অনুবাদ : সম্পদ বড়ুয়া

গেটের সাইনবোর্ডে লেখা, ‘Chien méchant’, হিংস্র কুকুর। আর কুকুরটি সত্যিই হিংস্র। মেয়েটা যতবার গেটের পাশ দিয়ে যায়, কুকুরটা নিজের শরীর গেটের ওপর ছুড়ে মারে, তাকে ধরতে আর টুকরো টুকরো করে ফেলতে চেয়ে হাউমাউ করে ওঠে। বড়সড় কুকুর, রীতিমতো ভয় ধরানো কুকুর, হয়তো জার্মান শেফার্ড বা রটওয়াইলার জাতের কিছু একটা। কুকুরের জাত সম্পর্কে মেয়েটা খুব বেশি জানে না। কুকুরটার হলুদ চোখ থেকে একেবারে খাঁটি ঘৃণা তার দিকে ঠিকরে পড়ছে বলে তার মনে হয়।

পরে, ‘Chien méchant’ লেখা বাড়িটা যখন পেছনে পড়ে যায়, মেয়েটা সেই ঘৃণা নিয়ে ভাবতে থাকে। সে জানে, এটা তার প্রতি ব্যক্তিগত কোনো ঘৃণা নয়। যে-ই গেটের কাছে আসুক, যে-ই হেঁটে বা সাইকেলে পাশ দিয়ে যাক, তাকেই এই ঘৃণার মুখে পড়তে হবে। কিন্তু কুকুরটা এই ঘৃণা কতটা গভীরভাবে অনুভব করে? ঘৃণাটা কি বিদ্যুতের স্রোতের মতো, কাউকে চোখে পড়লেই চালু হয়, আর সে রাস্তার মোড় ঘুরে চোখের আড়াল হলেই বন্ধ হয়ে যায়? আবার একা হয়ে যাওয়ার পরও কি ঘৃণার খিঁচুনি কুকুরটাকে কাঁপাতে থাকে, নাকি তার রাগ হঠাৎ মিলিয়ে যায়, আর সে আবার শান্ত হয়ে পড়ে?

সপ্তাহের প্রতিটি কর্মদিবসে দুবার সে সাইকেলে বাড়িটার পাশ দিয়ে যায়। একবার যে হাসপাতালে সে কাজ করে সেখানে যাওয়ার পথে, আরেকবার কাজের পালা শেষ করে ফেরার সময়। তার যাওয়া-আসার সময় এত নিয়মিত যে কুকুরটা বুঝে গেছে, মেয়েটা কখন আসবে। মেয়েটা চোখে পড়ার আগেই কুকুরটা গেটের কাছে এসে দাঁড়ায়, আগ্রহে হাঁপাতে থাকে। বাড়িটা একটা ঢালের ওপর বলে সকালে উঁচুতে উঠতে গিয়ে মেয়েটার গতি ধীর হয়ে যায়। বিকেলে অবশ্য স্বস্তির কথা, সে খুব দ্রুত সাইকেল চালিয়ে জায়গাটা পার হয়ে যেতে পারে।

কুকুরের জাত সম্পর্কে সে কিছু না জানলেও, তার সঙ্গে প্রতিবার মুখোমুখি হয়ে কুকুরটা কী ধরনের তৃপ্তি পায়, সে বিষয়ে তার বেশ ভালো ধারণা আছে। সেটা তাকে দমিয়ে রাখার তৃপ্তি, তাকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার তৃপ্তি।

যতদূর সে দেখতে পায়, কুকুরটা পুরুষ, খোজা করা হয়নি। কুকুরটা কি জানে যে সে একজন নারী? কুকুরের যেমন পুরুষ আর স্ত্রী দুই লিঙ্গ, তেমনি একজন মানুষও এই দুই লিঙ্গের একটির হবে বলে কি সে ধরে নেয়? আর সে কারণে কি কুকুরটা একই সঙ্গে দুই ধরনের তৃপ্তি পায়, এক পশুর ওপর আরেক পশুর আধিপত্যের তৃপ্তি, আর একজন পুরুষের একজন নারীর ওপর আধিপত্যের তৃপ্তি? মেয়েটার তা জানা নেই।

বাইরে উদাসীন থাকার ভান করলেও কুকুরটা কী করে বুঝতে পারে যে মেয়েটা তাকে ভয় পায়? উত্তর হলো, তার শরীর থেকে ভয়ের গন্ধ বেরোয়, আর সে তা লুকাতে পারে না। কুকুরটা যখনই তার দিকে ছুটে আসে, তার পিঠ বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে যায়, আর তার চামড়া থেকে গন্ধের একটা ঢেউ বেরিয়ে আসে। কুকুরটা সঙ্গে সঙ্গেই সেই গন্ধ পেয়ে যায়। গেটের ওপাশে থাকা এই প্রাণীর শরীর থেকে ভেসে আসা ভয়ের গন্ধ কুকুরটাকে ক্রোধে উন্মত্ত আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

সে কুকুরটাকে ভয় পায়, আর কুকুরটা তা জানে। দিনে দুবার এই আনন্দটার অপেক্ষায় থাকে সে। এই প্রাণীটা তার পাশ দিয়ে যাবে, যে তাকে ভয় পায়, যে নিজের ভয় লুকাতে পারে না, যার শরীর থেকে ভয়ের গন্ধ বেরোয়, ঠিক যেমন মাদি কুকুরের শরীর থেকে যৌনতার গন্ধ বেরোয়।

মেয়েটা অগাস্টিন পড়েছে। অগাস্টিন বলেন, আমরা যে পতিত জীব, তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ হলো নিজের শরীরের নড়াচড়াও আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। বিশেষ করে একজন পুরুষ নিজের পুরুষাঙ্গের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সেই অবাধ্য অঙ্গটি এমন আচরণ করে যেন তার নিজের আলাদা ইচ্ছাশক্তি আছে। এমনও মনে হতে পারে, যেন অন্য কোনো ইচ্ছাশক্তি তাকে চালাচ্ছে।

কুকুরটা যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়িটা যে পাহাড়ের ওপর, তার পাদদেশে পৌঁছালে মেয়েটার অগাস্টিনের কথা মনে পড়ে। এবার কি সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? ভয়ের সেই অপমানজনক গন্ধ যেন তার শরীর থেকে না বেরোয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ইচ্ছাশক্তি কি তার থাকবে? আর প্রতিবারই কুকুরটার গলার গভীর গর্জন সে শোনে, যে গর্জন ক্রোধেরও হতে পারে, কামনারও। প্রতিবারই গেটের ওপর কুকুরটার শরীর আছড়ে পড়ার শব্দ সে টের পায়। আর প্রতিবারই সে তার উত্তর পেয়ে যায়, আজ নয়।

‘Chien méchant’ কুকুরটা একটা ঘেরা বাগানের মধ্যে থাকে, যেখানে আগাছা ছাড়া আর কিছু জন্মায় না। একদিন মেয়েটা সাইকেল থেকে নামে, সেটা বাড়ির দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখে, তারপর দরজায় কড়া নাড়ে এবং অপেক্ষা করতে থাকে। তার কয়েক মিটার দূরে কুকুরটা পিছিয়ে যায়, তারপর আবার বেড়ার ওপর নিজের শরীর ছুড়ে মারে। সকাল আটটা। কারও বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার খুব স্বাভাবিক সময় নয়। তবু শেষ পর্যন্ত দরজাটা একটু ফাঁক হয়। ভেতরের ম্লান আলোয় মেয়েটা একটা মুখ দেখতে পায়, রোগা মুখের এক বৃদ্ধা, মাথায় ঢিলে হয়ে ঝুলে থাকা ধূসর চুল। ‘সুপ্রভাত,’ নিজের মোটামুটি ভালো ফরাসিতে মেয়েটা বলে। ‘আপনার সঙ্গে কি একটু কথা বলতে পারি?’

দরজাটা আরও খুলে যায়। মেয়েটা ভেতরে পা রাখে। অল্প আসবাবপত্রের একটা ঘর। সেখানে লাল কার্ডিগান পরা এক বৃদ্ধ টেবিলের সামনে বসে আছেন, সামনে একটা বাটি। মেয়েটা তাঁকে শুভেচ্ছা জানায়। বৃদ্ধ মাথা নাড়েন, কিন্তু উঠে দাঁড়ান না।

‘এত সকালে আপনাদের বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত,’ মেয়েটা বলে। ‘আমি দিনে দুবার সাইকেলে আপনাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাই, আর প্রতিবারই, নিশ্চয়ই আপনারা শুনেছেন, আপনাদের কুকুরটা আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করে থাকে।’

কেউ কোনো কথা বলে না।

‘কয়েক মাস ধরে এটা চলছে। আমার মনে হয়, এবার কিছু একটা বদলানোর সময় এসেছে। আপনারা কি কুকুরটার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে রাজি হবেন? তাহলে ও আমার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে, বুঝতে পারবে আমি কোনো শত্রু নই, আমার কাছ থেকে কোনো ক্ষতির ভয় নেই।’

বৃদ্ধ দম্পতি একে অন্যের দিকে তাকান। ঘরের বাতাস স্থির, যেন বছরের পর বছর কোনো জানালা খোলা হয়নি।

‘ও ভালো কুকুর,’ বৃদ্ধা বলেন। ‘Un chien de garde, পাহারাদার কুকুর।’

এই কথাতেই মেয়েটা বুঝতে পারে, কোনো পরিচয় হবে না, পাহারাদার কুকুরটার সঙ্গে তাকে পরিচিত করার কোনো চেষ্টাও হবে না। বৃদ্ধার কাছে তাকে শত্রু বলে ভাবাটাই যখন সুবিধাজনক, তখন সে শত্রুই থেকে যাবে।

‘আমি যতবার আপনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাই, আপনাদের কুকুরটা প্রচণ্ড ক্ষেপে ওঠে,’ মেয়েটা বলে। ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই, আমাকে ঘৃণা করাটা ও নিজের দায়িত্ব বলে মনে করে। কিন্তু আমার প্রতি ওর এই ঘৃণা আমাকে স্তম্ভিত করে, স্তম্ভিত আর আতঙ্কিত করে। যতবার আপনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাই, প্রতিবারই সেটা আমার জন্য অপমানজনক অভিজ্ঞতা। এতটা আতঙ্কিত হওয়া অপমানজনক। এই ভয় ঠেকাতে না পারা। ভয়টা বন্ধ করতে না পারা।’

বৃদ্ধ দম্পতি পাথরের মতো মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

‘এটা জনসাধারণের রাস্তা,’ মেয়েটা বলে। ‘জনসাধারণের রাস্তায় ভয় না পেয়ে, অপমানিত না হয়ে চলার অধিকার আমার আছে। আপনারা চাইলে এই অবস্থাটা বদলাতে পারেন।’

‘এটা আমাদের রাস্তা,’ বৃদ্ধা বলেন। ‘আমরা আপনাকে এখানে আসতে বলিনি। আপনি অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে পারেন।’

বৃদ্ধ লোকটি প্রথমবার কথা বলেন। ‘আপনি কে? কোন অধিকারে এখানে এসে আমাদের বলে দিচ্ছেন, আমরা কীভাবে চলব?’

মেয়েটা উত্তর দিতে যায়, কিন্তু বৃদ্ধের তা শোনার কোনো আগ্রহ নেই। ‘যান,’ তিনি বলেন। ‘যান, যান, যান!’

বৃদ্ধের গায়ের উলের কার্ডিগানের হাতার মুখটা খুলে আসছে। মেয়েটাকে চলে যেতে হাত নাড়ার সময় সেই খুলে যাওয়া হাতার মুখটা কফির বাটির মধ্যে গিয়ে লাগে। মেয়েটার মনে হয়, ব্যাপারটা তাঁকে বলে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলে না। কোনো কথা না বলে সে পিছিয়ে বেরিয়ে আসে। তার পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়।

কুকুরটা আবার বেড়ার ওপর নিজের শরীর ছুড়ে মারে। একদিন, কুকুরটা বলে, এই বেড়াটা ভেঙে যাবে। একদিন, কুকুরটা বলে, আমি তোকে টুকরো টুকরো করে ফেলব।

যতটা সম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করে মেয়েটা। যদিও সে কাঁপছে, যদিও সে টের পাচ্ছে তার শরীর থেকে ভয়ের ঢেউ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে, তবু কুকুরটার দিকে মুখ করে মানুষের ভাষায় বলে, ‘অভিশাপ তোকে, নরকে যা!’ তারপর সে সাইকেলে ওঠে এবং পাহাড়ের ওপরের দিকে চলে যায়।


লেখক পরিচিতি :
ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, শিক্ষাবিদ জন ম্যাক্সওয়েল কোয়েতজির জন্ম ১৯৪০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন শহরে। সেখানে তাঁর স্কুল জীবন কেটেছে। কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি আর গণিত শাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে অস্টিন-এর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেনফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ২০০৩ সালে কোয়েতজি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি ১৯৮৩ সালে এবং ১৯৯৯ সালে দু’বার বুকার পুরস্কার লাভ করেন। ‘কুকুরটি’ তাঁর 
The Dogগল্পের বাংলা অনুবাদ।