কুলদা রায়

কাঠামোবাদ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে হয়, এটি বুঝি শুধু ভাষাবিজ্ঞানী বা সাহিত্যতাত্ত্বিকদের জন্য তৈরি কোনো কঠিন বিষয়। সংকেতক, সংকেতিত, ভাষাব্যবস্থা, পার্থক্য, দ্বৈত বিরোধ, কাঠামো, এসব শব্দ সামনে এলে ভয় আরও বাড়ে। অথচ কাঠামোবাদের গোড়ার কথাটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের খুব কাছাকাছি। আমরা কোনো জিনিসকে শুধু তার নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝি না, অন্য কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে বুঝি। কাউকে লম্বা বললে মনে প্রশ্ন আসে, কার তুলনায় লম্বা? একটি ঘরকে অন্ধকার বললে কথাটির অর্থ বুঝতে পারি, কারণ আলো কাকে বলে জানি। দিনকে বুঝি রাতের পাশে, বড়কে ছোটর পাশে, কাছে কথাটিকে দূরের পাশে। কোনো শব্দ বা বস্তুর অর্থ তাই সব সময় তার ভেতরে একা বসে থাকে না। তার চারপাশের মিল, অমিল ও সম্পর্কও তাকে অর্থ দেয়। কাঠামোবাদ মূলত এই সম্পর্কগুলোর দিকে আমাদের চোখ ফেরায়।

ইতালো ক্যালভিনোর A Sign in Space গল্পটি এই ধারণা বোঝার জন্য অসাধারণ। গল্পটির বাংলা নাম করা যায় ‘মহাশূন্যে একটি চিহ্ন’। এর কেন্দ্রে আছে একটি চিহ্নের জন্ম, সেই চিহ্নের অর্থ, তাকে মনে রাখার চেষ্টা, তার হারিয়ে যাওয়া এবং পরে অসংখ্য চিহ্নের মধ্যে তার বিশেষত্ব হারিয়ে যাওয়ার সংকট। ক্যালভিনো কোনো তাত্ত্বিক বক্তৃতা দেন না। তিনি এমন এক মহাবিশ্বের গল্প বলেন যেখানে একটি মাত্র চিহ্নের সৃষ্টি বিরাট ঘটনা। সেই চিহ্নটির পিছু নিলে ভাষা, অর্থ, পরিচয়, পার্থক্য ও সম্পর্ক সম্পর্কে কাঠামোবাদের প্রধান কথাগুলো প্রায় নিজের থেকেই খুলে যায়।

গল্পটির কথকের নাম Qfwfq। সে মানুষ নয়, পরিচিত কোনো প্রাণীও নয়। Qfwfq ক্যালভিনোর সৃষ্টি এক কাল্পনিক মহাজাগতিক সত্তা, যার স্মৃতি মহাবিশ্বের আদিকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। আর Kgwgk তারই মতো আরেক কল্পিত মহাজাগতিক সত্তা, যে পরে Qfwfq-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। নাম দুটিও ইচ্ছাকৃতভাবে অদ্ভুত, যেন তাদের কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা মানবসমাজের মানুষ বলে মনে না হয়। ক্যালভিনোর Cosmicomics গ্রন্থে Qfwfq এমন এক আশ্চর্য কথক, যে কোটি কোটি বছর আগের ঘটনাও এমনভাবে মনে করে যেন নিজের যৌবনের কোনো দিনের কথা বলছে। সূর্য, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি কিংবা পৃথিবী আজকের রূপ পাওয়ারও বহু আগে কী ঘটেছিল, সে যেন সবই দেখেছে।

একসময় Qfwfq মহাশূন্যের একটি জায়গায় একটি চিহ্ন রেখে দেয়। তার উদ্দেশ্য খুব সাধারণ। সূর্য গ্যালাক্সির কেন্দ্র ঘুরে বহু কোটি বছর পরে আবার সেই অঞ্চলে ফিরলে নিজের দেওয়া চিহ্ন দেখে জায়গাটি চিনবে। আমরা যেমন পথ চিনতে কোনো গাছে দাগ দিই, মানচিত্রে চিহ্ন বসাই বা বাড়ির সামনে নম্বর লিখি, Qfwfq-ও তেমন কিছু করতে চেয়েছিল। পার্থক্য শুধু এই যে তার পথটি মহাবিশ্বের।

এখানেই অদ্ভুত একটি সমস্যা দেখা দেয়। Qfwfq যে চিহ্নটি দিয়েছিল, সেটি দেখতে কেমন ছিল? আজ আমাদের চারদিকে এত চিহ্ন যে এমন প্রশ্ন অস্বাভাবিক মনে হয়। অক্ষর আছে, সংখ্যা আছে, তীরচিহ্ন আছে, রাস্তার সংকেত আছে, নানা রকম নকশা আছে। আমরা একটি আকারকে অন্যটির সঙ্গে তুলনা করতে পারি। বলতে পারি এটি গোল, ওটি চৌকো, এটি সোজা, ওটি বাঁকা। কিন্তু Qfwfq যে সময়ের কথা বলছে, তখন তুলনা করার মতো আর কোনো চিহ্নই ছিল না। সে যদি বলে তার চিহ্নটি গোল, প্রশ্ন উঠবে গোলের ধারণা তখন কোথা থেকে এল? যদি বলে রেখার মতো, তবে রেখার সঙ্গে তুলনা করার মতো আরেকটি রেখা কোথায়? প্রথম চিহ্নটি এমন এক জগতে জন্ম নিচ্ছে যেখানে তাকে বোঝার জন্য আগে থেকে কোনো নমুনা নেই।

এই সমস্যার ভেতরেই কাঠামোবাদের একটি বড় কথা লুকিয়ে আছে। কোনো কিছুকে আলাদা করে চিনতে হলে তার থেকে ভিন্ন কিছু থাকা দরকার। একটি সাদা দেয়ালে ছোট কালো দাগ সহজেই চোখে পড়ে। দাগটি শুধু কালো বলে নয়, চারপাশ সাদা বলেও আলাদা হয়ে ওঠে। একই কালো দাগ যদি কালো দেয়ালে থাকে, হয়তো চোখেই পড়বে না। দাগটির নিজের রং বদলায়নি, কিন্তু তার চারপাশ বদলে গেছে। পরিচয় তাই শুধু নিজের গুণে তৈরি হয় না, পার্থক্যের মধ্যেও তৈরি হয়।

Qfwfq-এর প্রথম চিহ্নটির পাশে আর কোনো চিহ্ন ছিল না, কিন্তু তার চারপাশে ছিল চিহ্নহীন বিশাল মহাশূন্য। সেই চিহ্নহীনতার ভেতরে একটি জায়গা হঠাৎ আলাদা হয়ে গেল। আগে জায়গাটি অন্য সব জায়গার মতো ছিল। চিহ্ন বসানোর পর বলা গেল, এই সেই জায়গা। একদিকে চিহ্নিত স্থান, অন্যদিকে চিহ্নহীন অসীমতা। প্রথম পার্থক্যটি তৈরি হলো সেখানেই। একটি চিহ্ন নিজের অর্থ পেল অন্য সব জায়গা চিহ্নহীন থাকার কারণে।

ভাষাবিদ ফার্দিনাঁ দ্য সসুর (Ferdinand de Saussure) ভাষা নিয়ে ভাবতে গিয়ে এই পার্থক্যের গুরুত্ব দেখিয়েছিলেন। আমরা সাধারণত মনে করি একটি শব্দের ভেতরেই বুঝি তার অর্থ রাখা আছে। ‘গাছ’ বললেই যেন শব্দটির ভেতর থেকে গাছের অর্থ বেরিয়ে আসে। কিন্তু ‘গাছ’ শব্দটি কোনো বাস্তব গাছ নয়। কাগজে শব্দটি লিখলে সেখানে পাতা জন্মায় না, ডাল গজায় না। আমরা শব্দটি দেখি বা শুনি, তারপর মনে একটি ধারণা তৈরি হয়। সসুর শব্দের উচ্চারিত বা লিখিত রূপকে বলেছেন সংকেতক (signifier), আর সেই রূপ শুনে বা দেখে মনে যে ধারণাটি জাগে তাকে বলেছেন সংকেতিত (signified)। ‘গাছ’ শব্দটি সংকেতক, আর গাছ সম্পর্কে আমাদের মানসিক ধারণাটি সংকেতিত।

একজন মানুষের নাম দিয়েও বিষয়টি বোঝা যায়। ধরা যাক, একজনের নাম করিম। ‘করিম’ শব্দটি মানুষটির শরীর নয়, মুখ নয়, তার জীবনও নয়। তবু পরিচিত কেউ নামটি শুনলে মানুষটির কথা মনে করে। আবার যে তাকে চেনে না, তার কাছে ‘করিম’ শুধু একটি নাম। অর্থাৎ নামটি নিজে মানুষটিকে বহন করছে না। নাম ও মানুষটির সম্পর্ক জানতে হয়। ভাষার চিহ্নও এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে।

সসুর আরও দেখিয়েছিলেন, কোনো জিনিসের সঙ্গে তার নামের সম্পর্ক প্রকৃতিগত নয়। বাংলায় আমরা যে উদ্ভিদকে ‘গাছ’ বলি, ইংরেজিতে তাকে tree বলা হয়। অন্য ভাষায় আরও অন্য নাম আছে। যদি বাস্তব গাছের ভেতর থেকেই তার একটি অনিবার্য নাম বেরিয়ে আসত, সব ভাষায় নিশ্চয় একই নাম থাকত। তা হয়নি। মানুষ নির্দিষ্ট শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধারণা জুড়ে দিয়েছে। দীর্ঘ ব্যবহারে সেই সম্পর্ক আমাদের কাছে এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা তার বানানো স্বভাবটি ভুলে যাই। সসুর এই সম্পর্ককে যাদৃচ্ছিক বলেছেন। অর্থাৎ জিনিসটির এই নামটিই হতে হবে, প্রকৃতি তেমন কোনো বিধান দেয়নি।

আমাদের প্রতিদিনের জীবন চিহ্নে ভরা। ট্রাফিক বাতিতে লাল আলো জ্বললে গাড়ি থামে। লাল রঙের ভেতরে নিজে থেকে ‘থামো’ কথাটি লেখা নেই। মানুষ একটি নিয়ম বানিয়েছে, সমাজ সেই নিয়ম মেনে নিয়েছে, আমরা ছোটবেলা থেকে তা শিখেছি। একটি দেশের পতাকার রং ও নকশাও দেশ নিজে নয়। তবু তার সঙ্গে ইতিহাস, স্মৃতি, রাষ্ট্র ও পরিচয় জুড়ে আছে বলে তা গভীর অর্থ বহন করে। চিহ্নের শক্তি আসে ব্যবহারের নিয়ম এবং মানুষের সম্মতি থেকে।

Qfwfq-এর চিহ্নটির ক্ষেত্রেও এমনই। সে মহাশূন্যের একটি জায়গায় কিছু একটা করল এবং নিজের জন্য তার অর্থ দাঁড়াল, এই সেই জায়গা যেখানে আমি চিহ্ন রেখেছিলাম। মহাশূন্য তাকে এই অর্থ দেয়নি, সে নিজে দিয়েছে। কিন্তু অর্থটি কেবল তার জানা হলে অন্য কেউ সেটি কীভাবে বুঝবে? পথে একটি পাথরে গোল দাগ দিয়ে আপনি যদি মনে রাখেন, এখান থেকে ডানে গেলে বাড়ি, দাগটির অর্থ আপনার কাছে পরিষ্কার। অপরিচিত পথিকের কাছে সেটি অর্থহীনও হতে পারে। কোনো চিহ্ন সবার কাছে একই অর্থ বহন করতে হলে তার পেছনে কোনো পরিচিত নিয়ম বা অভ্যাস প্রয়োজন।

Qfwfq-এর কাছে চিহ্নটির মূল্য শুধু জায়গা চিনে রাখার জন্য নয়। সেটি তার নিজের উপস্থিতির স্মৃতিও। সে ভাবছে, এটি আমার চিহ্ন। মানুষের মধ্যেও এমন আকাঙ্ক্ষা খুব পরিচিত। কেউ গাছের গায়ে নিজের নাম কাটে, কেউ বাড়ির সামনে নামফলক ঝোলায়, কেউ বই লেখে, কেউ পুরোনো চিঠি জমিয়ে রাখে। মানুষ চায় তার উপস্থিতির কোনো চিহ্ন যেন থেকে যায়। সে চলে গেলেও কিছু যেন বলে, একসময় সে এখানে ছিল। মহাশূন্যে Qfwfq-এর প্রথম চিহ্নটির মধ্যে সেই খুব মানবিক আকাঙ্ক্ষা কাজ করে।

Qfwfq মনে করেছিল বহু কোটি বছর পরেও চিহ্নটি একইভাবে থাকবে। সে ফিরে আসবে, সেটি দেখবে, জায়গাটি চিনবে এবং নিজের পুরোনো উপস্থিতির সঙ্গেও যেন দেখা হবে। কিন্তু ফিরে এসে দেখে Kgwgk তার চিহ্নটি নষ্ট করে নিজের একটি চিহ্ন রেখে গেছে। Qfwfq ভীষণ রেগে যায়। তার মনে হয় নিজের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি হারিয়েছে।

গল্পটি ঠিক এই মুহূর্তে নতুন দিকে ঘুরে যায়। এতক্ষণ ছিল একটি চিহ্ন এবং তার চারপাশে চিহ্নহীনতা। এখন দুটি চিহ্ন হয়েছে। প্রথমবার তুলনা করা সম্ভব। Qfwfq-এর চিহ্ন এখন আর শুধু ‘চিহ্ন’ নয়। এটি Kgwgk-এর চিহ্ন থেকে আলাদা। একটি আগে ছিল, অন্যটি পরে এসেছে। একটি নিজের, অন্যটি প্রতিদ্বন্দ্বীর। দ্বিতীয় চিহ্নটির আবির্ভাব প্রথমটির পরিচয়ও বদলে দিল। নতুন কিছু এলে পুরোনো জিনিসের অর্থও বদলাতে পারে।

ভাষার ক্ষেত্রেও এমন ঘটে। ‘দিন’ শব্দটির অর্থ শুধু সূর্যের আলো নয়। ভাষায় ‘রাত’, ‘ভোর’, ‘সন্ধ্যা’ আছে বলেও ‘দিন’ একটি নির্দিষ্ট জায়গা পায়। ‘বড়’ কথাটি বুঝতে ‘ছোট’ দরকার। ‘ভাই’ কথাটি ‘বোন’, ‘বাবা’, ‘মা’, ‘বন্ধু’ প্রভৃতি সম্পর্কের পাশে নিজের অবস্থান পায়। একটি শব্দ ভাষার মধ্যে একা থাকে না। তার চারপাশে অন্য শব্দ আছে, আর সেগুলোর সঙ্গে মিল ও পার্থক্যের ভেতরে তার অবস্থান তৈরি হয়।

এই সম্পর্কগুলোর ব্যবস্থাকেই খুব সাধারণভাবে কাঠামো বলা যায়। কাঠামো মানে এখানে কোনো বাড়ির লোহার ফ্রেম নয়। কোন জিনিসটি কার সঙ্গে যুক্ত, কে কার থেকে আলাদা, কোনটি কোনটির বিপরীতে দাঁড়ায়, তাদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক কাজ করছে, সেই পুরো ব্যবস্থাই কাঠামো। ফুটবল মাঠে একজন গোলরক্ষকের কথা ভাবা যায়। তাকে গোলরক্ষক করে শুধু তার শরীর বা ব্যক্তিগত গুণ নয়। মাঠে তার নির্দিষ্ট জায়গা, দায়িত্ব এবং অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্কও তাকে গোলরক্ষক করে। খেলা শেষে একই মানুষ বাড়িতে গিয়ে বাবা, ভাই বা বন্ধু। মানুষটি বদলায়নি, সম্পর্ক বদলেছে, তাই পরিচয়ের দিকও বদলেছে।

গল্প পড়ার সময়ও এভাবে সম্পর্ক দেখতে পারি। কোনো গল্পে একজন ধনী ও একজন দরিদ্র চরিত্র থাকলে শুধু দুজনের আলাদা জীবন জানাই যথেষ্ট নয়। তাদের মধ্যে সম্পর্ক কী, সুযোগের পার্থক্য কোথায়, ক্ষমতা কার হাতে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গল্পে ঘর বারবার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত আর বাইরের জগৎ বিপদের সঙ্গে যুক্ত হলে ঘর ও বাইরে শুধু দুটি স্থান থাকে না, তাদের পার্থক্য গল্পের অর্থ তৈরি করতে শুরু করে। একজন চরিত্র সারাক্ষণ কথা বলে আর অন্যজন নীরব থাকলে সেই নীরবতাও কথার পাশে বিশেষ অর্থ পায়।

ক্যালভিনোর গল্পে এমন সম্পর্কের জাল ক্রমে ঘন হয়। চিহ্ন ও চিহ্নহীনতা, নিজের ও অন্যের, মনে রাখা ও ভুলে যাওয়া, তৈরি করা ও মুছে দেওয়া, এক ও বহু। প্রথম দিকে Qfwfq-এর জগৎ খুব সরল। একটি চিহ্ন আছে, বাকি সব চিহ্নহীন। Kgwgk আসার পর নিজের ও অন্যের পার্থক্য তৈরি হলো। পরে আরও চিহ্ন আসতে থাকলে প্রশ্নও বাড়ল। কোনটি আসল, কোনটি নকল, কোনটি আগে, কোনটি পরে, কোনটি ইচ্ছাকৃত, কোনটি কেবল দেখতে চিহ্নের মতো? মহাবিশ্ব যত জটিল হয়, চিহ্নের জগতও তত জটিল হয়ে ওঠে।

Kgwgk-এর উপস্থিতিতে Qfwfq নিজেকেও নতুনভাবে চিনতে শুরু করে। সে যতক্ষণ একা, ততক্ষণ ‘আমার চিহ্ন’ কথাটিতে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। অন্য কেউ আসতেই ‘আমার’ শব্দটির পাশে ‘অন্যের’ এসে দাঁড়ায়। মানুষের পরিচয়েও সম্পর্কের এই ভূমিকা আছে। শিক্ষক কথাটি ছাত্র ছাড়া পূর্ণ হয় না। পিতা পরিচয় সন্তানের সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয়। মালিক বললে মালিকানার সম্পর্ক উপস্থিত হয়। আমরা কে, তার অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কার সঙ্গে কী সম্পর্কে আছি তার ওপর।

Qfwfq ভেবেছিল চিহ্নটি সে তৈরি করেছে বলে তার অর্থের ওপরও নিজের পূর্ণ অধিকার থাকবে। কিন্তু Kgwgk-এর আগমন সেই বিশ্বাস ভেঙে দেয়। কোনো চিহ্ন একবার অন্যের সামনে এলে স্রষ্টার একার থাকে না। অন্য কেউ তাকে দেখবে, নিজের মতো বুঝবে, নকল করবে, বদলাবে বা মুছে দেবে। ভাষার ক্ষেত্রেও একই সত্য কাজ করে। আমরা যে শব্দ ব্যবহার করি, সেগুলো আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আমরা জন্মানোর বহু আগে ভাষা ছিল। তার শব্দ ছিল, ব্যাকরণ ছিল, ব্যবহারের অভ্যাস ছিল। আমরা সেই ভাষায় নতুন বাক্য বানাই, শব্দ নিয়ে খেলি, নতুন প্রকাশ তৈরি করি, কিন্তু একা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না যে আজ থেকে পরিচিত একটি শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ বদলে দিলাম এবং সবাই তা মেনে নেবে।

সসুর ভাষার সামগ্রিক ব্যবস্থা এবং ব্যক্তির ব্যবহারকে আলাদা করে দেখেছিলেন। সামগ্রিক ভাষাব্যবস্থাকে তিনি langue এবং ব্যক্তিগত ভাষাব্যবহারকে parole বলেছেন। নাম দুটি মুখস্থ রাখার চেয়ে ধারণাটি বোঝা বেশি দরকার। বাংলা ভাষা কোনো একজন মানুষের সৃষ্টি নয়। আমাদের জন্মের আগেই তার শব্দ ও নিয়ম ছিল। কিন্তু সেই ভাষা শিখে প্রত্যেকে নিজের বাক্য তৈরি করি। কেউ বলতে পারেন, ‘আমি কাল বাজারে যাব।’ বাক্যটি এই মুহূর্তে তাঁর নিজের তৈরি, কিন্তু ‘আমি’, ‘কাল’, ‘বাজার’, ‘যাব’ শব্দগুলো তাঁর আবিষ্কার নয়। ব্যক্তির স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা একটি আগে থেকে থাকা ভাষাব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে।

Qfwfq অবশ্য এক অর্থে আরও অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আছে। সে দাবি করতে পারে, তার আগে তো কোনো চিহ্নব্যবস্থাই ছিল না। কিন্তু সে প্রথম চিহ্নটি তৈরি করার মুহূর্তেই একটি ব্যবস্থার শুরু হয়ে যায়। একটি জায়গা চিহ্নিত, অন্য জায়গাগুলো নয়। দ্বিতীয় চিহ্ন আসার পরে তুলনা সম্ভব হয়। পরে অসংখ্য চিহ্ন জন্মালে তাদের মধ্যে একটি বড় সম্পর্কের জাল তৈরি হয়। তখন কোনো চিহ্ন আর একা থাকে না। নতুন চিহ্ন পুরোনোটির পাশে এসে তার গুরুত্ব বদলায়, কখনো ঢেকে দেয়, কখনো অনুকরণ করে, কখনো বিরোধ তৈরি করে।

তাই A Sign in Space শুধু একটি চিহ্নের গল্প নয়, একটি চিহ্নব্যবস্থা জন্ম নেওয়ার গল্পও। প্রথমে Qfwfq-এর চিহ্ন এত বিশেষ কারণ তার তুলনা নেই। পরে অসংখ্য চিহ্ন দেখা দিলে সেই একক বিশেষত্ব আর থাকে না। ফাঁকা দেয়ালে একটি ছবি থাকলে চোখ সরাসরি সেখানে যায়। একই দেয়ালে শত শত ছবি থাকলে প্রথম ছবিটি আর আগের মতো আলাদা হয়ে ওঠে না। ছবিটি বদলায়নি, চারপাশ বদলেছে। ক্যালভিনো এই পরিচিত অভিজ্ঞতাকে মহাজাগতিক মাপে নিয়ে গেছেন।

Qfwfq-এর সমস্যা শুধু অন্য চিহ্নের উপস্থিতি নয়। তার নিজের স্মৃতিও ধীরে ধীরে অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সে প্রথম চিহ্নটির কথা ভুলতে পারে না, অথচ ঠিক কেমন ছিল সেটি, সে বিষয়ে তার নিশ্চয়তা কমে যায়। মানুষের স্মৃতিতেও এমন ঘটে। শৈশবের বাড়িকে আমরা একভাবে মনে রাখি, বহু বছর পরে ফিরে গিয়ে দেখি বাস্তব বাড়িটি আমাদের স্মৃতির বাড়ির মতো নয়। একই ঘটনার কথা দুজন মানুষ আলাদা করে মনে রাখে। স্মৃতি কোনো কাচের বাক্সে রেখে দেওয়া অপরিবর্তিত ছবি নয়। সময়ের সঙ্গে তার রং ও বিন্যাস বদলায়।

Qfwfq-এর নিজের রুচিও বদলায়। যে চিহ্ন একসময় তার কাছে অপূর্ব মনে হয়েছিল, পরে সেটিকেই সেকেলে মনে হতে পারে। মানুষের পোশাক, গান, স্থাপত্য, সাহিত্য বা শিল্পরুচিতে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কোনো যুগে খুব আধুনিক বলে মনে হওয়া জিনিস কয়েক দশক পরে পুরোনো লাগে, আবার আরও পরে ঐতিহাসিক আকর্ষণ পায়। অর্থ শুধু পাশের অন্য চিহ্নের সঙ্গে সম্পর্কেই বদলায় না, সময়ের সঙ্গেও বদলায়।

সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতাতেও এই সত্য দেখা যায়। একজন লেখক কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে গল্প লিখতে পারেন। কিন্তু লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর তা অন্য মানুষের কাছে যায়। পাঠক নিজের সময়, অভিজ্ঞতা, ভাষা ও ইতিহাসের মধ্যে গল্পটি পড়েন। সমাজ বদলায়, নতুন জ্ঞান আসে, শব্দের ব্যবহার বদলায়। ফলে পুরোনো লেখাও নতুন অর্থ পেতে পারে। তার মানে এই নয় যে পাঠক যা ইচ্ছা তাই বলবেন। ব্যাখ্যার ভিত্তি অবশ্যই গল্পের ভাষা, ঘটনা, চরিত্র ও গঠনের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু লেখার অর্থ কেবল লেখকের মনের মধ্যে চিরকাল বন্দী থাকে না।

কাঠামোবাদ সাহিত্য পড়ার সময় লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে লেখার ভেতরের সম্পর্কগুলোর দিকে বেশি নজর দেয়। কোন চরিত্র কার বিপরীতে আছে, কোন ঘটনা আরেকটির প্রতিধ্বনি, কোথায় পুনরাবৃত্তি, কোথায় বিরোধ, কোন বস্তু বারবার ফিরে আসে, একটি ঘটনা আগের ঘটনার অর্থ কীভাবে বদলায়, এসব দেখা হয়। গোয়েন্দা গল্পে জানা ও অজানা, সত্য ও গোপন, অপরাধ ও অনুসন্ধান একে অন্যকে অর্থ দিতে পারে। প্রেমের গল্পে কাছে আসা ও দূরে যাওয়া, বলা ও না-বলা, আশা ও বাধার সম্পর্ক গল্পের টান তৈরি করে। ফলে গল্প কী বলছে শুধু সেটিই নয়, গল্পটি কীভাবে সেই অর্থ তৈরি করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ক্লোদ লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss) বিভিন্ন সমাজের পুরাণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লক্ষ করেছিলেন, চরিত্র ও ঘটনা আলাদা হলেও কিছু মৌলিক বিরোধ বারবার ফিরে আসে। জীবন ও মৃত্যু, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি, নিজের দল ও বাইরের মানুষ, কাঁচা ও রান্না করা, এ ধরনের জোড়া সম্পর্ক মানুষের চিন্তাকে সংগঠিত করতে পারে। সাহিত্যেও এমন বিরোধ গল্পের গভীর কাঠামো তৈরি করে। দুটি বিপরীত শক্তি কীভাবে মুখোমুখি হচ্ছে, তারা শেষে মিলছে কি না, একটি অন্যটিকে বদলে দিচ্ছে কি না, এসব দেখলে গল্পের নতুন স্তর খুলে যায়।

ক্যালভিনোর গল্পে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিরোধের একটি হলো এক এবং বহু। প্রথম চিহ্নটি একা বলে তার গুরুত্ব অপরিসীম। পরে অসংখ্য চিহ্ন তৈরি হলে নিজের চিহ্নটি আলাদা করে চিনে নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। জায়গা মনে রাখার জন্য যে চিহ্ন তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই চিহ্নের জগতই স্মৃতির সমস্যায় পরিণত হয়। শুরুতে চিহ্নের অভাব ছিল সমস্যা, পরে চিহ্নের অতিরিক্ততাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

মহাবিশ্ব ক্রমে নানা রেখা, দাগ, আকার ও বিন্যাসে ভরে উঠলে আরেকটি মজার ব্যাপার ঘটে। সবকিছু কেউ ইচ্ছা করে চিহ্ন হিসেবে বানায়নি, তবু Qfwfq অনেক কিছুকেই চিহ্নের মতো দেখতে শুরু করে। মানুষের অভিজ্ঞতাতেও এমন ঘটে। আমরা মেঘে মুখ দেখি, দেয়ালের দাগে পশুর আকৃতি দেখি, ঘটনাচক্রের মধ্যে ইঙ্গিত খুঁজি। একবার চিহ্ন পড়ার অভ্যাস তৈরি হলে এমন জায়গাতেও অর্থ দেখতে শুরু করি যেখানে কেউ হয়তো কোনো বার্তা রাখেনি। আমরা পৃথিবীকে শুধু দেখি না, শেখা সম্পর্ক ও চিহ্নের সাহায্যে তাকে পড়তেও থাকি।

চিহ্নের সংখ্যা বাড়লে বোঝাপড়া সব সময় সহজ হয় না। রাস্তার নাম, মানচিত্র, সংকেত আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু একই জায়গায় শত শত বিজ্ঞাপন, নির্দেশ ও বার্তা থাকলে প্রয়োজনীয় জিনিসটি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। তথ্যের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা। তথ্যের অভাব সমস্যা, অতিরিক্ত তথ্যও সমস্যা। ক্যালভিনোর গল্পকে আজকের তথ্যভরা পৃথিবীর ভবিষ্যদ্বাণী বলা বাড়াবাড়ি হবে, কিন্তু চিহ্নের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার যে অভিজ্ঞতা তিনি দেখান, সেটি এখন আমাদের খুব পরিচিত।

কাঠামোবাদ নিয়ে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা দরকার। এটি বলে না যে বাস্তব পৃথিবী বলে কিছু নেই এবং সবই কেবল শব্দ। একটি গাছকে ‘গাছ’ না বললেও গাছ থাকবে, নদীর নাম না থাকলেও পানি বইবে। প্রশ্ন হলো মানুষ সেই বাস্তব জগৎকে কীভাবে চিনছে, ভাগ করছে, মনে রাখছে এবং অন্য মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে। নদীর নাম দিলে তাকে অন্য নদী থেকে আলাদা করা সহজ হয়। মানচিত্রে রেখা টেনে অঞ্চল চিনতে পারি। ক্যালেন্ডারের তারিখ দিয়ে সময় ভাগ করি। ভাষা পৃথিবী তৈরি করে না, কিন্তু পৃথিবীকে মানুষের বোধের মধ্যে সাজাতে সাহায্য করে।

একটি শিশুর ভাষা শেখার মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি খুব পরিষ্কার। প্রথমে তার সামনে অসংখ্য বস্তু। পরে সে শেখে, এটি মা, এটি পানি, এটি আলো, এটি বিড়াল। আরও পরে শেখে সব চারপেয়ে প্রাণী বিড়াল নয়। কুকুর আলাদা, গরু আলাদা। সে শুধু নাম শিখছে না, পার্থক্যও শিখছে। ‘বিড়াল’ কী তা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে সে শিখছে কোনগুলো বিড়াল নয়। ভাষা শেখা এক অর্থে পৃথিবীকে পার্থক্যের মাধ্যমে চিনতে শেখা। Qfwfq-এর প্রথম চিহ্নও মহাশূন্যকে প্রথমবার ‘এই জায়গা’ এবং ‘অন্য জায়গা’য় ভাগ করে দিয়েছিল।

Qfwfq কে, সেটিও Kgwgk আসার পর আরও স্পষ্ট হয়। সে নিজেকে প্রথম স্রষ্টা বলে ভাবে, অন্যজন তাকে প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে। নিজের চিহ্নকে সুন্দর মনে করে, অন্যটির মধ্যে নকল দেখে। তার অহংকার, ঈর্ষা, অনিশ্চয়তা সবই অন্যের উপস্থিতিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্পর্ক শুধু চিহ্নের পরিচয় তৈরি করছে না, Qfwfq-এর নিজের চরিত্রও প্রকাশ করছে।

ক্যালভিনোর হাস্যরসের একটি বড় উৎস এখানেই। মহাবিশ্বের কোটি কোটি বছরের পরিবর্তনের সঙ্গে তিনি মানুষের ছোট ছোট দুর্বলতাকে জুড়ে দেন। Qfwfq প্রথম চিহ্ন বানিয়ে গর্বিত, কেউ নকল করলে বিরক্ত, নিজের নতুন নকশা নিয়ে খুশি, পরে পুরোনো নকশাকে সেকেলে মনে হলে অস্বস্তিতে পড়ে। একজন লেখক বহু বছর পরে নিজের পুরোনো লেখা পড়ে যেমন বিব্রত হতে পারেন, Qfwfq-ও বহু কোটি বছর আগের নিজের চিহ্নের দিকে তাকিয়ে তেমন অনুভব করে। মহাজাগতিক সময় আর খুব সাধারণ মানবিক অহংকার পাশাপাশি এসে গল্পটিকে একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক ও গভীর করে।

তবে A Sign in Space–কে শুধু সসুরের তত্ত্বের উদাহরণ হিসেবে পড়লে গল্পটির শক্তি কমিয়ে দেখা হবে। ক্যালভিনো তত্ত্বের কয়েকটি ধারণা নিয়ে আরও দূরে যান। প্রথম চিহ্ন তৈরি হলে কী ঘটে? দ্বিতীয়টি এলে প্রথমটির অর্থ কি আগের মতো থাকে? অসংখ্য চিহ্নে পৃথিবী ভরে গেলে একটি চিহ্নের বিশেষত্ব কোথায় থাকে? নির্মাতা নিজেই যদি নিজের চিহ্ন আর ঠিকমতো চিনতে না পারে, তাহলে অর্থের নিশ্চয়তা কতটা থাকে? গল্পটি কাঠামোবাদের ধারণা বোঝায়, আবার সেই ধারণার সীমার কাছেও আমাদের নিয়ে যায়।

কাঠামোবাদ সম্পর্কের ব্যবস্থা খুঁজে অর্থ বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু সম্পর্কের ব্যবস্থাই যদি বদলাতে থাকে, সমস্যা তৈরি হয়। ভাষায় নতুন শব্দ আসে, পুরোনো শব্দ হারিয়ে যায়, পরিচিত শব্দ নতুন অর্থ পায়। সমাজের নিয়মও বদলায়। নতুন একটি চিহ্ন এসে পুরোনো চিহ্নের অবস্থান পাল্টে দিতে পারে। তাহলে কোনো কাঠামোকে একবার আবিষ্কার করে চিরস্থায়ী বলে ধরে নেওয়া যায় না।

এই প্রশ্ন থেকেই পরে উত্তর-কাঠামোবাদের পথ খুলেছে। কাঠামোবাদ আমাদের বলে, অর্থ বুঝতে সম্পর্কের দিকে তাকাও। উত্তর-কাঠামোবাদ আরও একটি প্রশ্ন যোগ করে: সম্পর্কগুলোই যদি ক্রমাগত বদলায়, তাহলে অর্থ কতটা স্থায়ী হতে পারে? Qfwfq একটি স্থির চিহ্ন চেয়েছিল, কিন্তু সময়, অন্যের আগমন, নতুন চিহ্নের ভিড় এবং নিজের বদলে যাওয়া স্মৃতি তার সেই স্থিরতার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। ক্যালভিনোর গল্প তাই কাঠামোবাদের ভেতরে থেকেই স্থির অর্থের সমস্যাটিকেও ছুঁয়ে যায়।

মানুষ ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু ভাষাও মানুষকে গড়ে তোলে। নিজের নাম, পরিবার, দেশ, পেশা, সম্পর্ক, অধিকার, অপমান, ভালোবাসা, স্মৃতি, ইতিহাস সবকিছু নিয়েই আমরা ভাষার সাহায্যে ভাবি। Qfwfq নিজের জায়গা মনে রাখার জন্য চিহ্ন তৈরি করেছিল। পরে দেখা গেল, সেই চিহ্নের সঙ্গে সম্পর্কই তার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। সে শুধু চিহ্নের স্রষ্টা নয়, চিহ্নের জগতের বাসিন্দাও।

মানুষের পরিচয়ও পুরোপুরি নিজের শরীরের ভেতরে বন্ধ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কারও সন্তান, কারও বাবা বা মা, কারও বন্ধু, কারও সহকর্মী। প্রতিটি সম্পর্ক তার পরিচয়ের একটি দিক প্রকাশ করে। নাম, পেশা, জাতীয়তা, পরিবার, পদবি এসবও সামাজিক চিহ্ন হিসেবে কাজ করে। আমরা নিজেদের সম্পর্কে যা ভাবি, তার একটি বড় অংশ সম্পর্কের জালেই তৈরি হয়।

Qfwfq-এর প্রথম চিহ্নের প্রতি টানে মানুষের স্থায়ী হয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষাও দেখা যায়। আমরা নাম রেখে যেতে চাই, বই লিখি, ছবি তুলি, বাড়ি বানাই, সন্তানদের স্মৃতিতে বাঁচতে চাই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই চিহ্নগুলোর অর্থও বদলায়। একটি পুরোনো বাড়ি একজনের কাছে শৈশবের স্মৃতি, অন্যজনের কাছে বিক্রির সম্পত্তি, আরও পরে কারও কাছে ঐতিহাসিক স্থাপনা। বাড়িটি একই, সম্পর্ক বদলেছে, তাই অর্থও বদলেছে।

সাহিত্য পড়তে কাঠামোবাদ আমাদের একটি খুব কাজে লাগার চোখ দেয়। গল্প শেষ করার পর শুধু কী ঘটল জানলেই সব জানা হয় না। কে কার সঙ্গে যুক্ত, কোন ঘটনা অন্য ঘটনার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে, কোন বস্তু ফিরে ফিরে এসেছে, কোন দৃশ্য আগের কোনো দৃশ্যকে মনে করিয়েছে, একই ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটলে কেন তার অর্থ বদলেছে, এসবও দেখা দরকার। কোনো সমাপ্তি কেন চমক তৈরি করে, তা বুঝতে আগের প্রত্যাশার সঙ্গে তার পার্থক্য দেখতে হয়। কোনো চরিত্রের নীরবতা কেন ভারী লাগে, তা বুঝতে অন্যদের কথা বলার সঙ্গে তার সম্পর্ক দেখতে হয়।

এতে গল্পকে যন্ত্রের মতো খুলে টুকরো করার দরকার নেই। বরং দেখতে হয় একটি ভালো গল্পের বিভিন্ন অংশ কীভাবে একে অন্যকে অর্থ দেয়। A Sign in Space–এর শুরুতে প্রথম চিহ্নের একাকিত্ব না থাকলে শেষের চিহ্নের ভিড় এত অর্থবহ হতো না। Kgwgk না এলে ‘আমার চিহ্ন’ নিয়ে Qfwfq-এর গর্ব ও অধিকারবোধ এত স্পষ্ট হতো না। চিহ্ন মুছে না গেলে স্মৃতি ও হারানোর প্রশ্নও এত তীব্র হতো না। গল্পের প্রতিটি অংশ অন্য অংশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করছে। সেই সম্পর্কের জালই কাঠামো।

কাঠামোবাদের মূল কথাটি তাই খুব সাধারণ। কোনো কিছুর অর্থ জানতে শুধু তার নিজের দিকে তাকিয়ে থেকো না, তার চারপাশেও তাকাও। একটি শব্দ কোন শব্দের পাশে আছে, একটি চরিত্র কার সঙ্গে সম্পর্কিত, একটি ঘটনার আগে ও পরে কী আছে, কোন জিনিসের বিপরীতে আরেকটি জিনিস দাঁড়িয়ে আছে, সেসব লক্ষ করো। অনেক সময় আমরা যাকে কোনো জিনিসের নিজস্ব অর্থ বলে ভাবি, তার একটি বড় অংশ আসলে সম্পর্ক ও পার্থক্যের মধ্যেই তৈরি হয়েছে।

Qfwfq মহাশূন্যে একটি চিহ্ন রেখে ভেবেছিল, সে নিজের জন্য একটি স্থায়ী বিন্দু বানিয়ে ফেলেছে। কোটি কোটি বছর পরেও সেটি তাকে নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু অন্য চিহ্ন এলো, অন্য চোখ তাকে দেখল, কেউ মুছে দিল, কেউ নতুন চিহ্ন বসাল, সময় বদলাল, Qfwfq-এর নিজের স্মৃতিও বদলাল। একসময় এত চিহ্ন তৈরি হলো যে প্রথম চিহ্নটির একক বিশেষত্বই হারিয়ে গেল। যে চিহ্ন তাকে নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ছিল, চিহ্নের বিস্তৃত জগতই তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলল।

সসুরের ভাষাতত্ত্ব তখন আর শুকনো সংজ্ঞা হয়ে থাকে না। সংকেতক ও সংকেতিতের সম্পর্ক Qfwfq-এর চিহ্নের মধ্যে দৃশ্যমান হয়। চিহ্নের যাদৃচ্ছিকতা বোঝা যায়, কারণ মহাবিশ্ব তার জন্য কোনো স্বাভাবিক আকার নির্ধারণ করে দেয়নি। পার্থক্যের গুরুত্ব বোঝা যায়, কারণ চিহ্নহীন বিস্তারের বিপরীতে প্রথম চিহ্ন বিশেষ হয়েছিল, আর দ্বিতীয় চিহ্ন আসার পর প্রথমটির পরিচয়ই নতুনভাবে তৈরি হয়েছিল। কাঠামোর ধারণাও পরিষ্কার হয়, কারণ বহু চিহ্ন আলাদা আলাদা হয়ে পড়ে থাকে না, তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়ে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

ক্যালভিনোর গল্প আমাদের মানুষ সম্পর্কে খুব সাধারণ অথচ গভীর একটি সত্যের কাছে নিয়ে যায়। মানুষ পৃথিবীতে শুধু বাস করে না। সে পৃথিবীকে নাম দেয়, ভাগ করে, চিহ্নিত করে, স্মৃতিতে রাখে এবং গল্পে সাজায়। সেই নাম ও চিহ্নের মধ্য দিয়েই আবার নিজের জায়গা খুঁজে নেয়। Qfwfq মহাবিশ্বে নিজের অবস্থান মনে রাখার জন্য একটি চিহ্ন তৈরি করেছিল। সেই চিহ্নই পরে তাকে নিজের স্মৃতি, অহংকার, পরিচয়, অন্যের উপস্থিতি এবং সময়ের পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। মানুষ চিহ্ন তৈরি করে, আবার সেই চিহ্নের মধ্য দিয়েই নিজের পৃথিবীকে চিনতে শেখে।

কাঠামোবাদ আমাদের এই চেনার প্রক্রিয়াটিই দেখতে শেখায়। কোনো জিনিস কী, এই প্রশ্ন যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সেটি অন্য জিনিসের সঙ্গে কী সম্পর্কে আছে। একটি গল্প কী বলেছে, তা জানার পাশাপাশি গল্পের চরিত্র, ঘটনা, শব্দ, বিরোধ ও পুনরাবৃত্তি কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেই অর্থ তৈরি করেছে, সেটিও দেখা দরকার। ইতালো ক্যালভিনোর A Sign in Space মহাশূন্যের একটি নিঃসঙ্গ চিহ্ন থেকে শুরু করে অসংখ্য চিহ্নে ভরা এক জগতের মধ্য দিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে আমাদের সেই চোখটি দেয়। অর্থ একা জন্মায় না। অর্থ তৈরি হয় পার্থক্যে, সম্পর্কে এবং সম্পর্কের বৃহত্তর বিন্যাসে। সেই বিন্যাস দেখতে শেখার মধ্যেই কাঠামোবাদের সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে কার্যকর পাঠ। ·