অনুবাদ: এলহাম হোসেন

তানেলা বনির জন্ম আইভরি কোস্টের আবিদজানে। ১৯৫৪ সালে। মৃত্যু ২০২৬ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর। একাডেমিক দর্শনশাস্ত্রকে সৃজনশীল লেখালেখির সঙ্গে অসাধারণ সমন্বয় ঘটানোর জন্য তিনি বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। ফ্রান্সের তলুজের ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে তাঁর লেখাপড়া। এটি সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় নামেও পরিচিত। ওখান থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করেন। দেশে ফিরে ইউনিভার্সিটি অব কোকোডি আবিদজানে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব কোত দিভোয়ার-এর সভাপতির পদে আসীন ছিলেন। ২০০২ সাল থেকে তিনি নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ দ্য ফিউচার হ্যাজ অ্যান অ্যাপয়েন্টমেন্ট উইথ দ্য ডন প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে। নারীবাদ ও মানবমর্যাদা বা হিউম্যান ডিগনিটি তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু।

আমার গল্প কোন এক মার্চের ৮ তারিখে শুরু হয়। সবাই বলে, ৮ই মার্চ নারী দিবস। বছরের বাকি ৩৬৪ দিন নারীদের কথা মনে থাকে না। সে-দিনটাতে পাবলিক স্কয়ারে নারীরা সমবেত হয়। আমিও একটি মিছিলে অংশ নিই। আমার সন্তান ঈশা আমার সঙ্গে ছিল। আমি সাধারণত কোন বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিই না। জনসমাবেশগুলোতে শুধু অযথা তর্জন-গর্জন ধ্বনিত হয়। এ ধরনের জনসমাবেশ থেকে দূরে থাকি। স্কুলশিক্ষিকার চাকরিটা অবশ্য আমাকে জনসম্মুখে কথা বলার সাহস জুগিয়েছে। তবে নিজেকে জাহির করি না বললেই চলে। নিজে যা বিশ্বাস করি বা ভাবি, তা সাধারণত প্রকাশ করি না।

নীরব শিক্ষক বলে কিছু নেই। তবে এই নীরবতাই আমাকে পীড়া দেয় কারণ, আমি একজন রাগী মহিলা। দিনে একাধিক বার রাগ করি। ভেবে অবাক হই যে, আমার ছাত্রছাত্রীর সামনে কীভাবে নিজেকে সামলাই। আমি যে ক্লাসে বা সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সে-কথা মাঝে মাঝে ভুলে যাই।

অর্থবহ বাক্য তৈরি করি; কথা বলি। অবশ্য কথাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে আসে। নিজের ব্যাপারে কিছু বলি না। অন্যের ব্যাপারে বলি। গল্প বলতে চাই। সবকিছু ঘড়ি ধরে চলে। এখন স্কুল বন্ধ রয়েছে। ক্লাস যে কখন শুরু হবে—সে-ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। এটা নিয়ে বিরক্ত হবার কোন ফুরসত নেই। চারপাশে যুদ্ধের ডামাডোল, হট্টগোল। এসবের যেন কোন শেষ নেই। ছদ্মবেশী, মুখোশধারী উদ্বিগ্নতা এড়াতে নোটবই সঙ্গে রাখি। মাঝে মাঝে দু’একটি বাক্য লিখে রাখি। আমার সঙ্গে কী কী ঘটেছে, কী কী দেখি, কী কী শুনি—সেসব নিয়ে এবার লেখালেখি করব।

এখন প্রায় ন’টা বাজে। চত্বর জুড়ে শুধু মহিলা আর মহিলা। ওখানে উপস্থিত হলাম। প্রবেশমুখে দু’জন মহিলা। ওরা সবার উপর নজর রাখছেন। দেহরক্ষী। পুলিশ একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কোন প্রাইভেট ক্লাব থেকেও হতে পারে। মনে হলো এ কাজের পেছনে কোন যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে। যে-ই প্রবেশমুখে যাচ্ছে তাকেই ওরা তল্লাশি করছেন। ‘হ্যালো’ বলার বা সালাম বিনিময়ের কোন ফুরসত নেই। যেইমাত্র মেয়েদের দেখি ঠিক তখনই শুনতে পাই, “আপনাকে দেখে তো গর্ভবতী মহিলা মনে হচ্ছে। এগিয়ে আসুন। তল্লাশি করব।”

“আপনার কি আর কিছু বলার আছে?” আরেক জন মহিলা বললেন।

এবার ওঁরা আমার কাছে এলেন। একজন যে কাপড়টি দিয়ে বাচ্চাটির মাথা ঢেকে রেখেছিলাম সেটি সরালেন।

ওর নাম কী?

ঈশা!

ছেলেটি সুন্দর। ঘুমিয়ে আছে। আমার নাম এস্টেল। ...

আর আমার নাম ন্যানি। আমরা নিরাপত্তার দায়িত্বে আছি।

আমি তো গোলগাল মহিলা থেকে আলাদা। গর্ভবতী নই। আর না বাবা। বাচ্চাটার বয়স সবে নয় মাস। আমার শক্তিসামর্থ্য আছে। অবশ্যই। সব ঠিকঠাক। মনে যা চায় তাই পরিধান করি। নরম জামা পরলে ব্যাটনের ঘষা লাগে না। বুলেটকেও রুখে দেয়। পেটের সঙ্গে লাগিয়ে রেখেছি। প্রয়োজনে বুকটা বুলেটপ্রুফ ভেস্টের কাজ করবে। কিন্তু ব্যাপারটি পুরোই হাস্যকর। ...

“তুমি জানো আমরা কেন পোশাকের নিচে তল্লাশি করি”, ন্যানি বলেন।

“আমার কোন ধারণা নেই। সম্ভবত ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে যে, আমরা এখানে কেউ বন্দুক বা এমন কিছুই নিয়ে আসিনি যা দিয়ে কোন অঘটন ঘটানো যাবে।”

“তুমি ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছ।—এস্তেলা বললেন। তুমি তো দেখছ—বেল্টগুলো নতুন আকর্ষণীয় গেমের যন্ত্র। যে উপকরণগুলো নিয়ে বেশি আলাপ-আলোচনা হয় সেগুলোর বাইরে।”

“বেল্ট? কিসের জন্য?” বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করি।

“ওরা আমার বানানা বেল্ট দেখেছে। ওটা আমার হাতব্যাগ।”

“ঘাবড়াবে না, বলছি।” কোমরের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে এস্তেলা বলেন। আমার মনে হয় তোমার কোমরে পেন্সিল কাটার চাকু ছাড়া আর তেমন কিছু গোঁজা নেই। ধারালো বস্তুবিশেষ। নখকাটার যন্ত্র হতে পারে। ছোট ছোট যন্ত্র। তবে এটি বিরক্তিকর মানুষদের ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট। ...

“আমরা ঘরে তৈরি বোমা নিয়ে কথা বলছি যেগুলোর বাজারে বিস্ফোরণ ঘটানো যায়। রাস্তাতেও। এই খারাপ জিনিসগুলো কয়েক সেকেন্ডে শত শত মানুষকে হত্যা করতে পারে।” ন্যানি বললেন।

এস্তেল বলেন, “মহিলারা শরীরের সঙ্গে বোমা বহন করে। যাদের মাথা ঠিক নেই এবং যারা ওদের নেশাদ্রব্য সরবরাহ করে, তাদের প্ররোচনায় ওরা এসব কাজ করে। বেশ, তাহলে আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা তো তুমি জানো। এমনকি ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা পর্যন্ত এদের খপ্পর থেকে রক্ষা পায় না।

হ্যাঁ, আমি দেখেছি।

বেশ—এবার কাজের কথায় আসা যাক। ওখানে প্ল্যাকার্ড রাখা আছে। যা নেবে তা টেবিলের উপর থেকে বেছে নাও। ওখানে কাগজ আছে। কার্ডবোর্ডের টুকরোও আছে। লেখার সব উপকরণ রয়েছে। রাগ প্রকাশ করারও।

ন্যানি এগিয়ে এলেন। আমি কী করছি তা দেখতে।

“তুমি এসব লিখছ?” ন্যানি জিজ্ঞেস করেন।

নিজেকে প্রকাশ করার সময় যে ঝামেলার মুখোমুখি হই, তা জয় করার চেষ্টা করছি।

“তুমি তো হুট করে এসে পড়েছ।” ও বলল। ওদের কাছ থেকে আমি চলে যাই। সব মহিলা বিক্ষোভ প্রদর্শনের জায়গায় এসে সমবেত হলো। যারা স্পষ্ট ও জোরে জোরে কথা বলছিল তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। ন্যানি ও এস্তেলের বিপরীতে উঠোনের অপর প্রান্তে যেখানে একটি বড় আমগাছ রয়েছে সেখানে ওরা সমবেত হয়েছে।

ওরা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়।

“তুমি, তুমি তো গুপ্তচর নও, তাই না”?

এমন প্রশ্ন শুনে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলাম।

কেন?

তোমাকে আগে কখনও আমাদের কোন সভায় দেখিনি তো, তাই!

আরে বাদ দাও। ইতিমধ্যে প্রবেশপথে ওর শরীর তল্লাশি করা হয়েছে।

স্বাগতম।

ওর সহকর্মীর কথায় যে বাধা দেয় সে জানতে চায় না যে, আমি কে এবং কোত্থেকে এসেছি। সে কমিটির অন্যতম সদস্য। ভিড়ের মধ্যকার কেউ তাকে চেনে না। নারীকর্মীরা যে টুপি পরেছে আমি সেটি পরিনি। আসলে আমি তো ওদেরই লোক। এখানে ভিড়ের মধ্যে যে দলে ঢুকে পড়েছি আমি তো সেই দলের কেউ নই। এটি আমার দল নয়। আমাকে আড়চোখে লক্ষ্য করা ও আমাকে নিয়ে ফিসফাস আলোচনার শেষ নেই। আমি এখানে অপরিচিত। সবার উপর নজরদারি করছি। আমার সঙ্গে আমার সন্তান রয়েছে। এই অনিরাপদ স্থানে প্রবেশ করার পূর্বে আমার সঙ্গের বাচ্চাটাকে কারও কাছে রেখে আসতে পারলে ভালো হতো। তবুও এখানে অনেক মহিলা তাঁদের বাচ্চাগুলোর কাউকে কোলে, আবার কাউকে পিঠে করে নিয়ে এসেছে। কোন কোন বাচ্চা আমার ঈশার চাইতেও ছোট।

আমার চারপাশে ঢিলেঢালা হাতার জামা আর সফেদ স্কার্ফ পরা মহিলার ভিড়। লোকে লোকারণ্য রাস্তায় ধূপধুনার মিষ্টি গন্ধ। একটু দূরে কালো-লাল পোশাক পরা মহিলাদের দেখলাম। এবার সত্যি সত্যিই মিছিল দৃশ্যমানভাবে বড় হয়ে চলেছে। তরুণীরা যোগ দেয়। এরা সবাই সংক্ষিপ্ত পোশাক পরা। চপলা দাদিমারা ঢিলে হাতাওয়ালা ও রংবেরঙের পোশাক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এঁরাও মিছিলে যোগ দিয়েছেন। মিছিলের একেবারে মাঝখানে শরীরে ট্যাটু আঁকা কতিপয় মহিলা দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না। ওদের সাদা রংমাখা শরীরে কিছু একটা লেখা রয়েছে। কিন্তু আমি সেটির পাঠোদ্ধার করতে পারি না। আমি এখন এমন কোন ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে নেই যেটিতে বোধগম্য কিছু লেখা রয়েছে। জানি, স্কুল ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছি। এখন এমন এক জনতার স্রোতে এসে মিশেছি যেখানকার সবাই ভিন্ন কোন বর্ণমালা ব্যবহার করে।

আমার এ বিশ্বে চিহ্ন বিশ্লেষণকারীর সংখ্যা অনেক। কারণ এঁরা ঐতিহ্যের ভাষা বোঝেন। এঁরা আগেভাগে অনুমান করেন যে, রাস্তায় নগ্ন নারীর উপস্থিতি বড় কোন দুর্ভাগ্যের পূর্বাভাস। এরা চিন্তাভাবনা না করেই এমন কথা বলে ফেলেন। এভাবে মিছিলের যাঁরা দর্শক তাঁরাও দ্রুত চিহ্ন বিশ্লেষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। রাস্তার দু’পাশে এঁরা অবস্থান নেন। আনন্দের সঙ্গে পথ চলতে চলতে খোশগল্পে মেতে ওঠেন।

মিছিলে কেউ আমার মতো অপরিচিত একজনের উপস্থিতি লক্ষ্য করল না। জনতার স্রোতের সঙ্গে এগিয়ে যাই। আমরা প্রত্যেকেই মেনে নিয়েছি যে, মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে সর্বজনীন কারণে। এটিই অবশ্য একমাত্র উত্তম কারণ। জানি না, এতে ফায়দা কী। কিন্তু তবুও প্রতিদিন এতে আমরা আকৃষ্ট হচ্ছি। আমার সামনে দিয়ে যে প্ল্যাকার্ডগুলো এগিয়ে যাচ্ছে সেগুলোর দিকে তাকাই। অনেক সংগঠন, এনজিও, নানান দল যাঁরা নারীদের জীবনমান, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পেশাগত সংহতি, তাঁদের প্রতি সহিংসতা, সমাজচ্যুতিকরণ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে। দৈনিক নারীদের যত রকমের হ্যারাসমেন্ট করা হয়, তার তুলনায় বিশেষ কোন সহিংসতা তো আসলে কোন সহিংসতাই নয়। যেখানে সামান্য একটি অনিচ্ছাকৃত খটকা স্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরায় পথেঘাটে বা কর্মক্ষেত্রে বলা তুচ্ছ একটি কথা তাদের আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বকে গোপনে নিঃশব্দে হত্যা করে। যে ছোটখাটো কথা না বললেই ভালো হতো সেটি ধীরে ধীরে মনমস্তিষ্ককে গ্রাস করে; সারাটা দিন খোঁচায়। রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। আরো বাজে পরিস্থিতি হলো—এটি শরীরের উপর একটি বাজে প্রভাব ফেলে। তোমার শরীর ও মন জুড়ে যে ক্ষোভ জমে থাকে এবং তোমার দুনিয়াটাকে পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত করে দেয় তা তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে?

সবকিছু আরও বেশি বিভ্রান্তিকর মনে হয় যখন তোমার ঘনিষ্ঠজনেরা, অর্থাৎ স্বামী, বন্ধুবান্ধব, সন্তান, ভাই, বাবা তোমার কাজকে কঠিন করে তোলে।

এ জন্যই আমি আজ এখানে। আমি নিশ্চিত, এই একই কারণে এইসব তরুণী, জননী, দাদি-নানি—সবাই এখানে।

মা বলেন, “নিজের জায়গা নিজে খুঁজে নাও। ছেলেখেলার মতো যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বেই পরিষ্কারভাবে খুঁজে নাও। একে তোমার ঘুম হারাম করতে দিও না।”

এটিই আমার সাধারণ হেতু, কারণ জীবন একটা জালের মতো আমাদের জড়িয়ে ধরে। নিজের একটা জায়গার অন্বেষণে আমরা সংহতির গান গাই, ভেদাভেদ যাই থাক না কেন।

গান গাই। এটি ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে মলম লাগিয়ে দেয়। শেষ কবে গান গেয়েছিলাম সে-কথা আমার মনে নেই। জোরে জোরে যে কবে গান গেয়েছিলাম, তা ভুলেই গেছি। নিজের চারপাশে যে হট্টগোল চলছে, তা চোখে না পড়লে গান গাইতে পারতাম। এই হট্টগোল বারবার আমাকে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করে।

পাতিল, ক্যালাবাশ, কাঠের খুন্তি ও অন্যসব উন্নত উপকরণ নাচগানে ঢুকে পড়ে। সঙ্গ দেয়। মাইকে স্লোগান ধ্বনিত হয়। এরপর সংগীত বজ্রের মতো গর্জে ওঠে। তারপর তুঙ্গে থাকা হট্টগোলের শব্দ ভেদ করে প্রথম গুলির শব্দগুলো আনন্দের পরিবেশকে খান খান করে ভেঙে দেয়। কেউ জানে না এই কর্ণবিদারী শব্দ কোত্থেকে আসে। সঙ্গে আসে নরকের বাজে গন্ধ। মিছিলের নেতৃত্বদানকারীর মুখে টিয়ারগ্যাস স্প্রে করা হয়। এটি আমাকে অতীত স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় যখন সব স্কুল একসঙ্গে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিল। এবার সব মহিলা রাস্তায় নেমে এসেছে। আন্দোলনকারীদের শাস্তি দেবার পন্থা বদলায়নি। বছর বছর একই থাকে। এ পৃথিবীতে কোন শান্তিপূর্ণ সমাবেশকেই সহ্য করা হয় না। টিয়ার গ্যাস বোমা হলো এর প্রতি প্রথম প্রতিক্রিয়া। এরপর শীঘ্রই সেখানে মারণাস্ত্রের অবতারণা ঘটে।

কতিপয় মানুষ হতাহত হলো। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। এরপর শুরু হলো ছোটাছুটি। একটু পরে স্পিকার বন্ধ হয়ে গেল। প্রাণবায়ু শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। কেউ তো আর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিমুক্ত নন। অতি উৎসাহী কয়েকজন গুলির শব্দের তালে তালে স্লোগান দিতে লাগল। বন্দুক, সাবমেশিনগান গর্জে ওঠে। অবশেষে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। র‍্যালিটি পার্টির মুডে পৌঁছার পূর্বেই অপরিকল্পিতভাবে ভেঙে যায়। একটি ব্যর্থ উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে হট্টগোলের মধ্য দিয়ে।

সাংবাদিকরা আসেন। সহিংসতার কিছু ছবি তোলেন। গুলির মুহুর্মুহু শব্দের ফাঁকে ফাঁকে নারীরা সাহস করে কথা বলেন। চিৎকার করে কাঁদেন, অশ্রুপাত করেন। একটি জাফরিকাটা ছায়া আমার সামনে দিয়ে পার হয়ে যায়। ইতিমধ্যে অপর পাশ থেকে এপাশে এসে পড়েছি। যত দ্রুত সম্ভব দৌড় দিই। সুন্দর একটি ভোরের স্বপ্নকে তাড়া করে ছুটে বেড়াই। ঈশা এই নগ্ন নাটকের কিছুই বুঝতে পারেনি। ও এবার প্রশান্তির ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আমাকে বাস্তব এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। জানতে চায় ও এখন কোথায়। মেঝেতে নেমে খেলা করতে চায়। হামাগুড়ি দিয়ে। হাত-পা ছড়িয়ে চলতে চায়। গত কয়েক সপ্তাহে ও এসব শিখেছে। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ওকে পিঠে নিলাম। ও হাত-পা ছুড়তে লাগল। গোটা এলাকা ঘিরে ফেলা হলো। জানি না কোথায় যাব। ·