নিলে কোনো মানুষকে একটি শব্দে আটকে ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে।

ছুরি মাহফুজের শরীরে ভয়ংকর ক্ষতি করেছিল। তাঁর লেখার হাত দুর্বল করে দিয়েছিল, তাঁর চলাফেরা বদলে দিয়েছিল। কিন্তু লেখা বন্ধ করতে পারেনি। তিনি আরও প্রায় বারো বছর বেঁচেছিলেন। ২০০৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। শেষ বয়সে আগের মতো বড় উপন্যাস আর লিখতে পারেননি। কিন্তু যতটুকু সময় হাত সায় দিয়েছে, ততটুকু লিখেছেন। পুরোনো শহর, স্মৃতি, স্বপ্ন, ভয়, মৃত্যু, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, সব আবার ফিরে এসেছে ছোট ছোট লেখায়।

আর Awlad Haratina রয়ে গেছে। যে বইয়ের নামে একজন তরুণ তাঁর ঘাড়ে ছুরি চালিয়েছিল, সেই বই এখনও মানুষ পড়ে। গেবেলাউই কে, গাবাল, রিফা'আ, কাসেম ও আরাফা কী বোঝায়, ধর্মের পরে বিজ্ঞান মানুষকে মুক্ত করতে পারে কি না, বিপ্লবের পরে নতুন অত্যাচার কেন ফিরে আসে, এসব নিয়ে এখনও তর্ক হয়।

তরুণটি বইটি পড়েনি। মাহফুজ লিখেছিলেন। এত বছর পরে লেখক আর হামলাকারীর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য বোধ হয় এটুকুই নয়। একজন আগে বিচার করেছিল, পরে হত্যা করতে গিয়েছিল। আর মাহফুজ সারা জীবন মানুষকে দেখেছেন, শুনেছেন, লিখেছেন, তারপরও শেষ কথা বলার বদলে প্রশ্ন রেখে গেছেন। ·