গল্পটা স্ত্রীশক্তি নিয়ে, তবে বলেছিলেন একজন পুরুষ। অদ্ভুত-অদ্ভুত সব গল্প জানা ছিল তাঁর। তিনি লোকটি ছিলেন অনেকটা সেই 'সুরজ কা সাতোয়াঁ ঘোড়া-র মানিক মুল্লার মতো। তবে তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা আমরা কখনো তাঁর মুখে শুনিনি। তিনি বলতেন, গল্প নাকি তিনি জোগাড় করেন—হাটবাজার, চায়ের দোকান, ফুটপাথের কোনা, আস্তাকুঁড় এইসব জায়গা থেকে কুড়িয়ে-কুড়িয়ে নানারকম গল্প জমা হয়েছিল তাঁর সংগ্রহে। তিনি যখন গল্প শোনাতে বসতেন, তাঁর পাশে রাখা থাকত মস্ত একটা চটের ঝোলা। গল্পের মাঝে মাঝে সেটা দেখিয়ে তিনি বলতেন, এই অংশটা পেয়েছি একটা ঠোঙা থেকে, ওটা পেয়েছি একটা রাক্ষসের গল্পের ছেঁড়া পাতা থেকে, এইসব। আমরা জানতাম, এগুলো সবই বানানো কথা। তবে কিনা গল্প জিনিসটাই তো বানানো; তাই তাঁর ওই মিথ্যে ভণিতা নিয়ে আমরা ততটা মাথা ঘামাতুম না। গল্পই আমাদের টেনে আনত তাঁর ঘরে; আর গল্পের আঠাতেই সেঁটে যেত আমাদের ডানা।

তা যা-ই হোক, এই গল্পটা তিনি শুরু করেছিলেন এইভাবে: এক বুড়ি মায়ের দুই মেয়ে ছিল। তারা ছিল খুবই গরিব আর মেয়েদুটি ছিল বড়োই কালোকুচ্ছিত। রোজ সকালে তারা বনজঙ্গল থেকে কাঠকুটো কুড়িয়ে আনত, আর তাদের মা সেগুলো হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত। এই ছিল তাদের জীবন আর জীবিকা।

মেয়েদুটির মনে একটুও সুখ ছিল না; কারণ তারা জানত, বিয়েটিয়ে তাদের কোনোকালেই হবে না। তাদের ধনদৌলত নেই, আর দেহে রূপ তো নেই-ই। তো কে বিয়ে করবে তাদের। মেয়েদের মা-ও সেটা জানত। সে মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলত, আমি চোখ বুজলে তোরা শুকিয়ে মরবি আর শেয়াল-শকুনে ছিঁড়ে খাবে তোদের।

এই ভয়ানক অভিশাপের কথা শুনে মেয়ে দুটির খুব কান্না পেত। কিন্তু তাদের রাগি মা আবার কান্নাটান্না একদম দেখতে পারে না। এমনকী মা যখন হাটে গেছে, সেইসময়ও যদি মেয়েদুটি লুকিয়ে একটু কেঁদে নিত, তাদের মা ঠিক ধরে ফেলত ঘরে ফিরে। বুড়ি মা বলত, কান্নার একটা গন্ধ আছে; ঘরে কেউ কাঁদলে ঘরময় সেই গন্ধ লেগে থাকে। মেয়েদুটিকে তাই কাঁদতে হতো বনে গিয়ে, গাছতলায় বসে। গাছ, কাঠবেড়ালি আর পাখিটাখিরা তাদের কান্না শুনত। কোনো-কোনোদিন একটা হরিণও হয়তো খানিক দাঁড়িয়ে যেত তাদের কান্না শুনে। বনের গাছপালা, পশুপাখিরা জানত, মেয়েদুটি বড়োই দুঃখী, ইচ্ছেমতো কাঁদার সুখটুকুও তাদের নেই। গাছ বা পশুপাখিরা তাই কিছু মনে করত না, মাঝে মাঝে শুধু নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত, মানুষগুলো দেখছি বড় কাঁদুনে হয়—এত যে কিসের কান্না বুঝি না, বাপু!

তা যা-ই হোক, শহরের লোক এখন এত বেশি গাছপালা কেটে নিয়ে যাচ্ছে যে, বনে কাঠকুটো আর পাওয়াই যায় না। শুকনো ডালপাতা খুঁজতে খুঁজতে মেয়েদুটি সেদিন অরণ্যের বেশ গভীরে চলে এসেছে; আর মস্ত চওড়া একটা গাছ দেখে তার ছায়ায় বসে কাঁদা আরম্ভ করার আগে একবার ভেবে নিচ্ছে, বা রে, এরকম গাছ তো আগে দেখিনি!

তা মেয়েদুটো ভুল কিছু ভাবেনি। ওই গাছ সেই অরণ্যে একটাই ছিল আর বনের সকলেই জানত, ওই বৃক্ষ অন্তরে খুবই সহৃদয়, কিন্তু স্বভাবে বড় রাগি—কোনোরকম অনাচার তিনি সহ্য করতে পারেন না। সকলে তাই সেই বৃক্ষকে ভয় পেত, আবার সমীহ-ও করত। শোনা যায়, অনেক কাল আগে একটা জোয়ান ছেলে আর তার বউ—

গল্প যিনি বলছিলেন, এইসময় তিনি হঠাৎই যেন রিমোট কনট্রোলে চলমান গল্পটিকে থামিয়ে দিলেন, তারপর বললেন, না, ও-গল্প পরে হবে; এখন দুঃখী মেয়েদুটোর গল্পই চলুক।—এই বলে তিনি যেন রেকর্ড প্লেয়ারে ফাস্ট-ফরোয়ার্ড চাবি টিপে দিলেন। বরবউয়ের গল্প হু-হু করে চলে গেল; ঘরঘর শব্দ ছাড়া আমরা কিছুই শুনতে পেলাম না। তারপর আবার যখন প্লে চালু হলো—

মেয়েদুটি গলা জড়াজড়ি করে কাঁদছে আর বলছে, আমাদের কী হবে, ভাই! আমরা কি সারাজীবন কাঠকুড়োনি হয়েই থাকব, মাগো।

এই বলে তারা একেবারে গলা ছেড়ে কান্না শুরু করে দিল। আমরা শুনতে পেলাম, দুটি পৃথক স্বর যে-যার নিজের মতো করে বেজে যাচ্ছে; কোনো অনুনাদ সৃষ্টি হচ্ছে না। কান্না ঝরে ঝরে মাটিতে মিশে যাচ্ছে, কিছু কিছু বাষ্প হয়েও উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। আর তারপরই আমরা শুনতে পাই এক বিকট গম্ভীর আওয়াজ। কথক—না, কথক না বলে মাস্টারই বলি; আমরা তাঁকে আড়ালে বলতাম, ম্যানেজমাস্টার, আর সামনে শুধুই মাস্টার। তা মাস্টার বললেন, মেয়েদুটির কান্না শুনে বৃক্ষের অন্তর মথিত হয়েছে, তিনি এখন জানতে চান, কাঁদে কে? কাঁদেই বা কেন?

সেই বৃক্ষ যে খুবই কোমলমনা ছিলেন, তা তো আমরা আগেই শুনেছি। মেয়েদুটির দুঃখের কথা শুনে তাঁর হৃদয় যেন বিদীর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু স্বভাবে তিনি খুবই রাশভারী; তাই মনের তরল আবেগকে জমিয়ে কঠিন করে নিয়ে তিনি বললেন, বেশ, আমি দুটো বর দিচ্ছি—আর তোদের কেঁদে মাটি ভেজাতে হব না।

এই বলে বৃক্ষ পট করে একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে ছোটো মেয়েটিকে বললেন, আজ রাতে এই পাতাটা পেটকাপড়ে নিয়ে তুই শুয়ে থাকবি—তাহলেই তোর নিম্নাঙ্গে এক আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ হবে।

এরপর তিনি তার উঁচু ডাল থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে এনে বড়ো মেয়েটিকে দিয়ে বললেন, আজ রাতে তুই এই ফুলটা বুকের ভেতর নিয়ে শুয়ে থাকবি—তাহলেই তোর ওই শুকনো বুকদুটি ফুলের মতো ফুটে উঠবে।

মেয়েদুটি একসঙ্গে বলে উঠল, তারপর?

বৃক্ষ বললেন, তারপর আর তোদের ভাবনা নেই। রাজপুত্তুরের মতো বর হবে, ঘরসংসার হবে, ছেলেপুলে হবে—হবে, হবে, সব হবে—

এই বলে বৃক্ষ ঠিক সেই ভূতের রাজার মতো ধোঁয়া হয়ে গাছের ভেতর মিলিয়ে গেলেন। আর মেয়েদুটি—তারা তো আহ্লাদে মরে যায়! তাদের ইচ্ছে, এখনই সূর্যটা ডুবে যাব, ঝুপ করে রাত নেমে আসুক, আর হুস করে ফুরিয়ে গিয়ে আবার ভোর হয়ে যাক।

কিন্তু তা তো আর হবার নয়। দিনরাত যে তাদের নিজেদের নিয়মেই চলব, এ-কথা সকলেই জানে। মেয়েদুটিকে তাই পরের দিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হলো। অনেকক্ষণ জেগে থেক থেকে শেষরাতে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। ছোটো মেয়ের ঘুম ভাঙল এক আশ্চর্য সুন্দর ঝাঁঝালো গন্ধে। বড়ো মেয়ে উঠে বসতে গিয়েই টের পেল, তার বুকদুটি কেমন ভারী ভারী লাগছে—জামায় যেন আঁটছে না। 'বোন রে' বলে এ-ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।

টানা বলে যেতে যেতে মাস্টার এইখানে এসে এবার থামালেন। তারপর বললেন, মানুষ আনন্দে-রোমাঞ্চে কেঁদে থাকে, আমরা জানি। মেয়েদুটিও তাই একবার কেঁদে উঠল। আমরা হয়তো ভাবছি, ওদের দুঃখের জীবন এতদিনে শেষ হলো, আর ওদের কষ্টে অশ্রুপাত করতে হবে না। কিন্তু বন্ধুগণ, সেই রোমাঞ্চিত সকালে ওই দুটি মেয়ের জীবনে যন্ত্রণার আরও এক নিদারুণ অধ্যায় শুরু হলো, বলা যেতে পারে। আমাদের কাহিনিও তাই এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। এই অধ্যায়ের একটি শিরোনাম প্রয়োজন। তোমরা কী বলো?

আমরা কেউ বললাম, পুনর্জীবন; কেউ বলল, দ্বিতীয় জন্ম। তিনি হাত নেড়ে বললেন, ধুস! আমি এই অধ্যায়ের নাম দিয়েছি: শেয়ালশকুন।

আমরা সমস্বরে বললাম, সে আবার কী! এমন বেখাপ নাম দিচ্ছেন কেন?

মাস্টার বললেন, সেটা গল্প থেকেই জানতে পারবে। শোনো—এই বলে তিনি আবার গল্প শুরু করলেন।

শেয়ালশকুন 
মেয়েদুটি তো এ-ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে আর বলছে, বোন রে, আর যে ঘরে মন বসে না! বড়ো বোন ছোটোকে বলছে, তোর গন্ধটা আমাকে দে না ভাই। ছোটো অমনি বড়োকে বলছে, তোর বুকটা আমাকে দিবি, বল।

আর তারা দু-জনে হি হি করে হাসতে হাসতে একেবারে গড়িয়ে পড়ছে। এমন সময় তাদের বুড়ি মা 'এত হাসি কীসের শুনি'—বলতে বলতে ঘরে ঢুকে যেই বলেছে, 'একটা গন্ধ পাচ্ছি যেন'—দুই বোন ভয়ে একেবারে কাঠ।

তারা জানে, তাদের মায়ের খুব নাক, তারা ঘরে কাঁদলেও মা গন্ধ পেয়ে যায়। ছোটো মেয়ের এমন নেশা-লাগানো গন্ধকে তারা এখন লুকোয় কেমন করে! দুই বোন যত বল, 'কই, গন্ধ নেই তো!'—বুড়ি অমনি নাক দিয়ে হাওয়া টেনে নিয়ে বলে, 'নাঃ, একটা কেমন গন্ধ পাচ্ছি যেন।'

এই বলতে বলতে বুড়ির চোখ পড়েছে বড়ো মেয়ের দিকে। আর খপ করে মেয়ের বুকে একবার হাত দিয়েই সে বসে পড়েছে—'খেয়েছে রে!' বলে।

মেয়েরা তো ভেবে পায় না, কে খেল, কা-কেই বা খেল। তারা যত বলতে যায়, কিচ্ছু হয়নি মাগো, আমরা এক্ষুনি কাঠ কুড়োতে যাচ্ছি।—বুড়ি তত ডাক ছেড়ে বলে, ওরে আমার মেয়ের কী হলো রে—

বলতে বলতে বুড়ি যেই ছোটো মেয়ের গায়ে ঢলে পড়েছে, তার চিৎকার গেল থেমে। তারপর নাকের ফুটো দুটো যেন গুহার মতো হয়ে উঠল। ঘরের সব বাতাস যেন সে শুষে নিল নাকের রন্ধ্র দিয়ে; তারপর ছোটো মেয়ের নিন্মোদরে নাক ঠেকিয়েই একেবারে কাটা গাছের মতো আছড়ে পড়ল মেঝের ওপর। মেয়েরা হতবাক্ হয়ে দেখে, তাদের মা হাত-পা ছুড়ছে, নিজের মাথার চুলগুলো পটপট করে ছিঁড়ছে, আর গড়াগড়ি খেয়ে বলছে, মরেছে—এক্কেবারে মরেছে।

মেয়েরা তো ভেবে পায় না, কে মরল, কেনই বা মরল। তারা যত বলে, কিচ্ছু হয়নি মাগো, আমরা এক্ষুনি কাঠ কুড়োতে যাচ্ছি—তাদের মা তত গড়াগড়ি খায়, একবার বলে, 'খেয়েছে', আর তারপর বলে, 'মরেছে'।

মেয়েরা তো ভেবে পাচ্ছে না, মা-কে নিয়ে তারা কী করবে। কাঁদতে কাঁদতে বুড়ি মা-টা বুঝি মরেই যায়। তারা যেই বলে, কিছু হয়নি মাগো, আমরা কেউ মরিনি।—মা অমনি হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করে, ওরে, আমি যে পষ্ট দেখছি, শেয়ালশকুনে তোদের ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে—

মায়ের চোখের জলে মাটির মেঝে কাদা-কাদা হয়ে গেল। মেয়েদের ভয় হচ্ছিল, ঘরে বোধহয় এবার পুকুর হয়ে যাবে আর তাদের তিনজনকেই ডুবে মরতে হবে। কিন্তু তার আগেই বুড়ি মা কান্না থামিয়ে কাপড়চোপড় গুছিয়ে উঠে বসল, তারপর দুই মেয়ের দিকে কটমট করে চেয়ে বলল, শোনো, কাঠকুটো যা ঘরে আছে, তা-ই নিয়ে আমি হাটে যাচ্ছি। তোমরা কেউ আজ ঘরের বাইরে যাবে না।

মেয়েরা বলল, আমরা কাঠ কুড়োতে যাব না? বুড়ি বলল, না। মেয়েরা: আমরা ঘরের বাইরে যেতে পাব না? বুড়ি মাটিতে পা ঠুকে তিনবার বলল, না-না-না। তারপর ছোটো মেয়ের দিকে তাকিয়ে, আগে তোমার গা থেকে গন্ধ তুলি— বড়ো মেয়েকে: আগে তোমার বুকে একটা ছ্যাঁকা দি—

এই বলে বুড়ি কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে দুমদুম করে হাটে চলে গেল। যাবার আগে বলে গেল, মেয়েরা যেন কিছুতেই দরজা না খোলে।

মাস্টার বললেন, আমার মনে হয়, ওদের দরজায় বাইরে থেকে লাগানোর মতো শেকলটেকল কিছু ছিল না। তা নইলে বুড়ি নিশ্চয় বাইরে থেকেই দোর বন্ধ করে যেত।

আমরা বললাম, তা না-হয় বুঝলাম। কিন্তু গন্ধ তুলে ফেলা, ছ্যাঁকা দেওয়া—এসব কথার মানে কী?

মাস্টার বললেন, মানে গল্প থেকেই পাওয়া যাবে। তবে এখানে একটা ফুটনোট আমি জুড়ে দিতে পারি। যা বোঝবার বুঝে নাও।—এই বলে তিনি শূন্যে হাত ঘুরিয়ে যেন একটা টুকরো কাগজ নিয়ে আসছেন এইরকম ভাব করে বললেন, এটা আমি পেয়েছিলাম একটা ইংরেজি পত্রিকা থেকে। আমাদের দেশে এমন কোনো কোনো আদিবাসী গোষ্ঠী আছে, যাদের ঘরে সুন্দর মেয়ে জন্মালে গরম লোহা পুড়িয়ে তার মুখে ছ্যাঁকা দিয়ে দেয়।

আমরা শিউরে উঠে বললাম, কেন?

মাস্টার ধমক দিয়ে বললেন, এটা তো ইস্কুলের পড়া হচ্ছে না যে, সব কথার মানে লিখিয়ে দিতে হবে। গল্পটা শোনো এবার। তিনি বলতে লাগলেন:

বুড়ি তো হাটে চলে গেল। মেয়েরা দরজা লাগিয়ে ভাবতে বসল, এখন তারা কী করে। তারা কিছুতেই বুঝতে পারছে না, বুড়ি মা এত রেগে গেল কেন, আর ওইসব ভয়ানক কথাই বা বলে গেল কেন। ছোটো মেয়ে বলল, মা যদি আমার গা থেকে গন্ধ তুলে দেয়, দিদি! বড়ো মেয়ে বলল, মা যদি আমার বুকে ছ্যাঁকা দেয়, বোন! তারপর দু-জনে একসঙ্গে বলে উঠল: তাহলে তো আর রাজপুত্তুর আসবে না।

তারা আবার গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে বসেছিল, এরই মাঝে আবার আর-এক ফ্যাসাদ। ছোটো মেয়ের গন্ধের টানে একটা ভোমরা ঘরের মধ্যে সমানে বোঁ-বোঁ ঘুরছে আর বড়ো মেয়ের বুকের ওপর একটা প্রজাপতি সেই-যে বসে আছে, ওঠার নামটি নেই।

বড়ো বোন বলল, চল্, আমরা পালিয়ে যাই। ছোটো বোন বলল, কোথায়? তখন বড়ো বুঝিয়ে বলল, যেভাবেই হোক, এই ঘর থেকে তাদের বেরোতেই হবে। ছোটো সায় দিয়ে জানাল, ঠিকই তো, তা নইলে তারা রাজপুত্তুরের দেখা পাবে কেমন করে!

এই ভেবে আর দেরি না করে তারা বেরিয়ে এল, আর রোজ কাঠ কুড়োতে যাবার সময় যেমন করে, তেমনিভাবে একটা পাথর দিয়ে দরজাটাকে বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। আর ঠিক তক্ষুনি তাদের মনে হলো, বেরিয়ে তো এলাম—যাব কোথায়? মেয়ে দুটি ভেবে দেখল, বনের পথেই তাদের যেতে হবে, সেখানেই তো রাজপুত্রেরা শিকারটিকার করতে আসে; আর সুন্দরী মেয়ে দেখলে বিয়ে করে নিয়ে যায়।

দুই বোন নাচতে-নাচতে বনের পথ ধরল। তাদের পিছনে উড়তে উড়তে চলল একটা প্রজাপতি, আর একটা ভোমরা। বড়ো বোন বলল, রাজপুত্তুর— ছোটো: ঘোড়া ছুটিয়ে—

ঠিক সেইসময় খুব জোরে একটা স্কুটার এসে থামল তাদের সামনে, আর ফরেস্ট মাফিয়াদের দু-জন ছোটো মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে স্কুটারে বসিয়ে উধাও হয়ে গেল নিমেষের মধ্যে। তখন খুব ধুলো উড়ল। ভোমরাটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উড়ে পালাল, আর প্রজাপতিটা বড়ো মেয়েকে ছেড়ে একটা ফুলওয়ালা গাছের দিকে পাড়ি দিল।

গল্প যিনি বলছিলেন, তিনি বললেন, আজ এই পর্যন্ত থাক, কাল আবার শুরু হবে। আমরা হাঁ হাঁ করে বললাম, কিন্তু ছোটো মেয়েটার কী হলো, সেটা বলুন। তিনি হাই তুলে বললেন, কী আর হবে? ওই-যে খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় একটুখানি থাকে না— আমরা বললাম, কী? তিনি বললেন, খবর। গণধর্ষণ। গার্ল গ্যাংরেপড।

সেদিন রাত্তিরে আমরা অনেকেই ভালো করে ঘুমোতে পারলাম না। একজন তো স্বপ্নই দেখে ফেলল, বারংবার অত্যাচারে ধস্ত-বিক্ষত মেয়েটি। পরের দিন সে তার স্বপ্নের কথা বলাতে মাস্টার বললেন, বাঃ, তুমি তো অনেকটাই ভেবে ফেলেছ, দেখছি। আমরা বললাম, তার মানে? তিনি বললেন, সে পরে হবে এখন বড়ো মেয়ের কথা শোনো।—মাস্টার গল্প শুরু করলেন:

বড়ো মেয়ে দেখল, তার চারপাশে যেন ধুলোর ঝড় বইছে, তার চোখে যেন আঁধি লেগে গেছে। তারপর সে যখন খেয়াল করল, ছোটোবোন নেই, সে আর দেরি না করে বনের পথেই হাঁটা দিল। মেয়েটি জানে, বাড়ি আর ফেরা যাবে না, আর ফিরতে তো সে চায়ও না। সে তাই ভাবল, বনের পথে চলতে থাকলে তাকে নিশ্চয় বাঘ-ভালুকে খাবে। আর সে তো মরতেই চায়, অতএব তার আর ভয় কী।

এই ভেবে নিয়ে মেয়েটি হাঁটতে-হাঁটতে শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল একটা গঞ্জের কাছাকাছি। সেখানে একধারে একটা কুঁড়েঘরে এক খুনখুনে বুড়ি একা থাকে, গঞ্জের লোকে তাকে বলে, কুটনি। তা সে কুটনি তো মেয়েটিকে দেখে অবাক, এমন সোমত্ত মেয়ে, কোথায় চলেছে একা একা?

বড়ো মেয়ে তখন বুড়িকে সব বৃত্তান্ত জানিয়ে বলল, সে মরতে চলেছে। কুটনি বলল, আহা, মরবে কেন? আমি তোমার বোনকে ঠিক খুঁজে আনব। বড়ো মেয়ে: তুমি পারবে, আইমা? কুটনি বলল, নিশ্চয় পারব। এখানকার সব লোক আমার চেনা। তা তোমার গলায় ওটা কী, বাছা?

এদিকে হয়েছে কী, সেই তার বোন লুঠ হয়ে যাবার পর থেকে বড়ো মেয়ে এখনো পর্যন্ত এক ফোঁটা কাঁদেনি। তার সব কান্না দলা পাকিয়ে গলার কাছটায় শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে। এখন বুড়ি যেই বলেছে, গলায় ওটা কী?—মেয়ের সব কান্না গলে জল হয়ে একেবারে কুলকুল করে বেরিয়ে আসতে লাগল চোখ দিয়ে।

বুড়ি তাই দেখে বলল, অ, কান্না। আমি ভেবেছি, কী না কী!—এই বলে কুটনি একবার হাত বুলিয়ে মেয়েটির বুকদুটি ভালো করে মেপে নিল। তারপর বলল, কাঁদিসনি, নাতনি। তুই আমার কাছে থাক। আমি এখনই হাটে যাচ্ছি—সব লোকজনকে খবর দিচ্ছি। তোর বোনকে ওরা খুঁজে আনবেই।

মেয়েটি চোখ মুছে বলল, সত্যি বলছ, আইমা? কুটনি বলল, কোনো ভয় নেই রে, দিদি। তুই ঘরে যা, দুটি পান্তা খেয়েনে, আমি হাটে চললুম।—এই বলে সে মেয়েটিকে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে শনশন করে হেঁটে গঞ্জে হাজির হয়ে লোকজনকে জানিয়ে দিল, কচিমতো একটা মেয়ে এসেছে। দেখতে ভালো নয়, তবে বুকদুটি একেবারে পদ্মফুলের মতো।

গঞ্জের লোক তাই শুনে 'ঠিক আছে, ঠিক আছে' বলে বুড়িকে আশ্বস্ত করল, আর সাঁঝ লাগার আগেই দেখা গেল, কুটনির ঘরের সামনে এক লম্বা লাইন পড়ে গেছে। লাইনের শেষ মাথায় একটা বুড়ো লোক চোখ বুজে পান চিবোচ্ছে। তাকে দেখে একটা ছোঁড়া বলল, দাদু, আমি আপনার পরেই আছি।—এই বলে সে বিড়ি কিনতে গেল।

গল্পের কথক নিজেও এবার বিড়ি ধরালেন এবং খানিকক্ষণ ধূমপান করে বললেন, প্রথম দিন লাইনে ছিল তেরো জন। তা, সাত জনের পর মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে যায়। তখন বাকি ছ-জন পরের দিনের জন্যে লাইনে ইট রেখে বাড়ি চলে যায়। দ্বিতীয় দিন এসেছিল এগারো জন।

আমরা বললাম, অসহ্য! এ-গল্প আর শোনা যায় না। মাস্টার বললেন, ঠিকই। কাগজে পড়া যায়, কিন্তু গল্প হিসেবে বোধহয় ঠিক চলে না। আমি বলি কী, গল্পটা এখন থাক— আমরা উত্তেজিত হয়ে বললাম, না, গল্পটাকে আপনি এখানে ছেড়ে যেতে পারবেন না। নৃশংস দুটি কাহিনি আপনি আমাদের শুনিয়েছেন। এর একটা— তিনি বললেন, কী? আমরা: মানে, একটা প্রতিকার— মাস্টার হাই তুলে বললেন, প্রতিকারের গল্প আমি এখনো জোগাড় করতে পারিনি। আমরা বললাম, কিন্তু মেয়েদুটির কী হলো? মাস্টার বললেন, সেটাই তো বলতে যাচ্ছিলাম। বেশ, শোনো তাহলে—এই বলে তিনি আবার গল্প শুরু করলেন:

মাস্টার বললেন, কুটনির ঘরে যারা আসত, তাদের লোভ ছিল মেয়েটির বুকের ওপর। আর তাই কিছুদিন পরেই মেয়েটির দুই স্তন পুংদন্তের দংশনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে জায়গায় জায়গায় গর্ত-গর্ত হয়ে গেল। মেয়েটিকে দেখলে তখন ভয় করে। ফলে কুটনির ঘরে আর লোক আসে না। সে একদিন মেয়েটিকে বলল, এবার পথ দ্যাখো, বাছা।—এই বলে ঠোনা মেরে তাকে ঘর থেকে বের করে দিল। মেয়েটি এখন আবার বনের পথে।

এই বলে মাস্টার তাঁর ঝোলা থেকে এবার সত্যি-সত্যিই একটা ছেঁড়া লালচে কাগজ বের করে বললেন, এই জায়গার বর্ণনাটা আমি বরং তোমাদের পড়েই শোনাই। এটা আমি পেয়েছি খুব পুরোনো একটা বইয়ের ছেঁড়া পৃষ্ঠা থেকে। তা প্রায় শতখানেক বছর আগে—বটতলায় ছাপা বই। তিনি পড়তে লাগলেন:

বৃক্ষলতাসকল জ্যোৎস্নায় স্নান করে অভিনববেশে শোভিত হয়েচে। মৃদুল পবন পুষ্পের পরিমল হরণ করে তস্করের ন্যায় ধীরে ধীরে যাতায়াত কচ্চে। ঘর আলো করা বোয়ের পাশে খাঁদাবোঁচা বোয়ের মত দুই একটি তারা চাঁদের পাশে মিটমিটি কচ্চে—

আমরা বললাম, এ যেন রাজকন্যের গল্প মনে হয়। তিনি বললেন, তা তো হবেই। বইটার নামই তো তাই, উদাসিনী রাজকন্যার গুপ্তকথা। তিনি আবার পড়তে লাগলেন:

মৃণালের ন্যায় বাহুযুগল। ওষ্ঠ দুখানি গোলাপী রঙ্গে টসটস কচ্চে, রং দুদে আলতার ন্যায় উত্তম—

আমরা বললাম, এ কার বর্ণনা দিচ্ছেন? মাস্টার বললেন, ওহো, পড়তে-পড়তে অনেক দূর চলে গেছি। বেশ, তোমরা ভ্রম সংশোধন করে নাও:

রক্তহীন ওষ্ঠদুটি চাঁদের আলোয় ফ্যাকফ্যাক কচ্চে। মৃণালের ন্যায় বাহুযুগলে দাঁতের দাগ চকচক কচ্চে। বুকের পুরোনো ক্ষত শুকিয়ে গর্ত-গর্ত হয়ে আচে। গগন-আলো-করা চাঁদনিতে এক গাছের নীচে বসে মেয়েটি কুলকুল করে কাঁদচে আর ভাবচে, এবার কোথায় যাই। এমন সময়—

আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম, কী? মাস্টার বললেন, মেয়েটির মনে হলো, আরও একজন কেউ যেন নিকটে রোদন করছে। এই গহন অরণ্যে কে রোদন করে? আমরা বললাম, ছোটো বোন? মাস্টার হেসে বললেন, হ্যাঁ। দুই বোনের মিলন হলো। তাই দেখে গগনলোক থেকে দু-ফোঁটা শিশির ঝরে পড়ল। ব্যস, আজ এই পর্যন্ত— —আর বলবেন না? মাস্টার বললেন, নাঃ। কাল আবার শুরু হবে। কালকের অধ্যায়ের শিরোনাম: দুই বোন।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে আমরা অনেক জল্পনা করলাম। কেউ বলল, দুই বোন হাত ধরাধরি করে নদীতে ঝাঁপ দেবে। কেউ বলল, না, ওরা বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখবে, বুড়ি মা-টা ওদের শোকে কাঁদতে-কাঁদতে মরে গেছে। আর একজন জানাল, তার মনে হয়, দুই বোন দুটি পরি হয়ে আকাশে উড়ে যাবে—তা না হলে এ-গল্প জমে না।

যা-ই হোক, রাতটুকু আমাদের অপেক্ষা করতেই হলো, আর পরের দিন গল্প শুরু করার আগে মাস্টার জানিয়ে দিলেন, এই অধ্যায়ের শিরোনাম তিনি বদলে দিয়েছেন। নতুন নাম হলো: বৃক্ষ ও নারী।

আমরা বললাম, এরকম নাম দিলেন কেন? মাস্টার বললেন, সেটাই তো গল্প। শোনো তাহলে। মাস্টার বলতে লাগলেন:

বৃক্ষ ও নারী 
দুই বোনে প্রথমে খুব একচোট কান্নাকাটি তো হলো। তারপর বড়ো বোন যেই বলেছে, 'তোর গন্ধটা আর পাচ্ছি না তো।'—সেই মেয়ে আর থাকতে না পেরে টান মেরে খুলে দিয়েছে তার কোমরের কাপড়। আর ছোটো বোনের দশা দেখে বড়ো একটানে খুলে ফেলেছে তার বুকের জামা।

তখন বড়ো বোন দেখে কী, ছোটো মেয়ের যোনিপথ গুহার মতো হাঁ হয়ে একেবারে নাভি পর্যন্ত উঠে এসেছে। আধুনিক ছবিতে যেমন আঁকা হয় আর কি। আর ছোটো বোন দেখে কী, বড়ো মেয়ের বুকের এখানে-সেখানে মাংস খাবলা-খাবলা হয়ে আছে। এই উত্তর-আধুনিক ছবিতে যেমন দেখা যায় আর কি!—এই বলে মাস্টার বিড়ি ধরালেন। আর আমাদের মনে হলো, ছবিদুটি যেন আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। যাকে আমরা এতকাল বিমূর্ত শিল্প ভেবে এসেছি, তা এখন আমাদের কাছে এক বিকট মূর্তি ধরে এসে দাঁড়িয়েছে। যাকে আমরা এতদিন পরাবাস্তব বলে জেনেছি, তা এখন অতি উৎকট বাস্তব হয়ে আমাদের চোখের সামনে দগদগ করছে।

আমরা শিহরিত হয়ে বলি, ছবিদুটো সরান। মাস্টার হেসে বলেন, আমার কাছে তো কোনো ছবি নেই। আমরা ভেবে দেখি, তা-ই বটে। তিনি তো গল্পই বলছেন। আর কী আশ্চর্য, তাঁর মুখ থেকে নির্গত শব্দগুলো বিকৃত-বিক্ষত চিহ্ন হয়ে একটা আর-একটার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে এক বীভৎস ছবি হয়ে উঠেছে।

তারপর ছবি থেকে আমরা আবার কথায় ফিরে যাই। মাস্টার বলতে থাকেন:

দুই বোন কিন্তু পরস্পরের দশা দেখে একটুও কাঁদল না। একটা আর্তনাদ পর্যন্ত করল না। ছোটো বোন বড়োর বুকে চুমু খেল। বড়ো মেয়ে ছোটোর নিম্নাঙ্গে আদর করে হাত বুলিয়ে দিল। বলতে কী, বিগত কিছুকাল ধরে জগৎ তাদের কাছে পুরুষাঙ্গময় হয়ে গিয়েছিল। বহুকাল পরে তারা যেন একটি নারীদেহ দেখতে পেল। হোক না কুৎসিত, তবু নারীর শরীর তো।

সব দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে পরস্পরকে আদরেসোহাগে একেবারে ভিজিয়ে দিল তারা। শুদ্ধ শিশিরে তাদের শরীর সিক্ত হলো। শুভ্র জ্যোৎস্নায় তারা যেন স্নান করে নির্মল হলো। আর এইভাবে তারা যখন জগৎসংসার, চারিপাশ-চারিধার সব কিছু ভুলে গেছে, ভীষণ জোরে একবার কেঁপে উঠল সেই বৃক্ষ। পটপট করে শব্দ হলো। তারপর সেই বৃক্ষের অন্তরদেশ থেকে এক ক্রুদ্ধস্বর বলে উঠল, আমাকে অপবিত্র করে দিলি তোরা, ন্যাংটো মেয়ে। আমি অভিশাপ দিলাম, তোদের নিম্নাঙ্গ খসে যাক।—আর সেই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদুটির শরীর দ্বিখণ্ডিত হলো। ছিল দুই মেয়ে; এখন হলো চারটে দেহখণ্ড।

মাস্টার বললেন, বুঝতেই পারছ, এ হলো সেই অলৌকিক শক্তিধর বৃক্ষ—যার কাছ থেকে একদিন বরলাভ করেছিল মেয়েদুটি।—মাস্টার বলতে লাগলেন:

তোমাদের মনে আছে, আমি বলেছিলাম, এই বৃক্ষ বড় ভয়ানক প্রকৃতির। বহুকাল আগে এক দম্পতি—নাঃ, পুরো উপাখ্যানটাই দেখছি তোমাদের বলতে হয়।—মাস্টার জানিয়ে রাখলেন, এটা কিন্তু একটা আলাদা গল্প—লোককথা। গ্র্যাফটিং হচ্ছে বলতে পারো। মাস্টার উপাখ্যান শুরু করলেন:

এক জোয়ান ছেলে আর তার কিশোরী বউ। তারা দু-জনেই ছিল একটু বোকা গোছের। শরীরের ব্যাপারট্যাপার কিছু বুঝত না। তা একদিন রাতে বাপ-মাকে রমণলিপ্ত অবস্থায় দেখে তাদের খুব কৌতূহল হয় এবং পরের দিন বনে গিয়ে এক মস্ত গাছের নীচে তারা সেই ক্রিয়াটি অনুকরণ করার চেষ্টা করে। আর তাদের সেই মিলনে এত তাপ উৎপন্ন হয় যে, সেই গাছের ডালপাতা পর্যন্ত ঝলসে যায়। তখন সে বৃক্ষ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, আমার সমুখে এই কাজ করলি তোরা—তোদের নিম্নাঙ্গ পুড়ে যাক!

মাস্টার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এ বহু প্রাচীন গল্প, আমি অবশ্য পেয়েছিলাম একটা ঠোঙা থেকে। তা সেই গল্পের শেষে বলা ছিল, ওই অভিশাপের ফলেই নরনারীর গোপনাঙ্গের বর্ণ—বুঝতেই পারছ তোমরা—। বলেই মাস্টার ফস করে আবার একটা বিড়ি ধরিয়ে নিলেন। আমরা বুঝে গেলাম, এখন মিনিট দুয়েক ধূমপানের বিরতি। তবে আমাদের পক্ষে সুখের কথা, মাস্টারের বিড়িটা মাঝখানে নিভে গেল। তিনি সেটা ফেলে দিয়ে আবার গল্পের সুতোটা ধরলেন।

মাস্টার বলতে লাগলেন, মেয়েদুটি তো দুখানা হলো। তা-ই দেখে আকাশ দিয়ে উড়ে যেতে যেতে একজোড়া পাখি হা হা করে উঠল। চন্দ্র দুঃখিত হয়ে মেঘের আড়ালে চলে গেলেন; দু-একটা তারা অশ্রুসজল চক্ষুর মতো টলটল করতে লাগল। আর তখন সেই দুটি ছিন্ন ঊর্ধ্বাঙ্গের মুখ—

মাস্টারকে দেখলাম একটি বিড়ি থেকে মশলা বের করে নিয়ে তিনি তার ভেতর এক টিপ গাঁজা পুরে নিচ্ছেন। মাস্টার এটা মাঝে মাঝে করে থাকেন, আর তারপরই তাঁর গল্পের ভাষা খুব চড়ে যায়। বিড়িতে টান দিয়ে মাস্টার বললেন, তখন সেই মুখদুটি বলল, হে বৃক্ষ, তুমি যদি সত্য বৃক্ষ হও, তাহলে আমাদের বৃত্তান্ত শোনো। মনে রেখো, আজ আমাদের এই দশার জন্যে তুমিই দায়ী।

এই বলে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার পুরো কাহিনিটি বলে গেল। বলতে বলতে রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। আকাশে চাঁদের রঙ লালচে হয়ে উঠল; আর মেয়েদুটি দেখল, বৃক্ষের সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, আর সেই মর্মরে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা যেন গুমরে গুমরে উঠছে। বৃক্ষ বললেন, আমি তোদের ভালো করতে চেয়েছিলাম, আর পশ্বধম পুরুষ কিনা তোদের এই দশা করল! হায় হায়!

ঊর্ধ্বাঙ্গদুটি তখন আবার মুখ উঁচু করে বলল, আমরা তোমাকে শাপ দিচ্ছি, বৃক্ষ, পুরুষের দল আমাদের দেহকে যেভাবে কামড়ে-কামড়ে খেয়েছে, তোমাকেও একদিন ওরা সেইভাবে কুপিয়ে-কুপিয়ে কাটবে।

এই পর্যন্ত শুনে আমরা বললাম, ডায়ালগ একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে, মাস্টার।

শুনে মাস্টার খানিকক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন। তারপর বললেন, আমি কুড়িয়ে-কুড়িয়ে যেসব গল্প জোগাড় করেছি, তা থেকে এরকম কয়েকটা টাইপ পাওয়া যায়। যেমন ধরো: ১. মূক ও বধির কিশোরীকে ধর্ষণ ২. ধর্ষণ ও হত্যা ৩. প্রণয়-বিচ্ছেদ—মেয়েটির মুখে অ্যাসিড নিক্ষেপ ৪. প্রণয়-বিচ্ছেদ—গণধর্ষণ—সংজ্ঞাহীন মেয়েটি পরিত্যক্ত

এগুলো মাঝেমাঝেই ঘটছে দেখা যায়। সে-হিসেবে এইসব টেক্সট থেকে কিছু মোটিফও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

আমরা অধৈর্য হয়ে বললাম, জানি জানি—এরকম খবর তো আমরা প্রায়ই কাগজে পড়ি।

মাস্টার বললেন, হ্যাঁ। আর এইসব মেয়েদের বিবৃতি তো বড়ো একটা লিখে রাখা হয় না, তাই আমি ভেবে ভেবে কয়েকটা কথা ওদের মুখে বসিয়েছি। অবশ্য তোমাদের যদি পছন্দ না হয়—

আমরা বললাম, না, ঠিক আছে। তবে বীভৎস কাহিনি আমরা আর শুনতে চাই না। আপনি বরং গাছের গল্পটাই বলুন।

মাস্টার বললেন, হ্যাঁ, তাই বলি। মেয়েদুটির ওই অভিশাপ শুনে বৃক্ষ যেন কেঁদে উঠলেন। তার পাতা থেকে টপটপ করে শিশির ঝরে পড়তে লাগল। ডালপালা নেড়ে বৃক্ষ বললেন, ওরে, আর বলিস না—বলিস না। আমি এখনই তোদের জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছি।—এই বলে বৃক্ষ ছোটো মেয়েটির ঊর্ধ্বাঙ্গের সঙ্গে বড়ো মেয়েটির নিম্নদেশকে সংযুক্ত করে একটি অক্ষত নারীদেহ নির্মাণ করলেন। তারপর বললেন, যা, আর আমাকে শাপমন্যি দিসনি।

তখন সেই সদ্যগঠিত নারী বলে উঠল, কিন্তু কোথায় যাব, ঈশ্বর—কোন পৃথিবীতে?

শুনে বৃক্ষ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাতাসও যেন থমকে গেছে মনে হয়। পাতাগুলি নিস্পন্দ। তারপর বৃক্ষ বললেন, একটা পথ আমি বলে দিতে পারি। কিন্তু তুই আমার একটা উপকার করবি, বল্—

নারী বলল, কী?

বৃক্ষ বললেন, তাহলে তোকে একটা ঘটনা বলতে হয়। অনেক দিন আগে—এরপর বৃক্ষ সেই সঙ্গমরত যুবদম্পতির কাহিনিটি সম্পূর্ণ বিবৃত করে বললেন, ওরা আমাকে শাপ দিয়ে বলেছিল, তোমার ফুলে কোনোদিন ফল হবে না। আর তারপর থেকে—বিশ্বাস কর—আমি নির্বীজ হয়ে গেছি। এই অরণ্যে কত স্ত্রীবৃক্ষ আছে। তাদের গর্ভমুণ্ডের পরাগ বাতাসে উড়ে-উড়ে এধার যায়, ওধার যায়; কিন্তু আমার পুংকেশরকে কেউ স্পর্শ করে না। প্রজাপতি, ভোমরা, এমনকী একটা পাখি পর্যন্ত এসে বসে না আমার ডালে। হায় হায়, আমি নির্বংশ হব রে!

নারী বলল, কিন্তু আমি কী করতে পারি?

বৃক্ষ বললেন, এই নে আমার ফুল। এর পরাগরেণু ঠোঁটে করে নিয়ে তুই মাখিয়ে দিয়ে আয়—ওই যে পুষ্পিত স্ত্রীবৃক্ষটি দেখছিস—ওর ফুলের গর্ভমুণ্ডে।

নারী: তারপর? বৃক্ষ: তারপর ওই গাছেরই একটি সবীজ ফুল তুই একটুও না চিবিয়ে গিলে ফেলবি। নারী বলল, তা-তে কী হবে? বৃক্ষ বললেন, আমার ফুলে ফল হবে। আর তোর শরীরে এমন শক্তি সঞ্চারিত হবে যে, আর কোনো পুরুষ কখনো তোর দেহকে লাঞ্ছিত করতে পারবে না। নারী: সত্যি বলছ? বৃক্ষ বললেন, হ্যাঁ। যদি কোনো পুরুষ তোকে বলাৎকারে উদ্যত হয়, তার লিঙ্গ খসে পড়বে।

মেয়েটি শিউরে উঠে বলল, উঃ, কী ভয়ানক! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে শুনতে পেল, বিভিন্ন দেশ-প্রদেশ থেকে সহস্র নারীকণ্ঠ সম্মিলিত হয়ে বলছে, তা-ই হোক, তা-ই হোক; আমাদের হয়ে ওই শক্তি তুমি অঙ্গে ধারণ করো, নারি!

মাস্টার আর-একবার গাঁজায় দম চড়িয়ে নিয়ে বললেন, তারপর বৃক্ষের নির্দেশমতো মেয়েটি তার পরাগরেণু ঠোঁটে করে নিয়ে সেই স্ত্রীবৃক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই, সেই বৃক্ষ শাখায় করে একটি ফুল এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই নাও। অপনীত হোক তোমার সব গ্লানি আর অসম্মান।

মেয়েটি সেই ফুল নিজের জন্যে রাখল। তারপর তার ঠোঁটের সেই পরাগ সে ছুঁয়ে দিল বৃক্ষের একটি পরিণত পুষ্পে। সঙ্গে সঙ্গে সেই ফুলটি যেন নতুন করে ফুটে উঠল আর পরাগরেণুর স্পর্শে মেয়েটির ঠোঁটদুটি ফুলের পাপড়ির মতো হয়ে গেল। এরপর মেয়েটি সেই স্ত্রীফুলের গর্ভকোষ একবারও না-চিবিয়ে গিলে ফেলল, আর সেই গুপ্তবীজী শক্তির প্রভাবে মেয়েটি পরিণত হলো এক তেজোগর্ভা নারীতে।

এইখানে গল্প থামিয়ে মাস্টার বললেন, পুরুষের লিঙ্গ খসে যাওয়ার অনেক গল্প আমরা পুরাণে পেয়েছি। আবার কোনো-কোনো দেশের লোককথায় আছে, আগুন লুকোনো থাকে নারীর জননেন্দ্রিয়ে। এইসব প্রাচীন লোকবিশ্বাসেরই যেন পুনরাবর্তন ঘটল এই আখ্যানে।

আমরা বললাম, বেশ। কিন্তু মেয়েটি কী করল? মাস্টার বললেন, মেয়েটি তারপর আবার সেই পুরুষবৃক্ষের কাছে ফিরে এল, আর মাটিতে পড়ে থাকা সেই ছিন্ন অঙ্গদুটির দিকে চেয়ে সাশ্রু স্বরে বলল, কিন্তু এদের কী হবে, ঈশ্বর?

বৃক্ষ বললেন, ওদের আমি পাথর করে দিচ্ছি। বলামাত্রই সেই ছিন্ন অঙ্গদুটি শিলাখণ্ডে পরিণত হয়ে যেন লাঞ্ছিত সৌন্দর্যের স্মারকচিহ্ন হয়ে গেল।

মাস্টার বললেন, সিঁদুর মাখানো ঢিবিপাথর আমরা গাঁয়েগঞ্জে অনেক দেখেছি। সেইরকমই হলো আর কী! ব্যস, গল্প শেষ।

আমরা বললাম, কিন্তু মেয়েটি তার শক্তি নিয়ে কী করল? মাস্টার বললেন, তা আমি জানি না। ওটা তোমরা ভেবে নাও। আমরা বললাম, তা কী করে হয়? ওইটুকু না থাকলে যে আপনার গল্পটা শেষ হচ্ছে না।

মাস্টার তখন নানারকম ভণিতার পর 'দেখি, ঝোলাঝুলি ঝেড়ে কিছু পাই কি না'—বলে ঝোলা নয়, পকেট থেকে বের করলেন একটুকরো কাগজ। আমরা দেখলাম, বেশি পুরোনো নয়। এই ২০০১ সালেরই জানুয়ারি মাসে একটা ইংরেজি দৈনিকে বেরিয়েছিল খবরটা। আমরা কাগজের টুকরোটা মাটিতে বিছিয়ে পড়তে লাগলাম:

এক গ্রামে সমর্থ পুরুষেরা সকলেই মাঠের কাজ করতে অন্য দেশে চলে গেছে। এইসময় একদিন রাতে জোতদারের লোক এসে গুনে গুনে আটটি নারীকে ধর্ষণ করে। মেয়েগুলি যাতে ছুটে পালাতে না পারে, তার জন্যে একটা কৌশল করা হয়েছিল। প্রথমে তাদের উলঙ্গ করে নিয়ে তাদের জামাকাপড়গুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর সারা রাত ধরে অবাধে ধর্ষণ করা হয় সেই মেয়েদের।

আমরা আরও জানলাম: সেই ধর্ষিতা নারীরা এখনো উলঙ্গ হয়েই ঘরের মধ্যে দরজা দিয়ে বসে আছে। তারা বলছে, যতদিন-না ওই শয়তানগুলোকে ধরা হচ্ছে, তারা কাপড়ও পরবে না, বাইরেও বেরোবে না। আর যদি পুলিশ তাদের না ধরে, মেয়েরা ওই অবস্থাতেই সবাই গলায় দড়ি দেবে।..........এই হলো খবর।

আমরা চুপ করে বসে রইলাম।

মাস্টার বললেন, এবার কল্পনা করা যাক—আমাদের গল্পের মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে সেই গ্রামে এসে পৌঁছেছে। ·


১. দ্য স্টেটসম্যান, ২৪ জানুয়ারি ২০০১। গল্পটা ২০০১ সালে লেখা। সেইসময় আমি খুব লোককথা পড়ছিলাম। সেইসব কথার আদলে খবরের কাগজের টুকরোটাকরা দিয়ে এই গল্পটা বানিয়ে ফেলি। ভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়েছিল, অনুষ্টুপ, ২০০২।