অনুবাদ : অনিন্দ্য অন্তর

১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে আরব বিশ্বের বাইরে নাগিব মাহফুজকে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা মূলত আরব বা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পড়াশোনা করা মানুষ। তাঁদের কাছেও তিনি পরিচিত ছিলেন কায়রোর নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের জীবন্ত ছবি আঁকা গল্পের লেখক হিসেবে। কিন্তু এমনকি তাঁদের চোখেও মাহফুজের নিজস্ব কোনো শৈলী বা দৃষ্টিভঙ্গি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। এর একটি কারণ, তখন তাঁর যে অল্প কয়েকটি ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যেত, সেগুলোর মান ছিল খুবই অসম। আরেকটি কারণ, মাহফুজের এমন কোনো একজন অনুবাদক ছিলেন না, এখনও নেই, যিনি তাঁর গদ্যের শ্রেষ্ঠ কাজগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করাকে নিজের জীবনের কাজ করে নিয়েছেন। ফলে ইংরেজিতে মাহফুজের একটি স্থায়ী কণ্ঠও তৈরি হয়নি।

১৯৮০ সালে নিউইয়র্কের এক প্রকাশকের কাছে আমি মাহফুজের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই উৎকৃষ্ট অনুবাদে প্রকাশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। প্রকাশক তখন “তৃতীয় বিশ্বের” বই খুঁজছিলেন। কিছুটা ভেবেচিন্তে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দেওয়া হলো। কারণ জানতে চাইলে আমাকে বলা হয়েছিল, এবং কথাটির মধ্যে বিদ্রূপের কোনো লক্ষণই ছিল না, আরবি নাকি একটি “বিতর্কিত ভাষা”।

কয়েক বছর পরে মাহফুজকে নিয়ে জ্যাকলিন ওনাসিসের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আমার দিক থেকে বেশ আশাব্যঞ্জক চিঠিপত্র চালাচালি হয়েছিল। তিনি তখন ভাবছিলেন মাহফুজকে প্রকাশ করবেন কি না। পরে মাহফুজকে ডাবলডে প্রকাশনার কাছে নিয়ে যাওয়ার পেছনে যাঁরা ভূমিকা রেখেছিলেন, ওনাসিস তাঁদের একজন। এখন মাহফুজের বই সেখান থেকেই প্রকাশিত হয়। যদিও অনুবাদগুলোর মান এখনও বেশ অসম, আর বইগুলোও খুব বেশি প্রচার বা আলোচনার সুযোগ না পেয়েই একটি একটি করে বেরোয়।

মাহফুজের ইংরেজি অনুবাদের স্বত্ব আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রো প্রেসের হাতে। মনে হয়, একদিন তিনি বিশ্ববিখ্যাত লেখক হয়ে উঠবেন এমন কথা ভাবেননি বলেই স্বত্বগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে যে কাজটি এখন স্পষ্টতই সাহিত্যিক পরিকল্পনার চেয়ে বাণিজ্যিক উদ্যোগে বেশি পরিণত হয়েছে, এবং যার মধ্যে শিল্প বা ভাষার তেমন কোনো ঐক্য নেই, সেখানে মাহফুজের নিজের বলার ক্ষমতা নেই বললেই চলে।

আরব পাঠকের কাছে কিন্তু মাহফুজের নিজস্ব কণ্ঠ একেবারেই স্পষ্ট। ভাষার ওপর তাঁর অসাধারণ দখল আছে, অথচ সেই ভাষা নিজের দিকে আলাদা করে দৃষ্টি টানার চেষ্টা করে না। ইংরেজিতে সমস্যা হলো, প্রত্যেক অনুবাদকের হাতে মাহফুজের কণ্ঠ আলাদা শোনায়। তাঁদের অধিকাংশই, দু-একজন ছাড়া, নিজেরাও তেমন শৈলীসচেতন লেখক নন। বলতে খারাপ লাগছে, তাঁদের অনেকেই মাহফুজ আসলে কী নিয়ে লিখছেন, সেটিও পুরোপুরি বুঝেছেন বলে মনে হয় না।

পরের আলোচনায় আমি দেখানোর চেষ্টা করব, নিজের দেশ সম্পর্কে মাহফুজের দৃষ্টি অত্যন্ত বিস্তৃত, প্রায় সর্বগ্রাহী, এবং কোনো কোনো সময় বেশ কর্তৃত্বপরায়ণও। নিজের রাজ্য দেখতে থাকা এক সম্রাটের মতো তিনি যেন মনে করেন, মিশরের দীর্ঘ ইতিহাসের হিসাব করা, তাকে বিচার করা এবং তার রূপ নির্ধারণ করার অধিকার তাঁর আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো দেশগুলোর একটি মিশর। আলেকজান্ডার, সিজার, নেপোলিয়নের মতো বিজেতাদের কাছে যেমন, তেমনি নিজের মানুষের কাছেও সে ছিল আকর্ষণীয় ও কাঙ্ক্ষিত এক দেশ।

এই বিশাল বিষয়কে নিজের মতো করে প্রকাশ করার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক শক্তিও মাহফুজের আছে। তাঁর ভাষা শক্তিশালী, সরাসরি, আবার সূক্ষ্মও। তাঁর চরিত্রেরা গল্পে ঢুকেই যেমন দ্রুত আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মাহফুজও তেমনি সরাসরি পাঠকের সামনে এসে দাঁড়ান। তিনি আপনাকে ঘন এক আখ্যানের স্রোতে নামিয়ে দেন, তারপর সেখানে সাঁতার কাটতে দেন। কিন্তু সেই স্রোত, ঘূর্ণি আর ঢেউয়ের দিক তিনিই ঠিক করে চলেন। চরিত্রদের জীবন, সাদ জাগলুল বা মুস্তাফা আল-নাহাসের মতো প্রধানমন্ত্রীর আমলের মিশরের ইতিহাস, রাজনৈতিক দলের খুঁটিনাটি, পারিবারিক ইতিহাস, আরও কত কিছু তিনি অসাধারণ দক্ষতায় একসঙ্গে চালান।

বাস্তববাদ আছে, অবশ্যই। কিন্তু তার সঙ্গে আরও কিছু আছে। তাঁর দৃষ্টি এমন এক সর্বব্যাপী ছবির দিকে এগোয়, যেখানে দৈনন্দিন পৃথিবী আর চিরন্তন সময় পাশাপাশি থাকে। এই জায়গায় তাঁর ব্যাপ্তি দান্তের কথা মনে করিয়ে দেয়, তবে খ্রিস্টধর্ম ছাড়া।

ইংরেজি পাঠকের পক্ষে বোঝার উপায় নেই যে Dweller in Truth আসলে মাহফুজের অনেক পরের দিকের বই, ১৯৮৫ সালের, এবং এর ফারাও-যুগের বিষয়বস্তু তাঁকে ঔপন্যাসিক জীবনের একেবারে প্রথম পর্বে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। বইয়ের নামের আগে Akhenaten শব্দটি সম্ভবত মার্কিন প্রকাশক যোগ করেছিলেন। শোনা যায়, পিরামিড দেখতে আসা পর্যটকদের কাছে বইটি যাতে সহজে বিক্রি করা যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা।

১৯১১ সালে জন্ম নেওয়া মাহফুজ ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে প্রাচীন মিশর নিয়ে তিনটি উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন। সেগুলো তখনও ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি। সেই সময়ে তিনি আওকাফ বা ধর্মীয় সম্পত্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী। আধুনিক কায়রো নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা শুরু হওয়ার আগে তিনি জেমস বেইকির Ancient Egypt বইটিও অনুবাদ করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত Khan al-Khalili দিয়ে আধুনিক কায়রোর সেই কাহিনি শুরু হয়।

এই পর্ব চূড়ায় পৌঁছায় ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে তাঁর অসাধারণ কায়রো ট্রিলজি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। যদিও তিনটি উপন্যাসই ১৯৫২ সালের মধ্যে লেখা শেষ হয়েছিল। বিশ শতকের প্রথমার্ধের আধুনিক মিশরীয় জীবনের একটি বিশাল সারাংশ বলা যায় এই তিনটি বইকে।

ট্রিলজিতে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের প্রধান আল-সাইয়্যিদ আহমদ আবদ আল-জাওয়াদ এবং তাঁর পরিবারের তিন প্রজন্মের ইতিহাস আছে। সমাজ ও রাজনীতির বিপুল খুঁটিনাটির পাশাপাশি নারী-পুরুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও এটি গভীর অনুসন্ধান। আবার আবদ আল-জাওয়াদের ছোট ছেলে কামালের বিশ্বাসের সন্ধানও এর একটি বড় বিষয়। জীবনের প্রথম দিকে ইসলামের প্রতি তার যে টান তৈরি হয়েছিল, তা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

১৯৫২ সালের মিশরীয় বিপ্লবের পর প্রথম পাঁচ বছর মাহফুজ প্রায় নীরব ছিলেন। তারপর তাঁর গদ্যরচনা যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। উপন্যাস, ছোটগল্প, সাংবাদিকতা, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, চিত্রনাট্য, একের পর এক লিখতে থাকলেন তিনি।

প্রাচীন পৃথিবী নিয়ে প্রথম লেখাগুলোর পর মাহফুজ হয়ে উঠেছিলেন অত্যন্ত বহুলপ্রজ এক লেখক, এবং নিজের সময়ের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও ছিল গভীর। তবু একসময় যে তিনি আবার প্রাচীন মিশরে ফিরে যাবেন, সেটি প্রায় অনিবার্যই ছিল। কারণ প্রাচীন ইতিহাসে তিনি নিজের সময়ের নানা দিককে অন্য আলোয় দেখতে পারতেন, ভেঙে নিতে পারতেন, ঘনীভূত করতে পারতেন নিজের জটিল সাহিত্যিক প্রয়োজন অনুযায়ী।

আমার মনে হয়, Akhenaten, Dweller in Truth–এর ক্ষেত্রেও ঠিক এটাই ঘটেছে। খুব নীরবে বইটি মাহফুজের কয়েকটি পুরোনো উদ্বেগের কাছে ফিরে যায়। ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় সত্য আর একান্ত ব্যক্তিগত সত্যের সংঘর্ষ, এবং এমন এক রহস্যময় মানুষকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী অথচ অদ্ভুতভাবে পাশাপাশি টিকে থাকা নানা দৃষ্টিভঙ্গি, যাকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বোঝা যায় না।

বিশ্বখ্যাত হওয়ার পর মাহফুজকে সাধারণত দু-ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কখনো বালজাক, গলসওয়ার্দি ও জোলার ধারার সামাজিক বাস্তববাদী হিসেবে। কখনো আবার Arabian Nights থেকে উঠে আসা এক গল্পকার হিসেবে। দ্বিতীয় ধরনের একটি হতাশাজনক উদাহরণ এই পত্রিকার পাতায় জে. এম. কোয়েটজির মাহফুজ-বিচার।¹

লেবাননের ঔপন্যাসিক ইলিয়াস খুরির প্রস্তাবটি আমার কাছে সত্যের কাছাকাছি। তাঁর মতে, মাহফুজের উপন্যাসগুলোর মধ্যে দিয়ে যেন উপন্যাসের বিভিন্ন রূপের একটি ইতিহাসও তৈরি হয়েছে। প্রথমে ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য, তারপর রোমান্স, সাগা ও পিকারেস্ক কাহিনি, এরপর বাস্তববাদী, আধুনিকতাবাদী, প্রকৃতিবাদী, প্রতীকবাদী ও অ্যাবসার্ড ধারার লেখা।²

মাহফুজের গদ্য বাইরে থেকে খুব স্বচ্ছ মনে হয়। কিন্তু আরবি গদ্যের শিল্পী হিসেবে এবং সমাজের চলন ও মানুষ নিজের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে জানে ও বোঝে, সেই প্রশ্নের নিরলস পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি ভীষণ জটিল লেখক। তাঁর অঞ্চলে তাঁর তুলনা পাওয়া কঠিন, সম্ভবত অন্য জায়গাতেও।

যে বাস্তববাদী উপন্যাসগুলোর ওপর তাঁর খ্যাতি দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো আধুনিক মিশরের নিছক সমাজতাত্ত্বিক আয়না নয়। ক্ষমতা বাস্তবে কীভাবে মানুষের জীবনে কাজ করে, তা দেখানোর সাহসী চেষ্টাও সেগুলো।

সেই ক্ষমতার উৎস ঈশ্বরও হতে পারেন। যেমন ১৯৫৮ সালের রূপক উপন্যাস Awlad Haritna বা Children of Gebelaawi। মিশরীয় কর্তৃপক্ষ বইটি দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ রেখেছিল। সেখানে বিশাল জমিদার গেবেলাউই ঈশ্বরসদৃশ এক চরিত্র। তাঁর সন্তানদের তিনি স্বর্গোদ্যান থেকে নির্বাসিত করেন। একই রূপককে সিংহাসন, পরিবার ও পিতৃতন্ত্রের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, আবার রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আমলাতন্ত্রের মতো নাগরিক প্রতিষ্ঠানেও।

তবে এর মানে এই নয় যে মাহফুজের উপন্যাস কোনো বিমূর্ত তত্ত্ব দিয়ে পরিচালিত বা সাজানো। তা হলে তাঁর অগণিত আরব পাঠক এবং এখনকার বিস্তৃত আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে এই সাহিত্য এত শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় হতে পারত না।

আমার ধারণা, মাহফুজের চেষ্টা থাকে ধারণাকে চরিত্র ও তাদের কাজের মধ্যে এমন সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে দিতে, যাতে তত্ত্ব আলাদা করে কোথাও বেরিয়ে না থাকে।

কিন্তু একটি বিষয় তাঁকে সব সময় মুগ্ধ করেছে। পরম শক্তি, একজন মুসলমানের কাছে যার চূড়ান্ত রূপ অবশ্যই ঈশ্বর, কীভাবে একই সঙ্গে দৃশ্যমান জগতের রূপ নেয় আবার ধরাছোঁয়ার বাইরেও চলে যায়। Children of Gebelaawi–তে গেবেলাউই যখন সন্তানদের নির্বাসনের আদেশ দেন, তখন তারা বাস্তব জীবনের দুঃখকষ্টের মধ্যে নেমে আসে। অন্যদিকে গেবেলাউই নিজে সরে যান তাঁর দুর্গের মতো বাড়িতে। সন্তানরা নিজেদের এলাকা থেকে বাড়িটি সব সময় দেখতে পায়, কিন্তু তাঁর কাছে আর পৌঁছাতে পারে না।

যা অনুভব করা হয়, যা বেঁচে থাকা হয়, মাহফুজের অসাধারণ গদ্যে তা দৃশ্যমান ও বাস্তব হয়ে ওঠে। অথচ তিনি যত নিখুঁতভাবে খুঁটিনাটি খুলে দেন, তার সম্পূর্ণ অর্থকে ধরে ফেলা তত সহজ হয় না।

১৯৭৭ সালের Malhamat al-Harafish বা Epic of the Harafish Children of Gebelaawi–র এই বিষয়টিকেই আরও বিস্তৃত ও গভীর করে। মাহফুজের সূক্ষ্ম ভাষা সেই পরম শক্তিকে ইতিহাস, চরিত্র, ঘটনা, সময়ের ধারা ও জায়গার মধ্যে রূপ দিতে পারে। তবু যেহেতু সেটিই সবকিছুর প্রথম ভিত্তি, তাই সে একই সঙ্গে নিজের একগুঁয়ে, আদিম এবং কখনো যন্ত্রণাদায়ক দূরত্বও বজায় রাখে।

Akhenaten–এ সূর্যদেব তরুণ রাজাকে চিরদিনের জন্য বদলে দেন, কিন্তু নিজেকে কখনো প্রকাশ করেন না। আখেনাতেনকেও আমরা সরাসরি পাই না। তাঁর শত্রু, বন্ধু ও স্ত্রীর নানা বয়ানে দূর থেকে তাঁকে দেখি। সবাই তাঁর কথা বলে, কিন্তু তাঁর রহস্যের সমাধান কেউ করতে পারে না।

তারপরও মাহফুজের মধ্যে রহস্যময়তার বিরুদ্ধে খুব তীব্র একটি দিক আছে। কিন্তু সেই দিকের ভেতরেও বারবার এমন এক অধরা মহাশক্তির স্মৃতি বা আভাস ঢুকে পড়ে, যা তাঁকে যেন অস্বস্তিতে রাখে। আখেনাতেনের গল্পই ধরা যাক। তাঁকে নিয়ে চৌদ্দজন কথক কথা বলে। তবু তাঁর শাসন সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যাগুলোর কোনো মীমাংসা হয় না।

মাহফুজের যে বইগুলো আমি জানি, প্রত্যেকটিতেই এই কেন্দ্রীয় অথচ দূরের ক্ষমতার একটি মানবিক অবয়ব আছে। সবচেয়ে স্মরণীয় উদাহরণ কায়রো ট্রিলজির আল-সাইয়্যিদ আহমদ আবদ আল-জাওয়াদ। তাঁর মৃত্যুর তিন প্রজন্ম পরেও তাঁর কর্তৃত্বের ছায়া কাহিনির ওপর ভেসে থাকে।

ট্রিলজিতে তাঁর মহিমা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। তিনি শুধু মঞ্চের বাইরে সরে যান না। বিয়ে, যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা, সন্তান এবং বদলে যেতে থাকা রাজনৈতিক সম্পর্কের মতো খুব সাধারণ ঘটনাও তাঁর উত্তরাধিকারকে বদলে দেয়, তার দাম কমিয়ে দেয়।

জাগতিক জীবন মাহফুজকে যেন একই সঙ্গে ধন্দে ফেলে, টানে, আবার মুগ্ধও করে। বিশেষ করে আল-সাইয়্যিদ আবদ আল-জাওয়াদের ম্লান হয়ে আসা উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর লেখায় এই ব্যাপারটি স্পষ্ট। আসলে মাহফুজের বিষয় আবদ আল-জাওয়াদের পরিবার। কিন্তু সেই ক্ষয়ে যাওয়া উত্তরাধিকারই শেষ পর্যন্ত পঞ্চাশ বছর ধরে তিন প্রজন্মকে একসঙ্গে ধরে রাখে। ১৯১৯ সালের বিপ্লব, সাদ জাগলুলের উদারপন্থী যুগ, ব্রিটিশ দখল এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাজা প্রথম ফুয়াদের শাসন, সবকিছুর মধ্য দিয়ে।

ফলে মাহফুজের কোনো উপন্যাসের শেষে পৌঁছে পাঠক একই সঙ্গে দুটি বিপরীত অনুভূতির মুখোমুখি হয়। চরিত্রগুলোর দীর্ঘ পতনে যা ঘটেছে তার জন্য দুঃখ হয়। যেমন কায়রো ট্রিলজিতে আবদ আল-জাওয়াদের এক নাতি কমিউনিস্ট হিসেবে কারাগারে যায়, আরেকজন মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হিসেবে। আবার খুব ক্ষীণ একটি আশাও জাগে, গল্পের শুরুতে ফিরে গেলে হয়তো এই মানুষগুলোর প্রথম জীবনের সেই প্রবল শক্তিটুকু আবার পাওয়া যাবে।

এই অভিজ্ঞতা কতটা টানটান, তার আভাস পাওয়া যায় মাহফুজের Echoes from an Autobiography–এর ১৯৯৪ সালের “A Message” নামের একটি ক্ষুদ্র রচনায়:

“বিস্মৃতি যাকে মুছে দেয়, তাকে মনে করার মধ্যেই স্মৃতির নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায়।”

মাহফুজ সময়ের গতিকে এমনভাবে লিপিবদ্ধ করেন, যেখানে সহজ কোনো মুক্তি বা সান্ত্বনা নেই। অথচ তাঁর বিচারবোধ কঠোর, আর তাঁর চোখ অত্যন্ত নির্ভুল।

তাই মাহফুজকে কায়রোর কফির দোকানে ঘুরে বেড়ানো, নিজের অচেনা কোণে চুপচাপ লিখে যাওয়া কোনো বিনয়ী গল্পকার ভাবলে বড় ভুল হবে। অর্ধশতাব্দী ধরে নিজের কাজের কঠোরতা ধরে রাখার মধ্যে যে জেদ ও গর্ব তিনি দেখিয়েছেন, সাধারণ দুর্বলতার কাছে যে ছাড় দিতে চাননি, লেখক হিসেবে তাঁর আসল শক্তির কেন্দ্রে রয়েছে সেটিই।

চিরন্তন সময় আর মানুষের সময় কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, মাহফুজ এত দীর্ঘকাল ধরে সেই দৃষ্টি ধরে রাখতে পেরেছেন প্রধানত তাঁর দেশ মিশরের কারণে।

ভূগোল ও ইতিহাস, দুই অর্থেই মাহফুজের কাছে মিশরের তুলনা পৃথিবীর আর কোনো জায়গার সঙ্গে হয় না। যেন ইতিহাসেরও আগে থেকে থাকা এক দেশ। নীলনদ ও তার উর্বর উপত্যকা তাকে ভূগোলেও আলাদা করেছে। মাহফুজের মিশর হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের বিশাল স্তূপ। শাসক, শাসনব্যবস্থা, ধর্ম ও জাতিগত গোষ্ঠীর অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের মধ্যেও সে নিজের একটি ধারাবাহিক পরিচয় ধরে রেখেছে।

দেশগুলোর মধ্যেও মিশরের জায়গাটি অনন্য। বিজেতা, দুঃসাহসী অভিযাত্রী, চিত্রকর, লেখক, বিজ্ঞানী, পর্যটক, কত মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র এই দেশ। মানব ইতিহাসে তার জায়গা, আর যে প্রায় সময়হীন ছবি সে মানুষের সামনে খুলে দিয়েছে, সে দিক থেকে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তাকে মেলানো কঠিন।

ইতিহাসকে শুধু গুরুত্বের সঙ্গে নয়, যেন আক্ষরিক সত্য হিসেবেও নেওয়া মাহফুজের কাজের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। টলস্টয় বা সলঝেনিৎসিনের মতো তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের মাপ পাওয়া যায় তাঁর বিষয়বস্তুর বিশালতায়, সেই পরিসরে ঢুকে পড়ার দুঃসাহসে, এমনকি কখনো নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ঔদ্ধত্যেও।

মিশরের ইতিহাসের বিরাট অংশকে সেই ইতিহাসের পক্ষ থেকেই ভাষা দেওয়ার চেষ্টা, আর দেশের মানুষকে সেই ইতিহাসের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের বিচারের সামনে হাজির করার আত্মবিশ্বাস, আজকের লেখকদের মধ্যে এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষা খুব কম দেখা যায়।

মিশরের ইতিহাস তৈরি করেছেন যেসব বিখ্যাত মানুষ, তাঁরাও মাহফুজের কঠিন দৃষ্টি থেকে রেহাই পাননি। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তাঁর অসাধারণ, তখনও অনূদিত না-হওয়া Amam al-‘Arsh বা Before the Throne–এ মাহফুজ মিশরের শাসকদের আক্ষরিক অর্থেই চিরন্তন বিচারের আদালতে হাজির করেন। সোনার সিংহাসনে বসে আছেন ওসিরিস। পাশে আইসিস ও হোরাস। মিশরকে আজকের অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য যেসব বড় মানুষকে মাহফুজ দায়ী মনে করেন, তাঁদের বিচার করবেন এই তিনজন।

Akhenaten–এর মতোই যেন মিশরের দূর অতীত খুঁড়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে Before the Throne লেখা। বইটি শুরু হয় দেশের প্রতিষ্ঠাতা মেনেসের বিচার দিয়ে। তারপর একে একে বহু বিখ্যাত মানুষকে পার হয়ে এসে পৌঁছায় গামাল আবদেল নাসের এবং তাঁর উত্তরসূরি আনোয়ার আল-সাদাতের কাছে। বইটি প্রকাশের অল্প কিছুদিন আগেই সাদাত নিহত হয়েছিলেন।

এই কাজের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, মাহফুজ আদৌ এমন একটি কাজ হাতে নিয়েছিলেন। যেন মিশরের ইতিহাস তৈরি করা মানুষগুলোকে এক নিঃশ্বাসে পরীক্ষা করে দেখা তাঁর আখ্যানেরই একটি অংশ, এবং তাঁর ব্যক্তিগত দায়িত্বও।

বইটি শুধু মাহফুজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেয় না। যে ইতিহাস বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনার দীর্ঘ শৃঙ্খল বলে মনে হতে পারে, তার মধ্যে তিনি যে এক ধরনের ধারাবাহিকতা দেখেন, সেটিও প্রকাশ করে।

তিনি স্বৈরাচারী ফারাওদের সঙ্গে সাদাত, নাসের ও মুস্তাফা নাহাসের মতো বিপ্লবী গণনেতাদের একই ধারায় রাখেন। সঙ্গে আছেন মোহাম্মদ আলি ও ইসমাইলের মতো অটোমান খেদিভ, কপটিক প্যাট্রিয়ার্ক, সুফি নারী, কবি, দরবারি। এতে বোঝা যায়, ইতিহাসের ঈর্ষাপরায়ণ লিপিকার হিসেবে ক্ষমতার প্রতি মাহফুজের আগ্রহ কত গভীর। বলা যায়, ক্ষমতার সঙ্গে তাঁর এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও আছে।

আগের যুগের যাদের বিচারের জন্য ডাকা হয়েছে, তারা আদালত ছেড়ে চলে যায় না। পরের যুগের মানুষের সাক্ষ্য শোনার জন্য সেখানেই থেকে যায়। কখনো তাদের প্রশ্ন করে, কখনো নিন্দা করে, কখনো প্রশংসা করে, কখনো তাদের নিয়ে আলোচনা করে। এভাবে যুগে যুগে বড় মানুষদের হাতে তৈরি মিশরের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নানা সুতো একসঙ্গে বোনা হতে থাকে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। ষাটের দশকের শুরু থেকে মিশরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে একটি বিতর্ক চলছে, এখনও তা শেষ হয়নি। প্রথমে নাসেরের প্যান-আরববাদ এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছিল। লুইস আওয়াদ ও মাহফুজের মতো লেখকদের মতে, আরব জাতীয়তাবাদী উৎসাহীরা “আরব ইতিহাস”, “আরব সমাজতন্ত্র” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে মিশরের অনারব ইতিহাসকে বিকৃত করেছিলেন।

পরে ইসলামী দল ও ব্যক্তিরাও বিতর্কে যোগ দেন। তাঁদের বক্তব্য, মিশরের মুসলিম পরিচয়কেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সুন্নাহ বা সুন্নি ধর্মীয় শুদ্ধতার চর্চায় নিয়োজিত সবচেয়ে পুরোনো মুসলিম বিদ্যাপীঠ আল-আজহার এখনও কায়রোতেই সক্রিয়।

গত কয়েক মাসে সিরীয় লেখক হায়দার হায়দারের A Banquet for Seaweed উপন্যাস নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। ধর্মনিন্দা ও অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে অনেকে জোর দিয়ে বলছেন, ইসলামী মিশরে বইটি প্রচার করা উচিত নয়।⁴ মিশরের ভূমিকা কী, তার মূল সত্তা কী, তার সাংস্কৃতিক পরিচয় কোথায়, এসব নিয়ে বিতর্ক এখনও থামেনি। মাহফুজের লেখা মিশরীয় ও অন্য আরব পাঠকের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার এটিও একটি কারণ।

তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, Before the Throne–এ বিচারক ও সাক্ষীদের সবচেয়ে কঠোর আক্রমণের মুখে পড়েন গামাল আবদেল নাসের।

দ্বিতীয় রামেসিস, যেমন, নাসেরকে বলেন, বড় নেতা হিসেবে তিনি তাঁকে শ্রদ্ধা করেন এবং তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা বোধ করেন। কিন্তু তাঁর আফসোস, নিজের আমলে মিশর ছিল বড় শক্তি, অথচ নাসেরের মিশর ছিল তাঁর বিরাট উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুলনায় খুব ছোট একটি দেশ।

মেনেস নাসেরকে অভিযুক্ত করেন প্যান-আরববাদের মধ্যে মিশরের নিজস্ব ভাগ্য ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য। উত্তর ও দক্ষিণ মিশরকে একত্র করা শাসক মেনেসের মুখে এই অভিযোগ মোটেই ছোট নয়।

এর চেয়েও কম তীব্র নয় মুস্তাফা আল-নাহাসের আক্রমণ। রাজতন্ত্রের সময়কার দেশের শেষ বড় রাজনীতিবিদ তিনি। নিজের এবং স্ত্রীর বিলাসী রুচি ও কখনো প্রকাশ্য দুর্নীতির জন্যও পরিচিত ছিলেন। তবু মাহফুজ তাঁকে মিশরের বড় মানুষদের মধ্যে স্থান দেন। তারপর তাঁর মুখ দিয়েই নাসেরকে আক্রমণ করান মানবাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য, মিশরের জনগণের “অগ্রবর্তী বাহিনী” বুদ্ধিজীবীদের অপমান ও মানবিক মর্যাদা নষ্ট করে ধ্বংস করার জন্য, শিক্ষাব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত করার জন্য, সরকারি খাত ভেঙে দেওয়ার জন্য এবং বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানের জন্য। মাহফুজের একটি চমৎকার বাক্যে, সবকিছুর ফল হয়েছিল “ধ্বংসস্তূপের পাহাড়ের ওপর জমে থাকা ফাঁপা মিথ।”

নাসের কিছুটা দুর্বলভাবে জবাব দেন যে অন্তত তিনি মিশর এবং অন্য আরব দেশগুলোকে নাড়া দিয়েছিলেন, পরাজয়ের অবস্থা থেকে বের করার চেষ্টা করেছিলেন।

নাহাস আবার আক্রমণ করেন। তাঁর কথা, আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যদি একটু সংযত হতো! দেশকে সংস্কার ও উন্নতির পথে খুলে দেওয়া দরকার ছিল। মনে রাখা দরকার ছিল, বিশ্ববিপ্লবের চেয়ে মিশরের গ্রামের উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ইয়েমেনের যুদ্ধের চেয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা বেশি জরুরি।

শেষে ওসিরিস এক অদ্ভুত দ্বৈত রায়ে শুনানি শেষ করেন। তিনি স্বীকার করেন, মিশরের নেতাদের মধ্যে নাসেরই প্রথম সত্যিকার অর্থে দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এই স্বীকৃতির পরও তাঁকে “অমরদের” মধ্যে নিঃশর্ত জায়গা দেওয়া হয় না। তাঁর সমস্ত কাজের চূড়ান্ত বিচার যথাযথ আদালতে না হওয়া পর্যন্ত সেই স্থান শর্তসাপেক্ষ।

মিশরের রাজনীতি নিয়ে মাহফুজের ব্যক্তিগত বিচার এত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা এই বইটি শেষ হয় সাদাতের বিচার দিয়ে। শুরুতে সাদাতের বিচার নাসেরের তুলনায় অনেক কোমল।

এখানে দুটি বিষয় খেয়াল করার মতো। প্রথমটি, আখেনাতেন হঠাৎ আলোচনায় ঢুকে সাদাতকে বলেন, শান্তির প্রতি তাঁদের দুজনের অঙ্গীকার একই ছিল এবং দুঃখজনকভাবে দুজনকেই বিশ্বাসঘাতকতার একই অভিযোগ সহ্য করতে হয়েছিল।

দ্বিতীয়টি নাসের ও সাদাতের উত্তপ্ত তর্ক। অর্ধেক ঠাট্টা, অর্ধেক তিক্ততা। ছোট ছোট বাক্যে দ্রুত পাল্টাপাল্টি কথা। একসময় তাঁরা ছিলেন একই ষড়যন্ত্রের অংশীদার, একই লড়াইয়ের সঙ্গী। পরে আধুনিক মিশরের সম্পূর্ণ বিপরীত দুই শাসক।

মিশরীয় কথ্য ভাষার সঙ্গে মাহফুজের মতো ঘনিষ্ঠ পরিচয় এবং সাহিত্যিক আরবি গদ্যের ওপর তাঁর মতো দখল না থাকলে একই সঙ্গে এত মজার এবং এত গুরুতরভাবে এই দৃশ্য লেখা সম্ভব হতো না।

গামাল আবদেল নাসের তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আমার উত্তরাধিকার থেকে এমন বিশ্বাসঘাতক অবস্থান তৈরি করা তোমার কাছে এত সামান্য ব্যাপার হলো কী করে?”

আনোয়ার আল-সাদাত উত্তর দিলেন,
“আমাকে সেই অবস্থান নিতেই হয়েছিল। কারণ আমার রাজনীতি মূলত তোমার কাছ থেকে পাওয়া ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা ছিল।”

নাসের বললেন,
“কিন্তু আমার সম্মতি নিয়েই তোমাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তুমি ছিলে আমার সমর্থক ও বন্ধু।”

সাদাত বললেন,
“একটি অন্ধকার আতঙ্কের সময়ে নেওয়া অবস্থানের জন্য কাউকে দায়ী করা অন্যায়। তখন বাবা ছেলেকে ভয় পেত, ভাই নিজের ভাইকে ভয় পেত।”

নাসের বললেন,
“তুমি যে বিজয় পেয়েছ, তা আমার দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল।”

সাদাত বললেন,
“তোমার মতো পরাজিত মানুষের পক্ষে বিজয় অর্জন করা সম্ভব ছিল না। আমি মানুষকে তাদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছি। তারপর নিশ্চিত বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছি।”

নাসের বললেন,
“তারপর অপমানজনক শান্তির জন্য সবকিছুর সঙ্গে আপস করলে। আরবদের ঐক্য ভেঙে দিলে, মিশরকে একা করে দিলে।”

সাদাত বললেন,
“আমি এমন একটি দেশ পেয়েছিলাম, যা বিস্মৃতির খাদে পড়ে যাওয়ার কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ আরবরা সত্যিকারের সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। তখন পরিষ্কার হলো, তারা আমাদের মরতে দিতে চায় না, আবার শক্তিশালীও দেখতে চায় না। তারা চায়, তাদের টাকার জন্য আমরা মাথা নত করে ভিক্ষা করতে থাকি। না, সিদ্ধান্ত নিতে আমি দ্বিধা করিনি।”

নাসের বললেন,
“তাহলে যে মহাশক্তি সব সময় আমাদের পাশে ছিল, তাকে ছেড়ে এমন এক মহাশক্তির কাছে গেলে যে বরাবর আমাদের শত্রু ছিল।”

সাদাত বললেন,
“আমি সেই মহাশক্তির কাছে গিয়েছিলাম যার কাছে সত্যিকারের সমাধান ছিল। পরে ঘটনাই প্রমাণ করেছে, আমার বিশ্বাস ভুল ছিল না।”

নাসের বললেন,
“ইনফিতাহর দিকে তুমি এমন বেপরোয়াভাবে ছুটলে যে দেশকে মূল্যস্ফীতি আর দুর্নীতির ঢেউয়ে ডুবিয়ে দিলে। আমার সময়ে আমি যতটা গরিবের নিরাপত্তা দিয়েছিলাম, তুমি ততটাই নিরাপত্তা দিয়েছ ধনী আর চোরদের।”

সাদাত বললেন,
“আমি মিশরের ভালোর জন্য কাজ করেছি। আমার পেছনে সুবিধাবাদীরা নিজেদের কাজ করেছে।”

Before the Throne–এ যে ধরনের বিচার আমরা দেখি, বিষণ্ন Akhenaten–এর কেন্দ্রেও প্রায় একই অনুসন্ধান আছে। এখানে মাহফুজ আবার তাঁর আলেকজান্দ্রিয়াকে নিয়ে লেখা আগের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস Miramar–এর রাশোমনসদৃশ কৌশলে ফিরে গেছেন।

১৯৬৭ সালের Miramar–এর ঘটনাস্থল একটি বোর্ডিং হাউস। সেখানে জাহরা নামে প্রদেশ থেকে আসা সুন্দরী এক তরুণী গৃহকর্মীর কাজ করে। বাড়ির পুরুষেরা তাকে কামনা করে। গল্পের প্রত্যেক কথক পুরুষ, এবং প্রত্যেকে পঞ্চাশের দশকের শুরুর সামরিক কর্মকর্তাদের বিপ্লবের শেষ পর্বের মিশরীয় রাজনীতির কোনো না কোনো অবস্থানের প্রতিনিধি। একজন ওয়াফদপন্থী, একজন মোহভঙ্গ সমাজতন্ত্রী, আরেকজন নাসেরপন্থী সুবিধাবাদী।

Akhenaten–এ তরুণ মেরিয়ামুন তার বাবার সঙ্গে নীলনদ ধরে দক্ষিণে যাচ্ছে। পথে তারা একটি পরিত্যক্ত শহর দেখে। দৃশ্যটি তার কৌতূহল জাগায়। বাবার কাছ থেকে যতটুকু জানতে পারে, তাতেই সে ঠিক করে শহরটির সত্য, মৃত শাসকের সত্য এবং এখন নিঃসঙ্গ হয়ে থাকা বিধবা রানির সত্য খুঁজে বের করবে।

সে আখেনাতেনের জীবনের প্রধান মানুষদের কাছে যায় এবং প্রত্যেককে তাদের দেখা ঘটনাটি বলতে বলে।

নিজের অনুসন্ধানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেরিয়ামুন বলে:

“বাবার নিজেরই জ্ঞান ও সত্য লিপিবদ্ধ করার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। সে কারণেই আমাদের প্রাসাদে জাগতিক ও ধর্মীয় দুই জগতের মানুষের সমাগম হতো।”

এই বাক্যটির সমস্যা হলো, “সত্য লিপিবদ্ধ করা” কথাটি অনুবাদকের নিজের সংযোজন। ছোট সংযোজন, সন্দেহ নেই, কিন্তু মাহফুজের নিজের গদ্যের যে সংযত, আটসাঁট স্বভাব, তাতেও এতে সামান্য পরিবর্তন আসে।

এখানে প্রথমেই বলে রাখি, আমি অনুবাদক নই, কখনো হবও না। কিন্তু যখনই Akhenaten–এর আরবি মূলের সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদ মিলিয়েছি, একটি বিষয় বারবার চোখে পড়েছে। মূলের সঙ্গে অনেক স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাখ্যা যোগ করা হয়েছে, অথবা এমন শব্দ ঢোকানো হয়েছে যা আরবিতে নেই।

মাহফুজের আরবি লেখার যে বিষয়টি আমাকে সব সময় মুগ্ধ করেছে, তা শুধু তার পাথরে খোদাই করা মতো সংক্ষিপ্ত দৃঢ়তা নয়। শব্দের নিচে তিনি যে বিপুল সম্ভাব্য অর্থ রেখে দেন, সেটিও। তিনি সেগুলো মুখে বলে দেন না। যেন শব্দের তলায় গুঁজে রাখেন।

উপরের উদ্ধৃতিতে ঠিক যেখানে আরবি বাক্যটি থেমে যায়, অনুবাদক সেখানেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে সামনে এগিয়ে এসেছেন। “গভীর অনুরাগ ছিল” বলে যে অংশটি করা হয়েছে, মাহফুজের আরবিতে তা আরও স্থির ও নিষ্ক্রিয়। অর্থ কাছাকাছি “এর মধ্যে গাঁথা ছিল”, “শেকড় গেড়েছিল”, “নোঙর করা ছিল”। এই ভাষায় বসে থাকা বৃদ্ধ বাবার জীবন এবং উপন্যাসের বাকি অংশে জ্ঞানের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো ছেলের জীবনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম তুলনা তৈরি হয়।

যাই হোক, পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে তরুণ কথক মেরিয়ামুন একে একে আখেনাতেনের জীবনের প্রধান ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করে। শেষ ব্যক্তি নেফারতিতি, আখেনাতেনের বেঁচে থাকা স্ত্রী।

তাদের মুখে আমরা তরুণ রাজার ট্র্যাজেডি শুনি, শান্তির নামে তাঁর বিপর্যয়কর শাসনের কথা শুনি, তাঁকে ঘিরে পুরোহিত, সেনাবাহিনী ও প্রাসাদের নানা ষড়যন্ত্রের কথা শুনি। শেষে মনে হয়, বিভ্রান্ত, একা এবং সম্ভবত বিশ্বাসঘাতকতার শিকার অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

বহু দিক থেকে আখেনাতেন কনরাডের কার্টজের ঠিক বিপরীত। একজন আলোর চরিত্র, অন্যজন অন্ধকারের। Heart of Darkness মাহফুজের নিঃশর্ত প্রশংসা পাওয়া বইগুলোর একটি।

রহস্যময় রাজাকে মনে করে তাঁর আত্মীয়, দরবারি, সেনাপতি, ভাইবোন, পুলিশকর্তা, শিল্পী ও পুরোহিতেরা। মেরিয়ামুন অবিরাম প্রশ্ন করে। সে নিজের ধারণা জানায়, কিন্তু সব সময় কোনো শেষ সিদ্ধান্ত দেয় না।

উপাদানগুলো খুব সমৃদ্ধ, আবার কখনো বিভ্রান্তিকরভাবে জটিল। যেন একই সঙ্গে মূল সুর আর পাল্টা সুর চলছে। আখেনাতেন ও তাঁর মায়ের মধ্যে যৌন সম্পর্ক ছিল কি না, নেফারতিতি ক্ষমতার লোভে ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন নাকি নিবেদিত স্ত্রী, রাজা অন্যদের তুলনায় বেশি সুস্থ ছিলেন নাকি বেশি অসুস্থ, একের পর এক প্রশ্ন আখেনাতেনের রহস্যকে আরও বড় করে, আরও জটিল করে।

এই রহস্যের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, আখেনাতেন কি এক ঈশ্বরবাদী মহান দূরদর্শী ছিলেন, যাঁর এক অজ্ঞেয় ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস এবং শান্তির বাণী নিজের সময়ের অনেক আগে এসে পড়েছিল, এতটাই আগে যে সময়টি তা ধারণ করতে পারেনি? নাকি তিনি ছিলেন দুর্বল, মানুষকে চালাতে চাওয়া, অযোগ্য এক ধর্মদ্রোহী, যিনি সব পুরোনো দেবতাকে নির্বাসিত করায় আমুনের অনুসারীদের চোখে অন্তত তেমনই মনে হয়, এবং যাঁর হাতে মিশর এমন গৃহবিবাদে ডুবে যায় যে দেশের ঐক্য, এমনকি সীমান্তও বিপদের মুখে পড়ে?

আবার একটু Before the Throne–এ ফিরে গেলে রহস্যময় ফারাও আর সাদাতের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। মাহফুজের মনে যেন এই আধুনিক শাসকের সঙ্গে প্রাচীন পূর্বসূরির একটি জোড়া তৈরি হয়েছিল। ফারাও দাবি করেছিলেন, তিনি দেবতার সেবা করছেন। সাদাতের তেমন কোনো দাবি ছিল না। তিনি বরং রঙিন ব্যক্তিত্বের এক আত্মকেন্দ্রিক মানুষ হয়েই রয়ে গিয়েছিলেন।

তাই মাহফুজের কাছে এই প্রাচীন ঘটনার আকর্ষণ শুধু এই নয় যে আমরা মূল চরিত্রটিকে কখনো পুরোপুরি জানতে পারি না। আরও দূরের একটি সত্য খুঁজতে তার নিজের যাত্রাই তাকে বোঝা আরও কঠিন করে তোলে।

Akhenaten–এ মিশরের পরিচয়ের কর্তৃত্ব ও অখণ্ডতা হয় টিকে থাকে, নয়তো কয়েকজন বিরোধী সাক্ষীর চোখে তা বিপন্ন হয়। দুই ক্ষেত্রেই ক্ষমতা, তার টিকে থাকা এবং তার পতন উপন্যাসের কেন্দ্রে। প্রধান কারণ, নিজের উদ্দেশ্য সফল করতে ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, আখেনাতেন নিজেই তা জানেন না।

আখেনাতেন, নেফারতিতি ও আখেনাতেনের তরুণ উত্তরসূরি তুতানখামেন প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত তিন চরিত্র, মাহফুজ নিশ্চয়ই তা জানতেন। এই জানা তাঁর কাজ সহজ করেছে বলে মনে হয় না। প্রথমত তাঁদের সম্পর্কে অনেক তথ্য আছে। দ্বিতীয়ত, প্রথম আমেনহোটেপ, দ্বিতীয় রামেসিস বা চতুর্থ থুতমোসের তুলনায় তাঁদের মধ্যে এমন মানবিক আকর্ষণ আছে, যার কারণে আধুনিক ব্যাখ্যাকারীরা তাঁদের নিয়ে বারবার ফিরে আসেন।

এর একটি উদাহরণ ১৯৫৪ সালের চলচ্চিত্র The Egyptian। সেখানে মাইকেল ওয়াইল্ডিং আখেনাতেন, জিন টিয়ার্নি নেফারতিতি এবং ভিক্টর ম্যাচিউর আখেনাতেনের শৈশবের বন্ধু হোরেমহাবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। বহু বছর আগে কায়রোয় তরুণ বয়সে ছবিটি দেখে আমি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলাম। অথচ প্রাচীন মিশরের কাহিনি, আসল জায়গাগুলো আর বিশাল সব নিদর্শনের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা। ছবিটিতে আধ্যাত্মিকতা আর জাগতিক ক্ষমতার সংঘর্ষ ভালোভাবে দেখানো হয়েছিল, যদিও কোথাও কোথাও তা বেশ সস্তা নাটকীয়ও ছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে তুতানখামেনকে পশ্চিমের বিভিন্ন জায়গায় জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে। আখেনাতেনও বেশ কিছু প্রদর্শনীতে মনোযোগ পেয়েছেন। এ বছরের শুরুতে বোস্টন মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসের একটি প্রদর্শনীও ছিল।⁵ এসব প্রদর্শনীতে তাঁর শহর আমার্নাকে দর্শকের পরিচিত করে তোলা হয়েছে, একই সঙ্গে তাঁর যুগের শিল্পকলার অদ্ভুত লম্বাটে শরীর, নরম মেদযুক্ত অবয়ব এবং স্পষ্ট নারীত্বপূর্ণ ভঙ্গিও সামনে আনা হয়েছে।

ক্রিস্টিন এল মাহদির তুতানখামেন নিয়ে নতুন একটি বই একেবারে উল্টো পথে যায়। তাঁর বক্তব্য, আখেনাতেনের আসলে কোনো মৌলিক ধর্মীয় দর্শন ছিল না এবং খুব সম্ভবত তিনি সমকামী ছিলেন।⁶ এই ভাবনাটি মাহফুজের মাথায় এসেছে বলে মনে হয় না।

আরও কয়েকটি বিষয় এখানে বলা দরকার। তথ্য কীভাবে এক মানুষের কাছ থেকে আরেক মানুষের কাছে যায়, সেই প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি মাহফুজকে প্রবলভাবে টানে। সেই চলাচলের মধ্যে ঐতিহাসিক সময় কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটিতে বদলে যায়, সেটিও তাঁর আগ্রহের জায়গা। এই দৈনন্দিন খুঁটিনাটি সব সময় স্পষ্ট, কিন্তু কখনো শেষ সিদ্ধান্ত দেয় না।

মাহফুজের কাছে ভাষার কাজ শুধু তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়। মানুষের চরিত্র, আবেগ, বৈষয়িক স্বার্থ ও পরিচয় কীভাবে শব্দের মধ্যে ঢুকে তথ্যকে অনিবার্যভাবে বদলে দেয়, ভাষা সেটিও দেখায়।

আখেনাতেনের শত্রু ও বন্ধুদের কথা শোনার পরে মেরিয়ামুন শেষ পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী নেফারতিতির সঙ্গে দেখা করে। আখেনাতেনের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, এবার হয়তো রহস্যের সমাধান হবে। মেরিয়ামুন যেভাবে আখেনাতেনকে সত্যের উদ্‌গ্রীব অনুসন্ধানী বলে বিশ্বাস করে, নেফারতিতি হয়তো সেই ছবিটিই নিশ্চিত করবেন।

নেফারতিতি স্বীকার করেন, তিনি আখেনাতেনকে ছেড়ে গিয়েছিলেন তাঁর জীবন বাঁচানোর জন্য। হয়তো তাঁর ধারণা ছিল, বিদেশি আক্রমণকারীদের হাত থেকে দেশ রক্ষার জন্য শক্ত ব্যবস্থা নিতে আখেনাতেন যে দ্বিধা করছিলেন, নেফারতিতি পাশে না থাকলে সেই দ্বিধা কেটে যেতে পারে। তিনি হয়তো কাজ করতে বাধ্য হবেন।

কিন্তু নেফারতিতিও তাঁর স্বামী সম্পর্কে শেষ সত্য কখনো জানতে পারেন না। তাঁকে শুধু একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদে ভরসা করতে হয়, “ধর্মদ্রোহী” অসুস্থ হয়ে একা মারা গেছে। যদিও তাকে হত্যা করাও হয়ে থাকতে পারে।

ফলে সব সাক্ষ্যই আলো কাঁপা পানির মতো দ্ব্যর্থক। কোনো কিছুরই শেষ নিশ্চয়তা নেই। একটি ব্যাপার ছাড়া। আখেনাতেনকে যারা দেখেছে, সবাই মনে করে তিনি নিজের বিশ্বাস সত্যিই অনুভব করেছিলেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস অন্যের কাছে পুরোপুরি পৌঁছে দিতে পারেননি, নিজের শাসনের পরেও তাকে টিকিয়ে রাখতে পারেননি।

এর বাইরে তাঁর নিজের বক্তব্যসহ সব সাক্ষ্যেই কোনো না কোনো বিকৃতি আছে। যেন প্রতিবার কথা এক মুখ থেকে আরেক মুখে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সত্য একটু দূরে সরে যায়। একই সময়ে ফেরাউনের ক্ষমতাও কমে আসে।

তাঁর আবেগ যত বেশি তাঁকে দখল করে, শাসক হিসেবে তিনি তত দুর্বল হয়ে পড়েন। যে বিশ্বাস তিনি অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে চান, সেটিও তত বেশি রহস্যময় ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। নিজের ভেতরে আবদ্ধ, অন্যের নাগালের বাইরে। মানুষের চোখে ধীরে ধীরে তা মৃত্যুর মতো হয়ে যায়।

তবু মেরিয়ামুনকে দেওয়া বিভিন্ন বয়ান থেকে কয়েকটি বিষয়ে মোটামুটি মিল পাওয়া যায়। সাক্ষীদের মধ্যে আছেন আখেনাতেনের শক্তিশালী নুবীয় মা তিয়ে, যাঁর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলেও অভিযোগ আছে; নেফারতিতির বাবা আই; প্রধান পত্রলেখক টোটো; আখেনাতেনের একমাত্র ঈশ্বরের মহাপুরোহিত মেরি-রা; এবং তাঁর পুলিশপ্রধান মাহো।

সবার চোখে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় আখেনাতেনের অদৃশ্য ও নীরব ঈশ্বরের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস। মিশরে পুরোনো অন্য দেবতাদের জন্য কোনো জায়গা রাখতে তিনি একেবারেই রাজি নন। ক্রমে আরও ব্যক্তিগত এবং একই সঙ্গে আরও দূরের হয়ে ওঠা তাঁর ঈশ্বরের উদ্দেশে গাওয়া উচ্ছ্বসিত স্তোত্রগুলোয় এই বিশ্বাস কবিতার ভাষা পায়।

আরেকটি সাধারণ বিষয় তাঁর শান্তির প্রতি সম্পূর্ণ অঙ্গীকার। শক্তি বা সহিংসতা ব্যবহার করতে অস্বীকার, ভালোবাসা দিয়ে পুরো রাজ্য আলোকিত করার ইচ্ছা।

শাসক হিসেবে আখেনাতেনের অযোগ্যতাকে মাহফুজ সমর্থন করেন, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং মাহফুজের অন্য লেখা থেকে ফারাওকে বিচার করলে মনে হয়, আখেনাতেনের ধর্মীয় আবেগের প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি তাঁর প্রতি সামান্য বিদ্রূপও আছে। স্পষ্ট সহানুভূতি খুব কম।

আরও একটি বিষয় হলো, শান্ত স্বভাবের এই ফারাও জাগতিক ক্ষমতার চিহ্ন ও কর্তৃত্বকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না। শেষ পর্যন্ত এই কারণেই তাঁর বন্ধু, বড় সেনানায়ক হোরেমহাবের সমর্থন হারান। আখেনাতেনের শাসনের শেষ দিকে হোরেমহাব তাঁর ক্ষমতা কেড়ে নেন।

মাহফুজকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় অন্য একটি সমস্যা। আখেনাতেনের উদার অথচ অনমনীয় বিশ্বাস আর তাঁর শাসনকালে রাষ্ট্র ও ধারণা হিসেবে মিশরের ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখা, এই দুইয়ের মধ্যে এমন এক বিরোধ আছে যার সহজ মীমাংসা নেই।

সমস্যা হলো, আখেনাতেন কোনো আপসই মানেন না। রাজনীতির সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। তাহলে তিনি কি সাধু? নাকি আসলে বিপজ্জনক মানুষ, নিজের বিশ্বাসের জন্য দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিতেও যিনি প্রস্তুত? যেমন দেশের সীমান্ত রক্ষা করতে অস্বীকার করা।

উপন্যাস এর কোনো পুরোপুরি সন্তোষজনক উত্তর দেয় না। বরং সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট ও গভীর করে। আর সেই পথে প্রশ্নটিকে মানুষ কীভাবে সত্য জানে, সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসর থেকে সরিয়ে “জাগতিক” ইতিহাসের মধ্যে নিয়ে আসে। আরবিতে “পরকাল”-এর বিপরীতে “এই পৃথিবী” বোঝাতে আল-দুনিয়া শব্দটি বারবার এসেছে।

মাহফুজের ইঙ্গিত হলো, সবচেয়ে ভালো ও মহৎ ধারণাও ইতিহাসের শত্রুতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গেঁড়ে বসা স্বার্থকে মুছে ফেলতে পারে না। কারণ মহৎ ধারণার শক্তি কম, তা নয়। সমস্যা হলো, এমন কোনো সহজ, মানুষশূন্য সময় নেই যেখানে বাধাহীনভাবে সেই ধারণাগুলো নিজেদের মুক্তিদায়ী বা নিরাময়ের শক্তি কাজে লাগাতে পারে।

আরেকটি সমস্যা হলো, আল-দুনিয়া, এই জাগতিক পৃথিবীকে, কোনো না কোনো কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা দরকার। তা না হলে সে এমন এক ঘূর্ণায়মান বিশৃঙ্খলায় পড়ে যেতে পারে, যা মাহফুজ তাঁর পরের গল্প ও উপন্যাসে প্রায়ই দেখিয়েছেন। এই বিশৃঙ্খলার জন্য তিনি অনেক সময় বুদ্ধিজীবীদেরও দায়ী করেন।

১৯৬৭ থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়কে নিয়ে লেখা কয়েকটি উপন্যাসে এই পরিস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে Tharthara fawq al-Nil বা Adrift on the Nile এবং Taht al-Mazella বা Under the Shelter।

Adrift on the Nile–এ কয়েকজন বন্ধু নীলনদের ওপর একটি হাউসবোটে সরকারি কর্মচারী আনিস জাকির চারপাশে জড়ো হয়। আনিস স্ত্রী ও মেয়েকে হারিয়েছে। তার মতো বন্ধুরাও মাদকঘোর আর কথার হতাশার মধ্যে বাস করে। একসময় তারা গাড়ি দুর্ঘটনায় একজন কৃষককে হত্যা করে, কিন্তু কেউ সাহস করে ঘটনাটি জানাতে পারে না।

ছয়টি গল্প ও পাঁচটি নাটক নিয়ে তৈরি Under the Shelter–এর স্বভাবকে সবচেয়ে ভালো বলা যায় অভিব্যক্তিবাদী। নামগল্পে কয়েকজন মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে একটি বাসস্টপের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চোখের সামনে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। যৌন উন্মত্ততা, ধুলোর মধ্যে কাটা মাথা গড়িয়ে যাওয়া, গাড়ি দুর্ঘটনা। তারা নিষ্ক্রিয়ভাবে সব দেখে। কোনো কেন্দ্রীয় বিষয় বা উদ্দেশ্য যেন নেই।

তাই মাহফুজের মিশর অত্যন্ত টানটান এক জায়গা। তাঁর নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ও হাস্যরস তাকে অসাধারণ জীবন্ত করে তোলে। এই পৃথিবী মহান নায়কদের নিয়ে পুরোপুরি মুগ্ধ নয়, আবার আখেনাতেন যে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যের স্বপ্ন মরিয়া হয়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি, সেই ধরনের কোনো স্বপ্ন ছাড়াও সে চলতে পারে না।

শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্র না থাকলে মিশর সহজেই বিশৃঙ্খলায় ভেঙে পড়তে পারে। আবার ধর্মীয় মতবাদ বা ব্যক্তিগত একনায়কত্বের ওপর দাঁড়ানো অর্থহীন, অকারণ স্বৈরতন্ত্রেও পড়ে যেতে পারে।

মাহফুজের বয়স এখন ঊননব্বই। তিনি প্রায় অন্ধ। ১৯৯৪ সালে সালমান রুশদির The Satanic Verses নিয়ে তাঁর মধ্যপন্থী অবস্থানের কারণে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তাঁর ওপর শারীরিক হামলা চালায়। এখন শোনা যায়, তিনি অনেকটাই নিভৃত জীবন কাটান।

তাঁর মধ্যে একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও বেদনাদায়ক যে বিষয়টি আমি দেখি, তা হলো তাঁর দৃষ্টি ও সাহিত্য এত বিশাল হওয়ার পরও তিনি মিশরের জন্য উনিশ শতকের উদারনৈতিক একটি বিশ্বাস এখনও ধরে রেখেছেন। তাঁর বিশ্বাস, একটি ভদ্র, মানবিক সমাজ সম্ভব।

অথচ সমকালীন জীবন ও ইতিহাস থেকে তিনি নিজেই যে সব ঘটনা বারবার তুলে আনেন এবং লেখেন, সেগুলো যেন সেই বিশ্বাসের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেয়।

ব্যাপারটির বিদ্রূপ এখানেই। অন্য যে কারও চেয়ে মাহফুজ নিজের লেখায় মিশরের ভেতরের প্রায় মহাজাগতিক এক সংঘর্ষকে বেশি শক্তিতে নাটকীয় করে তুলেছেন। একদিকে আছে মহান, প্রায় চূড়ান্ত আদর্শ। অন্যদিকে মানুষ, ইতিহাস ও সমাজ সেই আদর্শগুলোকে ধীরে ধীরে কুরে খায়, ক্ষয় করে।

এই দুই বিপরীত শক্তিকে মাহফুজ কখনো সত্যিকার অর্থে মিলিয়ে দিতে পারেন না।

তবু একজন নাগরিক হিসেবে তিনি যেন এখনও বিশ্বাস করেন, সভ্যতা, মানুষের পারস্পরিক ভদ্রতা এবং জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে টিকে থাকা মিশরের এক গভীর, স্থায়ী পরিচয় হয়তো শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। সংঘর্ষ ও ইতিহাসের অবক্ষয়ের যে দুর্বল করে দেওয়া প্রক্রিয়া তিনি আমার পড়া অন্য যে কোনো লেখকের চেয়ে এত শক্তিশালীভাবে দেখিয়েছেন, হয়তো সেই প্রক্রিয়াকেও পেরিয়ে। ·


টীকা
১. জে. এম. কোয়েটজি, “Fabulous Fabulist,” The New York Review, ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪।
২. ইলিয়াস খুরি, “Mahfouz: The First Arab,” Mawaqif, খণ্ড ৫৭, শীত ১৯৮৯।
৩. রশিদ এল-এনানির Naguib Mahfouz: The Pursuit of Meaning (Routledge, 1993) বইটি আমার খুব কাজে লেগেছে। ইংরেজিতে মাহফুজকে নিয়ে লেখা সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বই এটিই।
৪. এ বিষয়ে দেখুন ম্যাক্স রোডেনবেকের “Witch Hunt in Egypt,” The New York Review, ১৬ নভেম্বর ২০০০ এবং সাবরি হাফেজ, “The Novel, Politics and Islam,” New Left Review, খণ্ড ৫, দ্বিতীয় সিরিজ, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০০০, পৃষ্ঠা ১১৭-১৪১।
৫. “Pharaohs of the Sun: Akhenaten, Nefertiti, Tutankhamen,” ১৪ নভেম্বর ১৯৯৯ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০০০।
৬. Tutankhamen: The Life and Death of the Boy-King (St. Martin’s, 2000)।