উৎপল দাশগুপ্ত

বছরটা ২০১৬ না ২০১৭ –খেয়াল নেই। গল্পপাঠে অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলাম। সেটা মনে আছে। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার আত্মবিশ্বাস তখন ছিল না। অভিজ্ঞতাও ছিল না। আমার একটি অতি প্রিয় উপন্যাস ছিল। কলেজে পড়বার সময় পড়েছিলাম। মুগ্ধ হয়েছিলাম। Margaret Mitchel-এর Gone with the Wind. মনে হয়েছিল এই উপন্যাসের একটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে ভা্লো হয়। কিন্তু সময় করে উঠতে পারিনি। কলেজের পড়াশোনার চাপ। পরে কর্মজীবনে প্রবেশ। সংসার। সব নিয়ে ব্যস্ততা। কিন্তু মনে স্বপ্নটা থেকেই গেছিল। অবসর নেবার পর অনুবাদ করতে আরম্ভ করলাম।

নিজের আনন্দেই করতাম। গল্পপাঠের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক জানতে পেরে ওঁদের পত্রিকায় মাসিক কিস্তিতে দিতে বলেন। আমি রাজি হই। এবং প্রতি সংখ্যায় একটি করে অধ্যায় প্রকাশিত হতে থাকে। এখনও চলছে।

এখন পেছন ফিরে প্রথম দিকের অধ্যায়গুলি পড়লে বেশ অস্বস্তি হয়। কোথাও বাক্য ভারী, কোথাও শব্দ বেমানান, কোথাও মূল লেখার স্বর ঠিকমতো ধরতে পারিনি। আজ হলে একটু অন্যভাবে অনুবাদটা করতাম। সেই পুরোনো অনুবাদগুলি আমার কাছে একরকম লজ্জার ইতিহাস। একই সঙ্গে আমার শিক্ষানবিশির ইতিহাসও।

অনুবাদ করতে করতে বুঝেছি, এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষার শব্দে বদলে দেওয়াটা অনুবাদ নয়। মূল লেখকের স্বর, বলবার ছন্দ, চরিত্রের ভেতরের টানাপোড়েন, এবং অনেক সময় লেখকের নীরবতাকেও অন্য ভাষায় পৌছে দেবার চেষ্টা করতে হয়। বেশ কঠিন কাজ। কিন্তু অনুবাদ সাহিত্যের জন্য অনিবার্য। গল্পপাঠ আমাকে শেখার সেই সুযোগটা করে দিয়েছে।

এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে বিশ্বের নানা দেশের লেখকের গল্প অনুবাদ করেছি। গন উইথ দ্য উইন্ড বিশাল উপন্যাস। তাই অন্য উপন্যাস অনুবাদ করার সাহস করিনি। কিন্তু বিশ্ববিখ্যাত ছো্টগল্পের অনুবাদ, দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের অনুবাদ, প্রবন্ধের অনুবাদ করেছি। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত এই যে, অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক ভালো সাহিত্য পড়বার সুযোগ হয়েছে। এমন অনেক লেখকের কাছে পৌঁছেছি, যাঁদের হয়তো ওভাবে পড়া হয়ে উঠত না। অনুবাদকের কাছে এটা বড় কম পাওনা নয়। অনেক সময় মনে হয়েছে, শুধু একটি লেখার অনুবাদই নয়, অন্য একটি সাহিত্যজগতের সঙ্গে বাংলার একটি ছোট সেতু তৈরি করবার চেষ্টা করেছি। সেই সেতু কতটা মজবুত হয়েছে পাঠকই তার বিচার করবেন। নিজের সংশয় অবশ্য থেকেই গেছে।

আগে মনে হতো অনুবাদ নিয়ে আমার আত্মবিশ্বাস বেশি। এখন মনে হয় সংশয়ই বেশি। একটি অনুবাদ শেষ করার পরে মনে হয় – মূল লেখকের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি তো? ওঁর স্বর বাংলায় অক্ষুণ্ণ আছে তো? আমার নিজস্ব ভাষার অভ্যেস লেখাটিকে বদলে দিয়েছে কী? জানি না। তবুও অনুবাদ করে যাই। সংশয় নিয়েই।

গল্পপাঠের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেবল অনুবাদক হিসেবে নয়, পাঠক হিসেবেও। বলা যেতে পারে পাঠক হিসেবেই এই পত্রিকাটির সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘতর।

বারো বছরে পত্রিকাটিকে বদলাতে দেখেছি। দুই বাংলার লেখকদের পাশাপাশি পুরোনো ও সমকালীন লেখকদের লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। গল্প, উপন্যাস, সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধ – বিষয়েবৈচিত্র্যই গল্পপাঠকে আমাকে আলাদা করে চিনিয়েছে।

বাংলা অনলাইন পত্রিকার জন্য এই পরিসরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যকে নিজের ভেতরে ধরে রাখা, একই সঙ্গে অন্য ভাষার সাহিত্যের জানালা খুলে দেওয়া – দুটিই দরকার। গল্পপাঠ এতদিন ধরে এই দুটি কাজই সমান্তরালভাবে করার চেষ্টা করেছে।

একক চেষ্টা নয়, বহু মানুষের দীর্ঘ পরিশ্রমে এই পত্রিকা আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক, প্রযুক্তিগত কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং সর্বোপরি পাঠক। একটি পত্রিকা শেষ পর্যন্ত পাঠকের ফিরে আসার মধ্যেই বেঁচে থাকে।

দুই.
সম্প্রতি গল্পপাঠের নতুন অবয়বটি আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। আগের তুলনায় এখন পত্রিকাটি অনেক বেশি আধুনিক এবং পেশাদারি। শুধু দৃষ্টিনন্দন হয়েছে বললে কম বলা হবে; ব্যবহার করাও সহজ হয়েছে। লেখকের নাম দিয়ে, লেখার নাম দিয়ে, বিভাগ ধরে, দেশ বা ভাষার ভিত্তিতে লেখা খুঁজে পাওয়া যায়। লেখকদের পরিচিতি ও কাজও সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে।

ই-বইঘরও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আমার মনে হয়, এর তাৎপর্য শুধু সুবিধের মধ্যে নয়। অনলাইন পত্রিকার একটি বড় সমস্যা হলো, পুরোনো লেখা দ্রুত আড়াল হয়ে যায়। নতুন লেখা জায়গা করে নেয়। পুরোনো লেখা খুঁজে বের করা ক্রমশ কঠিনতর হয়ে পড়ে। নতুন অবয়বে, গল্পপাঠের আর্কাইভ আরও বেশি ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে পত্রিকার অন্যতম বড় সম্পদ হয়ে উঠবে।

অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল লেখক, মূল ভাষা, দেশের পরিচয় যুক্ত হয়েছে। নতু লেখক এবং অনুবাদকরাও নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। ফলে গল্পপাঠ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের জায়গা আছে। কিন্তু সেটি এখনও সেভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। এই ব্যাপারটির দিকে নজর রাখতে হবে। লেখক এবং অনুবাদক উৎসাহিত বোধ করবেন। পাঠক কীভাবে একটি লেখা আবিষ্কার করছেন, কেন সেটি পড়ছেন, কীভাবে কোনও লেখকের অন্য লেখার কাছে পৌঁছচ্ছেন – ডিজিটাল মাধ্যমের ভবিষ্যৎ অনেকটাই এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।

বারো বছর খুব কম সময় নয়। একটি যুগ। একটি মানুষের জীবনে বারোটি বছর অনেক কিছু বদলে দেয়। সাহিত্যপত্রিকার ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। প্রযুক্তি বদলায়। পাঠকের অভ্যেস বদলায়। প্রকাশনার ধরণ বদলায়। অতএব গল্পপাঠকেও বদলাতে হয়েছে। অবয়ব বদলেছে। উপস্থাপনা বদলেছে। পাঠকের কাছে পৌঁছনোর পদ্ধতিও কমবেশি বদলেছে। মূল কাজটি কিন্তু এখনও একই। বাংলা সাহিত্যকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অন্য ভাষার সাহিত্যকেও বাংলা ভাষায় পাঠকদের কাছে নিয়ে আসা।

অক্টোবরে গল্পপাঠ একশোতম সংখ্যায় পৌঁছবে। আমার নিজের কাছেও একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত হয়ে থাকবে। আমার অনুবাদের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ও পাশাপাশি এগিয়েছে। ২০১৬-১৭ সালের সেই অনভিজ্ঞ অনুবাদকটির লেখা আজও পত্রিকার পুরোনো পাতায় আছে। ফিরে দেখলে লজ্জা পাই কিন্তু মুছে ফেলার কথা ভাবি না। কারণ তার মধ্যে আমার গড়ে ওঠার ইতিহাসটা রয়েছে। তবে সুযোগমতো কিছু কিছু পরিবর্তন করার ইচ্ছে আছে।

লেখক বা অনুবাদক নিজের পুরোনো লেখার মধ্য দিয়ে নিজের পথটি দেখতে পান। সাহিত্যপত্রিকাও পুরোনো সংখ্যাগুলির ভেতর দিয়ে নিজের যাত্রাকে দেখতে পায়। এর একশোতম সংখ্যাটি কেবল একটি সংখ্যা নয়। দীর্ঘ যাত্রার দৃশ্যমান চিহ্ন। আমি সেই যাত্রার ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র।

পত্রিকাটি একশোতম সংখ্যার পরেও এগিয়ে চলুক। নতুন লেখক আসুন। নতুন অনুবাদকেরাও। আমাদের লেখাও পুরোনো হয়ে যাবে। পত্রিকার চেহারা আরও বদলে যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। এটি কোনও একটি সময়ের কিংবা কোনও একটি প্রজন্মের সম্পত্তি নয়। একটি সময় থেকে অন্য সময়ে, একজনের হাত থেকে অন্য একজনের হাতে, একটি প্রজন্মে থেকে আরও একটি প্রজন্মে এর যাত্রা চলতেই থাকুক।

গল্পপাঠের একশোতম সংখ্যায় আমার শুভেচ্ছা তাই খুব সহজ। পত্রিকাটি যেন তার জানালাগুলি খোলা রাখে। পুরোনোর দিকে, নতুনের দিকে, বাংলার দিকে এবং পৃথিবীর অন্য ভাষাগুলির দিকেও। আমরা যারা এতদিন এর সঙ্গে ছিলাম, তারা যেন একদিন ফিরে তাকিয়ে বলতে পারি – এই দীর্ঘ যাত্রার কোনও এক পৃষ্ঠায় আমাদেরও সামান্য কিছু অবদান ছিল। হয়তো নিখুঁত করতে পারিনি। কিন্তু তাতে ক্ষতি নেই। অবদান ছিল, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

গল্পপাঠের জন্য অফুরান শুভেচ্ছা। ·