প্রপিতামহ মৃত্যুর সময় দাদাকে ক্ষুদ্র সোনার পাতখচিত একটি ভোজালি উপহার দিয়েছিলেন।

তখন সন্ধ্যা।

প্রপিতামহের মুখে তারই একফালি ছায়া এসে তাকে করে তুলেছিলো বিবর্ণ, ক্লিষ্ট। যেন তিনি জিজীবিষু, এরকম ভাবে সেই ছায়াচ্ছন্নতার মধ্যেও তার চোখ ঠিকরে আলো বেরোতে চাইছিলো।

ততক্ষণে প্রাণের মধ্যে তার ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে।

অতি নিভৃতে প্রাণের একদম তলায় চিরজীবন লুকিয়ে রাখা ভোজালি দাদার সামনে মেলে ধরলে বিস্ময়ে দাদার কণ্ঠ থেকে শব্দ শুকিয়ে যায়। এই সংসারে এই জিনিস জীবনে তিনি দেখেননি।

প্রপিতামহ এই ভোজালি সম্পর্কে যে ইতিহাস বৃত্তান্ত করেন, তা অনেকটা এরকম—

ভোজালিটা প্রপিতামহের জমিদার পিতার, তখন শীতকাল, চারপাশে ছিরিবিরি কুয়াশা, প্রপিতামহের জমিদার পিতা বয়সে তরুণ। তাঁর মাতা বিল পার হয়ে দূর গাঁয়ে নাইওরে গিয়েছেন। শীতকালের সন্ধ্যার কুয়াশা সবে যখন বিলের ওপর জুৎ মতো আসন পেড়ে বসতে চাইছে তখন কী এক অজানা কারণে মাতার বহরহীন নিঃসঙ্গ নৌকা একাকী জমিদার বাড়ির দিকে আসতে থাকে। নৌকার চারপাশের ছাউনি বহুবর্ণ কাপড়ে মোড়ানো। প্রপিতামহের জমিদার পিতা সন্ধ্যার বাতাস টানতে প্রাসাদের ছাদে এসে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে যান, দেখেন, মায়ের নৌকায় বিলের মাঝামাঝি স্থানে ডাকাত পড়েছে।

তুখোড় জোয়ান জমিদার পিতা এই ভোজালি দিয়ে কী করে একাই সেই এলাকার বিখ্যাত ডাকাতকে হত্যা করে নিজ মাতার সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলেন, এই ভোজালি তারই স্মৃতি বহন করে আছে। প্রপিতামহের জমিদার পিতা মৃত্যুর সময় বংশপরম্পরায় এই ভোজালিটাকে সংরক্ষণ করার জন্য প্রপিতামহকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

মা, তোমার বুকে ওটা কী?

ঘরে ফেরার পর মেয়ের এই প্রশ্নে প্রপিতামহের জমিদার পিতার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসি।

মেয়েকে বলি, সোনার মাকড়সা।

সে কাছে এসে খুঁটে পরীক্ষা করে, এতো দেখছি একটা লকেট, আবার মাকড়সাও, দিব্যি সোনার।

মেয়েকে নিয়ে বিছানায় গাঁট হয়ে বসেছি, সে আমার কাঁধারে মুখ রেখেছে, তক্ষণি গলি ঘুপচির ফাঁক ফুঁড়ে শিশু চৈত্রের বাতাস এলো, একটু অসংলগ্ন, কিছুটা উদাসীন কণ্ঠে বলি, জানিস, আজ রমনার ফুটপাত ধরে হেঁটে আসছি, মাথায় উড়ে পড়লো সারিসারি তেঁতুল পাতা, চমকে বুকের দিকে তাকিয়েছি, দেখি ওমা, একটি জ্যান্ত মাকড়সা, বুঝলি তক্ষণি কোথেকে ভেসে এলো কাঁঠাল চাঁপার গন্ধ, সেই বাতাসে, সেই গন্ধে আমি স্পষ্ট দেখি এ যেন ঠিক রমনার ফুটপাত নয়, এ যেন এক অজানা অচেনা গহীন জঙ্গল। আমার আঙ্গুলগুলো হয়ে উঠলো আশ্চর্য সোনালি, আমি মৃদু হাতে বুক থেকে সরাতে যাবো মাকড়সাটাকে, কী অভূতপূর্ব ঘটনা, সে সোনার, সে প্রাণহীন, স্থির হয়ে গেলো!

মেয়ে বিছানায় হেসে গড়িয়ে পড়ে, এতো স্বপ্ন বানাতে পারো তুমি মা!

স্বপ্ন বানানো?

না, মিথ্যে বানানো? এ-তো প্রপিতামহের গল্প থেকেই শুরু হয়েছে। ভাবতে ভাবতে আসমান নদী এক হয়ে যায়। ডুব দিই সেই নিঃসীম পাঁকের মধ্যেই।

তারপর?

তারপর,
দাদার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। বাবারা এক ভাই সাত বোন। সবাই তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। রাত্রির শেষ প্রহরের সময়ে জমেছে মিশমিশে আঁধার। দাদা সবাইকে ইশারা করলেন সরে যেতে, শুধু বাবাকে ছাড়া। সবাই সরে গেল, এমনকী দাদিও, দরজা ভেজিয়ে বাবা দাদার অতি নিকটে বসলেন, দাদার কপাল থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে রাজটিকা, প্রত্যহ নামাজের মাধ্যমে তিনি এই ছাপ অর্জন করেছেন। শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছিলো তাঁর, সব চেকনাই পরমুহূর্তে ডুবে যায় গাঢ় বিষণ্ণতায়। দাদা সেই লণ্ঠনের আলোয়, যেন মখমলের চাদর নয়, রঙধনুর তলা থেকে তুলে আনলেন ভোজালি, মেলে ধরলেন লণ্ঠনের আলোয়, এ আমার প্রপিতামহের ঐতিহ্যের, বীরত্বের স্মৃতি। এ দিয়েই তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যা, মাতার ইজ্জত রক্ষা করবে। এরপর কখনো শ্বাস টেনে, কখনো ফ্যাসফেঁসে কণ্ঠে তিনি যা বর্ণনা করেন তা সংক্ষেপ করলে এই দাঁড়ায়—বজরায় চড়ে সাতদাসীসহ প্রপিতামহর মা সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসছিলেন, তখন এই দেশে ব্রিটিশদের শাসন, বজরা দেখে তৎকালীন লর্ড নির্দেশ দিলেন বজরা থামাতে। খবর পেয়ে তরুণী মায়ের আক্রু রক্ষার্থে ছুটে এলেন কিশোর প্রপিতামহ। তিনি টের পেলেন লর্ড-এর চোখে খারাপ ইঙ্গিত, তক্ষণি তিনি এই ভোজালি বসিয়ে দিলেন লর্ড-এর বুকে।

আমার দিন পড়ে গেছে, মৃত্যুর সময় দাদা কাঁদছিলেন, জমিজমা কিছু ধরে রাখতে পারলাম না, এই ভোজালিটা, একমাত্র এইটাই আমাদের পূর্বপুরুষদের...।

মা, মাকড়সাটা তোমার সঙ্গে কথা বলে?

মেয়ের প্রশ্নে হেসে ফেলি, এ-কি জ্যান্ত যে কথা বলবে?

জ্যান্ত মাকড়সা মানুষের সাথে কথা বলে বুঝি?

এইবার ফাঁদে আটকা পড়ি, কিচ্ছু যখন জবাব খুঁজে পাচ্ছি না মেয়ে আমাকে উদ্ধার করে অন্য পাঁকে নিয়ে ফেলে, জানো মা, আমার ক্লাসের এক বান্ধবী বলছিলো ওদের পূর্বপুরুষ ধোপা ছিলো বলে ওর বোনের ভালো বিয়ে হচ্ছে না, মা পূর্বপুরুষ কী?

আমি ওর মন ঘোরাতে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাই; যেটাই কিনতে বলি, বলে পড়া হয়ে গেছে।

শিশু পার্কে যাবি?
না।
ফুটপাতে বসে চা খাবি?
না।
ঝিঙ্গুর পাখি দেখবি?
সেটা কেমন মা?
ইয়া বড় লেজ, মুখটা টিয়ে পাখির মতো, লেজটা ময়ূরের, ডানা দুটো শিম্পাঞ্জির, ভারি অদ্ভুত।

এরপর বনে ঢুকে গাছ দেখাই, অশোক, নাগলিঙ্গম, মায়ানিন, মেয়ে ক্লান্ত হয়ে পুকুর ঘাটে বসে পড়ে, তুমি আমাকে ঝুটমুট ঘোরাচ্ছ মা, এও তোমার এক মিথ্যে স্বপ্ন দিয়ে বানানো।

আমি হেসে বলি, এই জায়গাটা কত ছায়াচ্ছন্ন, ঝিঙ্গুরের কথা না বললে তুই কি আসতি? মন থেকে ঐ পাখির স্বপ্ন মুছে দেখ এসে লাভ হলো না ক্ষতি হলো?

মেয়ে গম্ভীর।

আমি বলি, ঝিঙ্গুর হলো ঝিঁঝিঁ পোকা, সে-তো তুই দেখেছিসই, যে গাছগুলো কখনো দেখা হয়নি সেগুলো না হয় দেখ।

মা পূর্বপুরুষ কী?

কী যে সমস্যা হয়েছে মেয়েটাকে নিয়ে। এমন সব প্রশ্ন করে যার উত্তর অন্য যে কারোর জন্য হয়তো সহজ, আমার মধ্যে মিশ্র জটিলতার সৃষ্টি করে। সেদিন প্রশ্ন করলো, আমার বাড়ি কোথায়?

আমি বললাম, শিবপুর।
তোমার বাড়ি কোথায়?
ধারাগঞ্জ।
তোমার বাড়ি ধারাগঞ্জ হলে আমার শিবপুর কেন?
ওটা তোর বাবার বাড়ি!
তোমার বাড়িও আমার বাড়ি নয় কেন? আমি তো তোমার পেট থেকে জন্মেছি।

সে অনেক ঝামেলার, একজন মানুষের দুটো বাড়ির পরিচয় থাকে না।
একজন মানুষের একজন মা, একজন বাবা, এই দুটো পরিচয়ে কোনো ঝামেলা হয় না? সেই জন্যই তো শুধু বাবার পরিচয় থাকে সবখানে।
কিন্তু আমি যে তোমার পেট ফেটে বেরিয়েছি, বাবা আমার কে?

কী করে এই মেয়েকে পুরুষের ভ্রূণ, একজন সন্তানের জন্মের সাথে মা-বাবার পারস্পরিক প্রয়োজনীয়তার ইতিবৃত্তান্ত বোঝাই? হাল ছেড়ে বলি, আরেকটু বড় হ সবে তো ছয় ক্লাস পড়ছিস!

এখন প্রশ্ন করছে পূর্বপুরুষ কী? এর উত্তর খুঁজতে ভেতরে ভেতরে মৃত বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।

বাবা আমার মারা গেছেন হঠাৎ। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। সুস্থ মানুষ ঘুমোতে গেলেন আর উঠলেন না। ততোদিনে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে স্বামী চলে গেছে বিদেশে। আমি কঠিন সিদ্ধান্তে অনড়, আর সন্তান নেবো না। ভোজালি নিয়ে তাই বাবার মধ্যে কোনো আয়োজন ছিলো না। আমি এক মেয়ে। বাবার কোনো পুত্র সন্তান নেই। আমারও কোনো পুত্র সন্তান হয়নি। বাবা জেনে গেছেন আর হবেও না।

ভোজালিটা তাই একসময় পূর্ব-পুরুষদের মখমলি রহস্য থেকে বেরিয়ে আলোর মধ্যে এসে পড়লো। জিনিসটা পুরনো, তবে কত পুরনো আন্দাজ করা কঠিন। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে বাবাও তাঁর পূর্ব-পুরুষদের মতোই নির্ভীক বীরত্বের কাহিনী ফেঁদেছেন। তবে সময় অনেক গড়িয়ে যাওয়ায় তা আরও জমকালো হয়েছে। বজরা হয়েছে সোনার, লর্ড রূপান্তরিত হয়েছে ভিনদেশি সশস্ত্র সওদাগরে, আপসহীন সেই জমিদার পূর্ব-পুরুষের সে-কী তেজী রূপ! শুনতে শুনতে চোখে স্বপ্ন নেমে এসেছে। প্রশ্ন করেছি, ভোজালির সোনার পাতগুলো কোথায়?

বাবা বলেন, আমার আব্বা যখন আমার হাতে এটা তুলে দেন, তখনই দেখিনি, হয়তো চুরি হয়ে গিয়েছিলো। আব্বা পরে এর মধ্যে রূপোর পাত বসিয়েছেন। উল্টে-পাল্টে দেখি, রক্তের মধ্যে স্পন্দন ওঠে।

আমি জানি, বাবার গুরুতর বেদনাটা কী। এই ভোজালি আমার কাছে দিয়ে যাওয়া মানে আমি একসময় আমার কন্যা সন্তানের হাতে সেটা তুলে দেবো। আমার কন্যা তো আমার পিতার উত্তরসূরী নয়। এমনকী আমিও কেমন বিভক্ত, কিছুটা বাবার, কিছুটা স্বামীর। বাবার এখানটায় এসেই তাঁর পূর্বপূরুষের স্রোতস্বী জল ডোবা হয়ে একপর্যায়ে শুকিয়ে গিয়েছে।

আদ্যোপান্ত খুঁজি।

পূর্ব-পুরুষের কাহিনী। মেয়েকে কী করে বোঝাই কন্যা সন্তানের কাছে এসে কীভাবে পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্য মার খায়। যেহেতু মার খাচ্ছে, সেহেতু এই বিষয়ে আমার অন্ধ কোনো মোহ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কখনো ডাকাত, কখনো লর্ড, কখনো সওদাগর একটি কাহিনীর এতো রূপ কেন? পূর্ব-পুরুষের ভিটেতে গিয়ে নানাজনকে প্রশ্ন করেছি। কেউ এই বিষয়ে কিছুই জানে না, যারা জানে, বাবাদের বর্ণিত কাহিনীই তাদের মধ্যে গেঁথে আছে। ধুলোয় একসা হয়ে ভোজালিটা পড়ে আছে তাকের ওপর। একসময় জাগতিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কাজের এত ধরন, এত প্যাঁচ, এইসব ভোজালি, ঐতিহ্য নিয়ে ভাবার অবসরই হয় না। অফিস থেকে ফিরে মেয়েকে নিয়ে বসি। ওকে পড়াই, ঘরের মেঝে পরিষ্কার করি। আমার ভেতর থেকে ভোজালি, পূর্ব-পুরুষ সংক্রান্ত কৌতূহল একসময় মুছে যেতে থাকে।

স্বামী চিঠি লেখে, চাকরিটা যেন ছেড়ে দিই, কী হবে এত কষ্ট করে? আমি পাল্টা উত্তর দিই, তুমিই বরং চলে আসো, এসে একটা কিছু করো। কী হবে এতো কষ্ট করে?

আমাদের পারস্পরিক সহমর্মিতা এই জায়গায় এসে স্থির হয়ে থাকে, আর এগোয় না। জীবন অনেক কঠিন, স্বামী চিঠিতে লেখে।

আমি লিখি, সে কী আমি কম বুঝি? নিঃসঙ্গতা রাক্ষসের মতো হাঁ করে থাকে, কোনদিন যে গিলে খাবে!

তোমার ওপর অনেক বিশ্বাস আমার—স্বামীর এই কথার রেশমী ফাঁদ বড়ো ভয়ঙ্কর, আটকা পড়ে থাকি।

একদিন আমার বাবার ভিটে থেকে অদ্ভুত এক লোক আসে।

কী রকম বাঁকা, ভঙ্গুর, জবুথবু। চোখ কোটরাগত। দাঁত নেই। বয়স একশোর বেশি হবে। সে জানায়, বংশপরম্পরায় তারা আমার বাবাদের দাস ছিলো। আমি একটি সত্যি বিষয় জানার জন্য ভিটে তোলপাড় করেছি, বিষয়টি তার কানে গেছে। সে এই বিষয়ে তার পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে এমন কিছু নির্মম সত্য জানে, যা তারাও বংশপরম্পরায় গোপন রেখে আসছে। আমি যদি সত্যিটা জানার সৎ-সাহস রাখি, তবে সে বিষয়টি আমাকে বলবে। তার এক পা কবরে চলে গেছে, একটি মিথ্যা যুগ যুগ প্রতিষ্ঠিত থাকুক, এটা সে চায় না।

আজব এক দোবজা পরিহিত কিস্তৃত চেহারার লোকটিকে দেখে আমার অদ্ভুত লাগতে থাকে। এই লোকটিকে দেখে অন্য এক দোলাচল, বংশানুক্রমে সে একটি প্রদীপ হয়ে এখনও পূর্ব-পুরুষের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে, এই সমাজে আমার চেয়ে সে অনেক মূল্যবান।

সে আমার সম্মুখে উপবিষ্ট হয়।

এরপর সে যা বর্ণনা করে—
আমার সেই জমিদার প্রপিতামহের ছিলো ভয়ানক নারীঘটিত দোষ। এই বিষয়ে তিনি এমনই ভয়ানক খাদক ছিলেন তাঁর ভয়ে ত্রিসীমানায় কন্যা জন্ম দিয়ে পিতামাতারা ডুকরে কেঁদে উঠতো। অঞ্চলের সব নারীই একে একে অস্পৃশ্যায় রূপান্তরিত হতে থাকে। জমিদারের মাতা সব দেখে শুনে একদিন তীব্র রোষে জ্বলে উঠলেন।

একদিন।
প্রাসাদের নিকটস্থ বিল দিয়ে কাপড় আবৃত নৌকা যাচ্ছে দেখে জমিদার ডাক দিলেন, নৌকা ঘাটে ভিড়াও।

মাঝি নির্বিকার নৌকা টেনে যাচ্ছে। জমিদার তখন ঘোর মাতাল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তিনি বজরায় চেপে সেই নৌকায় উঠে বসলেন, এরপর মাঝিকে এক ঝাপটায় নদীতে ফেলে ছইয়ের ভেতর প্রবেশ করলেন। এ-কী! নৌকায় সুসজ্জিতা কে উপবিষ্ট, এ যে তাঁরই স্নেহাতুর জননী।

ততক্ষণে তিনি মায়ের ঘোমটায় টান দিয়ে ঘোমটা নিচে টেনে ফেলেছেন। হাহাকার করে কেঁদে উঠলেন মা, তোর এতো ক্ষিদে! খা আমাকে খা!

ঘরে ফিরে টলতে টলতে সেই ঐতিহাসিক ভোজালি জমিদার নিজের বুকে বসিয়ে দিলেন।

মুহূর্তের মধ্যে আমার ভেতর থেকে যুগের পর যুগ ঘটে যাওয়া আমার পূর্ব-পুরুষদের মৃত্যুদৃশ্য হাস্যকর হয়ে ওঠে। এই ভোজালিটা সম্পূর্ণ অর্থহীন নয়, কেননা এর মাধ্যমে একটি প্রায়শ্চিত্ত সংঘটিত হয়েছিলো। কী আশ্চর্য মানুষের নিজেকে বংশানুক্রমে মহান করার লোভ! একটি কুখ্যাত ঘটনাকে ঢাকার জন্য ভোজালিটাকে মাটিচাপা দেয়ার বদলে প্রত্যেক বংশধরের কাছে একেকজন এটা অর্পণ করে গেছেন আত্মরক্ষার প্রতীক হিসেবে।

পূর্ব-পুরুষদের ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে বিষ জমাছিলো বুকে, তা সরিয়ে আমার নিজস্বতার জন্য উল্টো অহংকারী হয়ে উঠি।

সেই ধূলোমাখা ভোজালিটা যখন আমি নদীর জলের মধ্যে ছেড়ে দিচ্ছি তখন চারপাশে হাওয়া।

আমার মনটা হয়ে ওঠে আশ্চর্য ফরশা এবং নির্ভার। মেয়েকে বলি, পূর্ব-পুরুষ কী, সেটা তোকে না হয় পরে বোঝাবো, তার আগে জেনে রাখ তোর কিংবা আমার কারোর পূর্ব-পুরুষ নেই। এইখানে এসেই জলের ধারাটা কেমন ঢেউ খেয়ে গেছে।

মেয়ের চোখ বড় বড়। কিছু বুঝছে না, হাঁ হয়ে আছে।

তুমুল হেসে বলি, আমরা তবে কী? এই যে দেখছিস না আমার লকেট, দেখতে কিছুটা লকেট, কিছুটা মাকড়সা, আবার সোনার কিন্তু বুঝলি, আমরা সেই লকেট, বংশপরম্পরায় বিভিন্নজনের গলায় দোল খাচ্ছি, সৌন্দর্য বাড়াচ্ছি—বলতে বলতে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ·