অনুবাদ : জামাল নাসের

একটা বিষয়ে আমার বিশেষ প্রত্যয় জন্মেছে। তা হচ্ছে একটা মেয়ে যদি কাউকে বিয়ে করতে মনস্থির করে তবে সে লোকের আর রক্ষা নেই। একটা মাত্র কাজ সে করতে পারে। তা হলো তাৎক্ষণিকভাবে কোথাও পালিয়ে যাওয়া। এভাবেই যে সবক্ষেত্রে রক্ষা পাওয়া যায় তাও ঠিক নয়। আমার এক বন্ধু একবার এ ধরনের বিপদে পড়ে দ্রুত কোন এক বন্দরে গিয়ে জাহাজ ধরলো। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সাথে সে প্রায় কিছুই নিতে পারেনি। পথে একটা টুথব্রাশ কিনে নিয়েছিলো। একটা বৎসর পৃথিবীর এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে ভাবলো সে এখন নিরাপদ। কারণ মেয়েরা পরিবর্তনশীল এবং এই এক বৎসরে হয়তো সে তার সম্পর্কে সবকিছু ভুলে গিয়েছে। তখন সে ফিরে এসে প্রথম বন্দরেই জাহাজ থেকে নামলো। নেমেই প্রথম যাকে দেখলো সে হচ্ছে ওই ছোট্ট গেইলি, খুবই আনন্দিত চিত্তে জেটি থেকে তার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছে। ওই মহিলার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য সে পালিয়ে গিয়েছিলো। আমি শুধু একটা মানুষকেই একবার দেখেছিলাম এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে যে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলো। তার নাম হচ্ছে রজার চেরিং। যখন রুথ কার্লো নামে একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে তখন তার বয়স খুব একটা কম ছিলো না। নিজেকে সতর্ক রাখার ব্যাপারে সে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ছিলো। কিন্তু রুথ কার্লোর এমন একটা গুণ ছিল যে সে প্রায় মানুষের রক্ষণব্যুহ ভেদ করে ফেলতে পারতো এবং রজারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। সে তার সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও পার্থিব অভিজ্ঞতা হারিয়ে ফেলেছিলো। মিসেস কার্লো ইতোমধ্যে দু’বার বিধবা হয়েছে। তার ছিল চমৎকার দুটো কালো চোখ। সেগুলো যেন সবসময় কথা বলতো। এতো জীবন্ত চোখ আমি কখনো দেখিনি। মনে হতো সেগুলো জলে টলটল করছে। দেখলেই ইচ্ছে জাগতো এ দুখী মেয়েটার পাশে আমি দাঁড়াতে চাই। রজারের কাছে জেনেছিলাম সকলেই মিসেস কার্লোর সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। তার ভাগ্যটাই এমন ছিল, কোন কিছুই তার ঠিক মতো হতো না। সে বিয়ে করলে তার স্বামী তাকে মারধোর করতো, সে যদি কাউকে ব্যবসার জন্য নিয়োগ করতো সে তার সাথে প্রতারণা করতো, সে বাবুর্চি রাখলে সে মদ পান করে মাতাল হয়ে থাকতো। মোট কথা যেখানেই সে হাত দেয় সেখানেই একটা না একটা ঝামেলা বেঁধে যায়।

রজার যখন আমাকে বললো, সে অবশেষে মিসেস কার্লোকে রাজী করিয়েছে তাকে বিয়ে করতে তখন আমি তাকে শুভকামনা জানালাম।

‘আমি আশা করি তোমরা খুব ভালো বন্ধু হবে’, সে বললো। ‘সে তোমাকে একটু ভয় পায়। জানোতো, সে মনে করে তোমার মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই।

‘আমি জানিনা সে আমাকে কেন এমন মনে করে।’

‘তুমি তো তাকে পছন্দ করো। তাই নয়কি?’

‘অবশ্যই, খুবই’।

‘বেচারীর খুব বাজে সময় গিয়েছে। আসলেই তার কথা ভেবে আমার দুঃখ হয়।’

‘হ্যাঁ,’ আমি বললাম।

এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু আমার বলার ছিল না। জানতাম সে ছিল নির্বোধ মহিলা। আমার মনে হলো রজারের সাথেসে ফন্দিবাজী করছে। আমার নিজস্ব বিশ্বাস ছিল, সে বাদামের খোসার চেয়েও শক্ত মনের মহিলা, তার মধ্যে কোনো কোমলতা নেই।

তার সাথে আমার প্রথম দেখা তাস খেলায়। আমরা দু’জন মিলে ব্রীজ খেলেছিলাম। সে যখন আমার পার্টনার ছিল, দু’বার আমার ভালো তাসগুলোর ওপর ট্রাম্প করে দিয়েছিল। কিন্তু আমি তার সাথে ফেরেশতার মতো ব্যবহার করেছিলাম। তবে সত্যি বলতে কী, আমার মনে হয়েছিল, কারো চোখ যদি জলে ভরে উঠত, তাহলে সেটা তা্র নয় বরং আমার ক্ষেত্রেই হওয়া উচিত ছিল। আর সন্ধ্যার শেষদিকে খেলাশেষে সে আমার কাছে বেশ টাকা হারলো। বললো আমাকে চেক পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সে চেক আর কখনো দেয়নি। আমি না ভেবে পারলাম না, এরপর যখন আমাদের দেখা হবে, তখন তার নয়, বরং আমার মুখেই একটি করুণ ভাব ফুটে উঠবে।

রজার তার বন্ধুদের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল। সে তাকে সুন্দর সুন্দর অলঙ্কার উপহার দিল। তাকে এখানে, সেখানে সবখানে নিয়ে যেতে লাগলো। তাদের বিয়ের দিন ঘোষণা করা হলো অদূর ভবিষ্যতেই। রজারের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল আনন্দে আর উত্তেজনায়।

তখন একদিন হঠাৎ করে সে বদলে গেল। তার মন থেকে ভালোবাসা উবে গেল। আমি জানিনা কেন। মিসেস কার্লোর কথাবার্তা তার মধ্যে ক্লান্তি সৃষ্টি করেছিল, এমনটি হতেই পারে না। কারণ তার তো কখনোই কোনো কথাবার্তা বলার গুণই ছিল না। হয়তো তার চোখের করুণ চাহনী তার মনে যে অনুভূতি সৃষ্টি করেছিলো তার রেশ শেষ হয়ে গিয়েছিলো। যা’হোক তার চোখ খুলে গেল। আবার তার আগের বুদ্ধিমত্তা ফিরে এলো। সে আবারও আগের মতো হিসেবি আর বিচক্ষণ দুনিয়াদার মানুষে পরিণত হলো। তবে ভালোভাবে বুঝতে পারল, রুথ কার্লো তাকে বিয়ে করতে মনস্থির করে ফেলেছে। সেও মনেমনে শপথ করে বসল, রুথ কার্লোকে বিয়ে করার বিষয়ে দুনিয়ার কোনোকিছুই তাকে বাধ্য করতে পারবে না। কাজেই রজার মহামুশকিলে পড়ে গেলো। এখন যদি সে তাকে মুক্তি দিতে বলে তাহলে এক আবেগময় নাটকীয় দৃশ্যের অবতারনা ঘটবে। হুঁশ ফিরে আসায় স্পষ্ট দেখতে পারছিল কী ধরনের নারীর মুখোমুখি সে হয়েছে। সে বেশ ভালোভাবে জানত, যদি মেয়েটিকে আংটি ফেরত নিয়ে মুক্তি দেওয়ার কথা বলে, তবে মেয়েটি তার আহত অনুভূতির দাম বসাবে আকাশছোঁয়া এবং তার কাছ থেকে প্রচুর অর্থ খসিয়ে ছাড়বে। তা ছাড়া, কোনো পুরুষের পক্ষে একজন নারীকে এভাবে ফেলে চলে যাওয়া সব সময়ই এক বিব্রতকর ব্যাপার। লোকে নিশ্চিতভাবেই ভাববে সে মেয়েটার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে।

রুথ কার্লোর প্রতি যে তার মনোভাব বদলে গেছে তা সে তার কথাবার্তা বা আচার আচরণে প্রকাশ করলো না। আগের মতোই তার প্রতি মনোযোগ প্রদর্শন করে যেতে লাগলো। রেস্টুরেন্টে তাকে খেতে নিয়ে যায়, তাকে নিয়ে একসাথে খেলতে যায়, তাকে ফুল পাঠায়। তারা সিদ্ধান্ত নিল তাদের মনোমত একটা বাসা পাওয়ার পরপরই বিয়ে করবে। তারা বাসা খোঁজায় মন দিলো এবং বাসার সন্ধানে এজেন্ট নিয়োগ করলো। এজেন্ট রজারকে বাসার ঠিকানা পাঠায়। রজার রুথকে নিয়ে সে বাসা দেখতে যায়।

এভাবে বেশ কিছু বাসা তারা দেখল। কোন কিছুতে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হওয়াটা খুব কঠিন। রজার আরো কয়েকজন এজেন্টের কাছে দরখাস্ত পাঠাল। বাসার পর বাসা তারা দেখতে লাগল।

বাসার আগাগোড়া তারা ঘুরে দেখে। বাসাগুলোর নিচতলার ভাঁড়ার ঘর থেকে ছাদের নিচে চিলেকোঠা পর্যন্ত পরীক্ষা করে দেখে।

বাসাগুলোর কোনটা প্রয়োজনের তুলনায় খুব বড় আবার কোনটা প্রয়োজনের তুলনায় খুব ছোট।

কখনো সেগুলো শহরের কেন্দ্র থেকে খুব দূরে আবার কখনো বা খুব কাছে।

কখনো সেগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল আবার কখনো বা সেগুলোতে বেশ কিছু মেরামত প্রয়োজন।

কখনোবা সেগুলো খুব গুমোট এবং শ্বাসরোধকারী আবার কখনো বা বেশি বায়ুময়।

কখনোবা সেগুলো খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন আবার কখনোবা বেশি অনাবৃত।

রজার সবসময় একটা না একটা খুঁত বের করত, যার ফলে কোন বাসাই আর পছন্দ করা যেত না। তাকে সন্তুষ্ট করানোটা ছিলো কঠিন ব্যাপার। তার প্রিয় রুথকে নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ ঘরে থাকবে এটা সে ভাবতেই পারত না। আর সঠিক বাসা খুঁজে বের করতে গেলে ধৈর্যসহকারে খুঁজতে হবেই। বাসা খোঁজা একটা ক্লান্তিকর কাজ এবং এতে রুথ ইদানীং খিটখিটে হয়ে উঠছিল। রজার তাকে ধৈর্য ধরতে পরামর্শ দিল। তারা যে বাসাটি খুঁজছে সেটি কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আছে। শুধু খুঁজে নেয়ার জন্য দরকার একটু উদ্যম। একটু উদ্যোগী হলেই তারা তা খুঁজে পাবে। হাজার হাজার সিঁড়ি বেয়ে তারা ওঠানামা করল; অসংখ্য রান্নাঘর পরিদর্শন করল। রুথ অবসন্ন হয়ে পড়ল। একাধিকবার সে তার মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালো।

শত শত বাসা তারা দেখে ফেললো।

‘তুমি যদি শিগগির একটা বাসা খুঁজে বের করতে না পারো, তবে আমি আমার অবস্থান পুনঃবিবেচনা করতে বাধ্য হবো,’ সে বললো। ‘তুমি এভাবে চলতে থাকলে বছরের পর বছর গেলেও আমরা বিয়ে করতে পারব না।’

‘এমনটি বলো না’, রজার জবাব দিলো। ‘আমি তোমার কাছে মিনতি করছি একটু ধৈর্য্য ধরো। আমি এজেন্টদের কাছে আরো কিছু নতুন বাসার তালিকা পেয়েছি। ওখানে অবশ্যই কমপক্ষে আরো ষাটটি বাসার সন্ধান আছে।’

তারা আবার বাসার পেছনে যাত্রা শুরু করলো। একের পর এক বাসা দেখে যেতে লাগলো। এভাবে বাসা দেখে দেখে তারা দু’বছর কাটিয়ে দিলো। রুথ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। তার মন ঘৃণা আর অবজ্ঞায় ভরে উঠল। তার করুণ, সুন্দর চোখে পুরোপুরি গোমড়া আর অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা ভাব চলে এল। মানুষের সহনশীলতার একটা সীমা থাকে। রুথের ধৈর্য ছিল অপরিসীম। তার সে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে পড়লো। আর সে বিদ্রোহী হয়ে উঠলো।

‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও নাকি চাওনা?’ সে জানতে চাইলো।

তার কন্ঠে একটা অস্বাভাবিক রুঢ়তা ছিলো। কিন্তু সেটা রজারের ভদ্রতায় কোন প্রভাব ফেললো না।

‘অবশ্যই। একটা বাসা পাওয়ামাত্রই আমরা বিয়ে করবো। ভালো কথা এইমাত্র আমি খবর পেলাম আমাদের পছন্দের সাথে মানানসই কিছু বাসা পাওয়া যেতে পারে।’

‘আমি আর বাসার পেছনে ঘুরে বেড়াতে চাই না।’

‘আমার ভয় হচ্ছে তুমি নিতান্তই ক্লান্ত হয়ে পড়েছো।’

রুথ কার্লো রজারের সাথে দেখা করা বন্ধ করে দিল।

রজার তার বাসায় যাওয়া এবং তাকে ফুল পাঠানো অব্যাহত রাখলো। সে ছিল বরাবরের মতই একাগ্র এবং প্রেমময়।

প্রতিদিন সে তাকে বলতো কিংবা লিখে পাঠাতো, আজ সে তাদের দেখার জন্য অন্য একটা বাসার খোঁজ পেয়েছে। এক সপ্তাহ পর সে একটা চিঠি পেলো :

রজার,
আমি মনে করি না তুমি সত্যিকারভাবে আমাকে ভালোবাসো। আমি একজনকে খুঁজে পেয়েছি, যে আমার যত্ন নিতে উদগ্রীব এবং আমি আজ তাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি।

—‘রুথ’

রজার বিশেষ বাহক মারফত তার জবাব পাঠালো:

রুথ,
তোমার খবর আমার হূদয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলেছে। এ ক্ষত আমার কখনো শুকাবে না। কিন্তু প্রথমত তোমার সুখই আমার পরম চাওয়া। আমি এসাথে তোমাকে সাতটি বাসার ছবি পাঠাচ্ছি। আজ সকালের ডাকে এগুলো পেয়েছি। আমি নিশ্চিত এগুলোর মধ্যে একটা বাসা নিশ্চয়ই তোমার মনমতো হবে।

—‘রজার।’ ·


লেখক পরিচিতি : উইলিয়াম সমারসেট মম্‌ (২৫ জানুয়ারি ১৮৭৪ – ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬৫) একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং ছোটগল্পকার। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল বিক্রিত সাহিত্যিকদের তিনি অন্যতম। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইসমূহের মধ্যে রয়েছে : ‘অফ হিউম্যান বন্ডেজ’, ‘দ্য মুন এন্ড সিক্সপেন্স’, ‘দি স্যাকরেড ফ্লেইম’।