
অনুবাদ : অন্তরা আফরোজ
এক.
বাইরে রাতটা ছিল ঠান্ডা আর বৃষ্টিভেজা। কিন্তু লাবারনাম ভিলার ছোট্ট বসার ঘরে জানালার পর্দা টানা, ফায়ারপ্লেসে আগুন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছিল। বাবা আর ছেলে দাবা খেলছিলেন। খেলার ব্যাপারে বাবার মাথায় বেশ অদ্ভুত সব ভাবনা ছিল। নিজের রাজাকে তিনি এমন সব মারাত্মক আর অকারণ বিপদের মুখে ফেলছিলেন যে ফায়ারপ্লেসের পাশে শান্তভাবে উল বুনতে থাকা সাদা চুলের বৃদ্ধাও শেষ পর্যন্ত মন্তব্য না করে পারলেন না।
‘বাতাসের শব্দটা শোনো,’ মিস্টার হোয়াইট বললেন। নিজের একটা সর্বনাশা ভুল যখন তাঁর চোখে পড়ল, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই তিনি চাইছিলেন, ছেলে যেন ভুলটা দেখতে না পায়।
‘শুনছি,’ ছেলে গম্ভীরভাবে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াল। ‘কিস্তি।’
‘আমার তো মনে হয় না সে আজ রাতে আর আসবে,’ বাবা বোর্ডের ওপর হাত থামিয়ে রেখে বললেন।
‘বাজিমাত,’ ছেলে বলল।
‘এত দূরে থাকার এটাই সবচেয়ে বড়ো জ্বালা!’ হঠাৎ অকারণেই রেগে গিয়ে মিস্টার হোয়াইট চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘থাকার জন্য যত জঘন্য, কাদায় ভরা, ধারে-কাছে কিছু নেই এমন জায়গা হতে পারে, তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে খারাপ। হাঁটার পথটা কাদার জলা, আর রাস্তাটা যেন স্রোত। লোকজন যে কী ভাবে, বুঝি না। এই রাস্তায় মাত্র দুটো বাড়ি ভাড়া হয়েছে বলে বোধ হয় ওরা ভাবে, কিছুই এসে যায় না।’
‘থাক না,’ স্ত্রী শান্ত গলায় বললেন। ‘পরের খেলাটা হয়তো তুমিই জিতবে।’
মিস্টার হোয়াইট তাড়াতাড়ি মুখ তুলে তাকালেন। ঠিক তখনই মা আর ছেলের মধ্যে এক অর্থপূর্ণ চোখাচোখি তাঁর নজরে পড়ল। ঠোঁটের কাছে আসা কথাগুলো মিলিয়ে গেল, আর পাতলা ধূসর দাড়ির আড়ালে তিনি অপরাধীর মতো এক চিলতে হাসি লুকোলেন।
‘ওই তো এসে গেছে,’ হার্বার্ট হোয়াইট বলল। ঠিক তখনই বাইরের গেটটা জোরে বন্ধ হলো, আর ভারী পায়ের শব্দ দরজার দিকে এগিয়ে এল।
বৃদ্ধ মিস্টার হোয়াইট অতিথিকে স্বাগত জানাতে তাড়াহুড়ো করে উঠে গেলেন। দরজা খোলার পর তাঁকে নতুন অতিথির দুর্দশা নিয়ে সহানুভূতি জানাতে শোনা গেল। অতিথিও নিজের দুর্দশা নিয়ে কম আফসোস করছিলেন না। তা শুনে মিসেস হোয়াইট ‘আহা, আহা!’ বলে আলতো করে কাশলেন। একটু পর তাঁর স্বামী ঘরে ঢুকলেন, সঙ্গে এক লম্বা, বলিষ্ঠ মানুষ। তাঁর চোখ দুটো পুঁতির মতো ছোট, মুখটা টকটকে লাল।
‘সার্জেন্ট-মেজর মরিস,’ অতিথির পরিচয় করিয়ে দিলেন মিস্টার হোয়াইট।
সার্জেন্ট-মেজর সবার সঙ্গে হাত মেলালেন। তারপর ফায়ারপ্লেসের পাশে এগিয়ে দেওয়া চেয়ারটায় বসে তৃপ্ত চোখে দেখতে লাগলেন, গৃহকর্তা হুইস্কি আর গ্লাস বের করছেন এবং আগুনের ওপর একটা ছোট তামার কেটলি বসাচ্ছেন।
তৃতীয় গ্লাসের পর তাঁর চোখ দুটো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর তিনি কথা বলতে শুরু করলেন। দূরদেশ থেকে আসা এই অতিথির দিকে ছোট্ট পরিবারটি গভীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল। সার্জেন্ট-মেজর চেয়ারে চওড়া কাঁধ সোজা করে বসে বলতে লাগলেন বুনো সব দৃশ্য আর বীরত্বের কাহিনি, যুদ্ধ আর মহামারির কথা, অচেনা সব মানুষের কথা।
‘একুশ বছর,’ স্ত্রী আর ছেলের দিকে মাথা নেড়ে মিস্টার হোয়াইট বললেন। ‘যখন চলে গিয়েছিল, তখন গুদামে কাজ করা রোগা-পাতলা এক ছোকরা। আর এখন ওকে দেখো।’
‘দেখে তো মনে হয় না খুব একটা ক্ষতি হয়েছে,’ ভদ্রতার সঙ্গে বললেন মিসেস হোয়াইট।
‘আমারও একবার ভারত যাওয়ার খুব ইচ্ছে,’ বৃদ্ধ বললেন। ‘একটু ঘুরেফিরে দেখব আর কী।’
‘যেখানে আছেন, সেখানেই ভালো আছেন,’ মাথা নেড়ে বললেন সার্জেন্ট-মেজর। খালি গ্লাসটা নামিয়ে রেখে তিনি মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর আবার মাথা নাড়লেন।
‘আমি ওখানকার পুরোনো মন্দির, ফকির আর বাজিকরদের দেখতে চাই,’ বৃদ্ধ বললেন। ‘আচ্ছা মরিস, সেদিন একটা বাঁদরের থাবা না কী নিয়ে বলতে শুরু করেছিলে, সেটা কী ব্যাপার?’
‘কিছু না,’ সৈনিকটি তাড়াতাড়ি বললেন। ‘অন্তত শোনার মতো কিছু নয়।’
‘বাঁদরের থাবা?’ কৌতূহলী হয়ে বললেন মিসেস হোয়াইট।
‘ওটা... হয়তো একরকম জাদু বলতে পারেন,’ সার্জেন্ট-মেজর হালকাভাবে বললেন।
তাঁর তিন শ্রোতাই আগ্রহে সামনে ঝুঁকে এলেন। অতিথি আনমনে খালি গ্লাসটা ঠোঁটে তুললেন, তারপর আবার নামিয়ে রাখলেন। গৃহকর্তা গ্লাসটা ভরে দিলেন।
পকেটের ভেতর হাতড়াতে হাতড়াতে সার্জেন্ট-মেজর বললেন, ‘দেখতে একেবারে সাধারণ একটা ছোট থাবা। শুকিয়ে মমির মতো হয়ে গেছে।’
তিনি পকেট থেকে জিনিসটা বের করে এগিয়ে দিলেন। মিসেস হোয়াইট মুখ কুঁচকে পিছিয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর ছেলে হাতে নিয়ে কৌতূহলের সঙ্গে পরীক্ষা করতে লাগল।
‘এর মধ্যে বিশেষ কী আছে?’ ছেলের কাছ থেকে থাবাটা নিয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার হোয়াইট। দেখা শেষ হলে তিনি সেটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
‘এক বৃদ্ধ ফকির এর ওপর মন্ত্র দিয়েছিলেন,’ বললেন সার্জেন্ট-মেজর। ‘খুব পবিত্র মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, মানুষের জীবন ভাগ্যই চালায়, আর যারা সেই ভাগ্যে হাত দিতে যায়, শেষ পর্যন্ত তাদেরই দুঃখ পেতে হয়। তিনি এমন মন্ত্র দিয়েছিলেন যে তিনজন আলাদা মানুষ এর কাছে তিনটি করে ইচ্ছা চাইতে পারবে।’
কথাগুলো তিনি এমন গম্ভীরভাবে বললেন যে শ্রোতারা নিজেরাই বুঝতে পারলেন, তাঁদের হালকা হাসিটা ঠিক মানাচ্ছে না।
‘তাহলে আপনি নিজেই তিনটে ইচ্ছে চাইলেন না কেন?’ চট করে বলল হার্বার্ট হোয়াইট।
মধ্যবয়সী মানুষ বেশি-বোঝা তরুণের দিকে যেভাবে তাকায়, সৈনিকটি সেভাবে তার দিকে তাকালেন। ‘চেয়েছি,’ শান্ত গলায় বললেন তিনি। তাঁর ছোপছোপ মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
‘সত্যিই আপনার তিনটে ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল?’ মিসেস হোয়াইট জিজ্ঞেস করলেন।
‘হয়েছিল,’ বললেন সার্জেন্ট-মেজর। তাঁর গ্লাসটা শক্ত দাঁতে ঠক করে লাগল।
‘আর কেউ কি কিছু চেয়েছিল?’ বৃদ্ধা নাছোড় হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
‘প্রথম লোকটা তার তিনটি ইচ্ছাই পেয়েছিল। হ্যাঁ,’ উত্তর এল। ‘প্রথম দুটো কী ছিল জানি না। তবে তৃতীয় ইচ্ছায় সে মৃত্যু চেয়েছিল। এভাবেই থাবাটা আমার হাতে আসে।’
তাঁর গলার স্বর এত গম্ভীর ছিল যে সবাই চুপ করে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমার তিনটে ইচ্ছাই যখন হয়ে গেছে, মরিস, তখন এটা তো এখন আর তোমার কোনো কাজে লাগে না। রেখে দিয়েছ কেন?’
সৈনিকটি মাথা নাড়লেন। ‘এমনিই রেখে দিয়েছি, বোধ হয়,’ ধীরে বললেন তিনি। ‘একসময় বিক্রি করার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু এখন আর মনে হয় বিক্রি করব না। এরই মধ্যে যথেষ্ট সর্বনাশ করেছে। তা ছাড়া কেউ কিনতেও চায় না। কেউ কেউ ভাবে এটা রূপকথা। আর যারা একটু-আধটু বিশ্বাস করে, তারা আগে পরীক্ষা করে দেখতে চায়, তারপর দাম দেবে।’
‘যদি আবার তিনটে ইচ্ছে চাওয়ার সুযোগ পেতে,’ মিস্টার হোয়াইট তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে কি চাইতে?’
‘জানি না,’ মরিস বললেন। ‘আমি জানি না।’
থাবাটা তুলে তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মধ্যে ঝুলিয়ে ধরলেন তিনি। তারপর হঠাৎ সেটি আগুনে ছুড়ে দিলেন। মিস্টার হোয়াইট হালকা একটা চিৎকার দিয়ে ঝুঁকে পড়ে আগুন থেকে সেটা ছোঁ মেরে তুলে নিলেন।
‘পুড়ে যেতে দিলেই ভালো করতেন,’ গম্ভীরভাবে বললেন সৈনিকটি।
‘তোমার যদি না লাগে, মরিস, আমাকে দিয়ে দাও।’
‘দেব না,’ তাঁর বন্ধু জেদ ধরে বললেন। ‘আমি আগুনে ফেলে দিয়েছি। তুমি যদি ওটা রাখো, পরে যা-ই ঘটুক, আমাকে দোষ দিয়ো না। বুদ্ধিমানের মতো আবার আগুনে ছুড়ে ফেলো।’
মিস্টার হোয়াইট মাথা নাড়লেন এবং নতুন পাওয়া জিনিসটা ভালো করে দেখতে লাগলেন। ‘এটা দিয়ে ইচ্ছে করতে হয় কীভাবে?’
‘ডান হাতে উঁচু করে ধরে মুখে ইচ্ছেটা বলতে হবে,’ সার্জেন্ট-মেজর বললেন। ‘তবে এর ফল কী হতে পারে, সে বিষয়ে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি।’
‘শুনতে তো আরব্য রজনীর মতো লাগছে,’ রাতের খাবার সাজাতে সাজাতে মিসেস হোয়াইট বললেন। ‘আমার জন্য চার জোড়া হাত চাও না কেন?’
তাঁর স্বামী পকেট থেকে থাবাটা বের করলেন। তিনজনই হেসে উঠলেন, কারণ সার্জেন্ট-মেজর আতঙ্কিত মুখে তাঁর হাত চেপে ধরেছেন।
‘যদি চাইতেই হয়,’ রুক্ষ গলায় তিনি বললেন, ‘বুদ্ধিমানের মতো কিছু চেয়ো।’
মিস্টার হোয়াইট থাবাটা আবার পকেটে রাখলেন। চেয়ার টেনে বন্ধুকে টেবিলে বসার ইশারা করলেন। রাতের খাবারের ব্যস্ততায় থাবার কথা খানিকটা ভুলেই গেলেন সবাই। খাওয়ার পরে তাঁরা তিনজন মুগ্ধ হয়ে আবার শুনতে লাগলেন ভারতে সার্জেন্ট-মেজরের অভিজ্ঞতার আরেক দফা গল্প।
অতিথি শেষ ট্রেন ধরার জন্য বেরিয়ে গেলেন। তাঁর পেছনে দরজা বন্ধ হতেই হার্বার্ট বলল, ‘বাঁদরের থাবার গল্পটা যদি উনি আমাদের এতক্ষণ যেসব গল্প শোনালেন, সেগুলোর চেয়ে বেশি সত্যি না হয়, তাহলে এটা থেকে আমাদের খুব একটা লাভ হবে না।’
‘ওটার জন্য তুমি মরিসকে কিছু দিয়েছ?’ স্বামীর দিকে ভালো করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মিসেস হোয়াইট।
‘সামান্য কিছু,’ একটু লাল হয়ে বললেন মিস্টার হোয়াইট। ‘ও নিতে চায়নি, আমি জোর করে দিয়েছি। আরেকবার বলেও গেছে, ওটা যেন ফেলে দিই।’
‘তা তো বলবেই!’ নকল আতঙ্কের ভঙ্গিতে বলল হার্বার্ট। ‘আমরা এবার ধনী হব, বিখ্যাত হব, সুখী হব। প্রথমেই নিজেকে সম্রাট বানিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে করো, বাবা। তাহলে মা আর তোমাকে শাসাতে পারবে না।’
এই বলে সে টেবিলের চারপাশে ছুটল। হার্বার্টের কথায় খেপে গিয়ে মিসেস হোয়াইট চেয়ারের পিঠের ঢাকা হাতে তার পেছনে ছুটলেন।
মিস্টার হোয়াইট পকেট থেকে থাবাটা বের করে সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন। ‘সত্যি বলতে কী চাইব, বুঝতেই পারছি না,’ ধীরে ধীরে বললেন তিনি। ‘আমার তো মনে হয়, যা চাই তার সবই আমার আছে।’
বাবার কাঁধে হাত রেখে হার্বার্ট বলল, ‘বাড়ির দেনাটা শোধ হয়ে গেলেই তুমি পুরো সুখী হবে, তাই না? তাহলে দুইশ পাউন্ড চাও। ঠিক যতটা দরকার।’
এত সহজে ব্যাপারটা বিশ্বাস করছেন বলে একটু লজ্জিত হাসি হেসে বাবা থাবাটা উঁচিয়ে ধরলেন। ছেলে গম্ভীর মুখে পিয়ানোর সামনে গিয়ে বসল। তবে মায়ের দিকে একবার চোখ টিপে তার গাম্ভীর্য খানিকটা নষ্ট করে দিল। তারপর পিয়ানোয় কয়েকটা ভারী সুর তুলল।
‘আমি দুইশ পাউন্ড চাই,’ স্পষ্ট গলায় বললেন বৃদ্ধ।
কথাটা শেষ হতেই পিয়ানোয় জোরে একটা ঝংকার উঠল। তার মাঝেই বৃদ্ধের শিউরে ওঠা চিৎকার শোনা গেল। স্ত্রী আর ছেলে ছুটে এলেন।
‘এটা নড়েছে!’ মেঝেতে পড়ে থাকা থাবাটার দিকে ঘৃণাভরা চোখে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করলেন।
‘আমি ইচ্ছেটা বলার সময় এটা আমার হাতে সাপের মতো মোচড় দিয়েছিল।’
‘টাকা তো কোথাও দেখছি না,’ থাবাটা তুলে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে ছেলে বলল। ‘বাজি ধরে বলতে পারি, কখনো দেখবও না।’
‘তোমার মনের ভুল হবে,’ উদ্বিগ্ন চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে স্ত্রী বললেন।
তিনি মাথা নাড়লেন। ‘যাক, ক্ষতি তো কিছু হয়নি। তবে আমাকে বেশ চমকে দিয়েছিল।’
তাঁরা আবার আগুনের পাশে বসলেন। বাবা আর ছেলে পাইপ শেষ করলেন।
বাইরে বাতাস আগের চেয়েও জোরে বইছিল। ওপরতলায় একটা দরজা সশব্দে বন্ধ হতেই বৃদ্ধ চমকে উঠলেন। তিনজনের ওপর একটা অস্বাভাবিক, বিষণ্ণ নীরবতা নেমে এল। বৃদ্ধ দম্পতি শুতে ওঠা পর্যন্ত সেই নীরবতা কাটল না।
‘আমার মনে হয় বিছানার মাঝখানে বড়ো একটা থলেতে বাঁধা টাকা পাবে,’ শুভরাত্রি বলতে বলতে হার্বার্ট বলল। ‘আর আলমারির মাথায় ভয়ংকর কিছু একটা বসে থাকবে। অন্যায় পথে পাওয়া টাকা যখন পকেটে ভরবে, তখন ওটা তোমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে।’
অন্ধকারে একা বসে হার্বার্ট নিভে আসা আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। আগুনের মধ্যে নানা মুখ দেখতে পেল সে। শেষ মুখটা এত ভয়ংকর, এত বানরের মতো যে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মুখটা ক্রমে এত স্পষ্ট হয়ে উঠল যে অস্বস্তির ছোট্ট একটা হাসি হেসে সে টেবিলে হাতড়ে পানিভরা একটা গ্লাস খুঁজল, ওটার ওপর পানি ছুড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার হাত গিয়ে পড়ল বাঁদরের থাবার ওপর। হালকা কেঁপে উঠে সে কোটে হাত মুছল, তারপর শুতে চলে গেল।
দুই.
পরদিন সকালে শীতের উজ্জ্বল রোদ যখন নাশতার টেবিলে এসে পড়ল, তখন আগের রাতের ভয়গুলোর কথা ভেবে হার্বার্ট হাসল। ঘরটায় এমন একটা সাদামাটা, স্বাভাবিক ভাব ছিল, যা আগের রাতে ছিল না। নোংরা, কুঁচকে যাওয়া ছোট্ট থাবাটা সাইডবোর্ডের ওপর এমন অবহেলায় ফেলে রাখা ছিল যে বোঝাই যাচ্ছিল, তার ক্ষমতার ওপর কারও বিশেষ বিশ্বাস নেই।
‘আমার মনে হয় সব বুড়ো সৈনিকই একই রকম,’ মিসেস হোয়াইট বললেন। ‘আমরা যে এমন বাজে কথা বসে বসে শুনলাম, ভাবা যায়! আজকাল আবার ইচ্ছে পূরণ হয় নাকি? আর হলেও দুইশ পাউন্ড তোমার কী ক্ষতি করতে পারে?’
‘আকাশ থেকে পড়ে মাথায় লাগতে পারে,’ মজা করে বলল হার্বার্ট।
‘মরিস বলেছিল, ঘটনাগুলো এত স্বাভাবিকভাবে ঘটে,’ বাবা বললেন, ‘যে চাইলে সেগুলোকে কাকতালীয় ঘটনা বলেই ধরে নেওয়া যায়।’
‘আমি ফেরার আগে টাকা খরচ করতে শুরু কোরো না যেন,’ টেবিল ছেড়ে উঠতে উঠতে হার্বার্ট বলল। ‘আমার ভয় হচ্ছে, টাকা পেয়ে তুমি কৃপণ আর লোভী হয়ে যাবে। তখন আমাদের তোমাকে ত্যাজ্য করতে হবে।’
মা হেসে তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন, তারপর রাস্তা ধরে চলে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে রইলেন। নাশতার টেবিলে ফিরে এসে স্বামীর এত সহজে বিশ্বাস করার ব্যাপারটা নিয়ে বেশ মজা পেলেন। তবু ডাকপিয়নের টোকা শুনে তিনি তাড়াতাড়িই দরজায় ছুটে গেলেন। আর যখন দেখলেন ডাকপিয়ন শুধু দর্জির বিল দিয়ে গেছে, তখন মদখোর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট-মেজরদের নিয়ে বিরক্তির সঙ্গে দু-চার কথা বলতেও ছাড়লেন না।
দুপুরের খাবারের সময় তিনি বললেন, ‘হার্বার্ট বাড়ি ফিরলে এ নিয়ে আবার কত রসিকতা করবে, দেখো।’
‘করতেই পারে,’ নিজের গ্লাসে বিয়ার ঢালতে ঢালতে বললেন মিস্টার হোয়াইট। ‘কিন্তু যা-ই বলো, জিনিসটা আমার হাতে নড়েছিল। আমি কসম খেয়ে বলতে পারি।’
‘তোমার মনে হয়েছিল নড়েছে,’ স্ত্রী শান্ত গলায় বললেন।
‘আমি বলছি, নড়েছিল,’ মিস্টার হোয়াইট বললেন। ‘মনে হওয়ার প্রশ্নই নেই। আমি তখন শুধু... কী হয়েছে?’
স্ত্রী কোনো উত্তর দিলেন না। বাইরে এক লোকের রহস্যময় চলাফেরা দেখছিলেন তিনি। লোকটা দ্বিধাভরে বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন ভেতরে ঢুকবে কি না ঠিক করতে পারছে না। দুইশ পাউন্ডের কথা মনে থাকায় মিসেস হোয়াইট খেয়াল করলেন, আগন্তুকের পোশাক বেশ ভালো, মাথায় একেবারে নতুন, চকচকে রেশমি টুপি। তিনবার সে গেটের সামনে থেমে আবার চলে গেল। চতুর্থবার গেটে হাত রেখে দাঁড়াল, তারপর হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গেট খুলে পথ ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে এল। একই সময়ে মিসেস হোয়াইট দুই হাত পেছনে নিয়ে তাড়াতাড়ি অ্যাপ্রনের ফিতা খুলে সেটি চেয়ারের কুশনের নিচে লুকিয়ে ফেললেন।
অস্বস্তিতে থাকা আগন্তুককে তিনি ঘরে নিয়ে এলেন। লোকটা আড়চোখে তাঁর দিকে তাকাল। মিসেস হোয়াইট ঘরের অবস্থার জন্য আর স্বামীর গায়ে থাকা কোটটার জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলেন। কোটটা মিস্টার হোয়াইট সাধারণত বাগানে কাজ করার সময় পরতেন। লোকটি যেন অন্য চিন্তায় ডুবে থেকে তাঁর কথা শুনছিল। তারপর লোকটি কেন এসেছে, সে কথা বলবে বলে মিসেস হোয়াইট একজন নারীর পক্ষে যতটা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা সম্ভব, ততটাই ধৈর্য ধরে রইলেন। কিন্তু লোকটি প্রথমে অদ্ভুতভাবে চুপ করে রইল।
‘আমাকে... এখানে আসতে বলা হয়েছিল,’ শেষ পর্যন্ত সে বলল। ঝুঁকে প্যান্টে লেগে থাকা তুলোর একটা টুকরো তুলে ফেলল। ‘আমি ম অ্যান্ড মেগিন্স থেকে এসেছি।’
বৃদ্ধা চমকে উঠলেন। ‘কোনো সমস্যা হয়েছে?’ শ্বাস আটকে আসা গলায় তিনি বললেন। ‘হার্বার্টের কিছু হয়েছে? কী হয়েছে? কী হয়েছে?’
স্বামী তাড়াতাড়ি বাধা দিলেন। ‘আহা, আহা, মা। বসো। আগে থেকেই কিছু ধরে নিয়ো না। আমার বিশ্বাস, স্যার, আপনি নিশ্চয়ই খারাপ খবর আনেননি।’ তিনি আশাভরা উৎকণ্ঠায় আগন্তুকের দিকে তাকালেন।
‘আমি দুঃখিত...’ আগন্তুক বলতে শুরু করল।
‘ও কি আহত হয়েছে?’ প্রায় উন্মত্তভাবে জানতে চাইলেন মা।
লোকটি মাথা নুইয়ে সম্মতি জানাল। ‘খুব খারাপভাবে আহত হয়েছে,’ শান্ত গলায় বলল সে। ‘কিন্তু এখন ওর কোনো ব্যথা নেই।’
‘ওহ্, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!’ দুই হাত জড়ো করে বৃদ্ধা বললেন। ‘এর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! ধন্য...’
হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন। আশ্বাসটির ভয়ংকর অর্থ তাঁর মাথায় ঢুকল। আগন্তুকের বিকৃত মুখভঙ্গিতে নিজের আশঙ্কার ভয়াবহ সত্যটাও দেখতে পেলেন। তাঁর শ্বাস আটকে গেল। স্বামীর বুঝতে একটু দেরি হয়েছে দেখে তাঁর দিকে ফিরলেন এবং কাঁপতে থাকা বুড়ো হাতটা স্বামীর হাতের ওপর রাখলেন। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
‘মেশিনে আটকে গিয়েছিল,’ অবশেষে নিচু গলায় বলল আগন্তুক।
‘মেশিনে আটকে গিয়েছিল,’ ঘোরের মধ্যে কথাটা আবার বললেন মিস্টার হোয়াইট। ‘হ্যাঁ।’
তিনি জানালার বাইরে শূন্য চোখে তাকিয়ে বসে রইলেন। স্ত্রীর হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে এমনভাবে চেপে ধরলেন, যেমন প্রায় চল্লিশ বছর আগে প্রেমের দিনগুলোতে ধরতেন।
‘ও-ই তো আমাদের একমাত্র ছেলে ছিল,’ ধীরে আগন্তুকের দিকে ফিরে বললেন তিনি। ‘এ বড়ো কঠিন।’
লোকটি কাশল। তারপর উঠে ধীরে ধীরে জানালার দিকে গেল। ‘কোম্পানি আপনাদের এই বড়ো ক্ষতির জন্য আন্তরিক সমবেদনা জানাতে বলেছে,’ পেছনে না ফিরেই সে বলল। ‘দয়া করে বুঝবেন, আমি শুধু তাদের কর্মচারী। আমাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটাই পালন করছি।’
কেউ কোনো উত্তর দিলেন না। বৃদ্ধার মুখ সাদা হয়ে গেছে, চোখ স্থির, শ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। আর স্বামীর মুখে এমন একটা ভাব ছিল, যেমনটা হয়তো তাঁর বন্ধু সার্জেন্টের মুখে প্রথম যুদ্ধে নামার সময় ছিল।
‘আমাকে আরও বলতে বলা হয়েছে যে ম অ্যান্ড মেগিন্স এই ঘটনার কোনো দায় নেয় না,’ লোকটি বলল। ‘তারা কোনো আইনগত দায়ও স্বীকার করছে না। তবে আপনাদের ছেলের কাজের কথা বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে চায়।’
মিস্টার হোয়াইট স্ত্রীর হাত ছেড়ে দিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে আতঙ্কভরা চোখে আগন্তুকের দিকে তাকালেন। শুকনো ঠোঁট নড়ে শব্দ বেরোল, ‘কত?’
‘দুইশ পাউন্ড।’
স্ত্রীর চিৎকার যেন তাঁর কানেই পৌঁছাল না। বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। অন্ধ মানুষের মতো দুই হাত সামনে বাড়ালেন। তারপর জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
তিন.
প্রায় দুই মাইল দূরে নতুন বিশাল কবরস্থানে বৃদ্ধ দম্পতি তাঁদের ছেলেকে কবর দিলেন। তারপর ফিরে এলেন ছায়া আর নীরবতায় ডুবে থাকা বাড়িতে। সবকিছু এত তাড়াতাড়ি ঘটে গিয়েছিল যে প্রথমে তাঁরা যেন ঠিক বুঝতেই পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, তাঁরা এখনও অপেক্ষা করছেন, আরও কিছু একটা ঘটবে, এমন কিছু যা বৃদ্ধ হৃদয়ের পক্ষে বহন করা এই অসহ্য বোঝাটা একটু হালকা করবে।
কিন্তু দিন কেটে গেল। অপেক্ষার জায়গা নিল অসহায়ভাবে মেনে নেওয়া, বৃদ্ধ বয়সের সেই আশাহীন মেনে নেওয়া, যাকে কখনো কখনো ভুল করে উদাসীনতা বলা হয়। অনেক সময় তাঁরা প্রায় কোনো কথাই বলতেন না। এখন আর বলার মতো কিছু ছিল না। দিনগুলো ক্লান্তিকরভাবে দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল।
সপ্তাহখানেক পরে এক রাতে হঠাৎ বৃদ্ধের ঘুম ভেঙে গেল। হাত বাড়িয়ে দেখলেন, পাশে কেউ নেই। ঘর অন্ধকার। জানালার দিক থেকে চাপা কান্নার শব্দ আসছে। তিনি বিছানায় উঠে বসে শুনলেন।
‘ফিরে এসো,’ মমতার সঙ্গে বললেন তিনি। ‘ঠান্ডা লাগবে।’
‘আমার ছেলের আরও বেশি ঠান্ডা লাগছে,’ বৃদ্ধা বললেন এবং আবার কেঁদে উঠলেন।
ধীরে ধীরে স্ত্রীর কান্নার শব্দ তাঁর কানে মিলিয়ে গেল। বিছানাটা উষ্ণ, চোখ ঘুমে ভারী। কিছুক্ষণ ভাঙা ভাঙা তন্দ্রায় থাকার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ স্ত্রীর একটা তীব্র চিৎকারে ধড়ফড় করে জেগে উঠলেন।
‘থাবাটা!’ উন্মত্তভাবে চিৎকার করলেন স্ত্রী। ‘বাঁদরের থাবাটা!’
তিনি আতঙ্কে উঠে বসলেন। ‘কোথায়? কোথায় আছে? কী হয়েছে?’
স্ত্রী হোঁচট খেতে খেতে ঘর পেরিয়ে তাঁর কাছে এলেন। ‘ওটা আমার চাই,’ শান্ত গলায় বললেন তিনি। ‘তুমি ওটা নষ্ট করে ফেলোনি তো?’
‘বসার ঘরে তাকের ওপর আছে,’ অবাক হয়ে বললেন তিনি। ‘কেন?’
একসঙ্গে কাঁদলেন আর হাসলেন মিসেস হোয়াইট। ঝুঁকে স্বামীর গালে চুমু খেলেন।
‘এইমাত্র আমার মনে পড়ল,’ প্রায় উন্মত্ত গলায় বললেন তিনি। ‘আগে কেন আমার মনে হয়নি? তোমার কেন মনে হয়নি?’
‘কী মনে হয়নি?’
‘বাকি দুটো ইচ্ছে,’ দ্রুত বললেন তিনি।
‘আমরা তো মাত্র একটা ইচ্ছে করেছি।’
‘ওই একটাই কি যথেষ্ট ছিল না?’ তীব্র গলায় বললেন মিস্টার হোয়াইট।
‘না!’ বিজয়ীর ভঙ্গিতে চিৎকার করলেন স্ত্রী। ‘আমরা আরেকটা করব। তাড়াতাড়ি নিচে গিয়ে ওটা নিয়ে এসো। চাও, আমাদের ছেলেটা আবার বেঁচে উঠুক।’
মিস্টার হোয়াইট বিছানায় উঠে বসলেন এবং কাঁপতে থাকা শরীরের ওপর থেকে বিছানার চাদর ছুড়ে সরালেন। ‘হায় ঈশ্বর, তুমি পাগল হয়ে গেছ!’ আতঙ্কে চিৎকার করলেন তিনি।
‘ওটা নিয়ে এসো,’ হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন স্ত্রী। ‘তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো, আর ইচ্ছে করো... ওহ্, আমার ছেলে! আমার ছেলে!’
স্বামী দেশলাই জ্বালিয়ে মোমবাতি ধরালেন। ‘বিছানায় ফিরে যাও,’ কাঁপা গলায় বললেন তিনি। ‘তুমি জানো না কী বলছ।’
‘প্রথম ইচ্ছেটা তো পূরণ হয়েছে,’ তীব্র উত্তেজনায় বললেন বৃদ্ধা। ‘দ্বিতীয়টা হবে না কেন?’
‘কাকতালীয় ঘটনা,’ তোতলাতে তোতলাতে বললেন বৃদ্ধ।
‘যাও, ওটা নিয়ে এসো আর ইচ্ছে করো,’ উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করলেন স্ত্রী।
বৃদ্ধ ঘুরে তাঁর দিকে তাকালেন। তাঁর গলা কাঁপছিল। ‘ও মারা গেছে দশ দিন হলো। আর তা ছাড়া... তোমাকে বলতাম না, কিন্তু... ওকে শুধু ওর কাপড় দেখে চিনতে পেরেছিলাম। তখনই যদি ওকে তোমার দেখার মতো না থাকে, এখন কী হবে?’
‘ওকে ফিরিয়ে আনো,’ চিৎকার করে বললেন বৃদ্ধা এবং তাঁকে দরজার দিকে টেনে নিয়ে গেলেন। ‘যে ছেলেকে আমি নিজের বুকের দুধ খাইয়েছি, তাকে আমি ভয় পাব বলে মনে করো?’
অন্ধকারে তিনি নিচে নামলেন। হাতড়ে হাতড়ে বসার ঘর, তারপর ফায়ারপ্লেসের তাক পর্যন্ত গেলেন। তাবিজটা জায়গামতোই ছিল। হঠাৎ এক ভয়াবহ আশঙ্কা তাঁকে চেপে ধরল। মুখে না-বলা সেই ইচ্ছাটাই যদি ঘর থেকে বেরোনোর আগেই তাঁর ক্ষতবিক্ষত ছেলেকে সামনে এনে দাঁড় করায়! শ্বাস আটকে গেল তাঁর। এমনকি দরজাটা কোন দিকে, সেটাও হারিয়ে ফেললেন। কপাল ঠান্ডা ঘামে ভিজে গেল। টেবিল ঘুরে হাতড়ে হাতড়ে দেয়াল ধরে এগোলেন। শেষ পর্যন্ত ছোট প্যাসেজে এসে দাঁড়ালেন, হাতে সেই অশুভ জিনিসটা।
ঘরে ঢোকার সময় স্ত্রীর মুখটাও তাঁর কাছে বদলে গেছে বলে মনে হলো। মুখ সাদা, অপেক্ষায় টানটান। তাঁর ভয়ের চোখে মুখটা অস্বাভাবিক লাগছিল। তিনি স্ত্রীকেই ভয় পেলেন।
‘ইচ্ছে করো!’ শক্ত গলায় চিৎকার করলেন স্ত্রী।
‘এটা বোকামি আর পাপের কাজ,’ কাঁপা গলায় বললেন তিনি।
‘ইচ্ছে করো!’ আবার বললেন স্ত্রী।
তিনি হাত তুললেন। ‘আমি চাই, আমার ছেলে আবার বেঁচে উঠুক।’
থাবাটা মেঝেতে পড়ে গেল। ভয়ার্ত চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর কাঁপতে কাঁপতে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। বৃদ্ধা জ্বলন্ত চোখে জানালার কাছে গিয়ে পর্দা তুলে দিলেন।
ঠান্ডায় জমে যাওয়া পর্যন্ত তিনি বসে রইলেন। মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা স্ত্রীর দিকে চোখ গেল। মোমবাতির শেষ অংশটা পুড়ে চীনামাটির বাতিদানের কিনারার নিচে নেমে গেছে। দেয়াল আর ছাদের ওপর দপদপ করে ছায়া পড়ছিল। শেষে অন্য সব ঝলকের চেয়ে বড়ো একটা ঝলক দিয়ে মোমবাতিটা নিভে গেল। তাবিজটা কাজ করেনি ভেবে বৃদ্ধ এমন এক স্বস্তি পেলেন, যা ভাষায় বলা যায় না। চুপিসারে বিছানায় ফিরে গেলেন। মিনিট দুয়েক পর বৃদ্ধাও নিঃশব্দে, নিস্পৃহভাবে এসে তাঁর পাশে শুলেন।
কেউ কথা বললেন না। চুপ করে শুয়ে ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনতে লাগলেন। সিঁড়ির একটা ধাপ কড়কড় করে উঠল। দেয়ালের ভেতর দিয়ে কিচকিচ করতে করতে একটা ইঁদুর ছুটে গেল। অন্ধকারটা দমবন্ধ করা। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে সাহস জোগাড় করার পর বৃদ্ধ দেশলাইয়ের বাক্সটা নিলেন। একটা কাঠি জ্বালিয়ে মোমবাতি আনতে নিচে গেলেন।
সিঁড়ির নিচে পৌঁছাতেই দেশলাইটা নিভে গেল। আরেকটা জ্বালাবেন বলে থামলেন। ঠিক তখনই সদর দরজায় একটা টোকা পড়ল। এত মৃদু, এত চুপিসারে যে প্রায় শোনাই যায় না।
তাঁর হাত থেকে দেশলাইগুলো পড়ে প্যাসেজে ছড়িয়ে গেল। তিনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আবার টোকা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দ্রুত নিজের ঘরে পালিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
তৃতীয় টোকাটা সারা বাড়িতে শোনা গেল।
‘ওটা কী?’ ধড়ফড় করে উঠে বসে চিৎকার করলেন বৃদ্ধা।
‘ইঁদুর,’ কাঁপা গলায় বললেন বৃদ্ধ। ‘একটা ইঁদুর। সিঁড়িতে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল।’
স্ত্রী বিছানায় উঠে বসে শুনতে লাগলেন। এবার জোরে একটা টোকা সারা বাড়িতে বেজে উঠল।
‘হার্বার্ট!’ তিনি চিৎকার করলেন। ‘হার্বার্ট!’
তিনি দরজার দিকে ছুটলেন। কিন্তু স্বামী তাঁর আগেই গিয়ে বাহু ধরে শক্ত করে আটকালেন।
‘কী করতে যাচ্ছ?’ কর্কশ ফিসফিসে গলায় বললেন তিনি।
‘আমার ছেলে! হার্বার্ট!’ প্রায় যন্ত্রের মতো নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করলেন স্ত্রী। ‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম, জায়গাটা দুই মাইল দূরে। আমাকে ধরে রেখেছ কেন? ছাড়ো। আমাকে দরজা খুলতে হবে।’
‘ঈশ্বরের দোহাই, ওটাকে ভেতরে আসতে দিয়ো না,’ কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করলেন বৃদ্ধ।
‘তুমি নিজের ছেলেকেই ভয় পাচ্ছ!’ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললেন তিনি। ‘আমাকে ছাড়ো। আমি আসছি, হার্বার্ট। আমি আসছি।’
আবার একটা টোকা পড়ল। তারপর আরেকটা।
হঠাৎ এক ঝটকায় বৃদ্ধা নিজেকে ছাড়িয়ে ঘর থেকে ছুটে গেলেন। স্বামী পেছনে পেছনে সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত এসে কাতর গলায় তাঁকে ডাকলেন। স্ত্রী দ্রুত নিচে নামছিলেন। তিনি শুনলেন দরজার শিকল ঝনঝন করে খুলে গেল, তারপর নিচের শক্ত খিলটা ধীরে ধীরে খাপ থেকে টেনে বের করা হচ্ছে। এরপর স্ত্রীর টানটান, হাঁপাতে থাকা গলা শোনা গেল।
‘খিলটা!’ জোরে চিৎকার করলেন তিনি। ‘নিচে এসো। আমার হাত পৌঁছাচ্ছে না।’
কিন্তু স্বামী তখন হাঁটু আর দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে মেঝেতে পাগলের মতো থাবাটা খুঁজছেন। বাইরের জিনিসটা ভেতরে ঢোকার আগেই যদি শুধু ওটা খুঁজে পান! দরজায় তখন একের পর এক গুলির মতো আঘাত পড়ছিল, সেই শব্দ সারা বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তিনি শুনলেন, স্ত্রী একটা চেয়ার টেনে প্যাসেজে এনে দরজার গায়ে ঠেকিয়ে রাখছেন। খিলটা ধীরে ধীরে কড়কড় শব্দে সরে আসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর হাত বাঁদরের থাবার ওপর পড়ল। মরিয়া হয়ে প্রায় নিঃশ্বাসের সঙ্গে তিনি তৃতীয় এবং শেষ ইচ্ছাটা উচ্চারণ করলেন।
হঠাৎ টোকা বন্ধ হয়ে গেল। তার প্রতিধ্বনি তখনও বাড়ির ভেতর রয়ে গেছে। তিনি শুনলেন চেয়ারটা সরানো হলো, দরজা খুলল। এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। তারপর হতাশা আর দুঃখে স্ত্রীর দীর্ঘ, জোরালো হাহাকার তাঁকে সাহস দিল নিচে ছুটে তাঁর পাশে যেতে, তারপর সেখান থেকে বাইরের গেট পর্যন্ত। উল্টো দিকের মিটমিটে রাস্তার বাতির আলো পড়ছিল শান্ত, জনশূন্য রাস্তাটার ওপর।
লেখক পরিচিতি : উইলিয়াম উইমার্ক জ্যাকবস বা ডব্লিউ ডব্লিউ জ্যাকবস ১৮৬৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবের বাসস্থান ছিল টেমস নদীর একটি ঘাটের বাড়ি, যেখানে তার বাবা ব্যবস্থাপক ছিলেন। জ্যাকবস তার শৈশবের নাবিক ও ডকশ্রমিকদের স্মৃতি থেকে গল্প রচনা করেন, যা তাকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তার প্রথম বই, ‘মেনি কার্গোস’ (১৮৯৬) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক সাফল্য লাভ করে এবং এর পরে আরও দুটি বই প্রকাশিত হয়—‘দ্য স্কিপার'স উয়িং’এবং ‘সি আর্চিনস’। ‘দ্য মাঙ্কিস প’ বা ‘বানরের থাবা’ হলো কুসংস্কার ও আতঙ্কের একটি গল্প, যা ডিকেন্সীয় ঘরোয়া উষ্ণতা ও আরামের এক বাস্তবসম্মত আবহে উন্মোচিত হয়। এটি জ্যাকবসের দৈনন্দিন জীবন ও মৃদু হাস্যরসের সাথে বহিরাগত অভিযান ও ভয়ের সমন্বয় ঘটানোর দক্ষতার একটি উদাহরণ। লুই নেপোলিয়ন পার্কারের করা গল্পটির নাট্যরূপ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯০৩ সালে। জ্যাকবস ১৯৪৩ সালের ১লা সেপ্টেম্বর লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন।
0 মন্তব্যসমূহ